Home ফিরে এসো অনুরাগে ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৮

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৮

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৮
নওরিন কবির তিশা

প্রকৃতির রুদ্রতপ্ত ললাটে আজ এক নতুন তিলক। জীর্ণ পুরাতনকে বিদায় জানিয়ে আজ নববর্ষের প্রথম প্রভাত। চারদিকে অকালবৈশাখীর চঞ্চলতা নেই, বরং তপ্ত রোদেও এক অদ্ভুত সজীবতা মিশে আছে বাতাসে। আজ বাঙালির প্রাণের উৎসব, মাটির টানে ঘরে ফেরার আর নতুন করে বাঁচার শপথ নেওয়ার দিন। বসন্তের শেষ ধুলিকণা ঝেড়ে ফেলে প্রকৃতি আজ নব সাজে সেজেছে, যেন বহুকাল আগের কোনো হারানো সুর আবার নতুন করে বেজে উঠেছে প্রভাতী সেই সুরে।

তৃষার জন্য আজকের দিনটা একটু অন্যরকম। কলেজের ফাংশন, তাই ব্যস্ততার শেষ নেই। দর্পণের সম্মুখে দন্ডায়মান তৃষা নিজের প্রতিবিম্ব দেখে সে নিজেই যেন কিছুটা দ্বিধান্বিত। শাড়ি পরার অভ্যাস খুব একটা নেই, কিন্তু আজ তো নিয়মের বাইরে যাওয়ার দিন। তার পরনে শুভ্র রঙা লাল পেড়ে শাড়ি।কপালে একটা ছোট্ট লাল টিপ আর হাতে রেশমি চুড়ির রিনঝিন শব্দ। হাঁটুসম কৃষ্ণ কালো তার কেশরাজ আজ বাঁধনহারা তাতে নেই কোনো কৃত্রিমতার ছোঁয়া,কেবল একগুচ্ছ সুগন্ধিত বেলি ফুলের গাজরা শোভিত সেথায়।
সদ্য ফোটা গোলাপের পাপড়ির ন্যায় ঠোঁট জোড়া আবৃত মৃদু রঞ্জকে।পাশেই দাড়িয়ে ছোট্ট টুইংকেল। তার তুলতুলে দেহটাও আবৃত তৃষা মতোই শুভ্র রঙা লাল পেড়ে শাড়িতে। সাজগোজ হাতির চুড়ি চুলের গাজরা সবমিলিয়ে ‌এ যেন তৃষারই এক ক্ষুদ্র সংস্করণ। তৃষা মুচকি হেসে টুইংকেলের সম উচ্চতায় বসে তার তুলতুলে চোয়ালে শব্দ করে চুমু খেল।

—-‘তোমাকে আজ ভীষণ আদুরে লাগছে কিউটি পাই।
টুইংকেল কোমরে হাত দিয়ে একটু ঢং করে দাঁড়িয়ে বলল,,,
—-‘বানি! দেখো দেখো, আমি একদম তোমার মতো হয়েছি না? এই দেখো তোমার মতো চুড়ি, তোমার মতো ফুল! শুধু তোমার মতো ওই কপালে গোল লাল রঙের ওটা (টিপ) বসছে না কেন আমার?
তৃষা হাসতে হাসতে ড্রয়ার থেকে একটা বড় লাল টিপ বের করে টুইংকেলের ছোট্ট কপালে বসিয়ে দিয়ে বলল,,
—-‘এই নাও! এখন তো তুমি পুরো আমার ডুপ্লিকেট।
খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো টুইংকেল। মিষ্টি স্নিগ্ধ সেই হাসির লহরী প্রতিধ্বনিত হলো কক্ষ জুড়ে। তার হাসিতে মৃদু হাসলো তৃষাও।

কিছুক্ষণের মাঝে এই তৃষা আর টুইংকেল একে অন্যের হাত ধরে দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নাম ছিল উদ্দেশ্য ড্রয়িং রুম। সিঁড়ির ধাপগুলোতে ওদের নূপুরের নিক্বণ আর চুড়ির রিনঝিন শব্দ মিলেমিশে এক অপূর্ব সুরের সৃষ্টি করছিল।
আর্য নিচে দাঁড়িয়ে ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছিল। তৃষার কলেজে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান হওয়ায় তৃষা আর টুইংকেল কে নিয়ে যাবে সে নিজেই।পরনে তার নেভি ব্লু রঙের পাঞ্জাবি, হাত দুটো ফোল্ড করা।সে বরাবরের মতোই সময় নিয়ে বেশ সচেতন। কিন্তু সিঁড়িতে পায়ের শব্দ পেতেই সে যখন ঘাড় ফেরাল, মুহূর্তেই তার চোখের মণি স্থির হয়ে গেল।
তৃষার সেই শুভ্র বসন আর লোহিত পাড় যেন শরতের মেঘে গোধূলির রাঙা আলোর প্রতিচ্ছবি।তার উন্মুক্ত কেশদামের মেঘবরণ আঁধারে বেলি ফুলের শুভ্রতা এক মায়াবী বৈপরীত্য তৈরি করেছে। আর্যর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আজ যেন পথ হারাল। সে এতদিন তৃষাকে কেবল এক চঞ্চল, ক্ল্যামজি মেয়ে হিসেবে দেখে এসেছে; কিন্তু আজকের এই ধ্রুপদী সাজে তৃষাকে দেখে তার দৃষ্টি থমকে গেল মুহূর্তেই।
ললাটের সেই সিন্দুরবরণ টিপ আর আঁখিপল্লবে মাখা কাজলের স্নিগ্ধতা আর্যর হৃদস্পন্দনে এক পশলা অচেনা শিহরণ জাগিয়ে দিয়ে গেল।আর্যকে এভাবে স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখে তৃষা কিছুটা কুঁচকে গেল। সে আমতা আমতা করে বলল,,

—-‘দেরি হয়ে গেল খুব? আসলে আমিতো শাড়ি পড়তে পারি না আর টুইংকেলকে রেডি করতে গিয়ে…
আর্যর ঘোর কাটল। সে নিজের গাম্ভীর্য ফিরে পাওয়ার এক ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়ে হালকা কেশে গলা পরিষ্কার করল। অতঃপর হাত ঘড়িটা ঠিক করতে করতে একটু আড়চোখে তাকিয়ে বেশ রাশভারী স্বরে বলল,,
—-‘আপনাকে তো অনেক আগেই রেডি হতে বলেছিলাম। টাইম ম্যানেজমেন্টের ওপর আপনার কোনো দিনও দখল আসবে না। তবে…
সে একটু থামল। তার চোখের সেই কঠোরতা যেন এক মুহূর্তের জন্য নরম হলো; গভীর কন্ঠে সে বলল,,
—-‘তবে, এই বাঙালি সাজটা আপনাকে বেশ সুট করেছে। ইউ আর লুকিং… আই মিন, ডিসেন্ট। আর টুইংকেল? আমার লিটিল প্রিন্সেস টাকে তো আজ একদম মিনি-বানি মনে হচ্ছে।
টুইংকেল খুশিতে আর্যর পা জড়িয়ে ধরে বলল,,

—-‘পাপা! বানি বলেছে আমাকে নাকি ফেইরি লাগছে! তুমি বলো বানিকে বেশি কিউট লাগছে না? তুমি দেখেছো বানির চুলে কত সুন্দর ফুল?
আর্য ম্লান হাসল। সে তৃষার চোখের দিকে সরাসরি না তাকিয়েও যেন তার ওই কাজলরাঙা আঁখির মায়া অনুভব করতে পারছিল। সে দ্রুত গাড়ির চাবির রিংটা আঙুলে ঘোরাতে ঘোরাতে বলল,,
—-‘ওকে, ডান। কমপ্লিমেন্ট সেশন শেষ। এখন জলদি গাড়িতে উঠুন, নইলে পহেলা বৈশাখের জ্যামে কলেজের ফাংশান শেষ হয়ে যাবে আর আপনাকে গেটের সামনে দাঁড়িয়েই নববর্ষ পালন করতে হবে। লেটস মুভ!
আর্য এগিয়ে যেতেই তৃষা মনে মনে গাল ফুলিয়ে ভাবল,,
—— ‘অসহ্য! লোকটা কি একবারও মন খুলে বলতে পারল না যে আমাকে সুন্দর লাগছে? শুধু ডিসেন্ট বলেই দায়িত্ব শেষ? আস্ত একটা আনরোম্যান্টিক রোবট!

তৃষা পরক্ষণেই নিজের ভাবনায় নিজেই জিভ কাটল। মনের গহীনে একরাশ অস্বস্তি দানা বাঁধল। সে দ্রুত টুইংকেলের হাত ধরে আর্যর পিছু পিছু হাঁটতে শুরু করল। মনে মনে নিজেকেই শাসন করল সে,,
—-‘ছি তৃষা! তুই এসব কী ভাবছিস? উনি রোম্যান্টিক হন কিংবা আনরোম্যান্টি তাতে তোর কী? উনি তো স্রেফ টুইংকেলের পাপা! তার কাছ থেকে রোম্যান্টিক কমপ্লিমেন্ট আশা করাটা তো আকাশকুসুম কল্পনা। আস্ত একটা খাম্বো টাইপ রোবটের থেকে ডিসেন্ট শব্দটা শুনতে পাওয়াও তো বড়সড় মিরাকল!
গাড়ির কাছে আসতেই আর্য ড্রাইভিং সিটে বসে দরজা খুলে দিল। তৃষা আর টুইংকেল পেছনের সিটে গিয়ে বসল। আর্য রিয়ার-ভিউ মিররে একবার তৃষার প্রতিবিম্বের দিকে তাকাল। কাজল কালো চোখে তৃষার সেই বিভ্রান্ত চাউনি আর ওষ্ঠাধরের মৃদু কাঁপুনি আর্যর নজর এড়ালো না। সে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে শান্ত স্বরে বলল,,
—-‘বেল্টটা ঠিকমতো লাগিয়েছেন তো? জ্যামের কথা মাথায় রেখে বলছি, রাস্তায় কিন্তু বেশ কয়েকবার ব্রেক কষতে হতে পারে। আপনি যে পরিমাণে আনমাইন্ডফুল, তাতে কপালটা উইন্ডস্ক্রিনে ঠুকে না গেলেই হলো!
তৃষা বিরক্তিতে চোখ উল্টালো। বিড়বিড় করে বলল,,

—-‘হুহ! সারাক্ষণ শুধু ইনস্ট্রাকশন আর ভয় দেখানো। একটা দিনও কি শান্তি নেই?
টুইংকেল মাঝখানে বসে দুই হাততালি দিয়ে উঠল। সে জানলার কাঁচের বাইরে উৎসুক চোখে তাকিয়ে আছে। রাস্তায় লাল-সাদা পাঞ্জাবি আর শাড়ি পরা মানুষের ভিড় দেখে সে দারুণ উচ্ছ্বাসিত। সে আর্যর দিকে তাকিয়ে বলল,,
—-‘পাপা, পাপা! দেখো কত বেলুন! আমরা কি মেলাতে যাব না? বানি কিন্তু আমাকে প্রমিস করেছে!
আর্য ট্রাফিক সিগন্যালে গাড়ি থামিয়ে বলল,,
—-‘ বানি যখন প্রমিস করেছে, তখন নিশ্চয়ই মেলায় নিয়ে যাবে। তবে তৃষা, আপনার ওই ঝুড়িভর্তি প্রমিসগুলো ফুলফিল করার সময় যেন টুইংকেলের সেফটির দিকেও খেয়াল থাকে। মেলায় প্রচুর ক্রাউড থাকবে, সো বি কেয়ারফুল।
তৃষা জানালা দিয়ে বাইরের আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। রোদ চড়া হলেও বাতাসের আমেজটা বেশ মিষ্টি।গাড়ি যখন কলেজের গেটের সামনে এসে থামল, তখন চারদিকে উৎসবের ধুম। ঢাকের শব্দ আর মানুষের কোলাহলে আকাশ-বাতাস মুখরিত। আর্য গাড়ি থেকে নেমে তৃষার জন্য দরজা খুলে দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তৃষা গাড়ি থেকে নামতেই আর্য হঠাৎ নিচু স্বরে বলল,,

—-‘ওহ হ্যাঁ যাওয়ার আগে একটা কথা। আজকের ফাংশানে অযথা ছোটাছুটি করবেন না। আমি এক ঘণ্টা পর পিক করতে আসব।ফোনটা যেন সাইলেন্ট মুডে না থাকে,ওকে?
তৃষা মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানাল। সে টুইংকেলকে নিয়েই এগিয়ে গেলো ভেতরে।

ঢাকা সিটি কলেজের সুবিস্তীর্ণ প্রাঙ্গণ আজ যেন এক টুকরো লাল-সবুজের বাংলা। চারদিকে আল্পনার আলতো ছোঁয়া, বাঁশের বাখারিতে রঙিন কাগজের ঝালর আর মাটির সরাচিত্রের সমারোহে এক লৌকিক আভিজাত্য ফুটে উঠেছে। বৈশাখের তপ্ত দুপুরেও শান বাঁধানো চত্বরে শিরীষ গাছের ছায়া যেন এক স্নিগ্ধ চাদর বিছিয়ে রেখেছে। ঢাকের গুরুগুরু শব্দ আর এস্রাজ-সেতারের মূর্ছনা মিশে গিয়ে এক চিরায়ত উৎসবের আবহ তৈরি করেছে, যেখানে আধুনিকতার ভিড়েও ঐতিহ্যের সুবাস অমলিন।
তৃষা টুইংকেলের হাত ধরে ভিড়ের মাঝ দিয়ে সাবধানে এগোচ্ছিল। চারপাশের এই উৎসবমুখর পরিবেশে নিজেকে হঠাতই খুব হালকা লাগছিল তার। ঠিক তখনই চেনা এক কণ্ঠস্বরে তার পা থমকে গেল।
—-‘তৃষা! তুমি?
তৃষা ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল সায়েম দাঁড়িয়ে আছে। লাল পাঞ্জাবিতে সায়েমকে বেশ উজ্জ্বল লাগছে, কিন্তু তার চোখেমুখে এখন গভীর বিস্ময়। সায়েমের দৃষ্টি তৃষার দিক থেকে সরে গিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পুতুলের মতো সাজা টুইংকেলের ওপর স্থির হলো। সে খানিকটা থতমত খেয়ে জিজ্ঞেস করল,,

—-‘এই বাচ্চাটা কে তৃষা? তোমার সাথে… মানে ঠিক বুঝলাম না!
সায়েমের এমন সরাসরি প্রশ্নে তৃষা কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। আর্যর সাথে তার সম্পর্কের জটিলতা বা টুইংকেলের পরিচয়টা এই জনসমক্ষে কীভাবে ব্যাখ্যা করবে, তা ভেবে সে যখন ইতস্তত করছিল, তখনই ছোট্ট টুইংকেল তার স্বভাবসুলভ চপলতায় কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। তৃষার শাড়ির আঁচলটা মুঠোয় শক্ত করে ধরে সায়েমের দিকে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে বলল,,
—-‘আমি বানির বেস্ট ফ্রেন্ড! আর আমি বানির সাথে মেলা দেখতে এসেছি, তাই না বানি?
টুইংকেলের এমন আত্মবিশ্বাসী উত্তরে সায়েম যেন আরও অবাক হয়ে গেল। সে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই ভিড় ঠেলে উদয় হলো মেহসানা। পরনে নীল-সাদা শাড়ি আর চোখে সানগ্লাস, মেহসানাকে আজ বেশ ফুরফুরে মেজাজে লাগছে। তৃষাকে দেখেই সে একগাল হেসে চিৎকার করে উঠল,,

—-‘ তৃষা, ইউ্য আর লুকিং গর্জিয়াস বেবজ,
অতঃপর সে টুইংকেল এর দিকে চেয়ে ওর তুলতুলে নরম চোয়ালে আদুরে স্পর্শ এঁকে বলল,,
—-‘আরে আমার ছোট্ট কিউটি পাই মিমিটা?তোমাকে তো একদম বানির কার্বন কপি লাগছে।
মেহসানাকে দেখে তৃষা যেন কূলে ফেরার নৌকা খুঁজে পেল। সে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাফ ছেড়ে বাঁচল। সায়েমের কৌতূহলী দৃষ্টি থেকে বাঁচার এটাই মোক্ষম সুযোগ। সে দ্রুত মেহসানার হাত ধরে ফেলল।
—-‘ চল চল, ভেতরে প্রোগ্রাম শুরু হয়ে গেছে বোধ হয়। সায়েম ভাই, আমরা তাহলে আসি? পরে কথা হবে।
সায়েমকে আর কোনো প্রশ্ন করার সুযোগ না দিয়েই তৃষা টুইংকেলকে কোলে তুলে নিয়ে মেহসানার সাথে দ্রুত ভিড়ের মাঝে মিশে গেল। পেছন থেকে সায়েম অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল তাদের যাওয়ার দিকে।

🎶আরে বৈশাখের বিকেল বেলায়….
তোমায় নিয়ে বকুলতলায়….
প্রেমের একখান গান শোনাবো…
পাখিরা ডাকবে মনে রং লাগবে,…
পাখিরা ডাকবে মনে রং লাগবে….
কিছু মিষ্টি মধুর স্বপ্ন সাজাবো….
প্রেমের একখান গান শোনাবো…..🎶

পহেলা বৈশাখের সেই তপ্ত দুপুর। ঢাকা সিটি কলেজের প্রাঙ্গণ তখন এক মায়াবী রূপ ধারণ করেছে। চারদিকে ঢাকের বাদ্যি আর বাঁশির সুরে যেন এক আদিম গ্রামবাংলার প্রাণস্পন্দন জেগে উঠেছে। কলেজের সুবিস্তীর্ণ মাঠের এক কোণে তৈরি করা হয়েছে সুসজ্জিত এক মঞ্চ, যার চারপাশ আল্পনা আর রঙিন কাগজের শিকলে মোড়া।
আর্য কলেজের গেট দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতেই এক অপূর্ব সুরলহরী তার কানে আছড়ে পড়ল। কথা ছিল সে এক ঘণ্টা পর তৃষা-টুইংকেলকে নিতে আসবে, কিন্তু অফিসের একঘেয়েমি আর মনের কোণে জমে থাকা এক অঘোষিত অস্থিরতা তাকে সময়ের আগেই এখানে টেনে এনেছে। ডার্ক সানগ্লাস পরিহিত আর্য ভিড়ের মাঝ দিয়ে এগোতে এগোতে তার দৃষ্টি হঠাৎ থমকে গেল মঞ্চের ওপর।
মঞ্চের মাঝখানে শুভ্র বসন আর লোহিত পাড়ের এ অপরুপ মায়াবী মানবী;তৃষা।তার মেঘবরণ কেশে দুলছে ‌বেলি ফুলের গাজরাটি। সে একা নয়, একদল সখীর মাঝে সে যেন শরতের প্রথম শিউলি। মাইকে তখন বেজে চলেছে চিরচেনা গানটি।

তৃষার প্রতিটি মুদ্রায়, হাতের প্রতিটি ভঙ্গিমায় আজ এক অদ্ভুত ছন্দ। পায়ের নূপুরের নিক্বণ মঞ্চের কাষ্ঠফলকে এক অদ্ভুত মাদকতা ছড়াচ্ছে। তার ডাগর চোখের কাজলী মায়া আর অধরের সেই চপল হাসি আর্যর হৃদস্পন্দনকে যেন এক মুহূর্তের জন্য থামিয়ে দিল। আর্য মন্ত্রমুগ্ধের মতো দাঁড়িয়ে রইল।
সে কক্ষনো ভাবেনি, এই চঞ্চল আর অগোছালো মেয়েটির ভেতর এমন এক ধ্রুপদী শিল্পী লুকিয়ে আছে। তৃষার প্রতিটি ঘূর্ণিপাকের সাথে সাথে তার শাড়ির আঁচলটা উড়ছে মৃদুমন্দ বাতাসে।স্তব্ধ আর্যর নির্বাক দৃষ্টি তৃষাতে স্থবির।
পেছন থেকে হঠাৎ একটা ছোট শরীর তার পা জড়িয়ে ধরল,
—-‘পাপা! পাপা! দেখো দেখো, বানি কী সুন্দর ডান্স করছে!
আর্য নিচু হয়ে টুইংকেলকে কোলে তুলে নিল। টুইংকেলের চোখেমুখে তখন রাজ্যের উত্তেজনা। সে আর্যর কানে কানে ফিসফিস করে বলল,,
—-‘জানো পাপা, বানি না ফেইরিদের মতো ওড়না উড়াতে পারে। সবাই বানিকে তালি দিচ্ছে, দেখেছো?
আর্য ম্লান হাসল, তবে তার চোখ সরলো না মঞ্চ থেকে।

নাচ শেষ হতেই করতালিতে মুখরিত হলো চারপাশ। তৃষা হাঁপাতে হাঁপাতে স্টেজ থেকে নিচে নামল। কপালে জমা বিন্দু বিন্দু ঘাম বিন্দু মুক্তার ন্যায় চিকচিক করছে, সংজ্ঞাহীন তার সৌন্দর্যকে বাড়িয়ে দিচ্ছে বহুগুনে। আর্য আর টুইংকেল তৃষার দিকে এগোতে চাইল, ঠিক তখনই কোথা থেকে ‌উদয় হলো সায়েম ।
—-‘তৃষা! জাস্ট মাইন্ডব্লোয়িং! তুমি যে এত ভালো ডান্স করো, আগে তো কোনোদিন বলোনি। ইউ ওয়ার দ্য স্টার অফ দ্য স্টেজ!
সায়েমের এই অতিরিক্ত প্রশংসা তৃষাকে কিছুটা অস্বস্তিতে ফেলল।সে ইতস্থ হয়ে বলল,,
—-‘থ্যাঙ্ক ইউ। অ্যাকচুয়ালি অনেকদিন পর তো চাই একটু নার্ভাস…
সায়েম যেন আরও একধাপ এগিয়ে এল।
—-‘আরে নার্ভাসনেস কিসের? আমি তো ভাবছি তোমাকে আমাদের ক্লাবের প্রোগ্রামগুলোতেও…
সায়েমের কথা শেষ হওয়ার আগেই পেছন থেকে এক রাশভারী আর শীতল কণ্ঠস্বর ভেসে এল,
—-‘তৃষা! আই থিংক ইউ আর ডান ফর দ্য ডে।
তৃষা আর সায়েম দুজনেই চমকে পেছনে ফিরল। আর্য দাঁড়িয়ে আছে, এক হাতে টুইংকেল, অন্য হাত পকেটে। তার চেহারায় এক অদ্ভুত কাঠিন্য, যা দেখে সায়েমের হাসিমুখটা মুহূর্তেই ম্লান হয়ে গেল। আর্য সায়েমের দিকে সরাসরি না তাকিয়ে তৃষার দিকে স্থির দৃষ্টিতে চাইল।তৃষা কিছুটা ঘাবড়ে গিয়ে বলল,,

—-‘আপনি? আপনি তো এক ঘণ্টা পর আসার কথা ছিল!
আর্যর চোয়াল শক্ত হয়ে এল। সে শীতল কণ্ঠে বলল,,
—-‘টুইংকেল হাংরি। আর মেইবি আপনিই ওকে প্রমিস করেছিলেন মেলা দেখাবেন প্লাস ফুচকা খাওয়াবেন।সো অন্যের সাথে গল্প করে সময় নষ্ট করার চেয়ে প্রমিস রাখাটা বোধহয় বেশি জরুরি।
আর্যর কন্ঠে বিরক্তি স্পষ্ট। সায়েম অপ্রস্তুত হয়ে একটু সরে দাঁড়াল।আর্য তৃষার উত্তরের অপেক্ষা না করেই গাম্ভীর্যপূর্ণ কন্ঠে বলল,,
—-‘চলুন। সামনের স্টলটাতে ভালো ফুচকা পাওয়া যাচ্ছে। অযথা এখানে ভিড় বাড়িয়ে লাভ নেই।
অতঃপর এগিয়ে গেল সম্মুখ পানে।

মধ্যগগন পার হয়ে বিকেলটা যখন কিঞ্চিৎ ক্লান্তির আবেশে মন্থর হয়ে আসছিল। গোধূলির আমন্ত্রণে কমলাভ রঙে রঙিন হচ্ছে দিগন্ত। টুইংকেলের আবদারেই তাকে নিয়ে পার্শ্ববর্তী একটা মেলায় এসেছিল আর্য তৃষা। বর্তমান জনাকীর্ণ মেলা থেকে একটু দূরে নির্জন রাস্তার ধারের কৃষ্ণচূড়া গাছগুলোর নিম্নদেশ দিয়ে হাঁটছিল তিনজনে।মেলা থেকে বেরিয়েই আর্যর গাড়িটা বাগড়া দিল; কী একটা যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে সেটাকে কাছের গ্যারেজে রেখে আপাতত হাঁটাপথেই এগিয়ে চলেছে তারা।
তৃষার হাতে ধরা একগুচ্ছ ঝিলমিল বেলুন, মূলত কেনার টুইংকালের জন্যই তবে ঝিলমিল বেলুন তার পছন্দ হওয়ায় গুটি কয়েক নিজের জন্যেও নিয়েছে সে। বেলুনগুলো গোধূলির বাতাসে অবাধ্য হয়ে উড়তে চাইছে। তার পাশে ছোট ছোট পায়ে লাফিয়ে হাঁটছে টুইংকেল। তার এক হাতে একটা কাঠি-লজেন্স আর অন্য হাতে শক্ত করে ধরে আছে আর্যর আঙুল।
টুইংকেল হঠাৎ আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,,

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৭

—-‘পাপা! দেখো আকাশটা কেমন রেড! ঠিক বানির ওই টিপটার মতো, তাই না?
আজও সম্মুখে তাকিয়ে রিকশা খোঁজার প্রচেষ্টায় দৃষ্টি ঘোরাতে ঘোরাতে বলল,,—‘সামহাউ লাইক দ্যিস মাম্মাম।
হঠাৎ দূর হতে ভেসে আসলো রিক্সার টুংটাং শব্দ। আর্য রিকশাটাকে থামার সংকেত দিতেই কিছুটা এগিয়ে গিয়ে সেটি থামল। অতঃপর তিনজন মিলে চড়ে বসলো রিকশায়। আর্য-তৃষা পাশাপাশি মাঝখানে টুইংকেল। আর্য ইচ্ছাকৃতই কিছুটা গুটিয়ে বসেছেন যাতে তৃষার শরীরের সঙ্গে স্পর্শ লেগে সে অস্বস্তিতে না পারে।
মৃদুমন্দ বাতাস এসে লাগছে তাদের ঘর্মাক্ত মুখে। আঁধার ঘনীভূত হাওয়ায় রাস্তার পাশের ল্যাম্পপোস্ট গুলো জ্বালানো হয়েছে। হলদেটে আলোয় রিকশাটা এগিয়ে চলেছে;গন্তব্য সুখনীড়।

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৯

1 COMMENT

Comments are closed.