Home রুপুর বিয়ে রুপুর বিয়ে পর্ব ২৪

রুপুর বিয়ে পর্ব ২৪

রুপুর বিয়ে পর্ব ২৪
Bobita Ray

বিনয়ের চোখের আড়াল হতেই রুপু আশ্চর্য হয়ে খেয়াল করল। ওর এখন আর একটুও কান্না পাচ্ছে না। কষ্টগুলো বুকের ভেতরে গুমোট বেঁধেছে। ভুল করেও চোখ দিয়ে একফোঁটা নোনাজল গড়িয়ে পড়ল না। রুপুর নিজেকে এত স্বাভাবিক দেখতে বেশ অবাক লাগছে। এখন যদি রুপুর আবেগের বয়স থাকতো। তাহলে কী করত রুপু? কেঁদেকেটে একাকার করে ফেলত। কাঁদতে কাঁদতে হয়তো পটলি টোপলা গুছিয়ে নিজের বাড়ির দিকে রওনা হতো। বিনয় হাতে-পায়ে ধরে ক্ষমা চাইলেও শুনতো না রুপু। নিজের বাড়ি ঠিকই চলে যেত। তারপরই আসল খেলা শুরু হতো। তুচ্ছ কারণে বিনয়ের সংসার ছেড়ে যাবার জন্য রুপুর মা কারণে-অকারণে রুপুকে কটুকথা শোনাতো। খাওয়ার থেকেও কথার বিষ বেশি হজম করতে হতো রুপুকে। রুপুর মা এমনিতে বোকাসোকা হলে কী হবে। এই একটা ব্যাপারে প্রচণ্ড কড়া। তার ধারণা মেয়েরা যতই আদরের হোক না কেন! বিয়ের পর পর হয়ে যায়। মেয়েদের একমাত্র ঠিকানা স্বামীর ঘর। স্বামী শ্বশুরবাড়ির লোক যেমনই হোক না কেন! মৃত্যু পর্যন্ত চোখ-মুখ বুঁজে স্বামীর সংসার করে যেতে হবে।

রুপু বুকচিরে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এখন মাথা গরম করে বাবার বাড়িতে চলে যাওয়াটা হবে বড্ড বোকামি। এখানে তা-ও বীথি রানীর সাথে টক্কর দিয়ে রুপুর শ্বশুরের প্রশ্রয়ে বেশ দাপটের সাথে চলা যাচ্ছে। বাবার বাড়িতে গেলে প্রতিনিয়ত মা, আত্মীয়-স্বজন প্রতিবেশীদের হুল ফুটানো কথা সহ্য করে বেঁচে থাকতে হবে রুপুকে। তাছাড়া বিনয় যে বোকার হদ্দ। ওর মা একবার বারণ করলে কোনদিনও রুপুকে আনতে যাবে না। বিনয় আজ রুপুকে যে নোংরা কথা বলেছে। তারজন্য বিনয়কে এমনি এমনি ছেড়ে দেবে না রুপু। এমন শাস্তি দেবে। বিনয়কে সারাজীবন এই ভয়ংকর শাস্তির কথা মনে রাখতে হবে। মনে রাখতেই হবে।
বিনয় অনুশোচনায় দগ্ধ হয়ে গেল। বিনয় রুপুকে এত নোংরা কথা এত সহজে কীভাবে বলতে পারল। ভাবতে ভাবতে বিনয়ের নিজেকে পাগল পাগল লাগছে। বিনয়ের এখন রুপুর কাছে যাওয়ারও সাহস হচ্ছে না।
লজ্জা লাগছে খুব। লজ্জার থেকেও বেশি লাগছে ভয়।

মন বলছে, এখন রুপুর কাছে যাওয়া উচিত। নিজের নোংরা কথার জন্য রুপুর কাছে হাতজোড় করে ক্ষমা চাওয়া উচিত। রুপু যদি বিনয়ের ক্ষমা না মানে। বন্ধ ঘরে রুপুর পা জড়িয়ে ধরে ক্ষমা চাইতেও বিনয়ের কোন আপত্তি নেই।
নিজের মনের সাথে যুদ্ধ করে যখন সব লজ্জা ভয় জড়তা কাটিয়ে বিনয় রুপুর কাছে যেতে নিল। তখনই বীথি রানী বিনয়ের সামনে এসে দাঁড়াল। ছেলে পর হয়ে যাওয়ার দুঃখে বীথি রানীর চোখদুটো ছলছল করছে। এখন মাকে উপেক্ষা করে রুপুর কাছে যাওয়ার সাধ্যি নেই বিনয়ের। কোনকালেই ছিল না। বিনয় হাসার চেষ্টা করে বলল,
“মা তুমি শুধু শুধু কেন বাচ্চাদের মতো জেদ করো বলোতো? তুমি সারাদিন না খেয়ে থেকে নিজেকে কষ্ট দেবার সাথে সাথে কী আমাকেও কষ্ট দিচ্ছ না?”
“তোর বাবা বলল, তুইও নাকি আমার জন্য আজ সারাদিন না খেয়ে আছিস?”
বিনয় মায়ের কাঁধ জড়িয়ে ধরে হেসে ফেলল। বলল,
“কখনো তোমাকে ছাড়া খাই আমি?”
বীথি রানীর মনটা আনন্দে ভরে উঠল। ওই ডাইনিটার জন্য নিজের সোনার টুকরা ছেলেকে শুধু শুধু কষ্ট দেওয়ার কোন মানে হয় না। বলল,

“চল খেয়ে নিবি।”
বিনয় অন্যদিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস গোপন করে মায়ের পিছুপিছু খাবার ঘরে গেল।
রাতে সবাই একসাথে খেতে বসল। রুপু খুব স্বাভাবিক ভাবে সবার পাতে খাবার তুলে দিচ্ছে। খাবার তুলে দেবার ফাঁকে ফাঁকে বীথি রানীকে ইঙ্গিত করে রসিকতা করার চেষ্টাও করছে। বিনয় রুপুর এত স্বাভাবিক আচরণ দেখে বেশ অবাক হলো। সবচেয়ে বেশি অবাক লাগছে রুপু বিনয়ের দিকে ভুলেও তাকাচ্ছে না। আর না বিনয়ের সাথে কথা বলছে। বীথি রানী খেতে গিয়ে দেখল, রুপু আজ শুধু কাতল মাছের ঝোল, কাতল গাছের ডিম দিয়ে পটল ভাজা, আর লেজের অংশ দিয়ে চালকুমড়া ঘণ্ট রেঁধেছে। বীথি রানী চোখ-মুখ কুঁচকে ফেলল। বলল,
“আমি এই মাছ খাব না। আরকিছু রান্না করোনি?”
রুপু দায়সারা ভাবে বলল,

“না।”
“তাহলে আমি কী দিয়ে ভাত খাব?”
রুপু বীথি রানীর পাতে একগ্লাস জল ঢেলে দিল। তারপর পেঁয়াজ আর কাঁচামরিচ ভেঙে দিয়ে বলল,
“আপনি যখন মাছ খেতে চাচ্ছেন না। তাহলে আর জোর করে লাভ নেই। শেষে দেখা যাবে, গলায় আঙুল ঢুকিয়ে বমি করে সবার খাওয়ার রুচি নষ্ট করে দিয়েছেন। নিন। সোনামুখ করে খেয়ে নিন।”
বীথি রানী রাগে আগুন হয়ে গেল। কটমট করে রুপুর দিকে তাকাল। রুপু শাশুড়ী মায়ের আগুন চোখের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসল। বলল,
“একটা ডিম ভেজে দেব কী মা?”
বীথি রানী রাগ ভুলে বোকা বোকা চোখে রুপুর দিকে তাকিয়ে রইল। এই মেয়েটাকে ভগবান ভুল করে মাটির বদলে পাথর দিয়ে তৈরি করেছে। বীথি রানীর ভাবনায় কোন ভুল নেই। ১০০% শিওর। নাহলে এই কাণ্ড করে কেউ? কোথায় মাছ খাওয়ার জন্য বীথি রানীকে জোড়াজুড়ি করবে। সাধাসাধি করবে। বীথি রানী না খেতে চাইলে জোর করে পাতে মাছ তুলে দেবে। বীথি রানী এমন ভাব ধরে মাছ মুখে দেবে, যেন দেখে মনে হবে। সে নেহাৎ সবার কথা রাখতে মাছ দিয়ে ভাত খাচ্ছে।

অথচ ডাইনিটা কী সর্বনেশে কাণ্ড করে বসল। বীথি রানীর এখন খুব মাছ দিয়ে ভাত খেতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু দুই পয়সার মেয়েটার সামনে কিছুতেই মাথা নত করা যাবে না। বীথি রানী তেজের জ্বালায় গপাগপ পান্তাভাত কাঁচামরিচ ডলে খেতে লাগল। এবং আশ্চর্য হয়ে খেয়াল করল। খিদে পেটে পান্তা ভাত খেতে ততটাও খারাপ লাগছে না। বরং ভালো লাগছে। তবে এই খাওয়া শেষ না। রাতে যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়বে। বীথি রানী তখন ঠিকই মাছ দিয়ে ভাত খেতে বসবে। বিনয় বলল,
“মা প্লিজ একটু মাছ নাও?”
“তোর বউকে বেশি করে খাওয়া। এখন আমাকে পান্তা ভাত খাওয়াচ্ছে। দুদিন পর দেখা যাবে বাড়ি থেকেই বের করে দেবে।”

“ছিঃ মা আমি এতটাও খারাপ না। নিন একপিস মাছ নিন?”
“খবরদার আমার পাতে ভুলেও মাছ দেবে না তুমি।”
রুপু সঙ্গে সঙ্গে মাছের পিস বাটিতে রেখে দিল।
অনেক রাতে ঘরে এসে বিনয় দেখল, ঘরে আরেকটা খাট পাতা হয়েছে। রুপু মনের সুখে সেই খাটে বিছানা পাতছে। বিনয় হতভম্ব হয়ে করুণ চোখে রুপুর কাণ্ড দেখতে লাগল। এত অল্প সময়ে এই কাণ্ড কখন করল রুপু কে জানে! ঘটনা এই পর্যন্ত হলেও মানা যেত। কিন্তু রুপু চূড়ান্ত করল। বীথি রানীকে কোমল স্বরে ওদের ঘরে ডেকে নিয়ে আসল। বলল,

“আপনার ছেলে আজ আমাকে খুব নোংরা একটা কথা বলেছে মা। আমার অপরাধ মা ভক্ত ছেলেকে সাময়িক সময়ের জন্য মায়ের কাছ থেকে আলাদা করে রেখেছিলাম। ছেলেটা ম্যাঁ ম্যাঁ করে মায়ের কাছে যেতে না পারার দুঃখে মুখ ফস্কে আমাকে নোংরা কথা বলে ফেলেছে। এটা তো আর আগের যুগ নেই। যে বরের কটুকথা শুনেও হাসিমুখে সংসার করতে হবে। তারপরও আমি আগের যুগের মেয়েদের মতো সবভুলে আপনার ছেলের সাথে দিব্যি সংসার করছি। তো যাইহোক যে কারণে আপনাকে ডেকেছি। মা আমার রিকুয়েষ্ট এখন থেকে আপনি আমাদের সাথে ঘুমাবেন। অনেক ভেবে দেখলাম, মা ভক্ত ছেলেরা ঈশ্বরের আশীর্বাদ। মায়েদের কাছ থেকে এদের আলাদা করা একদম উচিত না। হয়ত মহা মহা পাপও হতে পারে। আমার এই বিষয়ে সঠিক ধারণা নেই। আপনার ছেলের কখন কী লাগবে। সে-তো আমার থেকে আপনিই ভালো জানেন তাই না মা? এখন বোকার মতো দাঁড়িয়ে না থেকে শুয়ে পড়ুন। আপনার ছেলের পাশে শুতে লজ্জা লাগলে দয়া করে আমার পাশে শুয়ে পড়ুন। প্রথম দুই তিন রাত আপনার হয়তো একটু অসুবিধে লাগবে। তারপর আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে।

অনেক ভেবেটেবে দেখলাম, আমার যদি কোনদিন ছেলে-টেলে হয়। আদৌও হবে নাকি সে ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারছি না। ছেলেকে আমি কঠিন শাসনে বড় করব। একটা বয়সের পর আমার কাছ থেকে একশো হাত দূরে রাখব। তারপরও যদি ভুল করে ছেলেটা আমার কোনকারণে মা ভক্ত হয়ে যায়। তাহলে বিয়েই দেব না। আমাদের মা-ছেলের ভণ্ডামির জন্য পরের বাড়ির মেয়েটাকে শুধু শুধু কষ্ট দেবার কোন মানে হয় না। শেষে দেখা যাবে, মেয়েটার অভিশাপ কুড়াতে কুড়াতেই আমার বুদ্ধকাল ভয়ংকর ভাবে কাটবে। আমার এত শখের একটা জীবন। এই জীবনে কোথায় হেসে খেলে আনন্দ আমুদে বাঁচব। তা না করে এত প্যারা নেওয়ার কোন মানে হয়? একি আপনি হা করে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? প্লিজ শুয়ে পড়ুন মা। প্লিজ..
রুপু কথাগুলো এত দৃঢ় কণ্ঠে অথচ হালকা ভাবে বলল বীথি রানী রাগ হবে, দুঃখিত হবে না আনন্দিত হবে। সঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। তবে রুপুর করা অপমান এই প্রথমবার বীথি রানী মোটেও গায়ে মাখল না। রুপু যখন বীথি রানীকে এখানে শুতে বলছে। বীথি রানী অবশ্যই শুবে।

বিনয় নাহয় একটা ভুল করেই ফেলেছে। প্রয়োজন হলে রুপু ক্ষমা না করা পর্যন্ত রুপুর দুইপা ধরে সারারাত বসে থাকতে রাজি আছে। তাই বলে মাকে এইঘরে শুতে বলতে হবে কেন? এই ব্যাপারটা কী রুপু অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করছে না? এখন মা রাজি নাহলেই হয়। বিনয় তো মাকে মুখের উপরে বলতেও পারবে না। তুমি রুপুর কথায় কিছু মনে করো না। প্লিজ এখন ঘরে যাও মা। এ-কি ঘরে মা-বউকে নিয়ে শোবার অভিজ্ঞতা যে সুখকর হবে না। বেশ বুঝতে পারছে বিনয়।
বীথি রানী বিনয়ের শুকনো মুখের দিকে তাকিয়ে সুখী সুখী গলায় বলল,
“তোর বউ এত করে বলছে যখন..”

বিনয় মাথা নিচু করে ফেলল। চাপা কষ্টে বিনয়ের বুকের ভেতরে ফেটে যাচ্ছে। রুপুটা কী ভয়ংকর একটা কাণ্ড করে বসল। মা যদি শখের বশে একদিন দুদিন ঘুমায় তাহলে ঠিকাছে। কিন্তু যদি…বিনয় আর ভাবতে পারে না। ক্রমশই রুপুর উপরে মেজাজ খারাপ হচ্ছে। ইতিমধ্যে মা নিজের কাঁথা, বালিশ, পানের বাটা, শুকনো ফলের কৌটা, চানাচুরের বৈয়াম আরও কী কী যেন এইঘরে নিয়ে এসেছে। মনের সুখে খাটের পাশে সবকিছু থরে থরে সাজিয়ে রাখছে। মায়ের ভাবসাব দেখে তো মনে হচ্ছে সহজে এইঘর থেকে যাবে না।
রুপু ঘরের দরজা বন্ধ করে ঘরের লাইট অফ করে দিল। বীথি রানীর পাশে শুতে শুতে বলল,
“মা রাতে কিন্তু ভুলেও নাক ডাকবেন না। হাতির মতো নাক ডাকার শব্দে আমার মোটেও ঘুম হয় না। নাক ডাকার শব্দে আমার কাঁচা ঘুম ভেঙে গেলে আমি কিন্তু আপনার নাক চিপে দিতেও পারি।

বীথি রানী ভয়ে ভয়ে রুপুর কাছ থেকে খানিকদূরে গিয়ে শুলো। এই মেয়েকে দেখে বিশ্বাস নেই। সত্যি সত্যি নাক চিপে দিতেও পারে। বুড়ো বয়সে ছেলের বউয়ের হাতে নাক চিপাচিপি খাওয়ার কোন শখ নেই বাবা..
বীথি রানী সারারাত ভালো করে ঘুমাতেই পারল না। যদি রুপু সত্যি সত্যি নাক চিপে দেয় সেই ভয়ে ঘুম হলো ছাড়া ছাড়া। তারউপরে বিধানবাবু বীথিকে দু তিনবার ঘরে যাওয়ার জন্য ডাকতে এসেছে। বীথি রানী সারা দেয়নি। ঘাপটি মেরেছিল। বীথি রানীর হয়ে রুপুই উত্তর দিয়েছে। মা ঘুমিয়ে পড়েছে বাবা। বীথি রানী ভোরের দিকে ভয়ংকর একটা স্বপ্ন দেখল, এখন আর স্বপ্নকে স্বপ্ন মনে হচ্ছে না। মনে হচ্ছে সত্যি সত্যিই রুপু খুব আগ্রহ করে বীথি রানী আর বিনয়কে নিয়ে কক্সবাজার ঘুরতে গেছে। ওরা তিনজন সাগরের পাড় ধরে হাঁটতে হাঁটতে একটা নির্জন জায়গায় চলে গেল। তখনই রুপু ওদের মা-ছেলেকে শক্ত দড়ি দিয়ে শক্ত করে বেঁধে ফেলল। বীথি রানী ভয়ে ভয়ে বলল,
“কী করছ কী বউমা? শিগগিরই বাঁধন খুলে দাও। টেনশনে আমার নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।

বীথির কথাশুনে রুপু অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। রুপুর এত কুৎসিত হাসির শব্দে বীথির গা ভয়ে ঝমঝম করে উঠল। শরীরে একবিন্দু শক্তি নেই। যে বাঁধন খুলে বিনয়কে নিয়ে দূরে কোথাও পালিয়ে যাবে। তখন জোয়ার। সমুদ্র ফুলেফেঁপে উঠছে। বড় বড় ঢেউ আছড়ে পড়ছে তীরে। বীথি রানী কিছু বুঝে ওঠার আগেই রুপু আচমকা ধাক্কা মেরে ওদের মা-ছেলেকে গভীর সমুদ্রে ফেলে দিল।
বীথি রানী মাঝ সমুদ্রে খাবি খেতে খেতে স্বপ্নের ভেতরে চিৎকার করে বলল,
“ফেলো না ফেলো না। আমাদের ছেড়ে দাও।”
বীথি রানীর স্বপ্ন ভেঙে যেতেই ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল। চোখদুটো জলে ভিজে গেছে। সারা শরীর ঘামে ভিজে উঠেছে। কেমন চিটচিট করছে।

এত ভয় শেষ কবে পেয়েছিল সঠিক মনে পড়ছে না। এই একটু আগেও মনে হচ্ছিল। এটা কোন স্বপ্ন না। রুপু সত্যি সত্যি ওদের মা-ছেলেকে বিশাল সমুদ্রে ফেলে দিয়েছে৷ যেখান থেকে বেঁচে ফেরা প্রায় অসম্ভব। স্বপ্ন এত নিখুঁতও হয়। বীথি রানীর সত্যিই জানা ছিল না। কী ভয়ংকর.. কী ভয়ংকর…
ওই তো রুপু ঘুমুচ্ছে। কোন সারাশব্দ নেই। জিরো বাল্বের নরম আলোতে কী শান্ত কী কোমল দেখাচ্ছে রুপুর ঘুমন্ত মুখখানি। অথচ এই মেয়ে যখন জেগে থাকে। সারাক্ষণ মুখ দিয়ে কথার তুবড়ি ছুটতে থাকে। বাকি রাতটা বীথি রানী একফোঁটা ঘুমাতে পারল না। জেগেই কাটাল।
সকালে রুপু সবজি রান্না করছে। আরেক চুলায় ডিমসেদ্ধ বসিয়েছে। ময়নার মা রুপুর পাশে বসে একমনে রুটি বেলছে। তখনই বিনয় চা খাওয়ার বাহানায় রান্নাঘরে এলো। আশেপাশে ময়নার মা ছাড়া আর কেউ নেই। বিনয় ইশারায় ময়নার মাকে চলে যেতে বলল। ময়নার মা ব্যস্ত ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়াল। রুপুকে বলল,
“বউদি আমি একটু বাইরে থেকে আসি।”

রুপু কিছু বলল না। বিনয় আস্তে করে রান্নাঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিল। বুকে সাহস সঞ্চয় করে একপা দুপায়ে রুপুর ঠিক পেছনে এসে দাঁড়াল। যখনই দুইহাত দিয়ে রুপুর কোমর জড়িয়ে ধরতে যাবে। তখনই রুপু ছিটকে দূরে সরে গেল। বিনয় আহত চোখে রুপুর দিকে তাকাল। বলল,
“কী করলে আমাকে ক্ষমা করবে তুমি?”
“কী করলে ক্ষমা করব? এটা তো ভাবার বিষয়। দাঁড়াও একটু ভেবে উত্তর দিচ্ছি।”
রুপু খুব গুছিয়ে কথা বলে। রুপুর কথার পিঠে কথা বলা বড্ড মুশকিল। বিনয় নিজের কথাগুলো গুছিয়ে নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছে।
রুপু সবজি নামিয়ে রেখে গ্যাসের চুলা অফ করে বিনয়ের মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। কাপড়ের আঁচলে ভেজা হাত মুছতে মুছতে বলল,

“তুমি যখন আমাকে নটি বেটিদের সাথে তুলনা করেই ফেলেছ..”
“রুপু আমার ভুল হয়ে গেছে। ভুল না বড্ড অন্যায় বড্ড পাপের একটা কথা বলে ফেলেছি আমি।”
“আমার কথা আগে শেষ করতে দাও.. তো যা বলছিলাম। তোমার মুখে আমার সম্পর্কে এত কুৎসিত একটা কথাশুনে আমি এখনো এতটা স্বাভাবিক আছি। এই নিয়ে তুমি বড্ড চিন্তায় আছো। তোমার ধারণা ছিল। আমি হয়তো টিপিক্যাল বউদের মতো কেঁদেকেটে একাকার করে ফেলব। আমিও বোধহয় তোমার মনের আশা পূরণ করতে একটু আধটু কাঁদতে চেয়েছিলাম। কিন্তু নিষ্ঠুর দুচোখে একফোঁটা জলও এলো না। সে না আসুক। এখন তুমি কী ভাবছ। তোমার মুখে এত নোংরা কথাশুনে আমি এখনো চুপ করে আছি মানেই যে সারাজীবন মুখ বুঁজে তোমার সংসার করব। এবং তুমি সুযোগ পেলে ভবিষ্যতে এর থেকেও নোংরা নোংরা কথা আমাকে শোনাবে। এই ধারণা মনেও এনো না। আমি আমার প্রয়োজনে তোমাদের বাড়িতে এখনো আছি। ভবিষ্যতেও আমার প্রয়োজন মতো থাকব। যেদিন আমি আমার নিজের পায়ের তলার মাটিটা শক্ত করতে পারব। সেদিন র্নিভয়ে নিশ্চিন্তে টা টা বাই বাই বলে বিদায় হয়ে যাব।

এখন আসল কথায় আসি, তোমার ধারণা আমি নটি বেটিদের মতো। কখনো যদি আমার কাছে আসার জন্য
আমার সঙ্গ পাওয়ার জন্য তোমার শরীর গরম হয়। দয়া করে খালি হাতে আমার কাছে আসবে না। হাতে মোটা অংকের টাকা নিয়ে তারপর আমার কাছে আসবে। ঠিক যেভাবে নটি বেটিদের কাছে যাও।
আর হ্যাঁ আমি কিন্তু শিক্ষিত, মার্জিত, এক পুরুষকে আমার কাছে আসতে দেওয়া নারী। তারউপরে এই সংসারের ধরতে গেলে সব কাজ আমি নিজে হাতে করি। আমার চার্জটা একটু না অনেকটাই বেশি হবে। এটা যেন মাথায় থাকে।”

রুপুর বিয়ে পর্ব ২৩

কথাগুলো বলতে পেরে রুপুর নিজেকে খুব হালকা লাগছে। বুকের গুমোট বাঁধা ভাব কমে গেছে অনেকখানি।
হতভম্ব বাকরুদ্ধ বিনয়কে রান্নাঘরে দাঁড় করিয়ে রেখে রুপু চলে গেল। যে কাজটা রুপু করতে পারেনি। সেই কাজটা বিনয় করল। খুব ভালোভাবেই করল। রুপুর কথাশুনে বিনয় এতটাই আহত হয়েছে। এতটাই মনে কষ্ট পেয়েছে।
মুখে হাত চেপে ধরে ব্যাকুল হয়ে কাঁদতে লাগল। অতিরিক্ত কান্নার দমকে বিনয়ের শরীর ফুলে ফুলে উঠছে।

রুপুর বিয়ে পর্ব ২৫