Home রোমান্টিক ভাইয়া রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ২৯

রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ২৯

রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ২৯
মহাসিন

সকাল হয়ে গেছে। ঘড়ির কাঁটা এখন দশ ছুঁই ছুঁই।
ড্রয়িংরুমে চায়ের কাপ হাতে বসে আছে নীলাঞ্জনা, সিয়াম আর কবিতা। বাইরে রোদ ঝলমল করলেও ঘরের ভেতরটা কেমন ভারী।
সিঁড়ি বেয়ে ধীর পায়ে নেমে এলো জেরিন। হাতে ছোট্ট একটা লাগেজ। চোখের নিচে রাত জাগার কালি, ঠোঁটে কৃত্রিম হাসি।
নীলাঞ্জনা চমকে উঠে বলল,
“একি! তুমি চলে যাচ্ছো?”
জেরিন মাথা নেড়ে বলল,
“হ্যাঁ ভাবি। অনেক দিন তো থাকা হলো। এবার বাড়ি ফিরতে হবে।”
তারপর কবিতার দিকে ফিরে মৃদু স্বরে বলল,
“ভাবি, তুমি যাবে না আমার সাথে?”

কবিতা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে উদাস গলায় বলল,
“না, আমি যাবো না। তোমার ভাইয়া বিদেশ থেকে ফিরলে তখন যাবো।”
কথা শেষ হতে না হতেই শাপলা চলে এলো। চোখে মুখে কৌতূহল।
জেরিন ধীরে এগিয়ে গেল তার কাছে। এক মুহূর্ত থেমে, হঠাৎই জড়িয়ে ধরল শাপলাকে।
শাপলা থমকে গেল। অবাক চোখে তাকাল—জেরিন এভাবে জড়িয়ে ধরছে কেন?
জেরিনের চোখে এখন নোনা পানির ঢেউ। বুকের ভেতরটা ফেটে যাচ্ছে, তবু গলার স্বর নামিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“আমি চলে যাচ্ছি শাপলা… তোমার আর সিয়ামের জীবন থেকে। এবার থেকে তোমাদের আর কোনো সমস্যা হবে না।”
কেউ যেন না দেখে, এমন করে শাপলার হাতে গুঁজে দিল একটা ভাঁজ করা চিরকুট।
“এটা পড়ে নিয়ো,” শুধু এটুকু বলে সরে গেল সে।
তারপর হালকা হেসে নীলাঞ্জনার দিকে তাকিয়ে বলল,
“ভাবি, আলো কোথায়? ওকে তো দেখছি না।”
“স্কুলে গেছে,” নীলাঞ্জনা বলল।
জেরিন ঘুরে তাকাল সিয়ামের দিকে। চোখে একরাশ না-বলা কথা।
“এই যে মিস্টার, চুপচাপ বসে আছেন কেন? চলুন, আমাকে একটু এগিয়ে দিন।”

সিয়াম কিছু বলল না। নিঃশব্দে উঠে দাঁড়াল।
দু’জন গুটি গুটি পায়ে বাড়ির গেট পর্যন্ত এলো। বাতাসে এখন নীরবতা।
জেরিন সিয়ামের হাতে ধরিয়ে দিল আরেকটা চিরকুট।
“এটা একটু কষ্ট করে পড়িয়েন,” বলে চোখ নামিয়ে নিল সে।
এরপর একটা গাড়ি থামিয়ে উঠে বসল।
গাড়ি চলতে শুরু করল। জানালার কাচের ওপাশে জেরিনের চোখে পানি, বুকে না-পাওয়ার বেদনা। সে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল সিয়ামের দিকে—যেন এই দেখাই শেষ দেখা।
সিয়ামও দাঁড়িয়ে রইল। চোখ সরাতে পারল না।
একটা সময় গাড়িটা দূরে গিয়ে মিলিয়ে গেল ধুলোর মেঘে।
সিয়াম ধীরে ঘুরে বাড়ির ভেতর ফিরে গেল।

কবিতা ঘরের ভেতর পায়চারি করছে। ছোট ছোট পায়ের শব্দেই বোঝা যাচ্ছে, ভেতরে দাউদাউ করে জ্বলছে আগুন।
চোখ দুটো রাগে লাল। ঠোঁট কাঁপছে, গলা দিয়ে বের হচ্ছে বিড়বিড় শব্দ—
“শাপলা… তোকে আমি কোনোদিন ছাড়বো না। তোকে সিয়ামের জীবন থেকে, এমনকি এই বাড়ি থেকেও তাড়িয়ে ছাড়বো।”
হঠাৎ করেই তার মাথায় ভেসে উঠলো সেই দিনের কথা—যেদিন সে নিজেই চুরি করেছিল মায়ের গহনা।
সেদিন কবিতা চারদিকে সতর্ক চোখ বুলিয়ে দেখে নিলো—কেউ নেই।
ধীর পায়ে ঢুকে পড়লো মায়ের ঘরে। শুরু হলো চাবির খোঁজ। বিছানার নিচে, বালিশের নিচে, ড্রয়ারে… কোথাও নেই।
“ধ্যাত! কোথায় গুঁজে রাখলো এই চাবি?” বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে আবার খুঁজতে লাগলো সে।
অবশেষে ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ার থেকে পেলো আলমারির চাবি।
নিঃশ্বাস দ্রুত হয়ে এলো। ছুটে গেল আলমারির কাছে। কাঁপা হাতে খুলতেই…
চোখ ঝলসে উঠলো সোনার ঝলকানিতে।
“এবার গহনাগুলো আমার হবে,” ফিসফিস করে বলল কবিতা।
গহনা হাতে নিতেই পেছন থেকে শীতল কণ্ঠ—
“কী করেন এখানে?”

চমকে ঘুরে তাকালো কবিতা। সামনে শাপলা।
চোখ দুটো বড় বড় করে ফিসফিস করে বলল,
“শাপলা, তুই কিছু দেখিসনি! একদম চুপ করে থাকবি। কিছুই হয়নি এখানে।”
কিন্তু শাপলা চুপ রইলো না।
গলা ফাটিয়ে ডাকলো, “সবাই এসো! দেখো কী হচ্ছে এখানে!”
মুহূর্তের মধ্যে ঘরে ছুটে এলো সবাই।
মহুয়া রাগে কাঁপতে কাঁপতে কবিতার গালে কষে চ*ড় বসিয়ে দিলেন।
“লাজ-লজ্জা সব কি খেয়ে বসে আছিস? তোর এত বড় সাহস হয় কী করে?”
কবিতা চিৎকার করে উঠলো,
“মা, তুমি আমাকে মা*রলে কেন? আমি যা করেছি বেশ করেছি! আমি নেবো এই গহনা। তুমি ওই নীলাঞ্জনাকে দিতে পারো না?”
সায়েক আহমেদ ধমকে উঠলেন,
“তোর মাথা ঠিক আছে তো? এগুলো কী করছিস তুই? নীলাঞ্জনা এই বাড়ির বউ। ওকে গহনা দেবে না তো কাকে দেবে?”

কবিতার চোখে জেদ আর অপমান।
“কেন বাবা, আমি কি এই বাড়ির মেয়ে না?”
“তুই এই বাড়ির মেয়ে। তোর বিয়ের সময় গহনা দেওয়া হয়েছিল,” শান্ত গলায় বললেন সায়েক আহমেদ।
“তবুও আমার এই গহনাই লাগবে!”
আবারও কষে চ*ড় পড়লো কবিতার গালে।
মহুয়া কাঁপা গলায় বললেন,
“বেরিয়ে যা এই বাড়ি থেকে! তুই আমার পেটের মেয়ে হয়ে কীভাবে এমন আচরণ করতে পারিস?”
কবিতা রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,
“হ্যাঁ, থাকবো না এই বাড়িতে। চলে যাবো!”
এই বলে চিৎকার করতে বেরিয়ে গেল সে।
সেই পুরনো স্মৃতি ভাবতে ভাবতেই কবিতার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।
দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করলো—
“শাপলা… আমি তোকে ছাড়বো না। বলে দিলাম।”

শাপলা জানালার পাশে বসে আছে। বাইরে থেকে আসা মৃদু বাতাস তার এলোমেলো চুলগুলো ছুঁয়ে যাচ্ছে, যেন কোনো অদৃশ্য হাত মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।
হঠাৎই নীরবতা ভেঙে বেজে উঠলো ফোনটা।
শাপলা চমকে ফোনটা হাতে তুলে নিলো। স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে—কলি কল দিয়েছে।
ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠলো এক চিলতে হাসি।
“হ্যালো! কেমন আছিস কলি?”
“ভালো আছি রে। তুই কেমন আছিস?”
“আমিও ভালো আছি।”
“শাপলা, কালকে তো স্কুল খুলবে। তুই যাবি তো?”
“হ্যাঁ রে, অবশ্যই যাবো। আর কালকে ওই ফালতু আনিকটাকে একটা উচিত শিক্ষা দিতে হবে।”
শাপলা একটু থেমে বলল,
“আর শোন, দীপাকে বলে দিস ও যেন কাল স্কুলে আসে। ওকে যে কী করবো আমি নিজেও জানি না।”
কলি হেসে বলল, “আচ্ছা ঠিক আছে, রাখি তাহলে। কাল স্কুলে দেখা হবে।”

লাইন কেটে যেতেই ঘরটা আবার নীরব হয়ে গেল।
শাপলা ফোনটা পাশে রেখে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলো।
হঠাৎ মনে পড়লো—জেরিনের দেওয়া সেই ভাঁজ করা চিরকুটটার কথা।
হাত কাঁপতে কাঁপতে টেবিল থেকে চিরকুটটা তুলে নিলো সে।
ভাঁজ খুলতেই চোখে পড়লো এলোমেলো অক্ষরে লেখা কয়েকটা লাইন। শাপলা চিঠি পড়তে লাগলো,
শাপলা তুমি আর সিয়াম সারাজীবন একসাথে থেকো।
আমি আর তোমাদের মাঝে কাঁটা হয়ে দাঁড়াবো না।
আজ, এই মুহূর্তে, আমি সারাজীবনের জন্য তোমাদের জীবন থেকে চলে যাচ্ছি।
আমি বুঝে গেছি… সিয়াম যদি তোমার পাশে থাকে, তুমি পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ হবে।
আর আমার থাকা মানেই তোমাদের সুখে একটা দাগ লাগা।
শুধু একটা কথা… নিজেকে সামলে রেখো। বিশেষ করে কবিতা ভাবির কাছ থেকে।
সে ভীষণ ভয়ংকর। নিজের স্বার্থের জন্য সে সবকিছু করতে পারে।
তুমি আর সিয়াম… সারাজীবন সুখে থেকো।
ইতি,
তোমাদের ভালোবাসার পথের কাঁটা
জেরিন
চিঠি টা পড়ে শাপলার মন টা খারাপ হয়ে গেল।

রাত এখন দশটা ছুঁই ছুঁই।
ঘরের বাইরে শহরটা ধীরে ধীরে নিস্তব্ধ হয়ে আসছে, অথচ নিরব এখনো জেগে আছে নীলচে ল্যাপটপের আলো।
বিছানার এক কোণে হেলান দিয়ে বসে আছে নিরব। গায়ে অ্যাশ রঙের টিশার্ট, পরনে কালো ট্রাউজার। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করতে চুলগুলো এলোমেলো হয়ে কপালে এসে পড়েছে। এই অগোছালো চেহারাতেই তাকে অদ্ভুত রকমের হ্যান্ডসাম লাগছে—যেন ক্লান্তিতেও একটা আলাদা মায়া লুকিয়ে আছে।
হঠাৎ দরজায় মৃদু টোকা পড়লো।
“ভাইয়া, ভিতরে আসবো?”
কণ্ঠটা শুনেই নিরব বুঝলো শাপলা এসেছে। মাথা না তুলেই বলল,
“হ্যাঁ, আয়।”
শাপলা গুটি গুটি পায়ে ঘরে ঢুকলো। বিছানার এক কোণে চুপচাপ বসে পড়লো। চোখে কিছু বলার কৌতূহল, ঠোঁটে প্রশ্নের কাঁপুনি।
ঠিক এখনই নিরবের ফোনটা বেজে উঠলো।
স্ক্রিনে ভাসমান নামটা দেখে নিরবের ঠোঁটে এক ঝলক হাসি ফুটলো।
“হ্যালো,” গলার স্বরটা নরম হয়ে এলো।
ওপাশ থেকে ভেসে এলো মিষ্টি মেয়েলি কণ্ঠ,
“হ্যালো, কি করেন এখন?”

“এই তো বসে আছি। তুমি কি করো?”
“কিছু না।”
শাপলা এতক্ষণ চুপ করে বসে সব শুনছিল। হঠাৎ সে সোজা হয়ে বসে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলো,
“ভাইয়া, এই কি আপনার সেই ভালোবাসার মানুষ?”
নিরব চমকে তাকালো। ফোনটা একটু দূরে সরিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“হ্যাঁ… এই-ই সে।”
শাপলার চোখ চকচক করে উঠলো।
“আমি কথা বলতে চাই ওনার সাথে।”
নিরব হালকা হেসে ফোনের ওপাশে বলল,
“এই যে, তোমার সাথে একজন কথা বলতে চায়।”
“কে সে?”
“ওই যে, শাপলার কথা বলেছিলাম না? ওই শাপলা।”
“আচ্ছা, দেন কথা বলি।”
নিরব ফোনটা শাপলার হাতে ধরিয়ে দিয়ে সতর্ক করলো,
“এই নে কথা বল। তবে শোন, অদ্ভুত কিছু জিজ্ঞেস করবি না। শুধু ভালো-মন্দ জিজ্ঞেস করবি। মনে থাকে যেন?”

শাপলা মুখ বাঁকিয়ে বলল,
“আচ্ছা ঠিক আছে।”
ফোন কানে দিতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো,
“হ্যালো?”
“হ্যালো, কেমন আছেন?” শাপলা জিজ্ঞেস করলো।
“ভালো আছি। তুমি কেমন আছো?”
“এই তো ভালো আছি। আচ্ছা, আপনার নামটা কী?”
প্রশ্নটা শুনেই নিরবের কপালে ভাঁজ পড়লো। সে চোখ পাকিয়ে শাপলার দিকে তাকালো।
শাপলা পাল্টা মুখ ভেংচি কেটে ফোনের দিকে মন দিলো।
ওপাশ থেকে চুমকি হেসে বলল,
“কেন, নিরব ভাইয়া তোমাকে আমার নাম বলেনি?”
“না তো। অনেকবার জিজ্ঞেস করেছি, বলেনি।”
“ঠিক আছে, আমি নিজেই বলছি। আমার নাম চুমকি।”
শাপলার ঠোঁটে এক চিলতে দুষ্টুমির হাসি।
“আচ্ছা, একটা কথা জিজ্ঞেস করি?”
“হুম, করো।”

“নিরব ভাইয়াকে আপনার কাছে কেমন লাগে?”
চুমকি মুচকি হেসে বলল,
“কেমন আবার লাগবে? যেমন লাগার কথা, ঠিক তেমনই লাগে।”
শাপলা চোখ বড় বড় করে ফোনটা কান থেকে একটু সরিয়ে নম্বরটা ভালো করে দেখে নিলো।
ঠিক তখনই নিরব ছোঁ মেরে ফোনটা কেড়ে নিলো।
“আচ্ছা, এখন রাখি। পরে কথা হবে,” বলে লাইন কেটে দিলো।
শাপলা রেগে গিয়ে বলল,
“আপনি আমার কাছ থেকে ফোনটা কেড়ে নিলেন কেন? ধ্যাত! আপনার সাথে আর কখনো কথা বলবো না!”
এই বলে সে উঠে দাঁড়িয়ে রুম থেকে বের হয়ে গেল।
নিরব পেছন থেকে কয়েকবার ডাকলো,
“শাপলা… শাপলা শোন!”
কিন্তু শাপলা একবারও ফিরে তাকালো না। রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে চলে গেল।
ঘরটা আবার নীরব হয়ে গেল।
ল্যাপটপের আলো, নিরবের এলোমেলো চুল, আর দরজার ওপাশে মিলিয়ে যাওয়া শাপলার ছায়া—সব মিলিয়ে রাতটা যেন একটা অসমাপ্ত গল্পের মতো থমকে রইলো।

শাপলা গুটি গুটি পায়ে হেঁটে সিয়ামের রুমের পাশ থেকে চলে যাচ্ছে , হঠাৎ একটা টান—সিয়াম তার হাত ধরে এক ঝটকায় ঘরের ভেতর নিয়ে এলো।
শাপলা ভয়ে শিউরে উঠলো। চিৎকার করতে যাবে, তখনই সিয়ামের উষ্ণ আঙুল এসে ছুঁয়ে দিলো তার ঠোঁট।
“চুপ কর, শাপলা,” ফিসফিস করে বলল সে, কণ্ঠে এক অদ্ভুত আবেগ মিশে।
শাপলা নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলো তাকে।
“উফ্! আপনি। আর একটু হলেই আমার প্রাণ বেরিয়ে যেতো।”
সিয়াম শাপলার কথায় কান দিলো না। বরং নিঃশব্দে দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিলো।
শাপলার বুকের ভেতর কেঁপে উঠলো।
“একি! দরজা বন্ধ করলেন কেন?”
সিয়াম ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। চোখে তার দীর্ঘদিনের দমে রাখা আ*কা*ঙ্ক্ষা*র আ*গুন।
“তোর সাথে আজকে বা*স*র করবো, শাপলা। বিয়ে হয়েছে কতদিন, অথচ এখনো সেই রাতটা অধরা রয়ে গেলো। এটা কি ঠিক?”
শাপলা পিছিয়ে যেতে যেতে বলল,
“আপনি কি সব ভুলে গেলেন? বিয়ের আগে আমি কী বলেছিলাম আপনাকে?”

সিয়াম একদম কাছে এসে দাঁড়ালো। তার নিঃশ্বাস শাপলার কপালে, গালে লেগে যাচ্ছে।
শাপলার বুক ধড়ফড় করছে, ঠোঁট কাঁপছে অজানা অনুভূতিতে।
এক টানে সিয়াম তাকে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নিলো।
“আমি কিছু ভুলিনি। সব মনে আছে। কিন্তু তোকে কা*ছে পেতে ইচ্ছে করে। তোর সাথে কথা বলতে, তোকে ছুঁ*তে, তোর চোখে নিজেকে দেখতে ইচ্ছে করে। আমি নিজেকে আর ধ*রে রাখতে পারছি না।”
শাপলার কান গরম হয়ে উঠলো। লজ্জায় গাল দুটো র*ক্তিম হয়ে গেল কাঠগোলাপের মতো।
সে কাঁপা কাঁপা স্বরে বলল,
“আমি… আমি এখনো এসবের জন্য প্রস্তুত না।”
সিয়াম তার কপালে আলতো করে কপাল ঠেকালো।
“আমি তো প্রথম দিন থেকেই প্রস্তুত, যেদিন তোকে দেখে মন হারিয়েছি।
আমি চাই তোর প্রতিটি নিঃশ্বাসে আমার নাম থাকুক। তোকে আ*দরে ভরিয়ে দিতে চাই, যেন তুই ভুলে যাস দুনিয়ার সব কিছু।”
কথা শেষ হতেই সে ধীরে ধীরে শাপলার ঠোঁট ছুঁয়ে দিলো।
প্রথমে নিঃশব্দ, কোমল… তারপর ধীরে ধীরে গভীর।

শাপলা পাথরের মতো স্থির হয়ে গেল। শরীর অবশ, মন এলোমেলো।
সিয়ামের স্প*র্শে তার ভেতরটা কেঁপে উঠছে। নিজেকে মা*তাল মনে হচ্ছে, ইচ্ছে হচ্ছে সব বাধা ভেঙে তার কাছে ধরা দিতে।
সিয়াম ধীরে ধীরে তার গাল, কানের লতি ছুঁয়ে নেমে এলো গলায়।
শাপলা ঠোঁটে কামড়ে নিজেকে সামলালো।
তারপর এক ঝটকায় তাকে সরিয়ে দিয়ে হাঁপাতে লাগলো।
সিয়াম চোখে আকুলতা নিয়ে তাকিয়ে বলল,
“উফ্, সরিয়ে দিলি কেন? আজ আর নিজেকে আটকে রাখতে পারবো না, শাপলা।
আজ তোকে চিরদিনের মতো নিজের করে নিতে চাই।”
শাপলা মাথা নিচু করে বলল,
“না… আমি এখনো তৈরি নই।”
“কেন? আমার ছোঁ*য়া তোর ভালো লাগে না?” সিয়ামের কণ্ঠে অভিমান।
শাপলা চুপ।
সিয়াম আবার জিজ্ঞেস করলো,
“কিরে, চুপ করে আছিস কেন? কিছু বল।”

হঠাৎই শাপলা এগিয়ে এসে সিয়ামের ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে দিলো।
একটা ছোট, কিন্তু গভীর স্প*র্শ।
সিয়াম হতবাক হয়ে গেল।
শাপলা ধীরে সরে এসে ফিসফিস করে বলল,
“আশা করি উত্তর পেয়ে গেছেন।”
এই বলে সে দরজা খুলে বেরিয়ে গেল, পেছনে ফেলে গেল একরাশ ধুকপুক করা নিঃশ্বাস।
সিয়াম দরজার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো।
তারপর ধীরে দরজা বন্ধ করে বিছানার দিকে এগিয়ে গেল।
বিছানায় ঝাঁপিয়ে পড়ে বিড়বিড় করলো,
“তুই যেদিন নিজেকে পুরোটা আমার কাছে সঁপে দিবি, সেদিন থেকে তোর প্রতিটা রাত হবে বা*সর রাত।
আমি তোকে এমনভাবে ভালোবাসবো, এমনভাবে আগলে রাখবো… যে তুই চাইলেও আর কখনো আমার কাছ থেকে সরে যেতে পারবি না।”
শাপলা হাঁপাতে হাঁপাতে নিজের ঘরে ঢুকলো। পেছন ফিরে দ্রুত দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিলো, যেন বাইরে পড়ে থাকুক সব উ*ত্তে*জ*না, সব অস্থিরতা।
বুকটা এখনো ধড়ফড় করছে।
গাল দুটো লাল, নিঃশ্বাস ভারী।
দেয়ালে হেলান দিয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো সে।

তারপর ধীরে ধীরে বিছানার দিকে এগিয়ে গিয়ে নিজেকে এলিয়ে দিলো নরম বালিশের ওপর।
চোখ বন্ধ করতেই আবার ভেসে উঠলো সেই মুহূর্তগুলো—সিয়ামের উত্তপ্ত নিঃশ্বাস, তার দৃঢ় স্পর্শ, আর নিজের ভেতর জেগে ওঠা অচেনা শিহরণ।
শাপলা বিড়বিড় করে বলল,
“উফ্… আর একটু হলেই নিজেকে সামলাতে পারতাম না।
কত কষ্ট করে নিজেকে বেঁধে রাখলাম।”
কথাটা বলেই সে বালিশে মুখ গুঁজলো।
বুকের ভেতরটা এখনো অশান্ত, কিন্তু শরীরটা ক্লান্ত।
ধীরে ধীরে চোখের পাতা ভারী হয়ে এলো।
রাতের নিস্তব্ধতায়, সেই অসমাপ্ত আবেগটাকে বুকের ভেতর চেপে রেখে,
শাপলা একসময় ঘুমিয়ে পড়লো।
রাত গভীর। একটা বিকট শব্দে ঘরের দরজা কেঁপে উঠলো, তারপর ভেঙে পড়লো ভেতরে।
ধুলোর ঝাপটার ভেতর দিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো এক ছায়ামূর্তি—মুখে কালো মুখোশ, চোখ দুটো শীতল, নি*র্ম*ম।
শাপলা চমকে উঠে তাকালো।
গলা শুকিয়ে কাঠ।চিৎকার করতে চাইলো, কিন্তু গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। হাত-পা অবশ, বিছানা ছেড়ে ওঠার শক্তিটুকুও যেন হারিয়ে গেছে।
মুখোশধারী লোকটা নিঃশব্দে এগিয়ে এলো।
পায়ের শব্দ নেই, শুধু নিঃশ্বাসের ভারী শব্দ ঘরের নিস্তব্ধতা চিরে ফেলছে। এক ঝটকায় তার শক্ত হাত এসে চেপে ধরলো শাপলার গলা। ঠাণ্ডা আঙুলগুলো যেন লোহার বাঁধন।
শাপলা ছ*টফট করতে লাগলো। বাঁ*চার জন্য হাত-পা ছুঁ*ড়লো, কিন্তু কোনো লাভ হলো না।

রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ২৮

চোখ দুটো ধীরে ধীরে উ*ল্টে যাচ্ছে।
বুকের ভেতর দ*ম বন্ধ হয়ে আসছে।
প্রা*ণটা এই বুঝি বে*রিয়ে যাবে—এমন এক নীরব মৃ*ত্যু*র ছায়া নেমে এলো চারদিকে।
ঘরটা এখনো নিঃশব্দ।
শুধু শাপলার বুকের ভেতর বাজচ্ছে একটাই প্রশ্ন
“আমি কি এখানেই শে*ষ হয়ে যাবো?”

রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ৩০

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here