Home লাভ বাই দ্যা ভিলেন লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৬১

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৬১

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৬১
লিজা মনি

ব্রেকিং নিউজ | আফ্রিকা জুড়ে আলোড়ন-
আফ্রিকার প্রায় প্রতিটি সংবাদমাধ্যমে এখন একটাই শিরোনাম। মধ্যরাতে শুত্রুপক্ষ থেকে ছুটে আসা এক ভয়াবহ বোমা হামলায় নিহত হয়েছেন দেশের সবচেয়ে ক্ষমতাধর গ্যাংস্টার বস। প্রাথমিক তথ্যে জানা যাচ্ছে, ঘটনার সময় তিনি তার নিজস্ব জেট বিমানের কাছাকাছি অবস্থান করছিলেন। চারপাশে ছিল কড়া নিরাপত্তা।বহুসংখ্যক সশস্ত্র গার্ড সর্বক্ষণ পাহারায় নিয়োজিত ছিল।
তবুও প্রশ্ন উঠছে, এত শক্ত নিরাপত্তা বলয় ভেদ করে হামলাকারীরা কীভাবে বোমা নিক্ষেপ করতে সক্ষম হলো? তদন্তকারীদের কাছেও বিষয়টি এখনো রহস্যে ঘেরা। নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রতিটি স্তর অক্ষত থাকার কথা থাকলেও, বাস্তবে তা কার্যকর হলো না কেন। প্রশ্নই এখন সবার মুখে মুখে।

একাধিক সূত্রের দাবি, এই হামলার পেছনে থাকতে পারে ভেতরের বিশ্বাসঘাতকতা। ধারণা করা হচ্ছে, গার্ডদের মধ্য থেকেই কেউ শত্রুপক্ষকে সহযোগিতা করেছে। সেই সহযোগিতার সুযোগ নিয়েই হামলাকারীরা নিখুঁতভাবে তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে। বিস্ফোরণের তীব্রতায় ঘটনাস্থলে থাকা গ্যাংস্টার বসসহ প্রায় চল্লিশজন গার্ড নিহত হন। ঘটনাটি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে পরিচয় শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়ে। দুরে ছিটকে পড়ে মাংস পিন্ড পাওয়া গিয়েছে।।কিন্তু এইসব কার তা চিহ্নিত করা মুশকিল।
নিরাপত্তা বাহিনী ঘটনাস্থল ঘিরে রেখে তদন্ত শুরু করেছে। ফরেনসিক দল আলামত সংগ্রহে ব্যস্ত। তবে এখনো পর্যন্ত নিশ্চিত কোনো পরিচয় বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি।
এই ঘটনার পর পুরো দেশ যেন নিঃশব্দ হয়ে গেছে। রাজপথ, বন্দর, এমনকি বাণিজ্যিক এলাকাগুলোতেও এক ধরনের অদৃশ্য আতঙ্ক বিরাজ করছে। সাধারণ মানুষের চোখেমুখে প্রশ্ন, এত বড় শক্তির পতন কি নতুন অস্থিরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে নাকি এটি অপরাধ জগতের ভেতরের আরেকটি রক্তক্ষয়ী অধ্যায়ের সমাপ্তি?
তদন্ত চলমান। দেশজুড়ে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা।

নিউজটির শব্দমালা কানে পৌঁছাতেই বলিষ্ঠদেহী পুরুষটি মুহূর্তের জন্য স্থবির হয়ে যায়। প্রশস্ত কাঁধের উপর ভারী নীরবতা নেমে আসে। চোখের গভীরে জমে উঠে ক্ষণিকের বিষণ্নতার ছায়া। কয়েক সেকেন্ডের জন্য মনে হলো অতীতের কোনো অস্পষ্ট স্মৃতি তার চেতনাকে আচ্ছন্ন করে ধরেছে। শ্বাস-প্রশ্বাস পর্যন্ত যেন নিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে।
কিন্তু সেই স্তব্ধতা দীর্ঘস্থায়ী হলো না। হঠাৎই কোনো অদৃশ্য চিন্তার স্ফুলিঙ্গ তার স্মৃতিপটে জ্বলে উঠতেই ঠোঁটের কোণে জন্ম নেয় এক বক্র ও অর্থবহ হাসি। যেন এই হাসির আড়ালে লুকিয়ে আছে অগণিত অপ্রকাশিত রহস্য ও অদম্য আত্মবিশ্বাস। লোকটার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠে। চোখের পাতায় জমে থাকা বিষণ্নতা ধীরে ধীরে সরে গিয়ে জায়গা করে দেয় শীতল দৃঢ়তায়।
তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তখনও স্ক্রিনে স্থির। এক পলকও বিচ্যুত নয়। সংবাদপাঠকের কণ্ঠ ভেসে আসছে দূর থেকে, অথচ তার মন এখন অনেক গভীরে ঘটনার পরত পরত বিশ্লেষণে ব্যস্ত। আলো-ছায়ার ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা সেই পুরুষটির অবয়বে স্পষ্ট হয়ে উঠল এক নিঃশব্দ ঘোষণা,

” তর জন্য মায়া হচ্ছে নিক। যত হোক এক সময় বন্ধু ছিলি আমার। কিন্তু তুই আমার জীবনের সব আলো-সুখ কেড়ে নিয়েছিস। আমার বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন আমার পাখিটাকে আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছিস। আমাকে দুর্বল জায়গাকে নিজের ক্ষমতা বানিয়েছিস। ভয় দেখিয়েছিস এনিকে চাইকে ওর সামনে আমার অতীত খুলে দিবি। আমি তার চোখে ঘৃনা দেখতে চাই নি। দিনের পর দিন বুকে কষ্ট নিয়ে রাত পার করছি। খোলা আকাশের নিচে চিৎকার করে কেঁদেছি। সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করে বলেছি,
” সে কেনো আমার হলো না।।যার জন্য সব ছাড়লাম সে কেনো আমায় ছাড়লো? কেনো ছিনিয়ে নেওয়া হলো আমার ভালোবাসাকে? এত কষ্ট কেনো দেওয়া হচ্ছে আমাকে?
সৃষ্টিকর্তা মনে হয় এতদিনে আমার আর্তনাদ, আমার চিৎকার শুনেছে। কিন্তু তকে একদম পৃথিবী থেকে বিদায় করে দিবে জানা ছিলো না। আমি আমার ভালোবাসাকে আবার ও নিজের বুকে নিয়ে আসব। কিন্তু দেখ, আটকানোর মত কেউ থাকবে না। এইবার আর অপেক্ষা করব না। সোজা কবুল বলে নিজের রানী করে ঘরে তুলব। গ্যাংস্টার বস তবে অবশেষে হেরে গেলো!
নাভিদ বাঁকা হেসে নিউজ বন্ধ করে দেয়। আজ কতদিন পর সে হেসেছে তার জানা নেই। তার জীবনে প্রতি সেকেন্ড হাহাকার লেগে গিয়েছিলো। তার ভালোবাসা, তার পাখিকে নিজের করে নেওয়ার সময় হয়ে গিয়েছে।

রাত যখন গভীর হয়েছিলো তখন চারপাশে আগুন তখন চারপাশে অনেকটা ছড়িয়ে গিয়েছিলো। জেটের ভেতরে ছিলো সব মরণাস্ত্র। ফলে আগুনে আরও দাউ -দাউ করে জ্বলে উঠে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। আরিশের কোনোদিকে খেয়াল ছিলো না। দুনিয়া পুড়ে ছাই হয়ে যাক তার মস্তিষ্কে ঘুরছিলো নিক কোথায়? নিক কি পুড়ে গিয়েছে?
যার ছায়াতলে সে বড় হয়েছে। যার হাত ছিলো তার নির্ভরতা তার পুড়ে যাওয়া শরীরের ছাঁই সে কিভাবে দেখবে? পাষণ্ড, পিশাচ বুক সেদিন চিৎকার করে কেঁদে উঠেছিলো। যুগ যুগ ধরে যে চোখ দিয়ে অশ্রু ঝড়ে নি, পর পর বোন আর ভাই রুপী বন্ধুকে হারিয়ে আরিশ দিশেহারা। নিজেকে টিকিয়ে রাখার মত শক্তি ছিলো না তার কাছে। আগুনের লেলিহান শিখার সামনেই জ্ঞান হারিয়ে জমিনে পড়ে যায়। অধিরাজ দৌঁড়ে গিয়ে শক্ত ও ভারী দেহটাকে আগলে নেয়। অধিরাজের নিজের ও শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। কিন্তু এই মুহূর্তে সেও যদি ভেঙ্গে পড়ে তবে শত্রুরা অস্তিত্ব এই মুছে দিবে। অধিরাজের শরীর কাঁপছিলো অসম্ভব ভাবে। তবুও নিজেকে মিথ্যে আশ্বাস দিয়ে মনোবল শক্ত রাখে। গার্ডদের সাহায্যে এই আগুনের ধ্বংসলীলা নিভানো হয়। সময়ের ব্যবধানে আরিশকে হসপিটলে নিয়ে যাওয়া হয়। আরিশের অবস্থা ও ছিলো প্রচুর খারাপ। মস্তিষ্কে এতটা চাপ খেয়েছে যে সে নিজেই সজ্ঞানে আসতে চাচ্ছে না। প্রায় বারো ঘন্টা অজ্ঞান অবস্থায় কেটে যায় হসপিটালের বেডে।

সময় রখন প্রায় দুপুর গড়িয়ে বিকেল। আগুনের স্পর্শে আরিশের শরীরে অনেক জায়গায় ক্ষত হয়ে গিয়েছে। শরীরে ব্যান্ডেজ নিয়ে আরিশ পা রাখে সেই মিনারে যেখানে গ্যাংস্টার বসের প্রানভোমরাকে যত্ন করে রাখা হয়েছে। আরিশ খুব ভালো করেই জানে এই ঘটনা শুনার পর এনি খুব বেশি একটা রিয়্যাক্ট করবে না। নিকের মৃত্যুতে হয়ত অনেক খুশি ও হবে। তার মুক্তিতে এখন কেউ আটকাতে পারবে না। উন্মুক্ত পাখির মত এখন ডানা মেলে উড়তে পারবে। আরিশ ডিভানে গিয়ে ধপ করে বসে পড়ে। চারদিকে যেন এক শোকের ছায়া। প্রতিটা গার্ডের চোখে কেমন বিষন্নতার স্পষ্ট ছাপ।
নাজলী রাত থেকে অপেক্ষা করছিলো আরিশের জন্য। আরিশ মিনারে এসেছে জানতে পেরে দ্রুত নিচে নেমে আসে। এতটা অধৈর্য ছিলো যে শরীরে উড়না জড়াতে ভুলে গিয়েছে। আরিশের সাথে অধিরাজকে দেখে হতভম্ভ হয়ে যায়। আরিশ চোখ তুলে তাকায় নাজলীর দিকে। অধিরাজ নিজের দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরিয়ে ফেলে। আরিশ নিজের শার্টের বোতাম এক এক করে খুলে নাজলীর দিকে ছুঁড়ে মারে। চোয়াল শক্ত করে ধমকে উঠে,
” রুম থেকে বের হওয়ার আগে মনে থাকে না?
নাজলী মাথা নিচু করে শার্টটা শরীরে পেঁচিয়ে নেয়। আরিশের দিকে এখনও তার নজর সেভাবে যায় নি। সামান্য ঠোঁট ভিজিয়ে বলে,

” কোথায় ছিলেন আপনারা সারারাত!
আরিশ ডিভানে শরীর এলিয়ে দিয়ে বলে,
” এনিকে নিচে নিয়ে আসো নাজলী। খুশি হোক তার পরও ওর খবরটা জানা জরুরি।
নাজলীর চোখ ছোট ছোট হয়ে আসে। অবাক গলায় জিজ্ঞাসা করে,
” কিসের খুশির খবর? তাছাড়া এনির শরীর ভালো নেই। সকালে হুট করেই সেন্সল্যাস হয়ে যায়। সারা রাত হয়ত নির্ঘুম ছিলো। আর খাবার ও খায় নি সারাদিনে। মেডিসিন দিয়েছি ফলে ঘুমিয়ে গিয়েছে। এখনও সজাগ হয় নি।
আরিশ শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,

‘ ঘুমের মধ্যে হলেও ডেকে তুলো।।রুমে যাওয়ার রাইট আমার নেই। নয়ত আমি নিজেই যেতাম ওর কাছে।
নাজলীর কেমন জানি খটকা লাগলো প্রচুর। এই ক্রিমিনালের কন্ঠ আজ এত নিস্তেজ কেনো? কি হয়েছে একবার জিজ্ঞাসা করব? না থাক, জিজ্ঞাসা করলে আবার মাথায় চেপে বসবে।
নাজলী বিনা বাক্যে এনির উদ্দেশ্যে যায়। কিন্তু তাকে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে হয় নি আর। এনি নিজেই আরিশের উদ্দেশ্যে নিচে নামে। তার চোখ দুইটা একদম ফুলে আছে। এনি নাজলীর দিকে এক পলক তাকিয়ে আরিশের সামনে গিয়ে বসে। আরিশের শরীরে ক্ষত দেখে আৎকে উঠে,
” ভাইয়া আপনার শরীরে এত ক্ষত হলো কিভাবে?
এনির কথা নাজলীর কর্ণে প্রবেশ করতেই এতক্ষণে সে পুরুষটার দিকে তাকায়। পিঠে অনেক জায়গায় পুড়ে যাওয়ার ক্ষত। নাজলীর চোখ পানিতে ঝাপসা হয়ে আসে। হাত বাড়িয়ে পিঠ ছুঁয়ে দিতে ইচ্ছে করলো তার। কিন্তু ভয়ে আর সেটা করলো না। চুপচাপ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
আরিশ এনির বিষণ্ণ মুখের তাকিয়ে বলে,

” জানো এনি, তোমার জীবনের সব থেকে বড় শত্রুটা আর নেই। আগুনের তেজে পুড়ে একদম ছাঁই হয়ে গিয়েছে।
এনি কেমন অদ্ভুতভাবে হেসে প্রশ্নবোধক চাহনিতে নাজলীর দিকে তাকায়। নাজলীর নিজেরও কপাল কুচকে আসে। আরিশের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে বলে,
” মানে? আপনার চোখ -মুখ এমন হয়ে আছে কেনো? কি হয়েছে? কে পুড়ে ছাঁই হয়ে গিয়েছে?
এনি নিজেও উত্তরের আশায় আরিশের দিকে তাকায়। আরিশ এনির দিকে তাকিয়ে আলতো হাসলো। একদম নিস্তেজ গলায় বলে,

” তোমার ঘরের শত্রু, তোমার জীবনের সব থেকে বড় শত্রু নিক আর নেই। সমাজ আর আইনের শিকলে আবদ্ধ হওয়া তোমার তথাকথিত স্বামীর দেহ পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছে।
আরিশ কথাটা বলে নিজের শরীর আবার ও এলিয়ে দেয় ডিভানের মধ্যে। অধিরাজ বহু আগেই রুম থেকে বের হয়ে গিয়েছে। বাহিরে সংবাদ নিয়ে প্রচুর কাজ আছে তার। আরিশ চোখ বন্ধ করলে শুনতে পায় এনির হাসির শব্দ। আরিশ জানত এনি প্রচুর খুশি হবে। কিন্তু তাই বলে যে মৃত্যুর ঘটনা শুনেও হাসবে সেটা কল্পনা করে নি। এনি ঠোঁট কামড়ে ধরে নিজের। কিছুটা নড়ে-চড়ে বলে,
” মজা করতে এসেছেন আমার সাথে? কি ভেবেছেন এনি অসহায়, দুর্বল। তাই উনার মৃত্যুর খবর জানিয়ে আমাকে হেনস্তা করতে এসেছেন? উনি পাঠিয়েছে তাই -না? আমাকে দুর্বল ভাবলে সব থেকে বড় বিপদে পড়বেন। একজন নরখাদক রুপী সাইকোপ্যাথকে মারার ক্ষমতা রাখি আমি। আর হ্যা, উনাকে বলে দিবেন এইসব সস্তা ড্রামা আমার সাথে না করতে। ঘৃনা করি আমি উনাকে। যাস্ট ঘৃনা!
এনি কথাগুলো বলছে আর ঘন ঘন নিশ্বাস ফেলছে। আরিশ নিজের দিকে একবার তাকিয়ে বলে,

” নিক কারোর ভালোবাসা পাওয়ার জন্য মিথ্যের আশ্রয় নেয় না এনি। আর না আরিশ ইলহাম জীবনে কোনোদিন মিথ্যে বলে। শুত্রুদের ঘায়েল করার জন্য অনকে সময় ছলনার আশ্রয় নেয়। কিন্তু এই মুহূর্তে তোমার সামনে দাঁড়িয়ে এইসব নিয়ে মিথ্যে বলার ক্ষমতা আর সাহস কোনোটা আমার নেই। আমার শরীরের ক্ষত দেখতে পাচ্ছো, এইসব আগুনের উত্তাপের কারনে হয়েছে। কেউ একজন, বা গার্ডদের মধ্যে একজন বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। নিক প্রাইভেট জেটে ছিলো। আর সেই মুহূর্তে সেই জেটে বোমা হামলা হয়। পুড়ে ছাই হয়ে যায় সব গার্ড। বাকিটা তুমি আন্দাজ করে নাও। বাহিরের দুনিয়ায় এক মুহূর্তে পা রাখো। দেখতে পারবে পুরো শহর কিভাবে উত্তপ্ত হয়ে আছে। আমি জানি তুমি নিককে জীবনের থেকে বেশি ঘৃনা করো। ওর মৃত্যুতে নিশ্চই খুশি হয়েছো?
আরিশের প্রতিটি শব্দ এনির কানে তপ্ত সীসার মতো বিঁধছিল। তার চারপাশের বাতাস যেন হঠাৎ ভারী হয়ে আসে। শ্বাস নিতে বুকটা অস্বাভাবিকভাবে ওঠানামা করছে।ঝাপসা চোখে আরিশের দিকে তাকিয়ে থাকে। ​নিজের জামার কাপড়টা আঙুলের চাপে কুঁচকে গেছে। নখগুলো যেন চামড়া ভেদ করে ভেতরে ঢুকে যেতে চাইছে। এনি একটা ঢোক গিলে কাঁপাকাঁপা স্বরে আরিশকে থামানোর চেষ্টা করতে চাইছে। কিন্তু নিজের গলার স্বরই তার কাছে অচেনা লাগছে এই মুহূর্তে। কোনো স্বর বের হচ্ছে না গলা দিয়ে। তার বুকের ভেতরটা তখন তীব্র এক অস্থিরতায় হাহাকার করে উঠছে। একটা মানুষ কতটা অধৈর্য হতে পারে, তা এনির মুখভঙ্গিতে স্পষ্ট। সেই অধৈর্যতা আজ কোনো রাগ ছিলো না। এখানে ছিলো চরম অসহায়ত্ব। আরিশের প্রতিটি শব্দ এনির কানে একেকটি ধারালো কাঁচের টুকরোর মতো বিঁধেছে।
​সে চাচ্ছে আরিশ এখনই হেসে উঠুক। বলুক,

” ভয় পাচ্ছো কেন? মজা করছিলাম আমি!
কিন্তু আরিশের পাথরের মতো শান্ত মুখ আর চোখের গভীর শীতলতা এনিকে ভেতরে ভেতরে একদম ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে। এনির মনে হচ্ছে তার চারপাশের দেয়ালগুলো ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে। নিজেকে আর সামলাতে না পেরে অধৈর্য হয়ে তাকায় আরিশের দিকে,
” দোহায় লাগে ভাইয়া, আমার সাথে মজা করবেন না। প্লিজ এইসব কথা আর বলবেন না।
আরিশ একই ভঙ্গিতে বলে,
” নিক আর নেই এনি। নিজের হাতে সব ঠিক করে এসেছি। নিক যদি বেঁচে থাকত তবে সর্ব প্রথম আমি জানতাম।
এনি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। আরিশের নিষ্ঠুর সত্যটা তার সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যায়। মুহূর্তের উন্মাদনায় সে হাতের কাছে থাকা ভারী ফুলদানিটা সজোরে মেঝেতে আছাড় দেয়।
​এক বিকট শব্দে কাঁচের ফুলদানিটা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। সেই তীক্ষ্ণ শব্দটা যেন এনির ভেতরের জমে থাকা যন্ত্রণারই একটা বহিঃপ্রকাশ। ডিভান থেকে বিদ্যুৎবেগে উঠে দাঁড়িয়ে উন্মাদের মতো চেঁচিয়ে উঠে,

” উনি বেঁচে আছে। উনি নেই মানে কি বুঝাতে চেয়েছেন? উনি মরে গিয়েছে! যদি আবার ও এমন শব্দ ব্যবহার করেন তবে আপনাকে আমি খুন করব। উনি আমাকে রেখে কখনো মরবে না। উনি আমাকে কথা দিয়েছেন, কসম কেটেছেন। প্রয়োজনে আমাকে মারবে এরপর উনি মরবে। সব কিছু ধ্বংস হয়ে যাক কিন্তু সে আমাকে এই নরকে একা রেখে কখনো যাবেন না। তাই ভুলে ও উনার মৃত্যুর কথা বলবেন না আমার সামনে। জিহ্বা কেটে ফেলব আপনার! ভুলে যাবেন না আপনার সামনে গ্যাংস্টার বসের ওয়াইফ দাঁড়িয়ে আছেন। তাই বুঝে শুনে কথা বলবেন।
এনি কথাগুলো বলছে আর নিশ্বাস টানছে। কেমন হিংস্র দেখাচ্ছে চোখ-মুখ! চোখের পাতা কোনো বাধা মানছে না, সেখান থেকে বিরতিহীনভাবে নোনাজল গড়িয়ে পড়ছে গালের তপ্ত রেখা বেয়ে।
​হঠাৎ করেই এনির মনে হলো চারপাশের সব কিছু ঝাপসা হয়ে আসছে।এক তীব্র শিরঃপীড়ায় তার পৃথিবীটা দুলে উঠেছে । যন্ত্রণায় দুই হাত দিয়ে নিজের মাথাটা সজোরে চেপে ধরে সে ধপ করে বসে পড়ল ডিভানের ওপর। শরীর যেন আর বইতে পারছে না এই কথার ভার। মানুষ অতিরিক্ত শক খেলে যেমন নিস্তব্দ আর হিংস্র হয়ে উঠে, ঠিক তেমন অবস্থা হয়েছে এনির। এনির শরীর কেঁপে পড়ে যাচ্ছিলো।
​নাজলী মুহূর্তকাল দেরি না করে দ্রুত পায়ে এগিয়ে আসে। পরম মমতায় এনিকে নিজের বুকের মাঝে টেনে নেয়। নাজলীর সেই আশ্রয়ের স্পর্শ পাওয়া মাত্রই এনির ভেতরের সবটুকু আর্তনাদ বাঁধ ভাঙ্গে এতক্ষণে। নাজলীর বুকে মুখ লুকিয়ে সে ডুকরে কেঁদে উঠে,

” তোমার স্বামীকে চুপ করতে বলো আপা। সে কেনো এমন জঘন্য কথা বলছে?
নাজলী নিজেও স্থির হয়ে গিয়েছে। এনির কান্নার জন্য নিজের ও চোখে পানি এসে গিয়েছে। হ্যা, নিক জেভরানকে সে সহ্য করতে পারে না।।অতীতের বিষাক্ত জিনিস তাকে এমন বনিয়েছে। তীব্র ঘৃনা করে সে তাকে। কিন্ত এই মৃত্যুর খবর কেনো জানি মেনে নিতে পারছে না। আরিশের দিকে তাকিয়ে কাঁপা গলায় বলে,
” সত্যি বলছেন?
আরিশ এক নজর তাকালো নাজলীর দিকে। তার দৃষ্টি বার বার এনির দিকে যাচ্ছে। যাকে ঘৃনা করে তার মৃত্যুতে কাঁদছে কেনো এই রমণী? আরিশের কলিজায় মুচড় দিয়ে উঠে এই দৃশ্য। নিক তুই দেখতে পাচ্ছিস তর মৃত্যুতে কেউ একজন কাঁদছে। যার চোখের ঘৃনা দেখতে পেয়ে দিশেহারা হয়ে পড়তি। তার চোখে আজ তকে ঘিরে অজস্র বেদনা।

হুট করেই এনির পুরো দুনিয়া ঘুরে আসে। নাজলীর বুক থেকে মাথা তুলে সোজা নিজের রুমের দিকে এগিয়ে যায়। কেমন নিস্তব্দ সেই হাটা। আরিশ নিশ্বাস ফেলে বের হয়ে যায় মিনার থেকে। নাজলী স্তব্দ হয়ে বসে থাকে সেই একই জায়গায়। এনি রুমের ভেতরে গিয়ে নিজের ফোনটা হাতে তুলে নেয়।।চোখের পানি মুছে তাকায় সেই স্ক্রিনে। রাত থেকে এই পর্যন্ত সে হাজারটা মিসডকল দিয়েছিলো। কিন্তু ওপাশ থেকে কেউ ফোন ব্যাক করে নি। কেমন যেন পুরো শরীর কাঁপছে।।চোখ দিয়ে সব কিছু অন্ধকার হয়ে আসছে। দরজার সামনে তাকালে মনে হচ্ছে পাষান্ড ব্যাক্তিটা সেখানে দাঁড়িয়ে আছে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে। বিছানায় তাকালে মনে হচ্ছে এখানেই আষ্টে -পৃষ্টে জড়িয়ে ধরে রেখেছে তাকে। দিশেহারা হয়ে এনি চুল খামছে ধরে নিজের। হাতে থাকা ফোনটাকে আছড়ে ফেলে দেয়ালের সাথে। এতটা জোরে ফেলেছে যে মোবাইলের কোনো অস্তিত্বের ঠিক নেই। এনি মুখ হাত চেপে ধরে দেয়াল ঘেষে বসে পড়ে। বুকের ভেতরে জমিয়ে রাখা এতক্ষণের কান্না টুকু উগরে দেয়। মাথা চেপে ধরে চিৎকার দিয়ে উঠে,
” যাবেন না, প্লিজ আমাকে ছেড়ে যাবেন না। ফিরে আসুন। একবারের জন্য ফিরে আসুন আমার কাছে। ওদের কথা মিথ্যে প্রমান করে নিজের ব্লাডরোজকে নিজের বুকে চেপে ধরুন। কথা দিচ্ছি আজীবন এই বুকে মিশে থাকব। যেভাবে বলবেন ঠিক সেভাবে চলব। আপনি চান তো রুম থেকে যাতে কখনো বের না হয়? একবারের জন্য আমার কাছে আসুন। খোদার কসম করে বলছি কখনো আপনার অবাধ্য হব না। কোনো পুরুষের সামনে যাব না। কোনো আলো-বাতাস নিজের শরীরে লাগাব না। আপনার মধ্যেই নিজের পৃথিবী গড়ে তুলব। আমার দুনিয়া লাগবে না। আমার কারোর প্রয়োজন নেই। শুধু আপনি আমার কাছে আসুন।। অনেক তো অবহেলা করেছেন আর কত করবেন!
এনি নিজেকে সামলাতে পারছে না। নাজলী দরজা খুলে এনির বিধ্বস্ত শরীর দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। চারপাশে কেমন অদ্ভুত নিরবতা।।তার মধ্যে এনির চিৎকার আর বিরবির আওয়াজ। নাজলী ছুঁটে যায় বোনের কাছে। দুই কাধে হাত রাখতেই এনি ঝাঁপিয়ে পড়ে নাজলীর বুকে। নাজলীর জামা খাঁমছে ধরে কেঁদে উঠে,

” ও আপা ওদের বলো না উনাকে এনে দিতে। ওরা কেনো এমন কথা বলছে? আমাদের যে এখনও সংসার করা বাঁকি। পুরোটা সময় তো যুদ্ধ করে কাটিয়ে দিলাম। ভালোবাসার পথ পাড়ি দেওয়া তো বাকি।
মাঝ পথে এমন জঘন্য সংবাদ কেনো দেওয়া হলো আমাকে? ওরা মজা করছে তাই না?
এনির আর্তনাদে নাজলীর কলিজা ছিঁড়ে যাচ্ছে। তার থেকে বেশি অবাক হয়েছে এনির এই ছন্নছাড়া রুপে। যাকে এত ঘৃণা করে তার জন্য এইভাবে কান্না করা অসম্ভব! নাজলী কাঁপা গলায় বলে,
” ত.. তুই তো ঘৃনা করিস এনি। তবে এইভাবে কাঁদছিস কেনো? এখন তো তুই স্বাধীন।
এনি কান্নার জন্য কথা বলতে পারছে না। কোনোরকম শ্বাস নিয়ে বলে,
” স্বামী ছাড়া আবার কিসের স্বাধীনতা আপা? আমি তো সেই স্বাধীনতা চাই না। আমি তো বর্তমান আমিটাকেই চাই।
নাজলী এনির দুই গালে হাত রেখে বলে,

” বাস্তবতা মেনে নে। আমি নিউজ দেখে আসলাম হালকা -ঝাপসা। পুরো দেশ তুলপাড় লেগে গিয়েছে। শুধু আমরা জানতে পারলাম না কিছু।
এনি দুই হাটু ভাঁজ করে চিৎকার দিয়ে কেঁদে উঠে,
” হাজারবার তুমি আমার মৃত্যু চেয়ে নিও এরপরও উনাকে নিয়ে এমন যন্ত্রদায়ক কথা বলো না। আমার সাথে এই কেনো এমন হয়? যকে নিজের জীবন ভাবতে শুরু করে সে-ই আমাকে ধোঁকা দেয়। আর কত সহ্য করব এই জীবনে? আমার ভেতরে যন্ত্রনা হচ্ছে। চিৎকার করে কেঁদেও তৃষ্ণা মিটছে না।
এনি কাঁদতে কাঁদতে হাটুর ভাঁজে মুখ গুঁজে দেয়। নাজলী মাথায় হাত রেখে বলে,
” এমন জঘন্য পুরুষের মায়ায় কবে পড়লি এনি? তাকে ভালোবাসলি কবে? ঘৃনার আড়ালে এই ভালোবাসা কিভাবে লুকিয়ে রাখলি?
এনির শরীর নিস্তেজ হয়ে আসে। কাঁদার মত শক্তি তার কাছে আর নেই।বিরবির করে বলে,

” ভালো তো আমি অনেক আগেই বেসেছি। ঘৃনার দৃষ্টি ছিলো সাময়িকের জন্য মাত্র। তোমরা উনার জঘন্য রুপ দেখেছো আপা। কিন্তু উনার এই জঘন্য রুপের ভেতরের হাহাকার দেখো নি।আমি কোনো গ্যাংস্টার বসকে ভালোবাসি না, আমি ভালোবাসি আমার স্বামীকে। আমি ভালোবাসি সেই উন্মাদ পুরুষটিকে, যে আমার দেওয়া যন্ত্রণার আঘাতে আমাকে আঘাত করে নি। বরং আমার হাতের চাবুকের দাগ বুকে নিয়েও আমার দিকে মুচকি হেসে তাকিয়েছিল। তোমরা উনার সেই কোমল রূপ দেখোনি যেটা আমি দেখেছি। উনার চোখের গভীরে লুকিয়ে থাকা নীরব ক্লান্তি, তার শক্ত কণ্ঠের আড়ালে জমে থাকা আমার জন্য এক অব্যক্ত ভালোবাসা সব এই তো আমার জন্য ছিলো। যে মানুষটা আমার জন্য পুরো পৃথিবীর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে সে মানুষটাকে আমি কিভাবে ঘৃনা করি? আমি যদি তাকে ভালো না বাসি তবে আর কে ভালোবাসবে তাকে? উনাকে তারা ঘৃনা করবে যারা গ্যাংস্টার বসের অতীত জানে না। যারা জানে না তার ভেতরের জমে থাকা আর্তনাদ গুলো। কেউ তার হিংস্র রুপ ছাড়া শান্ত রুপ দেখে নি। কিন্তু আমি দেখেছি তার ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যাওয়া শরীরটাকে। কিভাবে ঘৃনা করব এমন মানুষকে?
এনি থেমে যায়। নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে তার।।পুরো হাত- পা ঠান্ডা হয়ে আসে।

” ভালোবাসার খেলায় আমি জিতব আপা। উনি আসবেন আমার কাছে। নয়ত নিজেই চলে যাব সেই পাপীষ্ট পুরুষের নিকটে। উনাকে ছাড়া আমার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। এই মুহূর্তে আমার স্বামীকে ফিরিয়ে দাও নয়ত কবর খুঁড়ে রাখো আমার জন্য। তাকে ছাড়া আমি অসহায়। উত্তপ্ত শহরকে জানিয়ে দিও আমি আমার স্বামীকে ভালোবাসি। একজন জানোয়ার রুপী মনস্টারকে ভালোবাসি। আমাদের সন্তান যে এখন ও তার বাবার ছুঁয়া পায় নি।
এনির পুরো শরীর অসাড় হয়ে আসে। মাথাটে হেলে পড়ে একপাশে। নাজলী বুকের সাথে চেপে ধরে এনির নিস্তেজ শরীরটা। কানের কাছে বার বার আঘাত করছে এনির বলা লাস্ট কথাটা। সন্তান? নাজলীর বুক ধুঁক ধুঁক করে উঠে। তার মানে তার সন্দেহ সঠিক ছিলো! কিভাবে সামলাবে এখন সে?

নিস্তব্ধ রাত চারপাশকে পাথরের মতো ভারী করে রেখেছে। শুনশান নীরবতার ভেতর বিছানার মধ্যেই নিদ্রামগ্ন হয়ে আছে রমণীটি। অথচ অচেতন ঘুমের আড়াল ভেদ করে তার অনুভূতিতে কাঁপন জেগে উঠে তার। দরজার পাল্লা ধীরে ধীরে খুলছে। কেউ নিঃশব্দে ভেতরে প্রবেশ করে। মস্তিষ্ক সতর্ক সংকেত ছুড়ে দেয় , সজাগ হও। মুহূর্তের মধ্যেই এনি চোখ মেলে তাকাল সেই অন্ধকারের দিকে। তীব্র মাথা ব্যাথায় সে মরে যাচ্ছে। চোখ খুলতে পারছে না কোনোভাবেই। তবুও অধৈর্য হয়ে তাকিয়ে থাকে অন্ধকারের দিকে।
প্রতিবারের মতোই নিকের ধূসর চোখের সেই তীক্ষ্ণ শীতল চাহনি অন্ধকারে ঝলঝল করে উঠে। অদৃশ্য ক্ষমতার ভারে ঘেরা তার উপস্থিতি ঘরটাকে মুহূর্তে বদলে দেয়। সেই মাফিয়া কোর্টে মোড়া অবয়ব, বাম কবজিতে ঝকঝকে গ্রাফ ডায়মন্ডস হ্যালুসিনেশন এর ব্রেসল্যাট। ঘাড় ছুঁয়ে থাকা ব্লাশ করা চুল। নিকের উপস্থিতি দেখামাত্রই এনির ঠোঁটে অজান্তেই ফুটে উঠল এক হালকা হাসি। পুরো দিনের অশান্তি পার করে নিকের এই উপস্থিতি এনির কাছে ছিলো নিশ্বাস আটকে আসার মত। অধৈর্য হয়ে ছুটে যায় নিকের দিকে।
সে জানত এই মানুষটি বেশি সময় তার থেকে দূরে থাকতে পারবে না। যে এক মুহূর্ত চোখের আড়াল হলেই অস্থির হয়ে ওঠে। না দেখলে চিৎকার-চেঁচামেচিতে ফেটে পড়ে। সে কীভাবে এত দীর্ঘ রাত পার করে দেবে তাকে না দেখে? এনির কানে এসে আঘাত করে নিকের সেই পরিচিত আদুরে ডাক,

” কলিজা আমার!
এনি শুনলো। এক রাশ প্রশান্তি নিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলে। এই ডাকটা তার হৃদয় ধুমরে -মুচড়ে দেয়। এত প্রশান্তি কেনো এই শব্দটার মধ্যে? মুহূর্তেই অভিমানে বুক ভেঙ্গে আসে তার। চোখের পানি বাঁধ মানছে না। কথা আটকে আসছে গলায়। ভাঙ্গা গলায় বলে,
” ওরা আপনাকে নিয়ে অযথা মন্তব্য ছড়াচ্ছিলো। আমি জানতাম আমাকে রেখে কখনো যাবেন না। আপনাকে একটা কথা জানানো হয় নি। কথাটা শুনবেন না?
নিকের সেই শান্ত শীতল কন্ঠস্বর,
” সব শুন আমি। একদিনে নিজের কি অবস্থা করেছিস বেইবি।
এনি ঠোঁট কামড়ে ধরে বল,
” অসুন্দর দেখাচ্ছে?
নিক আলতো হাসলো। এনির চোখে চোখ রেখে বলে,
” তোমার পুরো শরীর যদি ঝলসে গিয়ে আত্নাটাও জীবিত থাকে। তবুও তুমি আমার কাছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সুন্দরী নারী থাকবে
এনি লাজুক হেসে আরেকটু এগিয়ে যায় নিকের দিকে। নিক তাকিয়ে থাকে এনির দিকে। এনি ঠোঁট কামড়ে ধরে রাখে। ইচ্ছে করছে বুকে ঝাঁপিয়ে পড়তে। কিন্তু এই পাষন্ড পুরুষ তাকে বুকে টানছে না কেনো? রাগ তো তার করার কথা।।তাহলে উনি কেনো এমন রোবটের মত দাঁড়িয়ে আছে? এনি আর অপেক্ষা করলো না কারো। নিককে ছুঁতে যাবে তার আগেই সব কিছু অদৃশ্য।

এনির শ্বাস যেন বন্ধ হয়ে আসছে। হারিয়ে ফেলার এক তীব্র ভয় আবার ও তার শরীরকে চেপে ধরে। তার চোখ যায় বেলকনির দিকে। সেখানে মনে হচ্ছে নিক দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু স্পর্শ করতে হলে সব হাওয়া হয়ে যায়।
এনি নিজের মানসিক ভারসাম্য ঠিক রাখতে পারছে না।
আঁধারে ডুবে থাকা ঘরটায় নিজেকে এখন এক জীবন্ত ধ্বংসস্তূপ মনে হচ্ছে। তার শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত থেকে দ্রুততর হচ্ছে। মনে হচ্ছে ফুসফুস দুটো ছিঁড়ে যাবে এই মুহূর্তে । নিজের দুই হাতে নিজের চুল খামচে ধরে বিছানায় বসে পড়ে। চোখজোড়া আতঙ্কে বিস্ফোরিত হয়ে উঠে। চারপাশের নিস্তব্ধতা এখন তার কানে ড্রামের মতো বাজছে একটি কথা,
​”হাহাকার যখন মস্তিষ্কের শিরায় শিরায় বিষের মতো ছড়িয়ে পড়ে। তখন মানুষ আয়নার সামনে দাঁড়িয়েও নিজেকে চিনতে ভুল করে।”

এনি বিছানা থেকে গড়িয়ে মেঝেতে পড়ে যায়। ঠান্ডা মেঝের স্পর্শে তার মনে হলো নিক হয়তো এই মেঝেতেই কোথাও লুকিয়ে আছে। তাকে দেখছে আর তার এই ছটফটানি উপভোগ করছে। কিন্তু কোথাও তার অস্তিত্ব নেই।
নিকের উপস্থিতি কোথাও না পেয়ে এনি কেঁদে উঠে। একা একা বিরবির করতে থাকে। করোটির ভেতরে হাজারটা ভাঙা কাঁচের টুকরো যেন একসাথে নড়ে উঠছে।কোনো এক পাশ থেকে বাস্তব চিৎকার করে বলছে,
“নিক নেই, নিক ! ও নেই।
কিন্তু এনির অবাধ্য মন সেই যুক্তি মানতে নারাজ। সে এখনও বাতাসে নিকের সেই তামাকু মেশানো পারফিউমের গন্ধ পাচ্ছে। চোখে লেগে আছে সেই দামী ঘড়ির কাঁটার ঝিলিক। মস্তিষ্ক এক ভয়াবহ লুপে আটকে গেছে। সে যতবার নিকের সেই ‘রোবটের মতো দাঁড়িয়ে থাকা’ ঠান্ডা চাহনিটা মনে করছে ততবার তার বুক চিরে একটা আর্তনাদ বেরিয়ে আসতে চাইছে। নিক কেন তাকে বুকে টানল না? তীব্র যন্ত্রনায় এনির মাথার রগগুলো ছিঁড়ে যাচ্ছে। মনে পড়ে নিকের সেই কথাগুলো,

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৬০

” তুমি আমাকে ভালোবাসবে বেবিগার্ল। আর যেদিন ভালোবাসবে সেদিন আমাকে হারিয়ে আমার থেকে বড় সাইকোতে পরিনত হবে!
এনি মেঝেতে বসেই কেঁদে উঠে। বিরবির করে বলে,
” আপনার কথাটাকে সত্যি প্রমান করতে আমাকে এত কষ্ট দিচ্ছেন? দেখুন কথা সত্যি হলো কিন্তু সেই কথার ভার বহন করার মত ক্ষমতা আমার হচ্ছে না। । আমি পাগল, আমি উন্মাদ হয়ে উঠেছি। হারাতে না চাইলে প্লিজ ফিরে আসুন আমার কাছে। আপনার কাছে আমার পৃথিবী গড়ে তুলতে চাই। আপনার সন্তান আপনার স্পর্শ পেতে চাই!

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৬২