লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি পর্ব ৩২
অহনা রহমান
রাজ বসে আছে নিরালায়। একাকী বিষন্ন হয়ে। মনে তার এক আকাশসম অনুশোচনা। এক আকাশসম ভালো থাকার ইচ্ছা। আবার ভীষণ রাগ। এই সমস্তের মিশেলে প্রচন্ড ডিস্টার্ব সে। রাগের বশে নেওয়া কোনো সিদ্ধান্তই ভালো ফলাফল বয়ে আনে না। তা রাজ এখন ভালোই বুঝছে। দিন-রাত রুহির সঙ্গে অশান্তি। এমনকি এখনোও পর্যন্ত সে রুহিকে টাচ পর্যন্ত করতে পারেনি। নাম মাত্র একটা বৈবাহিক সম্পর্কে তারা জড়িয়ে আছে৷ তাদের ভেতরে মুলত কিছুই নেই। রাজ যখনই রুহির কাছে যেতে চেয়েছে, রুহি ততবারই রাজকে দুরে সরিয়ে দিয়েছে। দোহাই দিয়েছে, হিয়াকে নিঃস্ব করতে পারলেই সে রুহিকে পাবে। আর নাহলে না। এমনকি ওরা যখন হানিমুনে গেলো, তখনও ওদের মাঝে কিছুই হয়নি৷ বাদবাকি যা ছিলো সবটাই লোক দেখানো। রুহির বলা কথাটা রাজ প্রথম দিকে সহজ ভাবে মেনে নিলেও সময়ের সাথে সাথে, সে ভালোই বুঝতে পারছে ব্যাপারটা মোটেও সহজ নয়৷ আর যেখানে হিয়ার সাথে তার ভাইয়ের নাম জড়িয়ে আছে, ব্যাপারটা অসম্ভব বলা যায়৷
রাজ নদীর ধারে বসে সিগারেট ফুঁকছে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে ধরনীতে। অথচ রাজের সেদিকে খেয়াল নেই। সে আছে ভাবনার রাজ্যে। রাজের দৃষ্টি পানির দিকে। এখানে এসেছে কখন তার খেয়াল নেই৷ ওর পাশে পড়ে আছে, অগণিত সিগারেট। এই দুনিয়ায় সবচেয়ে অভাব হচ্ছে, শান্তির অভাব। একটুখানি সুখের অভাব। এই মুহুর্তে রাজের একটু সুখের প্রয়োজন। শান্তিতে শ্বাস নেওয়ার প্রয়োজন। নাহলে যে দুনিয়ায় বেঁচে থাকা টাও বড্ড কঠিন হয়ে যাচ্ছে তার কাছে৷
ভাইয়ের সাথে হিয়াকে দেখলেই তার অন্তরে জ্বলন শুরু হয়। হৃদয়টা পুড়ে ছাড়খাড় হয়ে যায়। সে জানে না এই ব্যাথার কারণ কি! একটা সময় যে মেয়েটাকে কষ্ট দিতে এতো প্লান বানালো। যে মেয়েটাকে এতো ছোট করলো, তাকে দেখেই আজ সে মুগ্ধ হয়। আজ তার কাছেই তার হাত পেতে টাকা চাইতে হয়৷ কি অদ্ভুত সব! আচ্ছা নিয়তি কি সব সত্যিই ফিরিয়ে দেয়? হয়তো দেয়। এই যে রাজের মনে যত অশান্তি সবই তো হিয়াকে ঘিরে। হিয়াকে দেওয়া কষ্ট গুলো সময়ের সাথে সাথে তার জীবনে ফিরে এসেছে৷ অশান্তির অনলে দগ্ধ হয়ে যাচ্ছে সে।
হিয়াকে দেখে রাজ কষ্ট পায়। সেই কষ্ট নিয়ে যখন রুহির কাছে যায়, তখন সে আগুনে ঘি ঢালার মতো করে রুহি আরও কথা শুনিয়ে দেয়। অথচ রুহির উচিৎ ছিলো, রাজের দুঃসময়ে পাশে থাকার।
এরপর রাজ বেকার! এতোদিন না-হয় সিঙ্গেল ছিলো, ভাইয়ের টা খেতো। এখন বউ হয়েছে, বউ নিয়েও কি ভাইয়ের ইনকাম খাওয়া যায়? আর বউ যদি মানুষ হতো তাহলে তো হতোই! একটা জলহস্তনী, কালনাগিনী বিয়ে করে তার জীবনের তেরোটা বেজে গেছে। একথা মনে পড়তেই রাজ হাতের সিগারেটটা ছুঁড়ে মারলো দুরে। রাগে তার মাথা ফেটে যাচ্ছে এমন অবস্থা। খানিকটা সময় পর রাজ নিজেকে ঠিক করে নিলো। ধূসর রঙা শার্টের হাতাটা গুটিয়ে নিলো। ডান পাশে থাকা সিগারেটের প্যাকেট থেকে আরেকটা সিগারেট বের করে জ্বালিয়ে নিলো। ঠোঁটে গুঁজে ফের তাকালো নদীর স্বচ্ছ পানির দিকে।
রাজের জীবনের অশান্তির অন্তিমে আছে, যৌবনের নেওয়া একটা ভুল সিদ্ধান্ত! বউয়ের ভালোবাসা পাওয়ার জন্য সে হিয়াকে রে ইপ করাতে চেয়েছিলো৷ এটা ছিলো তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল। রাজ ঘুনাক্ষরেও বুঝতে পারেনি, রুহি এটা নিয়ে তাকে ব্লাকমেইল করবে। বুঝলে কি আর করতো সে? যার জন্য করি চুরি, সেই বলে চোর! রাজের ব্যাপারটা অনেকটাই ওরকম। রুহিকে খুশি করতেই তো সে এমনটা করতে চেয়েছিলো। আর সেই রুহিই কি’না তাকে ব্লাকমেইল করে!
রাজ ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। নদীর জলে নিজের মুখের অবয়বটা দেখলো সে। ভীষন হাসি পেলো নিজেকে দেখে৷ এই রাজ এবং কয়েক মাস আগের রাজের মধ্যে কি পরিমাণ তফাৎ ছিলো। তা তো ওকে দেখলেই বোঝা যায়৷ রাজ নিজের অবয়বের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো,
“এভাবে নিঃশেষ হওয়া যাবে না রাজ। তুই তো এমন ছিলি না। যেকোনো একটা তোকে বেছে নিতেই হবে। এখন তুই ভাববি, তুই কোনটা বেছে নিবি।
সেই ভাই? যার কাছে ছোটবেলা থেকেই হেরে এসেছিস তুই। হিয়া যদি নাফির সাথে সংসার করে তাহলে নাফি এবারেও জিতে যাবে রাজ।
আবার হিয়া কিন্তু নির্দোষ ছিলো। তাকে ঠকাতে গিয়েই তোর জীবনে আজ এতো কিছু। তুই কি ভাবিস, তুই হিয়ার ক্ষতি করলে তোর ভাই তোকে ছেড়ে দেবে?
আবার দেখ! তুই এসব কার জন্য করবি? তোর সো কল্ড ওয়াইফ? যে তোকে একফোঁটা দাম দেয় না? তুই কি ভাবিস, ওর স্বার্থসিদ্ধি হয়ে গেলে ও তোকে নিজের কাছে রাখবে?”
রাজ শেষের কথা গুলো বলে নিজেই হেঁসে ফেললো। আনমনে পুনরায় বলে উঠলো,
“বোকার স্বর্গে বাস করছিস রাজ! রুহি তোকে এক সেকেন্ডে ছেড়ে দেবে৷”
রাজ কিছুক্ষণ ভাবুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো নিজের দিকে। নিজেকে আজ ভীষণ একা লাগছে তার। কার কাছে যাবে? কাকে বলবে তার মনের কথা? কে দিবে একটু ভালো বুদ্ধি? সে যে আজ চরম অসহায়।
রুহি বাপের বাড়িতে এসেছে। একাই এসেছে সে। তখন রাত। সবাই খাবার টেবিলে বসে আছে। রুহি বসেছে নিজের বাবার পাশে। এই বাড়িতে আসার পরে, এই প্রথম তার বাবার সাথে দেখা হলো। কামরুল হাসান মেয়েকে দেখেই বললেন,
“কি মা? কেমন আছিস?”
রুহি হেঁসে জবাব দিলো,
“আছি ভালোই। তোমার শরীরের কি অবস্থা?”
কামরুল হাসান স্বাভাবিকভাবেই বলে উঠলেন,
“যাচ্ছে ভালোই। হিয়া মামনীর কি অবস্থা?”
হিয়ার কথা শুনেই রুহির মাথায় আগুন জ্বলে উঠলো। কেন এই হিয়া ছাড়া কি আর কিছু নেই জীবনে? রুহি তো তার মেয়ে। রুহির সম্পর্কে তো সে চাইলেই আরও কিছু প্রশ্ন করতে পারতো। কিন্তু না! সে করলো না। নিজের বাবার উপর বিরক্ত হলো রুহি। সে রাগে সাপের মতো ফোঁস ফোঁস করতে লাগলো। বিষদাঁত থাকলে সে এখনই কাম ড়ে দিতো। ঠিক এই কারনেই রুহি হিয়াকে দেখতে পারে না। এখন হিয়া না থাকলে নিশ্চয়ই তার বাবা আরও কিছু বলতো তাকে। রুহি নিজের রাগ সংবরন করে নিলো মুহুর্তের মধ্যেই। মেকি হেঁসে জানালো,
“হিয়া ভালোই আছে৷ সংসারে রাজ করছে সে। আমি আর কি! সে বড়বউ তাছাড়া তার স্বামীর ইনকামে সংসার চলে। দাপটে পা মাটিতে পড়ে না।”
কামরুল হাসান একদিকে খুশি হলেন। হিয়া ভালো আছে এটাই তো অনেকে। সে তার ভাইকে দেওয়া কথা তো রাখতে পেরেছে। এটাই অনেক! তবে তিনি বিচলিত হলেন রুহির কথার ধরন শুনে।
“এভাবে বলছিস কেন মা? হিয়ার সাথে ঝামেলা হয়েছে? দাপট মানে? হিয়া তো এমন মেয়ে না।”
রাগটা আর নিজের মধ্যে রাখতে পারলো না রুহি। টেবিলের উপরে থাকা কাঁচের গ্লাসটা হাতে নিয়ে, সজোরে ছুঁড়ে মারলো ফ্লোরে। কাঁচ ভাঙার বিকট শব্দ হলো ডাইনিংয়ে। সবাই অবাক হতবাক! তারমধ্যেই রুহি নিজের বাবার উপর চেঁচিয়ে বললো,
“কেন হিয়া কি ফেরেস্তা? ওর ভুল হতে পারে না? ও করতে পারে না কিছু? বাবা তুমি এমন ভাবে কথা বলো, মনে হয় আমি তোমার মেয়ে না৷ আমার তো মাঝেমধ্যে মনেহয়, হিয়া তোমারই মেয়ে। ওর বাপ তুমিই আর ওর মা তোমার স্ত্রী৷ অবৈধ স্ত্রী যাকে বলে!”
রুহির কথা শেষ হতে না হতেই, ঠাস করে একটা চড় পড়লো ওর মুখের উপর। চড়টা মেরেছে ওর মেঝো চাচা। রুহির মা ততক্ষণে এগিয়ে এসেছে মেয়ের কাছে। তিনিও প্রচন্ড ক্ষেপে গিয়ে রুহিকে থাপ্পড় মারলো। কামরুল হাসান মাথা নিচু করে বসে আছেন। তিনি পাথর বনে গেলেন। হেলেনা তরকারির একটা বল নিয়ে আসছিলেন ডাইনিংয়ে। রুহির শেষ কথাটি শোনা মাত্র ওনার হাত থেকে বল টা পড়ে গেল মেঝেতে৷
হিয়া তখন গভীর ঘুমে বিভোর। রাত তখন অনেক বেশি। হঠাৎ কারো অস্পষ্ট ডাকে হিয়া নড়েচড়ে উঠলো। ঘুমটা হালকা হতেই শুনতে পেল, স্পষ্ট নাফির কন্ঠস্বর।
“এই ময়না ওঠো না।”
হিয়া পিট পিট করে তাকালো। অমনি নাফি হিয়ার ঠোঁটে টপ করে একটা চুমু খেলো। হিয়ার নাকে নাক ঘষে দিলো। আদুরে স্বরে বলে উঠলো,
“ঘুম ভেঙেছে? বাপ্রে! সেই কখন থেকে ডাকছি।”
হিয়ার ঘুমের ঘোর তখনও কাটেনি ভালো। সে ঘুম ঘুম কন্ঠে আওরালো,
“কিছু হয়ছে? এতো রাতে কেন ডাকছেন?”
নাফি হিয়ার দুই হাত টেনে ধরলো। বসিয়ে দিলো হিয়াকে। হিয়ার দুই গালে হাত রেখে বলল,
“তুমি না বলেছিলে, রাতের শহর দেখার খুব ইচ্ছে তোমার? চলো আজকে রাতের শহর দেখবো আমরা।”
নাফির মুখে এমন কথা শুনে হিয়ার ঘুমটা উড়ে গেল। দু’দিন আগেই কোনো এক কথার মাঝে হিয়া বলেছিলো, তার রাতের আকাশ দেখার খুব ইচ্ছে। কথাটা সে সাধারণ ভাবেই বলেছিলো। ঘুনাক্ষরেও বুঝতে পারেনি নাফি তার কথাটা সিরিয়াসলি নিবে। হিয়াকে চুপ থাকতে দেখে নাফি খাট থেকে নেমে গেল। হিয়ার দু-হাত ধরে টেনে নিচে নামালো। হিয়ার ঘুমের রেশ পুরোপুরি কাটেনি তখনও। হিয়া স্থির হয়ে দাঁড়ালো না। নাফির বুকের কাছের শার্ট ধরে দাঁড়ালো। সুন্দর একটা স্বপ্ন দেখছিলো। ঘুমের মধ্যে কার বাইরে যেতে ইচ্ছে করে? হিয়ার ও করলো না।
“আজকে যাবো না। অন্যদিন যাবো হ্যাঁ?”
নাফি শুনলে তো হিয়ার কথা। হিয়ার কথা শেষ হতেই নাফি হিয়াকে পাঁজা কোলে করে তুললো। হিয়া তখন অনুভব করলো তার অবস্থান শুন্যে। ঘুমের যেটুকু রেশ ছিলো তা পুরোপুরি হাওয়া হয়ে গেল। সে সম্পুর্ন চোখ তুলে তাকালো। নিজেকে নাফির কোলো আবিষ্কার করলো সে। তাতে বেশ লজ্জা পেল মেয়েটা। নাফির গলাটা জড়িয়ে ধরে বলল,
“আপনি কি পাগল? এমন করে কেউ? এখন মাঝরাতে কে বলেছে ঘুরতে যেতে?”
নাফি তখন হিয়া সমেত সিঁড়ি দিয়ে নামছে। নাফি সাবধানে হিয়াকে নিয়ে নামতে লাগলো। এবং সেই সাথে বলল,
“আমি পাগল__তাও শুধুমাত্র আপনার জন্য মহারানী। আর মাঝরাতে আমার বউয়ের ঘোরার ইচ্ছে। বউয়ের ইচ্ছে তো আমাকে মিটাতেই হতো। তাই এখন ঘুরতে যাচ্ছি। আপনার কোনো সমস্যা?”
লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি পর্ব ৩১
হিয়া কিছু বলার আগেই ওরা ড্রয়িংরুমে এসে পৌঁছালো। ড্রয়িংরুমে রাজকে বসে থাকতে দেখে নাফি হিয়া দুজনেই আশ্চর্য হলো। তবে নাফি হিয়াকে কোল থেকে নামালো না। রাজকে সম্পুর্ন ইগনোর করে, না দেখার ভাণ করে চলে গেল। কিন্তু হিয়া তা করলো না। তার মাথায় দুষ্টু একট বুদ্ধি চাপলো। রাজ তো হিয়ার দিকেই তাকানো ছিলো। হিয়া তখন রাজের দিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসলো। বিয়ের দিনের মতো করে, রাজের দিকে দেখালো নিজের মিডল ফিঙ্গার। ইশারায় বলল,
“মুড়ি খা তুই।”
