Home রৌদ্রময় বালুচর রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ২৫

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ২৫

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ২৫
সোহানা ইসলাম

রাত ১২:২০।জারার ব্লক করে দেওয়ার পর কিছু সময় আরমান নিঃশব্দ ছিল।তারপর আচমকা যেন বিস্ফোরণ।ফোনটা ছুঁড়ে ফেলে দেয় বিছানায়।টেবিলের পাশে থাকা পানির বোতল, ফাইল, ঘড়ি—সব ছুঁড়ে ফেলে দেয় মাটিতে।
আরমান চিৎকার করতে চায়, কিন্তু গলায় যেন কিছু আটকে গেছে।দরজা লাগিয়ে ধপ করে বসে পড়ে মেঝেতে।সিগারেট বের করে আগুন ধরায়,
ধোঁয়া ছাড়ে—রাগে, অপমানে, না-পাওয়ার যন্ত্রণায়।”
“সত্যি তো আমি কে? তার সাথে এতো অধিকার ফলাবার। বাজে কথা বলার? কিন্তু আমি তো ওকে ভালোবাসি? ”
নিজের মুখে বলেই যেন নিজের মুখে থাপ্পড় মারে।ঘুষি মারে দেয়ালে।একটু রক্ত আসে, কিন্তু তার চেয়ে বেশি ঝরে পড়ে ভেতরের ক্ষোভ।
রাতটা কাটে ধোঁয়ার ভেতর, ভাঙা জিনিসের শব্দে, আর একরাশ অপরাধবোধে।

সকাল ৮:০২। জারা আর তার দুই বান্ধবী কলেজের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে।
জারা শান্ত, কিন্তু চোখেমুখে একধরনের ঠান্ডা কষ্ট।পেছনের রাতের ঘটনাটা এখনো মন থেকে মুছে যায়নি।ঘাটের কাছে হঠাৎ করেই জারা দেখে—আরমান দাঁড়িয়ে আছে।
চোখ লাল, গালের পাশে একটা আঁচড়ের দাগ, কাপড় একটু এলোমেলো। হাতে সিগারেট ছিল, কিন্তু তাকে দেখে সেটা ছুঁড়ে ফেলে দেয় পেছনে।
আরমান এগিয়ে আসে তাদের দিকে। কিছু বলতে চায় সে। কিন্তু জারা আরমানকে দেখে এক পা পিছিয়ে যায়।
তাদের সামনে আরমান কে দাঁড়িয়ে থকতে দেখে ফিহা জিজ্ঞেস করে –” ভাইয়া আপনি এখানে? কিছু বলতে চান?”
জারা হটাৎ ঠাণ্ডা গলায় বলে, ” ফিহা চল তাড়াতাড়ি আমাদের ধেরি হয়ে যাচ্ছে। ”
আরমান তাকিয়ে থাকে জারা’র দিকে। চোখে একরাশ অনুনয়, কণ্ঠে কিছু বলার চেষ্টা।

“হা হাফ ইঞ্চি মেয়ে… একটু শোনো… প্লিজ…”
কিন্তু জারা তাকায় না।হাঁটতে হাঁটতে নিজের মনে ফিসফিস করে বলে–“যে মানুষ আমার চরিএ নিয়ে কথা বলে, কোনো সম্পর্ক ছাড়া তুইতোকারি করে তার সাথে আমার কোনো কথা থাকতে পারে না। ”
আরমান দাঁড়িয়ে থাকে নীরব হয়ে।সেই মুহূর্তে ওর মাথার ভেতর একটাই কথা ঘুরে ফিরে বাজে—
আমি তো ওকে ভালোবাসি, তাহলে কি করে পারলাম তাকে এতো কষ্ট দিতে, বাজে কথা বলতে ?”
জারা চলে যায়।আরমান দাঁড়িয়ে থাকে ঘাটে,
হাতে আগুন নিভে যাওয়া সিগারেটের ছাই,আর মনে এক অব্যক্ত পোড়া গন্ধ।

কলেজ চত্বরে আলো-ছায়ার খেলা, বাতাসে হালকা ঠান্ডা ভাব। কলেজ ছুটির পর তিন বান্ধবী মাঠ দিয়ে হাঁটছে। কিন্তু জারার চোখেমুখে গুমোট একটা অন্ধকার। মুখে কোনো কথা নেই, চোখে ঝাপসা ক্লান্তি।মিম আর ফিহা দুই পাশে হাঁটছে, কিন্তু তেমন কিছু বলছে না—জারার মুখ দেখে ওরা বুঝে গেছে, ভেতরে কিছু একটা ঠিক নেই।
মাঠের এক কোণে এসে হঠাৎ জারা দাঁড়িয়ে যায়। মাথা নিচু।মিম ধীরে ধীরে বলে ওঠে — “জারা, তোর মুখটা এমন শুকনো কেন? কি হইছে? রাতে ঠিকঠাক ঘুমাসনি নাকি?”
জারা চুপ।
ফিহা আরও কাছে গিয়ে বলে— “তুই কথা বলছিস না কেন জানু ? দেখ, আমাদের থেকে কিছু লুকাস না।”
জারা কিছু বলতে গিয়েও থেমে যায়। হঠাৎ করে চোখ ফেটে জল চলে আসে। সে মুখ ঘুরিয়ে কান্না চাপতে চায়, কিন্তু পারে না। কেঁদে ফেলে।
মিম আর ফিহা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়।
মিম ঘাবড়ে গিয়ে বলে— “জারা! প্লিজ, কাঁদিস না! বল, কী হইছে?”
ফিহা উত্তেজিত গলায় বলে — “আরমান ভাইয়াকে তুই আজ এমন করে এড়িয়ে আসলি কেন? কাল তোকে ওই ভাবে নিয়ে গিয়ে কিছু বলেছিল ?”
জারা মাথা নাড়ে। জারা মাটির দিকে তাকিয়ে চোখ মুছে ধীরে বলে— “না… কিছু বলেনি।কিন্তু ”
মিম— “তাহলে?”

জারা অভিমানে, ভাঙা গলায় বলে — “কাল রাতে আমাকে অনেক গুলো কল, মেসেজ দিয়েছিল। কিন্তু আমি কোনো উত্তর দেয়নি। কেনো দিব, উনি কল দিলেই আমাকে ধরতে হবে কেন?উনি কে? আমি রিপ্লাই না দেওয়ায় যা মেসেজ করে পাঠায় এটা দেখে আমি হতবাক।”
ফিহা চিন্তিত হয়ে— “কি বলেছে?”
জারা কান্না চেপে, গলা শক্ত করে বলে— “এতো রাতে আমি কোন না’গ’র এর সাথে কথা বলছি? যে উনার কল,মেসেজের উওর দিচ্ছি না?’আমার চরিত্র নিয়ে কথা তুলেছে, বুঝছিস?”
মিম রেগে বলে— “কি! এই কথা বলছে তোকে? দুই–তিন দিনের পরিচয়… আর এত বড় কথা?”
জারা চোখ মুছে, গম্ভীর গলায় বলে –” হুম! লোকটা খুব খারাপ। বাজে লোক,শয়তান লোক,খবিশ লোক একটা।
আরমানকে ইচ্ছে মতো বকে আবারও বলে –” আমিও তাকে ব্লগ করে দিয়েছি। কেনো এতো অধিকার ফলাবে আমার উপর? কোন সম্পর্কের ভিত্তিতে তিনি আমার সাথে এমন করবে? এমন আচরণ করে যেন আমি তার প্রেমিকা গালি। ”

ফিহা— “কিছু গোলমেলে লাগছে ।”
জারা ঠোঁট কামড়ে ধরে দাঁড়িয়ে থাকে তাদের পাশে।
মিম নরম গলায় বলে— “আর এখন আবার আসছে ডং করতে, তাই না?”
জারা হালকা হেসে, চোখে অশ্রু নিয়ে বলে — “হ্যাঁ… তখন দেখলি না কলেজে আসার সময় পেছনে ঘুরছে। চোখে মুখে ‘আমি ভুল করেছি’ টাইপ অভিব্যক্তি।”
ফিহা:— ” যাই বলিস না কেন। আমার মনে হয় আরমান ভাইয়া জারা’কে পছন্দ করে।
জারা চোখ তুলে,ফিহার কথায় চমকে উঠে জারা। স্থির গলায় বলে — “কী সব যা-তা বলছিস। দুই এক দিনে দেখা হওয়া মানুষকে কী ভাবে পছন্দ করতে পারে?
মিম সন্দেহভরা কন্ঠে ধীরে ধীরে বলে,— “জানু আমারও কেন যেন মনে হচ্ছে আরমান ভাইয়া তোকে পছন্দ করে।”
জারা মুখ ঘুরিয়ে নেয়। বিরক্ত, অভিমানী একটানা কণ্ঠে বলে,—” এসব যুক্তিহীন কথা আমার সামনে বলবি না তোরা।”

ফিহা শান্ত গলায়— “জারা, রাগ করিস না। কিন্তু আমরা তো গত ক’দিন দেখেছি, আরমান ভাইয়া ঘাটে দাঁড়িয়ে থাকে। কাল আবার তোকে কেমন করে নিয়ে গেছে নিজের সাথে, মনে হচ্ছে কেউ তার সম্পদের দিকে চোখ দিয়েছে?”
জারা মাথা নিচু করে। চোখে-মুখে অসহায় অভিমান।
জারা ভাঙা গলায় — “যদি পছন্দ করেই, তাহলে সেই মানুষটা এমন কথা বলে কিভাবে?”
মিম — “সবাই ভুল করে জারা। ”
ফিহা তখন একটু চুপ করে থেকে হালকা হাসে।
ফিহা চ্যালেঞ্জের মতো করে বলে — “ঠিক আছে, তাহলে একটা কথা শুন। যদি সত্যিই আরমান ভাইয়া তোকে পছন্দ করে… তাহলে আজ কলেজ ছুটির পর তোকে দেখার জন্য, তোর সাথে একবার কথা বলার জন্য, ঘাটে দাঁড়িয়ে থাকবে। যদি দাঁড়ায়… তাহলে তুই বুঝে নিবি, ওর অনুভূতি সত্যি ছিল। আর যদি না থাকে… তাহলে যা বলেছিস, ঠিক তাই ধরে নেব।”
মিম ফিহার কাঁধে হালকা ধাক্কা দিয়ে বলে –” আমাদের ফিহার এসব নিয়ে অনেক অভিজ্ঞতা আছে দেখছি? তুইও কী এইভাবে জাহেদ ভাইয়ার পরিক্ষা নিস। ”
জারা চুপ করে যায়। কিছু বলে না।
শুধু বাতাসে চোখ রাখে… তার মনেও একটা অজানা কাঁপুনি। সত্যিই কি আরমান আসবে?

সারাদিন ক্লাসের মধ্যেও জারার মন বারবার ছুটে গেছে একটাই জায়গায়—ঘাট।ফিহার বলা কথাটা যেন বারবার কানে বাজছে।“যদি সত্যিই পছন্দ করে, তাহলে আজ ছুটির পর ঘাটে দাঁড়িয়ে থাকবে। তোকে একবার দেখার জন্য… তোকে একবার কথা বলার জন্য…”
বেলা গড়িয়ে দুপুর হলো। কলেজ ছুটি হলো।
পিঠে ব্যাগ, মুখে অভিমান, বুকের ভেতর একরাশ জোয়ার-ভাটা নিয়ে জারা ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল ঘাটের দিকে।পা চলছিল, কিন্তু মনের ভেতরে হাজারো প্রশ্ন —”আসবে?”
ঘাটের গাছগুলোর ছায়া লম্বা হয়ে পড়েছে নদীর গায়ে। বাতাসে হালকা গন্ধ—অপেক্ষার, না বলা কথার। নৌকায় দাঁড়িয়ে ঘাটের শেষ মাথাটা চোখে পড়লো জারার।চোখ আটকে গেল।সে সত্যিই দাঁড়িয়ে আছে।”আরমান।”
চোখে লাজুক অনুতাপ, হাতে কিছু নেই—কেবল মুখে গুছিয়ে রাখা কিছু শব্দ, আর চোখে ভরা সত্যি অনুভূতি।
আরমান ধীরে পা বাড়ায়। মুখ নিচু।
আরমান ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে।চোখে অনুতাপ, মুখে কথা জমে আছে। জারা পেছন ফিরে চলে যেতে চায়। আরমান তাড়াতাড়ি করে জারা’কে পিছু ডাকে। গলায় অনুতপ্ততা মিশে আছে— “হাফ ইঞ্চি মেয়ে! শোনো ! শুধু একবার।”
জারা থামে না , হাঁটতে থাকে আরও জোরে।
আরমান অবিরত বলতে থাকে — “Please, don’t go. Just listen to me once, Jara… please.”

জারা ঠোঁট শক্ত করে বলে –” কি সমস্যা আপনার, রাস্তায় এমন বখাটে ছেলেদের মতো করছেন? ”
আরমান গলায় কাঁপুনি নিয়ে বলে —” আ আমি কাল ওইসব বলতে চাইনি। মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছিল তুমি ফোন ধরছিলে না দেখে। ভয় পেয়ে গিয়ে ছিলাম তু ‘তুমি যদি অন্য কাউকে প’ছ’ন্দ ক’ র? ”
জারা ধীরে ঘুরে তাকায়। চোখে অশ্রু, কিন্তু কণ্ঠে শক্তি— “তাহলে পছন্দ করলেই বা আপনার কী? আপনি কে হন আমার? আপনি এত অধিকার দেখান কেন?”
আরমান চুপচাপ মাথা নিচু করে বলে— “আমি জানি না।আমি কে… জানি না অধিকার কোথা থেকে এলো… শুধু এটা জানি—তুমি আমার। আর কারো না।”

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ২৪

জারা থমকে যায়। চোখের পলক পড়ে না।
আরমান ধীরে হাত বাড়ায়, জারার হাতে কিছু তুলে দেয়—এক গুচ্ছ ছোট ছোট চকলেট, আর ভাঁজ করা একটা চিরকুট। চকোলেটগুলোর গায়ে ছোট করে সাঁটানো কাগজে লেখা:
“একটা করে সরি—তোমার হাসির জন্য।”
চিরকুটটা কাঁপা হাতে খোলে জারা।
চিঠিতে লেখা ____

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ২৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here