Home রুহআবিষ্ট তুমি রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ৬

রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ৬

রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ৬
অধরা মিনহা

আনতারা চেয়ারে বসে টানা আধা ঘণ্টা ধরে বেডে ঘুমিয়ে থাকা ইফরাদের দিকে তাকিয়ে আছে। এখন দুপুর তিনটা বাজে, তবুও ইফরাদের ঘুম ভাঙার কোনো লক্ষণ নেই। এতক্ষণ ধরে কেউ কিভাবে ঘুমাতে পারে, তা ভেবে আনতারা কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছে না। তার চোখেমুখে স্পষ্ট হতাশা ফুটে উঠেছে। ইফরাদ যেন জীবনের প্রতি ভীষণ উদাসীন। তার কোনো কাজেরই নির্দিষ্ট সময় নেই। দেরিতে ঘুম থেকে উঠলে দুশ্চিন্তা আর হতাশা বাড়ে, অথচ ভোরে উঠলে দিনটা কত সুন্দর, কত বরকতময় লাগে, এই সাধারণ সত্যটুকুও যেন সে উপলব্ধি করে না।
হঠাৎ ইফরাদের ফোনে কল আসার রিংটোনে আনতারার ভাবনার ঘোর কাটে। ঘুমের মধ্যেই ইফরাদ কলের শব্দ পায়। চোখ বন্ধ রেখেই বালিশের কাছ থেকে ফোনটা তুলে নেয়। কে কল করেছে না দেখেই রিসিভ করে কানে ধরে ঘোলাটে কণ্ঠে বলে,

— হ্যালো।
ওপাশ থেকে ভেসে আসে একটa পুরুষালি কণ্ঠ,
— এখনো ঘুমিয়ে আছিস?
ইফরাদ আগের মতোই বলে,
— হুমমম।
ওপাশ থেকে আবার বলে,
— উঠ তাড়াতাড়ি। আমরা আজকে তোর বাসায় আসছি। ভাবিকে বল আমাদের জন্য রান্না করতে।
ঘুমের মধ্যেই ইফরাদ চোখমুখ কুঁচকে বলে ওঠে,
— কিহ!
ওপাশ থেকে জোরে গলা চড়িয়ে বলে,
— বলেছি আজকে তোর বাসায় আসছি আমরা। ভাবির সাথে দেখা করতে।
ইফরাদ ধপ করে উঠে বসে, ফোনটা কানে রেখেই আধো ঘুমে চোখ খোলার চেষ্টা করে বলে,
— আমরা কারা?
ওপাশ থেকে উত্তর আসে,
— আমি, নোহা, মাহি, আয়ুষ, রোশান। আমরা পাঁচজন সন্ধ্যায় আসছি, ভাবির সাথে পরিচয় হতে।
কিছু একটা ভেবে ইফরাদ বলে,

— আচ্ছা।
এরপর ফোনটা কানে থেকে নামিয়ে বেডে রেখে দেয়। পাশে তাকাতেই তার চোখ পড়ে আনতারার দিকে।আনতারা চেয়ারে বসে আছে। ইফরাদের দৃষ্টি পড়তেই আনতারা অপ্রস্তুত হয়ে অন্যদিকে তাকায়। আনতারাকে দেখামাত্র ইফরাদের মুখে বিরক্তির ছাপ ফুটে ওঠে। সে আবার ধপাস করে শুয়ে পড়ে এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার ঘুমিয়ে যায়। আনতারা অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে থাকলেও বুঝতে পারে ইফরাদ আবার শুয়ে পড়েছে। তাই সে আবার ইফরাদের দিকে তাকায়। দেখে, ইফরাদ ইতোমধ্যেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেছে।
আনতারা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তার দিকে তাকিয়ে আস্তে করে বলে,
— আল্লাহ, আপনি সর্বশক্তিমান, সবকিছুর মালিক। সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন।
ঠিক তখনি দরজায় নক হয়। আনতারা উঠে গিয়ে দরজা খুলে দেখে শাহনারা দাঁড়িয়ে আছে।
শাহনারা বলে,

— মেডাম, আপনাকে শার্লিন মেডাম ডাকছেন।
আনতারা কিছুটা অবাক হয়। সিউর হতে জিজ্ঞেস করে, — আমাকে?
শাহনারা জবাব দেয়,
— জি।
আনতারা বলে,
— আচ্ছা। আপনি একটা কাজ করতে পারবেন?
শাহনারা জিজ্ঞেস করে,
— কী কাজ?
আনতারা একটু সংকোচ নিয়ে বলে,
— বাড়িতে তো অনেক পুরুষ কাজ করে। আর আমি পুরুষ মানুষের সামনে যাই না। সেজন্য আপনি যদি ওদের…
শাহনারা কথা শেষ করতে না দিয়েই বলে,

— আচ্ছা, আমি ওদের বলে আসছি যেন এদিকটায় না আসে।
আনতারা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলে,
— জি, এতে আমার অনেক উপকার হবে।
শাহনারা চলে গেলে আনতারা আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। সে মাথার ওড়নাটা ঠিক করে হিজাবের মতো করে পরে নেয়, তারপর মুখটাও ঢেকে ফেলে। ওড়নাটা এমনভাবে গায়ে জড়িয়ে নেয় যেন তার হাত বা শরীরের কোনো অংশই দেখা না যায়। সবকিছু ঠিকঠাক করে নিয়ে সে আবার দরজার কাছে এসে দাঁড়ায়।
কিছুক্ষণ পর শাহনারা ফিরে এসে আনতারাকে দেখে অবাক হয়ে বলে,
— এভাবে কেন মুখ ঢেকে আছেন? আমি তো সবাইকে বলে দিয়েছি, আপনি যেদিকে যাবেন সেদিকে যেন কেউ না আসে।
আনতারা শান্তভাবে বলে,
— তারা না আসুক, কিন্তু আমারও তো একটা পর্দা আছে। যদি কোনো পুরুষ না-ও থাকে, তবুও আমাকে পর্দা করতে হবে। ইসলামে এমনটাই বলা আছে। আমি তো খোলামেলা ভাবে চলতে পারি না।
শাহনারা কিছুটা বুঝতে পেরে বলে,

— ওহ।
আনতারা বলে,
— জি, এখন চলুন।
শাহনারা হাঁটা শুরু করে, আর তার পেছন পেছন আনতারাও হাঁটে। ইখতিয়ার চৌধুরী ও শার্লিন ইমরোজের রুম দ্বিতীয় তলায়, ইফরাদের রুম থেকে তিনটা রুম পরেই। কিছুক্ষণ পর তারা দুজন শার্লিন ইমরোজের রুমের সামনে এসে থামে।
শাহনারা আনতারার দিকে তাকিয়ে বলে,
— এটাই শার্লিন মেডামের রুম। ভেতরে যান।
আনতারা মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে দরজায় নক করে। ভেতর থেকে শার্লিন ইমরোজের কণ্ঠ ভেসে আসে,

— ভেতরে আসো।
আনতারা দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকে। ভেতরে গিয়ে দেখে, শার্লিন ইমরোজ বেডের উপর শুয়ে ফোন স্ক্রল করছেন আর অন্য হাতে কফি খাচ্ছেন। তার পরনে কালো নাইট ড্রেস—শার্ট ও প্যান্ট। দেখেই বোঝা যায়, তিনি এইমাত্র ঘুম থেকে উঠেছেন।
আনতারা ঢুকেই মুখ থেকে কাপড়টা সরিয়ে মুখ উন্মুক্ত করে সালাম দেয়,
— আসসালামু আলাইকুম।
শার্লিন ইমরোজ ফোন থেকে চোখ সরিয়ে আনতারার দিকে তাকান। তারপর কফির মগটা পাশে টেবিলে রেখে উঠে বসতে বসতে বলেন,
— ওয়ালাইকুম সালাম।
তারপর তিনি আনতারাকে ভালোভাবে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে থাকেন। পর্যবেক্ষণ করা শেষে ভ্রু কুঁচকে বলেন,

— এভাবে শংয়ের মতো হিজাব পড়ে আছো কেন?
কথাটা শুনে আনতারা ভেতরে ভেতরে অপমানিত বোধ করে। কিন্তু তা প্রকাশ না করে ধীর কণ্ঠে বলে,
— হাত-মুখ আবৃত রাখার জন্য এভাবে হিজাব বেঁধেছি।
শার্লিন সংক্ষিপ্তভাবে বলেন,
— ওহ।
আনতারা শান্ত গলায় আবার বলে,
— জি। আমাকে ডেকেছিলেন?
শার্লিন জিজ্ঞেস করেন,
— তোমার নাম কী?
আনতারা উত্তর দেয়,
— আনতারা শেখ।
শার্লিন ইমরোজ আবার প্রশ্ন করেন,
— বাবার নাম কী?
— আজাদ শেখ।
— কি করেন?
— ব্যবসা।
— কিসের ব্যবসা?
— ইটভাটার ব্যবসা।
কথাটা শোনার সাথে সাথেই শার্লিন ইমরোজের মুখ বিকৃত হয়ে গেল। তিনি নাক ছিটকে ঘৃণাভরা স্বরে বলেন,

— ছিহ! ইটভাটার ব্যবসা! শেষ পর্যন্ত একটা ইটভাটার ব্যবসায়ীর মেয়ে আমার ছেলের বউ!
আনতারা অবাক হয়ে বলে,
— ইটভাটার ব্যবসার কথা শুনে এমন তাচ্ছিল্য করছেন কেন? ইটভাটার ব্যবসা হালাল। আর হালাল কাজে নাক ছিটকানোর কি আছে?
শার্লিন ইমরোজ উঠে দাঁড়ান। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আনতারার দিকে এগিয়ে এসে বলেন,
— সামান্য একটা ইটভাটার ব্যবসায়ীর মেয়ে আমার ছেলের বউ, এটাই লজ্জার! তোমার তো কপাল খুলে গেছে। একটা সাধারণ ইটভাটার ব্যবসায়ীর মেয়ে হয়ে ফেমাস এক্টর ইফরাদ রিদান চৌধুরীর সাথে বিয়ে হয়েছে! চৌধুরী গ্রুপের সিইউ ইখতিয়ার চৌধুরীর ছেলের বউ হয়েছো!
আনতারা আত্নবিশ্বাসী চোখে দৃঢ় কন্ঠে বলে,

— সামান্য ইট ব্যবসায়ীর মেয়ে হওয়াতে আমার কোনো লজ্জা নেই। কারণ সেই সামান্য ইট ব্যবসায়ীর আয় হালাল। আর আপনাদের কাছে বাড়ি-গাড়ি, টাকা-পয়সাই সম্পদ হতে পারে, কিন্তু আমার কাছে সম্পদ হলো সওয়াব, আল্লাহর ইবাদত। টাকা-পয়সা, গাড়ি-বাড়ি কিছুই কবরে নিয়ে যেতে পারবো না, কিন্তু সওয়াব আর পূণ্য নিয়ে যেতে পারবো। তাই ফেমাস অভিনেতা ইফরাদের বউ হয়ে কপাল খুলেছে, এটা আমি বলতে পারছি না। তবে ইফরাদকে পেয়ে আমি সন্তুষ্ট। আল্লাহর বরকত আমার ওপর আছে, তাই আমার কপাল এমনিতেই খুলবে। এতে আমি কোনো খারাপ কিছু দেখছি না।
শার্লিন ইমরোজ রাগে ফুঁসতে লাগলেন। দাঁত চেপে বলেন,

— অসভ্য মেয়ে! বড়দের সাথে কিভাবে কথা বলতে হয় জানো না? বেয়াদব, ফাজিল!
আনতারা এবার দৃষ্টি ঘুরায় তবে কন্ঠে দৃঢ়তা কমে না। বলে,
— আমি অসভ্যতা করিনি। শুধু আপনার আমার প্রতি ভুল ধারণাগুলো পরিষ্কার করেছি।
শার্লিন যেন আরও ক্ষিপ্ত হন। গলা চড়িয়ে করে বলেন,
— এত বড় বড় কথা বলছো! ভুলে গেছো কি কীর্তি করে আমার ছেলেকে বিয়ে করেছো? কিভাবে এই বাড়ির বউ হয়েছো?
আনতারা শান্ত গলায় বলে,
— ইফরাদ নিজ সম্মতিতে আমাকে তার বাবা আর ভাইয়ের সামনে বিয়ে করেছে। আমি তাকে একবারও আমাকে বিয়ে করতে বলিনি।
শার্লিন ক্ষোভে কাঁপতে কাঁপতে বলে উঠলেন,

— নির্লজ্জ! চরিত্রহীন মেয়ে…
কিন্তু বাকিটা আর বলতে পারলেন না। হঠাৎই পেছন থেকে দৃঢ় কণ্ঠ ভেসে আসে,
— স্টপ ইট, মাম্মা!
শার্লিন থেমে গেলেন। অবাক হয়ে চোখ ঘুরিয়ে আনতারার পেছনে তাকাতেই দেখেন দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে ইরাইনা। আনতারাও ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়।
ইরাইনা সামনে এগিয়ে এসে বলে,
— কী হচ্ছে?
শার্লিন ইমরোজ শক্ত গলায় বলেন,
— এই মেয়ে আমার সাথে বেয়াদবি করছে।
শার্লিন ইমরোজের মুখ থেকে তার উদ্দেশ্যে বের হওয়া বাজে শব্দগুলো শুনে আনতারার চোখে জল আসে। চোখের জল চেপে রাখার চেষ্টা করলেও পারলো না চেপে রাখতে। এই ‘চরিত্রহীন’ শব্দটা তাকে ভীষণ কষ্ট দেয়। গলা ভারী হয়ে এলো আনতারার। সে ধীর গলায় বলে,
— আমি কোনো বেয়াদবি করিনি। আমি একটুও বেয়াদবি করিনি।
শার্লিন কঠোর কণ্ঠে বলেন,

— মিথ্যে বলবে না, নয়ত থাপ্পরে..
ইরাইনা এবার আগের চেয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বলে,
— আই সেইড স্টপ, মাম্মা।
এই কথার পর শার্লিন ইমরোজ থেমে গেলেন। আনতারার সামনে এভাবে থামিয়ে দেওয়ায় তিনি কিছুটা অপমান বোধ করলেন। ইরাইনা আনতারার দিকে তাকায়। তার চোখে জল স্পষ্ট। ইরাইনা শান্তভাবে বলে,
— তুমি রুমে যাও।
শার্লিন ইমরোজ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইলেন ইরাইনার দিকে। আনতারা মাথা তুলে একবার শার্লিনের দিকে তাকায়, তারপর চুপচাপ ঘর থেকে বের হয়ে গেল।
আনতারা বের হয়ে যেতেই শার্লিন বলেন,
— যেতে বললে কেন? আমি ওর সাথে কথা বলছিলাম!
ইরাইনা গম্ভীরভাবে বলে,
— এটা কেমন ব্যবহার ছিলো?
শার্লিন উদাসীন ভঙ্গিতে বলেন,

— যেমন ব্যবহার ওই মেয়ে ডিজার্ভ করে!
— তোমার বিহেভিয়ার অভার লাগছে না?
শার্লিন ইমরোজ ভ্রু কুঁচকে বলেন,
— তুমি এই মেয়ের পক্ষ টানছো?
ইরাইনা শান্তভাবে বলে,
— তুমি খুব ভালো করেই জানো, আমার কাছে যা ঠিক মনে হয় আমি সেটাই করি। কাছের মানুষ দেখে তার সাইড নেওয়া আমার স্বভাব না।
শার্লিন রেগে বলেন,
— তাই বলে ওই সভ্য মেয়েটার? তুমি জানো না মেয়েটা কতটা লোভী?
ইরাইনা দৃঢ় কন্ঠে বলে,
— না, আমি জানি না। আমি তোমার থেকে শুনেছি। কিন্তু কালকে মেয়েটার সাথে কথা বলার পর মনে হয়েছে তোমার কথাগুলো ইনভ্যালিড।
— কালকে একটু কথা বলেই বুঝে গেছো মেয়েটা ভালো?
— ভালো বলছি না, কিন্তু তুমি যেমন বলেছিলে তেমন না। তুমি বলেছিলে মেয়েটা নাকি ঠাস ঠাস মুখের উপর বেয়াদবি করে। অথচ কালকে আমি এত রূঢ়ভাবে কথা বলার পরও মেয়েটার কথায় নম্রতা ছিলো।

— এই মেয়ে এসব নাটক করছে! এসব ভং তার বাড়ির সবাইকে আয়ত্তে আনার।
ইরাইনা শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলে,
— মাম্মা, জীবনে একবার ভুল করেছি মানুষ চিনতে। কিন্তু এখন আমি মানুষ চিনি। আর এটাও বুঝি কে স্বার্থে ভালো ব্যবহার করছে আর কে বিনা স্বার্থে।
শার্লিন ইমরোজ রাগে চুপ করে থাকলেন। উনার মুখভঙ্গি দেখে বোঝা যাচ্ছিল, আনতারার ওপর উনার রাগ আরও বেড়েছে। ইরাইনা সেটা বুঝতে পেরে বলে,
— নিজের জায়গা ধরে রাখো, মাম্মা। এমন ব্যবহার করলে নিজের সম্মান হারাবে। আমি চাই না আমার মাম্মা কারোর সামনে নিচু হোক।
সন্ধ্যা আটটার দিকে। ইফরাদ লিভিং রুমে সোফায় বসে মোবাইল ফোন স্ক্রল করছে। ইফরাদ তার ফ্রেন্ড এবং কো-আর্টিস্টদের জন্য অপেক্ষা করছে। বাড়ির মেইন ডোরে কলিংবেল বাজে। ইফরাদ মোবাইল থেকে চোখ সরিয়ে দরজার দিকে তাকায়। মেইড গিয়ে দরজা খুলতেই পাঁচজন ভেতরে ঢুকে। তাদের মধ্যে তিনজন ছেলে আর দুজন মেয়ে। দুই মেয়ের পরনে ওয়েস্টার্ন পোশাক, হাঁটুর ওপর পর্যন্ত ড্রেস। ইফরাদ তাদের দেখে উঠে দাঁড়াশ, ফোনটা পকেটে রাখল এবং সামনে এগিয়ে যায়। ওরা এগিয়ে এলো।
একটা ছেলে হাত বাড়িয়ে ইফরাদের সাথে হ্যান্ডশেক করে, তারপর কোলাকুলি করে হেসে বলে,

— হোয়াটস আপ ব্রো? চুপিচুপি বিয়ে করে নিয়েছো! জানালেও না!
তখনই কালো শর্ট ড্রেস পরা একটা মেয়ে, যার নাম নোহা। সে ছেলেটিকে বলে,
— বুঝলি নিহাল, ইফরাদ হচ্ছে চালাক মাল! এক বছর আগে বিয়ে করেছে, অথচ আমাদের বুঝতেও দেয়নি।
তখনি ইফরাদের আরেকজন কো-আর্টিস্ট মাহি বলে উঠে,
— এতোদিন বুঝতে না দিলেও এখন বুঝে গেছি। এখন ভাবির সাথে দেখা করেই যাবো।
ইফরাদ একটু দূরেই দাড়িয়ে থাকা আয়ুষ আর রোশানের দিকে তাকায়। ওরা দুজনেই ইফরাদের ফ্রেন্ড। ওরা দুজনই গম্ভীরভাবে ইফরাদের দিকে তাকিয়ে আছে। আয়ুষ ফেমাস সিঙ্গার আর রোশান ইফরাদের মতোই এক্টর। দুজনই দেখতে খুবই সুদর্শন। আয়ুষের গায়ের রঙ শ্যামলা আর রোশানের সাদা।
ইফরাদ ওদের বলে,

— আচ্ছা, তোমরা আগে বসো। সব হবে।
নোহা এগিয়ে গিয়ে আয়ুষের হাত ধরে বলে,
— দাঁড়িয়ে আছো কেন? চলো বসি।
আয়ুষ মাথা নেড়ে সম্মতি দিয়ে গিয়ে সোফায় বসে। তারপর নিহাল, মাহিও গিয়ে সোফায় বসে। তবে রোশান দাঁড়িয়ে রইল। ইফরাদ চোখের ইশারায় আয়ুষ আর রোশানকে সাথে আসতে বলে। তারপর নিহালকে বলে,
— এক্সকিউজ মি।
বলেই ইফরাদ লিভিং রুম থেকে চলে যায়। রোশানও ইফরাদের পেছনে চলে গেলো। আয়ুষ নিজের হাতটা নোহার হাত থেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু নোহা আরও শক্ত করে ধরে রাখে। আয়ুষ নিচু গলায় বলে,
— হাতটা ছাড়ো, আসছি আমি।
নোহা ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,
— কোথায় যাবে?
আয়ুষ বিরক্ত হয়ে বলে,
— ওয়াশরুমে!

নোহা বিশ্বাস না করলেও কিছু বলে না। আয়ুষ তার হাত ছাড়িয়ে লিভিং রুম থেকে বের হয়ে সিঁড়ি বেয়ে দ্বিতীয় তলায় উঠে। উপরে এসে দেখে, ইফরাদ আর রোশান কথা বলছে। আয়ুষ কাছে যেতেই রোশান চুপ হয়ে যায় এবং গম্ভীর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
আয়ুষ একবার আড়চোখে রোশানের দিকে তাকিয়ে ইফরাদকে জিজ্ঞেস করে,
— কী হয়েছে?
ইফরাদ চিন্তিত হয়ে বলে,
— কী আবার হবে? ওরা হঠাৎ করে এসেছে! আমি তো ওই মেয়েকে কিছুই শিখিয়ে রাখিনি!
আয়ুষ বলে,
— তো তুই বলিসনি আমাদের আসার কথা ভাবিকে?
ইফরাদ ভ্রু কুঁচকে বলে,
— কে ভাবি? ডোন্ট কল হার ভাবি! জানিসই তো চাপে পড়ে বিয়ে করেছি! নয়ত এমন থার্ড ক্লাস মেয়েকে কোন দুঃখে বিয়ে করতাম?
রোশান শান্তভাবে বলে,

— তোর বউ আমাদের ভাবিই হয়। বিয়ে যখন করেছিস, রেসপন্সিবল হয়ে ভাবিকে রেসপেক্ট কর।
আয়ুষ কথাটা এগিয়ে নিয়ে বলে,
— আচ্ছা, এসব কথা পরে হবে। এখন তুই আগে ভাবিকে সবকিছু ঠিকভাবে বুঝিয়ে দে। উনি যেন নিহাল, নোহা, মাহির সামনে এমনভাবে প্রেজেন্ট করে যেন তোদের এক বছর আগেই বিয়ে হয়েছে। আর তোরা একটা লাভলী কাপল।
ইফরাদ বিরক্ত স্বরে বলে,
— ধুর! রাগ হচ্ছে! ওদের এখন না আসলে হতো না!
রোশান বলে,
— আমি তো জানতামই না ওরা আসবে। হঠাৎ নিহাল ফোন করে বলল সন্ধ্যায় তোর বাসায় আসবে।
আয়ুষ বলে,

— আমি মানা করেছিলাম। কিন্তু নিহাল বলেছে সে আসবেই। ভাবির সাথে মিট-আপ করবে।
ইফরাদ বিরক্ত হয়ে বলে,
— বালের বিয়ে, বালের ভাবি!
রোশান বলে,
— আচ্ছা, তুই গিয়ে ভাবিকে ম্যানেজ কর। নিচে গিয়ে বাকিটা আমরা দেখছি।
ইফরাদ মাথা নেড়ে বলে,
— হুম, যা তোরা।
রোশান আর আয়ুষ নিচে চলে যায়। ইফরাদ নিজের রুমে এসে দেখে, আনতারা জায়নামাজে বসে কুরআন তিলাওয়াত করছে। সে গলা খাঁকারি দিয়ে ডাকে,
— শুনো মেয়ে?
আনতারা কোনো উত্তর দিল না। সে তিলাওয়াতে ব্যস্ত ছিল। যে আয়াতটি পড়ছিল, সেটি শেষ না হওয়া পর্যন্ত থামার সুযোগ ছিল না। ইফরাদ কিছুটা বিরক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আনতারা আয়াত শেষ করে কুরআন শরীফ বন্ধ করে। তারপর মাথা ঘুরিয়ে ইফরাদের দিকে তাকিয়ে বলে,
— জি? ডাকছেন?
ইফরাদ বলে,

— হুম। রেডি হয়ে নাও।
আনতারা জিজ্ঞেস করে,
— কেন?
ইফরাদ বলে,
— আমার কিছু ফ্রেন্ড আর কলিগ এসেছে। ওদের সাথে দেখা করবে। ওরা তোমার সাথে দেখা করার জন্য এসেছে।
আনতারা সরাসরি বলে,
— আমি ওদের সাথে যেতে পারবো না।
ইফরাদ ভ্রু কুঁচকে বলে,
— কেন?
— আপনি জানেন আমি পর্দা করি। তারপরও আপনি কিভাবে আমাকে পর পুরুষের সামনে যেতে বলেন?
ইফরাদ বিরক্ত মুখে বলে,
— দু মিনিটের জন্য যাবে। আর হ্যাঁ শুনো, আমি ওদের বলেছি তোমার আর আমার এক বছর আগে বিয়ে হয়েছে। তাই ওরা বিয়ে নিয়ে জিজ্ঞেস করলে বলবে যে এক বছর আগে আমাদের বিয়ে হয়েছে, পারিবারিকভাবে।
আনতারা দ্বিমত করে বলে,

— না, আমি কোনো মিথ্যে কথা বলবো না। মিথ্যা বলা গুনাহ। আমি মিথ্যে কথা বলে শুধু শুধু গুনাহ করবো না। আমাদের নবিজি মিথ্যাবাদীকে অপছন্দ করেন।
ইফরাদ এবার চরম বিরক্ত হয়ে বলে,
— এই মেয়ে, হাদিস জ্ঞানের কথা রাখো! যেটা বলছি সেটা করো। নয়তো আমার থেকে খারাপ কেউ হবে না। চুপচাপ রেডি হও। পাঁচ মিনিট পর নিতে আসছি।
কথা শেষ করে ইফরাদ রুম থেকে বের হয়ে যায়। আনতারা জায়নামাজে বসেই রইল। কিছুক্ষণ সে নড়ল না। মনে হচ্ছিল, তার ভেতরে অনেক কথা জমে আছে, কিন্তু বলার মতো কোনো ভাষা খুঁজে পাচ্ছে না। সে ভেবেছিল, বিয়েটা ইফরাদ এখনো পুরোপুরি মেনে নিতে পারেনি, বিয়ের আগে ঘটে যাওয়া ঘটনাটার জন্য। তাই সবকিছু ঠিক করার চেষ্টা করছিলো। কিন্তু এখন তার মনে হচ্ছে, বিষয়টা শুধু এতটুকু না। ইফরাদের আচরণ তার কাছে আলাদা। একজন পর্দাশীল মেয়েকে পরপুরুষের সামনে যেতে বলে আবার একটা মিথ্যা গল্প দাঁড় করাতে চাচ্ছে! এসব কিছু আনতারার কাছে অস্বস্তিকর লাগছে।
এদিকে ইফরাদ নিচে লিভিং রুমে এসে বসতেই নোহা জিজ্ঞেস করে,

— ভাবি কোথায়, ইফরাদ?
ইফরাদ বলে,
— আসছে।
নোহা আবার বলে,
— বাই দা ওয়ে! ভাবির নামই তো জানি না। ভাবির নাম কি?
প্রশ্নটা শুনে ইফরাদ কিছুটা থেমে গেল। কেননা আনতারার নাম ইফরাদের মনে নেই। সবসময় তো এই মেয়ে বলেই ডাকে। নামের প্রয়োজন পড়েনি। কিন্তু এখন নামটা ভীষণ প্রয়োজন। ইফরাদ ভাবতে থাকে বিয়ের সময় কাজির সামনে আনতারা তার নাম কি বলেছিল। পুরো নামটা মনে না পড়লেও একটুখানি অংশ ইফরাদের মাথায় আসছে। মারজানা বা এর কাছাকাছি কিছু ছিলো।
কিছুক্ষণ ভাবার পর হঠাৎ বলে,

— মাই জানা।
মাহি অবাক হয়ে বলে,
— মাই জানা?
ইফরাদ হেসে বলে,
— নাম হচ্ছে মারজানা, বাট আমি মাই জানা ডাকি।
নিহাল হেসে বলে,
— ওহ হো ব্রো! মাই জানা।
ইফরাদ হালকা স্বরে বলে,
— ইয়াহ, সি ইজ মাই জানা।
নোহাও হেসে বলে,
— হাউ সুইট নিকনেম!
ঠিক তখনি আবার কলিংবেল বেজে উঠে। সবাই দরজার দিকে তাকায়। মেইড দরজা খুলতেই ইরাইনা ভেতরে ঢুকে। তার পরনে ছিল শার্ট আর ফরমাল প্যান্ট। বাম হাতে ঘড়ি, ডান হাতে একটি ব্যাগ। লিভিং রুমে ঢুকে সে প্রথমে নিহাল, নোহা, মাহি ওদের দেখে। তারপর তার চোখ গিয়ে থামপ আয়ুষ আর রোশানের দিকে। দুজনেই তার দিকে তাকিয়ে ছিল।
আয়ুষ ইরাইনার দিকে তাকিয়ে থাকতেই নোহা তা দেখে আয়ুষের গালে হাত রেখে নিজের দিকে ঘুরিয়ে দিয়ে বলে,

— কী হয়েছে? কী দেখছো?
আয়ুষ চোখ সরিয়ে নিয়ে বলে,
— নাথিং!
রোশান চোখ সরায় না। সে ইরাইনার দিকেই তাকিয়ে রইল। ইফরাদ ইরাইনাকে দেখে জিজ্ঞেস করে,
— কোথায় গিয়েছিলে?
ইরাইনা ইফরাদের দিকে তাকিয়ে উত্তর দেয়,
— অফিসে। একটু ইম্পর্ট্যান্ট কাজ পড়েছিল।
ইফরাদ ছোট করে বলে,
— আচ্ছা।
ইরাইনা আর দাঁড়াশ না। সোজা সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল। সিঁড়ির কাছে পৌঁছানোর পর পেছন থেকে নিহাল ডাক দেয়,
— কেমন আছো, ইরাইনা?
ইরাইনা ঘুরে তাকিয়ে বলে,

— ভালো।
তখন নোহা বিদ্রুপ করে বলে,
— যারা অন্যের ভালো চায় না, তারা ভালোই থাকে অলওয়েজ!
কথাটা শুনে সবাই নোহার দিকে তাকায়। আয়ুষ বিরক্ত দৃষ্টিতে নোহার দিকে তাকিয়ে বলে,
— চুপ করবে?
নোহা আয়ুষের কথার কোনো উত্তর দেয় না। ইফরাদ বিরক্ত মুখে নোহার দিকে তাকিয়ে থাকে। ঝগড়াটে স্বভাবের জন্য তার মেয়েদের প্রতি বিরক্তি লাগে। তার মনে হয়, মেয়েদের মনে অনেক হিংসা থাকে। অন্য মেয়ের সুখ দেখলেই তারা হিংসায় জ্বলে ওঠে, খোঁচা দেয়। এই স্বভাবগুলোর কারণেই মেয়েদের তার বিরক্ত লাগে। আর নোহা তো আরও বেশি বিরক্তিকর। অন্য সবার তুলনায় নোহার মনে হিংসা একটু বেশিই। নোহা আগে থেকেই ইরাইনাকে হিংসা করত, আর এখন আয়ুষের জন্য সেই হিংসা আরও বেড়ে গেছে।
এদিকে ইরাইনা সিঁড়ির কাছ থেকে এগিয়ে এসে লিভিং রুমের মাঝখানে দাঁড়ায়। নোহার সামনে গিয়ে শান্তভাবে বলে,

— ভুল! সবাই সুখী থাকে না। এই যেমন নিজেকেই দেখো, সুখী হতে পারছো?
নোহা আয়ুষের হাত শক্ত করে ধরে জোর গলায় বলে,
— কে বলছে সুখী না? আয়ুষ আমাকে কত ভালোবাসে! এত ভালোবাসা পেয়ে অসুখী থাকবো কেন!
ইরাইনা একবার আয়ুষের দিকে, তারপর নোহার দিকে তাকিয়ে বলে,
— তোমার লাভ লাইফ নিয়ে আমার কোনো জানার ইন্টারেস্ট নেই! তাই ষ্টুপিড কথা বন্ধ করো!
ইরাইনা কথা শেষ করতেই নোহা হঠাৎ আয়ুষের গালে চুমু খায়। আয়ুষ কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে যায়। সে একবার ইরাইনার দিকে তাকায়, কিন্তু ইরাইনা কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায় না।
নোহা স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলে,
— আমার বলতে হয় না। কিছু মানুষ আমাদের ভালোবাসা দেখে জ্বলে পুড়ে যায়।
ইরাইনা তীক্ষ্ণ কন্ঠে বলে,

— ঢং ততটুকুই কর যতটুকু ফেইসে মানায়। অতিরিক্ত ঢং দেখতে ক্রিন্জ লাগে!
নোহা চোখ গরম করে বলে,
— মাইন্ড ইউ ল্যাঙ্গুয়েজ!
ইরাইনাও চোখ রাঙিয়ে বলে,
— ইউ ফার্স্ট!
আয়ুষ পরিস্থিতি সামলাতে বলে,
— থামো, নোহা!
নোহা বিরক্ত হয়ে বলে,
— আমাকে কেন থামতে বলছো? ও কী বলছে শুনছো না?
রোশান তখন বলে,

— কী হচ্ছে এখানে? আমরা এখানে গেস্ট হিসেবে এসেছি। আর একজনের সাথে দেখা করতে এসেছি। তাই সবার ভদ্রতা বজায় রাখা উচিত।
ইফরাদ কোনো কথা বলে না। সে সেখান থেকে সরে গিয়ে সিঁড়ি বেয়ে দ্বিতীয় তলায় উঠে, আনতারাকে নিচে নিয়ে আসার জন্য। নিজের রুমের সামনে এসে দরজার হ্যান্ডেল ঘোরাতেই বুঝে, দরজাটা ভেতর থেকে লক করা। সে দরজায় নক করে। ভেতর থেকে কোনো সাড়া পাওয়া গেল না।
ইফরাদ এবার জোরে জোরে দরজায় নক করে বলে,
— এই মেয়ে, দরজা খুলো! তুমি শুনতে পারছো? দরজা খুলো!
ভেতর থেকে আনতারার কণ্ঠ শোনা গেল,
— না, দরজা খুলবো না আমি!
ইফরাদ কিছুটা থেমে অবাক হয়ে বলে,

— খুলবে না মানে?
আনতারা বলে,
— আমি ওদের সামনে যাবো না।
ইফরাদ বুঝতে পারে, আনতারা ইচ্ছা করেই দরজা লক করে রেখেছে, যাতে তাকে নিচে যেতে না হয়।
ইফরাদ আবার বলে,
— দরজা খুলো বলছি। সবাই অপেক্ষা করছে!
আনতারা দরজার সাথে ঘেঁষে দাড়িয়ে থেকেই বলে,
— বলে দিন অপেক্ষা না করতে। আমি আমার আল্লাহর আদেশ অমান্য করতে পারবো না।
ইফরাদ এবার বিরক্ত হয়ে বলে,
— এই মেয়ে, খারাপ হয়ে যাবে বলে দিচ্ছি। আমি ওদের বলেছি তুমি দেখা করবে! এখন তুমি না গেলে আমার অসম্মান হবে!
— আজকে যদি আপনার সম্মান রক্ষার্থে আমি ওদের সামনে যাই, নিজের পর্দা লঙ্ঘন করে, তাহলে আপনার উপর লানত পড়বে!
ইফরাদ দাঁত কিড়মিড় করে বলে,

— ডে ওয়ান থেকে তুমি আমাকে প্যারার উপর রেখেছ, মেয়ে! আজকে যদি তুমি ওদের সাথে দেখা না করো, তাহলে আমি বলে দিচ্ছি, আমি তোমাকে তালাক দিবো!
এবার আনতারার পাশ থেকে নিরবতা নেমে এল। ইফরাদ মনে করে, আনতারা তালাকের কথা শুনে ভয় পেয়েছে। তাই সে আরো ভয় দেখাতে বলে,
— তুমি দরজা খুলবে নাকি আমি তালাক দিবো?
তখনি পেছন থেকে একটা কন্ঠ ভেসে আসে,
— আর ইউ আউট অফ ইউ মাইন্ড?
ইফরাদ পেছনে তাকিয়ে দেখে ইরাইনা দাঁড়িয়ে আছে। ইরাইনা অবাক হয়ে বলে,
— দরজা খুলছে না দেখে তুমি তালাক দিবে? সিরিয়াসলি?
ইফরাদ কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলে,
— ফাজিল মেয়েটা আমার কথা শুনছে না। নিচে সবাই ওর জন্য অপেক্ষা করছে, আর ও নাকি যাবে না।
ইরাইনা শান্তভাবে বলে,

— ও কুরআনে হাফেজা। পর্দা করে। ও কিভাবে পরপুরুষের সামনে যাবে?
ইফরাদ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলে,
— হিজাব পড়ে আসতে বল! ব্যাস হয়ে গেলো!
— আসতে পারবে না দেখেই তো আসছে না।
ইফরাদ রেগে বলে,
— না আসলে আমার কোনো আর্টিস্টদের সামনে আমার সম্মান থাকবে?
— যেকোনো একটা কিছু বলে ম্যানেজ করে নাও। আর এমনিতেও আনতারা গেলে তোমার বিয়ের ব্যাপারটা বিগড়ে যেতে পারে। ওরা আনতারাকে প্রশ্ন করলে যদি উল্টো পাল্টা কিছু বলে বা সত্যি বলে ফেলে, তখন এই বিষয়টি মিডিয়াতে চলে যেতে খুব কম সময় লাগবে।
ইফরাদ কপালে ভাজ ফেলল। ইরাইনা কথাটা ভুল বলেনি। আনতারা না গেলে, সাজানো মিথ্যাটা পাবলিক হওয়ার সম্ভাবনা কম। তবু ইফরাদের রাগ কমে না, কারণ আনতারা তার কথা শুনেনি। জেদ ধরে নিজের কথাই ঠিক রেখে দরজা খুলেনি। তাই সে দরজায় ঠাবা মেরে বলে,

— ওদের সাথে কথা বলে তোমাকে দেখে নিবো, মেয়ে! রেডি থেকো!
বলেই ইফরাদ নিচে চলে এলো। ইফরাদকে একা আসতে দেখে নিহাল অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,
— ভাবি কোথায়?
ইফরাদ সোফায় এসে বসে শান্ত গলায় বলে,
— আসেনি।
মাহি অবাক হয়ে বলে,
— আসবে না?
ইফরাদ বলে,
— না।
মাহি আরও অবাক হয়ে বলে,
— মানে?
ইফরাদ আগের মতো করেই বলে,
— মানে, আমার বউ পর্দা করে। সে পরপুরুষদের সামনে যায় না। আমি তাকে পুরুষ মানুষের সামনে আসতে দেই না।
নোহা বলে,

— ওহ। তাহলে নিহাল, আয়ুষরা থাকুক। আমি আর মাহি আলাদা মিট করে আসি।
বলেই সে দাঁড়াতে নেয় তখনি ইফরাদ থামিয়ে বলে,
— না।
নোহা থেমে অবাক হয়ে তাকায়। ইফরাদ বলল,
— আমি আমার বউকে কারোর সামনেই আনবো না।
মাহি প্রশ্ন করে,
— কেন? আমরা তো মেয়ে। মেয়ে মানুষের সামনে তো আসতেই পারবে!
ইফরাদ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলে,
— আমার বউকে দেখে যদি তোমরা মুগ্ধ হয়ে অন্য কারো সামনে তার প্রশংসা করো, তাহলে তার পর্দার নষ্ট হবে। আর এমনিতেই আমি চাই না, পরপুরুষ কিংবা আমি ছাড়া অন্য কারো ঠোঁটে আমার বউ টপিক হিসেবে থাকুক। আই ডোন্ট লাইক দ্যাট!
নোহা শান্ত স্বরে বলে,

— আমরা কারোর সামনে তোমার বউকে নিয়ে কিছু বলবো না। আমরা শুধু দেখতে চাই, একটু।
ইফরাদ নাকচ করে দেয়,
— পসিবল না।
নোহা আবার ধীরে বলে,
— জাস্ট একটু…
আয়ুষ একটু বিরক্ত হয়ে বলে,
— পারবে না তো বলেছে একবার! এতো জোর করার মানে কি?
নোহা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,
— এমনভাবে রিয়েক্ট করছো কেন হঠাৎ? এতক্ষণ তো মেজাজ খুব ঠান্ডা ছিলো। হঠাৎ এতো রেগে গেলে কেন?
নিহাল গলায় শান্ত স্বর এনে বলে,
— ওকে গাইজ, শান্ত হও। এটা সিম্পল একটা ব্যাপার। এ নিয়ে এতো তর্ক করার কি আছে।
সেই সময় লিভিং রুমে দুজন মেইড হাতে ট্রে নিয়ে ঢুকে। ট্রেতে ছিল খাবার। নিহাল তাদের দিকে তাকিয়ে বলে,

— এই যে, স্ন্যাক্স আনছে। সবাই খেয়ে শান্ত হও।
মেইডরা ট্রে টেবিলে রেখে চলে যায়। ইফরাদ হাত বাড়িয়ে খাবার ইশারা করে বলে,
— সবাই নাস্তা নাও।
নিহাল হাত বাড়িয়ে একে একে সবাইকে নাস্তা দেয়। প্রথমে নোহা নিতে চায় না, কিন্তু নিহাল চোখের ইশারায় নিতে বলে। তারপর নোহা নাস্তা নেয়। সবাই নিজের বাটি থেকে চামচ দিয়ে কাস্টার্ড মুখের সামনে নিয়ে নেয়।
নিহাল হেসে বলে,
— এটা নিশ্চয়ই ভাবি বানিয়েছে।
ইফরাদ সোজাসাপ্টা বলে,
— না, মেইডরা বানিয়েছে।
নিহাল বলে,

— ঠিক আছে, ভাবিকে সামনে আনবে না। কিন্তু অন্তত ভাবির হাতে নাস্তা দিতে পারো না?
ইফরাদ দৃঢ় গলায় বলে,
— না, আমার বউয়ের হাতের বানানো নাস্তার ভাগ আমি কাউকে দিবো না।
নিহাল হেসে বলে,
— এতো জেলাসি?
ইফরাদ কথায় জোর দিয়ে বলে,
— অফকোর্স! আমার বউ। তাকে দেখবোও আমি, তার খেদমতও আমি নিবোই। তার তরফ থেকে সকল ফায়দা শুধু আমার জন্যই থাকবে। এসবের ভাগ আমি কাউকে দিবো না।
নিহাল হালকা করে বলে,
— মারাত্মক জেলাসি।
আড্ডা দিতে দিতে রাত দশটা বেজে যায়। এবার নিহাল, নোহা, মাহি, আয়ুষ আর রোশানদের যাওয়ার সময় হয়। তাদের সঙ্গে ইফরাদও বেরোবে। সবাই পার্টিতে যাবে।
রোশান হাতে থাকা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলে,

— ১০টা বেজে গেছে, এখন যাওয়া যাক।
নিহাল বলে,
— হ্যাঁ, এখন যাই।
আয়ুষ জিজ্ঞেস করে,
— ইফরাদ, আমাদের সঙ্গে পার্টিতে যাবি না?
ইফরাদ বলে,
— হ্যাঁ, তোদের সঙ্গেই যাব। চেঞ্জ করে আসছি, বস।
বলেই ইফরাদ দ্বিতীয় তলায় যায়। গিয়ে দেখে, তার রুমের দরজা এখনো লক করা। ইফরাদের রাগ হলেও নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করে দরজা ধাক্কা দিয়ে বলে,

— দরজা খুলো। ওরা চলে গেছে।
ভেতর থেকে আনতারা বলে উঠে,
— সত্যি তো, ইফরাদ?
ইফরাদ রাগে ফোঁসফোঁস করে বলে,
— না, রসিকতা করছি আমি! বেয়াদব, দরজা খুলো।
ভেতর থেকে এবার আনতারার দ্বিধা কন্ঠে বলে,
— ইফরাদ, আমি কিন্তু কারোর সামনে যাবো না। আমার পর্দা নষ্ট করলে হাশরের ময়দানে আপনার আমার আল্লাহর সামনে জবাব দিতে হবে।
ইফরাদ রাগে দাঁত পিষে বলে,

— হে আল্লাহর ফরেজগার বান্দা, আপনি দরজা খুলুন। আপনার কারোর সাথে দেখা করতে হবে না। আপনি নিজেকে জাদুকরে সাজিয়ে রাখুন।
বলেই সে কিছুক্ষণ থেমে দাড়িয়ে অপেক্ষা করে। নিরবতায় কাটে কিছুক্ষণ। ইফরাদ আবার কিছু বলার জন্য মুখ খুলতে নিবে, তখনি রুমের দরজা ধীরে খুলে গেল। ধীরে ধীরে দরজার ফাঁক দিয়ে আনতারা তাকালো। ইফরাদ দেখে, তার মুখ পুরো ঢাকা, শুধু চোখটা দেখা যাচ্ছে।
ইফরাদ রাগ চেপে বলে,
— তোমার সাহস দেখে অবাক হই আমি, ফাজিল মেয়ে! কত বড় সাহস, আমার রুমে এসে আমাকে এতোকিছু দেখাতে!
আনতারা শান্ত কণ্ঠে বলে,
— আপনাকে বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখার জন্য দুঃখিত, ইফরাদ।
ইফরাদ কঠিন মুখে বলে,

— এখন যদি দরজার সামনে থেকে না সরো, তাহলে আরো দুঃখিত বানাবো তোমাকে।
আনতারা দরজা থেকে সরে দাঁড়ায়। ইফরাদ রুমে ঢুকে। ভেতরে এসে দেখে মাটিতে জায়নামাজ বিছানো, তাতে তসবিহ রাখা। আনতারা দরজাটা লাগিয়ে মুখ থেকে কাপড় সরায়। সে ইফরাদকে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছিল না, তাই মুখ ঢেকে দরজা খুলেছিলো। ইফরাদ কাভার্ডের কাছে গিয়ে কাচের দরজা খুলে। কাপড় বের করে আনতারার সামনেই পরনের টি-শার্ট টা খুলে ফেলে টান দিয়ে।
আনতারা অবাক হয়ে পাল্টা ঘুরে বলে,

— কি করছেন, ইফরাদ?
ইফরাদ টি-শার্ট পাল্টে গায়ে শার্ট জরিয়ে বোতাম লাগাতে লাগাতে বলে,
— অন্ধ নাকি? দেখো না, শার্ট পড়ছি।
আনতারা নিশু স্বরে বলে,
— না, আমি দেখছি না।
ইফরাদ পাত্তা না দিয়ে নিজের কাজ করতে করতে বলে,
— তাহলে চোখের ডাক্তার দেখাও। তবে আমার কাছে ডাক্তার দেখানোর টাকা চেও না।
বলতে বলতেই ইফরাদ টাওয়াল কোমরে পেচিয়ে প্যান্ট চেঞ্জ করে নেয়। আনতারা এখনো ঘুরে দাড়িয়ে আছে অন্যদিকে। ইফরাদ চেঞ্জ শেষ করে ওয়াশরুমে চলে যায় মুখ ধুতে। আনতারা জায়নামাজে বসে তসবিহ পড়া শুরু করে আবার। এতোক্ষণ সে তসবিহ পড়ছিলো বসে বসে৷
ইফরাদ ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে আয়নার কাছে গিয়ে মুখ মুছতে থাকে। মুখ মুছতে মুছতেই আড়চোখে আনতারাকে দেখে মনে মনে বলে,

— তুমি যতই ধার্মিক হওয়ার ভান করো না কেন, আমাকে বিশ্বাস করানো সম্ভব না। অভিনয়ে কাঁচা তুমি, মেয়ে।
হঠাৎই ইফরাদের মাথায় একটি কুবুদ্ধি আসে। সে বাঁকা হেসে মনে মনে বলে,
— এখনই তোমার এসব নাটক ফাঁস করছি, মাই জানা।
ইফরাদ মুখ মুছে নিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়ে নেয়। তারপর আনতারাকে ডাক দেয়,
— এই মেয়ে, এদিকে আসো, কথা আছে।
আনতারা তাকিয়ে দেখে। ঠোঁটে এখনও দোয়া, হাতে তসবিহ। ইশারায় বুঝায় আসছে। আনতারা তসবিহ পড়া শেষ করে জায়নামাজে রেখে উঠে দাড়িয়ে ইফরাদের কাছে চলে আসে। বলে,
— বলুন।
ইফরাদ আত্নবিশ্বাসী গলায় বলে,

— আমি মানুষটা অনেক ভালো। আমার মন হচ্ছে দয়ার সাগর। যেহেতু মনটা আমার দয়ার সাগর, সেহেতু ভাবলাম তুমি মেয়েটা খারাপ হওয়ার পরও একটা সুযোগ দেই।
আনতারা অবাক চোখে তাকায়।
— কি সুযোগ?
ইফরাদ হেসে বলে,
— আমি অত্যন্ত গুডলুকিং এন্ড হ্যান্ডসাম ছেলে। তার উপর মোস্ট ডিমান্ডিং এক্টর। দেশের এক্টেরস, মডেল, বিজনেসম্যানদের মেয়ে থেকে শুরু করে সব মেয়ে আমার জন্য পাগল। এখন আমার সাথে তোমার মতো মেয়েকে মানাবে না। তোমার জন্য আমার ক্লাস নষ্ট হবে।
আনতারা কণ্ঠে হালকা সন্দেহ রেখে বলে,
— আপনি কি আমাকে ছেড়ে দিতে চাচ্ছেন?
ইফরাদ স্পষ্ট কণ্ঠে বলে,

— বললাম তো, সুযোগ দিতে চাচ্ছি। যদি তুমি সুযোগটা কাজে লাগাতে পারো, তাহলে তোমাকে মেনে নিবো, নয়ত ছেড়ে দিবো।
আনতারা আবার জিজ্ঞেস করে,
— বলুন কি সুযোগ?
ইফরাদ এবার সিরিয়াস হয়। তার চোখে ফুটে ওঠে দৃঢ়তা, আর ঠোঁটের কোণে ভেসে থাকে হালকা হাসি। সে ধীর স্বরে বলে,
— একটা শর্তে আমি তোমাকে বউ হিসেবে মানবো। আমার পাশে দাঁড়ানোর মতো যোগ্যতা তোমার থাকতে হবে। এসব বোরখা পরে ক্ষেত মেয়ের মতো চলাফেরা করা যাবে না। মর্ডান শর্ট ড্রেস পড়তে হবে। যদি আমার মতো হতে আপত্তি থাকে, তাহলে আমি তোমাকে তালাক দিয়ে দেব।
ইফরাদ থামে। আনতারা শান্তভাবে দাঁড়িয়ে আছে। চোখ দুটো স্থির ইফরাদের উপর। একটু নড়চড় নেই। কিছুক্ষণ নিরবতার পর ইফরাদ আবার বলে,
— এখন জানাতে হবে না। রাতে ভেবে রেখো। সকালে আমি ফিরলে আমাকে জানিও।
বলেই সে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালো। তখনই আনতারা পেছন থেকে ইফরাদের হাত ধরে বাধা দেয়। ইফরাদ ঘুরে তাকায়।
আনতারা শক্ত কণ্ঠে বলে,

রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ৫

— আমি বেপর্দা নারী হলে আপনি আমাকে গ্রহণ করবেন, সিদ্ধান্ত যদি এমন হয়, তাহলে আমি মনে করি আপনি আমার স্বামীর যোগ্য নন। যদি পর্দা করার জন্য আপনি আমাকে তালাক দিয়ে দেন, তাহলে আমি মনে করবো আল্লাহ আমার ভাগ্যে আপনার থেকে আরো উত্তম কাউকে রেখেছেন। সেজন্যই আপনার সাথে সংসার হবে না। যদি আপনার আপত্তি আমার ইবাদত, বন্দেগি হয়, তাহলে তালাক দিয়ে দিন। আমার আল্লাহ দুঃস্বপ্ন ভেবে ভুলিয়ে দিবে আপনাকে আমার মন থেকে।

রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ৭