রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৩৩
সোহানা ইসলাম
দুপুর ১টা। আকাশে রোদ আছে, কিন্তু খুব কড়া নয়। হালকা হাওয়া বইছে, গাছের পাতাগুলো দুলছে। রাস্তার ধারে ছোট ছোট চায়ের দোকান থেকে চায়ের গন্ধ ভেসে আসছে। কলেজের গেটের সামনে গাড়ি, রিকশা, মোটরবাইকের ভিড়। স্টুডেন্টরা ক্লাস শেষে একে একে বেরিয়ে আসছে। কেউ বন্ধুদের সাথে হাসি-ঠাট্টায় মেতে আছে, কেউ ফোনে কথা বলছে।
গেটের একপাশে দাঁড়িয়ে আছে জাহেদ। গায়ে সাদা শার্ট, জিন্স। হাতে একগুচ্ছ লাল গোলাপ আর ছোট্ট একটা গিফট বক্স। চোখে অদ্ভুত উচ্ছ্বাস, ঠোঁটে মৃদু হাসি। আজ সে ফিহাকে সারপ্রাইজ দিতে এসেছে।
এই কয়েকদিনে তাদের সম্পর্ক একটু স্বাভাবিক হয়েছে। ফোনে কথা হয়, মেসেজে হাসি-ঠাট্টা চলে। কিন্তু জাহেদের মন আজ অন্য রকম। সে চায় নিজের মনের কথাটা আবারও বলতে। সেদিন ফিহা তাকে এড়িয়ে গিয়েছিল, কিন্তু আজ আর সে পিছু হটবে না।
সে ভাবছে—”আজ যদি সে হ্যাঁ বলে দেয়… তাহলে আমি এই খুশিতে সোজা কাজি অফিস এ চলে যাব ।”
কলেজ ছুটি হওয়ার সময় এখনো আধা ঘণ্টা বাকি। কিন্তু জাহেদ এসেছিল সময়ের আগে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সে ফিহার হাসি কল্পনা করছে।
কলেজ ছুটির ঘণ্টা বাজল। গেটের ভেতর থেকে একের পর এক স্টুডেন্ট বের হচ্ছে। মেয়েদের হাসির শব্দ, গানের সুর, বন্ধুদের আড্ডা—সব মিলিয়ে চারপাশ জমজমাট।
কিন্তু যার জন্য জাহেদ এতক্ষণ অপেক্ষা করছে, সেই ফিহার দেখা মিলছে না। তার মন ধীরে ধীরে অস্থির হতে থাকে।
“এখনও বের হয় না কেন? ক্লাসে আছে নাকি? নাকি অন্য…?”
হঠাৎ একটা ভয় তার বুকের ভেতর খোঁচা দেয়। কোনো অজানা আশঙ্কা। তাই আর অপেক্ষা না করে সে কলেজের ভেতরে ঢোকে।
কলেজের মাঠ দিয়ে হাঁটছে জাহেদ। মনটা আনন্দে ভরা ছিল, কিন্তু হঠাৎ সেই আনন্দ ধুলিস্যাৎ হয়ে যায়।
দূর থেকে সে দেখে—ফিহা এক ছেলের সাথে দাঁড়িয়ে হাসছে। ছেলেটা দেখতে বেশ স্মার্ট, বয়সে হয়তো কলেজের সিনিয়র। তারা কিছু একটা নিয়ে কথা বলছে। ফিহার মুখে হাসি, চোখে ঝিলিক।
জাহেদের বুকের ভেতর হঠাৎ কেমন জানি ঝড় বয়ে যায়। হাতের গোলাপগুলো যেন তার হাতেই যেন শুকিয়ে গেল।
“এটা আমি কি দেখছি? ফিহা… অন্য কারও সাথে হাসছে? আমি কি এতদিন ভুল ভেবেছি? ওর অন্য কারোর সাথে? ”
সে এক পা এগোয়, কিন্তু তখনই ঘটে যায় অদ্ভুত একটা দৃশ্য। সেই ছেলে ফিহার হাতে একটা গোলাপ আর ছোট্ট একটা কার্ড দেয়। সাথে হেসে বলে—“উত্তরটা কালকের মধ্যে চাই।”
তারপর হালকা একটা স্মার্ট হাসি দিয়ে চলে যায় ছেলেটা সেখান থেকে ।
এই দৃশ্য দেখে জাহেদের মাথায় যেন আগুন ধরে যায়। তার চোখ লাল হয়ে ওঠে। সে ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণের জন্য। হৃদয়ের ভেতর জ্বালা, কষ্ট, অপমান সব একসাথে ঘুরপাক খাচ্ছে।
ফিহা হাসি মুখের যেই না ঘুরে জারা’দের কাছে আসতে নিবে, হঠাৎ চোখ যায় তার জাহেদ এর দিকে ! ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে কিছু দূরে। তার চোখে রাগ, ঠোঁটে দৃঢ়তা।
ফিহার বুক কেঁপে ওঠে। মুখ শুকিয়ে যায়।
__”সে এখানে… সব দেখেছে?”
এর মধ্যে জাহেদ ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে। ফিহার সামনে এসে দাঁড়ায়। চোখের দৃষ্টি কঠিন।
জাহেদ রাগে হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়ে আচমকা ফিহার চোয়াল চেপে ধরে বলে— ” কুওার বাচ্চা এগুলো কী? আমি তোকে ভালোবাসি জানার পরও তুই অন্য কারও সাথে হেসে হেসে ফুল নিচ্ছিস?”
ফিহা তোতলাতে থাকে।এমন শান্ত, হাসিখুশি ছেলেটা হটাৎ রেগে যাওয়ায় খুব ভয় পেয়ে যায়। সে একটু রাগ দেখালে যে জাহেদ হাজার বার সরি বলে, আজ সেই জাহেদ আর সাথে এই ভাবে কথা বলছে। তাকে ভুল বোঝছে? জাহেদ কে বোঝার চেষ্টা করে ফিহা
___“না… না জাহেদ, ব্যাপারটা আপনি যেটা ভাবছেন সেটা না…”
কিন্তু জাহেদ শোনে না। তার কণ্ঠে অভিমান আর আঘাত মিশে যায়।
___“আমি তোমার জন্য এসেছি, অর্ধেক ঘণ্টা আগে থেকে দাঁড়িয়ে আছি। আর তুমি এখানে…!”
ফিহার চোখ ভিজে আসে। গলা কেঁপে ওঠে।
___“আপনি আমাকে ভুল বোঝছেন ? একবার আমার কথা শুনুন। ”
কিন্তু জাহেদ তখনো কষ্টে ডুবে আছে। হাতে থাকা গোলাপগুলো ফ্লোরে ফেলে দেয়।
__“থাক, আর কিছু বলার দরকার নেই। আমি সব বুঝে গেছি।”
দূর থেকে মিম আর জারা দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছে। তারাও হতবাক। জাহেদ হটাৎ তাদের কলেজে কি করছে। সে তো এখানে নতুন, তাহলে কলেজ কীভাবে চিনল?
___” প্লিজ একবার শুনুন! ওই ছেলে….”
কথাটা বলতে দিল না ফিহাকে জাহেদ। তার আগেই সে বলে
___” আমি বোঝে গেছি সব! তোমার মনে যদি অন্য কেউ থাকে তাহলে এতো দিন আমার সাথে ঘন্টার পর ঘন্টা কথা বললে কেন? রাত জেগে মেসেজে আমার সাথে কথা বলতে কেন? আমি এক বেলা কল না দিলে রাগ করে থাকতে কেন? এসব কিছু অভিনয় ছিল তাই না কটকটি? ”
___ আমি অভিনয় করি নি আপনার সাথে? আর ওই ছেলের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই! ”
___”মিথ্যে বলতে হবে না। আর আমাকেও ভালোবাসতে হবে না। ভালো থেকো, আর বিরক্ত করব না তোমায়। ”
বলেই জাহেদ পিছন ঘুরে চলে আসতে থাকে।
এমন শক্ত কথা শুনার পর ফিহার বুকটা মুচড় দিয়ে উঠে। তার ভালোবাসার মানুষ তাকে ভুল বোঝছে। ওর জাহেদ খান তাকে আর বিরক্ত করবে না?কান্নায় ভেঙে পড়ে ফিহা। ওই ছেলেরা দেওয়া ফুল আর চিরকুট হাত থেকে ফেলে দেয়। এবং ফ্লোর থেকে জাহেদের আনা লাল গোলাপ আর ব্রক টা উঠে নেয়। জাহেদ কে চলে যেতে দেখে দৌড়ে গিয়ে ফিহা পিছন থেকে জরিয়ে ধরে। আর কাঁদতে কাঁদতে বলে
___“ আমি আপনাকে ভালোবাসি জাহেদ খান। সত্যি খুব ভালোবাসি। আমি আপনার সাথে কোনো অভিনয় করি নি। আর… আর ওই ছেলের সাথে আমার কোনো সম্পর্কও নেই। সত্যি বলছি, বিশ্বাস করুন আমায়? ”
বলেই আরও জোরে কান্না করতে থাকে সে। আর এদিকে জাহেদ পুরো বরফ হয়ে গেছে, ফিহার জরিয়ে ধরায়। আর ওর ভালোবাসার শিকার উক্তি শুনে! পিছন ঘুরে ফিহাকে তার কাছ থেকে ছাড়িয়ে ঠিক তার সামনে দাঁড় করায় জাহেদ।
__ কি বললে তুমি? ”
ফিহা কান্না করতে করতে হেঁচকি তুলছে বার বার। কান্না মিশ্রিত কন্ঠে বলে
__” ভালোবাসি আপনাকে! ”
__” তাহলে আমি যা নিজের চোখে দেখেছি, তা-কি মিথ্যে হয়ে যাবে? ”
___” ওই লোকটা আমাকে এগুলো দেয়নি! এগুলো জারার জন্য ছিল। সে আমাকে বলেছে যেন আমি জারাকে বোঝাই তার সাথে রিলেশন করতে। ”
জাহেদ থমকে যায়। তার রাগ ধীরে ধীরে কমে আসে। গলা নরম হয়ে যায়।
___“মানে… এগুলো তোমার জন্য ছিল না?”
ফিহা চোখ মুছতে মুছতে বলে—
“না ! আমি কাউকে ভালোবাসি না। আমি… আমি শুধু আপনাকেই ভালোবাসি। কিন্তু বলতে ভয় হতো। কারণ আমাদের ফ্যামিলির… আপনাদের ফ্যামিলির অবস্থান এক নয়… তাই এইসব ভেবে আমি চুপ থাকি।”
জাহেদের বুকের ভেতর অপরাধবোধের ঢেউ ওঠে। সে এগিয়ে এসে ফিহার হাত ধরে। ফিহার হাতে একটা ছোট্ট চুমু একে দিয়ে ওর দুই গালের নরম স্পর্শ করে বলে
__“আমি খুব ভুল করেছি ফিহা। আমি ভেবেছিলাম তোমাকে হারিয়ে ফেলেছি। আমি তোমাকে ছাড়া কিছু ভাবতেই পারি না। আমি তোমাকে ভালোবাসি, কটকটি। শুধু তোমাকেই।”
ফিহার চোখে জল, ঠোঁটে মৃদু হাসি।
___“আমিও আপনাকে ভালোবাসি জাহেদ খান। কিন্তু ভয় করতাম…।”
জাহেদ ফিহার চোখের জল মুছে দেয়।
__“এবার আর ভয় নয়। আমি আছি তোমার পাশে। সবকিছু আমি সামলাবো।”
দূর থেকে মিম আর জারা এগিয়ে আসে। মিম হাসি দিয়ে বলে—
__“অবশেষে আমাদের প্রেমিক-প্রেমিকা এক হলো।”
মিমের কথায় জাহেদ ফিহা কে ছেড়ে একটু সরে দাড়ায়। লজ্জা পাচ্ছে দুজনেই। মিম আর জারা হাসছে তাদের দুইজনকে লজ্জা পেতে দেখে।
মিম আবারও বলে
___“ওহ হ, অবশেষে আপনাদের পূর্ণতা আর এতদিনের ঝগড়া ঝামেলা শেষ।”
জারা মজার সুরে বলল
___“বাহ, জাহেদ ভাই, এই সারপ্রাইজের কথা তো আগে বলেননি।”
জাহেদ হালকা হেসে মাথা নিচু করল। ফিহার মুখও লাল হয়ে গেছে। লজ্জায় চোখ নামিয়ে রেখেছে সে। তার হাতে তখন জাহেদের আনা গোলাপ আর ছোট্ট গিফট বক্স। দুজনের চোখে চোখ পড়তেই বুকের ভেতর কেমন যেন ঢেউ খেলে যায়।
জাহেদ কিছু না বলে ফিহার হাতে উপহারগুলো রেখে একটু সরে দাঁড়াল। তাদের কাছ থেকে কিছুটা দূরে গিয়ে সে পকেট থেকে মোবাইল বের করল। ফোনের স্ক্রিনে একটা নাম—“আরমান ভাই”।
সে কল করল। প্রথমবার কল রিসিভ হলো না।
দ্বিতীয়বার করল—তবু না।তৃতীয়বার… চতুর্থবার…
এতবার করে কল করায় আরমানের বিরক্তি চরমে পর্যায়ে পৌঁছেছে। এমনিতেই সকালে ঘটে যাওয়া ঘটনার পর থেকে তার মেজাজ খারাপ। জারার আচরণ তাকে পুড়িয়ে মারছে ভেতর থেকে। আবার জিনিয়ার বিষয় টা তাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে।
অবশেষে কলটা রিসিভ করল আরমান। গলায় প্রচণ্ড রাগ,আরমান চিৎকার করে বলে
___“হা*য়ার পোলা! এতবার কল করছিস কেন রে? বালের পাগল?”
জাহেদ থতমত খেয়ে গেল। তবু হেসে বলল—
__“আরে ভাইয়া, এত রেগে আছো কেন? আমি তো জরুরি কথা বলতে কল দিয়েছি ।”
আরমান রাগে ফেটে পড়ে। এমনিতেই মেজাজ খারাপ আবার এর পেঁচাল।
__“বালের পেচার বাদ দিয়ে কি বলার জন্য কল করেছিস সেটা বল। আমার টাইম নষ্ট করিস না।”
জাহেদ এক নিঃশ্বাসে ফেলে বলে
__“আরে ভাইয়া, তুমি আরামে বসে আছো কোম্পানির ফাইল নিয়ে। আর এদিকে তোমার হাফ ইঞ্চি মেয়ে… মানে ওই জারা ভাবি’কে… তাকে প্রেম পত্র দিয়ে পটাচ্ছে এক ছেলে!”
এই কথা শুনেই আরমানের শরীরের রক্ত যেন আগুন হয়ে উঠল। চোখ লাল, হাত শক্ত। বুকের ভেতর থেকে গর্জন বেরোল—
___“তুই কি বললি, জাহেদ?”
জাহেদ হালকা মজা নিয়ে বলে
___“হ্যা ভাইয়া, যা শুনছো। আমি নিজে চোখে দেখলাম। ফিহাকে দিয়ে প্রস্তাব পাঠাচ্ছে। গোলাপ, চিঠি দিচ্ছে। ”
আরমানের শ্বাস ভারি হয়ে এলো।
__“তুই কোথায় আছিস এখন?”
জাহেদ:-“আমি এখন ফিহাদের কলেজে আছি।”
আরমান চিৎকার করে বলে__“ লোকেশন পাঠা। আর তুই অপেক্ষা কর! আমি আসতেছি।”
কল কেটে দিল আরমান। ফোনটা শক্ত করে ধরল, দাঁত চেপে বলল—
“হাফ ইঞ্চির বাচ্চা ! তোকে আমি আজ বুঝাব কেমন করে অন্যের দিকে তাকাতে হয়? আমার ভালোবাসা বোঝতে তোর এতো সমস্যা? তাই না !”
আরমান মনে মনে আরও হাজার ও কথা বলে,রুম থেকে বের হয়ে দৌড়ে গেলো ঘাটের দিকে।
আরমান কে এই ভাবে দৌড়াতে দেখে রোহান হতভম্ব হয়ে যায়। এই দুপুর বেলা এই ভাবে দৌড়ে কোথায় যাচ্ছে আরমান? রোহান ও আরমানের পিছন পিছন দৌড়ে এসে থামায় তাকে।
__” এই, এই তুই দুপুর বেলা পাগলের মতো দৌড়ে কোথায় যাচ্ছিস ? ” বলল রোহান
___ ” কলেজে যাচ্ছি! সর সামনে থেকে? ”
অবাক হয় রোহান, কলেজে যাচ্ছে মানে? কোন কলেজে যাবে? কি জন্য যাবে? এখানের তো কিছুই চিনে না সে? কেলজে কি কাজ তার?
__” কলেজে যাবি মানে? কোন কলেজে যাবি? আর কি জন্য যাবি? ”
__ ” বা*লের বো*দাই, সর সামনে থেকে! এমনিতেই মাথা নষ্ট, আবার পথ আটকে এখানে
এসে কলের গান গায়ছে বা&ল। ”
__ ” আরে বা*ল রেগে যাচ্ছিস কেন? কোনো সমস্যা হয়েছে? আমি যাবো সাথে? ”
__” বা&লের নাতি! হাফ ইঞ্চির বাচ্চা! আমি এতো দিন ধরে ভালোবাসা বোঝতে চাইছি, বা*লে বোঝেই না!এখন নাকি অন্য এক মা*ঙ্গের নাতি এসে লাইন মারছে?
আরমানের কথা বলার ধরন আর মুখের এক্সপ্রেশন দেখে ফিক করে হেসে উঠে রোহান। এখন সব ক্লিয়ার, আরমান কেন এতো রেগে আছে? আরমান কে শান্ত করতে হাসতে হাসতে বলে
___” আরে এতো প্যারা নিস না! মেয়ে মানুষ,
প্রেম প্রস্তাব তো দিবেই? স্বাভাবিক এটা? ”
রোহানের কথায় যেন আগুনে ঘি ঢালার মতো তেতে উঠে। এটা এই বোদা*য়ের কাছে স্বাভাবিক মনে হচ্ছে? আরমান ও দাঁতে দাঁত চেঁপে রোহানকে বলে
__” জিনিয়াকেও অন্য ছেলের সাথে বিয়ে দিয়ে দিব আমি তাহলে? কারণ এটাও স্বাভাবিক বিষয়। ”
আরমানের কথায় রোহানের মুখ ভোঁতা হয়ে যায়।
চোয়াল ঝোলে যায়। সে তো এটা জাস্ট এমনি বলল। তাই বলে এতো দূর নিয়ে যেতে হবে। চাঁদ সুন্দরী তাকে এমনিতেই পাওা দেয় না। এখন যদি শেষ ভরসাও এমন কথা বলে তাহলে সে কোথায় যাবে? রোহান অসহায় ফেইস নিয়ে বলে
__” আরে আমি তো এমনি বলেছি? জারা..না মানে ভাবি তো পরীর মতো সুন্দর! প্রেম প্রস্তাব তো দিবেই ছেলেরা? ”
__” হাফ ইঞ্চি হলে কি হবে? যে রূপ তার, এটা নিয়েই চিন্তায় মাথা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে আমার। কখন কোন বা&ল এসে চোখ দিয়ে বসে? সর এখন সামনে থেকে, লেট হয়ে যাচ্ছে আমার! ”
__” চল আমি ও যাচ্ছি তোর সাথে! ”
__” না তোর যেতে হবে না। জেরিন আর জিনিয়া একা আছে। তুই ওদের সাথে থাক। ”
কিছুক্ষণ পর কলেজের গেটের সামনে এসে দাঁড়ায় আরমান।অটো গাড়ি থেকে নেমে কলেজে ঢুকে পড়ল ঝড়ের মতো। তার চোখে তখন শুধু জারা।
গেটের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল জাহেদ, মিম আর জারা। হঠাৎ দেখে—আরমান আসছে। মুখে আগুন, চোখে বজ্রপাত।
জাহেদ হালকা ভয় পেয়ে গেল। তার কথায় কি অনেক রেগে গেছে ভাইয়া?এখন কি করবে?
মিম আর জারা একে অন্যের দিকে তাকাল।
জারা কিছু বুঝে উঠতে পারল না। শুধু মনে মনে ভাবচ্ছে–” এই লোকটা এভাবে রেগে আসছে কেন? আর এখানেই বা কী করছে?”
আরমান সোজা গিয়ে দাঁড়াল জারার সামনে।এক মুহূর্ত দেরি না করে—চপ্প! চপ্প!দুইটা জোর থাপ্পড় বসাল তার গালে। চারপাশের সবাই স্তব্ধ।
আরমান চিৎকার করে বলে
___“তোর এত সাহস হাফ ইঞ্চির বাচ্চা ? অন্য কারও ফুল নিবি তুই? আমার চোখের সামনে প্রেম করবি তুই?”
জারা হতবাক! চোখে জল চলে এল। কিন্তু সে চুপ। কিছু বলতে পারল না। তার বুক ধড়ফড় করছে।
আরমান রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলে
___“আমি তোর জন্য সব কাজ কাম ফেলে ঘাটে দাঁড়িয়ে থাকি, তোকে এক পলক দেখার জন্য । আমার জীবনের প্রতিটা স্বপ্ন তোর জন্য! আর তুই… তুই কলেজে এসে প্রেম করার ধান্দা করছি ?”
তার কণ্ঠে শুধু রাগ না, সেখানে কষ্টও আছে।
জারা কাঁদতে কাঁদতে ফিসফিস করে বলে—
__“আ আমি কারোর সাথে প্রেম করার ধা ধান্দা করছি না! ”
কিন্তু আরমান ওর কথায় কোনো পাওা না দিয়ে, তার হাত চেপে ধরে বলে
___“ তাহলে আমি মিথ্যে খবর পেয়েছি? ”
কিছুক্ষণ চুপ থাকে তার আরমান। একটা বড় নিশ্বাস ফেলে নরম গলায় বলে
___” আমি তোর জন্য বাঁচি জারা। তুই আমার! আমি তোকে কারও হতে দেব না। কারও চোখের দিকেও তোকে তাকাতে দেব না।”
তার চোখে পানি জমেছে। রাগের সাথে ভালোবাসা মিশে গেছে। জারা নির্বাক হয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে। কান্না থামাতে পারছে না।
জারা’কে কান্না করতে দেখে আরমান আবারও গর্জন করে বলে
___“তুই মনে রাখিস, তুই আমার। তুই আমি ছাড়া কিছু না। আমি মরতেও রাজি, কিন্তু তোকে কারও হাতে ছাড়ব না।”
জারা তখনও কাঁদছে। তার ভেতরে ভয়, কষ্ট, আবার অদ্ভুত একটা শান্তি। কারণ এই প্রথমবার আরমান তার ভালোবাসা এত প্রকাশ্যে, এত জোরে বলল।
জাহেদ,ফিহা আর মিম দূরে দাঁড়িয়ে হতভম্ব। ফিহা হেসে জাহেদকে কনুই মারে ফিসফিস করে বলে___“দেখছো? ভালোবাসা মানে এটাই।”
জাহেদ হালকা হাসে। গর্ব করে বলে
___“ভাইয়া কার দেখতে হবে না, ভালোবাসার রাজা আমার ভাই ।”
জারা চুপচাপ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। তার ঠোঁটে কাঁপছে তার। লজ্জায়, অপমানে মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে করছে তার। কলেজের গেটের সামনে গরম পরিস্থিতি। আরমানের হাত তখনও রাগে কাঁপছে। দুই চড়ের পর জারার চোখে জল। চারপাশে সবাই তাকিয়ে আছে, কিন্তু আরমানের কিছু যায় আসে না। তার গলা কাঁপছে রাগে আর অভিমানে। জারা একবারও কথা বলছে না। তার চোখে শুধু অপমান আর কষ্টের জল। ঠোঁট কাঁপছে, বুক ধড়ফড় করছে। জারা আরমানের সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। এতো গুলো দিনে জারাও আরমানের প্রতি দূর্বল হয়ে পরে। দূর্বল বললে ভুল হবে, হয়তো ভালোও বেসে ফেলেছ। কিন্তু আরমান কে তা বোঝতে দেয় না। কিন্তু আজ এতো গুলো মানুষের সামনে আরমান তার সাথে এমন ব্যবহার করবে এটা সে কখনো ভাবতে পারেনি। আরমানের ব্যবহার জারা’র আত্মসম্মানে লাগে। নিজেকে খুব ছোট মনে হচ্ছে এখন। অপমান ভোত করছে। লজ্জা মাথা তুলে তাকাতেও পারছে সে।
আরমান জারাকে আবারও বলে
___“তুমি জানো আমি তোমাকে ছাড়া কিছু না। আমি শ্বাস নিতে পারি না তোমাকে ছাড়া। তবু তুমি আমার ভালোবাসা বোঝতে চাইছ না। আমি আমার জীবনটা তোমার নামে লিখে দিয়েছি, প্রথম দেখায়। আমি তোমার জন্য সব কাজ, Important মিটিং ফেলে সকালে ঘাটে দাঁড়িয়ে ছিলাম। তোমার জন্য নিজে পছন্দ করে উপহার এনে ছিলাম। কিন্তু তুমি সেগুলো আামকে ফিরিয়ে দিয়ে বললে, আমি তোমার কেই নই?”
কথা গুলো বলে মুখ গোল করে দম ছাড়ে আরমান। জারা’র চোখের দিকে তাকিয়ে আবার বলার শুরু করে __” ভালোবাসি আমি তোমায়। বিয়ে করতে চাই। এইসব ফালতু প্রেম করে সময় নষ্ট করা….”
কথা শেষ করার আগেই জারা ভিজে গলায় বলে
__“আপনি সত্যি খুব খারাপ। আপনি সব সময় আমাকে ভুল বোঝে বাজে কথা বলেন। তুই-তুকারি করেন। আর আজকে আমার গায়ে হাত ও তুললেন, এতো গুলো মানুষের সামনে? আপনি…আপনি খুব খারাপ!খুব বাজে লোক! ”
শব্দগুলো ছিল ছোট, কিন্তু ভেতরে ছিল পাহাড়ের মতো আঘাত।
আরমান মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। জারার চোখে যে কষ্টের ঝড় দেখল, সেটা তার বুকের ভেতর কাঁপন ধরিয়ে দিল। কিন্তু মুখে রাগের আগুন তখনও নিভল না।
আরমান চিৎকার করে বলে
__“তুমি আমাকে খারাপ বলছো? তুমি? যার জন্য আমি আমার সবকিছু বিসর্জন দিছি?”
কিন্তু জারা আর দাঁড়াল না। চোখে জল নিয়ে সোজা কলেজের গেট পার হয়ে বেরিয়ে গেল।
তার চলে যাওয়া দেখে আরমান আরও পাগল হয়ে গেল। জারা’র যাওয়ার দিকে তাকিয়ে চেঁচাতে শুরু করল—
__“হাফ ইঞ্চির বাচ্চা কোথায় পালাচ্ছিস ? ”
পরিস্থিতি একদম গরম হয়ে গেল। কলেজের লোকজন তাকিয়ে আছে। মিম ভয়ে কিছু বলতে পারছে না।
এই সময় জাহেদ সামনে এসে আরমানকে থামানোর চেষ্টা করে। রাগ শান্ত করার জন্য বোঝানোর চেষ্টা করে
___“ভাইয়া, শান্ত হও। প্লিজ, সবাই দেখছে।”
আরমান চিৎকার করে বলে
___“শান্ত হবো? আমি পাগল হয়ে গেছি রে জাহেদ। ওই হাফ ইঞ্চির বাচ্চা মাথা নষ্ট করে রেখে দিয়েছে আমার। ”
তখনই জাহেদ দৃঢ় গলায় বলে—
___“তুমি ভুল বুঝছ ভাইয়া। লোকটার সাথে জারা একবারও কথা বলেনি। ওই ছেলেটা ফিহার হাত দিয়ে এসব পাঠিয়েছে জারার জন্য। ওই ফুল আর কার্ড সব ফিহার কাছে ছিল। ফিহা এখনো এই সব বিষয়ে ভাবি কে কিছু বলেনি,আর না ফুলগুলো দিয়েছে ।”
শব্দগুলো যেন বজ্রপাত হয়ে আঘাত করল আরমানের মাথায়। মুহূর্তেই তার শরীর নিস্তব্ধ হয়ে গেল। মুখ ফ্যাকাশে, চোখ বড় বড়।
আরমান হকচকিয়ে বলে
___“তুই কি বললি…?”
জাহেদ:–” হ্যাঁ ভাইয়া,ভাবি একটুও দোষী না।তুমি একটু বেশি বোঝে,ওকে ভুল বুঝেছ।”
আরমানের বুকের ভেতর যেন কেউ ছুরি চালিয়ে দিল। রাগ, অপরাধবোধ, ভালোবাসা সব একসাথে ঝড় তুলল।সে এক মুহূর্ত দেরি করল না। ছুটে গেল কলেজের গেটের বাইরে।
আকাশে তখন দুপুরের রোদ। রাস্তায় গাড়ি ছুটছে, হর্ন বাজছে। কিন্তু আরমানের মাথায় শুধু একটা শব্দ ঘুরছে—”জারা… জারা… আমি কী করলাম!”
সে তাড়াতাড়ি করে একটা গাড়ি ডাকে । গাড়িতে উঠে ড্রাইভার কে বলে স্পিডে গাড়ি চালিয়ে নদীর ঘাটের যেতে। তার বুক ধকধক করছে। হাতের তালু ঘামছে। গলা শুকিয়ে কাঠ।
আরমানের মনের ভেতর অপরাধবোধ কাজ করছে। বার বার কিছু কথা গুরুপাক খাচ্ছে তার মনে”আমি কীভাবে পারলাম? কীভাবে ওই চোখের দিকে তাকিয়ে থাপ্পড় মারলাম? আমার জারা… আমি তোকে কষ্ট দিলাম। আমি পাপী।”
গাড়ি এসে থামল ঘাটের কাছে। হাওয়া বইছে নদীর দিক থেকে। আকাশের রঙ কমলা হয়ে গেছে।
দূরে একটা ফাঁকা জায়গায় বসে আছে জারা। পাথরের ওপর। তার মুখে অশ্রুর দাগ। মাথা নিচু, কাঁধ কাঁপছে। নদীর জল যেন তার কান্নার সুরের সাথে মিলেমিশে গেছে।
আরমানের বুকের ভেতর তীরের মতো বিঁধল দৃশ্যটা। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল।
আরমান জারার সামনে এসে থামল। কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। বাতাসে তার নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে।
আরমান ভাঙা গলায় ধীরে ধীরে বলে
___“হাফ ইঞ্চি মেয়ে! …”
জারা মাথা তুলল না। মাথা নিচু কন্না করেই যাচ্ছে সে।
আরমান আবারও অসহায় গলায় ডাক দেয়
___” মানজারা! ”
জারা চোখ তুলে তাকায়। চোখে অশ্রু, আর ঠোঁটে কাঁপছে। জারা কাঁপা কাঁপা গলায়ে বলে—
___“আপনি কেন এলেন এখানে? আমাকে অপমান করার পরও আপনার রাগ কমেনি?”
আরমান হাঁটু গেড়ে বসল তার সামনে। হাত জোড় করে বলে
___“না মানজারা, আর রাগ নেই। শুধু লজ্জা আছে। আমি নিজেকে ক্ষমা করতে পারব না। আমি ভুল করেছি। আমি তোমায় না বুঝে কষ্ট দিয়েছি। শাস্তি দেওয়া আমায়, বাদা দিব না । আমাকে মারো। কিন্তু আমার কথা শোন…”
জারা কিছু বলল না। শুধু চোখের জল গড়িয়ে পড়ল।
আরমান হাত বাড়িয়ে তার চোখের জল মুছল। গলায় কাঁপা সুরে নিয়ে বলে
__“তুমি জানিস, আমি তোমার জন্য কীভাবে পাগল হয়েছি? যেদিন প্রথম তোমাকে দেখেছি, সেদিন থেকে আমার পৃথিবী তুমি। আমি প্রতিটা স্বপ্নে তোমায় রেখেছি। তুমি যদি আমার না হাসও, আমি বাঁচব না। আমি শ্বাস নিতে পারব না। আমি তোমায় ছাড়া কিছু না মানজারা।”
তার চোখ লাল, মুখে কষ্টের রেখা।
আরমানের গলার সর গভীর।কিন্তু মনে ভিতরে অপরাধবোধ আর চাপা কষ্ট নিয়ে বলে
__“আমি তোমায়কে্ভালোবাসি… না, ভালোবাসি না—আমি তোমায় আমার জীবনের মতো চাই। তোমার জন্য আমি সব করব। তোমার প্রতিটা কষ্ট আমি নিজের বুকে নেব। কিন্তু তোমাকে ছাড়ব না।”
জারা অবাক হয়ে তাকাল। তার বুকের ভেতর কেমন যেন কাঁপন। এই মানুষটা, যে কিছুক্ষণ আগেও তাকে অপমান করেছিল, আজ নিজের অহংকার ভেঙে তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসেছে। তার চোখে শুধু ভালোবাসার গভীরতা।
জারা ধীরে ধীরে আরমানের চোখের দিকে তাকায়। এই মানুষ টা তাকে এতো ভালোবাসে? এতো করে চায় তার জীবনে?
আরমান জারা’র গালে নিজের দুইহাত দিয়ে, আলতু স্পর্শ করে বলে
রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৩২
___“কিন্তু আমি এখন সব বুঝেছি। আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচব না, জারা। তুমি আমার। শুধু আমার। এই পাগলের হাত ধরবে সারাজীবনের জন্য হাফ ইঞ্চি মেয়ে ? ”
জারার চোখে জল, ঠোঁটে কাঁপা হাসি। সে কিছু বলল না। শুধু মাথা নিচু করল।
