Home রৌদ্রময় বালুচর রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ২১

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ২১

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ২১
সোহানা ইসলাম

কলেজ শেষ হতেই তিন বান্ধবী — মিম, জারা আর ফিহা — প্রতিদিনের মতো গাড়ি নিয়ে নদীঘাটে পৌঁছালো। ওদের বাড়ি নদীর ওপারে, তাই নৌকায় পার হতে হয়। গরমের দুপুর, নদীর ঠান্ডা হাওয়া মন ভালো করে দেয়।
নৌকা এখনও ঘাটে এসে পৌঁছায়নি, হঠাৎ ফিহার চোখ পড়লো এক পরিচিত মুখের দিকে — জাহেদ। আজকে যে তার জাহেদ খান এর সাথে দেখা হয়ে যাবে তা কিছুটা অপ্রত্যাশীত।
জাহেদ একটু দ্বিধা নিয়ে ফিহার দিকে এগিয়ে এলো।

__ “একটু কথা বলতে পারি তোমার সাথে, আলাদা করে?” জাহেদের কণ্ঠে ছিল একরকম সংযত আত্মবিশ্বাস।
মিম আর জারা দুজনেই ফিহার দিকে তাকালো প্রশ্নবোধক চোখে। ফিহার মুখে হালকা বিস্ময়, তবে সে হেসে মিম আর জারাকে বলল,
— “তোরা একটু ঐ পাশটায় দাঁড়া তো, আমি আসছি।”
মিম একটু খুশি, একটু কৌতূহলী। জারা কানে কানে বলল,
— “কাল তালহে কিছু হয়েছিলো বুঝলি কিছু জানু। “”
” জারা :- আমারও তাই মনে হয় । ”
মিম হেসে বলল,
— “আমরা কী করবো এখন? ওরা কথা বলুক, আমরা তো আর ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে পারি না!”
চল অন্য দিকে গিয়ে দাড়াই।।” তাদের কাছে থেকে কিছু টা দূরে এসে দাঁড়ায় মিম আর জারা।
জারাও হটাৎ আরমানের বলা কথা মনে পরে যায়। তাকে বলেছিলো রাতে, কলেজ ছুটির পর বটগাছ তলায় দাঁড়াতে। কিন্তু তার মন খচখচ করছে। ওই শয়তান লোকটার সাথে দেখা করতে মন সায় দিচ্ছে না জারা’র।
তারা ধীরে ধীরে কিছুটা দূরে গেলো, কিন্তু ফিহা আর জাহেদকে এক চোখে খেয়াল রাখতেও ভুললো না তারা দু’জন।
ওদিকে জাহেদ বলল,

— “আমি জানি, আমরা ঠিক চিনে উঠিনি একে অপরকে। কিন্তু তুমি আমার মনোযোগ কেড়েছো নিয়েছো কটকটি। ”
ফিহা একটু লাজুক, কিন্তু চমকে ওঠার অভিনয় করলো না।
— “আপনি ঠিক কী বলতে চাচ্ছেন জাহেদ খান !”
জাহেদ হেসে বলল,
— ” বলতে চাইছি, তোমার সাথে দুষ্টু মিষ্টি প্রেম করতে চাই কটকটি।”
জাহেদের এমন কথায় যেনো সে আকাশ থেকে ধপাস করে করেছে। এই হাঁদারাম জাহেদ খান তাকে ডিরেক্ট প্রপোজ করে ফেলো। কিন্তু পাওা দিলো না ফিহা। রসিকতা করে বলে –” দেখেন ভাইয়া বিয়ে করার বয়সে প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে লজ্জা দিবেন না ”
ফিহার মুখ থেকে ভাইয়া ডাক শুনে চোয়াল ঝোলে যায় জাহেদের। সে কী সুন্দর করে প্রপোজ করলো তার এই কটকটি তার বারোটা বাজিয়ে দিলো।

” হতে এসেছি ছাইয়া আর বানিয়ে দিলে ভাইয়া। সবই কপাল এর খেলা। ”
ফিহা আর কিছু বলল না। জাহেদের কথা কে একপ্রকার পাওা না দিয়ে চলে আসে
মিম আর জারা কাছে । ফিহা আসতেই তারা তাকে খুঁচানো শুরু করে এটা সেটা বলে।
” জারা :- কী জানু ? কী কথা হলো? ”
” মিম :- হ্যা.. হ্যা বল যার সাথে কথা বলতে গেলে ঝগড়া বেদে যায় তোর। আর কাল রাতে কী এমন হলো। আজ একেবারে পারসোনালি ভাবে কথা বলতে চলে আসলো?? ”
ফিহা লজ্জা পাচ্ছে। তাদের কথায় গাল লাল হয়ে যায় তার। কী করে বলবে তাদের ওই জাহেদ খান তাকে প্রপোজ করেছে? তার তো লজ্জা করে না কি। তাই কথা ঘুরাতে বলে –” এখন বাড়ি চল। রাতে ফোনে বললো সবটা তোদের । ”
” কী রে লজ্জা পাচ্ছিস মনে হচ্ছে ?বললো জারা”
” হ্যা দেখ আবার কেমন কথা গুরাচ্ছে এই ছেমরি। বললো মিম ”
এখন এই নিয়ে বিরক্ত করলে সত্যি আর বলবো না কিন্তু। চল এখন বাড়ি। কিছু টা রাগ ও লজ্জা মিশ্রিত কন্ঠে বলে ফিহা।

“আচ্ছা রাগ করিস না জাহেদ ভাইয়ার কটকটি ” দাঁত কেলিয়ে বলে মিম।
মিমের দিকে চোখ পাকিয়ে তাকায় ফিহা।
” আচ্ছা আচ্ছা চল আর বলবো না এসব ” মিম
জারা কিছু একটা ভাবে মিম আর ফিহা কে বলে –” তোরা দুজন চলে যা আমি আরও পরে যাব ”
মিম জারা’র কথায় অবাক হয়ে বলে –” তুই আবার পরে কেনো যাবি? এখানে কী কাজ আছে তোর? ”
ফিহাও এবার সুযোগ বোঝে জারা’র মজা উরিয়ে বলে –” আরে বোঝলি না তুই? গুড নাইট, গুড নাইট বলেছে বটগাছ তলায় দাঁড়াতে। তাই তো পরে যাবে ”
” ওওওও আচ্ছা ! আমিতো ভুলেই গিয়েছিলাম
চল তাহলে আমার চলে যাই,এখানে থেকে আমাদের আর কোনো কাজ নেই ভাই। ”
এই বলে চলে যায় সেখান থেকে মিম আর ফিহা।

বটগাছটা বিশাল। অনেক পুরোনো। তার ডালে-পাতায় কালের যত্ন, শিকড়ের গভীরে ইতিহাস। এমনকি লোকমুখে শোনা যায়, এই গাছের নিচে অনেক প্রেম শুরু হয়েছে, আবার অনেকে এখানেই ভালোবাসার শেষ দেখেছে।
আজ দুপুরের তীব্র রোদেও বটগাছটা যেন নিজের বিশাল ছায়া দিয়ে আশ্রয় দিয়েছে জারাকে। তার চোখে ক্লান্তি, তবুও এক ধরনের শান্ত ধৈর্য। তার কেনো যেনো মন বলছে জারা তুই একবার অপেক্ষা করে যা ওই লোকটার সাথে। সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে, বারবার মোবাইলের স্ক্রিনে তাকায়, সময় দেখে। দুইটা থেকে এখানে দাড়িয়ে আছে এখন ৩:৩৯বাজে।
লোকটা তো বলেছিল তাকে , ” কলেজ ছুটির পর বটগাছের নিচে দাড়ানোর জন্য। তাহলে এখনো আসছে না কেনো?”

আরও কিছু সময় অপেক্ষা করে মোবাইলের স্ক্রিনে সময় দেখে। ৪:১০ টা বাজে।
জারা একাই দাড়ায়ি আছে সেই পুরোনো বটগাছটার নিচে। তার মন কতো বারন করলো জারা তোর দাঁড়ানোর দরকার নেই। লোকটার সাথে তোর কোনো সম্পর্ক নেই, কোন কারণে লোকটার কথা মেনে তুই দাঁড়াবি? কলে হয় লোকটা তোর। কিন্তু জারা মনকে শক্ত করে নিজেই বোঝ নেই হয়তো আমার অপেক্ষা করা প্রয়োজন। মনের কথা না শুনে অপেক্ষা করছে আরমান এর জন্য ?,
ঘড়ির কাঁটা যেন আজ শুধু জারার জন্যই চলে।
হয়তো একসময় বিশ্বাস করেছিল —
আরমান আসবে, অবশ্যই আসবে।
সে ব্যস্ত মানুষ যদিও আসতে দেরি হবে,তাকে যখন বলছে দাড়াতে তাহলে আসবে।
কিন্তু অনেকটা সময় যাওয়ার পর যখন আরমান আসে না তখন জারার বুকের ভেতর শব্দহীন একটা ধাক্কা লাগে, তখন
বিশ্বাস নিজেই নিজের কাছে প্রশ্ন তোলে।

হাওয়া বইছে ধীরে ধীরে,আর জারা নিজের ঠোঁট চেপে ধরে — যাতে চোখের জল মুখে না নেমে আসে।সে চুপচাপ উঠে দাঁড়ায়।অপেক্ষা থেকে হাঁটা ধরে বাড়ির দিকে ফিরে আসে।
আর হেঁটে যেতে যেতে ভাবে…
আরমানের বলা কথা –” তোমার সাথে কথা আছে। অপেক্ষা করবে আমার জন্য। ”
এই ‘কথা আছে ‘শব্দটা জারার মনে গেঁথে গিয়েছিল।হয়তো এটুকু ভরসাই মানুষকে অনেকখানি নরম করে দেয়।
আরমান না আসায় জারা’র অনেক কষ্ট হচ্ছে। কেনো কষ্ট হচ্ছে তা সে যানে না। আগে কখনো তার সাথে এমন টা হয় নি। চোখের কোনে এসে অশ্রু মজা হয় জারা’র।
মনে মনে ভাবে –” আমি তো আর ইচ্ছে করে অপেক্ষা করতে চাই নি। ওই শয়তান লোকটার কথা মতো এসেছিলাম আমি। আমাকে অপেক্ষায় রেখে ওই শয়তান লোকটা আসলো না। আর কখনো ওই লোকটার কথা শুনবো না আমি। কথা ও বলবো না আর ওই শয়তান লোকটা সাথে।ফোন ও ধরব না। ”
জারার অজানা এক অভিমান জন্ম হলো আরমানের প্রতি। আবার ভাবে লোকটা কে, যার সাথে সে অভিমান করবে? লোকটা তো তার কেউ হয় না।। অভিমান করে লাভ কী তার?
এমন হাজার টা ভাবনা মাথায় নিয়ে বাড়ি চলে আসে জারা। শরীর ক্লান্ত, মন ভালো না সব মিলেয়ে মাথা টা চিনচিন ব্যথা করছে। এই ব্যথা দীর্ঘস্থায়ী হতে দেওয়া যাবে না। একটা লম্বা গোসল দরকার ক্লান্তি দূর করার জন্য। তাই গোসল করার জন্য চলে যায়। ফ্রেশ হয়ে এসে ড্রইং রুমে বসে। কিন্তু আজ আর টিভি অন করল না।

মারজিয়া বেগম লক্ষ করেছেন কলেজ থেকে আসার পর থেকে,
জারার মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে আছে, চোখ দুটো লাল। মুখে কোনো কথা নেই, চুপচাপ হয়ে আছে আজ, অন্য দিন তো এসেই জোহানের খুঁজ করে। তাহলে আজ কী হলো? বাড়িও ফিরলো দেরি করে।মেয়ের মন খারাপ মারজিয়া বেগম তা দূর থেকেই বুঝলেন।
তিনি ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে জারার পাশে বসলেন। কাঁধে হাত রাখলেন স্নেহভরে।
” কী হয়েছে মা! এমন মন খারাপ কেনো? আর আজ কলেজ থেকে আসতে এতো দেরি হলো কেন? ”
জারা প্রথমে কিছু বলল না। কী বা বলবে সে? কিন্তু মায়ের কোমল কণ্ঠে কিছুটা সান্ত্বনা পেল যেন। চোখে জল জমে উঠেছে।

মারজিয়া বেগম মেয়েকে নিজের বুকে টেনে নিলেন। শান্তনা দেওয়ার জন্য বলেন ___” দেখ মা, আমি যানি না তোর মন খারাপ কেনো? তুই এখন বড় হচ্ছিস, হাজার টা বাধা আসবে, মানুষ নানা কথা বললে, রাস্তার বখাটে ছেলেরা খারাপ ইঙ্গিত করবে তাই বলে নিজেকে দূর্বল ভাবা চলবে না। মন খারাপ এর কারণ যদি না বলতে চাস তাহলে বলতে হবে না। কিন্তু মা সবসময় পাশে আছি তোর। ” মায়ের কথা শেষ হতেই জারা মাথা উচু করে মায়ের মুখের দিকে তাকায়।
“আচ্ছা তাহলে বসে টিভি দেখ আমি তোর জন্য তোর পছন্দের খাবার রান্না করে নিয়ে আসছি। ”
কী বলবে জারা? সে তো ঠিক নিজেই যানে না তার মন খারাপ কেনো? কিন্তু এটা ঠিক যে, আরমান কথা আছে বলে তাকে অপেক্ষা করিয়ে আসেনি বলে মন খারাপ। কিন্তু এটা তো আর মা’কে বলতে পারবে। বিষয় টা কেমন অযুক্তিক।
তারপর তিনি মেয়ের প্রিয় খাবার রান্না করতে গেলেন—খিচুড়ি আর বেগুন ভাজি। তিনি জানেন, ছোটবেলা থেকেই এই খাবার জারার মন ভালো করে দেয়।

রাত ১০ টা বাজে। আরমান জারাকে সেই সন্ধা থেকে ফোন করছে। কিন্তু জারা কল ধরছে না।
এই পর্যন্ত আরমান জারাকে ২০০+ কল ও ৫০ টার মতো মেসেজ পাঠিয়েছে। কিন্তু কোনো রেসপন্স আসছে না জারার কাছে থেকে। বারবার এর মতো শূন্য তার চেষ্টা।
আরমানের সকালটা শুরু হয় ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে দৌড় দিয়ে। কাগজপত্র, মিটিং, ফোনকল—সব মিলিয়ে যেন তার একটুও নিঃশ্বাস ফেলার সময় নেই। ইন্জিনিয়ার এসেছে আজ, তাদের সাথে জমি, বিল্ডিং এর নকশা তৈরি নিয়ে ব্যস্তায় কাটে তার। এখানে এটা তাদের নতুন ব্রাঞ্চ তাই সবকিছু ঠিকঠাক থাকা চাই। অফিস সেটআপ—একটার পর একটা ঝক্কি।
এই ব্যস্ততার মধ্যেই কোথাও এক কোণে জমে আছে অপরাধবোধ—” জারাকে বলা কথা মনে পরে তার। ”
এতো বার কল, মেসেজ দেওয়ার যখন জারা কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে না, আরমান বোঝতে পারে জারার মন খারাপ।

মন খারাপ হবে নাই বা কোনো। তার জন্য মেয়েটা কতোটা সময় ধরে অপেক্ষা করেছে। সব কাজ কমপ্লিট করে ৫ টার দিকে আরমান বটগাছ তলায় আসে। কিন্তু জারা কে পায়নি সে, তাই ঘাটে থাকে দোকানদার কে জিজ্ঞেস করে যানতে
পারে জারা প্রায় ২ ঘন্টার মতো তার জন্য অপেক্ষা করছে।

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ২০

আরমান আবারও মোবাইলটা হাতে নিয়ে কল করে জারা’কে। শেষ চেষ্টা যাকে বলে। এই কল টা রিসিভ না করলে কাল মজা বোঝাবে সে হাফ ইঞ্চি মেয়ে কে।
আরমান এর শেষ চেষ্টা টা বিফলে যায়নি। কল টা এবার রিসিভ করেছে জারা। তাই সময় ব্যয় না করে তাড়াতাড়ি করে বলে —-” হ্যালো ”

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ২২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here