রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৪৫
সোহানা ইসলাম
রোহান যখন জিনিয়ার রুমের দরজায় নক করে, তখন গভীর রাত। চারদিকে নিস্তব্ধতা, হঠাৎ দরজায় টোকা পড়তেই জিনিয়া চমকে ওঠে। দরজা খুলতেই রোহানকে দেখে সে। জিনিয়া ভেতরে আসতে দেয়, মুখে হাসি রাখলেও চোখে এক অদ্ভুত ভয়ের ছাপ।
রোহান জিনিয়াকে দেখে বোঝতে পারে তার চাঁদ সুন্দরী কতোটা কেঁদেছে দুপুর থেকে। চোখ দু’টু লাল হয়ে কেমন ফুলে আছে। মুখটাও ফ্যাকাসে হয়ে আছে। কেমন যেনো এলোমেলো লাগছে এই টুকু সময়ে মেয়েটাকে। রোহানের বুক টা মুচড় দিয়ে উঠে। সে কী অনেক কষ্ট দিয়ে ফেলেছে। রোহান এক দেনে তাকিয়ে আছে জিনিয়ার দিকে।
রোহান তার দিকে এই ভাবে তাকিয়ে আছে দেখে কেমন যেনো অসুস্থি লাগছে জিনিয়ার। চোখ গুরিয়ে নেয় অন্য দিকে সে। রোহান জিনিয়ার পাশ কাটিয়ে রুমের ভিতরে চলে যায়।
জিনিয়া অবাক হয় বেশ। এতো রাতে রোহান তার রুমে কী করছে। তাকে আবার কষ্ট দিতে এসেছে। নাকি নিজের হবু বউয়ের ছবি দেখাতে এসেছে?
জিনিয়া দরজার সামনে দাড়িয়ে নিজেকে স্বাভাবিক করে বলে
___” কি.. কিছু বলবেন রোহান ভাই? ”
রোহান তরিত গতিতে তাকায় জিনিয়ার দিকে। তার নিজের চোখেও জল চিকচিক করছে। কীভাবে বলা শুরু করবে সে। জিনিয়া কী তার কথা শুনবে? নাকি সবসময়ের মতো এড়িয়ে যাবে?কিন্তু রোহান মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে আজ সে সবটা না যেনে কিছুতেই যাবে না। রোহান দুই পা এগিয়ে এসে জিনিয়ার হাতের কুনুইতে ধরে নিজের সামনে দাঁড় করায়।
রোহানের হঠাৎ এমন কান্ডে জিনিয়া ভয় পেয়ে যায়। বুক ধরফর করে উঠে। রোহানের এমন ব্যবহার করাটা জিনিয়ার মাথায় ডুকছে না।
রোহান জিনিয়ার দুই বাহু চেপে ধরে বলে
__” কী হয়েছিলো তোমার সাথে? কেমন তুমি আমার ভালোবাসাকে এমন দূরছাই করো সবসময়? ”
জিনিয়া ঠোঁট বাঁকিয়ে একটুখানি হেসে নিলো, কিন্তু সেই হাসিতে অভিমানের কষ্ট লুকানো ছিলো। রোহানের কাছ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে জিনিয়া শান্ত স্বরে বললো,
— “রোহান ভাই, আপনি তো বিয়ে করে নিচ্ছেন, তাই না? তাহলে এখন আমার বিষয় নিয়ে এত মাথা ঘামাচ্ছেন কেন?”
রোহান জোর দেখিয়ে বলে
__” কারণ আমি জানতে চাই। আর তুমি বলতে বাদ্য। ”
__” আমার চিন্তা বাদ দিয়ে আপনার হবু বউয়ের কথা ভাবুন। আর আমি কারও বাদ্য নই!”
রোহান থমকে যায়। তার বুকটা কেঁপে ওঠে। সে গম্ভীর গলায় বলে,
— “তুমি এভাবে কথা বলছো কেন, জিনিয়া? তুমি জানো তো আমি শুধু তোমাকেই চাই, অন্য কাউকে নয়!”
জিনিয়া বোধহয় একটু হাসলো।
__” আমাকে চান বলেই কী অন্য কাউকে বিয়ে করে নিচ্ছেন রোহান? এটা কেমন চাওয়া বলুন তো?”
রোহান এবার আরও এগিয়ে এসে দাঁড়ায় ওর সামনে। জিনিয়ার হাত দুটু নিজের হাতে নিয়ে বলে __” বিয়েতে হ্যাঁ বলেছি কারণ, তুমি আমার ভালোবাসা গ্রহণ করছো না। তোমার কাছে কতো বার নিজের ভালোবাসার দাবি নিয়ে এসেছি আমি বলো।কিন্তু তুমি বার বার ফিরিয়ে দিয়েছো। খুব অভিমান জমেছে তোমার উপর। তাই রাগের মাথায় বাবাকে হ্যাঁ বলে দিয়েছি! ”
জিনিয়া রোহানের হাত থেকে নিজের হাত ঝাড়া দিয়ে সরিয়ে নেয়।
__” হ্যাঁ যখন বলে দিয়েছেন, তাহলে বিয়ে করে ফেলুন। ”
রোহান রোহান শান্ত কন্ঠে বলে ওঠে—
— “বিয়েতো করবই। কিন্তু আমি জানতে চাই কী এমন ঘটেছে তোমার সাথে যার জন্য এতো দিধা, এতো অনিহা ছেলেদের প্রতি ?”
জিনিয়া শান্ত গলায় উত্তর দেয়,
— “রোহান ভাই, কিছু অতীত আছে যা বলা যায় না। ভুলে যেতে হয়। ”
রোহান এবার আর নরম থাকে না। তার চোখে জেদ, গলায় দৃঢ়তা—
— “না! আজ না জেনে আমি ফিরব না। তোমার অতীত যদি আমার জন্য বাঁধা হয়, তবে আমার অধিকার আছে সেটা জানার।”
জিনিয়া চুপ করে থাকে। মুখে হাসি রাখলেও বুকের ভেতর ঝড় বইছে। কিন্তু রোহান থামে না। একের পর এক প্রশ্নে জিনিয়ার বুকটা ভারী হয়ে ওঠে। অবশেষে সে ভেঙে পড়ে, চোখ ভিজে ওঠে, কণ্ঠ কেঁপে যায়। তারপর ও বলে না সে। আর রোহান আজ সবটা না যেনে কিছুতেই যাবে না। জিনিয়ার এমন নিরবতা ভেঙ্গে দিচ্ছে রোহান কে।
রোহানের অস্থিরতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে ঘরের প্রতিটি জিনিস এখনই তার শত্রু মনে হচ্ছে। জিনিয়া যখন মুখ খুলতে অস্বীকার করল, রোহানের ভাঙা হৃদয় আর যুক্তি—সব কিছু একসাথে গলিয়ে পড়ল। সে আর কথা শুনল না; চুপচাপ ঘরটিতে ছুটে ছুটে নানান জায়গায় চোখ বোলাতে থাকে—টেবিলের উপর থেকে, তাকের কোণ থেকে, দেয়ালের কাজে লাগানোর ছোটখাটো জিনিসপত্র থেকে কিছুই বাদ যায় না। নিঃশব্দে যেন তার ভেতরের কষ্টের আগুন আরও জ্বলছে।
তার চোখ পড়ে ড্রসিং টেবিলে রাখা কাচের ফুলদানিটায়। সূক্ষ্ম, পাতলা কাচ—দীর্ঘদিন ধরে ঝালাই না হওয়া এক স্মৃতি-জিনিস। রোহান হাত বাড়িয়ে সেটাই ধরল; হঠাৎ একটা অচেনা, উগ্র সিদ্ধান্ত নিয়ে সে এক ঝটকায় ফুলদানিটা ভেঙে ফেলে—রোহান কাঁপতে থাকা হাতে ভাঙা ফুলদানিটা গলায় ধরে, কণ্ঠে কেঁপে ওঠা কণ্ঠস্বর—
— “তুমি যদি না বল, আমি… আমি নিজেই শেষ করে দেবো।”
জিনিয়ার ধাক্কা খেয়ে দম বন্ধ হয়ে আসে। সে ছুটে এসে রোহানের হাত থেকে মিশে যাওয়া কাচ টানতে চায়, কিন্তু রোহানের পাগলামি তত শক্ত—সে পিছু হটে, চোখে এক অসম ক্ষমার চাহনি। জিনিয়া ভয়ে ভয়ে, কন্ঠ কাঁপিয়ে বলে—
— “রোহান ভাই, এমন কিছু করবেন না। ”
তবু রোহান থামল না। তার চোখে ললাটে ভেজা ঘাম, কণ্ঠে ধুলো–ধুলো; পাগল এইরকম এক চড়াই-উতরাই আচরণে যেন সবকিছু শেষ করে দিতে চায়—নিজেকে ছাড়া অন্যকে আর কিছু দেখতে চায় না। জিনিয়া দ্রুত এগিয়ে এসে তার মুখে হাত রাখে, কান্নাজড়িত কণ্ঠে অনুনয় করে—
— ” বলব। কিন্তু দয়া করে, আপনি নিজের ক্ষতি করবেন না।”
রোহানের ভিতরটা আরেক সেকেন্ডে ভেঙে পড়ে; সে কোনো যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। ঠিক তখনই জিনিয়ার গলাটা ভেঙে যায়—কী আশ্চর্য, এতক্ষণ ধরে ছিপছিপে থাকা সেই শব্দ বেরিয়ে এল, চিৎকার করে—
— “আমি ধর্ষিতা! আমি ধর্ষিতা! ওই পশুগুলো আমার সুন্দর জীবন টা নরক করে দিয়েছে। ”
শব্দটা ঘরে পড়ে আলোড়ন তুলল। রোহানের হাত হঠাৎ শক্ত হয়ে, কিছুখানি স্তব্ধ হয়ে যায়—তার চেয়ার মতো মনের সব স্তর কেঁপে ওঠে। জিনিয়ার কণ্ঠে থাকা যে অশ্রান্ত কষ্ট, সেই কাহিনি এক ছোঁয়ায় বেরিয়ে এসেছে। রোহান কাচটা টেনে ধরে থাকা হাতটা অজান্তেই ঢিমে করে ছেড়ে দিল; ভাঙা কাচটা মাটিতে পড়ে গড়ায়।
এই শব্দটা যেন রোহানের মাথায় বজ্রপাত হয়ে বাজলো। সে মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে যায়। তার নিঃশ্বাস আটকে আসে।
ঝিমুনি নেমে আসে—কিন্তু এটা হঠাৎ শান্তি নয়, বরং অনিশ্চিত সাস্পেন্স। রোহান সোজা হয়ে বসল, মুখের রং বদলে গেছে। তার চোখে লজ্জা, ভয়, রাগ—সব মিশে আছে। সে কাঁদছে; কিন্তু কাঁদা বলবেই জোরেই আক্রমণ করে না—তার কন্ঠে শুধু হাহাকার, বোঝাপড়ার আকিড়।
জিনিয়া মাটিতে লুটিয়ে কেঁদে যাচ্ছে, আত্মার ভিতর থেকে ছিঁড়ে আসা সব কণ্ঠস্বর বেরিয়ে পড়ছে। রোহান উঠে এসে বাইরে পিছিয়ে থেকে না, ফিরে এসে জোরে জোরে বলল না—তার বদলে সে ধীরে ধীরে জিনিয়ার পাশে বসে, কাঁধে হাত রাখে, জিনিয়া ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে মেঝেতে আরও লুটিয়ে বসে পড়ে। তারপর ভাঙা গলায় বলে যেতে থাকে—
“আমি তখন ক্লাস নাইনে পড়ি। প্রতিদিন স্কুল শেষে বাসার গাড়ি আমাকে আনতে আসতো। কিন্তু সেদিন গাড়ি এল না। আমি ভেবেছিলাম একটু দেরি করছে। বান্ধবীরা একে একে বাড়ি চলে গেলো, আমি একা রাস্তায় দাঁড়িয়ে রইলাম। ঠিক তখনই এক পরিচিত লোক এলো—আমাদের দূরের আত্মীয়। আমি দুই এক বার দেখেছিলাম তাকে। সে বললো, ‘চলো তোমাকে পৌঁছে দিই।’ আমি নির্দ্বিধায় উঠে পড়লাম গাড়িতে।”
জিনিয়ার চোখ দিয়ে টপটপ করে অশ্রু পড়তে থাকে। কণ্ঠ কাঁপতে কাঁপতে সে বলে—
“কিন্তু সে আমাকে বাসায় না নিয়ে শহরের বাইরে ফাঁকা জায়গায় নিয়ে গেলো। গাড়ি থামলো অন্ধকার মাঠের পাশে। আমি কিছু বোঝার আগেই তিনজন লোক গাড়ির ভেতর ঢুকে পড়লো। তারা আমার মুখ চেপে ধরলো, হাত-পা বেঁধে ফেললো। আমি চিৎকার করার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু কোনো শব্দ বের হলো না।”
জিনিয়া কাঁপতে কাঁপতে থেমে যায়, তারপর আবার বলতে শুরু করে—
“আমি মরার মতো লড়াই করছিলাম, কিন্তু তারা ছিলো তিনজন। আমার ইউনিফর্ম ছিঁড়ে ফেললো, আমাকে মাটিতে ফেলে দিলো। আমার চোখের সামনে আকাশ অন্ধকার হয়ে যাচ্ছিলো। তারা একে একে আমাকে নরকের মধ্যে ঠেলে দিলো। আমি শুধু চাইছিলাম মারা যেতে। সেদিন যদি ওরা আমায় মেরে ফেলতো তাহলে এই সমাজ থেকে আমাকে লুকিয়ে বাচাতে হতো না। ”
সে কান্নায় ভেঙে পড়ে, কিন্তু থেমে যায় না—
“ওরা চলে যাওয়ার পর আমি রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে ছিলাম। কোনোভাবে বাড়ি ফিরেছিলাম,কেউ ছিলো না বাসায় ঐদিন। কী দূর্ভাগ্য আমার তাই না। কিন্তু কাউকে কিছু বলিনি। মা–বাবার চোখে চোখ রাখতে পারতাম না। ভেবেছিলাম যদি বলি, তারা হয়তো মরে যাবে লজ্জায়। তাই সব লুকিয়ে রেখেছিলাম। দিনকে দিন আমি ভেতরে ভেতরে পুড়ে যাচ্ছিলাম। সেদিন রাতে আমার খুব জ্বর আসে। আম্মু সারারাত জেগেছিল বসেছিল আমার মাথার পাশে। যখন আমি জ্বরের ঘোরে আবোলতাবোল বলতে থাকি তখন আম্মু আমার অপুষ্ট কথাগুলো বোঝে ফেলে। আম্মু আমার রুমে কাউকে থাকতে দেয়নি সেদিন। সবাই অনেক চেষ্টা করেও থাকতে পারে নি। আম্মু আমায় বুকে জড়িয়ে সেদিন খুব কান্না করছিলো। আমার কাছে বার বার ক্ষমা চেয়েছে।আমি জ্বরের ঘোরে থাকলোও বোঝতে পারেছিলাম সব। এক টানা একুশ দিন হাসপাতালে ভর্তি ছিলাম। যখন সুস্থ হলাম, তখন জীবনের সব রঙধনু কালো হয়ে যায় আমার। ”
জিনিয়া কাঁদতে কাঁদতে বলে,
— “সেদিন আমার শৈশব, আমার স্বপ্ন, আমার ভবিষ্যৎ—সবকিছু ছিনিয়ে নিয়েছিলো তারা। আমি তখন থেকেই মরে গেছি, রোহান ভাই। আপনি আমাকে বিয়ে করতে চান, কিন্তু আমি চাই না আমার এই কলঙ্কের দাগ আপনার ভবিষ্যৎ নষ্ট করুক।”
তার চোখ দিয়ে অঝোরে পানি ঝরে।
রোহান পুরোটা শুনে নির্বাক হয়ে যায়। তার বুকের ভেতর তীব্র ঝড় উঠছে, কিন্তু মুখ দিয়ে শব্দ বের হয় না। তার মনে হয় কেউ বুকের ওপর পাহাড় চাপিয়ে দিয়েছে। কিছুক্ষণ জিনিয়ার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়।
জিনিয়া ভয়ে ভয়ে তার দিকে তাকায়। হয়তো সে ভেবেছিল রোহান ঘৃণা করবে, তাকে ছেড়ে চলে যাবে। আর ঠিক তাই-ই হলো—রোহান নিঃশব্দে দরজার দিকে এগিয়ে গেলো।
দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেলো কোনো কথা না বলেই।
ভেতরে বসে জিনিয়া হাহাকার করে কাঁদতে থাকে। তার বুক ফেটে যাচ্ছে, মনে হচ্ছে জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটিকেও হারালো সে।
রোহান বাইরে গিয়ে অন্ধকার আকাশের দিকে তাকায়। তার চোখ ভিজে ওঠে, বুকের ভেতর থেকে দীর্ঘশ্বাস বের হয়। সে মনে মনে ভাবে,
“কী ভয়ংকর অতীত নিয়ে বেঁচে আছো তুমি চাঁদ সুন্দরী । … কতটা অসহায় ছিলো সে তখন! আমি কীভাবে এখন তোমার সামনে দাঁড়াবো? ভালোবাসি তোমাকে, কিন্তু ভালোবাসা কি যথেষ্ট?”
আর ভেতরে বসে জিনিয়া আরও জোরে জোরে কাঁদতে থাকে।
রোহান থেমে কয়েক মুহূর্ত। তারপর আবার জিনিয়ার রুমের সামনে এসে দাঁড়ায়। জিনিয়ার বুক ফাটা কান্না যেনো ওর কানে বিষের মতো লাগছে। এতো এতো কষ্ট লুকিয়েছিলো এতোদিন, কান্না করতে পারেনি। মন খুলে কাউকে কষ্টের কথাগুলো বলতে পারে নি। আজ না হয় একটু মনে বরে কান্না,করুক সে। ঘরের বাইরে এসে চারপাশে চোখ বোলায়, যেন কল্পনা করে সে প্রতিটি আসল অপরাধী কোথায়। সে মনে মনে বলে—
— “আমি তাদের সব কিছু ছিনিয়ে নেবো—শুধু তোমার জন্য। তাদের সুখ, শান্তি, সব কিছু শেষ হয়ে যাবে। তুমি শুধু আমার পাশে থাকবে।একটু সময় দিবে প্লিজ। আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, চাঁদ সুন্দরী । আমি ঐ জানোয়ারদের চোখ খুলে তোমার সামনে রাখব।যে চোখ দিয়ে তোমার দিকে নোংরা ভাবে তাকিয়েছে।তাদের হাত কেঁটে তোমার সামনে রাখব। যে হাত দিয়ে তোমায় নোংরা ভাবে ছুঁয়েছে। শুধু আমায় একটু সময় দাও।”
কথা গুলো ভাবছে আর জিনিয়ার মুখটা বার বার বেসে উঠছে তার চোখের সামনে। কি অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলো তার দিকে।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখের পানি মুছে নেয় সে। প্রিয় মানুষের কষ্টের কথা শুনলে নিজের চোখে জল চলে আসে। এটাই ভালোবাসা।
চারিদিকে ফজরের আজান ভেসে আসছে। অর্ধেক অন্ধকারে ঢাকা আকাশ ধীরে ধীরে উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। নরম বাতাসে ভোরের স্নিগ্ধতা ছড়িয়ে পড়ছে। সেই ভোরের নীরবতায়ও জারা এখনো শুয়ে আছে আরমানের বুকে, চোখ আধখোলা, ঠোঁটে নিঃশ্বাসের শব্দ, কিন্তু মনে হচ্ছে এ যেন পৃথিবীর সবথেকে নিরাপদ আশ্রয়।
আরমান কিছুক্ষণ নীরবে তাকিয়ে রইল জারার দিকে। তার বুকের ভেতরে জারার চুলের গন্ধ, নিঃশ্বাসের উষ্ণতা—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। কিন্তু মনের ভেতর আবারও দুশ্চিন্তার হাওয়া বইছে। চারদিকে আজানের ধ্বনি মানে সকালের শুরু, আর সকালের শুরু মানেই বাড়ির লোকজন জেগে উঠবে। আরমান জানে, যদি এখন কেউ এসে তাদের একসাথে দেখে ফেলে, তাহলে অনেক কথা উঠবে, অনেক প্রশ্ন উঠবে।
সে আস্তে করে জারার কাঁধে হাত রাখল—
— “মানজারা… শোনছো, উঠো।”
জারা নড়ল না। চোখ বন্ধ রেখেই ফিসফিস করল—” আম্মু আর একটু ঘুমাই! ”
আরমান জারা’র কথায় আলতো হাসলো। জারা ভাবছে তাকে ওর আম্মু ডাকছে।
__” আমি তোমার আম্মু নই। তোমার একমাত্র স্বামী মানজারা। ”
__”যেই হোন না কেন আমি আরও ঘুমাব। ”
আরমান হেসে দিল, জারার মাথায় চুলে হাত বুলিয়ে দিল।
— “আমিও চাই না তুমি উঠো, কিন্তু যদি কেউ দেখে ফেলে, তাহলে ঝামেলা হবে। তুমি জানো না, আমি তোমাকে নিয়ে কতটা ভয়ে থাকি।”
জারা এবার ধীরে ধীরে চোখ খুলল। চোখে লালচে আভা, সারারাতের ক্লান্তি, কিন্তু তবুও দৃষ্টি ভরা ভালোবাসা। সে উঠে বসল, চুলগুলো এলোমেলো হয়ে মুখ ঢেকে দিয়েছে। আরমান কাছে টেনে নিল তাকে।এলোমেলো চুলগুলো ঠিক করে দিল।
— “এবার তুমি ওঠো। আমি তোমার জন্য কিছু আনেছিলাম। কিন্তু আমি সেগুলো দেওয়ার তোমার চোখে ঘুম চলে এলো!”—বলেই আরমান পাশের ব্যাগটা টেনে নিল।
জারা অবাক চোখে তাকাল।
— “কী আছে ওখানে?”
আরমান দুষ্টু হাসি দিল, ব্যাগ খুলে একে একে বের করতে লাগল। একটা লাল রঙের ইন্ডিয়ান গুজরাটি সারারা, তার মধ্যে সোনালি কাজ করা ওড়না, একজোড়া নূপুর , আর হিরের আংটি ছোটখাটো প্রসাধনী সামগ্রী। সব মিলিয়ে যেন ছোট্ট এক পৃথিবী সাজানো।
জারার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
— “এসব কী?!”
আরমান গম্ভীর মুখে বলল—
— “এসব তোমার জন্য। আমার লক্ষি বউয়ের জন্য।”
জারা সঙ্গে সঙ্গে মুখ গোমড়া করে ফেলল।
— “আমি এগুলো নিতে পারব না। ”
আরমান কপাল কুঁচকালো।
— “কেনো নিতে পারবে না? আমি তোমার স্বামী। তোমার জন্য কিছু এইটুকু কিন্তু আমার দায়িত্ব, আমার ভালোবাসা।”
জারা নিচু চোখে মৃদু গলায় বলল—
— “তবুও… জানি না কেন, মনে হচ্ছে অস্বস্তি লাগছে।”
আরমান এবার নাটকীয়ভাবে জামার উরনাটা জারার কাঁধে চাপিয়ে দিল।
— “অস্বস্তি মানে কী? বউয়ের জন্য পছন্দ করে ড্রেস কিনলাম, বউ যদি না পরে তাহলে রাগ করে চলে যাব কিন্তু !”
জারা অবাক হয়ে তাকাল।
— “সত্যি রাগ করবেন?”
— “অবশ্যই করব। তুমি যদি আমার উপহার গ্রহণ না করো, তবে মনে করব তুমি আমাকে মন থেকে গ্রহণ করোনি।”
জারা হাসতে না চেয়ে পারল না। ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।
— “আপনি একদম বাচ্চার মতো কথা বলছেন।”
আরমান কৃত্রিম রাগের ভান করল।
— “হুম বাচ্চাই আমি ? এই বাচ্চাই তোমার জন্য সারারাত জেগে ছিলো।আর তুমি তার বুকে আঙুল চুষে সারারাত ঘুমিয়েছো।”
__” আঙুল চুষে মানে? ”
আরমান জারা’র গাল টেনে দিয়ে বলে
__” হুম আঙুল চুষে। বউ আমাকে বাচ্চা বলছে। কিন্তু আমার এই লক্ষি বউটার এখনো বাচ্চামি যায় নি।
দু’জনের মধ্যে খুনসুটি শুরু হয়ে গেল। আরমান পেকেট গুলো ধরিয়ে দিল, জারা সরিয়ে রাখল পাশে। আরমান আংটিটা হাতে তুলে নিয়ে পড়িয়ে দিলো। নূরুপ গুলো জারা’র পায়ে পরিয়ে দিতে যাবে, কিন্তু জারা বাদা দেয়। পায়ে হাত দিতে দেয় না আরমানকে সে। জারা লজ্জায় মুখ ঢেকে দিল। এভাবেই তাদের ভেতরকার ভালোবাসার গভীরতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল।
জারা আবার বলল—
— ” আমার মনে হয় এগুলো আমার প্রাপ নই।”
আরমান তার ঠোঁটে আঙুল রেখে থামিয়ে দিল।
— “চুপ করো। তোমার ভালোবাসার কাছে এসব কিছুই না। তুমি শুধু আমার পাশে থেকো। আমি তোমার হাসি দেখতে চাই, তোমার কান্না মুছতে চাই। আমার জন্য এটাই যথেষ্ট।”
জারা চোখে জল নিয়ে তাকাল।
— “আপনি কেন এতটা ভালোবাসেন আমাকে?”
আরমান হেসে উত্তর দিল—
— “কারণ আমার হৃদয়ের প্রতিটি স্পন্দনে শুধু তোমার নাম লেখা আছে লক্ষি বউ ।”
ভোরের আলো তখন পুরো ঘর ভরিয়ে ফেলেছে। বাইরের পাখিরা ডাকছে। দূরে কোথাও রান্নাঘরে হাঁড়ির শব্দ, মানুষের ওঠার আওয়াজ। বাস্তবতার ডাক আসছে, কিন্তু ঘরের ভেতরে এই দু’জন যেন তাদের ছোট্ট পৃথিবীতে আটকে আছে।
আরমান আবার তাড়া দিয়ে বলল—
— “ঠিক আছে, এবার আমি যাই। যদি কেউ দেখে ফেলে, তাহলে তোমারও সমস্যা হবে, আমারও।”
জারা মাথা নেড়ে সম্মতি দিল, কিন্তু তার মুখে স্পষ্ট হলো না বিদায়ের প্রস্তুতি। সে আরমানকে জড়িয়ে ধরল শক্ত করে।
— “আমাকে ছেড়ে যাবেন না কখনো।”
আরমান তার কপালে চুমু দিল।
— “কখনো না। আজ কলেজে যাবে তুমি?”
জারা মাথা ঝাকিয়ে হুমম বলে।
__” আচ্ছা এগুলো হঠাৎ কেন আনলেন? ”
__”আমি কী আমার বউকে কিছু দিতে পারি না? ”
__” তা বলিনি। কিন্তু… ”
__” এটা পড়ে তুমি আমার সাথে ঘুরতে যাবে লক্ষি বউ। ”
জারা লজ্জা পেলো বেশ। আবার খুশিও লাগছে তার। আরমান তাকে নিয়ে ঘুরতে যাবে? খুশিতে গদগদ হয়ে বলে__” সত্যি নিয়ে যাবেন ঘুরতে? ”
__” তুমি চাইলে প্রতি দিন ঘুরতে যেতে পারি। কিন্তু….. ”
জারা কপাল কুঁচকে তাকায় আরমান এর দিকে।
__” কিন্তু আবার কী?”
আরমানের চোখে লেগে আছে ভালোবাসার নেশা। কন্ঠে মাদকতা নিয়ে বলে __” আমার যে একটু কড়া ডুজের আদর করতে মন চাই। আমার লক্ষি বউটা দিবে তো আমায় আদর করতে ? ”
জারার কান গরম হয়ে যায় আরমানের কথায়। কি নির্লজ্জের মতো কথা বলছে। কথার ছিড়ি তার। লজ্জায় গালদুটো রক্ত বর্ন দারণ করে।
আরমান বোঝলো তার ছোট্টো বউটা লজ্জা পাচ্ছে। তাই আরও লজ্জা দেওয়ার জন্য বলে
__” সারারাত জেগে বউ পাহারা দিয়েছি। তার বিনিময়ে আমি কী কিছু পাব না? ”
__” কি… কি চাই? ”
আরমান জারা’র কানে ফিসফিস করে বলে
__” তোমার ওই গোলাপি ঠোঁট দুটো একটু খেতে চাই। দিবে? সত্যি বলছি বেশি খাবো না, এক ঘন্টা পর ছেড়ে দিব। ”
জারা’র যেনো এবার কান দিয়ে ধোঁয়া বের হয়ে যায়। লজ্জায় আরও গুটিয়ে নেয় নিজেকে। আরমান এমন লাগাম ছাড়া কথা বলছে কী করে। কী নির্লজ্জ লোক খোদা। লজ্জায় নিজের দুই হাত কচলাচ্ছে জারা।
জারা কোনো উত্তর দিলো না। বুকের ভেতর এক অদ্ভুত মিষ্টি কষ্ট জমতে লাগলো। আরমান আরও এগিয়ে এসে তার কানে ফিসফিস করে বললো—
“শোনো মানজারা, যতবার তুমি আমাকে এভাবে এড়িয়ে যেতে চাও, ততবার আমি তোমাকে আরও কাছে টেনে আনতে চাই। তোমার এই লাজুক মুখটাই আমার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।”
জারা’কে লজ্জায় লাল হয়ে যেতে দেখে আরমান এবার একটু হেসে বলল—
— “তাহলে আজকের উপহারগুলো রাখো।আমি বরং যাই ভোরের আলো ছড়িয়ে পরছে চারদিকে। কেউ দেখে ফেললে সমস্যা।”
__” রাখব! কিন্তু আমার একটা শর্ত আছে।”
— “শর্ত?”—আরমান ভ্রু কুঁচকালো।
— “শর্ত হলো, এগুলো আমি কেবল আপনার সামনে পরব। না হলে আমি এগুলো সবসময় ব্যবহার করব না।”
আরমান হেসে উঠল।
— “ঠিক আছে। তবে ড্রেসটা পরে আমাকে দেখাতে হবে কালই। জাহেদ বললো তোমরা নাকি শাপলা বিলে যাবে ।”
__” যাব বলেছি। কিন্তু আম্মু যদি না দেয়।”মন খারাপ করে বলে জারা।
__” আমি জিনিয়াকে পাঠিয়ে দিব। তাহলে হবে? ”
জারা উপর নিচে মাথা ঝাকায়। মনে হবে!
দুজনেই হেসে উঠল। ভালোবাসা, খুনসুটি, গভীর ভালোবাসা মিশে আছে।
বিদায়ের সময় ঘনিয়ে এল। আরমান দরজার দিকে এগোল, পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখল জারা এখনো তার দেওয়া ড্রেসটার উড়না কাঁধে জড়িয়ে আছে। চোখে জল, ঠোঁটে মৃদু হাসি।
সে হাত নাড়িয়ে বিদায় জানাল।
জারা ধীরে ধীরে ফিসফিস করে বলল—
— ” সাবধানে যাবেন।”
আরমান দরজা পেরিয়ে চলে গেল, কিন্তু তার উপস্থিতি এখনো ঘরের ভেতরে রয়ে গেল—উপহারগুলোর মাঝে, জারার চোখের অশ্রুতে, আর ভোরের নরম আলোর মতো ভালোবাসার স্মৃতিতে।
জারাও ভোরের মৃদু আলোতে আশেপাশে ভালো করে দেখে নেয় কেউ আছে কী না। চারপাশে এখন কেউ নেই। তাই জারা তাড়াতাড়ি করে টিনের ঘরটার দরজা বন্ধ করে ছুটে আসে নিজের রুমে।রুমে আসার আগে মারজিয়া বেগম এর রুমে উঁকি দিয়ে আসে। রুমের দরজা লাগানো। সুস্থির একটা নিঃশ্বাস ফেলে জারা । এসেই আরমানের দেওয়া উপহার গুলো আলমারিতে লুকিয়ে রাখে সযত্নে। তার পর আবারও ঘুমিয়ে পরে।
ভোরের হাওয়া কেমন যেনো ঠান্ডা হয়ে বইছিল। চারদিক নিস্তব্ধ, শুধু পাখিদের ডাক শোনা যাচ্ছে। বড়মাঠটা কুয়াশায় ঢাকা, চারপাশে অল্প অল্প আলো ফুটতে শুরু করেছে। সময় তখন ভোর ৪টা ৪৫। আরমান একা একা মাঠের ভেতর দিয়ে বাড়ির দিকে হাঁটছে।
তার চোখ-মুখে ক্লান্তি, চিন্তার ছাপ। রাতভর কোনো ঘুম হয়নি। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে, বুকের ভেতর চাপা রাগ আর কষ্ট জমে আছে।
হঠাৎ পকেটের ভেতর মোবাইলটা কেঁপে উঠলো। স্ক্রিনে ভেসে উঠলো—রোহান কল করছে।
আরমান এক মুহূর্ত দ্বিধায় পড়লো। তারপর গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে কলটা রিসিভ করলো। ওপাশ থেকে রোহানের গলা ভেসে এলো, রাগে কাঁপছে—
“আরমান! কই তুই?”
আরমান গম্ভীর কণ্ঠে বলে __” কেনো? ”
শব্দ শুনেই আরমানের ভিতরের রাগটা যেনো আবার জেগে উঠলো।
রোহান রেগে আছে কিন্তু গলা ঠান্ডা স্বরে বললো—“তোর সাথে Important কথা আছে?”
রোহান আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু আরমান একটুও সুযোগ দিলো না। তার গলার স্বর ভারী হয়ে উঠলো।
__“ আমার কারো সাথে কোনো কথা নেই।”
এরপর আর কোনো কথা না শুনেই হঠাৎ কলটা কেটে দিলো। স্ক্রিন নিভে গেলো। চারপাশে আবার নিস্তব্ধতা।
আরমান থেমে মাঠের দিকে তাকালো কিছুক্ষণ। কুয়াশার ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মনে হলো—এই মুহূর্তে কারো সঙ্গে কথা বলার প্রয়োজন নেই, কারো সঙ্গও তার দরকার নেই। নিজের ভেতরের ঝড়টা সে একাই সামলাতে চায়।
ধীরে ধীরে মাঠ পার হয়ে সে এগিয়ে গেলো ফ্যাক্টরির দিকে। ভোরের আলোয় ফ্যাক্টরির গেট তখনও অন্ধকারে ঢাকা। ভেতরে ঢুকে সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো। মনে হলো—এই ফ্যাক্টরির কাজ, শব্দ আর যন্ত্রপাতির ভিড়ই তার একমাত্র আশ্রয়।বিশাল বড় সপ্ন জরিয়ে আছে তাদের এখানে। নিজেকে প্রমান করার নতুন একটা দিক টা।
সকাল আটটা বাজে। চারপাশে দিনের আলো একেবারে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। নদীর ঘাটে তখনো হালকা কুয়াশার আবেশ আছে, বাতাসে ভিজে ভিজে ঠান্ডা ভাব। জারা, মিম আর ফিহা তিনজন একসাথে কলেজের উদ্দেশ্যে বেরিয়েছে। ওদের হাসাহাসি, মজা করার শব্দে চারপাশটা যেন প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে।
“আল্লাহ ভাইয়া সত্যি তোর সাথে লুকিয়ে রাতে দেখা করতে গিয়ে ছিলো জানু?” মজার ছলে বলে ফিহা।
মিমও সঙ্গে সঙ্গে হেসে উত্তর দিলো—
“ আমাদের দুলাভাই কিন্তু বেশ রোমান্টিক ?”
তাদের কথায় জারা লজ্জা পেলেও তিনজনেই খিলখিল করে হেসে উঠলো। এই হাসির মধ্যেই তারা ঘাটে এসে পৌঁছালো। কিন্তু ঘাটে দাঁড়ানো দুইজনকে দেখে তারা থমকে গেলো।
সামনেই দাঁড়িয়ে আছে জাহেদ আর রাশেদ। দু’জনের মুখে হালকা গাম্ভীর্য, যেন কিছু অপেক্ষা করছে।
মিম একবার চোখ তুলেই রাশেদের দিকে তাকালো। রাশেদের চোখও ততক্ষণে মিমের ওপর স্থির হয়েছিলো। মুহূর্তটুকু যেন থেমে গেলো। কিন্তু মিম দ্রুত চোখ ফিরিয়ে নিলো, বুকের ভেতর ধুকপুকানিটা লুকিয়ে রাখলো।
এমন সময় জাহেদ এগিয়ে এলো। তার হাতে একটা ছোট্ট গিফট প্যাকেট। একটু অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে সে ফিহার দিকে তাকালো।
“ফিহা… এটা তোমার জন্য। কাল কিনেছিলাম।”
ফিহা মুহূর্তে চমকে গেলো। তার চোখে লাজুক ঝিলিক খেলে গেলো। সে কিছু বলতে পারলো না, শুধু গিফটটা হাতে নিয়ে নীরবে দাঁড়িয়ে রইলো।
এদিকে জারা আর মিম সুযোগটা ছাড়লো না। তারা দু’জন একসাথে হেসে উঠলো।
জারা মজা করে বললো—
“আহা! ফিহা জানু আমাদের জাহেদ দুলাভাই ও কিন্তু রোমান্টিক ?”
মিমও ঠাট্টা করে যোগ দিলো—
“ফিহা, তুই তো বললি না কেউ তোর জন্য গিফট কিনে ঘাটে এসে দাঁড়িয়ে থাকবে!”
ফিহার মুখ একেবারে লাল হয়ে গেলো। সে লজ্জায় কিছু বলার মতো অবস্থা খুঁজে পেলো না। শুধু হেসে নিচের দিকে তাকিয়ে রইলো।
জাহেদও অস্বস্তিতে পড়ে গেলো। তার গলার স্বর হালকা কেঁপে উঠলো—
“আরে, এটা তো এমনি… তেমন কিছু না।”
কিন্তু তার চোখে-মুখে স্পষ্ট লজ্জার ছাপ। ছেলেটি যতই বোঝাতে চাইছে, ততই যেন কথাগুলো ফাঁস হয়ে পড়ছে।
জারা আবার মজা করে বললো—
“হ্যাঁ হ্যাঁ, আমরা তো কিছুই বুঝি না?”
ফিহা জারাকে কনুই দিয়ে ধাক্কা দিলো, কিন্তু ততক্ষণে তিনজনেই আবার হেসে উঠলো।
জাহেদ আর রাশেদ একে অপরের দিকে তাকালো। তারপর জাহেদ একটু বিব্রত হাসি দিয়ে বললো—
“আচ্ছা, আমরা এখন যাই । পরে দেখা হবে।”
ওরা ঘুরে যাওয়ার সময় রাশেদ থেমে গেলো এক মুহূর্তের জন্য। তার চোখ আবার খুঁজে নিলো মিমকে। আর অবাক ব্যাপার হলো—মিমও তখন তার দিকেই তাকিয়ে ছিলো। চোখে চোখ মিলতেই সময় যেন থেমে গেলো। দুজনের ভেতরে ভেতরে যে কত কিছু জমে আছে, তা কেউ বুঝতে পারলো না।
কিন্তু মুহূর্তের ভাঙন এল খুব দ্রুত। রাশেদ নিঃশব্দে চোখ সরিয়ে নিলো, আর জাহেদের সঙ্গে হেঁটে চলে গেলো ঘাট থেকে ।
তাদের চলে যাওয়া পর্যন্ত মিম চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো। বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা শূন্যতা তৈরি হলো, আবার মিষ্টি একটা অনুভূতিও জমে থাকলো। জারা আর ফিহা অবশ্য মিমের মুখ দেখে কিছু বুঝলো মনে হয় । কিন্তুু কিছু বলল না। কলেজে গিয়ে ধরবে।
ফিহা ঠোঁটে দুষ্টুমি ভরা হাসি নিয়ে বললো—
“কী হলো মিম? কাকে দেখছিস ওই দিকে ?”
মিম লজ্জা পেয়ে তাড়াতাড়ি কলেজের পথ ধরলো। মুখে কিছু বললো না, তবে ভেতরে ভেতরে তার মনে যে দোলা উঠেছে, তা সে নিজেও অস্বীকার করতে পারলো না।
সকাল দশটা। উঠোনে বসে মারজিয়া বেগম টুকটাক ঘরের কাজ করছিলেন। ঝুড়িতে সবজি গোছাচ্ছেন, মাঝে মাঝে হাঁস-মুরগির দিকে তাকাচ্ছেন। এমন সময় পাশের বাড়ির রহিমা বেগম ঢুকে এলেন। তার মুখে চেনা হাসি থাকলেও চোখেমুখে কেমন যেন কূটনামি ঝিলিক।
রহিমা বেগম কাশির ভান করে বললেন—
“আপা, একটা কথা বলার ছিলো? রাগ করবেন না যেন।”
মারজিয়া বেগম ভ্রু কুঁচকে তাকালেন—
“কী ব্যাপারে, যে শুলনে আমি রাগ করতে পারি ?”
রহিমা বেগম ফিসফিস করে বললেন—
“আজ ভোরবেলা দেখলাম… আপনার বাড়ির দিক থেকে একটা ছেলেকে বের হয়ে যেতে।এই গ্রামের ছেলে বলে তো মনে হয় নি। এভাবে ভোরে কারো বাড়ি থেকে বের হওয়া কি ভালো কথা?”
কথাগুলো বলেই রহিমা বেগম একচোট কটূ হাসি দিলেন। যেন ইঙ্গিতটা স্পষ্ট—জারাকে নিয়েই তার সন্দেহ।
মারজিয়া বেগম একটু চুপ করে রহিমার দিকে তাকালেন। তারপর শান্ত গলায় বললেন—
“দেখেন আপা, আমি আমার মেয়েকে সবচেয়ে ভালো করে জানি। আমার জারা কোনো খারাপ পথে চলতে পারে না। আর আমার ঘরে কে আসলো না আসলো, সেটা নিয়ে কটূকথা বানানোর দরকার নেই।”
রহিমা বেগম আবার বলতে চাইলেন—
রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৪৪
“তা ঠিক, তবুও মানুষের চোখে তো—”
কথা শেষ করার আগেই মারজিয়া দৃঢ় স্বরে বলে উঠলেন—
“মানুষ যা খুশি বলুক, কিন্তু আমি জানি আমার মেয়ে কেমন। আপনি যদি সত্যিই আমার ভালো চান, তবে গুজব ছড়ানোর বদলে চুপ থাকবেন। কারণ সম্মান নষ্ট করা সহজ, কিন্তু ফিরিয়ে আনা কঠিন।”
রহিমা বেগম একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেলেন। আর কথা না বাড়িয়ে মাথা নিচু করে চলে গেলেন।
উঠোনে একা বসে মারজিয়া বেগম গভীর নিঃশ্বাস ফেললেন। নিজের মনে শুধু বললেন—
“আমার জারা কোনোদিন খারাপ কাজ করতে পারে না।”
