Home লাল শাড়িতে প্রেয়সী লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৫৮

লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৫৮

লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৫৮
Fatima Fariyal

এক অদ্ভুত আনন্দে ভরে উঠেছে আহাদ–রিদিতার রুমটা। বাতাসের মধ্যেই উচ্ছ্বাস টের পাওয়া যাচ্ছে। আজ আহাদের জন্মদিন, আর এই বিশেষ দিনেই জানতে পেরেছে, সে বাবা হতে যাচ্ছে। তাও একসাথে দুই সন্তানের। আনন্দের এমন দ্বিগুণ সুখ যে মানুষকে পাগল করে দিতে পারে, আহাদ তার জীবন্ত উদাহরণ। ততক্ষণে রুমে জড়ো হয়েছে আদনান, আহিয়া, শাহীন, নীলা। সবাই একসাথে এই মুহূর্তটা উপভোগ করছে। আহাদ রাজা আনন্দে পুরোপুরি উন্মাদ হয়ে উঠতেছে।।এই তো কিছুক্ষণ আগেই, গভীর রাতে সে তুহিনকে ফোন করে বসেছে। যেন বিজয়ের ঘোষণা দিচ্ছে,

“তুই না বলছিলি, আমার বয়স হয়ে গেছে অথচ এখনো বাপ হতে পারি নাই? এখন দেখ! একসাথে দুই সন্তানের বাপ হচ্ছি আমি!”
কণ্ঠে এমন গর্ব। এমন আত্মতৃপ্তি যেন জীবনের সবচেয়ে বড় যুদ্ধটা সে জিতে ফেলেছে। ওপাশ থেকে তুহিন ঠোঁট বাঁকিয়ে হালকা ঠাট্টার সুরে বলল,
“তুই সবে দুইটা আন্ডাকন্ডার বাপ হবি। আর আমি অলরেডি তিনটার বাপ।”
এক মুহূর্তেই আহাদের চোখে রাগের ঝিলিক দেখা দিল। সে গম্ভীর স্বরে বলল, “তুই বেআইনি কাজ করেছিস, তোর তো জেলে থাকার কথা। বাংলাদেশে ফিরেই আমি তোর নামে মামলা করবো।”
এমন কথা শুনে ঘরে উপস্থিত সবাই হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল আহাদের দিকে। কেউ বুঝতে পারছে না সে মজা করছে, নাকি সত্যিই সিরিয়াস। তুহিন অবাক হয়ে পাল্টা প্রশ্ন করল, “কেন? আমি জেলে যাব কেন? কী অপরাধ করেছি আমি?”

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

আহাদ একেবারে আইনজ্ঞের ভঙ্গিতে উত্তর দিল, “বাংলাদেশ পরিবার পরিকল্পনার ক্ষেত্র বলা হয়েছে দুটি সন্তানের বেশি নয়, একটি হলে ভালো হয়। আর তুই নিয়ম লঙ্ঘন করেছিস, তিনটা আন্ডাকন্ডা জন্ম দিয়েছিস। এটা একধরনের ক্রাইম! আমি আম্মাকে বলে তোর নামে মামলা ঠুকে দেব।”
এইবার আর কেউ নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সবাই একসাথে হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। আদনান ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি টেনে বিড়বিড় করে বলে উঠল,
“তবুও নিজের দুর্বলতা স্বীকার করবে না। জন্মগত ঘাড় ত্যাড়া!”
কিন্তু কথাটা আহাদের কানে চলে গেছে। সে জলন্ত দৃষ্টিতে তাকাল আদনানের দিকে। আদনান সঙ্গে সঙ্গে নড়েচড়ে বসে শিরদাঁড়া সোজা করে নিল। রিদিতা নিজের কোমল হাত দিয়ে আহাদের শক্ত হয়ে থাকা মুঠোটা চেপে ধরল। চোখের ইশারায় বোঝাল শান্ত হতে। অদ্ভুত ব্যাপার, এই সামান্য ইঙ্গিতেই আহাদের ভেতরের ঝড় থেমে গেল। সে গভীর শ্বাস নিয়ে তুহিনকে বলল,

“প্রস্তুত থাকিস। দেশে ফিরেই তোর ব্যবস্থা করবো। এখন ফোন রাখ।”
বলেই কল কেটে দিল। আহিয়া ছুটে এসে রিদিতাকে জড়িয়ে ধরল। চোখেমুখে খাঁটি আনন্দ।
“আউউউ! আমি গুলুগুলু বেবিদের ফুপি হবো! কী যে খুশি লাগছে আমার রিদি! বলে বোঝাতে পারবো না!”
রিদিতা লাজুক হেসে মাথা নিচু করল। গালে নতুন উজ্জ্বলতা ফুটে উঠেছে। আদনান দূর থেকে তাকিয়ে রইল আহিয়ার সেই উচ্ছ্বাসের দিকে। কিছু একটা ভেবে সে নিচের ঠোঁট কামড়ে হেসে ফেলল। একটা রহস্যময় হাসি।
কর্নারের সোফায় নীরবে বসে আছে নীলা। তার দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে আহাদের উপর। বাবা হওয়ার খুশিতে সে যেন সম্পূর্ণ বদলে গেছে। উঠতে বসতে রিদিতার দিকেই তার কড়া নজর। এমন এক মানুষ, যাকে ভাষায় ব্যাখ্যা করা যায় না। নীলা খুব ক্ষীণ করে হাসল। এই মুহূর্তটা তো তারও হতে পারতো। এই আনন্দ, এই উচ্ছ্বাস কেমন কুয়াশার মতো ধোঁয়াটে লাগছে। কিন্তু আশ্চর্যভাবে, যতটা যন্ত্রণা হওয়ার কথা ছিল, তার চেয়ে অনেক বেশি শান্তি অনুভব করছে সে। মনের ভেতর একা একা বিড়বিড় করল,

“আপনার এই খুশিটা। এই মুহূর্তের আনন্দটা আমি দেখতে পেরেছি, এটাই আমার চরম সৌভাগ্য। আপনাকে না পাওয়ার আক্ষেপ আমার আজীবন থাকবে। কিন্তু তবুও আমার কোনো অভিযোগ নেই আপনার প্রতি। আমি সুখী হই বা না হই, আমি চাই আপনি, আপনারা সারাজীবন এমনই সুখী থাকুন। আপনাদের জীবনটায় সবসময় সুখ বিরাজ করুক; এটাই আমার চাওয়া।”
একটা ভারী, অস্বস্তিকর নিশ্বাস বেরিয়ে এলো তার বুক থেকে। তারপর দৃষ্টি গেল শাহীনের দিকে। সে আহাদের সাথে কথা বলছে ঠিকই, কিন্তু মুখের সেই উজ্জ্বল হাসিটা কোথায় যেন হারিয়ে গেছে।
নীলার মনে পড়ে গেল শাশুড়ি সেই আদুরে আবাদারের কথা। আসার সময় মমতাজ বেগম নীলার হাত ধরে বলেছিলেন,

“আমি জানি, তোমাদের বিয়েটা কীভাবে হয়েছে। তবুও মা, জীবন তো কারো জন্য থেমে থাকে না। বয়স হয়েছে আমার, শরীরে অনেক অসুখ বাসা বেধেছে। হায়াত মওউতের তো কোনো নিয়শ্চয়তা নেই। কবে হায়াত শেষ হবে, কে জানে! ছেলেটার একটা পূর্ণ জীবন দেখে যেতে পারলে অন্তুর শান্তি পেত। একটা নাতি-নাতনীর মুখ দেখলে শান্তিতে মরতে পারতাম।”
নীলার বুকটা হু হু করে উঠল। কী অদ্ভুত এক সম্পর্কের বেড়াজালে সে আটকে আছে! শাহীনের সাথে হ্যাঁ-না বলে কথা বলতেও তাকে ভাবতে হয়, সেখানে সন্তান চাওয়ার কথা সে কল্পনাই বা করবে কীভাবে? যেখানে শাহীন এখনো আনিকার স্মৃতিতে প্রতিদিন ছটফট করে।
নীলাকে এভাবে শাহীনের দিকে পলকহীন তাকিয়ে থাকতে দেখে আহাদ হালকা করে হাসল। মনে মনে ভাবল, হয়তো নীলার মন এখন বিভ্রান্ত। আর সে তো এটাই চেয়েছিল। নীলা তাকে ভুলে নতুন অনুভূতির দিকে এগিয়ে যাক।
এখন মনে হচ্ছে, সেই সময়টা আর খুব দূরে নয়।

আদনান সবে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়েছে। সারাদিনের ধকল শরীর জুড়ে জমে আছে। মাথাটা ভার লাগছে, পেশিগুলো টানটান। এই মুহূর্তে যদি একটু আরাম করে শুতে পারত, তাহলে হয়তো ভেতরের অস্থিরতাটা কিছুটা কমত। মুখ মুছতে মুছতে সে আয়নার সামনে এসে দাঁড়াল।।আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে খানিক থমকে গেল। ফর্সা মুখে হালকা দাড়ি-গোঁফের রেখা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বেশ কয়েকদিন ক্লিন করা হয়নি, সেটাই চোখে পড়ছে। নিজেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিল সে। তখনই চোখের কোণে অন্য একটা উপস্থিতি টের পেল। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই দেখল, আহিয়া সোফার ওপর পা তুলে বসে আছে। দুই হাঁটু ভাঁজ করা, হাত দুটো হাঁটুর ওপর রেখে সে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে আদনানের দিকে। আদনানের ভ্রু দুটো কুঁচকে গেল। তোয়ালেটা চেয়ারের ওপর ছুড়ে ফেলে এগিয়ে গেল আহিয়ার দিকে। কপালে আলতো করে একটা ঠোকা দিল। একটু দুষ্টুমির সুরে বলল,

“এভাবে কী দেখছিস? আমার তো লজ্জা করছে।”
বলেই হেসে উঠল আদনান। কিন্তু আহিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝল, সে হাসির মুডে নেই। ঠোঁটের ভেতরটা কামড়ে ধরে আছে। একটু আড়চোখে তাকিয়ে আছে। মুখে অদ্ভুত এক জেদ আর অভিমান একসাথে ভর করেছে। আদনানের হাসি এবার মিলিয়ে গেল। ভেতরে হালকা চিন্তার ঢেউ। সে দ্রুত তার পাশে বসে পড়ল। কণ্ঠ নরম করে জিজ্ঞেস করল,
“কী হয়েছে আহি? তুই ঠিক আছিস তো?”
একটু থেমে আবার বলল,
“শরীর খারাপ লাগছে?”
বলতে বলতে কপালে হাত রাখল। কিন্তু দেখল তাপমাত্রা স্বাভাবিকই। তবু অস্বস্তি কাটল না আদনানের। চোখে চোখ রেখে বলল,

“কী হয়েছে? হুম? কী ভাবছিস? আমাকে বল।”
আহিয়া ঠোঁট ফুলিয়ে ফেলল। কিছুক্ষণ পর সাহস যুগিয়ে বলেই ফেলল, “আমিও বেবে চাই।”
এক মুহূর্তের জন্য আদনান স্থির হয়ে গেল। কথাটা বুঝতে তার কয়েক সেকেন্ড লাগল। চোখে বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে রইল সে। আহিয়া এবার পুরো শরীর ঘুরিয়ে তার দিকে মুখ করল। আগের চেয়ে একটু জোর দিয়ে বলল,
“আমিও একটা বেবি চাই। আমার ও বেবি লাগবে।”
“বেবি দিয়ে তুই কী করবি?”
আহিয়া চোখ বড় বড় করে তাকাল।
“মানুষ বেবি দিয়ে কী করে?”
“এত কিছু আমি জানি না। আগে তুই বড় হ। তারপর এসব নিয়ে ভাবা যাবে।”
আহিয়া সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করল, “আমি ছোট?”
আদনান মাথা নেড়ে বলল,

“ছোট না তো কী? দিনে চার কদম হাঁটলে তিন কদমই উষ্ঠা খেয়ে পড়ে যাস। আগে নিজেকে সামলাতে শিখ, বেবি-টেবির কথা পরে হবে।”
এই কথায় আহিয়ার চোখ দুটো জ্বলে উঠল। কণ্ঠে অভিমান মিশিয়ে বলল, “আপনি এমন কেন আদনান ভাই? আমি ভেবেছিলাম আপনি খুশি হবেন এই কথা শুনে।”
মুহূর্তেই আদনানের মুখের রঙ বদলে গেল। ফর্সা মুখটা হালকা লাল টকটকা হয়ে উঠল। সে একটু ঝুঁকে আহিয়ার মুখের কাছে এসে বলল,
“প্রথমত, আদনান ভাই বলতে আমি বারণ করেছিলাম।”
একটু থেমে আরও গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“দ্বিতীয়ত, তুই এখনো ছোট। তোর শরীর এখনো এত বড় দায়িত্ব নেয়ার মতো তৈরি হয়নি। আমি তোকে নিয়ে কোনো ঝুঁকি নেব না।”

আহিয়া ঠোঁটে ঠোঁট চেপে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। এবার তর্জনী দিয়ে আদনানের বুক ঠেলে সড়িয়ে দিল। নিজে উঠে গিয়ে বিছানায় শুয়ে চাদর টেনে মুরি দিল। কণ্ঠ উঁচু করে বলল,
“আপনি সোফায় থাকবেন। খবরদার আমার কাছে আসবেন না।”
একটু থেমে আবার যোগ করল,
“আমি তো এখনো ছোট। যেদিন বুঝবেন আমি বড় হয়েছি, সেদিন আসবেন।”
আদনান ঠোঁট কামড়ে হেসে ফেলল। আহিয়ার এই অভিমানী স্বভাবের ব্যাপারে সে অবগত। ছোটবেলা থেকেই রাগ, অভিমান করলে এভাবেই চাদরের নিচে লুকিয়ে পড়ে। অবশ্য এক ঘুম দিলেই আবার সব ভুলে যায়। আদনান ধীরে এসে পিছন থেকে আহিয়ার কোমর টেনে নিজের সাথে মিশিয়ে নিল। কানের কাছে মুখ নিয়ে কণ্ঠ নিচু করে বলল,

“আমি বলেছি বাবুর আম্মু হওয়ার মতো বড় হসনি।”
একটু থেমে মুচকি হেসে যোগ করল,
“কিন্তু বাবুর আব্বুকে সামলানোর মতো বড় তো হয়েছিস।”
আহিয়া চাদরের ভেতর থেকেই বলল, “দূরে থাকেন।”
আদনান আরও কাছে ঘেঁষে এল। ঘাড়ে থুতনি ঠেকিয়ে বলল, “সম্ভব না।”
“কেন সম্ভব না?”

লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৫৭

আদনানের কণ্ঠ এবার আরও নরম, আরও গভীর।
“কারণ তুমি আমার অস্তিত্বে মিশে আছো। আলাদা হওয়া সম্ভব না।”
আহিয়া সরে যেতে চাইল। কিন্তু পারল না। আদনান তাকে ছাড়ল না। বরং পুরোপুরি আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল, যেন এই আলিঙ্গনেই সব অভিমান গলে যাবে।

লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৫৯