লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ২২
লিজা মনি
রাতের অন্তিম প্রহরে আকাশমণ্ডল একটি গাঢ় নীল-ধূসর আচ্ছাদনে আবৃত থাকে।যা ক্রমশ প্রভাতের শুভ্র আলোকে স্থান দান করতে প্রস্তুত হয়। গগনের তমসাচ্ছন্নতা ও মৃতপ্রায় নক্ষত্রবিন্দুগণ এক বিষণ্ন নীরবতার সৃষ্টি করে। যেন প্রকৃতি নিজ শ্বাস-প্রশ্বাস সংবরণ করে সময়ের গর্ভে আসন্ন প্রভাতকে ধারণ করবার নিমিত্তে প্রতীক্ষমাণ।
রজনীর গভীরতম স্তরে, এক নির্জন কক্ষে আবদ্ধ থাকে দুইটি বিপরীতমুখী সত্তা।
একজন ক্ষমতার উন্মত্ত প্রতিমূর্তি। যাঁর অন্তরঙ্গে হিংস্রতা ও দখলদারিত্বের উগ্র স্পর্শ।
অন্যজন নিঃসহায়তা ও আত্মসমর্পণের এক করুণ প্রতিচ্ছবি।
গ্যাংস্টার বসের প্রতিটি আচরণে উচ্চাসনের অহংকার ও আদিম প্রবৃত্তির নৃশংস ছায়া।
তাঁর অঙ্গপ্রত্যঙ্গ যেন ক্ষুধার্ত হায়েনার সমতুল্য।এমনভাব্ব স্পর্শ করে যাচ্ছে যেন অনেক দিনের একত্রিত তৃষ্ণা নিবারন করছে। মায়া, করুনা বলতে কিছু নেই তর চোখে। ধূসর চোখ দুইটা হিংস্রতা নিয়ে ঝলঝল করছে।
এনির দুটি হাত লৌহবদ্ধ শৃঙ্খলে আবদ্ধ।
কবজির চারপাশে হ্যান্ডকাফের ঠাণ্ডা শীতলতা তাঁর ব্যক্তিসত্তাকে সম্পূর্ণরূপে নিষ্ক্রিয় করে দিচ্ছে।
দেহ ভাষাহীন হয়ে পড়েছে। তবে চক্ষু জ্বালায় অব্যক্ত আর্তি। মুখ কাপর দিয়ে বাঁধা। চোখ থেকে অনবরত নোনাজল গড়িয়ে পড়ছে। যার ধ্বনি উচ্চারিত না হলেও বেদনাদগ্ধ বাতাসে প্রবাহিত।
প্রতিটি মুহূর্ত যেন অনন্তকালব্যাপী শোষণের এক নির্মম পালা। এনির দেহ যখন যন্ত্রণায় অবসন্ন আর চেতনা স্তিমিত হয়ে আসে তখনই নৃশংসতার বেষ্টনী অতিক্রম করে। জ্ঞান হারিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলে। কিছু মুহূর্ত অতিবাহিত হওয়ার পর এনিকে নাড়াচড়া করতে না দেখে নিক থেমে যায়। মনে অচিরে এক ঝলক চৈতন্যের উন্মেষ ঘটে।নিস্তব্ধতা হঠাৎ হয়ে ওঠে ওজনদার।
নিশ্চল এনিকে দেখে এক পলক। সেই নির্মম পুরুষের চেতনায় ক্ষণিক এক দ্বিধার রেখা আঁকা পড়ে।
সম্ভবত অপরাধবোধ নয় বরং নিয়ন্ত্রণ হারানোর ভীতি।নিকের দৃষ্টি ধীরে ধীরে নেমে আসে।
সেই নিথর শরীরের প্রতি যে শরীর ভাষাহীন হয়েও
প্রত্যেক ছায়া ও ক্ষতচিহ্নে এক নিরব চিৎকারে পূর্ণ।
এই মুহূর্ত হিংস্রতা ও সহনশীলতার মধ্যবর্তী একটি বিষণ্ন প্রান্তর। যেখানে মানুষত্ব ও পাশবিকতার সীমানা অস্পষ্ট হয়ে ওঠে। নিক এনির মুখের দিকে এক পলক তাকিয়ে হ্যান্ডকাফ খুলে দেয়। কোমড়ে একটা টাওয়েল পেচিয়ে এনির রক্তাক্ত ঠোঁটে শক্ত করে চুমু খায়। এরপর পাজা কোলে তোলে নেয়। মুখে কোনো ভাবান্তর নেই। কোনো অনুশুচনা অথবা অপরাধ ও নেই৷ যেন সে আগে থেকে ধারনা করেছিলো এমন কিছুই হবে৷ হাতে ভেজা কিছু অনুভব করতেই ডান হাতের দিকে তাকায়। বাম হাতে বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে কপাল ঘেঁষে বিরক্তিতে চোয়াল শক্ত করে ফেলে,।
” ফা**ক! ফা*ক! অহহহ! আরেকটু সতর্ক থাকার উচিত ছিলো।
নিক হাত থেকে দৃষ্টি সরিয়ে লাল বেডসিটের দিকে তাকায়। বেডসিটের কালার লাল হওয়ায় তেমন ভালো ভাবে বুঝা না গেলেও সবটা স্পষ্ট। নিক নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে রেখেছে। কিছুক্ষনের মধ্যেই নিজের ঠোঁট থেকে তরল রক্ত বের হতে থাকে। বিরক্তিতে বৃদ্ধা আঙ্গুল দিয়ে রক্ততটা মুছে নিলো।
হালকভাবে এনিকে বিছানায় শুয়ে দিলো। এরপর কাভার্ড থেকে একটা কালো শার্ট বের করে পুনরায় বেডসিটের কাছে আসে। এনির শিউরে বসে পুরোটা শরীরে চোখ রাখে৷ অসংখ্য ক্ষততে পুরো শরীর রক্তাক্ত হয়ে গিয়েছে। নিক ঢোক গিলো কিছুটা। ঘন ঘন নিশ্বাস টেনে পাশে থাকা বেড সাইট টেবিলটাকে হাত দিয়ে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়। রাগে চুল খামছে ধরে বিরবির করে উঠে,
” বলেছিলাম ঘুমন্ত সিংহকে না জাগাতে। উত্তাপ সহ্য করতে পারবে না। রক্তাক্ত হয়ে পড়বে। গ্যাংস্টার বস নিক জেভরানের স্পর্শ গ্রহন করার ক্ষমতা যদি তোমার থাকত তাহলে ট্রাস্ট মি বেবিগার্ল দেড় বছর আগেই আমার হাতে নিজের সতিত্ব হারিয়ে ফেলতে।এই অবস্থার জন্য তুমি নিজেই দায়ী বেবিগার্ল।
থেমে…
“বালের নারী জাত! নগ্ন হয়ে এসে নিজেই সিডিউস করবে, আবার নিজেই দোষ দিবে। এতদিনের ঘৃনা কি কম ছিলো, যে আরেকটা যুক্ত হলো”
হঠাৎ নিক চুল ছেড়ে দেয়৷ কপালে অসংখ্য ভাঁজ ফেলে চোখ ছোট ছোট করে ফেলে। সামনে দৃষ্টি রেখে নিজের উপর বিরক্ত নিয়ে বলে,
” আমি কেনো এই নারীকে দরদ দেখাচ্ছি। এমনটা হওয়ার এই কথা ছিলো। এখন যদি এইসবে পরিচিত না হয় তাহলে পরবর্তীকালের সম্মুখীন কিভাবে হবে।
নিক এনির পাশ থেকে উঠে দাঁড়ায়। এরপর ফিঙ্গার টাচ করে দরজা খুলে। দরজার সামনে কাউকে দেখতে না পেয়ে রাগে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে ফেলে। গ্যাংস্টার বসের রাগ যেন আগ্নেয়গিরির মতো ফুটে উঠে।যা মুহূর্তের মধ্যে তার সারা শরীর জুড়ে জ্বলে ওঠে। দরজার কাছে কাউকে না পেয়ে সে অদ্ভুত এক অতৃপ্তি অনুভব করে চোয়াল শক্ত করে ফেলে। পেশিগুলো মনে হচ্ছে কিছু দিয়ে বাঁধা। শক্তি নিয়ে টানটান হয়ে ওঠে। চোখ দুটো আগুনের মতো লালচে জ্বলজ্বল করছে। ঠোঁটের কোণ থেকে গজগজ আওয়াজ বের করছে। শিকারীর মত কিছুটা চিৎকার।গলা আঁটসাঁট হয়ে কষ্টকর শ্বাসের সঙ্গে এক মৃদু গর্জনে মিশে যায়। বুকের শক্ত কাঁধগুলো অস্থিরভাবে ওঠানামা করতে থাকে। প্রতিটি শ্বাস তীব্র রাগ ঝরছে। একরাশ নির্জন ঘরে তার রাগ যেন এক নির্মম সিংহের থাবার মতো হয়ে উঠেছে। নিক নিজেকে কন্ট্রোল করতে না পেরে আরিশের নাম্বারে ফোন দেয়৷ দুই সেকেন্ডের মধ্যে আরিশ রিসিভ করে ফেলে। যেন সে সারা রাত এই ফোনটার এই অপেক্ষা করছিলো।
— হ… হ্যা ভাই.. বল। সারারাত ধরে গালে হাত দিয়ে বসে আছি আমি আর অধিরাজ। তর এই ফোনের অপেক্ষায়।
নিক রাগে গর্জে উঠে,
” শালা মাদার্ফা*কার ডাক্তার কোথায়? শু** বাচ্চা বলেছিলাম না, দরজা খুলেই যাতে আমি ডাক্তারকে দেখতে পায়। পেলাম না কেনো সন আব আ বিচ?
রাগের তাপে নিকের পুরো মুখ লাল হয়ে গিয়েছে। চোখ দুইটা থেকে যেন আগুনের লাভা বের হচ্ছে৷ এই মুহূর্তে আরিশ আর অধিরাজকে খুন করতে পারলে গ্যাংস্টার বসের রাগ হয়ত ঠান্ডা হত৷ নিকের এমন ভয়ানক ক্ষুব্দতায় আরিশ ঠোঁট ভেজায়। অধিরাজের দিকে তাকিয়ে সামান্য ঢোক গিলে। অধিরাজ ভয়ে কাঁপছে রিতীমত। আরিশ সাহস জুগিয়ে বলে,
” আমি ডাক্তার ইসাবেলাকে বলেছিলাম জীবন বাঁচাতে চাইলে সারারাত যাতে তর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। বিশ্বাস কর ভাই, তুই যখন আমাকে ফোন দিয়ে বলেছিলি একজন নারী ডক্তারকে তর মেনশনে পাঠিয়ে দিতে তখন হয়ত ভেবেছি তুই মজা করছিস। কারন নারী তর জন্য বিষ। তুই পারলে প্রতিটা নারীর গলা চেপে মেরে ফেলতি। কিন্তু পরমুহূর্তেই আমি ডাক্তার ইসাবেলাকে রাতের অন্ধকারে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে তর মেনশনে রেখে আসি৷ উনি হয়ত নিচে আছে। একটু খুঁজে দেখ ভাই পেয়ে যাবি। এইভাবে হুংকার দিয়ে আমাদের দম বন্ধ করে ফেলিস না। তর জন্য এমনি সারারাত ঘুমায় নি।
আরিশের কথা শেষ হতেই নিক রাগে গর্জে উঠে,
” সামনে যদি তদের দুইটাকে আজ পাই তাহকে খোদার কসম জান খেয়ে ফেলব। আমি এখন মহিলাকে খুঁজে বের করব ইডিয়েট!
আরিশ সামান্য সিরিয়াস হয়ে বলে,
” কি হয়েছে নিক? এতক্ষন ভাবছিলাম হয়ত এমনি? তুই হুট করে ডাক্তারের পিছনে পড়েছিস কেনো? ক্ষতে পচন ধরে গেলেও তুই নিজের জন্য ডাক্তার আনবি না। সেটা আমার থেকে ভালো কেউ জানে না। এনির কি হয়েছে?
নিক রাগে কটমট করে শ্বাস টানে।চোয়াল শক্ত করে ফোন কেটে দেয়। এরপর ঘন ঘন শ্বাস টেনে। পাগলের মত এদিক – সেদিক তাকায়। পুনরায় ওয়াশরুমে ডুকে দ্রুত শাওয়ার নিয়ে বের হয়। দরজা খুলে সামনে এগিয়ে যায়। হঠাৎ সিঁড়ির এক অংশে চোখ যায়। মহিলাটার বয়স হয়ত পঞ্চাশের উর্ধ্বে হবে। নিক ঠোঁট কামড়ে ধরে। রাগে কাঁপতে থাকা শরীর কিছুটা শিথিল হয়ে আসে। চোখ দিয়ে দুইজন গার্ডকে ইশারা করে। গার্ড মহিলাটার কাছে আসে। এরপর হাতে থাকা রিভলভার দিয়ে গুঁতা দিয়ে বলে,
” এই মহিলা!
নিক গার্ডদের দিকে তাকিয়ে কপাল কুচকে ফেলে। পরমুহূর্তেই কিছু একটা ভেবে রহস্যময় হাসে। যেমন গুরু তেমন শির্ষ্য।
রিভলভারের গুঁতা খেয়ে মহিলাটা পিটপিট করে চোখ মেলে তাকায়। চোখের সামনে কুচকুচে কালো, কালো পোশাকে এত বড় বড় দেহরক্ষীকে দেখে ভয়ে ” আয়ায়ায়া ” বলে চেঁচিয়ে উঠে।
মহিলাকা চেঁচাতে দেখে নিক চোয়াল শক্ত করে ফেলে। ইচ্ছে করছে গলায় ছুঁরি ধরে শরীরটা এসিডে ডুবিয়ে রাখতে। রাগে বিরবির করে উঠে,
” নাটকবাজ!
মহিলাটা সামান্য ঢোক গিলে দাঁড়ায়। মস্তিষ্ক সজাগ হয়ে উঠে। এই মুহূর্তে সে দেশের সব থেকে বড় হার্টল্যাস গ্যাংস্টার বস নিক জেভরানের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ভাবতেই গলা শুকিয়ে আসে। রক্ত ঠান্ডায় যেন হিম হয়ে আসছে৷ তাকে যখন জোর করে তোলে এখানে নিয়ে আসা হয়েছিলো তখন থেকেই সে ভয়ে জমে আছে। পালাতে চেয়েছিলো অনেকবার। কিন্তু পুরো মেনশনের চারদিকে দেহরক্ষী দাড়িয়ে আছে৷ একসময় সে সিঁড়ির কাছে ঘুমিয়ে পড়ে। কিন্তু জানা নেই তাকে কেনো রাত থেকে এখন পর্যন্ত জোর করে আটকে রেখেছে।নিক একটা গার্ডকে ইশারা করে বিরক্তিতে রুমের দিকে এগিয়ে যায়। মহিলাটাকে নিকের যাওয়া দেখে নিশ্বাস ফেলে। একজন গার্ড মহিলাটাকে আদেশ করে বলে,
” বসের পিছনে পিছনে যান। ম্যাডাম অসুস্থ।
মহিলাটা অবাক হয়ে বলে,
” উনার ওয়াইফ আছে? উনার মত কোনো ব্যক্তি সংসার করছে?
গার্ড বিরক্ত বোধ করলো। রাগ দেখিয়ে বলে,
” চিকিৎসা করার জন্য হয়ত আনা হয়েছে৷ আমরাও জানি না। চিকিৎসা ব্যতিত অযথা প্রশ্ন করে নিজের বিপদ ডেকে নিয়ে আসবেন না। গো!
মহিলাটা ভয়ে আর কিছু বললো না। নিকের পথ অনুসর করে দরজার সামনে যায়। সামান্য ঠোঁট ভিজিয়ে কাঁপা গলায় বলে,
” আ.. আসব স্যার?
নিক তাকায় না একবারের জন্যে ও। ডিভানে গম্ভীর হয়ে বসে দুই আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করে”
” কাম.
মহিলাটা ধীর পায়ে এগিয়ে আসে। শয়নরত এনিকে দেখে ভ্রুঁ কুচকে ফেলে। এনির মায়াবী মুখশ্রীতে যেন লেগে আছে কত- শত কোমলতা। দবদবে ফর্সা মুখশ্রীর চারপাশে সোনালি চুলগুলো ঝলঝল করছে।কোন রাজ্যের রাজকুমারী এই মেয়ে! মহিলাটা মোহিত মুচকি হাসে। এনির ঠোঁটে ক্ষত দেখে আৎকে উঠে। দেখেই মনে হচ্ছে কেউ একধিকবার কামড়েছে। মহিলাটা গম্ভীর নিশ্বাস টেনে চাঁদরে ধরে টান দেয়।
মাঝপথে নিকের কর্কশ কন্ঠ শুনে থেমে যায়,
” এলার্ট দিচ্ছি আপনার হাতের সামান্য স্পর্শ যাতে এই নারীর গায়ে না লাগে।
নিকের এমন বাক্যে ডাক্তার ইসাবালা হতভম্ভ হয়ে
যায়। অবাক হয়ে বলে,
” স্পর্শ না করে চিকিৎসা কিভাবে করব স্যার?
নিক চোয়াল শক্ত করে ফেলে,
” আমার কথাটা হয়ত বুঝতে পারেন নি ড.ইসাবালা। সামান্য স্পর্শ লাগলেও আপনারা হাত কেটে কুকুরকে খাওয়াব। যা করবেন দুর থেকে। আরেকটা প্রশ্ন করলে… পরেরটা ভেবে দেখব কি করা যায়।
ড. ইসাবালা আতঙ্কে জমে যায়। কার গোহায় এসে পড়েছে সে? কিন্তু সেটা আর প্রকাশ করার সাহস হয় নি। ড. ইসাবালা স্টেথোস্কোপের সাহায্যে রক্তচাপ পরীক্ষা করে। স্বাভাবিক তুলনায় রক্তচাপ বেশি বেগে প্রবাহিত হচ্ছে। রক্তচাপ পরীক্ষা করতেও থেমে যায়। কারন এইটা করতে গেলে তাকে স্পর্শ করতে হবে। পুরো শরীরে..গলায় ক্ষত দেখতে পেয়ে মহিলাটা বিরক্তির নিশ্বাস ফেলে। নিক তীক্ষ্ণ চোখ তাকিয়ে আছে। ড. ইসাবেলা কিছুটা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলে,
” এমনটা কিভাবে হয়েছে স্যার?
নিক স্বাভাবিক ভঙ্গিতে উত্তর দেয়,
” ইন*** হয়েছিলাম।
মহিলাটা অপ্রস্তুত হয়ে বলে,
” শ্বাস খুব ধীরে ধীরে চলছে।
” বেঁচে আছে কি না সেটা বলেন?
মহিলাটা অবাক হয় প্রচুর। পর মুহূর্তে মনে পড়ে নিক কে? আর তার থেকে এমন কথা আশা করা অস্বাভাবিক কিছু নয়।
মহিলাটা কিছু মেডিসিন লিখে দিয়ে বলে,
” পরেরবার থেকে কাছে গেলে নিজেকে নিয়ন্ত্রন করে যাবেন।
নিক এনির নিস্তেজ মুখের দিকে তাকিয়ে আনমনে বলে,
” এই মেয়ে আশে- পাশে থাকলে চব্বিশ ঘন্টার ভিতরে আটচল্লিশ বার আমি অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ি। নিয়ন্ত্রনে রাখার প্রশ্ন আসছে কোথা থেকে? নিয়ন্ত্রনে আছি বলেই এখনও বেঁচে আছে।
ড. ইসাবালা ফুঁশ করে শ্বাস টানলেন। এখানে থাকাটা আর উচিত মনে করলো না৷ এমনিতে ভয়ে
শিউরে উঠছে বার বার। কেমন অদ্ভুত গা ছমছমে বাড়ি এইটা! কালো আর লালের মিশ্রন সব কিছু। ইসাবেলা নিজের জিনিস পত্র নিয়ে উঠে বলে,
” খেয়াল রাখবেন নিজের স্ত্রীর। সর্বনিম্ন এক সপ্তাহ অন্তত বেড রেস্ট থাকতে হবে। ক্ষত অনেক গভীর৷
নিক রক্তলাল চোখে তাকায়। ড. ইসাবালা নিকের রাগের কারন বুঝলো না। ভয়ে দ্রুত রুম থেকে প্রস্থান করে। ড. চলে যেতেই নিক ঠোঁট কামড়ে দাঁড়ায়। দুই মিনিটের মধ্যে এনি পিট- পিট করে চোখ মেলে তাকায়। ব্যাথায় পুরো শরীর ছিঁড়ে যাচ্ছে। শরীরটাকে সামান্য নাড়াতেই ব্যাথায় শব্দ করে কেঁদে উঠে।
এনির কান্নার আওয়াজ নিকের কানে প্রবেশ করে। তবে তার কোনো হেলদুল নেই। গম্ভীর নিশ্বাস ফেলে একটা ল্যাপটপের দিকে এক পলক তাকায়। অধরে রহস্যমায় হাসি খেলে যায়। এনি অনেক কষ্টে হেডবোর্ডে হেলান দিয়ে বসে। মাথা ব্যাথায় ছিঁড়ে যাচ্ছে। নিজেকে খুব খালি খালি অনুভব করছে। ঘুমটা কাটিয়ে ভালোভাবে চোখ খুলে। চোখের সামনে নিককে ঠোঁট কামড়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বিরক্তির নিশ্বাস ফেলে। চাদরটা সরানোর জন্য হাত রাখতেই স্তব্দ হয়ে যায়। শরীরে একটা সুতা পর্যন্ত নেই৷ নিজেকে নগ্ন বিবস্ত্র দেখে মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ে। মাথা নিচু করে ঠোঁট চেপে ধরে। চোখ থেকে নিয়ন্ত্রনীনভাবে পানি পড়ছে। রাতের ঝাপসা কিছু ঘনিষ্ট স্মৃতি ভাসতে থাকে। এনির নিশ্বাস দ্রুত চলতে থাকে। চাদর খামছে ধরে। শারিরীক পরিবর্তন অনুভব করতেই ডুকরে কেঁদে উঠে।
নিক এনির দিকে বাজ পাখির ন্যায় চোখ রেখে ধমকে উঠে,
” স্টপ ক্রাইং ইডিয়েট।
নিকের ধমকে এনির চোখ জ্বলে উঠে। নীল মনির সাদা অংশ কেমন লাল হয়ে গিয়েছে। কান্না সংযত করে ঘৃনা ছুঁড়ে দিয়ে বলে,
” নিজের কাজ তাহলে এতদিনে হাসিল করলেন গ্যাংস্টার বস নিক জেভরান। এইটাই তো চেয়েছিলেন, আমার শরীরটাকে জানোয়ারের মত ছিঁড়ে খাওয়া। রক্ষিতা ট্যাগ লাগিয়ে মৃত্যুর ভয়টা কেড়ে নিয়েছিলেন। আজ থেকে ইজ্জতের ভয়টাও কেড়ে নিলেন। পুরো দুনিয়া এখন আমাকে ছিঁড়ে খেলেও আফসোস থাকবে না। কারন সব থেকে বড় নরখাদক স্বাদ গ্রহন করে ফেলেছে। প্রতিদিন আপনার কাছে এই জিনিসটা হাত পেতে ভিক্ষে চেয়েছি। বাট আপনি আমাকে আর বাঁচতে দিলেন না। মৃত্যুর দরজায় এনে দাড়া করালেন।
ইউ উইল বি ইন দ্য ওয়ার্স্ট কন্ডিশন, জাস্ট ওয়েট অ্যান্ড সি।
নিকের চোখ পুনরায় আগুনের মত জ্বলে উঠে। যেন বরফ ঢাকা আগ্নেয়গিরি ভিতর হঠাৎ বিস্ফোরন ঘটে৷ রাগটাকে আর কন্ট্রোল করতে পারলো না৷ প্রগাঢ় ক্ষুব্দতার সাথে ঝড়ের বেগে এসে এনির চিবুকটা শক্ত করে চেপে ধরে। এনি সাথে সাথে মুখ খিঁচে ফেলে৷ নিক ক্রোধে শ্বাস নিচ্ছে ঘন ঘন। দাঁত কটমট করে গর্জে উঠে,
” পুরো দুনিয়া ছিঁড়ে খেতে কি ইঙ্গিত করেছিস? ঠোঁট কেঁপে উঠে নি বান্দির বাচ্চা? এই পাঁচ ফুট সাইজের শরীরে আমি নিক জেভরান ব্যাতীত দ্বিতীয়ত কারোর স্পর্শ লাগলে সৃষ্টিকর্তার কসম সেই জায়গার মানচিত্র বদলে ফেলব। তুই বাঁচবি। আর বাকিটা জীবন এই বন্ধ রুমে সৃষ্টির্তার পর আমার নাম নিতে নিতে বাঁচবি। এই চেহারা আমি ব্যাতীত কেউ দেখতে পারবে না। এই চোখের গভীরতায় আমি ছাড়া আর কেউ মোহিত হতে পারবে না। এই বদ্ধ রুমে আমার সাথে বাঁচবি। কাঁদলে আমার জন্য কাঁদবি। নিজের জন্য কাঁদা ও তর জন্য মানা। আজ থেকে আমার প্রতিটা হিংস্রতাকে ধারন করতে হবে। এতদিন ছাড় দিয়েছিলাম বাট ছেড়ে দেয় নি।
প্রতিটা হুংকার এনির কানে বজ্রের মত আঘাত করবে। প্রতিটা বাক্যে শুধু অবাক হচ্ছে৷ কি ধরনের পাগলামো এইসব। উনি ছাড়া কেউ তাকাতে পারবে না মানে? এই বদ্ধ রুমে আজীবন থাকবে হবে! এনি নিশ্বাস টানে,
” মানসিক বিকাশগ্রস্ত এ সাইকোপ্যাথ আপনি ! সুস্থ মানুষ এমন অস্বাভাবিক আচরন করতেই পারে না।
নিক আরও শক্ত করে চেপে ধরে। দাঁত পিষে বলে,
” আই ডোন্ট কেয়ার। সামান্য বাতাস ও তর শরীরে লাগতে পারবে না। প্রয়োজন অনুযায়ী যাস্ট শ্বাস নিবি।
এনি চোয়াল শক্ত করে বলে,.
” সেটা দেওয়ার প্রয়োজন ছিলো কি? গলা চেপে শ্বাসটা ও বন্ধ করে নিন।
নিক বাঁকা হাসলো। গ্রিবাদেশ নাড়িয়ে বলে,
” আমার অবাধ্য হলে সেটাও করব বেবিগার্ল। ক্ষমতা থাকলে নিশ্বাসটাও নিজের নিয়ন্ত্রনে নিয়ে আসতাম। আমি ব্যাতীত একটা পাখিও তোমার দিকে তাকাতে পারবে না। আই উইল বি ইয়োর ফার্স্ট প্রায়োরিটি।
এনি নিস্তেজ হয়ে আসে। নিক যে স্বাভাবিক নয় সেটা আজ সে নিশ্চিত হয়। কোনোভাবে কি এই লোক আমাকে নিজের নিয়ন্ত্রনে করতে চাইছে? অনেক মুভিতে দেখেছি। সাইলেন্ট সাইকোপ্যাথরা ঠিক একইভাবে অপর পক্ষকে ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রনে নিয়ে আসে। আজ তাহলে আমার জীবনে কেনো বাস্তবতা হয়ে নেমে আসলো? আমি এমন চার- দেয়ালের মধ্যে বন্ধীত্ব জীবন নিয়ে বাঁচতে পারব না। যে কোনো মুল্যে পালাতে হবে।
তবে এনি এইটা মনের ভিতর এই চেপে রাখলো। প্রকাশ করার প্রয়োজন বোধ করলো না। এমনিতে মনে হচ্ছে তার ভেতরটা কেউ ছুঁরি দিয়ে ক্ষত – বিক্ষত করে দিচ্ছে।
এনি রাগে চোখ বন্ধ করে ফেলেছে৷ নিকের শক্ত হাতের স্পর্শে মাথা ঘুরে আসে। শরীরের দুর্বলতা এখনও কাটে নি। ওয়াইনের রিয়্যাকশনটা এখনও শরীরে রয়ে গিয়েছে। এনি কান্নার জন্য কিছু বলতে পারছিলো না এতক্ষন। বিরবির করে বলে,।
” আপনি আমাকে গভীরভাবে ছুঁয়েছেন নিক জেভরান। আমার সব থেকে বড় সম্পদ কেড়ে নিয়েছেন। এতটা কষ্ট আর ক্ষত- বিক্ষত হয়ত কয়লার উপর হেটে আর চাবুকের আঘাত জর্জরিত ও হয় নি। ভিতরটা ছিঁড়ে যাচ্ছে আমার।
নিক এনিকে ছেড়ে দেয়৷ আর কত মারবে এইটুকু শরীরে। পুরো শরীর এমনিতেও যখম হয়ে গিয়েছে। নিক বিরক্তির শ্বাস ফেলে ল্যপটপটা তুলে নেয়। এরপর ঠোঁটে কামড়ে কিছু একটা চালু করে। মুহূর্তেই কিছু একটার শব্দ উচ্চ স্বরে বেজে উঠে।এনি হতভম্ভ হয়ে বলে,
” ছিহহ অশ্লিল শব্দ! এইসব দেখেন আপনি? অপরাধ তো জীবনে কম করেন না৷ ট্রাস্ট মি এইসব দেখার জন্য চোখ, কানের জেনা হয়ে যাবে।
নিক শব্দটা কমিয়ে স্ক্রিনে দৃষ্টি রাখে। অধরে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে বলে,
” এইবার ভাবো ঠিক কতটা অশ্লিল তুমি?
এনি অবাক হয়ে বলে,
” ম.. মানে?
নিক কিছু বললো না। গম্ভীরতা টেনে ল্যাপটপটা এনির দিকে ঘুরিয়ে দেয়৷ সাউন্ড আগের মত উচ্চতরভাবে দেয়৷ সাউন্ড প্রুফ রুম, বাহিরে শব্দ যাওয়ার কোনো ইয়াত্তা নেই।
এনি অন্যদিকে তাকিয়ে ছিলো৷ শব্দের কারনে নিভু নিভু চোখে সেখানে তাকায়। মুহূর্তে থমকে যায় তার দৃষ্টি। একদম বিবিস্ত্র অবস্থায় সে নিকের সামনে লেপ্টে দাঁড়িয়ে আছে৷ নিক বার বার সরাতে চাইছে কিন্তু সে আরও চেপে দাড়াচ্ছে। নিকের প্যান্ট ধরে টানা – টানি, চুমু খাওয়া সব দৃশ্য মনিটরে ঝলঝল করছে৷ এরপর.. এরপর নিকের আক্রমন। এনি ধ্বাক্কা মেরে ল্যাপটপটা ফেলে দেয়। ল্যাপটপটা মেঝেতে ছিটকে পড়ে। নিক এক পলক তাকিয়ে বাঁকা হাসে। এনি চাঁদর খামছে ধরে শক্তভাবে। এনি নিশ্বাস টেনে বলে,
” এমন কিভাবে করেছি আমি? অগ্নি কান্ডে ফেলে দিলেও আপনার সান্নিধ্যে যাওয়ার মত জঘন্য কাজ আমি আনাস্তাসিয়া এনি কখনো করব না।
নিক গ্রিবাদেশ নাড়িয়ে বলে,
” এই ভিডিওটা কখনো তোমাকে দেখাতাম না। কারন গ্যাংস্টার বস নিজের কাজের কৈফিয়ত কাউকে দেয় না। শুধু এই বাঁশির শব্দটা পুনরায় শুনার জন্য চালু করেছিলাম।।
এনি ভ্রুঁ কুচকে বলে,
” কোন বাঁশির শব্দ?
নিক প্যান্টে হাত গুঁজে বলে,
” যেটাকে অশ্লিল শব্দ হিসেবে নামকরন করেছো।
নিক আর দাড়ালো না। বড় বড় পা ফেলে রুম থেকে বেরিয়ে যায়
এনি নিকের কথায় হতভম্ভ হয়ে তাকিয়ে থাকে। রাগে গজগজ করতে করতে বলে,
” নির্লজ্জ চিতা বাঘ।
এনি এই নির্মম সত্যিটা মানতে পারছে না। হুট করে মনে হলে তাকে তো পিল দেওয়া হয় নি। যে কোনো মুল্যে পিল সংগ্রহ করে খেতে হবে। নাহলে সর্বনাশ ঘটে যাবে। যা সর্বনাশ হওয়া তার হয়ে গিয়েছে। একবার পালিয়ে যাক পুরো শরীরের চামড়া বদলে ফেলবে। যাতে জানোয়ারটার স্পর্শের ছাপ কোথাও না থাকে। কিন্তু চিতা বাঘের অংশ নিজের গর্ভে কখনো আসতে দেওয়া যাবে না।
অধিরাজ এখনও বাগান বাড়িরে ডিভানে গালে হাত দিয়ে বসে আছে৷ আরিশ গম্ভীরতা নিয়ে দাঁত কটমট করছে। দুইজনের মুখেই ভয় আর চিন্তার ছাপ। নিরবতা ভেঙ্গে অধিরাজ বলে,
” স্যার আপনার কি মনে হয়? বস সত্যি ম্যাডামের উপর অধিকার প্রয়োগ করেছে?
আরিশ কিছুক্ষন নিরব থেকে বলে,
” অধিরাজ তর মানে আছে একটা ঘটনা?
অধিরাজ কপাল কুচকে বলে,
” কি?
আরিশ গ্রিবাদেশ নাড়িয়ে বলে,
” নিক আমাদের খুব অনাকাঙ্ক্ষিত প্রশ্ন করেছিলো। মেয়েদের সব থেকে বড় দুর্বলতা কোথায়?
অধিরাজ এখনও বুঝে নি৷ অবুঝের মত উত্তর দেয়,
” জি স্যার। এতে প্রচুর অবাক হয়েছিলাম। এইটার সাথে এর কি সম্পর্ক স্যার?
আরিশ ঠান্ডা গলায় তীক্ষ্ণ নজরে বলে,
” এইটাই মেইন সম্পর্ক অধিরাজ। তুই আর আমি বলেছিলাম মা – বাবা, সন্তান আর স্বামী। হার্টল্যাস গ্যাংস্টার বস কখনো অন্য স্বামীদের মত হবে না এইটা সিউর। মাকে সে জীবনের থেকেও বেশি ঘৃনা করে। তাহলে রইলো বাকি সন্তানের কথা। এনিকে ধরে রাখার জন্য সব থেকে বড় অস্ত্র হচ্ছে সন্তান। কারন এনির হৃদয়ে মরে যাওয়ার ভয় নেই। নিক আঘাত করতে গেলে সে আরও এগিয়ে যায়। ফোর্স করে তাকে মেরে ফেলার জন্য। যার হৃদিয়ে মরার ভয় থাকে না তারা অনেক সাংঘাতিক হয় অধিরাজ। একদিন ঠিক আত্নহত্যা করার জন্য এগিয়ে যায়। পুরো দুনিয়া না জানুক কিন্তু আমি আরিশ জানি এনিকে ছাড়া নিক দুই মিনিট শ্বাস পর্যন্ত নিতে পারবে না।
অধিরাজ শুকনো ঢোক গিলে বলে,
” ত.. তার মানে বস ম্যাডামকে বাচ্চার মা বানাতে চাইছে। সন্তানকে একা রেখে কোনো মা মরতে পারবে না। মরার ভয় ডুকানোর জন্য?
আরিশ বাঁকা হেসে বলে,
” ইয়াহহহ। আর কখনো নিককে ছেড়েও যেতে পারবে না।
অধিরাজ অবাক হয়ে বলে,
” কতটা তীক্ষ্ণ বুদ্ধি আপনার স্যার। সামান্য একটা লাইন থেকে পুরো উত্তর বের করে ফেলেছেন।সত্যি আপনি বসের বন্ধু। পুরো দুনিয়ার কেউ বসের মনের কথা না বুঝলেও আপনি বুঝেন।
আরিশ সামান্য হাসলো। অধিরাজের দিকে তাকিয়ে বলে,
” দেশের সব থেক বড় গ্যাং ব্লাক ভাইপার গ্যাং। সেই ব্লেক ভাইপার গ্যাংস্টার বস নিক জেভরানের ডান হাত আমি অধিরাজ।বছরের পর বছর এক বিছানায় রাত কাটিয়েছি। তার জীবনের প্রতিটা ঘটনা আমার জানা। আমি বুঝতে না পারলে বুঝবে কে?
অধিরাজের চোখ চিক চিক করে উঠে। হাসি দিয়ে বলে,
” আপনাদের দুইজনের সেবা করতে পেরে আমি গর্বিত হয়। আপনাদের বন্ধুত্ব দেখে শুধু দেশ নয় আমার ও হিংসে হয় মাঝে মাঝে।
আরিশ গম্ভীর হাসলো। কিছু বলতে গিয়েও থেমে যায় কারোর পায়ের শব্দ শুনে। ঘাড় ঘুরিয়ে সিঁড়ির দিকে তাকাতেই চোয়াল শক্ত করে ফেলে। নাজলী প্রচন্ড রেগে দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসে। এরপর প্রচন্ড ক্ষোভে দাঁত পিঁষে বলে ,
” আমাকে এখানে আটকে রেখে এমন টর্চারের মানে কি?
আরিশ রক্ত চোখ নাজলীর চোখে চোখ রাখে। গর্জন করে বলে,
” গলার আওয়াজ নামিয়ে ফা* কিং গার্ল। গলার আওয়াজ নিয়ে কথা বললে জবান চেপে ধরব।
নাজলী চোখ বন্ধ করে রাগ নিয়ন্ত্রন করলো। শান্ত কন্ঠে বলে,
” এইভাবে টর্চার করছেন কেনো?
আরিশ ভ্রুঁ কুচকে বলে,
” বন্ধী হয়ে থাকবে এইটাই শেষ কথা।
— সেটা বলি নি।
— কোনটা বলেছো?
নাজলী কটমট করে বলে,
” ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হতে হয় গ্যাংস্টার বসের ডান হাত ক্রিমিনাল লিডার আরিশ।
আরিশ বিরক্তিতে বলে,
” ওয়াশরুম কি আমার মাথায় নিয়ে ঘুরছি। ফ্রশ হতে হয় সেটা আমাকে জিজ্ঞাসা করছো। রুমে ওয়াশরুম না থাকলে বাঁশ ঝাঁড়ে যাও ইডিয়েট!
আরিশের কথা শুনে অধিরাজ কেঁশে উঠে। নাজলী প্রথমে অবাক হলেও নাক ছিটকে বলে,
” বিয়াদবি করবেন না একদম। এত বড় শহরে কি বাঁশ ঝাঁড় আপনার বাপে লাগিয়ে দিয়ে গিয়েছে।
আরিশ ছন্ন- ছাড়া হয়ে এদিক- সেদিক তাকায়। নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করে বলে,
” আজ প্রথম দিন তাই ক্ষমা করে দিয়েছি। পরের বার বাবা নিয়ে কথা বললে সব থেকে নিকৃষ্ট আরিশকে দেখতে পাবে।
নাজলী চোখের মনি উল্টে তাচ্ছিল্যতা নিয়ে বলে,
” বাবা – মা নিয়ে কথা বলতে ও চাই না। কিন্তু আপনার খারাপ রুপ যা দেখেছি সেটাই অনেক৷ বিশ্বাসঘাতক আপনি।
আরিশ শব্দ করে হেসে উঠে। তীক্ষ্ণ নজরে তাকিয়ে বলে,
” অহহ বেইবি! গ্যাংস্টারদের কাছ থেকে বিশ্বাস আশা করো কিভাবে? আরিশের শান্ত রুপটাই দেখেছো। তবে চিন্তা করো না, রাগালে আমার অশান্ত রুপটাও দেখবে।
— সেই দিনটার অপেক্ষায় রইলাম।
আরিশ শান্ত চোখে তাকায়। কি ভয়ানক তীক্ষ্ণ সেই দৃষ্টি।
নাজলী সামান্য ভয় পেলো। তবে প্রকাশ করলো না একটুও । প্রসঙ্গ পাল্টিয়ে বলে,
” আমি ফ্রেশ হবে৷ এখন ব্রাশের প্রয়োজন। শাওয়ার নিব তাই ড্রেসের প্রয়োজন। আমাকে যে এখানে বন্ধী করবেন সেটা তো আপনাদের আগে থেকেই প্লান ছিলো। বাড়িতে যখন এনেছেন সেই হিসেবে আগে থেকেই সব কিছু গুছিয়ে রাখা উচিত ছিলো।
আরিশ চোয়াল শক্ত করে বলে,
” কি মনে হয়? তোমাকে সেবাযত্ন করব বলে এখানে নিয়ে এসেছি?
নাজলী চুপ হয়ে যায়৷ কিছু একটা ভেবে বাঁকা হাসে। আরিশের কাছা- কাছি দাড়িয়ে বলে,
” স্বামীজান! নিজের স্ত্রীর সাথে এমন ব্যবহার কেনো করছেন?
আরিশ দু পা পিছিয়ে যায়। নাজলীর অভিনয় দেখে রাগে কেঁপে উঠে শরীর। ধমক দিয়ে বলে,
” যাস্ট সেট আপ! ভুলভাল শব্দ উচ্চারন করলে এসিডে ডুবিয়ে মারব।
নাজলী লাজুক হেসে বলে,
” স্বামীর হাতে স্ত্রীর খুন! আমি তাহলে ইতিহাসের এক ভাগ্যবান নারী হব। আমার স্বামী আমাকে খুন করবে। একটু ভালোবেসে খুন করবেন প্লিজ?
অধিরাজের চোয়াল ঝুলে আসে। এই মেয়ে তো পাক্কা প্লেয়ার। ড্রামা করছে নাকি সত্যি কথা বলছে? আরে ধুর শা**ওয়া বুঝতে পারছি না কেনো?
অধিরাজ শান্ত হয়ে আসে। চোখ ছোট করে বলে,
” মাইর খেলে শান্ত পাবে? রাগাতে এসেছো?
নাজলী ঠোঁট উল্টে বলে,
” নিজের স্ত্রীকে মারতে হাত কাঁপবে না? মায়া হবে না আপনার আরিশ।
আরিশ আর নিতে পারছে না এইসব সম্মোধন। পাশে থাকা টেবিলে লাথি দিয়ে হুংকার দিয়ে উঠে,
” যাস্ট সেট আপ!
নাজলী বাঁকা হাসে। আরিশের নাস্তানাবুদ অবস্থা দেখে যেন প্রশান্তি লাভ করছে। অধিরাজ দ্রুত আরিশের দিকে এগিয়ে আসলে আরিশ হাত দিয়ে থামিয়ে দেয়। নাজলীর দিকে রক্তচোখে তাকিয়ে বলে,
‘ তুই বাহিরে যা আমি এখন এই আসছি।
নাজলীর সব সাহস শেষ। এতক্ষন অধিরাজকে দেখানোর জন্য এইসব বলেছে৷ এখন অধিরাজ চলে গেলে এই নেকড়ের সামনে এক মুহূর্ত ও থাকা যাবে না। তবে নাজলী এইটা বুঝেছে তাকে জানে মারবে না। কারন তাকে প্রচুর নিরাপত্তার মধ্যে রাখা হয়েছে। এই বন্ধী করার পিছনে নিশ্চই কোনো রহস্য আছে। আর সেটা সে বের করবে৷ নাবিদ একা একা কি করছে কে জানে? এনি চিঠি তো পেয়েছে। এখন কাল পালাতে পারলেই হয়। তাহলে আমাকে ও আর তার সাথে দেখা করার প্রয়োজন হবে না। আমিও পরে সুযোগ বুঝে পালাব।
আরিশ পড়ে থাকা টেবিলটাকে লাথি মেরে সামনে এগিয়ে যায়। নাজলী বাঁকা হেসে বলে,
” স্বামীজান বউকে রেখে কোথায় যাচ্ছেন?
আরিশের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে যায়৷ হিংস্রতা নিয়ে প্রবল বেগে এসে নাজলীর গালে থাপ্পর বসায়৷ নাজলী পড়ে যেতে নিলে আরিশ বাহু চেপে ধরে৷ এরপর এক ধ্বাক্কায় ডিভানের উপর ফেলে দেয়। পুরো শরীর ব্যাথায় ঝাকি দিয়ে উঠে। আরিশ চোখের পলকে টি- শার্ট খুলে দুরে ছুঁড়ে ফেলে দেয়৷ আরিশের এমন উন্মাদ কান্ডে নাজলী চোখ ছোট ছোট করে ফেলে। চোখে সামান্যতমন ভয়ও নেই। আরিশ নাজলীর দিকে ঝুঁকে দুই হাত চেপে ধরে। নাজলীর মনে হচ্ছিল যেন কোনো সিংহ তার হাতে খামছে ধরেছে। চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ে। আরিশ এক হাতে নাজলীর জামার অংশ টান মেরে ছিঁড়ে ফেলে। রাগে গর্জে উঠে,
” স্বামী ডাকার স্বাদ আমি তকে বুঝাচ্ছি।
নাজলী সামান্য হেসে বলে,
” এইভাবে নেকড়ের মত খামছা- খামছি করছেন কেনো? একটা জামা ছিলো এইটাও ছিঁড়ে ফেললেন। আমাকে বললে আমি খুলে দিতাম।
আরিশের হাত শিথিল হয়ে আসে। রাগে জ্বলতে থাকা চোখ দুইটাতে এখন অবাকতা। নাজলীর ঠোঁটের দিকে চোখ যায়। ঠোঁটে মুচকি হাসি৷ গোলাপি ঠোঁট জোড়া কেমন লাল হয়ে আছে। এত কাছে এই ঠোঁট দুইটা যেন চুম্বকের মত আরিশকে টানছে। আরিশ সামান্য ঢোক গিলে। নিজেকে হারিয়ে নাজলীর ঠোঁটের সাথে ঠোঁট মিলিয়ে দেয়। যে মুহূর্তে নাজলীর মধ্যে মত্ত হতে যাবে এমন সময় ব্যাথায় আচমকা নাজলীর ঠোঁট ছেঁড়ে দেয়। হঠাৎ নাজলীর এমন অপ্রত্যাশিত আক্রমেন আরিশ মোটেও প্রস্তুত ছিলো না৷ আরিশ নিচ দিয়ে নাজলীর হাত চেপে ধরে৷ রাগে আরিশের শরীর কাঁপছে। নাজলী যেভাবে ছিলো ঠিক সেভাবেই চেপে ধরে আছে। আরিশ আচমকা নাজলীর হাতে নখ দিয়ে আচর কাটে। সাথে সাথে নরম চামড়া কেটে গিয়ে রক্ত বের হতে থাকে। নাজলি আরিশকে ছেড়ে দেয়। হাতে রক্ত দেখে বিরক্তি নিয়ে বলে,
” হাত কেটে রক্ত বের করে ফেলেছেন?
আরিশ নিচের দিকে তাকিয়ে এখনও ঘন ঘন নিশ্বাস টানছে। পুরো মুখ লাল হয়ে আছে৷ নাজলী সেদিকে তাকিয়ে হেসে বলে,
” বেশি ব্যাথা পেয়েছেন স্বামীজান। আজ তো যাস্ট ভবিষ্যতে চেপে ধরেছি আরেকবার আমার কাছে আসলে ভবিষ্যতটা-ই অন্ধকার করে ফেলব।
আরিশ এখন ও শ্বাস নিচ্ছে৷ এমন এক জায়গায় নাজলী আক্রমন করেছে যে আরিশের সব শক্তি এক নিমিষে ফুরিয়ে গিয়েছে।
নাজলী ঠোঁট কামড়ে হেসে রুমের দিকে এগিয়ে যায়। সে জানে এর পরিনাম হিসেবে কঠিন মুল্য দিতে হবে। কিন্ত সে সব মুল্য দিতে প্রস্তত। এমন নেকড়ে কে -সে শান্তিতে থাকতে দিবেই – না।। যখন জানে মারবে না তখন ভয় কিসের? আর যখন ইজ্জতে হাত দিতে যাবে তখন ঠিক আজকের মত-ই চাঁদমামাকে চেপে ধরব।
আরিশের কোনো শব্দ না পেয়ে নাজলী ঘাড় ঘুরায় এক পলক দেখার জন্য। আরিশকে মাথা নিচু করে বসে থাকতে দেখে সামান্য হাসে। এরপর গলার আওয়াজ দিয়ে বলে,
” লজ্জা কেনো পাচ্ছেন ক্রিমানল লিডার আরিশ। নিজের বউ – এই স্পর্শ করেছে। অন্য মেয়েতো আর ধরে নি। তাই বলে এইটা নিয়ে লজ্জায় বসে থাকবেন। আরে সাহস নিয়ে উঠে পড়ুন আমার এক মাত্র ক্রিমিনাল জামাই।
নাজলী আর অপেক্ষা করে না। এক দৌঁড়ে রুমে যায়। এরপর ঠাস করে দরজা লাগিয়ে দেয়৷ বড় বড় শ্বাস টেনে বুকে থু থু দেয়। সিংহের সাথে যুদ্ধ করে ফিরেছে সে। নিজের সাহস নিয়ে নিজেকে কতক্ষন বাহবা দিলো। আরিশের চুপ হয়ে যায় মুখটা দেখে সামান্য চিন্তিত হয়ে যায়৷ সামান্য ব্যাথা পেয়ে এইভাবে বসে থাকার ছেলে তো সে নয়। এইটা চুপ থাকা নয়। এইটা হচ্ছে ঝড়ের পূর্বাভাস? নাজলী ভয়ে ঢোক গিলে।
জঙ্গল জুড়ে রহস্যজনক রক্তের ছাপ। আফ্রিকার গভীর অরন্য থেকে মানুষের হাড়গুড় আর মাংবিশেষ উদ্ধারে চাঞ্চল্যকর তথ্য
নিউজ ডিস্ক, মধ্য আফ্রিকা–
আফ্রিকার এক অজানা ও গভীরতম বনাঞ্চলের ভেতরে সম্প্রতি যা আবিষ্কৃত হয়েছে, তা যেন সভ্যতাকেই চ্যালেঞ্জ জানায়। বিস্ময়, আতঙ্ক এবং প্রশ্নে মোড়ানো এক রহস্যময় সন্ধান ধরা দিয়েছে। ঝোপজঙ্গলের নিঃসঙ্গ গহ্বরে মিলেছে মানুষের রক্ত। ছিন্নভিন্ন মাংসপিণ্ড এবং ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা হাড়গোড়।
স্থানীয় এক আদিবাসী সম্প্রদায়ের শিকারিরা প্রথম সন্দেহজনক রক্তের দাগ দেখতে পান। তাদের ভাষায়, “গাছের কান্ডে, পাতায়, এমনকি বাতাসে ছিল রক্তের গন্ধ। সেদিন বনের নীরবতাও যেন ছিল অস্বাভাবিক।”
তদন্তকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেখতে পান একাধিক হাড়ের টুকরো।ভাঙা করোটি এবং মাংসের লোপাট হওয়া অংশ ছড়িয়ে আছে।যার সবই স্পষ্টত মানবদেহের। এই নারকীয় দৃশ্যের সামনে দাঁড়িয়ে কেউই নির্লিপ্ত থাকতে পারেনি।
তবে প্রশ্ন একটাই—এ কোন শক্তির খেলা?
প্রাকৃতিক শত্রু।নাকি মানবকুলেরই রক্তপিপাসু চক্রান্ত?
সম্ভাব্য দুটি তথ্য সামনে এসেছে।
১. জংলি – জন্তুর হামলা –
স্থানীয় রেঞ্জারদের মতে, এলাকা ঘিরে রয়েছে চিতা, হায়েনা, এবং বিরল কিছু নিশাচর মাংসাশী প্রাণী। তবে মানুষের ওপর এতটা ভয়ানক ও বিস্তৃত আক্রমণের নজির খুব কমই আছে। পশুর কামড়ের নিদর্শন কিছু হাড়ে পাওয়া গেলেও, পুরো ঘটনার ব্যাখ্যা তাতে মেলে না।
২. নাকি মানুষেই মানুষের শত্রু-
অন্যদিকে, কিছু তদন্তকারী ও সাংবাদিক মনে করছেন এটি হতে পারে রিচ্যুয়াল স্যাক্রিফাইস বা গোপন সহিংসতার ফল। আফ্রিকার নির্জন অরণ্যে বহু সময় এমন কাল্ট বা ভৌতিক সম্প্রদায়ের অস্তিত্বের কথা শোনা গেছে।যারা অন্ধ বিশ্বাসে মানব বলির পথে হেঁটেছে।
ব্রাডকাস্ট স্ক্রিপ্ট….
অ্যাংকর (স্টুডিও, শান্ত কিন্তু কণ্ঠে উদ্বেগ):
লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ২১
“নমস্কার। আমি মালিকা এনজেইয়া, AfriHorizon News-এর রাতের সংবাদ উপস্থাপক। আজ বিকেলে আমাদের অনুসন্ধানী দল একটি জঙ্গলবেষ্টিত এলাকায় অস্বাভাবিকতা শনাক্ত করেছে।রক্তের দাগ এবং হাড়ের কিছু অব্যবস্থাপিত অংশ পাওয়া গেছে। এখানেই আমাদের ফিল্ড রিপোর্টার তাকুয়িলা সোমবো, ঘটনাস্থল থেকেই সরাসরি সংযোগে আছেন।
কারোর জানা নেই কে করেছে এমন কাজ? জন্তু নাকি কোনো মানুষ? আদ’ও কি রহস্য উন্মোচন হবে?
