লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৬৯
লিজা মনি
দ্য ব্লাডস্টোন ব্যাঙ্কোয়েট পার্টি। নিশ্ছিদ্র অন্ধকারের বুক চিরে একে একে এসে থামছে লিমুজিন আর রোলস-রয়েসের বহর। গাড়ি থেকে নেমে লাল গালিচায় পা রাখছেন পৃথিবীর শীর্ষ ধনী ব্যক্তিরা। তাদের পাশে রয়েছেন ওয়াইফ বা প্রেমিকা। লোকগুলোর মুখে দাম্ভিকতা আর ঠোঁটে হাসি। যাদের হাতের ইশারায় পৃথিবীর শেয়ার বাজার ওঠানামা করে। পৃথিবীর শীর্ষ বিলিয়নিয়ার, ট্রিলিওনিয়ার এবং আন্ডারওয়ার্ল্ডের একচ্ছত্র মাফিয়া সম্রাটরা আজ এক ছাদের নিচে। তাদের পরনে নিখুঁত টেইলর-মেড ডার্ক স্যুট, আর পাশে থাকা ফ্যামিলির নারীদের অবয়বে হিরের অলঙ্কার আর রয়্যাল ক্রিমসন গাউনের আভিজাত্য।
বাহ্যিক অবয়বে এটি এক অপার্থিব ও রাজকীয় উৎসবের রাজসূয় যজ্ঞ হলেও, সেই বিশাল হলের অন্তঃপ্রকোষ্ঠের বাতাস এক অদৃশ্য। পারদস্পর্শী স্নায়ুযুদ্ধে স্তব্ধ হয়ে আছে। আপাত-সুশীল ও মার্জিত হাসির মুখোশ পরিধান করে প্রতিটি আভিজাত্যের প্রতিমূর্তি একে অপরের সাথে সৌজন্যমূলক করমর্দনে লিপ্ত ঠিকই, কিন্তু তাদের সেই অতলান্ত ও ধূর্ত শিকারী চোখজোড়া অবিরাম খুঁজে চলেছে সেই একটিমাত্র মহার্ঘ্য বস্তুকে।
ধনকুবের ও মাফিয়া সম্রাটদের এই জাগতিক মিলনমেলা কোনো সৌহার্দ্য কিংবা উৎসবের উদযাপন নয়। এটি হলো হিংস্র ও রক্তপিপাসু নেকড়েদের এক অতি-গোপন ও চরম মনস্তাত্ত্বিক সামিট। এই মিলনমেলা হলো হলো হিংস্র নেকড়েদের এক গোপন সামিট।যেখানে প্রত্যেকেই তার পাশের জনকে ছিঁড়ে ফেলার আদিম ক্ষুধা
যেখানে প্রতিটি সত্তা তার সুবেশধারী প্রতিবেশীকে ছিঁড়ে-খুঁড়ে ফেলার এক আদিম, পাশবিক ও তীব্র ক্ষুধা বুকের অতল গভীরে সযত্নে লুকিয়ে রেখেছে। আভিজাত্যের এই মসৃণ চাদরের নিচে নিঃশব্দে অপেক্ষা করছে এক প্রলয়ংকারী রক্তক্ষয়ী ঝড়।
ঠিক যখন ঘড়ির কাঁটা উৎসব সূচনার অন্তিম দশ মিনিটকে স্পর্শ করল তখনই সেই রাজকীয় সভাকক্ষে পদার্পণ ঘটল এক জীবন্ত বিভীষিকার।
আটলান্টিকের ওপার অর্থাৎ আমেরিকা থেকে আফ্রিকা মহাদেশের তপ্ত খনি—এই দুই গোলার্ধের আন্ডারওয়ার্ল্ডকে একক ছায়াতলে শাসন করা সবচেয়ে নৃশংস ও কুখ্যাত ‘ব্লাডি বিস্ট’, গ্যাংস্টার সম্রাট নিক জেভরান।
তার দীর্ঘ ও পেশীবহুল শরীরে জড়ানো রয়েছে আমেরিকান সিল্কের তৈরি কুচকুচে কালো ওভারকোট। যা তার চওড়া কাঁধ বেয়ে নেমে গেছে । বাম হাতের কব্জিতে টিমটিম করে জ্বলছে পৃথিবীর সবচেয়ে মহার্ঘ্য সময়লিপিকার Patek Philippe Grandmaster। বিপরীতে, ডান হাতের কব্জিকে জড়িয়ে রেখেছে হিরের কারুকার্যখচিত এক ভারী প্লাটিনাম ব্রেসলেট।য
হলরুমের ভেতরের মৃদু আলোতেও নিকের চোখজোড়া ঢাকা রয়েছে জেট-ব্ল্যাক সানগ্লাসের আড়ালে। নিক এগিয়ে আসতেই তার চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে উঠল।পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্লভ ও বিলাসবহুল পারফিউম Clive Christian No. 1 Majestic Baudicca-র এক তীব্র, কড়া ও মাদকতাময় সুবাসে।
গোলাপী ঠোঁটের ঠিক নিচে থকা তিলটা চিকচিক করছিলো। নিককে দেখা প্রায় সবাই হতভম্ভ হয়ে পড়ে। নিক কিপাল সামান্য কুঁচকে, চারপাশের বিলিয়নিয়ারদের অস্তিত্বকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে, এক পরম একাধিপত্যের অহংকার নিয়ে কোটিপতিদের সেই সুরক্ষিত দুর্গে প্রবেশ করলেন এই গ্যাংস্টার সম্রাট। গ্যাংস্টার বসের সৌন্দর্যে মোহিত পার্টিতে আসা পত্নী বা প্রেমিকারা। কেমন চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছে তাকে। নিক ভ্রুঁ নাচায় সামান্য। দুর থেকে কেউ তার দিকে তাকিয়ে থাকলে বা নজরে রাখলে সেটা অনুভব করার ক্ষমতা আছে তার। খুব সহজে লোকের চোখ- মুখ দেখে অনেক কিছু বুঝে ফেলার অলৌকিক ক্ষমতা তার মধ্যে আছে। নিক কপাল ঘেষে বিরবির করে উঠে,
” ব্যাশ্যা!
নিক জেভরানের এই অপ্রত্যাশিত উপস্থিতি উপস্থিত প্রতিটি মস্তিষ্ককে এক পরম বিভ্রান্তির অতল গহ্বরে নিক্ষেপ করছে। কারণ, আন্ডারওয়ার্ল্ডের এই নির্মম সত্যটি সবারই জানা।নিক নারীবদ্বেষী, নারীদের প্রতি তার এক চরম ও শীতল ঘৃণা রয়েছে। তার বিশাল ও অন্ধকার সাম্রাজ্যে কোনো রানীর অস্তিত্ব নেই। তার জীবনে অনুরাগের কোনো স্থান নেই।কোনো ভালোবাসার মানুষও নেই যাকে এই অমূল্য অলঙ্কার উপহার দেওয়া যায়।
তবে এই সর্বগ্রাসী নিলামে, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপ মৃত্যুর পরোয়ানা নিয়ে আসে সেখানে কেন এই পুরুষের পদার্পণ? কার জন্য এই রক্তস্নাত ব্লাডস্টোন ছিনিয়ে নিতে এসেছে সে?
এই একটিমাত্র অনুদঘাটিত প্রশ্ন উপস্থিত পৃথিবীর সমস্ত ঝানু বিলিয়নিয়ার আর কূটনীতিবিদদের মাথা সম্পূর্ণ খারাপ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। যে মানুষটার বুকে কোনো হৃদয় নেই, সে কেন পুরো মাফিয়া সাম্রাজ্যের সবচেয়ে কামড়াকামড়ির বস্তু, এই তীব্র ভালোবাসার প্রতীক হাড়টি পাওয়ার জন্য নিজের পুরো শক্তি বাজি ধরল? সে কি এই হাড় দিয়ে নিজের ক্ষমতার চূড়াকে আরও একবার প্রমাণ করতে চায় নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে অন্য কিছু? একমাত্র কায়াত আর হাতে গুনা কয়েকজন জানে নিকের বিয়ের ব্যাপারে। নিক যে তিন সন্তানের বাবা হয়েছে সে কথা ও বাহিরে যায় নি। কায়াত চোয়াল শক্ত করে রাগে ফুঁশে যাচ্ছে।
নিক ডিভানে বসতেই অনেকজন আসে তার কাছে। বহু দিন পর দেখা তাই অনেকের সাথে হাত মিলায়।জেভিয়ার নিকের সাথে হাত মিলিয়ে হেসে বলে,
” আফটার অলমোস্ট টু ইয়ার্স, আই ফাইনালি মেট ইউ। দ্য গ্যাংস্টার বস, দ্য কিং অফ আমেরিকা অ্যান্ড আফ্রিকা। এভরিথিং ইজ অলরাইট, রাইট?
নিক স্বভাবসুলভ ঠোঁট কামড়ে হাসলো। চোখ থেকে সানগ্লাস খুলে ফেলে। বের হয়ে আসে দুইটা তীক্ষ্ণ শিকারীর ন্যায় হিংস্র ধূসর রাঙ্গা চোখ। জেভিয়ার দিকে তাকিয়ে বলে,
” উপর ওয়ালা ছাড়া কার ক্ষমতা আছে, আমাকে ক্ষতি করার? ইভেন আ গ্ল্যান্স অ্যাট মি ইজ ইনাফ ফর হিম টু ডিল উইথ এনিওয়ান হু কামস দেয়ার টু কজ হার্ম ড্রিম , মি, জাভিয়ান।
জাভিয়ান ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলেন। কায়াত ক্রুর হেসে নিকের দিকে এগিয়ে আসে। সবার উপস্থিতিতে প্রশ্ন করে বসে,
” কার জন্য এই নিলাম কেন্দ্রে এসেছেন গ্যাংস্টার বস। আজ তো নিলামে কোনো নারী উঠবে না। আজ উঠবে অন্য কিছু। আপনার তো প্রিয় মানুষ নেই। তবে কার জন্য নিবেন এই হাড়?
নিক অদ্ভুত চোখে তাকালো কায়াতের দিকে। অনেকে উৎসুক হয়ে তাকিয়ে আছে নিকের দিকে। কায়াতের চোখ- মুখ দেখে নিক কপালে ভাঁজ করে বলে,
” আমার স্ত্রীর কথা হয়ত ভুলে যাচ্ছিস কায়াত? খুব সুন্দর আর স্ত্রী আর ফুটফুটে তিনটা বাচ্চা আছে আমার।
নিকের এই দুইটা লাইন অনেককে ধ্বাক্কা দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিলো। গ্যাংস্টার বস নিক জেভরান বিয়ে করেছেন অথচ কেউ জানতে এই পারে নি। একজন নিকের উদ্দেশ্যে বলে,
” আর ইউ ম্যারিড? হোয়েন ডিড ইউ বিকাম আ ফাদার?”
নিক ঈগল দৃষ্টিতে তাকায় সে ব্যক্তির দিকে। নিককে কিছু বলতে না দিয়ে কায়াত ঠাট্টা করে বলে,
” ভুল ভাবছেন ক্রিশ্চিয়ান। ভুলে গেলেন নাকি, গ্যাংস্টার বস নিলাম কেন্দ্র থেকে রক্ষিতা হিসেবে কিনেছিলেন এক মেয়েকে? সেই রক্ষিতাকে নিজের স্ত্রী বলে দাবি করছেন।
কায়াতের চোখ- মুখে ব্যাঙ্গ হাসি। পুরো রুমে কেমন একটা বিদঘুটে পরিস্থিতি! সবাই এইটা – সেট জিজ্ঞাসা করছে। নিকের মস্তিষ্ক ধপ করে জ্বলে উঠে। রাগে আর উন্মাদনায় চোখ দুইটা আগ্নেয়গিরির লাভার মত যেন জ্বলছে। চোয়াল শক্ত করে ঘাড় নাড়ায় গ্যাংস্টার বস। রাগটাকে যথাসম্ভব শান্ত রেখে বলে,
” স্ত্রী সে আমার। ভুলে যাবি না কায়াত, সে আমার সন্তানের মা। আমার জীবন। তাই রক্ষিতা শব্দটা আবার উচ্চারন করলে জবান টেনে নিয়ে আসব।
কায়াত ভ্রুঁ নাচায়। কপাল কুচকে বলে,
” কেমন স্ত্রী? প্রথমে রক্ষিতা হিসেবে কিনে নিয়ে রক্ষিতা ট্রিট করলি । এরপর ভালো লেগেছে তাই বিয়ে করে ফেললি? নিলাম থেকে কিনে নেওয়া মেয়েকে সাধু প্রমান করতে চাচ্ছেন গ্যাংস্টার বস? ভুলে যাবেন না আঠারো জন মাফিয়ার চোখের সামনে থেকে নিয়েছিলেন। রক্ষিতা একজন রক্ষিতা এই হয়। সে বিয়ে করে স্ত্রী বানালেও রক্ষিতা এই থাকবে। নারী জাতিকে ঘৃনা করা ব্যাক্তিটাও আজ এক প্রস্টিটিউটের প্রেমে পড়ে গেলে আশ্চর্য!
কায়াতের ঠোঁটের সেই বিষাক্ত উপহাস শেষ বিন্দুর ছোঁয়া পাওয়ার আগেই, পুরো হলরুমের আভিজাত্যকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে এক বিকট কানফাটানো ধাতব শব্দ আছড়ে পড়ে। উপস্থিত প্রত্যেকে তীব্র আতঙ্কে নিজেদের কান চেপে ধরে।
নিক পকেটে থাকা কালো রিভলভারের মোহনা তখনো তপ্ত ধোঁয়া উদগিরণ করছে। তার চোখের পলক পড়ার আগেই দুটো তপ্ত বুলেট নিখুঁত নিশানাভেদে ছুটে গেছে কায়াতের অভিমুখে। কোনো সুযোগ না দিয়ে, বুলেটের সেই সিসা গলানো তীব্র গতি একদম কায়াতের দুই হাঁটুর হাড়ের গভীরে গিয়ে বিঁধে যায়। মুহূর্তের মধ্যে রাজকীয় সেই মসৃণ মার্বেলের মেঝে কায়াতের তাজা রক্তে রঞ্জিত হয়ে উঠে। কায়াতের আর্তনাদে স্তব্ধ হয়ে যায় ট্রিলিওনিয়ারদের সেই পুরো কনক্লেভ। নিক রক্তাক্ত কায়াতের কলার চেপে ধরে হিংস্র বাঘের মত গর্জে উঠে,
” মাদার্ফাক! তর কলিজা কত বড় আজ আমিও মেপে দেখব। ভেবেছিলাম তিলে তিলে মারব তকে। কিন্তু তকে বাঁচিয়ে রেখে নিজের সহ্যের সীমা পার করছি। শুয়রের বাচ্চা রক্ষিতা কাকে বললি তুই? তুই জানিস সে কতটা পবিত্র? গ্যাংস্টার বস নিক জেভরান এতটাও উত্তেজিত নয় যে যাকে – তাকে নিজের বেডে জায়গা দিয়ে দিবে। স্ত্রী শব্দের মানে বুঝিস তুই? যে হাজারটা প্রস্টিটিউটের শাও**** মুখ দেয় সে কিভাবে বুঝবে স্ত্রীর মর্যাদা? সেইমল্যাসে কুত্তার বাচ্চা!
নিক প্রায় কায়াতকে মেরে ফেলছিলো। দুইজনের মধ্যে এক প্রকার ধ্বস্তাধস্তি শুরু হয়ে। কায়াতের রক্তে ভেসে যাচ্ছে সব কিছু। অন্যরা এগিয়ে আসে দ্রুত। ছাড়িয়ে নিতে নিতে আতঙ্কিত গলায় বলে,
” কাম ডাউন, মিস্টার নিক জেভরান। প্লিজ, ট্রাই টু স্টে কাম। ইফ ইউ কিপ হোল্ডিং হিম লাইক দিস, কায়াত উইল ডাই। দিস ইজ নট গুড ফর দ্য মাফিয়া এম্পায়ার। মিস্টার কায়াত, প্লিজ ডোন্ট সে এনিথিং এলস ফর নাউ। কিন্তু কায়াত যা বলছে মিথ্যা তো নয়। রক্ষিতা আবার স্ত্রী হয় কিভাবে? শান্ত হন। নিলামের পরিবেশ নষ্ট হয়ে যাবে।
নিক ঘন ঘন নিশ্বাস টেনে কায়াতকে ধ্বাক্কা মেরে সরিয়ে দেয়। কায়াত ব্যাথায় কাতরাচ্ছে। চোখ দুইটার মধ্যে হিংসা আর প্রতিহিংসা জ্বলজ্বল করছে। কিছু একটা ভেবে ঠোঁটের রক্ত মুছে রহস্যময় হাসে। কায়াতকে দ্রুত চিকিৎসার জন্য চিকিৎসা কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয় । নিক হাতের রক্তের দিকে তাকিয়ে গ্রিবাদেশ শক্ত করে বলে,
” আমার স্ত্রীকে রক্ষিতা বললে শুধু নিলাম কেন্দ্র নয় শহরটাকে এই জ্বালিয়ে দিব। কার কার মনের ভেতরে চলছে সে রক্ষিতা? খোদার কসম করে বলছি এমন একজনকে খুঁজে পেলে কলিজা টেনে আনব। সাহস থাকলে সামনে এসে বলো। শুধু রক্ষিতা কেনো তাকে নিয়ে সামান্য কথা ও সহ্য করব না। হোক সেটা প্রশংসা বা কটূক্তি। নারী আমার তাই পর পুরুষের জিভে তার কথা গেলে সহ্য হবে না। আই হোপ আমার হিংস্রতা আর ধ্বংসলীলা সম্পর্কে ধারনা আছে সবার?
পুরো নিলাম কেন্দ্রে পিনপিন নিরবতা। মহিলারা ভয়ে সামান্য সিটিয়ে যায়। নিক রাগে এখনও ঘন ঘন নিশ্বাস টানছে। এই মুহূর্তে কায়াতকে সবার সামনে জানে মারা পসিবল ছিলো না। কিন্তু এখন আর ছাড় দিবে না সে। রাগে ঘাড় ঘষে ডিভানে ধপ করে বসে যায়।
কিছুক্ষণ আগের ঘটনাকে কেন্দ্র করে কারোর সাহস নি গ্যাংস্টার বসকে কিছু জিজ্ঞাসা করার।।সবাই উপস্থিত না থাকলে হয়ত কায়াতের অন্তিম দিন ছিলো আজ। নিকের ক্রোধ- চোখ -মুখ যেভাবে ফুলে উঠেছিলো সব ছিলো হিংস্রতা আর ধ্বংসের প্রকাশ। অনেকে আড়ালে এনিকে বাজে মন্তব্য করছে। কিন্তু সেটা নিকের কান অব্দি পৌঁছাতে দিচ্ছে না। লড়াই করার ক্ষমতা তাদের ও আছে। তবে সামনে বসে থাকা ব্যাক্তিটা দুইটা দেশে আধিপত্য বিস্তার করে। আমেরিকার মত এমন ক্ষমতাধর রাষ্ট্রে তার আধিপত্য। মেয়েটা অনেক সুন্দরী সবার কানে – কানে পৌঁছে গিয়েছে এই সংবাদ। কারোর মস্তিষ্কে লুলুপ চিন্তাধারা আটকে যায়। একজন আরেকজনের কাছে ফিসফিস করে বলে,
” এক পলক দেখার দরকার। কার জন্য এমন ব্লাডি বিস্ট এত উন্মাদ হয়ে উঠলো।
ক্রিশ্চিয়ান ঠাট্টার হাসি হেসে বলে,
” লাভ নেই মি, বোস। শুধু শুধু আগুন ধরতে গেলে জ্বলে যাবেন। জানা মতে উনার স্ত্রীকে কেউ দেখে নি কয়েকজন ছাড়া। আর সেই কয়েকজন একবার দেখে দ্বিতীয়বার দেখার সুযোগ পায় নি। কখনো বাহিরে বের করে নি। মিনারে যাওয়ার মত ভুল তো কখনো করবেন না। খুব ভালো করেই জানেন মিনারের চারপাশে হিংস্র পশু দিয়ে নিয়ন্ত্রিত। অসংখ্য গার্ড, মাটির নিচে সংবাদ মাধ্যম। একটা পাখি প্রবেশ করলেও সাথে সাথে সিগন্যাল চলে যায় সব জায়গায়। সেখানে প্রবেশ করার মত ভুল তো পাগলেও করবে না। আজ পর্যন্ত কোনো শত্রু সেখানে যেতে পারে নি। ভেতরে ডুকার চেষ্টা করলেও তারা পরবর্তীতে লাশ হয়ে ফিরেছে। সেই ক্ষমাধর আইল্যান্ড, সেই মিনারের খুব সুরক্ষিত স্থানে উনি আর উনার সন্তানেরা হয়েছে।
মি, বোঁস ওয়াইনে চুমুক দিয়ে চোখ ছোট ছোট করে নিকের দিকে তাকায়। সময় ঘনিয়ে আসে সেই নিলাম মুহূর্তের। কায়াত ছাড়া সবাই উপস্থিত রয়েছে। কায়াত এমনিতেও কেনার জন্য আসে নি। সে অর্ধেক সম্পত্তি হারিয়ে পাগল প্রায়। সে জানত নিক আসবে এখানে। আর সে এসেছিলো সবার সামনে অপমান করতে। গুলিবিদ্ধ হলেও কায়াতের ঠোঁটে বাঁকা হাসি। সবার সামনে নিকের স্ত্রীকে রক্ষিতা আর প্রস্টিটিউট বলতে পেরে যেন শান্তি লাগছে তার। গ্যাংস্টার বসের দাম্ভিকতা আর অহংকারে আঘাত করে সে অনেকটা উত্তেজিত।
চারদিকের রাজকীয় ঝাড়বাতি আর আলোর সমাহার। পৃথিবীর তাবড় তাবড় ট্রিলিওনিয়ার আর মাফিয়া সম্রাটরা তাদের আসনগুলোতে পাথরের মূর্তির মতো স্তব্ধ হয়ে বসে আছেন। কারো মুখে কোনো শব্দ নেই।
হলের ঠিক কেন্দ্রে, উগ্র স্পটলাইটের নিচে কাঁচের বক্সের ভেতর রাখা সেই অলৌকিক ব্লাডস্টোন হাড়টি। মনে হচ্ছে এক রক্তপিপাসু দানবের মতো জ্বলজ্বল করছে। হলের এক কোণায় সোফায় হেলান দিয়ে বসে আছেন নিক জেভরান। তার তীক্ষ্ণ, শিকারী দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে সেই পাথরটার ওপর। রাগে আর উত্তেজনায় সে নিজের নিচের ঠোঁটটা দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরে রেখেছে।চোয়ালের পেশি এখনো শক্ত।
হঠাৎ করেই স্টেজের ওপর ভেসে উঠল নিলাম পরিচালকের গম্ভীর কণ্ঠ,
“লেডিস অ্যান্ড জেন্টলমেন, দ্য ব্লাডস্টোন! প্রারম্ভিক মূল্য পাঁচ বিলিয়ন ডলার!”
নিলাম শুরু হতেই পুরো হলে এক অদৃশ্য পারদ চড়তে লাগল। কোটিপতিদের সুশীল মুখোশের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসতে লাগল তাদের আদিম লোভ।
”ছয় বিলিয়ন!” হলের ডান প্রান্ত থেকে হাত তুললেন এক নামী রাশিয়ান অলিগার্ক।
“সাত বিলিয়ন ডলার!” মুহূর্তেই কাউন্টার ডাক দিলেন লন্ডনের এক শীর্ষ ব্যাংকিং টাইকুন।
একে একে দামের অঙ্কটা আকাশ ছুঁতে লাগল। আট বিলিয়ন… দশ বিলিয়ন… বারো বিলিয়ন! সাধারণ মানুষের কাছে যা কল্পনাতীত, এই এলিটদের কাছে তা কেবল কাগজের টুকরো। কিন্তু লক্ষ্য করার মতো বিষয় ছিল, আন্ডারওয়ার্ল্ডের বাকি বড় বড় মাফিয়া ডনরা তখনো চুপ করে ছিল। তারা ব্লাডস্টোনের দিকে তাকাচ্ছিল না বরং তাদের চোখ ছিল গ্যাংস্টার বসের ওপর। নিকের শান্ত রুপ কিছুটা অবাক করলো।
দামের অঙ্ক যখন “পনেরো বিলিয়ন ডলারে” গিয়ে কিছুটা থমকে দাঁড়াল, তখন নিলাম পরিচালক হাতুড়ি উঁচিয়ে বললেন, “পনেরো বিলিয়ন ডলার… একবার… পনেরো বিলিয়ন ডলার… দুবার…”
ঠিক তখনই পুরো হলরুমকে স্তব্ধ করে দিয়ে নিক তার ডান হাতটা সামান্য ওপরে তুলেন। তার ঠোঁটের কামড় শিথিল হলো। তবে কণ্ঠ থেকে বেরিয়ে এলো এক বরফশীতল আদেশ,
”চল্লিশ বিলিয়ন ডলার!”
এক ঝটকায় দাম পনেরো থেকে চল্লিশ বিলিয়নে গিয়ে ঠেকল! পুরো নিলাম কেন্দ্রে এক মুহূর্তের জন্য অক্সিজেন ফুরিয়ে যায় । উপস্থিত বিলিয়নিয়াররা একে অপরের মুখের দিকে তাকাতে লাগলো। কারো সাহস হলো না এই দামের ওপর আর এক ডলারও বাড়ানোর। সবাই এতটুকু বুঝেছে নিজের সব সম্পত্তি বিক্রি করে হলে নিক এই হাড় নিয়ে যাবে।
নিলাম পরিচালক কাঁপানো হাতে হাতুড়িটা টেবিলের ওপর আঘাত করলেন,
“চল্লিশ বিলিয়ন ডলার… একবার…”
“দুবার…”
“এবং তিনবার! সোল্ড টু মিস্টার নিক জেভরান!”
পুরো হলের থমথমে নীরবতার মাঝে নিক জেভরান ধীর পায়ে উঠে দাঁড়ালেন। কোটিপতিদের সেই সুরক্ষিত দুর্গে সবার চোখের সামনে দিয়ে, এক পরম অহংকার আর একাধিপত্য নিয়ে সে এগিয়ে গেলেন সেই ব্লাডস্টোনের দিকে। ওটা এখন তার। ওটা সে নিয়ে যাবে তার সেই বিশেষ মানুষের জন্য, যার দিকে আঙুল তোলার সাহস এই পৃথিবীর আর কারো নেই।
সেই নিচ্ছিদ্র ও স্তম্ভিত নীরবতার বুক চিরে নিকঅত্যন্ত মন্থর অথচ দৃঢ় পদক্ষেপে আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। পৃথিবীর তাবড় তাবড় ধনকুবের আর মাফিয়া সম্রাটদের সেই সুরক্ষিত ও দুর্ভেদ্য দুর্গের অন্তঃপ্রকোষ্ঠে উপস্থিত সবার ভীত চাউনিকে উপেক্ষা করে এক পরম অহংকার আর একাধিপত্যের রাজদণ্ড হাতে সে ধীর পায়ে এগিয়ে গেলেন সেই প্রদীপ্ত ব্লাডস্টোনের অভিমুখে।
প্লাটিনাম স্পটলাইটের নিচে জ্বলতে থাকা সেই রক্তাক্ত পাথরটি এখন আর কোনো নিলামের পণ্য ওটি এখন এই ব্লাডি বিস্টের চূর্ণ-বিচূর্ণ না হওয়া অহংকারের এক নতুন দলিল। ওটার ওপর এখন কেবল গ্যাংস্টার বসের সিলমোহর। এই মহার্ঘ্য বস্তুটি সে আজ ছিনিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তার জীবনের সেই একমাত্র বিশেষ মানুষটির উদ্দেশ্যে। যার পবিত্র অস্তিত্বের দিকে পুনরায় আঙুল তোলার মতো দুঃসাহস কিংবা স্পর্ধা এই নশ্বর পৃথিবীর আর কোনো জীবিত প্রাণীর নেই। নিক বক্সটার দিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসলেন,
” আমার গচ্ছিত সম্পদ আবার আমার কাছে ফিরে আসলো।
রাত্রির প্রহর তখন দশটার কাছাকাছি…
নিকের কৃষ্ণবর্ণের রাজকীয় Rolls-Royce Boat Tail গাড়িটি ঝড়ের গতিতে অন্ধকার চিরে ছুটে চলেছে। অনুগামী হিসেবে পেছনে প্রহরীবেষ্টিত এক বিশাল গাড়িবহর। নিকের অবয়বে এক হিংস্র ও নিষ্ঠুর অভিব্যক্তি ফুটে উঠেছে। এই অভেদ্য নিরাপত্তার একমাত্র কারণ। বর্তমানে এই আন্ডারওয়ার্ল্ড ডনের জিম্মায় রয়েছে এমন এক মহামূল্যবান বস্তু, যা সমগ্র মাফিয়া জগতের পরম আরাধ্য সম্পদ। ফলত, সেটি হস্তগত করার লক্ষ্যে যেকোনো মুহূর্তে অতর্কিত আক্রমণ হওয়াটাই অবধারিত।
পার্শ্ববর্তী আসনে বসে নিপুণ হাতে গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করছে অধিরাজ। নিক যে কিছুক্ষণ পূর্বে নিজের শরীরে ড্রাগস পুশ করেছে তা অধিরাজের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এড়াতে পারেনি। সে এতটুকু অন্তত অনুধাবন করতে পেরেছে যে ভেতরে কিছু একটা হয়েছে। অন্যথায় বস এতটা হিতাহিত জ্ঞানশূন্য ও ডেস্পারেট হয়ে উঠবেন কেন? নির্ঘাত ম্যামকে কেন্দ্র করে কোনো অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটেছে। কারণ, ম্যামের প্রসঙ্গে সামান্যতম আঁচ এলেই স্যার এমন প্রলয়ঙ্করী ও নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে ওঠেন। অধিরাজ প্রশ্ন করতে চাচ্ছিলো। কিন্ত নিজের এমন চোখ-মুখ দেখে সাহস হচ্ছে না। নিক গ্রিবাদেশ শক্ত করে আরিশকে ফোন করে। দুই-তিন বার রিং হতেই ওপাশ থেকে আরিশ অধৈর্য গলায় বলে,
” নিয়েছিস?
” সম্পত্তি বিক্রি করে হলেও সেটা নিয়ে আসতাম। শুন আমার কথা। সেদিন নিলামের আঠারোজন থেকে সাত জন মরে গেলেও বাকি এগারোজন এখনও বেঁচে আছে। কায়াত বাদে দশজনের পরিচয়, এখন কোথায় অবস্থান করছে দ্রুত খুঁজে বের করে। কাল রাতটা যাতে ওদের শেষ রাত হয়। যে চোখ দিয়ে তাকিয়েছিলো সে চোখ তুলে নিব। যে কলিজা নিয়ে ভেবেছিলো বেডে নিয়ে যাবে সেই কলিজা টেনে আনব। ওকে খারাপ চোখে দেখেছে এমন একজনকে বাঁচতে দিব না। সে পবিত্র, পুরো পবিত্র!
আরিশের উত্তর শুনার আগেই নিক ফোন কেটে দেয়। কেটে নিশ্বাস ও নিতে পারে নি হয়ত। পর পর উচ্চ আওয়াজে ফোন বেজে উঠে। নিক বিরক্তি নিয়ে তাকায় ফোনের দিকে। স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই চোখ-মুখ শান্ত হয়ে যায়।।ফোনে ভাসছে সুন্দর করে একটা নাম,
” ব্লাডরোজ”
নিক দ্রুত ফোন রিসিভ করতেই এনি কাঁদাকাঁদো গলায় বলে,
” তিনজনকে একসাথে সামলাতে পারছি না। কোথায় আছেন আপনি নিক?
স্ত্রীর এমন অসহায় গলা শুনে ঠোঁট কামড়ে ধরে গ্যাংস্টার বস। নিজের উন্মাদ, বেপোরোয়া আর হিংস্র স্বভাবটাকে আড়াল করে শান্ত গলায় বলে,
” এইতো এসে পড়বো জান। রাতে আমাকে আর দিনে আমার তিন বাচ্চাকে সামলাতে গিয়ে বেশি কষ্ট হয়ে যাচ্ছে তাই – না ব্লাডরোজ? কি করবো বলো? ওদের পাপা থাকতে পারে না বউ ছাড়া। আর ওরা থাকতে পারে না মা ছাড়া। নিক জেভরানের এইতো ফ্রেশ ডিএনএ। অন্তরের অন্তরালে অন্তহীন অস্থিরতারে জান।
এনি হতভম্ভ হয়ে যায়। দ্রুত ফোন কেটে দেয়। অসহায় চোখে নাজলীর দিকে তাকায়। যে এই মুহূর্তে গ্যাংস্টার বসের দুই কন্যাকে সামলাচ্ছেন। নাজলী প্রথমে অস্বস্তি বোধ করলেও পর মুহূর্তে সিরিয়াস গলায় বলে,
” এতটা অবহেলা কেনো?
এনি অবাক হয়ে বলে,
” কিসের অবহেলা আপা?
নাজলী বিরক্তি নিয়ে তাকায় এনির দিকে। দাঁত পিষে বলে,
” তুই এখনও অসুস্থ এনি। মাত্র আটদিন হলো হসপিটাল থেকে এসেছি। এমনিতে শরীর দুর্বল। তার উপর স্ত্রীর অধিকার পালন করতে শুরু করলি? উনিও একদম স্বামীর অধিকার নিতে আরম্ভ করে দিলো? একটা মাস অপেক্ষা করে যেত না?
এনি লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে যায়। মুখ লুকালে হয়ত বেঁচে যেত। মিনমিন গলায় বলে,
” তুমি যা ভাবছো সেটা নয় আপা। উনি কাছে আসে না আমার। উনি আমাকে অস্বস্তিতে ফেলার জন্য এমন কথা বলেছে।
নাজলী তীর্যক চোখে তাকিয়ে বলে,
” স্বামীকে বাঁচাতে চাইছিস?
” সত্যি বলছি আমি। লোকটাকে হয়ত ক্ষমা করি নি কিন্তু ভালোবাসি – তো। মিথ্যে কেনো বলবো?
নাজলী অবাক হয়ে বলে,
” ক্ষমা করিস নি?
” উনি কি ক্ষমা পাওয়ার যোগ্য?
” কিন্তু তা- ও ভালোবাসিস? পাঁচ মাস একদম উন্মাদ হয়ে উঠেছিলি। কয়েকদিন গেলে হয়ত মরে যেতি এমন অবস্থা। পুরো সাইকো!
এনি ফিচেল হেসে বলে,
” ভালোবাসা আর ক্ষমা কি এক জিনিস আপা। ভালোবাসি সেটা অস্বীকার করলাম কখন? কিন্তু উনার পাপ আর অত্যাচার ক্ষমা করলে যে নিজের আত্নার উপর অধিক জুলুম হয়ে পড়বে।
নাজলী হতাশার নিশ্বাস ছেড়ে বলে,
“আজকাল তকে বুঝতে পারি না এনি। কেমন যেন হয়ে গিয়েছিস। দুই পাগল একসাথে যুক্ত হয়েছিস। একজন আরেকজনে বাঁচতে পারে না, পাগল হয়ে যায়। আর কাছে আসলেই সব উঁড়ে যায়। কেমন প্রেম এইটা? দুই সাইকোর সংসার আদ’ও সম্ভব? সে জানে তুই যে তাকে ক্ষমা করিস নি?
” জানতে চাই নি কখনো। কি জানাব? কিছু কথা না জানা উত্তম। উনাকে জানাতে চাই ও না। সহ্য করতে পারবে না। হিংস্র হয়ে উঠবে।
নাজলী কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে এনির দিকে। অনেকটা গুলোমুলো হয়ে উঠেছে। তার সাথে বৃদ্ধি পেয়েছে সৌন্দর্য। চোখের সামনে বোনটা মা হয়ে গেলো, কত কিছু সহ্য করলো! নাজলী ঘুমন্ত দুই কন্যাকে বিছানায় শুয়ে দিয়ে এনির কোলের দিকে তাকিয়ে বলে,
” খাওয়ানো শেষ?
” খাচ্ছে এখনও।
নাজলী কপাল কুচকে বলে,
” কিন্তু চোখ বন্ধ করে আছে। আমি ভাবলাম ঘুমিয়ে পড়েছে।
এনি ছেলের দিকে তাকিয়ে সামান্য হেসে বলে,
” ঘুমের মধ্যেই খাচ্ছে।
” এইবার শুইয়ে দে দয়া করে। তুই একটু ঘুমাহ। যার বাচ্চা সে এসে সামলাবে। কোনো মেইড তো রাখতে দিলি না।
এনি এরিককে শুইয়ে দিতে দিতে বলে,
” ওদের মা জীবিত থাকতে মেইড কেনো দেখাশুনা করবে আপা। ওদের প্রতিটা মুহূর্ত আমি উপভোগ করতে চাই। অনুভব করতে চাই একটা হৃদয়হীন মনস্টারকে।
নাজলী মিটিমিটি হেসে বের হয়ে যায় রুম থেকে।একসময় এই রুমের আসার অনুমতি কারোর ছিলো না। আজ কত কিছু পরিবর্তন হলো।
আরিশ ল্যাপটপে বসে দশ জন মাফিয়ার সমস্ত বায়োডাটা সংগ্রহ করছিলো। তারা হলো সেই দশজন মাফিয়া যারা এনিকে নিলামে তুলেছিলো। বাকি সাতজনকে নিক অনেক আগেই মেরে দিয়েছে। আর বাকি আছে কায়াত। এই কায়াতকেও একদিন মেরে দিবে। তবে সে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক ধূর্ত। বার বার হাতের নাগালের বাহিরে চলে যাচ্ছে । সে ছয়জনের বায়ো সংগ্রহ করতে পারলেও চারজনের পরিচয় কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছে না। রাগ আর দুশ্চিন্তায় মাথা ছিঁড়ে যাচ্ছে। নাজলী এনির কাছ থেকে এসে এই মাত্র রুমে প্রবেশ করলো। আরিশকে কাজ করতে দেখে তার কপাল কুচকে আসে। বিগত চার ঘন্টা ধরে ল্যাপটপ নিয়ে বসে আছে। সামনে একটা নয় চারটা ল্যাপটপ। আরিশের দৃষ্টি নিজের দিকে ঘুরানোর জন্য রুম জুড়ে কিছুক্ষণ পায়চারী করে। কিন্তু আরিশ কিছুতেই তাকায় না তার দিকে। নাজলী চোখ ছোট ছোট করে নিজের। এই লোক কি কোনোভাবে তাকে এড়িয়ে চলছে? কোনো কিছু পেয়ে নাজলী গলা কেঁশে বলে,
” শুনোন আমার কথা। সেদিন বলেছিলাম আমার জন্য ব্যবহারের কাপড় নিয়ে আসার জন্য। আপনি নিয়ে আসলেন না কেনো? এখন আমি কি পড়ব?
আরিশ কোনো উত্তর করলো না। তার চোখ- কান সব মনিটরে ডুবে আছে। একবারের দিকে ফিরেও তাকায় নি। নাজলীর ইগোতে লাগলো বিষয়টা। এমনিতেই সে একদম জেদী টাইপের তার উপর আরিশের এমন চুপচাপ থাকা তার সহ্যের বাহিরে। নাজলী শক্ত আরিশের কাছে গিয়ে বলে,
” আশ্চর্য! আপনি আমার কথা শুনেও কোনো উত্তর দিচ্ছেন না কেনো? আমার কাপড় কোথায়?
আরিশ মনিটরে দৃষ্টি রেখেই গম্ভীর গলায় বলে,
” কাজ করছি নাজলী, ডিস্ট্রাব করো না।
নাজলী ল্যাপটপটা জেদ ধরে সরিয়ে দিতে দিতে বলে,
” কি এমন বালের কাজ করছেন আপনি? সামান্য কথার উত্তর দিতে পারছেন না?
নাজলী ল্যাপটপটা সরিয়ে রাখতে পারলো না। তার আগেই আরিশ ধমকে উঠে,
” সমস্যা কি তোমার? কথা কানে যাচ্ছে না? বলছি না কাজ করছি। ডিস্ট্রাব করছো কেনো এত?
নাজলীর পুরো শরীর ঝিমঝিম করে উঠে। হুট করে ধমকটা নিতে পারলো না রমণী। আড়চোখে তাকায় আরিশের হাতের দিকে। যেটা থাপ্পরের জন্য উঠে আসছিলো। কিন্তু ক্রিমিনাল লিডার সেটা আটকে দেয় নাজলীর আগোচরে। কিন্তু রমণীর চোখ ফাঁকি দেওয়া এত সহজ নয়। চোখ পানিতে ঝাপসা হয়ে আসে। এইটা অপমান নয় সোজা তার ব্যক্তিত্বে গিয়ে লেগেছে।
আচমকা আরিশ নাজলীর দিকে তাকাতেই থমকে যায়। নাজলীর চোখে পানি দেখে অধৈর্য হয়ে পড়ে ক্রিমিনাল লিডার। হতভম্ভ হয়ে নিজের কাজের কথা অনুসরন করে। রাগ আর জেদের মাথায় কি করতে যাচ্ছিলো ভাবতেই চোখ- মুখ খিঁচে ফেলে। নাজলীকে স্পর্শ করতে যাবে তার আগেই সরে যায় রমণী। গ্রিবাদেশ নাড়িয়ে বেলকনীর দিকে এগিয়ে যায়। আরিশ চুপসে যাওয়া বেলুনের মত স্ত্রীর পিছন পিছন যায়,
” নাজলি, প্লিজ স্টপ ক্রাইং। আই ডিড্ন’ট রিয়ালাইজ হোয়াট আই ওয়াজ ডুইং। আই ওয়াজ কমপ্লিটলি বেরিড ইন ওয়ার্ক। হোয়েন ইউ সাডেনলি ডিড দ্যাট, আই কুড্ন’ট কন্ট্রোল মাই অ্যাংগার। আই’ম সরি ফর বিহেভিং দ্যাট ওয়ে।
নাজলী শুনলো না। ঠাস করে বারান্ধার দরজা লাগাতে গেলে আরিশ আটকে দেয়। নরম সুরে বলে,
” স্যরি বলেছি – তো? এখন মার্কেটে চলো। প্রয়োজনে পুরো মার্কেট কিনে নিয়ে আসব। এরপরও….
আরিশকে থামিয়ে নাজলী চোখের পানি মুছে বলে,
” আপনার কি মনে হয়? শপিং করার জন্য আপনাকে জ্বালাচ্ছিলাম। কোনোদিন বুঝেছেন আমাকে যে আজ বুঝবেন? স্বার্থপর জানোয়ার একটা! জীবনে যদি আপনার টাকা’ই কিছু পরিধান করেছি তবে আমার নাম নাজলী মাইলাহ নয়। কথাটা মাথায় ডুকিয়ে রাখবেন। এতটা অসহায় হয়ে যায় নি যে কাপড়ের জন্য আপনাকে জ্বালাতন করব।
আরিশ অসহায় চোখে তাকায়। নাজলী কাঁদছে একদিকে অন্যদিকে রাগে ফেটে পড়ছে। আরিশ নাজলীর হাত ধরতে গেলে নাজকী ছিটকে সরে যায়। হুশিয়ারি দিয়ে বলে,
” ডোন্ট টাচ! কাজ করুন গিয়ে। আপনাকে বাঁধা দেওয়ার জন্য ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। আর কি শাস্তি দিবেন? চাইলে দিতে পারেন। অহহ, হ্যা হাত তুলতে চেয়েছিলেন। কি ভেবে যেন থাপ্পরটা দিলেন না, হাত নামিয়ে নিলেন। চাইলে থাপ্পর কন্টিনিউ করতে পারেন। এই যে গালটা এগিয়ে দিচ্ছি।
নাজলী কথাটা বলে আরিশের দিকে গাল এগিয়ে দেয়। আরিশ এক সেকেন্ড তাকিয়ে আকড়ে ধরে রমণীর ধনুকের মত লতানো কোমর। নাজলী বুঝে উঠার আগে গালে পর পর দশটা চুমু খেয়ে থেমে যায়। আরিশের স্পর্শ আর চুমু কোনোটা সহ্য হলো না নাজলীর। ছাঁড়া পাওয়ার জন্য ছটফট করতে থাকে। আরিশ শক্ত করে নিজের চেপে ধরে নাজলীর গালে হাত রাখে। একদম শান্ত গলায় বলে,
” আমার সমস্ত সম্পত্তি তোমার, পুরো আমিটা এই তোমার। আমার পুরো সম্রাজ্য খেয়ে ফেললেও প্রশ্ন করব না। কেনো চাইবে না কিছু? অবশ্যই চাইবে। আমার আয়, আমার রোজগার সব তো তোমার জন্য। তুমি খরচ না করলে আর কে করবে? কাজের মধ্যে কেউ ডিস্ট্রাব করলে আমার মাথা ঠিক থাকে না সেটা পুরনো অভ্যাস। অভ্যাস বদলাতে তো সময় লাগবে কিছুটা। থাপ্পর দিতে যাচ্ছিলাম অন্য কেউ মনে করে। পরে দেখলাম আমার রানী দাঁড়িয়ে আছে। সেই রানীর গালে থাপ্পর কিভাবে দেয়? রাজার সেই সাহস বা ক্ষমতা নেই। বলো আছে?
নাজলী একটুর জন্য ও টললো না। কেমন শক্ত করে রেখেছে নিজের শরীর। আরিশ ফুঁশ করে শ্বাস টানলো। এই মেয়ে তার থেকে তিন সিঁড়ি উপরে। বিরবির করে উঠে,
” ভেবেছিলাম আমাকে সামলাতে হিমশিম খাবে। অথচ তোমাকে সামলাতে আমি হিমশিম খাচ্ছি। তোমাকে সামলানো যে এতটা কঠিন হবে জানা ছিলো না। কি শক্তি তর জান, ক্রিমিনাল লিডার আরিশ ইলহামকে দিয়ে সরি বলাচ্ছো বার বার।
আরিশের বিরবির নাজলী শুনলো না। আরিশ ও নাজলীকে ছাড়লো না। একইভাবে বুকের সাথে শক্তভাবে চেপে ধরে রাখে। কিছু সময় অতিবাহিত হওয়ার পর নাজলী সরে এসে বলে,
” কাজ করুন গিয়ে আপনার।
” কাজ পড়ে করব, এখন নয়।
” কিন্তু আপনি কাজ করছিলেন।
” আগে বউ, পরে কাজ।
নাজলীর চোখ ছোট ছোট হয়ে আসে। অন্যপাশে তাকিয়ে বলে,
” নাটক – টা একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে না?
আরিশ শান্ত নিশ্বাস ছাড়ে। নাজলীর লাল চুলে মুখ দিয়ে হিসহিসিয়ে বলে,
” একদম নয়। নাটক কেনো করবো? প্রেমের নাটকে আমি অনেক কাচা। তুমি চাইলে অন্য কিছুর নাটক করতে পারি।
নাজলীর গলা কেঁপে উঠে,
” ক.. কি?
” ক্রিকেট ম্যাচ! ইউ নো, নাজলী নিক একসাথে তিনটা ডাউনলোড করেছে। আমি আর তুমি মিলে চারটা করব। খুব দ্রুত এই কাজে লেগে পড়তে হবে।
আরিশের ইঙ্গিত বুঝতে বাকি রইলো না আরিশের। লজ্জায় এদিক- সেদিক তাকিয়ে হাঁশ – ফাঁশ করতে থাকে রমণী। কোনো রকম ছুটে পালিয়ে যেতে চাচ্ছে এই মুহূর্তে। এই লোক অতিরিক্ত ভয়ানক! রাগ করা তার জন্য কষ্টকর হয়ে পড়ছে। দ্রুত পায়ে রুমের দিকে গিয়ে যায়। যাওয়ার আগে চোখ রাঙ্গিয়ে আরিশের দিকে তাকিয়ে বলে,
” একবার আসতে দিয়েছি বলে ভেবে নিবেন না বার বার আসতে দিব। সোজা কেটে গলায় ঝুলিয়ে দিব। কি কাটার কথা বলেছি আশা করে বুঝেছেন।
নাজলীর যাওয়ার দিকে আরিশ হতভম্ভ হয়ে তাকায়। পর পর ঠোঁটে দেখা মেলে এক বাঁকা হাসি।
নিকের সেই কৃষ্ণবর্ণের গাড়িটা এসে থামে সুবিশাল মিনারসদৃশ অট্টালিকার সম্মুখে। অনুগামী প্রহরীর দল মুহূর্তের মধ্যে চারপাশ থেকে সটকে যায়। নিক অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সাথে গাড়ি থেকে অবতীর্ণ হয়ে মিনারের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে।তার শক্ত মুঠোয় তখনো অবরুদ্ধ সেই মাফিয়া জগতের মহামূল্যবান রত্নখচিত বাক্স।
কক্ষভ্যন্তরে প্রবেশ করেই নিক তৃষ্ণার্তের ন্যায় পানি পান করে। চারপাশের এই দমবন্ধ করা পরিস্থিতি তার নিকট এতটাই দুঃসহ ঠেকছে যে কোনোভাবেই সে নিজেকে স্থির রাখতে পারছে না। মস্তিষ্কের কোষে কোষে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে প্রতিদ্বন্দ্বী ইগরের সেই তীব্র বিষাক্ত কটূক্তি ও অবমাননাকর বাক্যবাণ। এক চরম মানসিক যন্ত্রণায় নিক নিজের কেশগুচ্ছ খামচে ধরে গ্যাংস্টার বস।তার শিরা-উপশিরায় তখন ক্রোধের দাবানল জ্বলছে।হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে সেই মারমুখী আক্রোশ সামলাতে না পেরে সে সম্মুখের ভারী টেবিলটি সজোরে উল্টে দেয়।
ঝনঝন শব্দে কাচ ও আসবাবপত্রের ভাঙচুর প্রতিধ্বনিত হয় কক্ষের প্রতিটি দেয়ালে। সেই বিকট ও প্রলয়ঙ্করী শব্দে স্টাফরা আতঙ্কে শিউরে উঠে। আরিশ তখন শব্দভেদ্য (সাউন্ডপ্রুফ) রুমে থাকায় এই তাণ্ডবের বিন্দুবিসর্গও টের পায় না। ওদিকে এনি নিজের কক্ষের দ্বার উন্মুক্ত রেখে দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে ছিল। অকস্মাৎ এই তীব্র আওয়াজে সে আতঙ্কে নিজের দুই কর্ণদ্বয় চেপে ধরে। বাচ্চারা জেগে যাবে এই আশঙ্কায় সে দ্রুত নিজের কক্ষের দরজা বন্ধ করে দেয়। কিন্তু তার অবচেতন মন কিছুতেই শান্ত হতে পারছে না এক অজানা অমঙ্গল আশঙ্কায় বুকটা কেঁপে উঠে। নিদারুণ কৌতূহল আর উদ্বেগ নিয়ে নিচে কী ঘটেছে তা প্রত্যক্ষ করতে সে দ্রুত গাত্রবস্ত্র হিসেবে একটি ওভারকোট জড়িয়ে নিচে যাওয়ার জন্য অগ্রসর হয়। সিঁড়ি কাছে আসতেই এনির চোখ বড় বড় হয়ে যায়। পুরো মেঝেতে কাচের টুকরো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গিয়েছে। নিকের হাত থেকে তাজা রক্ত চুইয়ে চুইয়ে পড়ছে। এনি আতঙ্কে হতভম্ভ হয়ে যায়। মেঝেতে পা রাখবে তার আগেই গ্যাংস্টার বসের অধৈর্য হুংকার,
” নো ! পা রাখবে না ভুলেও। কাচ ডুকে যাবে পায়ে। ব্যাথা পাবে।।
এনি দাঁড়িয়ে যায়। কেমন যেন খাপছাড়া লাগছে নিককে। এনি সামান্য কেঁদে উঠে,
” আপনি সরে আসুন। প্লিজ কাছে আসুন। রক্ত ঝরছে হাত থেকে।
নিক আসে না। কেমন নিশ্বাস টানছে ঘন-ঘন। এনি রাগ দেখিয়ে বলে,
” আপনি না আসলে কিন্তু বাচ্চাদের নিয়ে আমি আমার বোনের বাড়ি চলে যাব।
সাথে সাথে ক্ষুব্দ চোখে তাকায় গ্যাংস্টার বস। এনি ঠোঁট ভিজিয়ে অসহায় গলায় বলে,
” আমি বোনের বাড়ি যাওয়ার কথা বলেছি। এইভাবে রেগে যাচ্ছেন কেনো? বোনের বাড়ি তো পাশের রুমে এই। গেলেও সাথে সাথে নিয়ে আসতে পারবেন।যাচ্ছি না কোথাও। প্লিজ আসুন দ্রুত। নয়ত আমি চলে যাব আপনার কাছে।
নিক শুনলো এনির কথা। একদম বাধ্যমত এনির কাছে আসে। এনি ছটফট করে নিকের হাত ধরে বলে,
” কত রক্ত ঝড়ছে। একটু রাগ কমালে কি হয়? নিজের শরীরে আঘাত করে কি পান?
নিক এখনও কেমন অধৈর্য হয়ে আছে। এনি ভয়ে শিউরে উঠছে বার বার। লোকটা আচমকা এমন উন্মাদ হয়ে উঠলো কেনো? রুমে প্রবেশ করে নিক দরজা লাগিয়ে দেয়। এনি সাহস নিয়ে জিজ্ঞসা করে,
” ক.. কি হয়েছে? এইভাবে রেগে আছেন কেনো?
নিক আচমকা চেপে ধরে এনির বাহু। অধৈর্য গলায় বলে,
” রাগ কমাতে কি করব? শান্তি পাচ্ছি না। অস্থির হয়ে যাচ্ছি। সব কিছু ধ্বংস করে দিতে ইচ্ছে করছে।
এনি নিকের দিকে এক পলক তাকিয়ে শরীরে রাখা অভার কোর্ট-টা সরিয়ে ফেলে। চুলগুলো সরিয়ে নিকের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। উন্মুক্ত হয়ে উঠে এনির পিঠের অর্ধেক অংশ। নিক এক পলক তাকালো এনির দিকে। পর মুহূর্তেই অস্থির ভাবে মুখ ডুবিয়ে দিলো গলার মধ্যে। এনি সামলাতে হিমশিম খেয়ে উঠে। নিক উগ্রভাবে স্পর্শ করে যাচ্ছে। এনি নিকের পিঠে হাত রেখে বলে,
” শান্ত হন আপনি। কি হয়েছে? কেনো রেগে আছেন?
নিকের কোনো রেসপন্স নেই। ঘাড় থেকে মুখ উঠিয়ে ওষ্টে ওষ্ট মিলিয়ে দেয়। এনি চোখ-মুখ খিঁচে ফেলে। এক হাতে এনির জামার অংশ টেনে ছিঁড়ে ফেলবে এমন সময় চিকন একটা কন্ঠ ভেসে উঠে। সব তছনছ হয়ে গেলেও হয়ত নিকের ধ্যান ভঙ্গ হত না। কিন্তু এই মেয়েলী চিকন গলা ছিলো মারাত্নক এক শক্তিশালী স্বর। নিক এনি দুইজনে তাকায় বিছানার দিকে। নিক এখনও ঘন ঘন নিশ্বাস ছাড়ে। এনির থেকে সরে এসে মেয়ের দিকে এগিয়ে যায়। এনি স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে।
নিক ঘন ঘন নিশ্বাস টানে। বিছানায় তিন অস্তিত্বের দিকে তাকিয়ে হাতের ঘডি, ব্রেসল্যাট সব খুলে ফেলে। এনি হাত চেপে ধরে আদেশ দিয়ে বলে,
” উঠুক সমস্যা নেই। আপনি বসুন, ড্রেসিং করাতে হবে।
” খাইয়েছো ওদের?
” হুম।
” তিনজনকে খাওয়াতে কষ্ট হয় না। বাহিরের কিছু নেই ওদের খাওয়ার মত? ইফ ইউ’আর গোয়িং টু ইট আউটসাইড ফুড, লেট মি নো আই’ল ব্রিং ইট।
এনি চোখ ছোট ছোট করে বলে,
““ ইউ’আর গেটিং সিলি নাউ দ্যাট ইউ’ভ বিকাম আ ফাদার। এমন দশ দিনের বাচ্চা বাহিরের জিনিস খাবে? একবার বাচ্চাকে এসিডিটির রোগী বলে চালিয়ে দিচ্ছেন তো আবার বাহিরের জিনিস খাওয়াতে চাচ্ছেন?
নিক তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ড্রেস চেইঞ্জ করে হাত-মুখ ভালোভাবে ক্লিন করে আসে। বাচ্চাদের দিকে ঝুঁকে চুমু খায় পর পর অনেক গুলো। বাবার ঠোঁটের ছোয়া পেতেই একজন পিটপিট করে চোখ মেলে তাকায়। যার চোখের রং হুবহু তার মত। নিক অদ্ভুতভাবে তাকায় মেয়ের দিকে। যদিও বাচ্চাদের বুঝা যায় না। তবুও এই মেয়ে গ্যাংস্টার বসের কপি বললেই চলে। বাচ্চারা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক ছোট। এদেরকে ছুঁতে গেলে গ্যাংস্টার বস দিশেহারা হয়ে পড়ে। তার পাপের সম্রাজ্যে পবিত্র ফুল কেনো জন্মালো? টিকবে তো? ইচ্ছে না থাকা সত্তেও মেয়েকে কোলে তুলে নেয় গ্যাংস্টার বস। ছোট্ট দেহটা বাবার শরীরের সাথে একদম মিশে যায়। নিকের নিশ্বাস কেমন যেন দ্রুত চলতে থাকে। এনি তাকিয়ে – তাকিয়ে দেখছে বাবা -মেয়ের মিলন। নিক মেয়ের কপালে চুমু খেয়ে বলে,
” আমার পৃথিবী। তুমি একদম আমার কপি। বাকি দুজন থেকে আলাদা।
নিক কথাটা বলে এনির খুঁজ চালায়। এনি পিছন থেকে ডাক দেয়,
” এরিকের পাপা এদিকে তাকান।
নিক ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকায়। পিছনে একটা রমণী দাঁড়ানো। যার শরীরের সাথে মিশে আছে লাল রঙ্গের একটা স্লিম ড্রেস। নিকের খেয়াল হয় এইটা কিছুক্ষণ আগেও ছিলো। কিন্তু উগ্রতা আর হিংস্রতার জন্য খেয়ালে আসে নি। ড্রেসের হাতা বলতে চিকন একটা ফিতের মত অংশ। আর লম্বা হাটু অব্দি। সদ্য মা হওয়া রমণীর নারী অবয়ব ভেসে উঠে গ্যাংস্টার বসের সামনে। নিকের মস্তিষ্ক এলোমেলো হয়ে উঠে। শরীরের সমস্ত রক্ত যেন বরাফের মত ঠান্ডা হয়ে আসছে। খেই শক্তি হারিয়ে ফেলবে যে কোনো সময়। শুকনো ঢোক গিলে অনেকবার। এসির মধ্যে থেকেও ঘেমে একাকার অবস্থা। এনি মুচকি হেসে একদম নিকের কাছে এসে দাঁড়ায়। নিক মেয়েকে বিছানায় রাখতে ভুলে যায়। নিজেকে নিয়ন্ত্রন করতে ঘন শ্বাস ফেলে। নিকের এমন তছনছ অবস্থা দেখে মিটিমিটি হাসে রনণী। নিকের কাছে আসতেই মেয়েলী শরীরের উষ্ণ গন্ধ তার নাকে আসে। ধপ করে বিছানায় বসে যায়। এক হাতে মেয়ে বিছানায় রেখে কপাল চেপে ধরে নিজের। এনি নিকের উপর ঝুঁকে এডমস আ্যপলে আঙ্গুল ছুঁয়ে ফিসফিস করে বলে,
” এমন সুদর্শন স্বামী পেয়ে আজ খুব খুশি খুশি লাগছে।
নিক দাঁতে দাঁত চেপে ধরে নিজের এনির হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে বলে,
” এতদিনে খুশি খুশি লাগছে? ইচ্ছে করে এমন ড্রেস পড়েছো? একটু আগে রাগ কমাতে চাইলে আর এখন কন্ট্রোলল্যাস করতে চাইছো?আমাকে জ্বালাতে এসেছো? অধৈর্য হয়ে গেলে তোমার অসুস্থতার পরোয়া কিন্তু করব না।
এনি নিকের এমন ছটফটে চেহারা দেখে মুচকি হাসে। নিকের উপরে উঠে এসে গালে আঙ্গুল দিয়ে স্পর্শ করতে করতে বলে,
” উমমম, এরিকের পাপা, আপনি কিছু-মিছু করতে পারেন। তবে আবার ও মনে করিয়ে দেয় আমি কিন্তু দুর্বল আর অসুস্থ।
নিক ঠোঁট কামড়ালো নিজের। এনি টুপ করে চুমু খেয়ে বসে নিকের উন্মুক্ত বক্ষে। এনির ফর্সা উন্মুক্ত অংশ ভেসে আসতেই হেচকা টানে বিছানায় ফেলে দেয়। এনি বুঝে উঠার আগেই নিক দুইটা হাত চেপে ধরে বলে,
” ফা’ক ইউ বেবিগার্ল!
বলেই মুখ ডুবিয়ে দেয় স্ত্রীর গলায়। এনি হতভম্ভ হয়ে বলে,
” কি করছেন? আমি কিন্তু অসুস্থ!
নিক কামড়ে ধরে এনির থুতনি। এনি ব্যাথায় শব্দ করে উঠে। নিক এনির গ্রিবাদেশ ধরে ফের বলে,
” বিশ্রি আওয়াজ দিবে না। তুমি অসুস্থ জানা সত্তেও সিডিউস করতে এসেছো? আমাকে জব্দ করতে চলে আসার আগে একবার ও ভাবো নি যেদিন তুমি সুস্থ হবে সেদিন তোমার কি অবস্থা হবে? কি চাচ্ছো ড্রাগস নিতে নিতে মরে যায়?
আৎকে উঠে এনি। ঠোঁট ভেঙ্গে কান্না করে দেয়,
” কি বলছেন এইসব? আমি তো মজা করত এসেছি। মরবেন কেনো?
নিক গম্ভীর নিশ্বাস ফেলে আওড়ায়,
” চিন্তা নেই, মরলে সাথে নিয়েই মরব। একা একা মরব না।
এনির শরীরে চাঁদর জড়িয়ে দিয়ে নিক উঠে দরজার কাছে যায়। একজন এসে সেই বক্সটা দিয়ে যায়। এনি কপাল কুচকে তাকায় সেদিকে। নিক বাঁকা হেসে বক্স খুলে এনির সামনে রাখে। সামান্য আলো চিকচিক করে উঠে হাড় থেকে। এনি অবাক হয়ে বলে,
” খুব সুন্দর?কেমন যেন অদ্ভুত! পাথরটার ভেতরে এমন লাল আর কালোর মিশ্রণ কেনো?
লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৬৮
নিক ঠোঁট নাড়ায় সামান্য। এনির গলায় চুমু খেয়ে পড়িয়ে দিতে দিতে বলে,
” এই পাথরের কালো অংশটা আমার অন্ধকার মাফিয়া সাম্রাজ্য, আর ভেতরের লাল রক্তটা তোমার প্রতি আমার তীব্র, অবাধ্য আসক্তি। কখনো যাতে গলা থেকে খুলতে না দেখি।
