Home কি করিলে বলো পাইবো তোমারে কি করিলে বলো পাইবো তোমারে পর্ব ১৭

কি করিলে বলো পাইবো তোমারে পর্ব ১৭

কি করিলে বলো পাইবো তোমারে পর্ব ১৭
মুনমুন বুড়ি

আগুন্তক এর উপস্থিতি টের পেয়ে আলতাফ শেখ ও সিয়াম এক সঙ্গে দরজার দিকে ফিরে তাকায়। তাকিয়ে দেখে দরজায় দাঁড়িয়ে আছে একটি কালো ছায়ামূর্তি। আলতাফ শেখ আগন্তুকটির দিকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে বললেন—
— কে?
আগন্তুকটি কোনো উত্তর দেয় না, চুপচাপ মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকে। সিয়াম বিরক্তিকর কণ্ঠে বলে ওঠে—
— এই তুই আবার কোন মাল রে? চুপচাপ খাম্বার মতো দাঁড়িয়ে আছিস কেন?
সিয়ামের কথাটি শেষ হওয়ার সাথে সাথে আগন্তুকটি এক পা এক পা করে ওদের মুখোমুখি আস্তে আস্তে এগিয়ে আসে। আগন্তুকের বুটের আওয়াজে এই নিস্তব্ধ পরিবেশে আলতাফ শেখ ও সিয়াম অজান্তেই কেঁপে ওঠে। আগন্তুক সামনে আসতেই সোডিয়ামের নিয়ন আলোয় লোকটির মুখ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। লোকটিকে দেখে সিয়াম কাঁপা কণ্ঠে বলে ওঠে—

— অ অভ্র!
আলতাফ শেখ হতভম্ব হয়ে অভ্রর দিকে তাকিয়ে আছেন।
অভ্র গাঢ় বাঁকা করে হেসে বলে ওঠে—
— চিনতে পেরেছ তাহলে?
আলতাফ শেখ নিজেকে সামলে বলে ওঠেন—
— তুমি এখানে কী করছ?
— কেন, আমার আসা মানা নাকি? মাই ডিয়ার শ্বশুর আব্বু।
— কী বলছ এসব!
— কেন, ভুল বললাম নাকি কিছু? শ্বশুর আব্বুবুবুবুবু—
অভ্রর কথা শুনে সিয়াম নিজেকে স্বাভাবিক করে বলে ওঠে—
— অভ্র ভাইয়া, তুমি এখানে কীভাবে এসেছ? মানে এই জায়গাটা কীভাবে চিনলে? একা এসেছ নাকি সঙ্গে মিহিও আছে?

— না শালাবাবু, তোমার বোন তো আসেনি, কিন্তু আমি একাও আসিনি। সঙ্গে একজন এসেছে।
— কে এসেছে?
অভ্র কুটিল হেসে বলে ওঠে—
— তোদের যম।
এই একটি কথাই যথেষ্ট ছিল আলতাফ শেখ আর সিয়ামের বুক কাঁপিয়ে তোলার জন্য— হলোও তাই। আলতাফ শেখ নিজের ভয় লুকাতে চেয়েও পারছেন না, বাম হাতে নিজের কপালের ঘাম মুছতে মুছতে বলে ওঠেন—
— কী বলছ তুমি এসব, অভ্র? আমি কিছু বুঝতে পারছি না।
অভ্র এক ভ্রু উঁচিয়ে বলে ওঠে—
— আচ্ছা? ঠিক আছে, বুঝাই তাহলে তোদের ভালো করে।
কথাটা বলা শেষ করে অভ্র মুখ দিয়ে অদ্ভুত আওয়াজ বের করে বলে ওঠে—
— চু… চু…
মুহূর্তেই অন্ধকার রুমটির চৌকাঠ পেরিয়ে চারটে কালো লোমশধারী কুকুর এসে সিয়াম আর আলতাফ শেখের চারদিকে গোল করে ঘিরে দাঁড়ায়। তাদের হাউলিংয়ে সিয়াম আতঙ্কিত হয়ে কাঁপা কণ্ঠে অভ্রকে বলে ওঠে—

— অভ্র ভাইয়া, এসব কী! এই কুকুরগুলোকে সরাও এখান থেকে!
সিয়ামের কথা শুনে যেন অভ্র মজা পেল। সেভাবেই কটাক্ষ সুরে বলে উঠল—
— কেন শালাবাবু, ভয় পাচ্ছো নাকি?
অভ্রর কথাগুলো শেষ হওয়ার সাথে সাথে কুকুরগুলো পুনরায় ক্ষিপ্ত আওয়াজ করতে থাকে। আলতাফ শেখ নিজের কপালের ঘামটুকু কোনোমতে মুছে জড়ানো কণ্ঠে বলে ওঠেন—
— এরকম কেন করছ তুমি? কী চাই?
মুহূর্তেই অভ্রর চোয়াল শক্ত হয়ে যায়। তীক্ষ্ণ চোখে আলতাফ শেখকে পর্যবেক্ষণ করে বলে—
— যা জানতে চাইব, সত্যি করে বলবি। যদি একটুও মিথ্যার আভাস পাই, তাহলে জান নিয়ে ফিরতে পারবি না।
— কী জানতে চাও?
— মিহি কে?
আলতাফ শেখ কিছু বলার আগেই সিয়াম বলে ওঠে—
— এইসব কেমন প্রশ্ন অভ্র ভাইয়া? আব্বুকে জিজ্ঞেস করছ মিহি কে? তাহলে শুনে রাখো— মিহি আলতাফ শেখ আর রিনা বেগমের ছোট মেয়ে, আমার ছোট বোন।
সিয়ামের কথা শুনে অভ্র এক ভ্রু উঁচিয়ে বলে—

— আচ্ছা?
মুহূর্তেই কুকুরগুলো সিয়াম আর আলতাফ শেখের উপর আক্রমণ করে বসে। কুকুরগুলো ক্রমশ ক্ষতবিক্ষত করতে থাকে আলতাফ শেখ আর সিয়ামকে। প্রতিটি আর্তনাদে ঘরের প্রতিটি দেওয়াল কেঁপে উঠছে। আলতাফ শেখ শেষমেশ প্রাণ বাঁচাতে বলে ওঠেন—
— আমি বলছি! বলছি! মিহি আমার নিজের মেয়ে না— ও আমার রক্তের কেউও নয়! তুমি কুকুরগুলোকে সরাও, আমি সব বলব! আহহহহ!
আলতাফ শেখের কথা শুনে অভ্রর মুখে বাঁকা হাসি ফুটে ওঠে। সে সন্তুষ্টজনক হাসে—
— চু… চু… স্টপ, মাই সোলজারস।
মালিকের আদেশ পাওয়া মাত্রই কুকুরগুলো সরে আসে। কুকুরগুলো থেকে ছাড়া পেয়ে আলতাফ শেখ ও সিয়াম জোরে জোরে নিশ্বাস নিতে থাকে। পুরো শরীরে জায়গায় জায়গায় ক্ষত তাদের। অভ্র ওদের অবস্থা একবার দেখে নিয়ে চেয়ারে আয়েশ করে বসতে বসতে বলে—

— একদম প্রথম থেকে শুরু করবি। আর সব সত্যি বলবি। যদি একটুও মিথ্যা বলার চেষ্টা করিস, তোদের খেলা এখানেই শেষ হবে।
আলতাফ শেখ ভীতসন্ত্রস্ত চেহারায় অভ্রর দিকে তাকিয়ে নিজেকে সামলে বলতে শুরু করে—
দেলোয়ার আহমেদ বাংলাদেশের বিশিষ্ট ব্যবসায়ীদের মধ্যে অন্যতম। দিনে দিনে নিজের পরিকল্পনা ও বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে তিনি অনেক ব্যবসায়ীকে নিমিষেই ঘায়েল করে দিতেন। পূর্বপুরুষদের সবাই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকায় অল্প বয়স থেকেই ব্যবসার কাজে হাত দিয়েছিলেন তিনি। সফলতাও অর্জন করেছিলেন প্রচুর। ফলস্বরূপ বহু মানুষের চোখের কাঁটা হয়ে উঠেছিলেন এই দেলোয়ার আহমেদ। অনেকেই তাকে টেক্কা দেওয়ার চেষ্টা করলেও তার সঙ্গে পেরে উঠতে সক্ষম হতো না।
দেলোয়ার আহমেদের পরিবারে তার , স্ত্রী জুই আহমেদ ও একটি নবজাতক মেয়ে ছিল। মা–বাবা অনেক আগেই মারা গিয়েছিলেন, তার কোনো ভাইবোনও ছিল না। ফলে পারিবারিক সমস্ত সম্পত্তির একমাত্র অধিকারী ছিলেন তিনি।

তার অফিসেই পিএ হিসেবে জয়েন করি আমি। শুরুতে তার সম্পত্তির উপর আমার কোনো নজর ছিল না। আমি আমার কাজ দায়িত্বের সঙ্গেই পালন করতাম। আমার কাজ দেখে খুশি হয়ে অল্প দিনেই আমি তার পছন্দের একজন হয়ে উঠি। তিনি আমার উপর খুব ভরসা করতেন।
সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিল, কিন্তু একদিন আমার আলাপ হয় মোস্তফা হাসানের সঙ্গে— যিনি ছিলেন দেলোয়ার আহমেদের প্রতিপক্ষ। তিনি সবসময় মুখিয়ে থাকতেন দেলোয়ার আহমেদের সম্মানহানি করা ও তার ব্যবসায় লোকসান করানোর জন্য। একবার তিনি দেলোয়ার আহমেদের বিরুদ্ধে ব্যবসায়িক টাকা চুরির মিথ্যা অভিযোগ আনেন। তখন দেলোয়ার আহমেদ তার পরিকল্পনা জেনে প্রমাণ জোগাড় করে তাকে পুলিশের হাতে ধরিয়ে দেন। সেই থেকেই মোস্তফা হাসানের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় দেলোয়ার আহমেদকে খুন করা।
তিনি আমাকে দেলোয়ার আহমেদকে খুন করতে বলেন, বিনিময়ে প্রচুর টাকার প্রলোভন দেখান। আমিও লোভে পড়ে তার সঙ্গে হাত মেলাই। যদিও কথা ছিল শুধু দেলোয়ার আহমেদকে খুন করার, কিন্তু হঠাৎই আমার চোখ পড়ে তার সম্পত্তি, তার কারবার, তার সাম্রাজ্যের উপর— যা আমি তার পুরো পরিবার ধ্বংস করতে পারলেই হাসিল করতে পারতাম।

ইচ্ছে ছিল স্বামী–স্ত্রী দুজনকেই শেষ করার, সাথে তাদের মেয়েটাকেও মেরে ফেলার। কিন্তু সবকিছু যাচাই করে আমি জানতে পারলাম, তার সম্পত্তির ৮০ ভাগই তার মেয়ের নামে। আর আমি ওই সম্পত্তি তখনই নিজের করতে পারব, যখন ওই মেয়ে নিজে আমাকে লিখে দেবে— আর এই কাজটা তার আঠারো বছরের আগে সম্ভব ছিল না।
তাই আমি সিদ্ধান্ত নিলাম— তাদের মেরে আমি তাদের মেয়েটাকে নিজের মেয়ের পরিচয়ে বড় করব।
পরিকল্পনা অনুযায়ী এক রাতে আমি তাদের বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দিই এবং তাদের বাঁচার সব পথ বন্ধ করে দিই। এর আগেই আমি মেয়েটাকে সরিয়ে নিয়েছিলাম। এরপর থেকেই মেয়েটি হয়ে ওঠে আলতাফ শেখ ও রিনা বেগমের কনিষ্ঠ কন্যা— মিহি শেখ।

আস্তে আস্তে মেয়েটা বড় হতে থাকে। যত বড় হতে থাকে, ততই মিহি রূপবতী হয়ে ওঠে। আশেপাশের বিভিন্ন মানুষের নোংরা দৃষ্টি তার উপর পড়তে থাকে। শেষমেশ তার উপর নজর পড়ে আন্ডারওয়ার্ল্ডের কুখ্যাত নারী ব্যবসায়ী ডেনিয়াল মার্কো(DM)।
তার নজর পড়ার সাথে সাথেই মিহিকে নানা ভাবে কিডন্যাপ করার চেষ্টা করা হয়, কিন্তু কোনো এক কারণে— বা কারো কারণে— সে সফল হচ্ছিল না।

কোনোভাবে DM মিহির আসল সত্য জেনে যায় এবং আমাকে টাকার লোভ দেখাতে থাকে। কিন্তু মিহির বয়স তখনও আঠারো হয়নি, তাই তার নামের সম্পত্তি আমার করার কোনো উপায় ছিল না। তখনই DM আমাকে এমন টাকার প্রলোভন দেয়, যা ওই সম্পত্তির থেকেও অনেক বেশি ছিল। ফলে আমি মিহিকে পাচার করতে রাজি হয়ে যাই।
শুরুতে এই পরিকল্পনায় কৌশিক আমাদের সঙ্গে থাকলেও, পরবর্তীতে সে মিহিকে সত্যিই ভালোবেসে ফেলে। কৌশিকের কোনো পরিবার নেই— এখন যারা তার বাবা–কাকা সেজে আসে, সবটাই সাজানো নাটক।
কৌশিক মিহির সঙ্গে ভালোবাসার অভিনয় করে, এবং আমরা যে তাদের বিয়ে ঠিক করে রেখেছিলাম— সেটাও ছিল কৌশিকের পরিকল্পনা, মিহির বিশ্বাস অর্জনের জন্য। কিন্তু পরবর্তীতে সে সত্যিই মিহিকে ভালোবেসে ফেলে এবং সবভাবে তাকে প্রটেক্ট করতে থাকে।
কিন্তু তুমি মিহিকে বিয়ে করে ফেলায় কৌশিকের মনোযোগ মিহির উপর থেকে সরে যায়।

— আর তোরা লোক লাগিয়ে মিহিকে কিডন্যাপ করিয়েছিস।
অভ্রর কথায় আলতাফ শেখ মাথা উপর–নিচ করে সম্মতি জানায়।
অভ্র চেয়ার থেকে উঠে আলতাফ শেখের সামনে গিয়ে ঝুঁকে বলে—
— আর এটায় তোর জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল। আমি তোদের এতকিছুর পরও মাফ করে দিতাম, কিন্তু তোরা আমার দুর্বলতায় হাত দিয়েছিস— যেটা আমি সহ্য করব না। জাহান্নামে ভালো থাকিস।
অভ্রর কথা শুনে আলতাফ শেখ ও সিয়ামের বুক কেঁপে ওঠে। আলতাফ শেখ অস্থির কণ্ঠে বলে ওঠে—

কি করিলে বলো পাইবো তোমারে পর্ব ১৬

— মানে…?
আলতাফ শেখের কথা শুনে অভ্র হো হো করে হেসে ওঠে।
মুহূর্তেই পুরো ঘর কুকুরের গর্জন আর মানুষের আর্তনাদে ভরে ওঠে।
তাদের সেই ভয়ংকর আর্তনাদে অভ্রর অন্তর অদ্ভুত প্রশান্তিতে ভরে ওঠে…

কি করিলে বলো পাইবো তোমারে পর্ব ১৮