Home রুহআবিষ্ট তুমি রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ১৯

রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ১৯

রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ১৯
অধরা মিনহা

وَصَلَّى اللَّهُ عَلَى سَيِّدِنَا مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِهِ وَصَحْبِهِ وَسَلَّم
অর্থ: আল্লাহ আমাদের নেতা হযরত মুহাম্মদ (সা.), তার পরিবারবর্গ ও সাহাবিদের ওপর রহমত ও শান্তি বর্ষণ করুন।
তাফসিরের শেষের আরবি ইবারতটুকু পড়া শেষ করতেই আনতারার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠে প্রশান্তির এক চিলতে হাসি। যত্নে তাফসিরের কিতাবটা বন্ধ করে। দীর্ঘ এই পথচলার শেষে আনতারার হৃদয়টা গভীর কৃতজ্ঞতায় ভরে উঠে। দুই হাত তুলে মোনাজাত ধরে,

— আল্লাহ, আপনার কাছে হাজার হাজার শুকরিয়া, আমাকে এই পর্যন্ত নিয়ে আসার জন্য। আমাকে এই জ্ঞান অর্জনের সামর্থ্য দেওয়ার জন্য, এই কিতাব শেষ করার তাওফিক দেওয়ার জন্য। আল্লাহ, আমাকে আপনার রহমত ও নিয়ামত দান করুন। আমার ইলমে বরকত দিন। আমাকে ইসলামের সর্বোচ্চ জ্ঞান অর্জনের তাওফিক দিন। আমি যেন একজন যোগ্য আলেমা হয়ে দ্বীনের খেদমত করতে পারি। আমার এই পথচলা কবুল করুন, হে আমার রব।
মোনাজাত শেষে আনতারার চোখের কোণে আনন্দাশ্রু চিকচিক করে উঠে। আজ তার কাছে এটা শুধু একটা কিতাবের সমাপ্তি না বরং আরো গভীর জ্ঞান অর্জনের পথে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা। আনতারা তাফসিরের কিতাবটা হাতে নিয়ে উঠে। বুক স্ট্যান্ডে কিতাবটা যত্ন করে রেখে ফিরে আসতে যাবে, ঠিক তখনি আনতারার খিমারে টান লাগল। পাশে রাখা একটা শো-পিসে খিমারটা আটকে গিয়েছিল। মুহূর্তেই শো-পিসটি পড়ে গিয়ে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। কাচের টুকরোগুলো ছড়িয়ে পড়ে রুমের বেশ খানিকটা জায়গাজুড়ে।
শো-পিসটা ভেঙে যেতে দেখে আনতারার মনটা খারাপ হয়ে গেল। চারপাশে তাকিয়ে দেখে, পুরো রুমেই কাচের টুকরো ছড়িয়ে আছে। এগুলো পরিষ্কার করা জরুরি, নইলে অসাবধানতাবশত পায়ে কাচ বিঁধে যেতে পারে। কিন্তু রুমে কোনো ঝাড়ু নেই, যেটা দিয়ে কাচগুলো পরিষ্কার করা যায়। তাই অত্যন্ত সাবধানে আনতারা রুম থেকে বেরিয়ে নিচে ডাইনিং রুমের এরিয়ায় চলে এলো। সেখানে শাহানারাকে দেখতে পেল। শাহনারা তখন ডাইনিং টেবিল গুছাতে ব্যস্ত।
আনতারা কাছে গিয়ে নরম স্বরে বলে,

— ঘর ঝাড়ুটা কোথায়, আপু?
শাহানারা কাজ করতে করতেই বলে,
— ঘর ঝাড়ু তো ওইদিকে। কিন্তু কেন, ম্যাম?
আনতারা বলে,
— রুমের পুরোটা কাচের টুকরো ছড়িয়ে আছে। সেগুলো পরিষ্কার করব।
ঠিক তখনি পেছন থেকে একটা কণ্ঠ ভেসে এলো,
— কী ভেঙেছো তুমি?
কণ্ঠটা শার্লিন ইমরোজের। আনতারা ফিরে তাকাতেই দেখে, শার্লিন ইমরোজ সেখানে দাঁড়িয়ে আছেন।চোখেমুখে তখনো ঘুমের ছাপ। পরনে নাইটি অর্থাৎ রাতের পোশাক।
আনতারা কিছুটা নিচু স্বরে, চোখ নামিয়ে বলে,
— আমাদের রুমে যে একটা ঈগল পাখির মতো শো-পিস আছে না? ওটা আমার খিমারের টান লেগে পড়ে গেছে।
কথাটা শুনতেই শার্লিন ইমরোজের চোখের ঘুম মুহূর্তেই কেটে গেল। তিনি দ্রুত এগিয়ে আসতে আসতে বলেন,

— কী বললে? তুমি চৌদ্দ লাখ টাকার ল্যালিক গোল্ডেন ঈগল স্কাল্পচারটা ভেঙে ফেলেছো?
জিনিসটার দাম শুনে আনতারা ভীষণ ভয় পেয়ে যায়। এত দামী একটা জিনিস তার কারণে ভেঙে গেছে। এই ভাবনাতেই অপরাধবোধে বুকটা ভার হয়ে এলো। কাচুমাচু হয়ে বলে,
— ইচ্ছাকৃতভাবে ভাঙিনি। ভুলে ভেঙে গেছে।
শার্লিন ইমরোজ তাচ্ছিল্যের সুরে বলেন,
— ভুলে ভেঙে গেছে মানে? তোর চোদ্দগুষ্টি এত টাকা দেখেছিস কখনো?
কথাগুলো শুনে আনতারার আরো বেশি খারাপ লাগে। জিনিসটা ভেঙে যাওয়ার জন্য তার ভেতরে এমনিতেই অপরাধবোধ ছিল। তার ওপর সেখানে বাড়ির মেইডরা উপস্থিত, আর তাদের সামনেই শার্লিন ইমরোজ তার পরিবারকে টেনে এভাবে অপমান করছে। তবুও আনতারা মাথা নত রেখেই শান্ত থাকার চেষ্টা করে বলে,

— আমি বলেছি তো, আমি ইচ্ছে করে করিনি। আমার ভুল হয়ে গেছে।
শার্লিন ইমরোজ এবার আরো তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলেন,
— ভুল তো হবেই। জীবনে দেখেছিস এত দামী জিনিস! নিচুজাতের বাচ্চা!
অপমানের কথাগুলো এবার আনতারার সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যায়। এতক্ষণ নীরব থাকলেও এবার আনতারা কিছুটা দৃঢ় গলায় বলে,
— জিনিসটা আমার স্বামীর। আমি কোনো কাজের মেয়ে নই যে আপনি আমাকে জিনিসের দাম বোঝাচ্ছেন। এটা ভাঙার অপরাধে আমার স্বামী আমাকে কিছু বলতে পারেন, যদি তিনি মনে করেন। কিন্তু আপনি কেন আমাকে এভাবে গালাগালি করছেন? তাও আমার পরিবারকে নিয়ে? আপনি আমাকে এভাবে গালাগালি করতে পারেন না।
আনতারার কথা শুনে শার্লিন ইমরোজ আরো ফুঁসে উঠেন। রাগে আনতারার হাত শক্ত করে ধরে বলেন,

— এই ছোটলোকের বাচ্চা, তোর সাহস কত বড়! তুই আমার সঙ্গে এভাবে কথা বলিস? কী ভেবেছিস, আমার ছেলে দুটো তোর হয়ে কথা বলেছে দেখে সংসারে রাজত্ব করবি? তোর কোনো যোগ্যতা আছে আমার ছেলের বউ হওয়ার?
শার্লিন ইমরোজের শক্ত মুঠো থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে করতে আনতারা এবার দৃঢ়ভাবে শার্লিন ইমরোজের চোখে চোখ রাখে। তারপর স্পষ্ট কণ্ঠে বলে,
— আমারই সবচেয়ে বেশি যোগ্যতা আছে। এখন আমার মধ্যে যতই ত্রুটি থাকুক না কেন, আমি হীনা আপনার ছেলে অপূর্ণ। কারণ আমি আপনার ছেলের স্ত্রী। এখন যাকে ছাড়া আপনার ছেলে অপূর্ণ, নিশ্চয়ই সেই মেয়েটা আপনার ছেলের জন্য অযোগ্য না!
কথাটা শুনে শার্লিন ইমরোজের রাগ আরো বেড়ে যায়।
— দাঁড়া, তোকে তোর যোগ্যতা দেখাচ্ছি।

বলেই শার্লিন ইমরোজ আনতারার হাত শক্ত করে ধরে টানতে শুরু করেন। আনতারা বারবার নিজের হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করছে। কখনো থেমে যাচ্ছিল, কখনো পেছনে সরে দাঁড়াচ্ছিল। কিন্তু শার্লিন ইমরোজ কিছুতেই থামেন না। তিনি বারবার টেনে আনতারাকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যেতে লাগলেন। এভাবে টানতে টানতে একসময় তিনি আনতারাকে বাড়ির বাইরে নিয়ে এলেন। আনতারার বুকের ভেতর তখন ভয় জমে গেছে। কী হতে যাচ্ছে, কিছুই বুঝতে পারছে না। বিস্মিত ও আতঙ্কিত কণ্ঠে বলে উঠে,
— কী করছেন আপনি? কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আমাকে? ছাড়ুন আমাকে!
শার্লিন ইমরোজ আনতারাকে টানতে টানতে বাড়ির গেটের সামনে নিয়ে এসে দারোয়ানকে বলে উঠে,

— গেট খুলো।
কথাটা কানে যেতেই আনতারার বুকটা ছ্যাৎ করে উঠে। শার্লিন ইমরোজ কী করতে যাচ্ছেন, তার একটা ভয়ংকর আভাস পেয়ে যায়। নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য আনতারা সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করতে লাগল। ভাঙা গলায় কাঁদতে কাঁদতে বলে,
— ছাড়ুন আমাকে। আমি রাদের স্ত্রী।
কিন্তু শার্লিন ইমরোজ আনতারার কোনো কথাই শুনেন না। বরং আনতারাকে ধাক্কা মেরে গেটের বাইরে বের করে দেম। তারপর তীব্র অপমানের সুরে বলেন,
— এই নে, দেখ তোর যোগ্যতা, ছোটলোকের বাচ্চা! দুইদিনে এসে ভেবেছে আমার সংসারে রাজত্ব করবে! কর রাজত্ব রাস্তায় বসে। ফকিন্নির জাত, ফকিন্নি!
কথাগুলো বলেই শার্লিন ইমরোজ গেট বন্ধ করে দিলেন।আনতারা মাটিতে পড়ে গিয়েছিল। কাঁপতে কাঁপতে উঠে দাঁড়িয়ে ছুটে গিয়ে গেটের ওপর জোরে জোরে থাপ্পড় দিতে লাগল। চোখ দিয়ে অবিরাম পানি ঝরছে। কাঁদতে কাঁদতে আকুতি জানায়,

— গেট খুলুন। আমাকে ভেতরে আসতে দিন। আপনি কেন আমার সঙ্গে এমন করছেন?
কিন্তু আনতারার কান্না, আহাজারি কিংবা অনুনয় কোনোটাই শার্লিন ইমরোজের হৃদয় গলাতে পারল না। তিনি দারোয়ানকে স্পষ্টভাবে বলে গেলেন, যেন কোনোভাবেই গেট না খোলা হয়। এরপর তিনি ভেতরে চলে গেলেন। আনতারা অনেকক্ষণ ধরে গেটে ধাক্কা দিতে থাকে। কিন্তু গেট আর খুলে না। একসময় সমস্ত শক্তি নিঃশেষ হয়ে গেল আনতারার। কাঁদতে কাঁদতে গেটের সামনে মাটিতে বসে পড়ে। এই মুহূর্তে নিজেকে ভীষণ অসহায় মনে হচ্ছে তার। কোথায় যাবে, কী করবে, কিছুই বুঝতে পারছে না।

তার ওপর সে এখন রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে, বেপর্দা অবস্থায়। বিষয়টা মাথায় আসতেই আনতারা তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়ায়। আশপাশে তাকিয়ে কিছুটা দূরে থাকা ঝোপঝাড়ের আড়ালে গিয়ে নিজেকে লুকিয়ে ফেলে, যাতে অন্তত নিজের পর্দা রক্ষা করতে পারে। তারপর সেই ঝোপের আড়ালে বসেই নিঃশব্দে কাঁদতে থাকে। সময় গড়িয়ে যেতে থাকে।
সকাল পেরিয়ে দুপুর হলো। দুপুর পেরিয়ে বিকেলও শেষের পথে। সন্ধ্যা নামতে আর খুব বেশি সময় বাকি নেই। অথচ আনতারা তখনো সেই ঝোপের আড়ালেই বসে আছে। কান্না কোনোভাবেই থামছে না। বুকের ভেতর ভয় আর অসহায়ত্ব ক্রমেই বাড়ছে। হঠাৎ দূর থেকে গাড়ির হর্নের শব্দ ভেসে এল। আনতারা কান্না থামিয়ে ঝোপের আড়াল থেকে উঁকি দেয়। চোখে পড়ে ইফরাদের গাড়ি। গেট খোলার অপেক্ষায় গাড়িটা বাইরে দাঁড়িয়ে আছে।
আনতারার বুকের ভেতরটায় হঠাৎ আশা ফুটে। সে জোরে ডেকে উঠে,

— রাদ?
ইফরাদকে ডাক দিয়েই আনতারা দ্রুত ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল। ঠিক তখনি গেট খুলে দেওয়া হলো। ইফরাদের গাড়ি ভেতরে ঢোকার জন্য এগোতে শুরু করে।আনতারা দৌড়ে গিয়ে গাড়ির জানালায় ধাক্কা দিয়ে বলে,
— রাদ? শুনছেন? আমি আনতারা।
ইফরাদ তখন গাড়ির ব্যাক সিটে বসে ফোন স্ক্রল করছিল। হঠাৎ কানে হালকা করে ভেসে এল ‘রাদ’ ডাকটা। মুহূর্তের জন্য তার মনে হলো, যেন কেউ তাকে ডাকছে। ভাবনাটা মাথায় আসার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই গাড়ির জানালায় ধাক্কার শব্দ হলো। ইফরাদ তাকিয়ে দেখে জানালার ওপাশে আনতারা। তাকে দেখেই ইফরাদ দ্রুত ড্রাইভারকে বলে,

— গাড়ি থামাও।
ড্রাইভার সঙ্গে সঙ্গেই গাড়ি থামায়। ইফরাদ এক সেকেন্ডও দেরি করে না। দ্রুত দরজা খুলে গাড়ি থেকে বেরিয়ে এল।বাড়ির বাইরে আনতারাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ইফরাদের বুকটা ধক করে উঠে। কেঁদে কেঁদে মেয়েটার চেহারা নাজেহাল হয়ে গেছে। চোখ মুখ ফুলে আছে, মুখে অসহায়ত্বের ছাপ স্পষ্ট। ইফরাদ তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে আনতারার গাল দুটো আলতো করে নিজের দুই হাতের মধ্যে ধরে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলে,
— কী হয়েছে, আনতারা? তুমি এখানে কেন?
প্রশ্নটা শুনতেই আনতারা আর নিজেকে সামলে রাখতে পারে না। ঝাপটে ইফরাদকে জড়িয়ে ধরে ইফরাদের বুকে মুখ গুঁজে কেঁদে উঠে। কাঁদতে কাঁদতে বলে,
— আপনার মা আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে, রাদ।
কথাটা শুনে ইফরাদ মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। সে দ্রুত আনতারার মুখটা নিজের বুক থেকে তুলে দুই হাতে ধরে আনতারার দিকে তাকিয়ে বলে,

— কী বললে?
আনতারার ঠোঁট কেঁপে উঠে। আবারো কান্নায় ভেঙে পড়ে বলে,
— আপনার আম্মু আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। আমি থাকতে চেয়েছি, কিন্তু উনি আমাকে টেনে বের করে দিয়েছেন।
কথাটা কানে যেতেই ইফরাদের কপালের রগগুলো ফুলে উঠে। রাগে তার রক্ত গরম হয়ে গেল। সে চোখ বন্ধ করে জোরে একটা শ্বাস নেয়। নিজেকে সামলে নিয়ে আবার চোখ মেলে। তখনি তার চোখে পড়ে আনতারার পোশাকের অবস্থা। বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে আছে আনতারা, অথচ তার পরনে কেবল থ্রি-পিস আর খিমার। অর্থাৎ আনতারা বেপর্দা অবস্থায় বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। আর বাড়ির ভেতরে রয়েছে গার্ড ও দারোয়ানরা।
বিষয়টা ইফরাদের ইজ্জতে আঘাত করে। তার স্ত্রী এভাবে বেপর্দা হয়ে পরপুরুষের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। এটা ইফরাদ কোনোভাবেই মেনে নিতে পারে না। এক মুহূর্তও দেরি না করে ইফরাদ নিজের গা থেকে স্যুটটা খুলে আনতারার গায়ে পরিয়ে দেয়। আনতারা স্যুটটা গায়ে জড়িয়ে নিয়ে আরো মিইয়ে যায়। ইফরাদ নিজের গলার টাইটা একটু লুজ করে নেয়। তারপর আনতারার হাত শক্ত করে ধরে বলে,

— চল, ভেতরে।
আনতারা এবার ইফরাদের হাতটা শক্ত করে ধরে ইফরাদের সঙ্গে হাঁটতে শুরু করে। বাড়ির গেটের সামনে পৌঁছেই ইফরাদ সেখানে থাকা সব গার্ড ও দারোয়ানদের উদ্দেশে কঠোর কণ্ঠে বলে,
— Turn around. Heads down. No one is to look this way. Is that clear?
সবাই একসঙ্গে বলে উঠে,
— Yes, sir.
সঙ্গে সঙ্গেই ইফরাদের আদেশ অনুযায়ী সবাই ঘুরে দাঁড়ায় এবং মাথা নিচু করে ফেলে। ইফরাদ এবার আনতারাকে সঙ্গে নিয়ে গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকে। তারপর আনতারার হাত ধরে বাড়ির দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। মেইন ডোর পেরিয়ে দুজন যখন ভেতরে ঢুকে, তখন লিভিং রুমের সোফায় বসে থাকা শার্লিন ইমরোজ তাদের দেখেই দাঁড়িয়ে গেলেন। ইফরাদও আনতারার হাত ধরে ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এল। শার্লিন ইমরোজের সামনে এসে ইফরাদ থামে। আনতারা শার্লিন ইমরোজকে দেখামাত্র মাথা নত করে ফেলে। অন্য হাত দিয়ে ইফরাদের বাহু আঁকড়ে ধরে এবং ভয়ে আরো মিইয়ে যায়। ভয় পাবেই না বা কেন? সকালে যা করলো!
শার্লিন ইমরোজের চোখেমুখে তীব্র রাগ। তিনি আনতারার দিকে তাকিয়ে ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলে উঠেন,

— এই মেয়ে আবার আমার বাড়িতে ঢুকল কোন সাহসে? একে তো আমি বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিলাম!
ইফরাদ শার্লিন ইমরোজের দিকে তাকিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বলে,
— আমি নিয়ে এসেছি ওকে!
শার্লিন ইমরোজ সঙ্গে সঙ্গেই ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন,
— কেন নিয়ে এসেছো তুমি? বের করো একে! একে আমার সহ্য হচ্ছে না। ও আমার সঙ্গে বেয়াদবি করেছে।
কথাটা শুনে ইফরাদ আনতারার দিকে তাকায়। আনতারা ভীত চোখে ইফরাদের দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে না বোঝায়। অর্থাৎ সে বেয়াদবি করেনি। ইফরাদ এবার শার্লিন ইমরোজের দিকে তাকায়। ঠিক তখনি শার্লিন ইমরোজ বিরক্ত হয়ে বলে উঠেন,
— আশ্চর্য! তুমি ওকে এখনো বের করছো না কেন?
একটু থেমে শার্লিন ইমরোজ এবার আরো কঠিন কণ্ঠে বলেন,
— রাদ, তোমাকে মাম্মার কসম! তুমি এই মেয়েকে ডিভোর্স দেবে! যদি মাম্মাকে ভালোবাসো, তাহলে ওকে ডিভোর্স দেবে!
শার্লিন ইমরোজের এমন কথা শুনে ইফরাদের চোখদুটো রাগে বড় হয়ে গেল। সে অবাক ও ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলে,

— কী বলছো তুমি!
শার্লিন ইমরোজ আগের মতোই বলেন,
— আমি যা বলছি, ঠিকই বলছি। তুমি যদি সত্যিই মাম্মাকে ভালোবাসো, তাহলে এই মেয়েকে ডিভোর্স দেবে। তোমার জীবন থেকে ওকে বের করে দেবে। আর যদি তুমি তা না করো, তাহলে মাম্মা নিজের জীবন দিয়ে দেবো।
কথাটা শুনতেই ইফরাদের চোখজোড়া রাগে লাল হয়ে উঠে। চোখেমুখে কঠোরতা ফুটে উঠে। লাল চোখে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে,

— তুমি ভালোবাসার প্রমাণ চাও? আনতারাকে ডিভোর্স দিলে তুমি বুঝবে আমি তোমাকে ভালোবাসি?
কথাটা শুনে আনতারা হঠাৎ পাথর হয়ে গেল। চমকে উঠে মাথা তুলে। ইফরাদ কী বলছে? মুহূর্তেই তার বুকটা ধক করে উঠে। ভয় যেন শরীরের প্রতিটি শিরায় ছড়িয়ে পড়ে।অন্যদিকে ইফরাদের কথায় শার্লিন ইমরোজের মনে নতুন করে আশার আলো জ্বলে উঠে। ওনার মনে হলো, ছেলে অবশেষে ওনার কথায় আসছে। তিনি খুশিতে মাথা নেড়ে বলেন,

রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ১৮

— হ্যাঁ! তুমি এই মেয়েকে ডিভোর্স দিলে মাম্মা বুঝব, তুমি মাম্মাকে ভালোবাসো। মাম্মা তোমার কাছে প্রমাণ চাইছি। তুমি মাম্মাকে প্রমাণ দিয়ে দাও, বেটা?
আনতারার ভয়ে পুরো শরীর অবশ হয়ে আসতে লাগল। বুকের ভেতরটা কাঁপছে। সে অসহায় চোখে ইফরাদের দিকে তাকিয়ে রইল। ইফরাদ জোরে একটা শ্বাস নেয়। তারপর শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলে,
— ওকে, ফাইন! তোমাকে প্রমাণ দিচ্ছি আমার ভালোবাসার!

রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ১৯ (২)