Home রৌদ্রময় বালুচর রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৩১

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৩১

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৩১
সোহানা ইসলাম

আনিছুর রহমান যখন বিদেশে পারি জমালেন, তার মেয়ে জারার মুখে একটাই শখ—এক জোড়া খরগোশ। মেয়ের ইচ্ছে পূরণ করতে তিনি শখ করে কিনে দিয়েছিলেন দুইটা সাদা খরগোশ। তখন জারা ছোট, কিন্তু ছোট্ট হাতেই কী যত্ন করত সে! সকাল-বিকেল খাওয়ানো, পরিষ্কার করা—সব নিজ হাতে করত।
বছরের পর বছর সেই খরগোশগুলো জারার আপনজন হয়ে গিয়েছিল। মাঝে মাঝে বাচ্চাও দিত তারা। কিন্তু দুর্ভাগ্য… সেই বাচ্চাগুলো কোনো না কোনো কারণে বাঁচত না। এক এক করে সব মরে যেত। তবু শেষবার যখন তিনটা বাচ্চা বেঁচে গেল, জারা বুক ভরে আশায় ছিল—‘এবার হয়তো থাকবে।’
কিন্তু আজ… সব ওলটপালট হয়ে গেল। আরমান, , সেই তিন বাচ্চার মাকেই মেরে ফেলল!
জারার বুকটা যেন হাহাকার করে উঠল। তার কোলের মধ্যে ছোট্ট প্রাণীটা নিথর হয়ে পড়ে আছে। চোখ ভরে জল, কান্নায় বুক ফেটে যাচ্ছে। সে শব্দে ভরে উঠল উঠোন।

___“আপনি এটা কী করলেন,? এটা আমার বাবার দেওয়া শেষ স্মৃতি ছিল!”জারার কণ্ঠে রাগ, অভিমান, আর অসহায় কান্নার মিশ্রণ।
আরমান দাঁড়িয়ে আছে কিছুদূরে, দাঁত কিড়মিড় করছে, মুষ্টিবদ্ধ হাত। তার মাথার ভেতর যেন ঝড় বইছে। “এই মেয়েটা… এর গায়ের উড়না কই? এটা কি শহর নাকি? জাহেদ আছে, মা আছে, ছোট ভাই আছে—তবু এভাবে দাঁড়িয়ে আছে!” তার মাথা যেন আরও গরম হয়ে উঠছে।
মারজিয়া বেগম বিরক্ত হয়ে উঠলেন।
__“আল্লাহ! এইটুকুর জন্য এতো কান্না? ইচ্ছে করে তো আর করেনি ছেলেটা !”
তিনি আরমানের দিকে তাকালেন। দেখলেন, অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে ছেলেটা। মুখে কোনো কথা নেই।
পরিস্থিতি সামাল দিতে মারজিয়া বেগম গলা পরিষ্কার করলেন,

___ “বাবা’রা, তোমরা ঘরে চলো। অনেক দিন পর আসছো, না খাইয়ে ছাড়ব না।”
এ কথা বলে তিনি জাহেদ আর আরমানকে তাড়া দিয়ে ঘরে ঢুকে গেলেন।
কিন্তু আরমানের চোখ তখনো জারার দিকে। চোখে রাগের আগুন। বুকের ভেতর গর্জন,মনে মনে বলে ___“নিবুদ্ধ মেয়ে! আমি ওকে এই অবস্থায় দেখলে কিছু বলতাম না। কিন্তু এখানে জাহেদ আছে, নিজের মা আছে, ছোট ভাই আছে… তবুও উড়না ছাড়া দাঁড়িয়ে আছে!”
জারা এখনো খরগোশটাকে বুকে চেপে কাঁদছে। যেন তার বুকের ভেতর থেকে শেষ আলোটুকুও নিভে গেছে।
__“এটা আমার বাবার শেষ স্মৃতি ছিল… আপনি জানেন , আমি কতটা ভালোবাসতাম ওকে।”
আরমান এগিয়ে এলো। চোখে রাগ, গলায় শাসনের সুর।
____ “কাঁদা বন্ধ করো! আমি বলেছি না, এটা ইচ্ছে করে হয়নি! আর, এইসব উড়না ছাড়া বাইরে আসার অভ্যাসটা এখনই ছাড়ো। এটা গ্রাম, শহর না। সবাই দেখে…”
জারা তার দিকে তাকাল। চোখ লাল, কান্নায় ভিজে গেছে গাল। এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে হঠাৎ আঘাত করল কথায়—

___“আপনি কে আমাকে এসব বলার। আমি কী পরছি তা নিয়ে কথা বলার? আপনি কী জানেন আমার অনুভূতি? আপনি আমার সব শেষ করে দিলে,। আর এখন আসছেন আমাকে শিখাতে উড়না কীভাবে পরতে হয়? আমার বাবার…!”
কথাগুলো যেন তীরের মতো বিঁধল আরমানের বুকের ভেতর। সে থেমে গেল। রাগে ফুঁসছে, তবুও কোনো উত্তর খুঁজে পাচ্ছে না।
ঘরের ভেতর থেকে মারজিয়া বেগম ডাক দিলেন, ____“এই যে! কতক্ষণ বাইরে দাঁড়িয়ে থাকবে?”
কিন্তু উঠোনের এই তীব্র নীরবতায়, শুধু জারার কান্নার শব্দই ভেসে আসছে…
আরমানের রাগ আর চেপে রাখা গেল না। হঠাৎ করেই সে এগিয়ে এল জারার সামনে। চোখে আগুন, গলার স্বর কড়া—
___“তুমি কি নিজের অবস্থাটা বুঝতে পারছো না? উড়না ছাড়া উঠোনে দাঁড়িয়ে আছো, সামনে আমি আছি, জাহেদ আছে, নিজের মা আছে! লজ্জা বলে কিছু নেই তোমার?”
জারা চমকে তাকাল। মুখ ভিজে কান্নায়, বুকের ভেতর যন্ত্রণা, অথচ এখন তাকে উড়নার জন্য শাসন করা হচ্ছে! চোখ লাল করে বলল—

___“আপনি কে হে? আমার পর্দার হিসাব নেওয়ার ? আমি কী পরব, কীভাবে থাকব সেটা আমার ব্যাপার। আপনি কেন আমার উপর এত অধিকার ফলাচ্ছেন ?”
আরমান দাঁত কিড়মিড় করল, মুষ্টিবদ্ধ হাত কাঁপছে।
___ “আমার সামনে এসব আমি সহ্য করব না, জারা। আমি বলেছি, আবার যেন এমনটা না হয়।”
জারার বুকের ভেতরটা হুহু করে উঠল। চোখ দিয়ে ঝরঝর করে জল গড়াচ্ছে।
___“আপনি আমার খরগোশটাকে মেরে ফেলেছেন , আপনি জানেন এটা আমার বাবার দেওয়া শেষ স্মৃতি ছিল। তার জন্য একটা ক্ষমা চাওয়ার বদলে আপনি আমার পোশাক নিয়ে কথা বলছেন ! এত অধিকার কেন আপনার? কে আপনি ?”
কথাগুলো যেন বজ্রপাতের মতো পড়ল আরমানের মাথায়। মুহূর্তের জন্য তার রাগের ঝড় থেমে গেল। বুকের ভেতর কেমন অদ্ভুত টান লাগল, কিন্তু মুখ থেকে কোনো শব্দ বের হলো না।
জারা আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না। খরগোশটার নিথর শরীর বুকে চেপে ঘরের দিকে ছুটে গেল। আরমান স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল উঠোনে। দাঁত চেপে শুধু একটাই কথা মনে মনে বলল—

____“কীভাবে বোঝাবো ওকে… আমি অধিকার দেখাচ্ছি না, আমি শুধু চাই না, কেউ ওর দিকে খারাপ চোখে তাকাক। কিন্তু এই মেয়ে বুঝাব কীভাবে!”
দূরে মারজিয়া বেগমের ডাক শোনা গেল—
___“এই যে! খাওয়া দাওয়া করবে না তোমরা?”
কিন্তু উঠোনে তখনও জারার কান্নার প্রতিধ্বনি বাজছে, আর আরমানের বুকের ভেতর ফুঁসছে অজানা রাগ আর অদ্ভুত টান…
জারা খরগোশটাকে বুকে চেপে ঘরে চলে গেলেও আরমানের মাথার ভেতর ঝড় থামল না। দাঁত কিড়মিড় করছে, বুক ধকধক করছে। তার চোখে শুধু ভাসছে—“উড়না ছাড়া! আমার সামনে! জাহেদের সামনে!”
কিছুক্ষণ পর তারা ঘরে ঢুকল। সবাই খাওয়ার জন্য বসেছে, কিন্তু জারা নেই। ওর চেয়ার ফাঁকা।
মারজিয়া বেগম বিরক্ত হয়ে জোহান কে বললেন, “তোর বোনের আবার মেজাজ দেখ। ছোট একটা খরগোশ মরে গেছে বলে এই কান্নাকাটি… আমি পারি না এই মেয়ে কে নিয়ে। ”
আরমান কোনো কথা বলল না। নিঃশব্দে জারার জারা’র চেয়ারের দিকে তাকিয়ে আছে ।
খাওয়া দাওয়া শেষ করে আরমান উঠে দাড়ায়। মারজিয়া বেগম এর দিকে তাকিয়ে বলে

___” আন্টি জারা রুম টা কোন দিকে?”
___ ” কেন বাবা? ”
___ ওই, না, মানে .. ওকে একবার সরি বলতাম! ”
__” ওর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে না তোমায়! ও এমনিতেই ঠিক হয়ে যাবে। ”
আরমান করুন সুরে বলে ___” প্লিজ আন্টি! ”
মারজিয়া বেগম আর কিছু বললেন না, হাত দিয়ে দেখিয়ে দিলেন জারার রুম। আরমান জাহেদ কে ইশারা করে বাড়ির বাহিরে গিয়ে ওর জন্য অপেক্ষা করতে। জাহেদ চলে যায় বড় ভাইয়ের কথা মতো।
জারা’র দরজা ভেজানো। আরমান হাত তুলে ঠকঠক শব্দ করল।
__“জারা… দরজা খোল।”
ভেতর থেকে কোনো উত্তর নেই। শুধু চাপা কান্নার শব্দ শোনা যাচ্ছে। আরমানের রাগ তুঙ্গে উঠল। ধাক্কা দিয়ে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে গেল।
ছোট্ট ঘরে জারা মেঝেতে বসে আছে। কোলে নিথর খরগোশ। চোখ লাল হয়ে গেছে কান্নায়। মাথায় ওড়না নেই। চুল এলোমেলো। আরমানের চোখে সেই দৃশ্য দেখে আবার রাগ চড়ে গেল।
__“তুমি কি একদমই বুঝ না? নির্বুত মেয়ে। এভাবে উরনা ছাড়া থাকবে তুমি? মাথায় ওড়না নেই, দরজা বন্ধ করে বসে আছো—বাড়িতে আমি আছি, জাহেদ আছে! আমরা বাহিরের মানুষ। কেউ দেখে গেলে কী বলবে?”
তার কণ্ঠে রাগে আগুন ঝরছে।
জারা মুখ তুলল। চোখে কান্নার জল চিকচিক করছে, কিন্তু দৃষ্টি তীক্ষ্ণ।

“ একদম আমাকে এই ভাবে শাসন করতে আসবেন না। আপনি আমার কেউ হন না, তাই শাসন করার কোনো অধিকার ও নেই আপনার ?”
আরমান থমকে গেল। বুকের ভেতর যেন হঠাৎ কেমন শূন্যতা। মুহূর্তের জন্য রাগ মিলিয়ে গিয়ে কষ্টের মতো কিছু ফুটে উঠল চোখে। কিন্তু সে সেটা ঢাকল কঠিন স্বরে—
___“তুমি বুঝবে না, জারা। আমি যা বলছি, সেটা তোমার ভালোর জন্য বলছি।”
জারা হঠাৎ খরগোশটার মৃতদেহ বালিশের পাশে রেখে দাঁড়িয়ে গেল। চোখ লাল, কণ্ঠ কাঁপছে কিন্তু দৃঢ়—
____“আমার ভালো আমি জানি। আপনি আমার সব শেষ করে দিলেন… আমার বাবার শেষ স্মৃতি ছিল এটা। আর এখন আমাকে শিখাচ্ছেন কীভাবে চলতে হয়? ক্ষমা চাওয়ার বদলে আপনি আমাকে অপমান করছেন ! কেন? এত অধিকার কেন আপনার?”
কথাগুলো আরমানের বুকের ভেতর ঝড় তুলে দিল। কিন্তু মুখে কিছু বলতে পারল না। শুধু চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। এক মুহূর্ত পর সে ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে নিচু গলায় বলল—

___“আমি অধিকার দেখাইনি, জারা… আমি শুধু চাই না কেউ তোমার দিকে খারাপ চোখে তাকাক। আমি…”
কথা শেষ করল না। গলার স্বর থেমে গেল।
জারা আর কোনো কথা না বলে মুখ ফিরিয়ে নিল। চোখ দিয়ে আবার জল গড়াল। আরমান কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল, তারপর ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
কিন্তু দরজার বাইরে এসে নিজের মুষ্টিবদ্ধ হাত তাকিয়ে সে মনে মনে বলল—
“কেন এ মেয়ে আমার এত রাগ জাগায়… কেন ওর কষ্ট দেখে আমার বুক ফেটে যায়?”

আরমানরা সেদিন চলে যাওয়ার পর তিন দিন কেটে গেছে। এই তিন দিন জারা কলেজে যায়নি। একা একা ঘরে বসে থাকে। কারো সঙ্গে বেশি কথা বলে না। সেই খরগোশটার মৃত্যু যেন তার ভেতর থেকে হাসি কেড়ে নিয়েছে।
আরমান কয়েকবার কল করেছে, কিন্তু জারা ধরেনি। একবারও না। বারবার রিং হলেও সে শুধু স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ছিল—রাগ, অভিমান আর অজানা কষ্টের মিশ্রণ নিয়ে।
শেষ পর্যন্ত আরমান জাহেদকে বলে—
___“ফিহার সঙ্গে যোগাযোগ কর। বল, ওরা যেন একবার জারা’কে দেখে আসে। আর আমার… সঙ্গে যেন একবার দেখা করে যায় ওরা ।”
পরের দিন ফিহা আর মিম আরমানদের সঙ্গে দেখা করতে এল। কথা শেষ হলে আরমান গাড়ি থেকে বের করে আনল দুইটা ঝুড়ি। ঝুড়ি দুটো ঢাকা কাপড়ে ঢাকা।
ফিহা অবাক হয়ে বলল,__ “এগুলো কী?”
আরমান কাপড়টা সরাল। ঝুড়ির ভেতর থেকে নড়াচড়া শুরু করল ছোট ছোট সাদা খরগোশ। প্রতিটি ঝুড়িতে পাঁচ করে—মোট দশটা।
ফিহা আর মিম দুজনের চোখ বড় বড় হয়ে গেল।
___“আরমান ভাইয়া, এগুলো…!”
আরমান গম্ভীর স্বরে বলল—

__“ওকে দিয়ে আসবে। বলে দিও, এগুলো আমার দোষের জন্য নয়… ওর হাসিটা ফেরানোর জন্য।”
ফিহা এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে হালকা হেসে বলল,___“আপনি তো অনেক কেয়ার করেন জারার জন্য।”
আরমান মুচকি হাসল না, গম্ভীর মুখে শুধু বলল
___“ও কষ্ট পেলে আমি ভালো থাকতে পারি না। নিয়ে যাও।”
ফিহা আর মিম ঝুড়ি হাতে নিয়ে জারাদের বাড়ির দিকে রওনা দিল। পথে মিম ফিসফিস করে বলল——“শোন, আরমান ভাইয়া জারার জন্য খরগোশ কিনে দিয়েছে! এটা কি সাধারণ ব্যাপার নাকি?”
ফিহা হেসে মাথা নেড়ে বলল,
___“না রে। সাধারণ কিছু না। এই লোকটা জারার জন্য সিরিয়াস হয়ে গেছে। বুঝলি? রাগের পেছনে যে এত কেয়ার লুকিয়ে থাকে!”
মিম খিলখিল করে হেসে উঠল,
___“দেখি, জারা কী করে! রাগ ভাঙবে তো?”
ফিহা মুচকি হেসে বলল,

__“ভাঙবেই। এই খরগোশগুলো দেখে যদি না ভাঙে, তাহলে জারা সত্যিই পাথর।”
তারা জারাদের বাড়িতে পৌঁছল। গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ফিহা হালকা গলায় ডাক দিল,
___“জারা! বের হ। তোর জন্য সারপ্রাইজ আছে।”
জারা ভেতর থেকে আস্তে আস্তে বেরোল। মুখে কোনো হাসি নেই। চোখে এখনো ক্লান্তি আর অভিমান। ফিহা ঝুড়ি সামনে ধরল। কাপড় সরিয়ে দিল। ঝুড়ির ভেতর থেকে সাদা খরগোশগুলো লাফালাফি করছে।
জারার চোখ হঠাৎ বড় হয়ে গেল। হাত কাঁপতে কাঁপতে ঝুড়ির কাছে এগোল।
___“এগুলো…!”
ফিহা হেসে বলল,
____“আরমান ভাইয়া দিয়েছে। বলেছে—তোর মুখে হাসি ফেরাতে। আর হ্যাঁ… উনি বলেছেন, এটা দোষ মেটানোর জন্য নয়। এটা শুধু তোর খুশির জন্য।”
জারার বুকের ভেতর কিছু যেন কাঁপল। আঙুল দিয়ে খরগোশের নরম লোমে হাত বোলাতে বোলাতে সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। কিছু বলতে পারল না।
ফিহা পাশে দাঁড়িয়ে কানে কানে মিমকে বলল,

____“দেখ, জারা কিছু বলছে না, কিন্তু চোখে পানি চলে এসেছে। রাগ ভাঙবেই।”
ঝুড়ি থেকে একে একে খরগোশগুলো উঠিয়ে কোলে নিল জারা। ছোট ছোট প্রাণগুলো তার বুকের ভেতর জমে থাকা কষ্টে যেন একটু আলো ফেলে দিল। আঙুল বোলাতে বোলাতে তার চোখ ঝাপসা হয়ে গেল।
___“এতগুলো… কেন দিলেন?”
মনের ভেতর প্রশ্ন গুঞ্জন তুলল। “আমি তো কথা বলিনি, কল ধরিনি… তবু কেন আমার জন্য এত কিছু করল? আমি রাগ করেছিলাম… তবু কেন…”
তার বুকের ভেতর কেমন অদ্ভুত অনুভূতি জমতে লাগল—রাগের মাঝে হালকা কাঁপুনি, যেন কষ্টের ওপর দিয়ে কেউ কোমল ছোঁয়া বুলিয়ে দিল।
ফিহা হাসিমুখে বলল,
___“এই যে, চুপচাপ করে বসে আছিস কেন? ভালো লাগছে না নাকি?”
জারা মাথা নাড়ল ধীরে বলে
____“ভালো লাগছে…” গলার স্বর কাঁপা।
মিম হেসে উঠল,
____“আমাদের কাছে কিছু লুকাস না, প্লিজ। আরমান ভাইয়া যদি তোর জন্য এমন করে… তাহলে বুঝে নে, তোর জন্য তার মনে কিছু আছে।”
জারা এক ঝটকায় চোখ তুলে তাকাল,

___“তোরা কি পাগল নাকি? আমার খরগোশ মেরেছে তাই এগুলো পাঠিয়েছে ? আর উনি আমার খরগোশ মেরে ও উড়নার জন্য কী বকাঝকা করল…! —এই মানেই কী দাঁড়ায়?”
ফিহা ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বলল,
___“মানে দাঁড়ায়—রাগটা যত্নের থেকে আসে। কেউ যদি তোকে পাত্তা না দিত, উড়নার জন্যও কিছু বলত না।”
মিম আবার খিলখিল করে হেসে উঠল,
___“হ্যাঁরে, জারা, তুই বুঝলি না কিছু। এই রাগের ভেতরেই তো কেয়ার লুকিয়ে থাকে। আমরা তো সব বুঝি।”
জারা কিছু বলল না। শুধু খরগোশটার লোমে হাত বোলাতে বোলাতে জানলার বাইরে তাকিয়ে রইল। মনে মনে বলল,
“আপনি কেন এমন করছো, মি. খান ? আমার জীবনে আপনি কে… এত অধিকার দেখানোর?”
এক অদ্ভুত অস্থিরতা বুকের ভেতর ছড়িয়ে গেল।
ঠিক তখনই তার ফোনটা টেবিলে কেঁপে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল নাম—” সুইট বয় ।”
জারা যখন আরমান কে প্রথম ফর্মাল ড্রেসে দেখে, তখন তার মাথায় শুরু একটা নামই ঘুরপাক খাচ্ছিল। ‘সুইট বয় ‘। তাই আরমানের ফোন নাম্বার ও সুইট বয় দিয়ে সেব করে রাখে জারা।
ফিহা আর মিম দুজনেই একসাথে চেঁচিয়ে উঠল,
“ওহহো! দেখ, কে কল দিচ্ছে! তোর সুইট বয় ! বলেই হাসতে থাকে দুইজন। ”
জারা হকচকিয়ে ফোনের দিকে তাকাল। হাত কাঁপছে।
ফিহা মজা করে বলল,
“রিসিভ কর। না করলে আমরা কল রিসিভ করব।”
মিম হেসে যোগ করল,
“আরমান ভাইয়ার মেজাজ কিন্তু ভয়ংকর… আবার কিন্তু কল না ধরার অপরাধে বকাবকি শুরু করবে।”
জারা তাড়াতাড়ি ফোনটা হাতে তুলে নিল। কল ধরবে কি ধরবে না—এই দ্বিধায় বুক ধকধক করছে। শেষমেশ ধীরে ধীরে আঙুল স্লাইড করল…

___“হ্যালো…”
ওপাশ থেকে গভীর গলার স্বর, যা শুনেই বুকের ভেতর কেমন কেঁপে উঠল জারার।
__“তিন দিন হলো তোমাকে দেখতে পাইনি…একটু কথা হয় নি। এতো অভিমান হয়েছে আমার উপর? ”
জারার নিঃশ্বাস আটকে গেল। ফিহা আর মিম কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে আছে, হাসি চেপে।
___” আ আমি কেন আপনার উপর অভিমান করতে যাব। বলল জারা! ”
___ ” হুম বোঝলাম! এখন বলো পছন্দ হয়েছে? ”
___” কী? ”
__ ” খরগোশ গুলো পছন্দ হয়েছে? ”
জারা ঠোঁট কামড়ে চোখ নামিয়ে বলল,

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৩০

___” এগুলো পাঠানোর কোনো দরকার ছিল না ?”
ওপাশ থেকে নীরবতা, তারপর ধীরে ধীরে কথাগুলো ভেসে এল—
“আমার দরকার সবকিছু… যেটা তোমায় নিয়ে।”
জারার বুকের ভেতর ঝড় বয়ে গেল। ফোনের ওপাশের শব্দগুলো যেন হাওয়ার মতো এসে তার কান পেরিয়ে সরাসরি হৃদয়ে আঘাত করল।

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৩২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here