রুপুর বিয়ে পর্ব ৩৭
Bobita Ray
দুইদিন পর,
অসময়ে বিনয়কে দেখে, অথৈ হেসে ফেলল। আন্তরিক ভাবে বলল,
“ভেতরে আসুন জামাইবাবু।”
রুমা রান্না করছে। চেঁচিয়ে বলল,
“কে এলো রে অথৈ?”
“জামাইবাবু এসেছে মা।”
রুমা তড়িঘড়ি করে গ্যাসের চুলা অফ করে বসার ঘরে এলো। বিধ্বস্ত বিনয়কে দেখে আঁতকে উঠল। অস্ফুট স্বরে বলল,
“কী হয়েছে বাবা তোমার?”
বিনয় ধপ করে সোফায় বসে পড়ল৷ খুব অল্পসময়ে বিনয় ভয়াবহ ডিপ্রেশনে চলে গেছে। অতিরিক্ত চিন্তায় দু’রাত ধরে একফোঁটা ঘুম হয় না। একদিকে মায়ের জেদ। আরেকদিকে রুপুর জেদ। কাকে রেখে কাকে সামলাবে বিনয়? ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। কেউ কেন বিনয়ের কষ্ট বুঝে না? বিনয় বলল,
“মা রুপুর সাথে কী আপনাদের কথা হয়েছে?”
রুমা চোখের জল মুছে বলল,
“রুপু আমার বা তোমার শ্বশুরের ফোন ধরে না। মাঝেমধ্যে অথৈয়ের সাথে কথা বলে।”
“অথৈ তোমার সাথে শেষ কবে রুপুর কথা হয়েছে?”
অথৈ বলল,
“গতকাল রাতে।”
“রুপু কিছু কী বলেছে তোমাকে?”
“নাতো। কেন কী হয়েছে?”
বিনয় দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“আমাকে একগ্লাস জল দাওতো অথৈ।”
অথৈ তড়িঘড়ি করে জল আনতে চলে গেল।
বিনয় হাঁটুগেড়ে রুমার সামনে বসে আচমকা রুমার পাদু’টো জড়িয়ে ধরে ঝরঝর করে কেঁদে দিল। রুমা হতবিহ্বল হয়ে পড়ল। বিনয় কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“মা প্লিজ রুপুকে বোঝান একটু আপনারা। আমি আর সহ্য করতে পারছি না। আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে মা।”
“পা ছাড়ো বাবা।”
বিনয় চট করে রুমার পা ছেড়ে দিল। রুমা বিনয়ের মুখোমুখি বসল। কী হয়েছে জিজ্ঞেস করতেই বিনয় কোনকিছু লুকাল না। এ-ই দুদিন যা যা হয়েছে। সবকিছু খুলে বলল শাশুড়ীমাকে। সবশুনে রুমা হতভম্ব হয়ে গেল। বলল,
“রুপু কী পাগল। ও কেন এখনো নিজের ভালো বুঝতেছে না।”
“মা প্লিজ বোঝান আপনারা রুপুকে। আমার মা রুপুকে একমাস সময় বেঁধে দিয়েছে। রুপু একমাসের ভেতরে আমাদের বাড়িতে ফিরে না এলে কী হবে আমি নিজেও জানি না। তবে এতটুকু জানি। ওকে না পেলে। আমি..আমি নিশ্চিত একটা না একটা অঘটন ঘটিয়ে ফেলব।”
“অবুঝের মতো কথা বলোনা বাবা। একটু ধৈর্য ধরো। তোমার শ্বশুর আজ বাড়িতে আসুক। আমি তোমার শ্বশুরকে নিয়ে রুপুর কাছে যাব। ওকে যেভাবেই হোক তোমার সংসারে ফিরিয়ে এনে দেব। এত ভালো ঘর। এত ভালো বর। আমার বোকা মেয়েটা সব ফেলে কেন যে মরীচিকার পেছনে উন্মাদের মতো ছুটছে। ইশ, কেন রুপু নিজের ভালো বুঝতে পারছে না। আর কবে বুঝবে আমার বোকা মেয়েটা। সব হারিয়ে নিঃস্ব হওয়ার পরে বুঝে কী কোন লাভ হবে বলোতো?”
রুমার আক্ষেপ ঝরা কথাশুনে বিনয় ভরসা পেল। অথৈ জলের সাথে জলখাবার নিয়ে এলো। বিনয় শুধু জলের গ্লাসটা হাতে নিল। অন্য খাবার ছুঁয়েও দেখল না।
রুপু বাবা-মাকে দেখে খুশিও হলো না। দুঃখিতও হলো না। রুমা মেয়েকে পরম মমতায় জড়িয়ে ধরল। চোখের জল মুছে বলল,
“আমাদের কথা তোর কী মনে পড়ে না রুপু? এত পাষাণ কীভাবে হলি তুই?”
রুপু ক্যাটারিং কক্ষে ক্লাস করাচ্ছে। পঁচিশ জন মেয়ে খুব কৌতূহল নিয়ে রুপুর মায়ের আদিখ্যেতা দেখছে। এই ব্যাপারটা রুপুর মোটেও ভালো লাগছে না। রুপু বলল,
“মা চলো তোমাদের আমার ঘরটা দেখিয়ে দেই। এতদূর থেকে এসেছ। একটু বিশ্রাম নাও। ততক্ষণে আমি ক্লাস শেষ করে আসছি।”
রুমা দ্বিমত করল না। তবে অনিন্দ্য বলল,
“ছুটি নিয়ে নে। তোর সাথে আমাদের কিছু দরকারি কথা আছে। কথাগুলো বলে আমরা আজই রওনা হবো।”
“ছুটি নিতে হবে না। ঘণ্টাখানেক পরেই আমার টিফিন পিরিয়ড। একঘণ্টার মধ্যেই আশা করি তোমাদের জরুরি কথা শেষ হবে।”
রুপুর ঘরটা রুমার বেশ পছন্দ হলো। রুপু বাবা-মায়ের সাথে ঠাম্মিকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে অফিসে চলে গেল। ঠাম্মি অনেকক্ষণ রুপুর বাবা-মায়ের সাথে খোশগল্প করল। একফাঁকে নতুন কুটুমদের জন্য কী কী রাঁধতে হবে মিনতিকে বলে এলো। রুপু যে একা এতদূর এসে ভালো আছে। বড় কোন বিপদ হয়নি। রুপুকে স্নেহ মমতায় আগলে রাখার একজন মানুষ আছে। এই ব্যাপারটা অনিন্দ্যের বেশ ভালো লাগল। অনিন্দ্য স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল।
রুপু ঘরে এসে বলল,
“মা একটু অপেক্ষা করো। আমি চট করে ভাত বসিয়ে দেই। তরকারি রান্না করা আছে। শুধু গরম করে নিলেই হবে।”
“তার কোন দরকার নেই। তোর ঠাম্মি আমাদের দুজনকে খেতে বলেছে।”
রুপু কোনরকম কৌতূহল দেখাল না। রুপু যেন জানতো। ঠাম্মি এরকম একটা কাণ্ড ঠিকই করবে।
রুপু ভাত বেড়ে নিয়ে খেতে বসল। খেতে খেতে বলল,
“বলো তোমাদের দরকারি কথা।”
এই রুপুকে অনিন্দ্য-রুমার বড্ড অচেনা লাগছে। মেয়েটা চোখের আড়াল হতেই কেমন পাল্টে গেল। অনিন্দ্য রুপুর মুখোমুখি বসল। বলল,
“সংসার জীবনে তুমি খুব ব্যর্থ রমণী। তুমি কী তা স্বীকার করো?”
রুপু বাবার চোখের দিকে একপলক তাকাল। বাবা রেগে গেলেই শুধু রুপুদের দুবোনের সাথে তুমি তুমি করে কথা বলে। অথচ আজ বাবার চোখে রাগ নেই। তবে জড়তার জন্য রুপুকে তুই তুই করে কথা বলতে পারছে না। কিংবা এই ধরনের কথা বোধহয় তুই তুই করে বলা যায় না। কথার মান হালকা হয়ে যায়।
“অস্বীকার করার তো কিছু নেই বাবা।”
“তুমি আমার মেয়ে হয়ে এত সহজেই হাল ছেড়ে দিলে?”
“হাল তো কখনো ধরিইনি। ছাড়ব কী!”
“বিনয়ের সংসারে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে কী সিদ্ধান্ত নিলে?”
“আমি কোন সিদ্ধান্ত নেব না বাবা।”
“কেন নেবে না? একা একা এতদূর এসেছ। সংসার ফেলে চাকরি করছ। নিজের মন মতো চলছ। সিদ্ধান্ত নিতে ক্ষতি কী?”
বাবার রাগ রাগ মুখের দিকে তাকিয়ে রুপু হেসে ফেলল। বলল,
“তুমি হুট করেই রেগে যাচ্ছ বাবা।”
রুমা বলল,
“এতকথা আমার ভালো লাগছে না রুপু। তুই ফিরে চল। মন দিয়ে সংসার কর। বিনয়ের মতো ভালো ছেলে তুই কোটিতে একটা পাবি না। আমি কী শাশুড়ীর জ্বালা খাইনি? তোর ঠাকুমা কতরকম ভাবে জ্বালিয়েছে আমাকে। খাওয়ার কষ্ট থেকে শুরু করে সবরকম কষ্ট দিয়েছে। তারপরও আমি তোর বাবার সংসার ছেড়ে যাবার কথা দুঃস্বপ্নেও ভাবিনি।”
রুপু কঠিন মুখে বলল,
“ভাববে কীভাবে মা? তোমার যাওয়ার কোন জায়গা ছিল না। তাই কোনদিন সাহস করে উঠতে পারোনি।”
“রুপু..”
“আমি সরি মা।”
“খুব রোজকার করা শিখেছ না তুমি? আজ রক্ত গরম। যা-খুশি করতে পারবি। একদিন তো এই রক্ত আর গরম থাকবে না। তখন একটা পরিবার যদি না থাকে। স্বামী সন্তান সংসার যদি না থাকে। তখন এত টাকা-পয়সা দিয়ে কী করবি তুই? পঁচে গলে মরলেও তো তোকে কেউ দেখার জন্য থাকবে না।”
এবারও রুপু হেসে ফেলল। মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“ঠাকুমারও তো ভরা সংসার ছিল মা। কিসের অভাব ছিল তার সংসারে। ছেলে-ছেলের বউ, দুটো নাতনি। সব থাকার পরেও তো মানুষটাকে বৃদ্ধ বয়সে একা একটা বদ্ধ ঘরে পঁচে গলেই মরতে হলো। মরার সময় একফোঁটা জল পর্যন্ত পেল না মানুষটা।
কার মৃত্যু কখন কীভাবে হবে। তুমি বা আমি কেউ তো জানি না মা।”
রুপুর মুখে কঠিন জবাব শুনে রুমা স্তব্ধ হয়ে গেল। অনিন্দ্য বলল,
“এখানে আমি বা তোর মা যুক্তিতর্ক করতে আসিনি। আমরা তোর বাবা-মা। তোর ভালো-খারাপ সবকিছু দেখার দায়িত্ব আমাদের। আমি বাবা হয়ে তোর কাছে হাতজোড় করছি। ফিরে চল মা। একটু ধৈর্য ধরে সংসারটা টিকিয়ে রাখ। একদিন দেখবি তোর থেকে সুখী আর কেউ হবে না।”
“তোমাদের কোন ভয় নেই বাবা। আমি কখনো বিনয়কে নিজে থেকে ডিভোর্স দেব না। তবে ও যদি দিতে চায় সেটা অন্য ব্যাপার।”
“দুজন দুইপ্রান্তে থেকে কীভাবে সংসার টিকাবি তুই?”
“সেই দায়িত্ব কী আমার একার বাবা?”
“মেয়ে হয়ে জন্মেছিস। আর দায়িত্ব এড়ানোর কথা ভাবছিস?”
“কেন এই ভুল কনসেপ্টটা যুগ যুগ ধরে শুধু মেয়েদের ক্ষেত্রেই প্রচলিত বাবা? তোমরা পুরুষরা কেন সারাজীবন গা বাঁচিয়ে চলতে পছন্দ করো? তোমাদের কী একটুও আফসোস হয় না? অনুশোচনা হয় না? আমার কথা বাদই দিলাম। এই সমাজে কী মেয়েরা চাকরি করছে না? চাকরি করে স্বামী সংসার বাচ্চা-কাচ্চা সামলাচ্ছে না? সামলাচ্ছে বাবা। খুব ভালোভাবেই সামলাচ্ছে। মেয়েরা যদি পারে। তোমরা ছেলেরা কেন পারো না বাবা? নিজেদের ব্যর্থতা তো কখনো স্বীকার করোই না। উল্টো মেয়েদের দিকেই কেন আঙুল তুলো? আমি চাকরি ছাড়ব না বাবা। আমি পড়াশোনা শেষ করব। চাকরি করব। দিনশেষে আমাকে সবাই ছেড়ে গেলেও এই চাকরিটা খড়কুটো হয়ে আমাকে আঁকড়ে ধরবে বাবা৷”
“তোকে তো চাকরি ছাড়তে বলছি না। আপাতত চাকরিটা ছাড়। এই-তো কয়েকটা বছর। দেখতে দেখতে কেটে যাবে মা। একটু সংসারে মনোযোগ দে। বাচ্চা-কাচ্চা হোক। তখন নাহয় চাকরি করিস।”
এত দুঃখের মাঝেও রুপু হেসে ফেলল। বলল,
“বয়স হয়ে গেলে তখন কে চাকরি দেবে আমাকে? সময় থাকতে শখ পূরণ করতে হয় বাবা। আর শখ পূরণ করার জন্য চাই টাকা। দিনশেষে টাকাই সব।”
রুমা বিষণ্ন কণ্ঠে বলল,
“তোর জ্ঞানের কথা শুনতে আমার আর ভালো লাগছে না রুপু। ছেলেটা তোকে ফিরে পাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে আছে। সেদিন আমার পাদু’টো জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদছিল খুব।”
“বিনয়ের মতো ছেলেরা শুধু কেঁদেই বিশ্বজয় করে ফেলতে চায় মা। ওরা কোন সম্পর্ককেই বেঁধে রাখতে পারে না। সম্পর্কের ব্যালেন্স করতে পারে না।”
“ছেলেটা প্রচণ্ড ভেঙে পড়েছে রুপু। তুই ওর কথা একবারও ভাববি না?”
“আমার কথা কে ভাবে! যাইহোক আমার সময় শেষ। তোমরা থাকো। আমি অফিসে গেলাম।”
“কোথাও যেতে হবে না তোর। ব্যাগ গোছা। বাড়ি চল। রুপু রুপু যাসনে… শোন আমার কথা।”
বীথি রানী বিনয়ের কাছে না জিজ্ঞেস করেই বিনয়ের সাথে পুতুলের বিয়ের পাকা কথা ঠিক করে ফেলেছে। আধুনিক যুগ। এই যুগে শুধু ছেলে মেয়ের বাড়িঘর দেখবে কেন? মেয়েরও অধিকার আছে। বিয়ের আগে ছেলের বাড়িঘর দেখা। ছেলের সাথে আলাদা ভাবে সময় কাটানো। বিনয়ের ছোটমাসির সাথে পুতুল আজ বিনয়ের বাড়িঘর দেখতে এসেছে। বীথি রানীর অবশ্য প্রথমে একটু আপত্তি ছিল। পুতুলের বাবা কম করে হলেও মেয়েকে ২০/২৫ ভরি গয়না দিয়ে সাজিয়ে দেবে। সাথে আরও যে কী কী দেবে, ধারণা করা যাচ্ছে না। বীথি রানী গয়নার কথা শুনেই খুশিতে বাক-বাকুম পায়রা হয়ে আছে। অসুস্থ শরীরেও পুতুলের জন্য দুই একটা পদ খুব যত্ন করে নিজের হাতে রান্না করেছে। পুতুল আজ এই বাড়িতে আসবে। বিনয়কে কিছু জানানো হয়নি। বিনয়টা কেমন ক্ষ্যাপা ক্ষ্যাপা হয়ে আছে। কিছু বললেই কেমন ছ্যাঁত করে উঠে। শেষে তীরে এসে তরী ডুবাতে চায় না বীথি রানী। পুতুল যখন বিনয়নের সামনে গিয়ে দাঁড়াবে। পুতুলের রূপের আগুনে বিনয়ের চোখ ঝলসে যাবে। তখন আর রুপুর কথা মাথায়ও থাকবে না।
পুতুলকে দেখে চোখ-মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল বীথি রানীর। ছিঃ ছিঃ এই মেয়ে কী পরে এসেছে। হাতা কাটা টাইট জামা। বুকে কোন ওড়না নেই। একটা ঢোলা ঢালা ছেঁড়া ফাটা জিন্সের প্যান্ট পরেছে। ফর্সা পেট কিছুটা বেরিয়ে আছে। দেখতে কী যে বিশ্রী লাগছে। ইতি বীথি রানীর গা টিপতেই বীথি রানীর মুখে কৃত্রিম হাসি ফুটে উঠল। বলল,
“ঘরে এসো মা।”
পুতুল ঘরে এসে প্রথম যে কথাটা বলল তা হলো,
“আপনার ছেলে কোথায় আন্টি?”
বীথি রানীর মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। একটা অল্পবয়সী মেয়ে আধল্যাংটা হয়ে বিনয়ের সামনে যাবে। ভাবাও তো দুঃস্বপ্ন। ইতি বলল,
“বিনয় ঘরেই আছে। ওই যে ডানদিকের ঘরটা। যাও তুমি।”
পুতুলের পিছুপিছু বীথি রানীও যেতে নিল। ইতি পেছন থেকে খপ করে বোনের হাত ধরে ফেলল। চাপা কণ্ঠে বলল,
“তুই কোথায় যাচ্ছিস?”
বীথি রানী বিড়বিড় করে বলল,
“দেখে আসি ওরা কী কথা বলে।”
“তোর কী মাথা খারাপ। ওরা এই-যুগের ছেলে-মেয়ে। কত গোপন কথা থাকে।”
“বিনয় তো মেয়েটাকে চেনেই না। কী আবার গোপন কথা বলবে।”
“ও তুই বুঝবি না দিদি। পুতুল যদি ভুল করেও কোনভাবে দেখে ফেলে, তুই দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে ওদের কথা শুনছিস। জীবনেও তোর ছেলেকে বিয়ে করবে না।”
বীথি রানী আপনমনে বিড়বিড় করে বলল,
“এরথেকে রুপুই তো ভালো ছিল।”
“কী বিড়বিড় করছিস চলতো আমার সাথে। দেখি কী কী রান্না করেছিস।”
বীথি রানী আঁতকে উঠে বলল,
“ওদের একা রেখে রান্নাঘরে যাব মানে? তোর কী মাথা ঠিক আছে?”
“শোন দিদি, এই যুগের ছেলে-মেয়েরা সবকিছু সহ্য করতে পারে। শুধু প্রাইভেসি নষ্ট করা সহ্য করতে পারে না। প্রচণ্ড বিরক্ত হয় ওরা।”
বীথি রানী বিড়বিড় করে বলল,
“বিয়ের আগে আবার কিসের প্রাইভেসি।”
বিনয় আধশোয়া হয়ে রুপুকে ক্রমাগত মেসেজ করছিল। রুপু কোন মেসেজের রিপ্লে দিচ্ছে না৷ শুধু মেসেজ সিন করে রেখে দিচ্ছে। রুপু যে মেসেজ দেখছে। বিনয় এতেই খুশি। তখনই পুতুল এসে বিনয়ের সামনে দাঁড়াল। হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“হাই বিনয়..”
বিনয় ভড়কে গেল। ফোনটা হাত ফস্কে পড়ে গেল।
মেয়েটার দিকে একনজর তাকিয়ে মাথানিচু করে ফেলল। বলল,
“আপনি কে?”
পুতুল বিনয়ের পাশে বসতে বসতে বলল,
“আমি পুতুল।”
বিনয় খানিকদূরে সরে বসল। মাথানিচু করে বলল,
“মা দেখেনি আপনি এইঘরে এসেছেন?”
“তোমার মা মানে আন্টিই তো আমাকে এই-ঘরে পাঠাল।”
বিনয় প্রচণ্ড অবাক হলো। অপরিচিত একটা মেয়েকে মা শুধু শুধু এইঘরে পাঠিয়েছে কেন? বিনয় বুঝতে পারছে না। পুতুল বলল,
“তোমার ঘরে বসে কী সিগারেট খাওয়া যাবে? আমার প্রচণ্ড সিগারেটের তৃষ্ণা পেয়েছে। এখন একটা না খেলে চলবেই না।”
মেয়েরা আজকাল সিগারেট খায়। বিনয় জানে। কিন্তু ওর ঘরে বসে রূপবতী একটা মেয়ে সিগারেট টানবে। ব্যাপারটা যেন কেমন লাগছে। তাছাড়া মা দেখলে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে। বিনয়ের উত্তরের অপেক্ষায় অবশ্য পুতুল বসে নেই। সে প্যান্টের পকেট থেকে সিগারেট বের করে দামি লাইটার দিয়ে ধরিয়ে ফেলল। তারপর মনের সুখে কতক্ষণ সিগারেট টানল। বিনয়ের প্রচণ্ড অস্বস্তি লাগছে। সিগারেটের কটু গন্ধে সারাঘর ম ম করছে। মাকে তো আশেপাশে কোথাও দেখাও যাচ্ছে না। লজ্জিত ভঙ্গিতে বিনয় বলল,
“আপনাকে আমি ঠিক চিনতে পারছি না।”
এরকম রসিকতা পুতুল বোধহয় বহুদিন শুনেনি। অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। হাসতে হাসতে পুতুলের ফর্সা গাল লাল টুকটুকে হয়ে গেল। চোখে জল এসে গেল। বলল,
“ঠাকুর ঘরে কে রে? আমি কলা খাইনি। ব্যাপারটা এইরকম হয়ে গেল না? আজ বাদে কাল তোমার সাথে আমার বিয়ে। আর তুমি বলছ, আমি কে?”
বিনয় যেন আকাশ থেকে পড়ল। মুখটা আতঙ্কে রক্তশূণ্য হয়ে গেল। মা..মা এইরকম একটা কাণ্ড করতে পারল?
পুতুল বলল,
“তুমি আমার দিকে তাকাচ্ছ না কেন?”
বিনয় সরাসরি পুতুলের চোখের দিকে তাকাল। পরক্ষণেই
চোখ নামিয়ে নিল। পুতুল বলল,
“এই বিয়েতে কী তোমার মত নেই?”
“না।”
পুতুল বলল,
“আমারও অবশ্য তেমন মত নেই। বাবা বিয়ে করতে বলছে। তাই বিয়ে করছি। বিদেশিরাই সুখে আছে জানো? ওদের মন চাইলে বিয়ে করে। মন চাইলে ডিভোর্স দেয়। আবার মন চাইলে লিভ টুগেদার করে। মজাই মজা।”
এই ধরনের কথাবার্তা শুনতে বিনয়ের মোটেও ভালো লাগছে না। আবার মেয়েটাকে চলে যান বলতেও পারছে না। কী এক ঝামেলায় পড়া গেল। পুতুল বলল,
রুপুর বিয়ে পর্ব ৩৬
“তোমাকে আমার বেশ পছন্দ হয়েছে বিনয়। পছন্দ হওয়ার কারণটা পুরোপুরি ধরতে পারছি না। তবে আমার মনে হচ্ছে, তোমাকে একটু গড়ে-টরে নিলে তুমি পারফেক্ট একজন হাজবেন্ড হবে। বেশি চালাকচতুর পুরুষ মানুষ আমার আবার ভালো লাগে না। তুমি তো আমার ব্যাপারে কিছুই জিজ্ঞেস করছ না। অবশ্য এখন জিজ্ঞেস করেও লাভ হবে না। আমি আমার ব্যাপারে কোনকিছুই তোমাকে বলব না।”
কথাগুলো বলে পুতুল রহস্য করে হাসল।
