Home রৌদ্রময় বালুচর রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৬৭

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৬৭

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৬৭
সোহানা ইসলাম

ড্রইংরুমে সবাই বসে আছে, পরিবেশটা ভারী হলেও ভেতরে একধরনের অদৃশ্য কৌতূহল ঘুরে বেড়াচ্ছে। ফিহা চুপচাপ দাড়িয়ে আছে—তার দৃষ্টি মাটির দিকে, শ্বাস যেনো আটকে আছে ভয়ে। তখনই আরিফ খান পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা জারাকে আস্তে করে কাছে টেনে নিলেন। তার চোখে ছিল আন্তরিক প্রশ্নের ছায়া।
তিনি খুব নিচু গলায় জারাকে জিজ্ঞেস করেন
—“এটা কি তোমার বান্ধবী আম্মু? ”

জারা একটু লাজুক ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলে। জারার মুখে লুকানো হাসি বুঝিয়ে দেয়—সে ফিহাকে নিয়ে গর্বিত, আবার খান পরিবারের প্রতিক্রিয়া নিয়েও একটু চিন্তিত।আরিফ খান ফিহাকে দেখেছে রাশেদের বিয়ের সময়। মন্দ লাগেনি তার কাছে। আরিফ খান চোখের কোণে নরম হাসি ফুটিয়ে আবার জানতে চান ফিহা কেমন মেয়ে, স্বভাব কেমন। জারা খুব অল্প কথায় নিজের বান্ধবীর প্রশংসা করে—কিন্তু স্বর এত নিচু যে আশেপাশের কেউ শুনতে পর্যন্ত পায় না।
এরপর আরিফ খান এবার মিমকে ডাকেন। মিম এগিয়ে আসতেই তিনি একইভাবে জিজ্ঞেস করেন—“তোমার বান্ধবী কেমন আম্মু? ”

মিমও হাসতে হাসতে উত্তর দেয়, যেনো আগের উত্তরের সাথেই মিলিয়ে ফিহার ভালো দিকগুলো তুলে ধরে। তার চোখেমুখে একধরনের খুনসুটি ফুটে ওঠে, যেনো পরিবারের সামনে ফিহাকে নিয়ে একটু মজা করেও তারা তাকে আগলে রাখতে চায়।
আরিফ খানের সাথে আসিফ খানও কথা শুনছিলেন। তিনিও একটু নিচু স্বরে দুজনের সাথে খানিক কথা বলেন। মাঝে মাঝে দুদিকে তাকিয়ে নেন—কেউ যেনো শুনতে না পায়। এত চুপিচুপি কথাবার্তা দেখে জারার মুখে হাসি ফুটে ওঠে, মিমও চোখ টিপে দেয়। মনে হচ্ছিল দুই বোন যেনো বাবা-চাচার সামনে গোপনে কিছু বলছে, আবার লজ্জায় মুখ লুকাতে চাইছে।
ফিহা দূর থেকে দাঁড়িয়ে তাদের মুখের ভঙ্গি দেখছিল। তার বুকের ভিতর ধুকপুক করছিল, ভাবছিল—এতক্ষণ ধরে কী নিয়ে কথা বলা হচ্ছে? তবে জারা আর মিমের মুখের হাসি দেখে সে একটু স্বস্তি পায়। তাদের চোখের ভরসা যেনো জানিয়ে দিচ্ছিল, কোনো খারাপ কিছু হচ্ছে না।
কিছুক্ষণ পর আরিফ খান আসিফ খানের দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে সায় দিলেন। যেনো সিদ্ধান্তটা পরিষ্কার হয়ে গেল তাদের চোখাচোখিতেই। আরিফ খান তখন একটু সোজা হয়ে দাঁড়ালেন, যেনো এখন আর লুকানোর কিছু নেই।
ঠিক তখনই আরিফ খান সামনে থাকা সবাইকে উদ্দেশ্য করে একটু জোরেই বলে উঠলেন

__“তোমাদের বান্ধবীকে বসাও।”
তার কণ্ঠ দৃঢ়, কিন্তু তাতে কোনো রুক্ষতা নেই। বরং ভেতরে মমতা আর স্বীকৃতির ইঙ্গিত। ঘরে থাকা অন্যদের দৃষ্টি হঠাৎ ফিহার দিকে চলে গেল। জারা আর মিম দ্রুত এগিয়ে গিয়ে তাকে হাত ধরে বসাতে সাহায্য করল খান ম্যানশনের বড় ড্রইং রুমে।
আসিফ খান কন্ঠে রুক্ষতা রেখে আরমানদের দিকে তাকিয়ে বলেন
__“ তোদের বিজনেস ট্রিপে পাঠিয়েছি আমরা, আর তোরা এক এক করে বউ নিয়ে হাজির হচ্ছিস?”
আরমান মাথা নিচু করে হাসে।জাহেদ দাড়িয়ে আছে রাশেদের সাথে। এখন আর বেশি কিছু বলা মানে জেছে বিপদে গারে আনা। রোহান ফিহার কাছে গিয়ে বলে
__“ তোমার কপাল পুরলো বোন! অন্যের শশুড় বাড়িতে শাশুড়ী কুটনি থাকে, কিন্তু তোমার বেলা ভিন্ন কারণ তোমার শশুড় নিজেই পিএইচডি করা কুটনা!”
রোহানের কথায় ফিহা ঘাবড়ে যায়। চোখ তুলে আসিফ খানের দিকে তাকায়। বাকি সবাই মুখ টিপে হাসে। এই ছেলে সারাক্ষণ খুঁচাতে থাকে। আসিফ খান রোহানের দিকে রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। এই ছেলেটাকে তিনি কী করবেন ভেবে পান না। তিনি আরমান কে বলেন

__“ আরমান তোর বন্ধুকে আমার চোখের সামনে থেকে জেতে বল!”
__“ আপনার মেয়েকে দিয়ে দিলে, চলো যাবো,বলতেও হবে !”
আরিফ খান কথা বারান না।তিনি জানেন এই ছেলে থামার লোক না। ফিহা আবার চোখ তুলে দেখে পরিবারের সবার মুখ ছিল গম্ভীর। আরিফ খান, আসিফ খান, জেসমিন বেগম, ফারিয়া বেগম—সবার দৃষ্টি ছিল সরাসরি ফিহার উপর। প্রথম কথা বলার ভঙ্গিটাও ছিল একটু কড়া— যেনো পরীক্ষা নিচ্ছে, যেনো যাচাই করছে এই মেয়েটিই কি সত্যি তাদের ছোট ছেলের উপযুক্ত। ফিহা ভয়ে কেঁপে উঠেছিল। কথার চাপ, পরিস্থিতির ভার—সে প্রায় কান্না করে দেবে এমন অবস্থায় পৌঁছে যায়। জিনিয়া আর ছায়মা তাড়াতাড়ি এসে ফিহার পাশে বসে।মেয়েটা খুব ভয় পেয়েছে।
ঠিক তখনই সবার মুখে হাসি ভেঙে পড়ল। পুরো পরিবেশ মুহূর্তেই বদলে গেল। জেসমিন বেগম উঠে এসে ফিহাকে জড়িয়ে ধরলেন—যেনো প্রথমদিনেই তাকে বৌমা হিসেবে মনে থেকে মেনে নিলেন। ফিহা বিস্মিত, কেঁপে থাকা চোখগুলো ধীরে ধীরে শান্ত হতে থাকে।
আরমান পাশে দাঁড়িয়ে ছিল; জাহেদ ওকে দেখে এমনভাবে তাকালো যেনো ওর পৃথিবীটাই স্থির হয়ে গেছে। পরিবার তখনই বুঝে গেল—ফিহা তাদের বাড়ির নতুন সদস্য হতে চলেছে।
আর জাহেদ? সে আর সময় নষ্ট করল না। সরাসরি জানিয়ে দিল—সে বিয়ে করতে চায়। এখনই, যত দ্রুত সম্ভব।
পরিবার প্রথমে একটু আপত্তি করল। বিশেষ করে আসিফ খান।

__“ একে তো মেয়ে উঠিয়ে এনেছিস, আবার নির্লজ্জদের মতো বিয়ের জন্য লাফালাফি করছে।”
__“ বিয়ে করব বলেই তো মেয়ে উঠিয়ে এনেছি। ” বললো জাহেদ।
আসিফ খান গিয়ে ফিহার পাশে বসেন। মাথায় হাত ভুলিয়ে দেনয়। ফিহার ভয় কিছুটা কমে আসে।আসিফ খানের এমন ভালো মানুষী দেখে রোহান মুখ বাঁকায়। জেরিন দৌড়ে গিয়ে ফিহাকে জড়িয়ে ধরে বলে
__“ সাদা পরি আর মিম ভাবির মতো তুমি আমার ভাবি হবে।”
জেরিন ফিহাকে আগে থেকেই চিনে। ফিহা কিছু বলে না। চুপ করে থাকে। জিনিয়া জেরিন কে বলে
__“হ্যাঁ ভাবি হবে!”
__“ তাহলে আমার তিনটা ভাবি হবে! ” বলেই খুশিতে আত্মহারা। ফারিয়া বেগম এসে ফিহার সাথে টুকটাক কথা বলেন। যাতে ফিহার ভয় দূর হয়। জেসমিন বেগম আর ফারিয়া বেগম বললেন
__“ আরমান আর জারা’র বিয়ের সাথে ফিহা আর জাহেদ ও বিয়েটা সেরে ফেললে
মন্দ হয় না! ”

__”এখনই এত তাড়াহুড়ো কেন? আর জাহেদ এর এখনো স্টাডি কমপ্লিট হয় নি ?”— এমন প্রশ্ন উঠল।
কিন্তু জাহেদের চোখের দৃঢ়তা দেখে সবাই নিশ্চিত হলো, এ সিদ্ধান্ত আর বদলাবে না। সে যেনো ফিহাকে হারানোর ভয়েই আছে। তার রাগ, তার ঝগড়া—সবকিছু মিলিয়ে ওর ভিতরের ভালোবাসা টাই স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছিল।
অবশেষে সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিল—আরমান আর জারার বিয়ের সাথেই জাহেদ ও ফিহার বিয়েও হবে। এই সিদ্ধান্তে সবাই খুশি হলেও একজনের মাথার উপর যেনো বজ্রপাত হলো—রোহান।
সে আকাশ ভেঙে পড়ার মতো অনুভব করল।
“জাহেদ ছোট—আর সে আগে বিয়ে করে নিচ্ছে? আর আমাকে এখনো অপেক্ষা করতে হবে?”
তার চোখে যেনো ক্ষোভ, কষ্ট আর অবহেলার মিশ্র অনুভূতি। আর সবচেয়ে বড় কথা—ওর শশুর আব্বাকে এখনো সে পটাতে পারেনি।
এখনো জিনিয়ার পরিবার তার ব্যাপারে চূড়ান্ত সম্মতি দিলেও শশুর তার বড় কুটনা সিদ্ধান্ত দেয়নি।
রোহান আর সহ্য করতে পারল না। কাপ-গ্লাস ঝাপ করে ফেলল টেবিলে। হঠাৎ দাঁড়িয়ে বলল

—“ যদি জাহেদ বিয়ে করতে পারে, তবে আমিও করবে।
জিনিয়ার কথা এখন ওর মাথায় শুধু ঘুরছে। মেয়ে টাকে আর নিজের থেকে দূরে রাখতে চায় না। আজকাল বড্ড বেশি কাছে পেতে ইচ্ছে করে তাকে।তাই তো সময় অসময় হুট করে চলে আসে এই বাড়িতে। আর বাবার ও একজন মানুষের প্রয়োজন। যে তার সাথে সারাদিন বসে গল্প করবে।এখন ব্যবসার সামলাচ্ছে আরমানের সাথে। রোহানের বাবা আর আরমানের বাবা বিজনেস পার্টনার। এখন রোহানের বাবার বয়স বেরে গেছে, অসুস্থ। রোহান একবার তার চাঁদ সুন্দরীর দিকে তাকায়।
জিনিয়া লাজুক হয়ে ফিহার পাশে বসে আছে। কিন্তু চোখেমুখে বোঝা যাচ্ছিল—সে রোহানের কথাতেই থাকতে চায়। পরিস্থিতি জমাট বাঁধতে বেশি সময় লাগল না।
ঠিকই হলো—পরের দিন সকালে আসিফ খান রোহানকে ডেকে বসালেন।

__“ কি চাচ্ছো তুমি? ”
__“ আপনার মেয়েকে! ” রোহানের সোজাসাপটা জবাব।
__“ আমি আমার মেয়েকে একবছর পর তুলে দিব। আপত্তি আছে কোনো? ”
__“ ১০০% আপওি আছে। হয় মেয়ে এখন দিবেন না হয় আমি নিজেই ওকে নিয়ে কাজি অফিসে বিয়ে করে সংসার করা শুরু করে দিব।”
__“ ফাজলামো করছো আমার সাথে? ”
__“ আমি না! আপনি আমার সাথে করছেন! ”
__“ মানে?”
__“ বিয়ে তো আগেই ঠিক হয়েছিলো, তাহলে এখন কেন…!”
__“ তুমি বিয়ে নিজেই বিয়ে ভেঙে দিয়েছিলে, ভুলে গেলে?”
__“ খুদার কসম! আমি যদি যানতাম সেদিন আমার সাথে চাদঁ সুন্দরীর বিয়ে ঠিক হয়েছিল তাহলে কখনো না করতে না। এই কথা আমি আগেও বলেছি।আর আমার আব্বুর শরীর ও বেশি ভালো না তা নিশ্চয় জানেন আপনি। ”

__“ হ্যাঁ যানি! ”
__“ তাহলে কেন এমন করছেন আমার সাথে শশুড় আব্বা ? আপনার মেয়েটাকে খুব প্রয়োজন আমার। একবার কী আমার উপর একটু দয়া করে আপনার আদরের মেয়েটা আমার হাতে তুলে দেওয়া যায় না? কোনো কিছুর কমতি রাখব না অযত্ন করব না কখনো। আপনার মনের মতো আমি আপনার মেয়েকে রাখবে। যাতে কোনো দিন না কিছু বলতে পারেন। ”
__“ঠিক আছে, তোমার বাবাকে কাল আসতে বলো!”
__“আমি বললো কেন? আপনার ফোনে টাকা নেই, কল করে বলুন আপনি! ”
__“ বিয়ে করতে চাও! ” কিছু টা ক্ষিপ্ত হয়ে বলেন আসিফ খান।
__“পাগল ও চায় বিয়ে করতে সেখানে আমি একজন সুস্থ মানুষ! ”
__“ তাহলে তুমি বলবে না! ”
__“আপনিই বলুন, আমি পারব না, নিজের বিয়েরকথা বাপ কে জানাতে। আমার লজ্জা করে। ” বলেই লজ্জা পাওয়ার ভঙ্গিতে মুখ ডেকে নেয়। তা দেখে সবাই হেসে ফেলে।
আসিফ খান রোহানের উপর অনেক রেগে যান।এই ছেলে তার কথা একটাও মানে না। প্রথমে একটু ঝগড়া হলো। কঠোর সুরে কথা বললেন—

যেনো বাবার দায়িত্ব বুঝিয়ে দিচ্ছেন। রোহানও রাগ কম দেখাল না; বহুদিনের অভিমান যেনো ফেটে পড়ছিল। সে বিয়ে করেই ছাড়বে।তাকে কেউ বাদা দিতে পারবে না। অনেক অপেক্ষা করছে আর না।
কিন্তু শেষে আসিফ খানই নরম হলেন। ব্যাপারটা বুঝলেন। রোহানের চোখে যে জেদ, যে দৃঢ়তা—তা কোনো সাময়িক আবেগ না।ও সত্যিই জিনিয়াকে ভালোবাসে। তিনি মাথা নেড়ে সম্মতি দিলেন।
আরমান, জারা, জাহেদ, ফিহা—সবাই তখন ড্রইংরুমে বসে ছিল। রোহান খবরটা জানিয়ে দিতেই আনন্দের রোল উঠল। জিনিয়া মাথা নিচু করে ফেলল, আর সবার মুখে একরাশ প্রশান্তির হাসি।
সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিল—আর মাত্র চারদিন পর—একসাথে তিন জুটির বিয়ে হবে। আরমান প্রথমে চুপ ছিল।তার অভিমান, তার অস্থিরতা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। কিন্তু জারার দিকে তাকিয়ে সে ধীরে ধীরে নরম হলো। জোহান এসে আরমানের পাশে দাড়ায়।আরমান জোহানকে বলে
__“ এখন এসেছিস কেনো?এতোক্ষণ তো বাবার আঁচলের নিচে বসে ছিলি?”
আনিছুর রহমান আরমানের কথা শুনে ফেলে।কড়া চোখে তাকান তিনি। জোহান আরমানের দিকে দুই হাত তুলে ইশারা করে কোলে নেওয়ার জন্য। আরমান ভ্রু কুঁচকে বলে

__“ কী? ”
__“কোলে নাও! ”
__“ আমার কোল তোর বোনের জন্য শুধু..! ”
__“ বোনু সোফায় বসে আছে, আমাকে নাও এখন! ”
আরমান জোহানকে কোলে তুলে নেয়। শরীর টা কেমন ভার ভার লাগছে। জোহান আরমানের গলা জরিয়ে ধরে বলে
__“ দুলাভাই সবাই বিয়ে করে নিচ্ছে! ”
__“ তো কী হয়েছে?”
জোহান কিছু সময় চুপ থাকে। তারপর আবার বলে
__“ আমার বিয়ে করবে হবে? ”
আরমান প্রথম জোহানের কথা লক্ষ্য করে না। যখন ভালো ভাবে লক্ষ্য করে তখন বোঝতে পারে তার পটল শালাবাবু কী বলছে। ঠাসস করে কোল থেকে মানিয়ে আনিছুর রহমান কে বলে
__“ আমি না কি নির্লজ্জ! আমার লজ্জা নাই। এখন নিজের ছেলে, যার এখনো টুনটুনি কাটানোর বয়স হয় নি সে বিয়ের কথা বলছে!”
জোহান আরমানের দিকে তাকিয়ে থাকে। সে তো সরল মনে বলেছে আর এই লোক তা সবাইকে জানিয়ে দিয়েছে? সবাই ফিক করে হেসে ফেলে।জোহান গাল ফুলিয়ে রাখে। আনিছুর রহমান মারজিয়া বেগম কে গম্ভীর কণ্ঠে বলে

__“ ওকে রুমে নিয়ে ঘুম পারাও জাহিরের
আম্মু। ”
মারজিয়া বেগম ছেলেকে আরমানের কাছ থেকে নিয়ে যান।জোহান যাওয়ার সময় আরমানের দিকে তাকায়। সে এর সোধ তুলবে।আরমান মুখ বাঁকায়। তারপর একটা শয়তানী হাসি দিয়ে শশুড়ের দিকে তাকায়। বিজয়ের হাসি তার মুখে। রাশেদ জাহির বসে বসে তাদের এক একজনের কথা শুনছে।
বাড়ির পরিবেশ, সবার মুখের খুশি—সব মিলিয়ে সে অবশেষে মত দিল। ফারিয়া বেগম ছায়মা কে বলে
__“ ছায়মা ফিহাকে রুমে দেখিয়ে দে, ফ্রেশ হয়ে নিক মেয়েটা। ”
ছায়মা উজ্জ্বল মুখে বলে
__“ মামি, ছায়মা আমার রুমেই থাকবে না হয়। অন্য রুমের কি প্রয়োজন? ”
__“ তাহলে আমিও থাকবো তোদের সাথে। ” বললো জিনিয়া। জারাও তাল মিলিয়ে বলে
__“ আমাকে বাদ দিলে হবে না, আমিও আমার জানুর সাথে থাকবো!”
এটা শুনে আরমানের মুখ কালো হয়ে যায়। কিন্তু কিছু বলে না। জারা একবার তাকায় আরমানের দিকে। লোকটা ভালোই অভিমান করছে দেখা যাচ্ছে। মিমও বলে

__“ তাহলে আমিও থাকবো তােদের সাথে! ”
একথা শুনে রাশেদ বসা থেকে উঠে দাঁড়য়।আরমানের দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকায়। যেনো ওর জন্য তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হাত ছাড়া হয়ে যাচ্ছে। করুন সুরে আরমান কে রাশেদ ডাক দেয়
__“ স্যারররর! ”
আরমান কপাল কুঁচকে আসে রাশেদের ডাকে। কিছু বলে না। তার বউই তো ওর সাথে থাকে না।
আরমান উপরে চলে যাওয়ার জন্য পা বারায়। তখনই পিছন থেকে ফারিয়া বেগম বলেন
__“ আরমান তোর একটা পার্সেল এসেছে! ”
আরমানের পা থেমে যায়। ফারিয়া বেগম এর দিকে তাকিয়ে বলে
__“জায়গা মতো ফিট করেছে তো? ”
__“হ্যাঁ করে দিয়েছে, রুমে গিয়ে দেখে নিস! ”
আরমান আলতো করে হাসে। মায়ের দিকে তাকিয়ে আবার উপরে চলে যেতে নেয়। তখন আবার শুনা গেলো ফারিয়া বেগম এর কথা।

__“বউ পেয়ে আমার ছেলে এখন আমাকে কম ভালোবাসে! ”
আরমান এবার প্রশান্তির হাসি টানে ঠোঁটে।যে যানে তার মা তাকে কেনো এই কথা বলছে। প্রায় বলে তাকে। এটা নতুন না। কিন্তু আরমান প্রতি বার ওর মাকে নতুন ভাবে উওর দেয়। এবারও তাই। বড় বড় পা ফেলে এসে মাকে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু দিয়ে বলে
__“ আম্মু তুমি যানো আমি বাবা না হয়েও বাবা হয়েছি।আমার প্রথম সন্তান তুমি আর আব্বু। যারা আমাকে প্রথম বাবা বলে ডেকেছে। আমি বাবা হয়ে সন্তানদের কীভাবে কম ভালোবাসতে পারি বলো!”
জারা’র মুখে একরাশ হাসি।একটা মানুষ এতো টা ভালো হতে পারে। সবার মুখে হাসি ফুটে উঠে। আবেশ করে আনিছুর রহমান এর। আরিফ খান গর্ব করে বলে
__“ আমার ছেলে! ”
তার মুখেও লেগে আছে হাসি। ফারিয়া বেগম ছেলেকে মাথায় হাত ভুলিয়ে দেন। জেসমিন বেগম এসে বলেন
__“হুমমম! আমি তো কেউ না। ”
আরমান হাসে। তার আম্মু পর যদি তাকে কেউ মন থেকে আগলে রাখে সে হচ্ছে তার ছোট আব্বু আম্মু। আরমান জেসমিন বেগম কেও তার কাছে এনে মাথায় চুমু দিয়ে বলে
__“আমার তিন টা আম্মু। আর তারা আমার কাছে সমান।”
কথা টা বলে আরমান মারজিয়া বেগম এর দিকে তাকায়। তিনি মাএ ড্রইংরুমে এসে দাঁড়ান। আরমানের কথা তিনি বোঝেছেন। তাকে কতোটা সম্মান দিলো এই ছেলেটা।আনিছুর রহমানের আর কোনো অভিযোগ নেই আরমানের উপর।
জেসমিন বেগম সব ছেলে মেয়েকে তাড়া দিয়ে বলেন

__“ যাও আন্ডা বাচ্চারা, গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আসো ডিনার করবে সবাই। ”
জাহেদ রাশেদের কাঁধে হাত দিয়ে উপরে চলে যায়।যাওয়ার আগে একবার ফিহার দিকে তাকায়। ফিহা এখন হাসি মুখে সবার সাথে কথা বলছে। তাকে কতো সহজে সবাই আপন করে নিয়েছে। জাহির রোহানকে বলে
__“চলুন আমার সাথে, ফ্রেশ হয়ে নিবেন। ”
রোহান বলে
__“ না… না আমি বাড়ি চলে যাব এখন। বাবা বাড়িতে একা আছে।”
আসিফ খান রোহানকে বলে
__“ এ কথা এখন মনে পরলো তোমার? ”
জেসমিন বেগম বলে
__“আ..হা! কি হচ্ছে? রোহান তুমি এখন কোথাও যাবে না। একেবারে ডিনার করে তার পর যাবে।”
রোহান হেসে মাথা নেড়ে সায় দেয়।তারপর জাহিরের সাথে চলে যায়। ছায়মা ফিহাকে নিয়ে উপরে চলে যায়। মিমও যায় নিজের রুমে। জিনিয়া চলে যায় নিজের রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিবে।
ফারিয়া বেগম জারাকে বলে

__“তুই দাড়িয়ে আছিস কেনো, ফ্রেশ হবি না! ”
জারা এসে ফারিয়া বেগমের পাশে দাড়ায়।আরমানের দিকে তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নেয়। আরমান ওর মাকে বলে
__“আম্মু এক কাপ কফি পাঠিয়ে দিও তো!”
__“ ডিনার করবি না? ”
__“ খিদে নেই আম্মু! ”
জারা আরমানের এমন নিরবতা কেমন যেনো লাগছে।
__“শুনুন! ”
আরমান জারা’র ডাক শুনেও দাঁড়ায় না। চলে যায় রুমে।ফারিয়া বেগম জারা’র দিকে তাকিয়ে ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করে কী হয়েছে।
__“তোমার ছেলেকে মাইর দিয়েছি!”
ফারিয়া বেগম অবাক হয়ে বলেন
__“কী বললি? তুই আমার ছেলেকে মেরেছিস?”
জারা গাল ফুলিয়ে বলে
__“তো কী করব? তোমার ছেলে অন্যের কথা শুনে আমাকে কষ্ট দেয়! ”
ফারিয়া বেগম জারার দিকে রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন। জারা ভয়ে মাথা নিচু করে ফেলে। সে খুব বড় ভুল করে ফেলেছে। এখন ওর শাশুড়ী ও রেগে গেছে। চোখ তুলে তাকায় ফারিয়া বেগম এর দিকে। ফারিয়া বেগম ও ওর দিকে তাকিয়ে ছিলো। জারা’র অপরাধী দৃষ্টি দেখে ফিক করে হেসে ফেলেন।জারা’র গালে হাত রেখে বলেন

__“ জোরে দিয়েছিস, না কি আস্তে? ”
শাশুড়ীর কথা শুনে জারা’র আরও অবাক হয়। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে আবার মাথা নিচু করে ফেলে।
__“এটা তোমার ছেলে বলতে পারবে! ”
__“আচ্ছা পরে যেনে নিস! এখন যা ফ্রেশ হয়ে আয়। ”
জারা রুমে যাওয়ার আগে একবার মারজিয়া বেগম কে জড়িয়ে ধরে। আহ্লাদী মেয়ের মতলব ঠিক বোঝে যান তিনি। মেয়েকে চুলে সেম্পু করিয়ে দিতে হবে তিনি ঠিক বোঝেছেন।
জারা মায়ের দৃষ্টি দেখে হাসে। তাড়া দিয়ে নিয়ে যায় সাথে করে।

রাতের খাবার শেষ হতে না হতেই পুরো খান ম্যানশন অদ্ভুত নীরবতায় ঢেকে গেল। সবাই একে একে টেবিল ছেড়ে নিজ নিজ রুমে চলে গেলেও—একজনই আসেনি… আরমান। তার রাগ আজ পুরো বাড়ির বাতাস পর্যন্ত ভারী করে রেখেছে। জারা সেই নীরবতা, সেই দূরত্ব খুব ভালোভাবেই টের পাচ্ছে।
উপরে মেয়েদের রুমে গিয়ে ছায়মা, জিনিয়া আর ফিহা একসাথে বসে গল্পে মেতে আছে। হাসির শব্দ মাঝে মাঝে করিডোর পর্যন্ত ছড়ায়। এতকিছুর মাঝেও মিম চুপচাপ পড়ে আছে; রাশেদ তাকে অন্য রুমে যেতে দেয়নি। মিমের মনটা যদিও একটু খারাপ হয়েছিল, তবে সে জানে—স্বামীকে কষ্ট দেওয়া যাবে না। তাই কোনো অভিযোগ ছাড়াই নিজের রুমেই থাকে।
অন্যদিকে জারা শাশুড়ির আশেপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তার চোখে একই প্রশ্ন—আরমানের রাগ কীভাবে ভাঙাবে? কিভাবে স্বামীকে খুশি করবে? কীভাবে তাকে ফেরত নিয়ে আসবে নিজের কাছে?
ফারিয়া বেগম রাতের শেষের খাবার সাজিয়ে আনলেন। তারপর প্লেটটা জারার হাতে দিয়ে বললেন,

__“যা, আমার ছেলে কে খাবার খাইয়ে আয়।”
জারা ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলল।
__“যদি রুমে ঢুকতে না দেয়?”
__“ দিবে তুই যা! ”
__“তাহলে বলে দাও কীভাবে রাগ ভাঙ্গাব? ”
ফারিয়া বেগম হাসিমুখে টিসু দিয়ে হাত মুছতে মুছতে বললেন
—“তুই তোর স্বামীর রাগ কীভাবে ভাঙাবি সেটা আমি বলে দিব? নিজের বুদ্ধি খাটা।”
এসময় আরিফ খান ফারিয়া বেগমকে ডাকলেন, তিনি সেদিকে চলে গেলেন। এখন জারা একাই। প্লেট হাতে। প্রচণ্ড দুশ্চিন্তায়।
ধীরে ধীরে সে হাঁটল আরমানের রুমের সামনে। দরজায় টোকা দিল।ভিতর থেকে গম্ভীর কণ্ঠ
—“কে?”
জারা মিনমিন করে উত্তর দিল,

__“আমি… আমার স্বামীজানের একমাএ লক্ষী বউ বলছি গো।”
ভিতরটা নিস্তব্ধ। আরমান আর শব্দ করল না। সাড়া না পেয়ে জারা দ্বিধা নিয়ে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে গেল।
রুম ফাঁকা।বেডের পাশ, সোফা কোথাও নেই। জারা নিশ্বাস ছেড়ে বেলকনির দিকে তাকাল—সেখানেই।
সে বেলকনিতে গিয়ে দেখল আরমান আকাশের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার সারা শরীর থেকে অভিমান, রাগ, নীরবতা ছড়িয়ে পড়ছে।
জারা ধীরে গিয়ে পাশে দাঁড়াল।
__“রাগ করে আছেন স্বামীজান?”
আরমান কোনো উত্তর দিল না। জারা একটু হেসে, একটু ভেঙে পড়ে, একটু অনুনয় করে, একটু বাচ্চার মতো ন্যাকামি করে—সব রকমভাবে চেষ্টা করল তার রাগ ভাঙানোর।
আসলে আরমানের রাগ তো আগেই ভেঙে গেছে। সে শুধু এমনই রাগের ভান করছে—তার লক্ষী বউকে একটু মজা দেখানোর জন্য। জারা চুপিচুপি বুঝেও ফেলল সেটা। তার ঠোঁটের কোণে মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল।
হঠাৎ সে আরমানের কাঁধে ঝুলে পড়ল। কানের কাছে ফিসফিস করে বলল
—“সরি সরি সরি…গো আমার স্বামীজান!”
কিন্তু আরমান তখনও ভান ধরে আছে। কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। জারা গাল ফুলিয়ে, চোখ কুঁচকে, নাটুকে ভঙ্গিতে নেমে এল তার কাঁধ থেকে।

__“ঠিক আছে! কথা বলতে হবে কাউকে। আমি চলে যাচ্ছি।”
এতটাই রাগ দেখিয়ে বেলকনি থেকে বেরিয়ে যেতে লাগল। কিন্তু সে বেলকনির দরজা পার হওয়ার আগেই—আরমান পিছন থেকে জারাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
হঠাৎ টেনে নেওয়া সেই আলিঙ্গনে জারা থেমে গেল। আরমানের বুকের উষ্ণতা জারার পিঠ ছুঁয়ে যেতেই তার চোখ মুহূর্তে ভিজে উঠল।
আরমান মুখটা জারার গারে গুঁজে দিল।একটার পর একটা ছোট ছোট চুমু আঁকল। নরম, লাজুক, ক্ষমাপ্রার্থনার মতো আদর।
মুহূর্তেই সব ভুল বোঝাবুঝি, সব অভিমান, সব দূরত্ব গলে গেল।বেলকনির বাতাসে হঠাৎ উষ্ণতা তৈরি হলো…দু’জনের সেই ছোট্ট জগৎই যেনো নতুন করে জেগে উঠল।
__“ কখন থেকে অপেক্ষা করছিলাম, আসতে এতো লেট হলো কেনো?”
জারা ঘুরে আরমানের গলা জরিয়ে ধরে বলে
__“ আপনি কীভাবে জানলেন আমি আসবো?”
আরমান জারাকে নিজের সাথে আরও টেনে নিয়ে বলে

__“মনের একটা টান আছে না লক্ষী বউ!”
__“তাই! ”
__“হুমমম!”
__“তাহলে এতক্ষণ এমন করছিলেন কেনো?”
__“দেখছিলাম, আমার বউ আমার রাগ ভাঙ্গাতে কী কী করে? ”
__“ তো কি দেখলেন? ”
__“ আমার হাফ ইঞ্চি মেয়ে টা এখন সম্পূর্ণ ভাবে আমার লক্ষী বউ হয়ে গেছে। আর আমাকে বোঝতে শিখেছে। ”
তারপর আরমান জারার হাত ধরে রুমে ফিরে গেল। জারা তাকে বসিয়ে খাবার খাওয়াতে লাগল।খেতে খেতে আরমান আবার শুরু করল—
নেদার আদর, নেদার দুষ্টুমি, নেদার বিরক্তি একবার হাঁ করে বলে
—“এটা কী রান্না?”
একবার বলে
—“মাঝে মাঝে হাত কাঁপে কেন?”
__“আপনি বোঝবেন না! ”

—“লক্ষী বউ, তুমি তো আমাকে কাঁপা হাতে খাওয়ালে মুখ দিয়ে নয় নাক দিয়ে ঢুকে যাবে।”
জারা হাসতে হাসতে, কখনো চোখ রাঙিয়ে, কখনো ঠোঁট ফুলিয়ে—সবই সহ্য করল। খাওয়া শেষে জারা উঠতে চাইলে—আরমান আবার পিছন থেকে এসে জড়িয়ে ধরল।এইবার তার কণ্ঠে কোনো গম্ভীরতা নেই। নেই কোনো অভিমান।শুধুই মায়া, ভালোবাসা আর নরমতা—“লক্ষী বউ…”
জারার বুকটা কেঁপে উঠল। তার ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল অজান্তেই। এটাই ছিল তার স্বামী—তার আরমান…যে রাগ দেখায়, আবার অনেক ভালোবাসে।
__“বলুন! ”
__“হাতের জিনিস গুলো রেখে একবার আসবে?”
__“ কেনো?”
__“তোমাকে একটা জিনিস দেখানুর আছে!”
জারা আর দাঁড়ায় না, চলে যায় নিচে। দিকে রাতের নরম আলো। বাড়ির প্রতিটা করিডোর নিস্তব্ধ, যেন সবাই দিনের ক্লান্তি মাটিতে রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে। কিন্তু এই নীরবতার মাঝেই, ঠিক রাত এগারোটায়, জারার মনে উত্তেজনা আর একটুখানি কৌতূহল একসাথে মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। কারণ আরমান তাকে খুব স্পষ্ট করে বলেছিল

—“এগুলো রেখে একবার আসবে… একটা জিনিস দেখাবো।”
জারা তখন হাসতে হাসতেই নিচে নেমেছিল খাবারের প্লেটগুলো রাখতে।রান্না ঘর থেকে আরমানের রুমে যাওয়ার সময় ছায়মার রুম থেকে ফিহা, জিনিয়া আর ছায়মা এত গল্পে মেতে আছে যে জারা নিজেও গা ভাসিয়ে দেয় আড্ডায়। সময় কেটে যায় অজান্তেই। প্রায় এক ঘন্টা পর হঠাৎ মনে পড়ে
—“স্বামীজান তো অপেক্ষা করছে…!”
জারা তড়িঘড়ি করে উঠে পড়ে। জারাকে উঠতে দেখে ফিহা বলে
__“জানু কোথায় যাচ্ছিস? ”
ছায়মা ফিহাকে বলে
__“আরে বোঝ না, ভাইয়ার কাছে যাচ্ছে! ”
__“আমি যাব আর আসব, দরজা খুলা রেখো।”
__“ আসতে দিবে তোর স্বামীজান? একজনকে ও আসতেই দিলো না! ”বলল ফিহা।

__“তুমি যাও, তোমার স্বামীজানের গলা শুকিয়ে যাচ্ছে হয় তো তোমাকে দেখতে না পেয়ে। ”বলল ছায়মা।
জারা মুচকি হাসে।রুম থেকে বের হয়ে করিডোর দিয়ে দৌড়ের মতো হাঁটতে হাঁটতে নিজের উরনার আঁচল ঠিক করে নেয় মাথায়। খান ম্যানশনের লম্বা হলওয়ের লাইটগুলো আধো-আলো ছড়িয়ে রেখেছে, সেই আলোয় জারার ছায়া লম্বা হয়ে পড়ে যাচ্ছে।
আরমানের রুমের সামনে এসে দাঁড়ায় জারা। বড় বড় নিশ্বাস ফেলে দরজায় টোকা দেয় জারা __টুক… টুক…
রুমের দরজা আধখোলা। ভেতর থেকে ল্যাপটপের বোর্ড চাপার শব্দ আসছে। জারা যখন অবশেষে ঘরে ঢোকে, আরমান তখন মাথা নিচু করে মনোযোগ দিয়ে কাজ করছে—তবে তার মুখে স্পষ্ট রাগ।
জারা এসে চুপচাপ সামনে দাঁড়ায়।গলা খাঁকিয়ে বলে,
__“কি দেখাবেন স্বামীজান?”
আরমান মাথা তোলে না। কোনো উত্তর নেই।
জারা একটু বিরক্ত হয়ে আবার বলে,

__“শুনছেন? কি দেখাবেন?”
আরমান এবার হাত থামিয়ে নিচু চোখে বলে,
__“এখন বলেছি আসতে।”
জারা বুঝতে পারে রাগটা এখান থেকেই শুরু। সে মৃদু হেসে বলে,
___“ওই ফিহাদের সাথে আড্ডা দিচ্ছিলাম।”
আরমান ঠান্ডা গলায় বলে,
__“তাহলে যাও, আড্ডা দাও।”
এই কথা শুধু রাগ প্রকাশ করে না—বরং তার মনখারাপের গভীরটাও বোঝায়। জারা হালকা অবাক হয়ে তাকে দেখে। তার হাসিটা মিলিয়ে যায়। সে জানে আরমান চট করে রেগে যায় না। কিন্তু যখন রেগে যায়, তখন তার মন ভাঙে।
জারা আর দেরি না করে সামনে এসে দাঁড়ায়। তার চোখে একটু অপরাধবোধ। ধীরে ধীরে ল্যাপটপটা আরমানের কোল থেকে সরিয়ে পাশের টেবিলে রাখে। তারপর খুব আপনভরে আরমানের কোলে বসে, তার গলা জড়িয়ে ধরে। কণ্ঠে আদুরে চাপা উত্তেজনা

—“তাড়াতাড়ি দেখান… তর সইছে না তো গো স্বামীজান ।”
আরমান চেষ্টা করে রাগ দেখাতে, কিন্তু জারা যে এভাবে কোলে এসে বসবে—তা সে কল্পনাও করেনি। তার রাগ খানিকটা নরম হয়ে আসে। বা*লের রাগ তার,এই মেয়ের সামনে রাগ গলে পানি হয়ে যায়। তবুও সে কিছু বলে না। অন্যমনস্ক ভাবে জারার হাত নিজের হাতে নেয়।
হঠাৎই সে জারাকে কোলে তুলে দাঁড় করিয়ে দেয় । জারা অবাক হয়ে বলে,
__“এই! কি করলেন!”
আরমান গম্ভীর গলায় বলে,
__“চলো। একটা জিনিস দেখাতে হবে।”
জারা অবাক হলেও কিছু বলে না। সে জানে, আরমানের কাজ সবসময় একটু অদ্ভুত, একটু নাটুকে টাইপ। তবে সেই নাটুকে স্বভাবেই অনেক মিষ্টি ভালোবাসা লুকিয়ে থাকে।
আরমান জারাকে বেডের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। তারপর আঙুল তুলে বেডের উপরের দিকে ইশারা করে বলে

—“ওই পর্দাটা সরাও।”
জারা পিছনে ফিরে তাকায়।
__“ তখন তো খেয়ালই করি নি। কি আছে পর্দার আড়ালে?”
তার চোখে কৌতূহলের ঝিলিক।আরমান শুধু বলে,
__“নিজেই দেখা নাও।”
জারা ধীরে ধীরে পর্দার কাছে এগিয়ে যায়। আরমানের দিকে শেষবার তাকায়—তার চোখেমুখে এক ভরসা, যেন সে অপেক্ষা করছে জারার প্রতিক্রিয়ার জন্য। তারপর জারা দুই হাত দিয়ে পর্দাটা আলতো করে সরিয়ে দেয়।
পর মুহূর্তেই তার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে যায়। মুখ হা হয়ে যায়। কারণ পর্দার আড়ালে যা দাঁড়িয়ে ছিল—তা সে একেবারেই আন্দাজ করতে পারেনি।৷ সেখানে পুরো দেয়ালজুড়ে একটা বড় ফটো–কোলাজ ফ্রেম।
ফ্রেমের ভেতরে আরমান আর জারার সবচেয়ে সুন্দর, সবচেয়ে বিশেষ মুহূর্তগুলো সাজানো—
একসাথে হাসছে…স্ট্রিট ফুড খাওয়ার ছবি…
ভোরের রোদে তোলা সেলফি…রাতের অন্ধকারে ছায়া…আরেকটায় জারা লাজুক হাসিতে তাকিয়ে আছে, আরমান পাশে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে।জারা’র হাতে খরগোশ। সব ছবিই যেন তাদের গল্পের টুকরো। দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে জারা একদম স্তব্ধ।
আরমান ধীরে ধীরে এসে জারার পাশে দাঁড়ায়। তার গলা নরম, একটু কাঁপা

—“পছন্দ হয়েছে?”
জারা কিছু বলতে পারে না কয়েক সেকেন্ড। সে শুধু তাকিয়ে থাকে ছবিগুলোর দিকে। তারপর আরমানের দিকে ফিরে আসে এবং হঠাৎই তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে।
__“খুব পছন্দ হয়েছে… স্বামীজান।”
তার চোখে পানি চিকচিক করে উঠলেও সে লুকিয়ে ফেলে। এই মুহূর্তটা তার কাছে শুধু একটা সারপ্রাইজ নয়—ভালোবাসার গভীরতার প্রমাণ।
আরমান হাত দিয়ে জারার মুখটা তুলে ধরে। চোখে চোখ পড়ে গেলে দূরত্বগুলো নিজে থেকেই গলে যায়। যেন রাগ, অভিমান সব জায়গা ছেড়ে পালিয়ে যায়।জারা ফিসফিস করে বলে,
__“আপনি রাগ করেন কেনো এমন?”
আরমান ধীরে বলে,
__“কারণ তোমাকে খুব ভালোবাসি।”
এই কথাটা শুনতেই জারার মুখে লাজুক হাসি।
সে আবার আরমানের গলা জড়িয়ে ধরে। তাদের নিঃশ্বাস কাছে আসে। আরমান ধীরে জারার ঠোঁট নিজের দখলে নিয়ে নেয়—অত্যন্ত কোমল, ভালোবাসায় ভরা একটি চুমু। নরম, শান্ত, কোনো তাড়াহুড়া নেই। দুজনের মাঝের পুরো পৃথিবী যেন থমকে দাঁড়ায়।
আরমান যখন জারার ঠোঁটে নরম চুমু রাখলো, জারা চোখ বন্ধ করেই রইলো। দুজনের নিঃশ্বাসের স্পর্শে বাতাস ভারী হয়ে উঠল।
ঘরটা যেন আরও নিঃশব্দ, আরও গভীর হয়ে গেল।জারা ধীরে ধীরে আরমানের বুকে মাথা রাখে।তার গলায় কাঁপা কাঁপা স্বর,

__“স্বামীজান… এত সুন্দর একটা সারপ্রাইজ আপনি আমাকে দিলেন… আমি কীভাবে ধন্যবাদ দেব?”
আরমান জারার মাথার চুলগুলো সরিয়ে তার কানে ফিসফিস করে
—“আমাকে ধন্যবাদ দিতে হয় না… তুমি আমার। এটাই যথেষ্ট।”
জারা হেসে ফেলে। তার হাত দুটো ধীরে ধীরে আরমানের বুকের ওপর উঠে আসে। আরমান সেই হাত নিজের দুই হাতে জড়িয়ে ধরে।
রুমের নরম লাইটে তাদের ছায়া দুটো মিলে যায় একসাথে। আরমান জারাকে বেডের দিকে টেনে নেয়,কিন্তু টানটা খুবই নরম, খুবই আদরভরা।
জারা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে—লজ্জায় গাল টকটকে লাল।
সে মাথা নিচু করে।চোখ দুইটা আধভেজা, ঠোঁটের কোণে বিন্দু–হাসি। আরমান কাছে এসে তার চিবুকটা আলতো করে উপরে তোলে।
__“লক্ষী বউ!”
__“হুমমম! ”
__“ আমার না কেমন যেনো লাগছে? ”
জারা আরমানের দিকে চিন্তিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে
__“কী হয়েছে আপনার স্বামীজান!”
আরমান জারা’র কপালে কপাল ঠেকিয়ে বড় বড় নিশ্বাস ফেলে নেশালো কন্ঠে বলে
__“তোমাকে বাসিয়ে দিতে ইচ্ছে করছে লক্ষী বউ! ”

জারা আরমানের কথার মানে বোঝতে পারে। লজ্জায় নিজেকে আরও গুটিয়ে নেয় আরমানের দিকে। যাতে আরমানের সাথে ওর দৃষ্টি এক না হয়। তাহলে সে লজ্জায় মরেই যাবে। আরমান ফিসফিস করে বলে
__“তোমাকে খুব কাছে পেতে ইচ্ছে করছে বউ।আমার ভালোবাসার সাগরে তোমাকে বাসিয়ে দিলে খুব রাগ করবে? ”
আরমানের পর পর কথা জারা কেমন করে ভিতর থেকে অবশ হয়ে আসচ্ছে। আরমানের কষ্ট তাকে মাতাল করে দিচ্ছে। জারা লজ্জা আরমানের শার্ট খামছে ধরে।
__“এভাবে লজ্জা করো না লক্ষী বউ… আমি তো তোমার জানস্বামী।”
জারার শ্বাস কেঁপে ওঠে।তার হৃদপিণ্ড যেন বুকের ভেতর নরম থাপ থাপ করছে। আরমান হাত বাড়িয়ে জারার গালের পাশে আলতো স্পর্শ করলে—জারা চোখ বন্ধ করে অনুভূতিতে ডুবে যায়।
ধীরে ধীরে আরমান তার কপালে একটা চুমু রাখে,তারপর গালে,তারপর নাকে—প্রতিটা চুমু এত যত্নভরা যে জারার শিরদাঁড়া বেয়ে কাঁপুনি নেমে আসে। আরমান আস্তে করে বলে—“আজকে খুব মিস করেছি তোকে বউ…”
আরমান জারাকে নিজের বুকে টেনে নিয়ে জড়িয়ে ধরে— ওই আলিঙ্গনটা যেন পুরো দুনিয়ার নিরাপত্তা এক জায়গায়।

__“ তোকে মিস করেছি… কিন্তু তোকে একটু না জ্বালালে শান্তিই পাব না। একটু কষ্ট দেই বউ। আমি ভালো মানুষ , বেশি কষ্ট দিব না।” আরমানের কণ্ঠে মজা, কিন্তু স্পর্শে গভীর ভালোবাসা।
জারা গালে হাসি নিয়ে বলে
—“আপনি খুব খারাপ… আমাকে কাঁদিয়ে ছাড়েন।”
আরমান তার কানের কাছে মুখ নিয়ে যায়—
__“আমার ভালোবাসা সহ্য করে একটু কাঁদলে কিছু হবে না বউ?একটু কাঁদায়? ”
তারপর সে জারাকে আস্তে করে বেডে বসায়।
জারা হাতের আঙুল দিয়ে আঁচল নিয়ে খেলা করছে—লজ্জা, অভিমান আর খুশির মিশেল মুখে। আরমান সামনে বসে তার আঙুলগুলো নিজের হাতে নিয়ে বলে—
__“এই হাতগুলো আমার…কাজে লাগবে।”
জারা মাথা নিচু করে মৃদু হাসে। আরমান ধীরে ধীরে জারার হাত নিজের গালে ছুঁইয়ে দেয়।
তার ত্বকের উষ্ণতায় জারার বুকের ভেতর ঢেউ খেলে যায়।জারা মনে মনে ভাবে—“এ মানুষটা আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর পাওয়া…”
আরমান ধীরে ধীরে আবার তাকে আলিঙ্গনে টেনে নেয়।এবার আলিঙ্গনটা আগের থেকে গভীর, আরও আঁকড়ে ধরা। এতে শুধু রোমান্স নয়—নিশ্চয়তা, সুরক্ষা, ভালোবাসা—সবকিছুর মিল দেখা যায়। জারা আরমানের বুকের ওপর মাথা রেখে চোখ বন্ধ করে। আরমান তার মাথায় আলতো চুমু দিয়ে বলে—

__“আজ রাতটা শুধু তোমার। শুধু আমাদের। ”
বাইরে রাত আরও গভীর হয়। ঘরের ভেতর দুজনের নীরবতার মাঝেও ভালোবাসার ভাষা বাজতে থাকে—মুখে মুখে নয়,স্পর্শে,চাহনিতে,
একসাথে থাকার গভীর অনুভূতিতে।
তাদের রাতটা সেইভাবেই কাটতে থাকে—শব্দহীন,
অশান্তিহীন,কিন্তু ভালোবাসায় ভরা,দুজনের হৃদয়ের মতো নরম ও নিরাপদ।
ঘরটা তখন অন্ধকার, শুধু জানালা দিয়ে চাঁদের আলো ঢুকে দু’জনকে আলতো রুপালি ছায়ায় ঢেকে রেখেছে। জারা বেডে শোয়া মাত্র আরমান ধীরে ধীরে তার কাছে এগিয়ে আসে। তার চোখে অদ্ভুত নেশা—এক ধরনের টান, এক ধরনের আকর্ষণ যা জারাকে নিঃশ্বাস আটকে দেয়।
আরমানের কণ্ঠ গভীর, নরম, নেশালো

—“আজ তোকে ছাড়বো না, লক্ষী বউ… একচুলও না। আমার হক আমি আদায় করে দিবো!”
জারা শক্ত করে চোখ বন্ধ করে।তার বুক দ্রুত ওঠানামা করছে। আরমান খুব কাছে আসে—এতটাই কাছে যে তার নিঃশ্বাস জারার গালে স্পর্শ হয়ে লাগে।জারা ফিসফিস করে বলে—“স্বামীজান… ভয় লাগছে…”
আরমান জারার থুতনির নিচে আঙুল রেখে মুখটা উপরে তোলে।তার কণ্ঠ আরও গভীর হয়—
__“ভয় পাস না… আমার কাছে তুই সবচেয়ে নিরাপদ।”
তারপর সে জারাকে বুকে টেনে নেয়। এমনভাবে ধরে যেন পৃথিবীর সব ঝড় থেকে তাকে আগলে রাখছে। ধীরে ধীরে, যত্নে, ভালোবাসায়—জারার চুলে হাত বুলাতে থাকে।এবার তার কণ্ঠ আরও নরম, আরও নেশা মেশানো
—“আজ তোকে আমার সব ভালোবাসা দিয়ে ভরিয়ে দেব, বউ…”
জারা আরমানের বুকের উপর হাত রেখে বলে—
__“লাগাম টানেন স্বামীজান…”
আরমান জারার মুখটা নিজের কাঁধে লুকিয়ে দেয়,একটুও ছাড় দেয় না।জারার গাল গরম হয়ে ওঠে,শরীরটা কেমন যেন নরম হয়ে আসে
তার আলিঙ্গনে বন্দি হয়ে।

__“ সম্ভব না আর বউ..!”
রাত বাড়তে থাকে,আরমান প্রতি মুহূর্তে জারাকে আরও কাছে টেনে নেয়,আরও আগলে রাখে,
আরও গভীর করে তার ভালোবাসার ছোঁয়া।
জারা মাঝেমধ্যেই শ্বাস কেঁপে ওঠে—কখনো লজ্জায়,কখনো আরমানের আদরের ভারে।
আরমান একবারও তাকে ছেড়ে দেয় না।

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৬৬

তার কণ্ঠ, তার স্পর্শ, তার নিঃশ্বাস—সবকিছুতে জারাকে ঘিরে রাখে নরম উষ্ণতায়।
রাত যত যায়,আরমানের ভালোবাসা ততই গভীর হয়।জারা সেই ভালোবাসায় হারিয়ে যায়—
কিছুটা লজ্জায়,কিছুটা আনন্দে,ও অনেকটা তার স্বামীজানের নেশা-ভরা কণ্ঠে।
এভাবে ধীরে ধীরে রাতটাতাদের দু’জনের উষ্ণতা আর নরম ভালোবাসার ভেতরেই। চুপচাপ গলে যায়…

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৬৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here