লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৯
নুসাইবা আরা নুরি
সকাল সকাল আলতাফ শেখ আর সিয়ামের আগমনে অবাক মির্জা বাড়ির সকলে।সিয়াম গলা ছেড়ে মেহেরাজ কে ডাকতে শুরু করে আর বেকথ্য ভাষায় গালি দিতে থাকে।
একজন ভদ্র লোকের বাড়িতে এসে তাদের বাড়ির ছেলেকেই এমন বাজে গালি দেওয়াই নিলয় মির্জা উঠে গিয়ে দাঁড়ায় আলতাফ শেখ এর সামনে।তারপর বলে,
-তোরা এখানে??আর মেহেরাজ কে ডাকছিস কেন? কি হয়েছে???
নিলয় মির্জার কথা শুনে আলতাফ শেখ রেগে অকথ্য ভাষায় গালি দিয়ে বলে,
-কই তোর ছেলে ডাক।তারপর বলছি কি হয়েছে।মেহেরাজ??
কথাটা বেশ জোরেই বলে আলতাফ শেখ।আলতাফ শেখের কথা শুনে নাহিদা খাতুন নিচে স্বরে বলে,
-ভাইজান আমাদের বলেন কি হয়েছে।মেয়েরাজ তো বাড়িতে নেই।
নাহিদা খাতুনের কথায় আলতাফ শেখ বলে,
-তো বাড়িতে ডাকেন।
নিলয় মির্জা এবার রেগে যায়।সকাল সকাল কি কারনে চিল্লাছে না বলে ছেলেকে ডাক ছেলেকে ডাক করছে।নিলয় মির্জা এবার রেগে বলে,
-কি সমস্যা সকাল সকাল মেহেরাজ কে খোজ করছিস কেন।ও তোদের আবার কি করছে??
-কি করে নাই তাই বলেন।
সিয়ামের কথায় নিলয় মির্জা সিয়ামের দিকে তাকাতেই আলতাফ সাহেব বলেন,
-ডাক তোর ছেলেকে আজ একটা বিহীত হবেই।কি শুরু করেছিস তোরা।আমাদের কি খেলনা পেয়েছিস।মন চাইলো জোর করে মেয়েটাকে বিয়ে দিলি।মন চাইলো ডিভোর্স দিলি।আবার মন চাইছে এখন আমার মেয়ের পিছনে পড়েছিস।
আলতাফ শেখের কথা বোধগম্য হয় না নিলয় মির্জার।তাই শান্ত ভাবেই বলে,
-মানে?
-বুজতে পারছেন না নাকি বুজার চেষ্টা করছেন না।আমার ছোট্ট বোনটাকে একবার কলঙ্ক লাগিয়ে মন ভরেনি আপনাদের।এবার আবার ছেলেকে লেলিয়ে দিয়েছেন আমাদের সম্মান নষ্ট করবেন বলে।হাত পা ভেঙে কাটা-খাল এ ফেলে দিবো মনে রাখবেন।
মেহেরাজের ব্যাপারে এমন কথা শুনে মেজাজ গরম হয়ে যায় এতক্ষন চুপ থাকা হাসান সাহেবের।নিজের বড় নাতিকে ভীষন ভালোবাসেন তিনি।তাই একটু এগিয়ে এসে সিয়ামের সামনে দাঁড়িয়ে বলে,
-মেহেরাজ কার পিছু নিয়েছে??
-কার আবার শ্রেয়সীর।যাকে মেহেরাজের পছন্দ না বলে বিয়ের দুদিন বাদেই ডিভোর্স দিয়ে একটা কলঙ্ক জুটিয়ে দিয়েছেন আপনারা।তাহলে এখন পিছনে কেন লাগছে নিশ্চয় চরিত্র খারাপ আপনার নাতির।নয়তো খালাতো বোনকে বাদ দিয়ে আবার আমার বোনের পিছনে পড়তো না।কারেক্টারলেস।
হাসান সাহেব ভিষন ক্ষেপে জান এবার।সিয়ামের কলার চেপে ধরে বলে,
-চুপ একদম চুপ।থাবড়িয়ে তোমার দাতের পাটি খুলে দিবো।যা মনে আসছে তাই বলছো।তোমার বোন ওর বিয়ে করা বউ।ও তো জানেই!
হাসান সাহেবের কথা কেড়ে নিয়ে আলতাফ শেখ হাসান সাহেবের হাত থেকে সিয়ামের কলার ছাড়াতে ছাড়াতে বলে,
-আপনাকে আমি যথেষ্ট সম্মান করি চাচা।তাই ভালোভাবে ওয়ার্নিং করছি।কিন্তু মনে রাখবেন আবারো যদি আপনার নাতিকে আমার মেয়ের আশে পাশে দেখেছি।তবে আপনার নাতি কে হারাবেন।
হাসান সাহেব রেগে ফুশে কিছু বলতে যাবেন আবারো তার আগে আলতাফ শেখ নিলয় মির্জার দিকে তাকিয়ে বলে,
-নিজের ছেলেকে সাবধান করিস।পুলিশ কেচ করার মতো ভুল করবো না আমি। বন্ধু ছিলি বলে আমার এক রুপ দেখেছিস।শত্রুর খাতাই নাম লেখালে আমার ভয়ানক রুপ দেখবি।আজ আসি।
কথাটা শেষ করে সিয়াম কে সাথে নিয়ে বেরিয়ে যায় বাড়ি থেকে।তখন সিয়াম একা আসতে চাইলেও আলতাফ শেখ আসেন কারন তিনি জানেন তার ছেলের মাথা গরম। কখন কি করে বসে ঠিক নেই।তাই তিনি সাথে এসেছিলেন।মেহেরাজ কে চড় থাপ্পড় দেয়ার জন্য। তবে মেহেরাজ তো বাড়িতেই নেই।
ওরা চলে যেতেই নিলয় মির্জা রাগে পাশে থাকা চেয়ারে লাথি মারে।কাঠের চেয়ার শব্দ করে টাইলস এর মেঝেতে পড়ে যায়।নাহিদা খাতুন কেপে উঠেন।ছেলের শোকে তিনি কাতর।ছেলেটা এতদিন পর বাড়িতে এসে রাগ করে বাড়ি ছেড়েছে তার উপর এই নতুন ঝামেলা।নিলয় মির্জার দিকে রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে হাসান সাহেব বলে,
-তোর মুখে কথা ছিলনা।ডিভোর্স পেপার নকল ছিলো।এমনকি মেহেরাজের সাইন টাও নকল।মেহেরাজ যদি মেয়েটার পিছু নিয়ে থাকে তবে ঠিক কাজ করেছে বউ এর পিছু নিয়েছে।ওদের বলিস নি কেন তুই ওদের ডিভোর্স হয়নি তুই আর আছিয়া মিলে এই কুবুদ্ধি এটেছিস।
হাসান সাহেব বয়স্ক হলেও।রাগের চোটে তার কন্ঠ দিয়ে যেনো আগুন ঝরছে।নিলয় মির্জা এগিয়ে গিয়ে চেয়ার টেনে বসে। তারপর হাত বাড়িয়ে ইশারায় নাহিদা খাতুনকে পানি দিতে বলে।নাহিদা খাতুন পানির গ্লাস এগিয়ে দিতেই তিনি এক ঢোকে পানি গুলো শেষ করেন।বেশ কিছুক্ষন সবার মাঝে চলে নিরবতা।নিলয় মির্জার প্রেশার বেড়ে গেছে।নিলয় মির্জা এবার নিরবতা ভেঙে বাবার উদ্দেশ্যে বলে,
-তুমি কি ভেবেছো সম্মান টা কোথায় যাবে।আমি যে সম্মানের জন্য এত বড় একটা কাজ করলাম আর তোমার নাতি জেদ ধরে সেই সম্মান টুকু নিয়ে টানাটানি করছে।দুনিয়াতে কি মেয়ের আকাল পড়ছে।যে ওই মেয়ের কাছেই যেতে হবে।
নিলয় মির্জার কথায় হাসান সাহেব কিছু বলবে তখনি তাকে থামিয়ে এতক্ষন পর শারমিন খাতুন বলে,
-তুই কি তোর বউ থুয়ে আমাদের কথা মতো অন্য মেয়ের কাছে যাবি সংসার এর আসায়।যে তোর বউ।বিয়ে করা বৈধ বউ তাকে ছেড়ে আরেক জনের কাছে যাবি তুই।
মায়ের কথার পিঠে নিলয় মির্জা আর কিছু বলে না।নাহিদা খাতুনকে ছোট্ট করে বলে,
“আমার প্রেশার এর ওষুধ টা দাও।আর পারলে ছেলেকে ফোন দিয়ে নিষেধ করো ও যেনো আর ওই মেয়ের পিছে না যায়।ওর থেকে ভালো মেয়ে এনে দিবো ওকে আমি।
মেহেরাজ ঘরের ভিতর পায়চারি করছে চোখ মুখ রাগে লাল হয়ে গেছে ইতিমধ্যে।হাত মুষ্টিবদ্ধ। সে সময় ঘরে প্রবেশ করলো ফাহিম।হাতে কফির কাপ।শিষ দিতে দিতে ঘরে প্রবেশ করে মেহেরাজ কে একবার পর্যবেক্ষন করে ফাহিমের মুখ বন্ধ হয়ে গেলো।মেহেরাজ কে দেখে মোটেই এখন সাভাবিক লাগছে না।
ফাহিম ধীর পায়ে গিয়ে মেহেরাজের হাতে একটা কফির কাপ এগিয়ে সে বিছানায় পা ঝুলিয়ে বসে জিজ্ঞাসা করলো,
-কিরে তোর কি হয়েছে।এমন রেগে আছিস কেন??
-অপহরন করার সহজ উপাই কি??
মেহেরাজের এমন উত্তর শুনে ফাহিমের মুখ বন্ধ হয়ে গেলো।কোন প্রশ্নের কোন উত্তর। ফাহিম কে চুপ থাকতে দেখে মেহেরাজ আবারো বলল,
-বল??
-কাকে অপহরন করবি??
-শ্রেয়সীকে!!
মেহেরাজের কথায় কফি খেতে খেতে ভিষম লাগে ফাহিমের।কাশতে কাশতে বিছানায় সুয়ে পড়ে।আর হুট করে ভিষম খাওয়ার জন্য গরম কফি সব ফাহিমের গায়ে পড়ে।ফাহিম ভিষম খাওয়া আর কফির পুড়ে যাওয়ার যন্ত্রনা নিয়ে ওয়াশরুমে ছুটে।মেহেরাজ একবার বিরক্ত চোখে তাকিয়ে নিজের কফি খাওয়ায় মনযোগ দেয়।ফাহিমের ছোট বেলার সভাব।হুট হাট কথায় কথায় ভিষম খাওয়া তাও শুধু তার কথা শুনলেই।তাই মেহেরাজ বিরক্ত।
প্রায় মিনিট দশ পরে লাল হয়ে যাওয়া হাত নিয়ে ফাহিম ওয়াশরুম থেকে বের হয়।তার কাশতে কাশতে চোখ দিয়ে পানি এসে গেছে।ফাহিম আবারো বিছানায় একই জায়গায় বসে আউচ আউচ করতে করতে বলে,
-একজন লেফটেন্যান্ট কমান্ডার হয়ে তুই করবি অপহরন তাও নিজের বউকে।যুগে যুগে কত কিছু দেখবো রে দোস্ত।
-আম সিরিয়াস।
-কত বড় মামলা হবে জানিস ফেসে যাবি তুই।
” মেহেরাজ মির্জা কাওকে ভয় পায় না।ওই শালারা কি করেছে জানিস। আমার বাবার কলার ধরেছে ওই জল্লাদ ওশুর তাও ওশুরের মেয়ের সাথে কথা বলার জন্য। আমি কি ওকে এতো সহজে ছাড়বো।ওশুরের মেয়েকে অপহরন করে দুই বাচ্চার মা বানিয়ে তাই আবার রেখে আসবো।
মেহেরাজের কথায় ফাহিম চোখ ছোট ছোট করে বলে,
-ওশুর কে?? আর আঙ্কেল এর কলার ধরেছে মানে কবে কখন??
মেহেরাজ একটা তপ্ত নিঃশ্বাস ছাড়ে।তারপর বিছানায় এসে বসে। বেশ কিছুক্ষন চুপ থেকে বলে,
-আমার শশুর এর প্রকৃত নাম ওশুর।আর বাড়ির কেয়ার টেকার আবদুল্লাহ ভাই ফোন দিয়েছিলো।সব ঘটনা খুলে বলেছে।আসার আগে ভাইকে বলে এসেছিলাম বাড়ির সকল সমস্যা আমাকে জানাতে।
-ওহ।
ফাহিম এবার বাবু হয়ে বসে।চুপ করে বসতে পারে না।পেটের ভিতর কথা গুড়্গুড় করছে।কিন্তু মেহেরাজের মুখ দেখে সাহস হচ্ছে না বলার।মেহেরাজ বেশ অনেক্ষন ভেবে বলল,
“নাহহ অপহরন করে কষ্ট করবো কেন।ওশুরের সামনে থেকে তার এক মাত্র মেয়েকে নিয়ে আসবো দেখি কিভাবে আটকায়।তোকে যে ফাইল রেডি করতে বলেছিলাম করেছিস??বলিস না ভুলে গেছি।
লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৮
মেহেরাজের কথায় ফাহিমের হাসি হাসি মুখটা মিলিয়ে যায় নিমিষেই।আসলেই সে ভুলে গেছিলো।আবার বলা চলে ইচ্ছা করেই করেনি।কারন মেহেরাজের মত বদলে যাচ্ছে হুটহাট। এই যে এক্ষুনি বললো অপহরন করবে।আবার এক্ষুনি বলছে না সামনে দিয়ে আনবে।নিজে তো পাগল হয়েছে তাকেও পাগল করবে।ফাহিম মনে মনে বিড়বিড় করে বলে,
-তোকে দেখলে গিরগিটি ও লজ্জা পাবে ভাই।গিরগিটি রঙ বদলায় মিনিটে মিনিটে আর তুই নিজের মত বদলাস সেকেন্ডে সেকেন্ডে।
