Home কি করিলে বলো পাইবো তোমারে কি করিলে বলো পাইবো তোমারে পর্ব ২১

কি করিলে বলো পাইবো তোমারে পর্ব ২১

কি করিলে বলো পাইবো তোমারে পর্ব ২১
মুনমুন বুড়ি

শুরু হলো ছটফটানি! শ্বাস নেওয়ার জন্য মরিয়া সংগ্রাম। দম বন্ধ হয়ে আসতে লাগল ধীরে ধীরে। একই সঙ্গে মস্তিষ্কে হানা দিল জীবনের সমস্ত স্মৃতি! সেই—
হাসিমুখের শৈশব, বৃষ্টিভেজা বিকেল, মায়ের কোলের উষ্ণতা… সবকিছু যেন চোখের সামনে ঝলসে উঠছে একের পর এক।

বুকটা উঠানামা করছে অসহ্য যন্ত্রণায়। সাহায্যের জন্য গলা দিয়ে চিৎকার করতে মন চাইছে, কিন্তু চিৎকার করার শক্তিটুকুও যেন হারিয়ে গেছে। চারপাশটা কেমন ঝাপসা… ভারী… অন্ধকার।
ঠিক তখনই— কেউ একজন মিহির পা দুটো শক্ত করে আঁকড়ে ধরল।
মৃত্যুর দোরগোড়ায় পৌঁছে যাওয়া মিহি খড়খড়ে মরুভূমিতে একফালি বৃষ্টির মতো জীবনের অন্তিমক্ষণে একটু আশার আলো দেখতে পেল। প্রাণ ভরে শ্বাস নিল মেয়েটা।
হঠাৎ তার শরীরটা নিচের দিকে টেনে নামানো হলো। গলার উপর চাপটা আলগা হতেই মিহি হাওয়ার জন্য নিশ্বাস নিতে হাঁসফাঁস করতে করতে কাশতে লাগল।
চোখ দুটো আধখোলা। দৃষ্টি এখনো ঝাপসা। তবু সে অনুভব করতে পারছে— কেউ একজন খুব কাছে… খুব পরিচিত এক উষ্ণতা তাকে ঘিরে আছে।
কানে ভেসে এল চাপা, উদ্বেগ মেশানো কণ্ঠস্বর—

— মিহি, চোখ খোল।
গলাটা শুনেই মিহির বুকটা কেঁপে উঠল।
এই কণ্ঠস্বর মিহি চেনে, খুব পরিচিত এই কণ্ঠস্বর ওর কাছে। কাঁপতে থাকা চোখের পাতা আস্তে তুলল মিহি। সামনে ভেসে উঠল ভীত, আতঙ্কগ্রস্ত এক মুখ। মিহিকে চোখ খুলতে দেখে অভ্র বলে উঠল—
— মি…হি!
কেঁপে উঠল অভ্রের গলা। নাসরিন আহমেদ অভ্রের হাতে থাকা পানিটা দিয়ে বললেন—
— আব্বু, ওকে পানিটা দে।
অভ্র পানিটা নিয়ে মিহির মুখের সামনে এনে বলল—
— নে, একটু পানি খা।
পানি পেতেই কালবিলম্ব না করে পানিটা খেয়ে নিল মিহি। কিছু মুহূর্ত সেইভাবেই কেটে গেল। হঠাৎ অভ্র মিহির দুই বাহু ধরে মিহিকে সোজা করে নিজের মুখোমুখি করে রাগী সুরে বলে উঠল—

— মরার শখ জাগছে? মরবি তুই? এত সহজে মরবি? শুনে রাখ, এত সহজে মুক্তি পাবি না তুই। এখনো তো আরো অনেক সত্যি জানা বাকি আছে তোর। সামান্য এতটুকু জেনেই মরতে যাচ্ছিলি?
— আহ, অভ্র, মেয়েটাকে এইভাবে বকছিস কেন?
— আম্মু, তুমি চুপ করো। ওকে আজ জবাব দিতেই হবে— ও কেন এমন করল? কী হল, চুপ করে আছিস কেন? বল, কেন এমন করেছিস?
কথাগুলো বলেই অভ্র মিহির বাহু ধরে ঝাঁকিয়ে উঠল। মিহি অশ্রুসিক্ত চোখে অভ্রের দিকে তাকিয়ে আহত সুরে বলল—
— অভ্র ভাইয়া… আমার জন্যই কি আমার নিজের মা-বাবা মারা গিয়েছিল?
মুহূর্তেই অভ্রের বুক ধক করে উঠল।
মিহি পুনরায় বলল—

— আমি কি অপয়া? আম…
আর কিছু বলতে পারে না মিহি। এর আগেই মিহিকে বুকের সাথে শক্ত করে চেপে ধরল অভ্র। একটা আশ্রয়স্থল পেয়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল মিহি। ছেলে আর ছেলের বউয়ের ঘনিষ্ঠ মুহূর্তে ওদের একা ছেড়ে দিয়ে সেখান থেকে সরে এলেন নাসরিন আহমেদ।
অভ্র মিহির মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলল—
— কাঁদবি না, মিহি। এখন তোর সবকিছুর ওপর শুধু আমার অধিকার। তুই কাঁদলেও তার কারণ শুধু আমি হব। তুই এইভাবে অন্য কারো জন্য নিজের চোখের জল নষ্ট করতে পারিস না। এটাই শেষবার— আর কখনো আমি ছাড়া অন্য কারো জন্য তুই কাঁদবি না। শুধুমাত্র যেদিন আমার লাশ তোর সামনে আসবে, সেদিনই তুই কাঁদবি। এছাড়া কাঁদা তোর জন্য নিষিদ্ধ।

অন্ধকার রুম। পুরো রুমের মধ্যিখানে একটি চেয়ারে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় পড়ে আছে কেউ একজন। তার মাথার ওপর ঝুলছে ছোট্ট একটি টিউবলাইট। লোকটি অচেতন, মুখশ্রী জুড়ে নিষ্ঠুরতার চিহ্ন।
হঠাৎই রুমের বাইরে কয়েক জোড়া পায়ের শব্দ পাওয়া গেল— তারা এই দিকেই আসছে। শব্দ করে রুমের দরজাটা খুলে গেল। দরজা খুলতেই কয়েকজন লোক অচেতন লোকটির সামনে এসে থামল। কেউ একজন তড়িঘড়ি করে একটা চেয়ার এনে দিল। সেই চেয়ারে বড় দাম্ভিকতার সাথে পা তুলে বসল কেউ একজন।

পরনে তার কালো ওভারকোট, হাতে রোলেক্সের ঘড়ি। তার এক চোখ প্রাচীন জলদস্যুদের মতো কাপড় দিয়ে আবৃত। লোকটি হাতের ইশারায় কিছু বোঝাতেই একজন লোক বালতিভর্তি পানি এনে অচেতন লোকটির দিকে ছুড়ে মারল।
মুখে পানির ছিটা পড়তেই পিটপিট করে চোখ খুলল লোকটি। হেলে থাকা মাথা সোজা করে সামনে তাকাতেই এক ঝাপসা অবয়ব দেখতে পেল। কয়েকবার পলক ঝাপটাতেই লোকটির মুখশ্রী পরিষ্কার হলো।
লোকটিকে দেখতেই কৌশিকের মুখ থেকে বেরিয়ে এলো—

কি করিলে বলো পাইবো তোমারে পর্ব ১৯+২০

— ম… মার্কো…
মার্কো মুখে এক হাত বুলিয়ে মুচকি হেসে বলল—
— হে ব্যাডি লং টাইম নো সি

কি করিলে বলো পাইবো তোমারে পর্ব ২২