লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি পর্ব ৩৬
অহনা রহমান
নাসিমা উত্তেজিত হয়ে গেলেন। কি করবেন কিছুই বুঝে উঠতে পারলেন না তখনই। তিনি উত্তেজিত হয়ে বেশ কয়েকবার বললেন,
“আলহামদুলিল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ!”
হিয়াও কিংকর্তব্যবিমূঢ়! তার কানে বারংবার বাজছে মাহবুবার বলা একটি কথা, “তুমি মা হচ্ছো।”
হিয়া খেয়ালই করলো না, তার দুচোখ ভরে এসেছে জলে। হাত আপনা-আপনি চলে গেছে নরম পেটে। হিয়া তখন একটা অন্যরকম অনুভূতি অনুভব করলো। অন্যরকম মানে অন্যরকম, এরকম তার কখনোই হয়নি। প্রশান্তি ছড়িয়ে গেছে হাওয়ায়। হিয়া আস্তেধীরে উঠে বসলো। নাসিমা তখনই এসে হিয়াকে জড়িয়ে ধরলেন। কান্নামাখা গলায় বললেন,
“মামনী, তুমি জানো না আমি কতটা খুশি হয়েছি। আমার…আমার এই ঘরটা আবারও সেজে উঠবে। আমার…আমার নাফি বাবা হবে! আমার নাফি! আমি দাদী হবো দাদী।”
হিয়া নাসিমাকে জড়িয়ে ধরলো। তার-ও কান্না পেল এই মানুষটার খুশি দেখে। হিয়া কান্না করে ফেললো। এক তো মা হওয়ার খুশি, অন্যদিকে এই মানুষগুলোকে এতটা খুশি হতে দেখা। ঠিক তখনই হিয়ার নজর গেল নাফির দিকে। মানুষটা একদম স্থির হয়ে আছে। স্ট্যাচুর মতো। নড়তে মানা যেন তার। হিয়া অবাক হলো! নাফি কিছু বলছে না, তারমানে কি নাফি খুশি হয়নি?
নাফি খুশি হয়নি কথাটা ভাবতেই হিয়ার বুকের ভেতরটা কেমন হুহু করে উঠলো। হিয়া কিছু বলতেই যাবে তার আগে, মাহবুবা নাসিমাকে টেনে তুললো হিয়ার থেকে। নাসিমা উঠলে, মাহবুবা কিছু একটা বললেন ফিসফিস করে। নাসিমা তখন নাফির দিকে তাকালেন। নাফিকে অমন স্থির দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তিনি কিছুই বললেই না৷ বরং তাকালেন হিয়ার দিকে। এরপর মাহবুবার সাথে একবার চোখে চোখ মিলিয়ে নিলেন। দুই বান্ধবী ওদেরকে কিছু না বলেই রুম ত্যাগ করলেন এরপর।
নাফি তখনও স্থির। তবে তার চোখদুটো জ্বলজ্বল করছে। হিয়া বুঝলো ওটা অশ্রু। নাহ, তারমানে লোকটা খুশিই হয়েছে। হিয়া মনে মনে শান্তি অনুভব করলো এবার। কিন্তু নাফি কিছু বলছে না দেখে অস্থির হয়ে উঠলো। গাইগুই করতে থাকলো মেয়েটা। নাফি তার দিকেই তাকিয়ে আছে অথচ কিছু বলছে না। এরচেয়ে অস্বস্তিকর আর কি’বা হতে পারে। এমন একটা সুখবর শুনে নাকি চুপচাপ রয়েছে। হিয়া আশ্চর্য না হয়ে পারলো না। একটুপর আবার আসবেনে ময়না ময়না করতে! হাহ!
নাফির কোনো রেসপন্স না পেয়ে হিয়া নিজেই নামলো খাট থেকে। নামতে নামতে মনে মনে বলল, এমনিতে ওনার কাছে যাওয়ার কোনো ইচ্ছে’ই ছিলো না আমার। শুধুমাত্র, লোক দেখানোর জন্য যাচ্ছি।’ পরক্ষণেই মনের দ্বিতীয় অংশটা ডেকে বলল, কিন্তু এখানে লোক কোথায়? তুই কোন লোক দেখানোর জন্য যাচ্ছিস?’
নিজের মনের প্রশ্নে বিরক্ত হলো। বাস্তবতা হলো, নাফি কথা বলছে না দেখে তার ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছে। মানুষটা খুশি হয়েছে হিয়া জানে। কিন্তু কথা কেন বলছে না? উনি কি জানে না, হিয়ার সাথে কথা না বললে, হিয়ার খারাপ লাগে। কষ্ট হয়! হিয়া চুপচাপ নাফির সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। কোনো কথা না বলে, কপাল ঠেকালো নাফির শক্তপোক্ত বুকে। দু’হাতে কোমড় পেঁচিয়ে ধরলো। তবুও নাফি কোনো রেসপন্স করলো না৷ হিয়া একহাত দিয়ে নাফির পেটের কাছে খোঁচাতে লাগলো। তবুও নাফির সাড়া পাওয়া গেলো না৷ হিয়ার যে তখন, কি খারাপ লাগলো! বাধ্য হয়েই একপ্রকার হিয়া কথা বলল,
“শুনছেন?”
– – –
“কি হয়েছে আপনার?”
– – –
“আমার সাথে কেন কথা বলছেন না?”
– – –
“আপনি কি খুশি হননি?”
– – –
এতোগুলো কথা বলার পরও যখন নাফি কথা বলল না, হিয়ার কষ্টে বুকটা ভরে এলো৷ দুচোখে অশ্রু জমলো ফের। মনে জেগে উঠলো অবাঞ্ছিত চিন্তা ভাবনা৷ হিয়া ভাবলো, নাফি খুশি হয়নি। বোধহয় তার বাচ্চাটাকে রাখতে দেবে না। হয়তো নষ্ট করতে বলবে! এসব কথা মাথায় আসতেই হিয়া ফুঁপিয়ে উঠলো। নাফিকে জোড় করে জড়িয়ে ধরে বলল,
“আপনি খুশি হননি তাই না? আপনি কি আমাদের বাচ্চাকে নষ্ট করতে বলবেন? নাফি আমাদের ভালোবাসার অংশ আসছে আপনি খুশি হননি?”
অবশেষে এইবার নাফি মুখ খুললো। হিয়ার উদ্দেশ্যে বলল,
“নিজের অংশকে আমি কেন নষ্ট করবো হিয়া? বিশ্বাস করো, আমার এতো বছরের জীবনে আমি আজকের মতো আনন্দিত কখনো হইনি৷”
“তাহলে আপনি কথা বলছেন না কেন?”
নাফি আবারও চুপ হয়ে গেল। কোনো জবাব দিলো না হিয়ার কথার। হিয়াকে ধরলোও না৷ হিয়ার বিষন্ন ভাব আরও বেড়ে গেল। নাফি কিছু নিয়ে রাগ করেছে তা এতক্ষণে ভালোই বুঝেছে হিয়া৷ নাফি এই প্রথমবার হিয়ার উপর রাগলো তাই হিয়া একটু বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছে। হিয়া আবার বলল,
“আপনি আমার উপর রাগ করেছেন? কি করেছি আমি? বলুন না। কেন কথা বলছেন না? এমন একটা সংবাদ শুনেও কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন না৷ আমার যে কষ্ট হচ্ছে নাফি।”
হিয়ার এতোগুলো কথার উত্তরে নাকি বলল,
“কষ্ট আমিও পাই হিয়া। যা করেছো ভালোই করেছো! বাট আমি তোমাকে ফার্স্ট এন্ড লাস্ট ওয়ার্নিং দিলাম, এখন থেকে কোনো খামখেয়ালি নয়। কেননা এখন তুমি শুধু একা নও। তোমার ভেতরে আমার সন্তান আছে৷ তোমার খামখেয়ালির জন্য যেন আমার সন্তান এবং আমার ভালোবাসার কোনো ক্ষতি না হয়। কথাট ভালোভাবে মাথায় ঢুকিয়ে নাও।”
হিয়াকে নিজের থেকে সরিয়ে দিলো নাফি। এমনকি হিয়ার দিকে একটা বার তাকালোও না। রুম ত্যাগ করলো সে। যাওয়ার আগে কেবল বলে গেল,
“রেস্ট করো এখানে। যা লাগবে রুমেই দেওয়া হবে। আমি ডক্টর আন্টির সাথে কথা বলে আসছি।”
নাফি যাওয়ার সাথে সাথেই হিয়া কেঁদে উঠলো। নাফি এই প্রথমবার তার সাথে এমন ব্যবহার করলো। এই প্রথমবার তাকে এভাবে নাম ধরে ডাকলো। হিয়া মেনে নিতে পারলো না এটা৷ ও তো জানতেই পারলো না, নাফি কি জন্য রাগ করেছে।
নাসিমা আর মাহবুবা ড্রয়িংরুমে রাজকে দেখলেন। মাহবুবা এবারেও উৎফুুল্ল হয়ে রাজকে বলে উঠলেন,
“এই যে রাজ! তুমি তো চাচা হচ্ছো। তা বাবা হবে কবে?”
রাজ উদ্বিগ্ন হয়ে তাকিয়ে ছিলো দোতলার দিকে৷ হিয়ার কি হয়েছে এটা জানতে না পারলে তার শান্তি মিলছে না৷ কিন্তু ও উপরেও যেতে পারছে না সংকোচের কারণে। হঠাৎ করে মাহবুবার মুখ থেকে কথাটা শুনে রাজ চমকে উঠলো। বিস্ময়ে চোখ জোড়া বড়বড় হয়ে গেল। রাজকে ওভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে নাসিমা সরল মনে বললেন,
“যা তো বাজার থেকে মিষ্টি নিয়ে আয়।”
রাজ কথা বলতে পারছে না। কেবলই ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে নাসিমা ও মাহবুবার দিকে। রাজ কথা বলছে না দেখে নাসিমা আবারও বললেন,
“কি হলো, বসে আছিস কেন? বাজারে যেতে বললাম না? আমি টাকা তোর একাউন্টে পাঠিয়ে দিচ্ছি।”
রাজ পুতুলের ন্যায় উঠে দাঁড়ালো। এমন শক খেয়েছে বেচারা, কথা বলতেই যেন ভুলে গেছে। হিয়া প্রেগন্যান্ট? হোয়াট?! ক্যামনে কি? এতো ফাস্ট ক্যা? ও আগে বিয়ে করলো অথচ বউকে স্পর্শ পর্যন্ত করতে পারলো না। রাজের বুক ফেটে গেল। কপাল কতটা খারাপ হলে, এক্সের প্রেগ্ন্যাসির খবর শুনে মিষ্টি কিনতে যেতে হয়। ড্রয়িংরুম দিয়ে যাওয়ার সময় রাজের মাথায় এলো বাপ্পারাজের কথা। মা ও আন্টিকে উপেক্ষা করে কষ্টে বেচারা গেয়ে উঠলো,
“প্রেমের সমাধী ভেঙে, মনের শিকল ছিড়ে পাখি যায় উড়ে যায়।
তোমায় পাবো না জানি, শুধু চোখের পানি….!”
নাসিমা আর মাহবুবা অবাক না হয়ে পারলেন না৷ ওদিকে রাজ নিজের কাজে নিজেই হতভম্ব। এতক্ষণ মনে হলো অজ্ঞানের মতো গান গাইছিলো সে। এখন সম্বিত ফিরে পেতেই হকচকিয়ে দ্রুত বাড়ির বাইরে চলে গেল সে।
নাফি নিচে নেমে বেশ কিছুক্ষণ কথা বললো মাহবুবার সাথে। মাহবুবা পরামর্শ দিলেন, হসপিটালে গিয়ে চেকআপ করিয়ে আসার জন্য। এবং হিয়ার ভালোভাবে খেয়াল রাখার জন্য। হিয়ার খেয়াল রাখার বিষয়ে কোনো টেনশন নেই। নাফি নিজে আছে তারপর নাসিমা আছেন। দরকার পরে হিয়ার মা এসে থাকবেন।
হিয়ার সাথে ওরকম ব্যবহার করে নাফির নিজেরও ভালো লাগছে না৷ ড্রয়িংরুমে বসে সে বারবার তাকাচ্ছে উপরের ঘরে। হিয়ার জন্য টেনশন হচ্ছে তার। মেয়েটা এমনিতেই আধ-পাগলা। তবে নাফি আজকে নিজের রাগের কাছে হার মানলো। গেলো না হিয়ার কাছে। এছাড়া ওই মেয়েকে ভালো বানানোর আর কোনো উপায় নেই।
“আম্মু এতো মিষ্টি কেন বাড়িতে?”
নাসিমা উত্তেজনায় বেমালুম ভুলে গিয়েছিলেন রুহির কথা। ও যে বাড়িতে নেই অথবা ওকে জানানো হয়নি একথাটা কারো মাথাতেই আসেনি। ও বাড়িতে এসেছে একটু আগে। আসার পর ড্রয়িংরুমে এমন মিষ্টির ছড়াছড়ি দেখে রুহি তো অবাক! রুহি এরপর নাসিমাকে জিজ্ঞেস করলো উপরিউক্ত কথাটি।
“আল্লাহ! তোমাকে জানানো হয়নি তাই না? দেখেছো বাড়ির কাছের মানুষই ট্রেন মিস করে।”
রুহি বিচলিত হয়ে বলল,
“বুঝলাম না আপনার কথা। বুঝিয়ে বলেন।”
নাসিমা হাস্যোজ্জ্বল হয়ে বললেন,
“বলবো, কিন্তু তোমার তো খরচ হবে খুব। আল্লা! এবার কি করবে রুহি?!”
রাজ ড্রয়িংরুমে উপস্থিত ছিলো। ও কিছুই বলছে না। এমনিতেই তো রুহির সাথে খুনব একটা কথা-টথা বলে না সে। আর আজকে যে শক খেয়েছে তাতে তো মুখ দিয়ে কোনো কথাই বের হবে না।
“আম্মা একটু খুলে বলবেন কি হয়েছে? এতো পেঁচাচ্ছেন কেন?”
রুহি একটু ঝাড়ি মেরে বলল কথাটা। অমনি রাজ খেঁকিয়ে বলল,
“মুখ সামলে কথা বলবি। কার সাথে কথা বলছিস ভুলে যাস না।”
নাসিমার একটু খারাপ লাগলো রুহির কথাতে। কিন্তু রাজ বউকে এভাবে শিক্ষা দিচ্ছে এটাও তার পছন্দ হলো না৷ তিনি রাজকে বললেন,
“আহ ছোটছেলে! এসব কোন ধরনের আচরণ। মেয়েটা সারাদিন পর ভার্সিটি থেকে ফিরেছে। এভাবে বলছিস কেন?”
রুহি মুখ বাঁকিয়ে অন্যদিকে ফিরে রইলো। কে কি বলল, তাতে তার কিছুই যায় আসে না। নাসিমা রাজকে ধমকে রুহির দিকে তাকালেন আবার। রুহিকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“এ বাড়িতে নতুন সদস্য আসছে৷ আমাদের হিয়া প্রেগন্যান্ট।”
লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি পর্ব ৩৫
রুহি একটা মিষ্টি খাচ্ছিলো। নাসিমার কথাটা শুনে ওর হাত থেকে মিষ্টিটা পড়ে গেল। চমকে থমকে অবাক হয়ে ক্যাবলার মতো তাকিয়ে রইলো ও। কি রিয়াকশন দেবে তা যেন ও ভুলেই গেছে৷ রুহির এমন অবস্থা দেখে রাজের ভীষণ হাসি পেল৷ রাজ সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো৷ রুহিকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় গেয়ে উঠলো,
“ধুমতানা ধুমতানানানা ধুমতা ধুমতানা ধুম ধুম ধুম! হেই…ডিজে বাহারুল!”
