লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৫০
লিজা মনি
নিশুতির ঘন অন্ধকারে একটা লোক দৌড়াচ্ছে প্রাণান্তে। শ্বাসের প্রতিটি টান বুকগহ্বরে আগুন জ্বালিয়ে দেয়।পায়ের নিচে ভেজা ভূমি পিছলে গিয়ে ভয়কে আরও তীক্ষ্ণ করে তোলে।
পেছনে লেপ্টে থাকে এক অচেনা সত্তা। এই মনস্টারের ছায়া। যার উপস্থিতি শব্দহীন হলেও পায়ের শব্দে ঝংকার তুলছে নিস্তব্দ রাতকে। এই রাতকে পরিণত করে শ্বাসরুদ্ধ কারাগারে।
আকাশ চিরে তুমুল বজ্রপাত নামছে। বিদ্যুতের ক্ষণিক দীপ্তিতে পথের রেখা ভেঙে যায়। গাছপালার ছায়া ধারালো দাঁতের মতো সামনে এগিয়ে আসে।
হৃদস্পন্দন অনিয়ত ছন্দে ছমছম করে উঠে। সময় সংকুচিত হয়ে কয়েকটি নিঃশ্বাসে আটকে পড়ে। একটা লোক জীবন বাঁচাতে প্রান দিয়ে দৌড়াচ্ছে।
হঠাৎ অন্ধকারের ভাঁজ থেকে উদ্ভাসিত হয় হুডি-পরা এক লোক। হাতে ঝুলে থাকা কুড়ালটি সম্ভাব্য পরিণতির নীরব প্রতীক।
কুড়ালের ধাতব অবয়ব আলো-অন্ধকারে কেঁপে ওঠে। স্পর্শের আগেই চাপ সৃষ্টি করে মেরুদণ্ডে বইয়ে দেয় শীতল স্রোত। বৃষ্টির ধারালো ফোঁটা চোখে মুখে আছড়ে পড়ে দৃষ্টিকে ঝাপসা করে তুলে বার বার। তবু থামার অবকাশ নেই। কুড়ালটা হাতে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে লোকটার দিকে।
লোকটা দৌড়াতে দৌড়াতে নিজের গন্তব্য হারিয়ে ফেলে। বুকের ভেতর বাতাস জমে থাকে বরফের মতো ভারী হয়ে।
হাপাচ্ছে সে প্রানপ্রনে। কিন্তু নিঃশ্বাস আর এগিয়ে যাচ্ছে না।।ফুসফুস ফাঁকা আর্তিতে থমকে যায়।
ভয়ের চাপে কণ্ঠনালী সঙ্কুচিত হয়ে আসে। প্রতিটি শ্বাস আধা পথে ভেঙে পড়ে শব্দহীন কাঁপুনিতে।
হৃদস্পন্দন উন্মাদের মত হয়ে পড়ে।
শরীর শিউরে ওঠে অনিচ্ছায়। কাঁপন ছড়িয়ে পড়ে অস্থিমজ্জা পর্যন্ত।
চোখের সামনে কালো দাগ ভাসে।আলো নিভে আসতে চায় মাথার ভেতর ভোঁ ভোঁ করে আতঙ্ক ঘোরে।
ঠোঁট কাঁপছে। জিহ্বা ভারী হয়ে আসে। গলা শুকিয়ে কাঠ শ্বাস চাইলে কেবল শূন্যতাই ফেরত দেয়।
পাঁজরের ভেতর তীক্ষ্ণ ব্যথা জ্বলে ওঠে। ঘাম আর ঠান্ডা একসাথে ত্বকে কামড় বসায়। পানি পিপাসায় জিহ্বা বের হয়ে যাচ্ছে। লোকটা দৌড়াতে গিয়ে হুট করেই দুইটা পশুর সম্মুখীন হয়। লোকটা ভয়ে চিৎকার দেওয়ার আগেই বাঘ আর বণ্য কুকুরের থাবার সম্মুখীন হয়।
হুডি পড়া লোকটার ঠোঁটে বাঁকা হাসি খেলে যায়। গম্ভীর গলায় ডাক দেয়,
” হান্টার, শ্যাডো কাম!
মালিকের আওয়াজ পাওয়া সাথে সাথেই অভিজ্ঞ সহকারীর মত আক্রমন থেকে থেমে যায়। দৌঁড়ে চলে যায় গ্যাংস্টার বসের দিকে। নিক অদ্ভুত ভাবে হেসে ওদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো। সাথে সাথে ধূসর চোখ দুইটা জ্বলে উঠলো। সামনে ছটফট করতে থাকা লোকটার দিকে তাকায়। হিংস্রতায় পুরো চোখ -মুখ লাল হয়ে উঠে। নিক আর অপেক্ষা করলো না। লোকটার পেটের উপরে বসে এলোপাথারি কিল – ঘুষি দিতে থাকে। লোকটা চেঁচাচ্ছে যন্ত্রনায়। বাঁচার জন্য মিনতি করছে। এইসব মিনতি নিকের কাছে তুচ্ছ। নিজের সব শক্তি দিয়ে লোকটার মুখে আঘাত করে যাচ্ছে। চোখ -মুখ থেতলে গিয়েছে। রক্ত ছিটকে পড়তে চাইলো তার চোখে -মুখে। কিন্ত বৃষ্টির ফোটার জন্য পানির সাথে মিশে গেলো। ঠোঁট কেটে রক্তাক্ত হয়ে পড়ে। চোখ দুইটা কোটরে গেঁথে যায়। লোকটা পাগলের মত হাত – পা ঝাপ্টাচ্ছে। নিক নাকে ঘুষি দিয়ে গর্জে উঠে,
” শত্রু পক্ষে ছেড়ে দেওয়ার মত রেকর্ড আজ পর্যন্ত গ্যাংস্টার বস করে নি। তর ভাই ম্যাসিমো আমার স্ত্রীর দিকে নজর দিয়েছে। তাই শালাকে মেরেছিলাম। তর সাহস হলো কিভাবে সেইম ভুল পুনরায় করার। শালা মাদার্ফাক, আমার স্ত্রীকে নষ্ট করার নীল নকশা তৈরি করিস! সেই নকশা আমি তর শা*** ডুকাব!
লোকটা কিছু বলার সুযোগ পাচ্ছে না। নিকের এলোপাথারি আঘাতে বেহুশ হয়ে পড়ে। নিক আরও রেগে ফেটে পড়ে। নিজেকে সামলাতে না পেরে পেটে কোঁ**প বসায়। রক্ত আর মাংস পিন্ড ছিঁটকে পড়ে দুরে কোথাও। লোকটার পুরো শরীর ঝাঁকিয়ে উঠে। চোখ দুইটা উল্টে আসে। জিহ্বা বের হয়ে দাঁতে কা**মড় লাগে। নিক উন্মাদের মত কিছু একটা খুঁজে চলে। কাঙ্খিত জিনিসটাকে পেয়ে হাত দিয়ে পিষ্ট করে ফেলে। রক্তাক্ত ছিন্ন – বিচ্ছিন্ন কলিজাটা হাতে নিয়ে কিছু বিশ্রি গালি দেয়।
নিক উঠে দাঁড়ায়। কলিজাটাকে পায়ের নিচে ফেলে ইচ্ছেমত পিষ্ট করে। নিজের দুইজন বিশ্বস্ত সহকারীর দিকে তাকিয়ে সামান্য ইশারা করে। ব্যাস দুইজন এই ঝাঁপিয়ে পড়ে মৃত লোকটার উপরে। ছিঁড়ে খেতে থাকে শরীরের কাচা মাংস। মুখ থেকে বের করে ভয়ানক গর্জন।
নিক হেসে আবারও যেভাবে এসেছিলো সেভাবে চলে যায়। রেখে যায় এক উন্মাদ পরিবেশ।
বাগানের গভীরতম আঁধারে দাঁড়িয়ে থাকা বাড়ির সামনের পাকা পথ ধরে হঠাৎ করে থামে গ্যাংস্টার বসের গাঢ় ধূসর গাড়ি। গাড়ি থেকে নেমে সোজা মেইন করিডরের দিকে এগিয়ে যায়। দরজা খুলতেই দেখতে পায় আরিশ আর অধিরাজ নকশা তৈরি করছে।
নিক রুমে ডুকে রক্তাক্ত শার্ট খুলে ফেলে। আরিশ নিজের কলমটা টেবিলের উপর রাখতেই নিকের দিকে চোখ যায়। শত ক্ষতের দাগ। প্রতিটা ক্ষত তাজা হতে উঠেছে পানির স্পর্শে।
নিকের শরীরের ক্ষত দেখে আরিশ হকচকিয়ে উঠে,
” নিক, তর পিঠে এত আঘাতের চিহ্ন কিসের? চাবুকের প্রতিটা দাগ এখনও কাচা হয়ে আছে। কে করেছে এইসব?
নিক খুব শান্ত গলায় বলে,
” আমার বাম পাজড়ের বাঁকা হাড্ডি।
অধিরাজ আর আরিশ দুইজন এই থমথমে খায়। এইটা কি ধরনের উত্তর? আরিশের চোখ -মুখ রাগে জ্বলে উঠে। এতগুলো আঘাতের চিহ্ন তার মাথা গরম করে দিচ্ছে। রাগে চোয়াল শক্ত করর বলে,
” বাম পাজড়ের বাঁকা হাড্ডি মানে? হেয়ালি করছিস আমার সাথে?
” তর কেনো মনে হলো আমি হেয়ালি করছি?
” তকে প্রশ্ন করেছি একটা তুই উত্তর দিচ্ছিস আরেকটা। পাজড়ের হাড্ডি খুলে গিয়ে তর শরীরে এইভাবে আঘাত করেছে? মজা করছিস আমার সাথে?
নিক বিরক্ত হলো। দাঁত পিষে বলে,
” এই বাঁকা হাড্ডি একটা চাবুক নিয়েছে। এরপর রাগ মিটিয়েছে আমার উপরে।
আরিশ কিছু বলবে তার আগেই অধিরাজ অভিজ্ঞদের মত বলে,
” আপনি কি ম্যামের কথা বলছেন, বস? বাঁকা হাড্ডি মানে কি উনাকে বুঝিয়েছেন?
নিক শরীরে শার্ট জড়িয়ে বলে,
” বাম পাজর আমার একটা এই। তাই উনাকে ছাড়া আর কাউকে বুঝানোর কথা না।
এতক্ষণে আরিশ আর অধিরাজের মাথায় ডুকলো। কিন্তু কেউ এই বিশ্বাস করতে পারছে না। কারোর হজম হচ্ছে না এই বিষয়টা। যার দিকে আঙ্গুল তুলে কথা বললে আঙ্গুল কেটে দেয় তাকে এতগুলো আঘাত করলো? অবিশ্বাস্য!
আরিশ কাঁপা গলায় বলে,
” ক.. কি করেছিস এনির সাথে?
নিক ভ্রু কুচকে তাকিয়ে বলে,
” বেডি মানুষের মত কাঁপছিস কেনো? আদর করেছি তকে?
আরিশ থতমত খেয়ে উঠে। এই বাল কখনো ঠিকভাবে কথা বলে না। স্বাভাবিক গলায় বলে,
” তকে এইভাবে আঘাত করেছে কেনো? পুরো শরীর যখম হয়ে গেছে।
নিক চেয়ারে বসতে বসতে বলে,
” সবাই ভালোবেসে চুম্মা -চুম্মি করে আর আমার বাঁকা হাড্ডি আলাদা জিনিস। উনার চুমুতে হবে না। তাই ভালোবাসা ফুটিয়ে তুলতে গিয়ে চাবুক মেরেছে।
” এইটা ভালোবাসা?
” ইয়েস।
আরিশ চোখ বন্ধ করে নিশ্বাস টেনে বলে,
” নিক মিজা করিস না ভাই। আগে বল তকে এইভাবে আঘাত করলো কেনো? আর তুই সত্যি কিছু করিস নি?
নিক চোয়াল শক্ত করে বলে,
” স্বামী -স্ত্রীর ভেতরের কাহিনী তুই জানতে চাচ্ছিস কেনো? ওর ইচ্ছে হয়েছে তাই মেরেছে। ওর ইচ্ছে হলে আমাকে কাটবে। যেখানে আমি প্রশ্ন করি নি সেখানে তুই প্রশ্ন করছিস কোন সাহসে? আমার স্ত্রী যা খুশি করবে। কেউ একটা প্রশ্ন ও করতে পারবে না।
আরিশ ফুঁশ করে শ্বাস টানে। এই আসক্তি ধ্বংসের কারন না হলেই চলবে।
স্থির গলায় বলে,
” এতটা ভালোবাসলি কখন?
নিক বাঁকা হাসে,
” কে বললো ভালোবাসি? তীব্র এক আসক্তি আমার। এক মরন ব্যাধী ক্যান্সার! সে আমার শরীরে এমনভাবে বাসা বেঁধেছে যে ছাড়তে চাইলেও কোনোদিন ছাড়তে পারব না।
অধিরাজ ঢকঢক করে পানি গিলে ফেলে। এক মেয়ের জন্য নিকের এমন ভালো আচরন মাঝে মাঝে অধিরাজকে তৃষ্ণার্ত করে ফেলে। অধিরাজ কেঁশে বলে,
” কখনো ম্যামের প্রশংসা করেছেন স্যার?
নিকের নাক -মুখ কুচকে আসে। এইসব আশ্চর্য জিনিস এর থেকে একটাও নেই। অধিরাজ বুঝে বলে,
” ম্যামকে গিয়ে চাঁদের সাথে তুলনা করবেন। তুমি
চাঁদের থেকেও বেশি সুন্দরী।
নিকের চোখ -মুখ ক্রোধে জ্বলে উঠে। দাঁত পিষে বলে,
” চাঁদের হাত -পা আছে? নাকি ওর নিজের কোনো আলো আছে। চাঁদের নিজের এইতো আলো নাই। আরেকজায়গা থেকে ভিক্ষে করে নিজের আলোটা টিকিয়ে রাখছে। যার নিজের কোনো উজ্জ্বলতা নেই তার সাথে এই মেয়ের তুলনা করব? মরার জন্য মন চাচ্ছে তর? বল আমাকে, এসিডে চুবিয়ে রেখে আসি।
অধিরাজ থমথমে মুখে দাঁড়িয়ে থাকে। নিকের যুক্তি দেখে আরিশও ভ্রুঁ নাচায়। সত্যি, যার নিজের এই কোনো আলো নেই তার আবার সৌন্দর্য কিসের!
অধিরাজ ভোঁতা মুখে বলে,
” সরি স্যার।
নিক চুল ঠিক করে বলে,
” মেহেরের কি অবস্থা?
আরিশ একটা পাথরকে ঘুরাতে ঘুরাতে বলে,
” সারাদিন নিশ্চুপ হয়ে বসে থাকে। আমার সাথেও কথা বলে না তেমন। ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে এসেছি। মেডিসিনের পাওয়ারে এত সহজে ঘুম ভাঙবে না। সকালে যাব মেডিসিন খাওয়ানোর জন্য।
নিক নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরলো। তার রিয়্যাকশন বুঝা বড্ড কঠিন।
রাতের অন্ধকার গাঢ় কালিমার মতো চারদিক গ্রাস করে নিয়েছে। বাহিরে তুমুল বেগে ঝরছে বৃষ্টি। প্রতিটি ফোঁটা যেন আকাশের বুক ছিঁড়ে ছুটে আসা তীক্ষ্ণ বাণ। বৃষ্টির আঘাতে মাটি কেঁপে উঠছে। চারপাশে ছড়িয়ে পড়ছে ভারী ও দমবন্ধ করা শব্দের চাপ। হঠাৎ হঠাৎ বজ্রের বিকট কলধ্বনি আকাশ চিরে দিচ্ছে। তার গর্জনে হৃদস্পন্দন পর্যন্ত থমকে যেতে চায়। বিদ্যুতের নিষ্ঠুর ঝলকানিতে অন্ধকার ক্ষণিকের জন্য উন্মোচিত হয়ে আবার আগের চেয়ে আরও ভয়ংকর রূপে ফিরে আসে। হিমেল বাতাস শীতল ধারালো ছুরির মতো শরীর ছুঁয়ে যাচ্ছে। শরীরব যেন কাঁপন ধরিয়ে দিচ্ছে প্রতিটি শিরায়।
এই পরিবেশে নিস্তব্ধতা আর প্রলয়ের শব্দ মিলেমিশে এক আতঙ্কগ্রস্ত সৌন্দর্যের জন্ম দিয়েছে।
রাত্রির এই রুদ্র রূপ প্রকৃতির নিঃশব্দ হুঁশিয়ারি নির্মম গভীর এবং অবর্ণনীয়ভাবে।
একটা বদ্ধ পরিত্যক্ত রুম। রুমটা কেমন অশুভ কিছুর ইঙ্গিত বহন করছে। চারপাশে শুনশান নিরবতা। সেই ভয়ানক রুমটার নোংরা মেঝেতে অচেতন হয়ে পড়ে আছে এক অষ্টাদশী কন্যা। তার পুরো শরীর ভিজে একাকার অবস্থা। কাপড় ভেদ করে শরীরের প্রতিটা ভাঁজ উন্মুক্ত হয়ে আছে। বৃষ্টির প্রতিটা ফুঁটা যেন তার শরীরে মুক্তার মত চিকচিক করছে।
সামনেই বসে আছে এক বিকৃত পুরুষ। গ্যাংস্টার বসের হাতে বার বার অপমানিত হওয়া এক কাপুরুষ, ইগর। তার অশুভ জঘন্য দৃষ্টি মেহেরের শরীরের প্রতিটা ভাঁজে। চোখ দুইটা কেমন লালসার প্রলেপ পড়ে গিয়েছে। মেহেরের দিকে তাকিয়ে একের পর এক হুইস্কির বোতল শেষ করে যাচ্ছে। একটা গার্ডকে আদেশ করে বলে,
” জ্ঞান ফিরা এই মেয়ের।
সাথে সাথে দুইজন লোক এসে মেহেরের মুখে পানি ঢেলে দেয়। সময়ের ব্যবধানে মেহের ধরফরিয়ে উঠে। হুট করে চোখের সামনে কুৎসিত মানুষগুলোকে দেখতে পেয়ে আতঙ্কে জমে যায়। কায়াত, ইগর এই দুইজন ব্যাক্তিকে মেহের পূর্ব থেকেই চিনে। এরা আরিশ আর নিকের সব থেকে বড় শত্রু। ক্ষমতা আর দাপটের দিক থেকে কেউ কারোর কাছ থেকে কম যায় বা। এদের দুইজনের মুল টর্গেট ক্রিমিনাল লিডার আর গ্যাংস্টার বসের ধ্বংস। মেহেরের ভাবনার মধ্যেই ইগর পুরো রুম কাঁপিয়ে বিশ্রিভাবে হেসে উঠে। মেহেরর মনে হচ্ছে এক দোযখে এসে পড়েছে সে। আর সামনে আছে এক ভয়ানক পিশাচ। ধ্বংসের সীমানা অনুভব করতেই রমণী অস্থির হয়ে উঠে। ইগর একদম মেহেরের কাছে আসে। এরপর নাক দিয়ে মেহেরের শরীর শুকে কুকুরের মত জিহ্বা বের করে। মেহের সহ্য করতে না পেরে কান্না করে উঠে। মেহেরের এমন অসহায় মুখটা দেখে ইগর আরও হেসে উঠলো। এই বিশ্রি হাসির শব্দ বহন করার মত শক্তি মেহেরের নেই। ইগর হাসি থামিয়ে বলে,
” কেমন আছো ক্রিমিনাল লিডারের প্রানভোমড়া?
মেহের চোখ বন্ধ করে কেঁদে উঠে,
” ছেড়ে দাও আমাকে। এখানে নিয়ে এসেছো কেনো? কি চাই তোমাদের?
ইগর বিকৃতভাবে হাসলো। মেহেরের গলায় আঙ্গুল ছুঁয়ে দিতে দিতে বলে,
” এতটা ছটফট করছো কেনো বেইবি। ইঞ্জয় করো আমাদের সাথে। রুমে বন্ধী থাকতে থাকতে নিশ্চই ক্লান্ত হয়ে গিয়েছো। এখন কিছুটা আরাম করো। আরিশের বোন এত সুন্দর জানলে তো ওই শালীর জন্য এতটা বেপোরোয়া হতাম না।
মেহেরের ঘৃনায় শরীর গুলিয়ে আসে। হায় আল্লাহ কোন দোযখে ফেলেছো আমায়? কষ্ট লাঘব করার জন্য তোমার প্রকৃতিকে অনুভব করতে চেয়েছিলাম। আর তুমি আমার জন্য এমন জঘন্য কাহিনী লিখে দিলে? প্লিজ হ্যাল্প করো। ভাইয়া কোথায় তুমি? এই জঘন্য লোকগুলো থেকে বাঁচাও। প্লিজ ভাইয়া!
ইগরের অশালীন স্পর্শে মেহের ক্রোধে ফেটে পড়ে। ছটফট করে চিৎকার দিয়ে উঠে,
” ডোন্ট ক্রস ইউর লিমিট বাস্ট্রাড! টাচ করলে শুধু হাত নয় নরক যন্ত্রনা সইতে হবে তকে। ভুলে যাচ্ছিস আমি কে? আমার পরিচয় কি? ছেড়ে দে আমাকে। কসম করে বলছি কাউকে কিছু বলব না।
ইগর মেহেরের রাগান্বিত মুখশ্রীর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে ওয়াইন ছুঁড়ে দিলো মুখে। সামান্য ওয়াইন মুখে যেতেই মেহেরের গা গুলিয়ে আসে। বমি করে পুরো মেঝে ভাসিয়ে দেয়।
ইগর নাক-মুখ কুচকালো। আবারও অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো এক বিকৃত দানব। হাসতে হাসতে মেহেরের চারপাশ ঘুরে ঘুরে বলে,
” তেজ দেখালে আরও নোংরা পরিস্থিতি তৈরি করব। তর সব থেকে বড় অপরাধ, তর সাথে ওই দুই শুয়রের বাচ্চার সম্পর্ক আছে। আব্বে শালী তর কিছু হলেই তো আরিশ পাগলা কুকুর হবে। বোনকে হারিয়ে যখন উন্মাদ হয়ে উঠবে তখন পরবর্তী প্রহার ওর উপর করব। এরপর ওকে মেরে ফেললে গ্যাংস্টার বস নিয়ন্ত্রনহারা হয়ে পড়বে। সর্বশেষ খতম করব এই গেইমের সব থেকে বিষাক্ত সাপটাকে। এর কারনে আমি সব থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। এই মাদা*র্চু*** মরলে আমার রাস্তা পরিষ্কার। তার আগে তকে মরতে হবে ডার্লিং। এই শরীরের স্বদ প্রথমে নিব এরপর ছিঁড়ে ছিঁড়ে মাংস খাব। তাজা রক্ত পান করব এই শরীরের। প্রচুর জ্বালিয়েছে তর ভাই আমাকে। এখন সুযোগ বদলা নেওয়ার।
মেহেরের শরীরের নিচ থেকে যেন জমিন সরে গিয়েছে। বুক ফেঁটে চিৎকার বের হয়ে আসতে চাইছে। কিন্তু চিৎকার দেওয়ার মত শক্তি খুঁজে পাচ্ছে না। এক কা-পুরুষের নোংরা স্পর্শ তার শরীরকে কুলষিত করে দিবে ভাবতেই শরীর হীম হয়ে আসতে চাইছে। মেহের কান্না করে ছটফট করে উঠে আবারও,
” এতবড় অপরাধ করো না। তুমি তো আমার বাবার বয়সী। প্লিজ মেয়ে ভেবে ছেড়ে দাও আমাকে। কসম করে আবারও বলছি কাউকে কিছু বলব না। আমার সম্রমটুকু ছিনিয়ে নিও না। দোহায় লাগে তোমার।
ইগর কান্নার অভিনয় করলে। অপরাধীর মত মুখটাকে করে বলে,
” তুমি আমার মেয়ের বয়সী?
মেহের মাথা নাড়িয়ে বলে,
” আমার বাবা বেঁচে থাকলে হয়ত তোমার সমান থাকত। প্লিজ ছেড়ে দাও আমাকে ইগর।
ইগর আরও ইনোসেন্ট সেজে বলে,
” বাবা মাই ফুট! আমি ইগর কত মেয়ের সাথে রাত কাটিয়ে ফেলে এসেছি তার হিসেব নেই। এর থেকে এক দুইটা বাচ্চা-কাচ্চাও হয়ত পয়দা হয়ে গিয়েছে। কোনোদিন ফিরেও তাকায় না এইসবে। আর তকে নিজের মেয়ে ভাববো? আর এইটা ভেবে ছেড়ে দিব? ইমোশনাল নাটক করতে এসেছো বেইবি!
কথাগুলো বলে আবারও পৈশাচিকভাবে হেসে উঠে,
” পুরুষ্যত্ব যে তোমাকে টানছে ডার্লিং। তর ভাইয়ের সামনে যদি তকে ছিঁড়ে খেতে পারতাম তবে শরীরের জ্বলা মিটত। কিন্তু এই শুয়রের বাচ্চাগুলো জানতে পারলে তো আমাকেই খেয়ে ফেলবে।
ইগর এগিয়ে আসে মেহেরের দিকে। মেহের ইগরের চোখে চোখ রেখে বলে,
” একটু স্পর্শ করলে আল্লাহর গজব পড়বে তর উপর ইগর।
ইগর মেহেরের চুলের মুঠি শক্ত করে ধরে ঘর কাঁপিয়ে ধমকে উঠলো,
” চুপ শালী। তর আল্লাহকেই তো মানি না। সেখানে গজব ফেলবে কে।
মেহের ব্যাথায় কাতরাতে থাকে। চুলগুলো মনে হচ্ছে ছিঁড়ে যাচ্ছে। চোখ থেকে টিপটিপ পানি পড়ছে। করুন সুরে বলে,
” নিজের সৃষ্টিকর্তাকে যে চিনে না সে এমনিতেই জালিম। তর ধ্বংস এমনিতেও লেখা হয়ে গিয়েছে। আমাকে দিয়ে তর ইতি টানবে। আমাকে ছেড়ে দে নাহলে সকালের সূর্যদয় দেখারও সুযোগ পাবি না। যদি আমার ভাই ভুলেও জানতে পারে তুই আমার সাথে বিশ্রি ব্যবহার করেছিস তর কলিজা কেটে রাস্তার কুকুরকে খাওয়াবে।
ইগরের মাথায় ধপ করে আগুন ধরে যায়। রাগে উন্মাদ হয়ে মেহেরের নরম গালে পর পর চার -পাঁচটা থাপ্পর লাগায়। ফর্সা গাল যেন চামড়া ফেটে রক্ত বের হচ্ছে। ঠোঁটের কোণা থেকে রক্ত পড়ছে। থাপ্পরের প্রবণতা এত বেশি ছিলো যে মেহের নিজেকে ঠিক রাখতে পারে নি। এক পাশে ছিটকে পড়ে রমণী। ইগর থামে নি। মেহেরের নরম টুল তুলে পেটের উপর পা রেখে অশালীন ভাষায় গালি দিতে দিতে বলে,
” তর ভাই আমার বাল ফেলাবে। এই শুয়রের বাচ্চাটাকে মারার জন্যই তকে আনা হয়েছে শালী। একদম ভাইটার মত হয়েছিস। শরীরের প্রতিটা ভাঁজে তেজ। নিজের ইজ্জত হারাতে চলেছিস সেটার বিন্দুমাত্র ভয় নেই।
মেহেরের মনে হচ্ছে এই বুঝি শ্বাসটা বন্ধ হয়ে আসছে। গলা কাটা মুরগীর মত ছটফট করে উঠে রমণী। পেটের উপর যেন কোনো পাহার ধ্বসে পড়েছে। ফর্সা মুখ পুরোটা লাল হয়ে আসে তার। ইগরের পায়ে ধরার জন্য ছটফটিয়ে উঠে। কিন্তু হাত পিছন থেকে বাঁধা। মেহের সহ্য করতে না পেরে কেঁদে উঠে,
” ইজ্জত ভিক্ষে দাও। প্রাণ ভিক্ষে দাও আমাকে ইগর।
এতটা জঘন্য কাজ করো না আমার সাথে। আমি নিককে ভালোবাসি। ও আমাকে একটুও ভালোবাসে না। তুমি যদি আমার সাথে খারাপ কিছু করো। তাহলে ও সারাজীবন আমাকে ধর্ষিতা বলে অনুভব করবে। আমি মরে গেলেও তার কলিজা কাঁপবে না। বলবে ধর্ষিতার জন্য আবার কিসের মায়া। ইগর তোমার পায়ে পড়ছি আমি। আমাকে জানে মেরে ফেলো। আমার সম্রমটুকু নিও না। আমি ওকে খুব ভালোবাসি। ওর ভালোবাসা ছাড়া আমি বাঁচতে পারব। কিন্তু ওর চোখের ঘৃণা নিয়ে কখনো মরতে চাই না।
ইগরের পা থেমে যায়। ঠোঁটের কোণে ফুটে এক কূটিল হাসি। মেহের নিককে ভালোবাসে এইটা সে কখনো জানতো না। খুশিতে উন্মাদ হয়ে বলে,
” তাহলে এক ঢিলে দুই পাখি মারব।
এইটা বলেই ইগর পাগলের মত হাসতে থাকে। মেহের নিস্তেজ শরীর নিয়ে পড়ে আছে। চোখ থেকে পানি পড়ছে অনবরত। কাঁদছে আর আল্লাহকে ডাকছে। প্রয়োজনে নিজের শরীরে নিজে কো**প বসিয়ে মরে যাবে। এরপরও অন্য পুরুষের স্পর্শ শরীরে লাগতে দিবে না। যাকে একবার হৃদয়ে স্থান দিয়েছে সে ছাড়া অন্য কারোর ছোঁয়া মেহেরের কাছে নরক যন্ত্রনা।
ইগর হিংস্রতা নিয়ে মেহেরের চুলের মুঠি চেপে ধরে। মেহের ব্যাথায় গোঙ্গাতে থাকে। তাকে টেনে -হিচড়ে বাহিরে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। বৃষ্টির বড় বড় ফোটা ভিজে একাকার করে ফেলে তাকে। শরীরে কাদা মাটিতে মাখামাখি হয়ে যায়। বজ্রপাত গুলো এই মুহূর্ত অশরীরি ডাকের মত শুনা যাচ্ছে। ইগর এখনও দানবের মত হেসে যাচ্ছে। শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে মেহেরের দিকে এগিয়ে আসছে আর পৈশাচিক ভাবে হাসছে।
” তকে এই মুহূর্তে ছিঁড়ে খাব। এইটা বদ্ধ রুমে করলে কেউ দেখবে না। চারপাশে হাজারটা গার্ড আছে। সবাই দেখবে তর ছটফটানি।এই আকাশ – চন্দ্র, সূর্য, জমিন সব কিছু তর চিৎকারের সাক্ষী হবে। এমন চিৎকার যেগুলো তর ভাইকে ভেঙ্গে ফেলতে সাহায্য করবে । এতেই হবে আমার পৈশাচিক আনন্দ। ওই দুই শয়রের বাচ্চার অহংকার চূর্ণ -বিচূর্ণ হবে। কত অপেক্ষা করেছি এই দিনটার জন্য। চেয়েছিলাম নিকের রক্ষিতাটাকে এভাবে শেষ করতে। কিন্ত শালা দুই মিনিটের জন্যও বাহির করে না। একটা পাখির নজরেও আসতে দেয় না। সামান্য রক্ষিতাকে এমনভাবে রক্ষা করছে যেন জীবনে কোনোদিন মেয়ে পাচার করে নি। তো কি হয়েছে। একজনের প্রানভোমড়াকে মারতে পারব না। কিন্তু আরেকজনের প্রামভোমড়াকে তো পেয়েছি। কুত্তার মত ছিঁড়ে খাব।
মেহেরের মনে হলো এই মুহূর্তে চারপাশের বাস্তবতা ভেঙে চূর্ণ হয়ে গিয়েছে। আর তার ভেতরের পৃথিবীটা এক নিমিষে অন্ধকারে ডুবে গিয়েছে।
আতঙ্ক বুকের গভীরে জমাট বেঁধে শ্বাসরোধী ভারে পরিণত হয়। প্রতিটি নিশ্বাস যেন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে টিকে আছে। চিন্তাশক্তি স্তব্ধ হয়ে পড়ে। মস্তিষ্কে শুধু একটানা ভয় ঘুরপাক খাচ্ছে।
চোখ আতঙ্কে বিস্ফারিত হয়ে উঠে দৃষ্টিতে ফুটে ওঠে চরম অসহায়ত্ব। যেখানে সাহায্যের আশা পর্যন্ত বিলীন হয়ে যায়।
কণ্ঠনালি শক্ত হয়ে আসে মুহূর্তেই। আর্তনাদ জন্ম নিলেও শব্দে রূপ নিতে পারে না। কারণ ভয় নিজেই তার কণ্ঠস্বর গ্রাস করে নিয়েছে।
স্নায়ুগুলো নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। শরীর অবশতায় জমে যায়। অথচ ভেতরে ভেতরে কাঁপন থামছে না। মনের গভীরে অপমানের আশঙ্কা বিষাক্ত ধোঁয়ার মতো ছড়িয়ে পড়ে। আত্মসম্মানকে শ্বাসরুদ্ধ করে ধীরে ধীরে নিঃশেষ করে দেয়।
অশ্রু নীরবে গড়িয়ে পড়ে। কিন্তু সেই কান্নাতেও কোনো স্বস্তি নেই। ভয়ে রমণী দিশেহারা হয়ে পড়ে। বিরবির করে উঠে,
” ইয়া আল্লাহ তোমার বান্দীকে সাহায্য করো। আজরাইল পাঠাও আর জানতে ছিনিয়ে নাও। তবুও এই অভিশাপ শরীরে লাগতে দিও না। এই পিশাচ থেকে আমাকে রক্ষা করো।
মেহের কাঁদছে আর বিরবির করছে। শরীর অবশ হয়ে আসছে। ইগর এগিয়ে এসে ঝুঁকে পড়ে তার দিকে। হাতের বাঁধ খুলে দিতেই মেহের চোখ খুলে। সামনে ইগরের বিকৃত চেহারা সামনে আসতেই কলিজা কেঁপে উঠে। কোনো কিছু না ভেবে ইগরের হাতে সর্ব শক্তি দিয়ে কামড় বসায়। ইগর ব্যাথায় বিশ্রি গালি দিয়ে উঠে। একটু ছাড়া পেতেই মেহের সুযোগ কাজে লাগায়। পিচ্ছিল জায়গা থেকে উঠে কোনোরকম দৌঁড় দেয় সামনের দিকে। পিছন থেকে ইগর কর্কশ কন্ঠে বলে,
” এই ধর, শালীকে।
সাথে সাথে অনেকগুলো গার্ড মেহেরকে আটকে ফেলে। বরফের মত জমে যায় রমণী। হাত জোর করে বলে,
” যেতে দাও আমাকে। নাহলে এই লোকটা শেষ করে ফেলবে। একটু সাহায্য করো।
সবাই কেমন অদ্ভুতভাবে হেসে উঠে। কি জঘন্য সেই হাসি। এরমধ্যে একজন গার্ড বলে,
” সিনারী দেখার জন্য দাঁড়িয়ে আছি। বসের শেষ হলে সামান্য চান্স পেলে কাজে লাগাব। আর তুই সাহায্যের হাত পেতেছিস?
মেহেরের পায়ের নিচ খুব হালকা লাগছে।বাস্তবতার এই নিষ্ঠুরতায় উন্মাদের মত এদিক -সেদিক তাকায়। এখানে প্রতিটা লোক পিশাচ। কেউ নেই তাকে সাহায্য করার জন্য। আরিশের কথা মনে হতেই মেহের চুল খামছে ধরে চিৎকার দিয়ে উঠে। এক নারীর এই চিৎকারের শব্দ যেন জমিন পর্যন্ত কাঁপিয়ে তুলেছে। কষ্টের এই আর্তনাদের সাক্ষী পুরো প্রকৃতি হচ্ছে। মেহের চারপাশে তাকিয়ে উন্মাদের মত বলে,
” এই প্রকৃতিকে আমি প্রচুর ভালোবাসতাম। এখনও বাসি। প্লিজ আমাকে বাঁচাও। আমি তো তোমাদের স্নিগ্ধ সকালের বন্ধু ছিলাম। কত – শত সময় কাটিয়েছি তোমাদের সাথে। প্লিজ হ্যাল্প করো।
প্রকৃতিও যেন স্থির হয়ে গিয়েছে। মেহের পাগলের মত বলেই যাচ্ছে। নিজেকে বাঁচানোর আশায় সবার কাছে ভিক্ষে চাইছে। একটা বিকট থাপ্পর এসে পড়ে তার বাম গালে। ভেজা মাটিতে আবারও ছিঁটকে পড়ে রমণী। ইগর রাগে ফুঁশ – ফুঁশ করছে । কোমড় থেকে ব্যাল্ট খুলে মেহেরের পিঠে এলোমেলো ভাবে মারতে থাকে। মেহের গগন কাঁপিয়ে আল্লাহকে ডেকে উঠে। ইগর যেন নিজের সব রাগ মিটাচ্ছে এই নিষ্পাপ ফুলটার উপরে। মেহের গলা কাটা মুরগির মত ছটফট করতে থাকে। আশে পাশে প্রতিটা বিষাক্ত পশু হেসে মজা নিচ্ছে। রক্তাক্ত হয়ে পড়ে মেহেরের শরীর। ঠোঁট -কপাল ফেটে রক্ত পড়ছে। বুক থেকে ওরনা সরে গেলে দুর্বল হাত দিয়ে জড়িয়ে নেয়। নিথর দেহটা যেন মাটির সাথে মিশে যাচ্ছে। এক একটা আঘাত বজ্রের সাথে তাল মিলাচ্ছে। মেহের কেনো জানি অজান্তেই হাসলো। এইটা ভেবে খুশি লাগছে ব্যাল্ট দিয়ে মেরে ফেলুক তবুও তাকে চরিত্রহীন না করা হোক। মেহেরের ছটফটানো কমে যায়। ঠোঁটের মৃদু হাসি দেখে ইগর থেমে যায়। সামান্য ভয় ডুকে মনে। তবে এই হাসিটা তার ব্যক্তিত্বে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে। রেগে ব্যাল্টটাকে দুরে কোথাও ছুঁড়ে ফেলে দেয়। হিংস্রতার দাপটে গর্জে উঠে,
” এই শালী কাঁদার বদলে হাসছে কেনো? পাগল হয়ে গিয়েছে? মায়াজাল ফেলছিস? তবে শুন ইগর এইসব মায়াজালে আবদ্ধ হয় না। তকে ভেঙ্গেই আমি শান্ত হব।
মেহের নিথর শরীরটা নাড়াচড়া করতে পারছে না। বৃষ্টির ফুটাতে রক্তগুলো পরিষ্কার করে দিচ্ছে।বৃষ্টিস্নাত নিশুতির রাতে অন্ধকার নেমে আসে অচলিত শাসনের মতো হয়ে উঠেছে। আকাশের প্রতিটি ফোঁটা দণ্ডাদেশের সিলমোহর। কাদামাখা ভূমিতে মেহের ছটফট করছে। মাটি এক আঠালো কারাগার, যা পা ও ইচ্ছাকে একসাথে গ্রাস করে।
মেহেরের শ্বাসপ্রশ্বাস অনিয়ত ছন্দে কেঁপে ওঠছে। বক্ষগহ্বরে সঞ্চিত আতঙ্ক নিঃশব্দে ছমছমিয়ে ওঠে।
বৃষ্টির অবিরল ধ্বনি চারপাশে প্রতিধ্বনিত হয়ে চিন্তার স্তরগুলোকে ভেঙে চুরমার করে দেয়।
কাদা আঙুলের ফাঁক গলে ঢুকে পড়ে স্মৃতির ভাঁজে।
বিদ্যুতের ক্ষণস্থায়ী দীপ্তিতে মুখখানা উদ্ভাসিত হয়
অশ্রু ও বৃষ্টির সীমানা বিলুপ্ত হয়ে একাকার।
নিশ্চুপ রাত প্রত্যক্ষদর্শী হয়েও নির্বিকার থাকে।পাথুরে নির্লিপ্ততায় মানবিকতার অনুরণন গিলে ফেলে। রাতের স্তব্ধতা ভারী হয়ে ওঠে ঘোষণাপত্রের মতো।
ভাগ্যের নির্মম পরিহাস খুবই ভয়ানক। যে রমণী কোনোদিন একটা থাপ্পরের আঘাত সহ্য করে নি সে আজ চাবুকের আঘাত সহ্য করে যাচ্ছে। চিৎকার করে কাঁদছে কিন্ত কেউ শুনছে না।
ইগরকে তার দিকে ঝুঁকতে দেখে মেহের উন্মাদ হয়ে উঠে। চারপাশে কত লোভী পুরুষ চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছে। তার নারী অবয়ব দেখার জন্য উন্মাদ হয়ে আছে। এই মুহূর্তে মেহের কাঁদতে কাঁদতে গলা ভেঙ্গে ফেলেছে। অথচ কোনো সমাধান মিলছে না। কাটা রক্তাক্ত ঠোঁট নিয়ে বলে,
” মিনতি করছি ইগর ছেড়ে দাও আমাকে। এত বড় ক্ষতি করো না আমার।
ইগর শক্তভাবে গলায় চেপে ধরে বলে,
” তকে মেরে সবগুলোকে আমার পায়ের নিচে এনে ফেলব।
এই বলে ইগর মেহেরের জামার এক অংশ টান দিয়ে ছিঁড়ে ফেলে। খামছির সাথে সাথে নরম মাংসপিন্ড থেকে রক্ত বের হয়ে আসে। মেহের জমিন ফাটিয়ে চিৎকার দিয়ে উঠে। দিশে হারা হয়ে উন্মাদের মত কেঁদেই যাচ্ছে। ইগর আরও এক টানে অপরপাশ ছিঁড়ে ফেলে। ভেতরের অন্ত*** দৃশ্যমান হয়ে উঠে। অতি শোকে মেহের পাথর হয়ে উঠে। মুহূর্তেই কান্না করা বন্ধ করে দেয় সে। একটু পর তাকে পুরো বস্ত্রহীন করে ফেলা হবে। এরপর সব গুলো কাপুরুষ তার দিকে তাকিয়ে গিলে খাবে। ভাবতেই মেহের চোখ বন্ধ করে ফেলে। চোখ থেকে পানি নয় যেন রক্ত পড়ছে। এই যন্ত্রনা আর বর্বতা সে সহ্য করতে পারছে না। একটু পর পর বজ্রপাতের কারনে সব আলোকিত হয়ে উঠছে। আচমকাই মেহেরের হাত যায় ইগিরের পিঠে। ইগর বিকৃতভাবে হেসে জামার বাকি অংশ ছিড়তে থাকে। অন্তর্বাসে হাত দেওয়ার সাথে সাথে মেহের একটা ছুঁড়ির সাহায্যে নিজের গলায় বসিয়ে দেয়। সাথে সাথে একটা বাক্য ভেসে আসে,
” লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ। হে আল্লাহ, আমাকে ক্ষমা করুন, আমার প্রতি দয়া করুন এবং আমাকে সর্বোচ্চ সঙ্গীদের সাথে মিলিত করুন। জীবন দিয়ে দিব তবুও নিজের ইজ্জত দিব না ।
ইগরের চোখ বড় বড় হয়ে যায়। নিজের পকেটে হাত দিয়ে দেখে ছোট্ট ছুঁড়িটা নেই। পিঠে হাত দেওয়ার নাম করে তাহলে ছুঁড়িটা নিয়েছে! ইগরের মাথায় যেন ভাঁজ পড়ে। দ্রুত মেহেরের উপর থেকে উঠে পড়ে। প্রতিটা গার্ড আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে পড়ে। মেহের হুট করে এমন কাজ করবে কেউ কল্পনাও করে নি। ইগর পাগলের মত এদিক -সেদিক ছুঁটছে। এই মেয়ে এত সাঙ্ঘাতিক জানলে কখনো তুলে আনত না। ভেবেছিলো ভোগ করে ছেড়ে দিবে। ভয় দেখিয়ে দেখিয়ে ভেতর থেকে শেষ করে দিবে। কিন্তু এখন কোনোভাবে যদি নিক আর আরিশ জানতে পারে!
মেহেরের গলা দিয়ে তরল রক্ত পড়ছে। বৃষ্টির সাথে মিশে যাচ্ছে সেই রক্তগুলো। গলা দিয়ে একটা শব্দ হচ্ছে। মেহের কাঁদছে। যন্ত্রনায় রুহটা বের হয়ে আসছে। পুরো শরীর আঘাতে রক্তাক্ত।নিথর দেহ হয়ে মাটির সাথে মিশে যাচ্ছে। আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে,
” খুব ভালোবাসি তোমাকে ভাইয়া। তোমার বোন আর কিছুদিন ভাইয়ের কোলে থাকতে পারলো না। ওরা বাঁচতে দিলো না আমায়। একদম কাঁদবে না আমার জন্য। কষ্ট হচ্ছে তোমার সাথে আর কোনোদিন দেখা হবে না। আই লাভ ইউ ভাইয়া।
ইগর সব কিছু রেখেই দল বল নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে তার বেঁচে থাকার প্রয়োজন। সব চলে গিয়েছে। ঘন অন্ধকার এই বর্ষণের রাতে অর্ধ নগ্ন হয়ে পড়ে আছে এক অষ্টাদশী কন্যা। বড় বড় শ্বাস টেনে বিরবির করে,
” মৃত্যুর আগে তোমাকে দেখতে চাই নিক।প্লিজ একবার ভালোবাসি বলো আমায়। এই শক্তিতে হয়ত আবারও ঠিক হয়ে যাব। একটু বেশিই ভালোবাসতাম তোমার। এই ভালোবাসা এত যন্ত্রনাদায়ক জানলে কখনো ভালোবাসার সাহস দেখাতাম না। আগুনে ঝাঁপ দেওয়া সমতুল্য জেনেও তোমাকে ভালোবেসছি। প্রতিটা নিশ্বাসে তুমি ছিলে। আমার প্রতিটা সপ্ন ছিলো তোমাকে ঘিরে। সারপ্রাইজ হিসেবে তোমাকে আর পেইন্টিংটা দেওয়া হলো না। তোমার জন্য এঁকেছিলাম একরাশ ভালোবাসা নিয়ে। আমি তো এতিম একটা মেয়ে। এতিম হয়ে তোমাকে ভালোবেসেছি। তোমার বউটাকে আর দেখা হলো না। তবে আশা রাখি সে অনেক সুন্দরী। সুখে সংসার করো দুজন। পরকালে তোমার -আমার দেখা না হোক। ভালোবাসার এই ব্যাথা, তীব্র যন্ত্রনা আমি আর সইতে পারবো না। বড্ড ভালোবাসি তোমাকে। আফসোস তোমার মুখ থেকে ভালোবাসি শুনা হলো না। সুখে থেকো……..
লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৪৯
এনির শরীর নিস্তেজ হয়ে আসে। অতিরিক্ত রক্ত ক্ষরণে ছটফট করতে থাকে যন্ত্রনায়। তীব্র ব্যাথায় গোঙ্গাতে থাকে। একটা পাখিও যেন চারপাশে নেই। হসপিটালে নিয়ে যাওয়ার মত কেউ নেই। ভাগ্যের উপর সব ছেড়ে দিয়ে মেহের চোখ বন্ধ করে ফেলে। একটা সময় শ্বাস ধীরে ধীরে কমে আসতে থাকে।
