লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ১৮
নুসাইবা আরা নুরি
ফুটপত দিয়ে দ্রুত পায়ে হেটে যাচ্ছে রাশিদা খাতুন।গায়ের জরাজীর্ণ শাড়িটার অবস্থা বেহাল।নোংরা হয়ে আছে কেমন।আধ খোপা চুল গুলো খুলে যাবে প্রায়।মাগরিবের আজান পড়ে গেছে চারিদিকে।সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে।এখন দিন কাল ভালো না হুট হাট মানুষ গায়েব হয়ে যাচ্ছে।রাশিদা খাতুনের হাতে দুটো রুই মাছ।এক কেজি হবে মাছ দুটো।
আজ মাছের আড়তে মাছ গুছিয়ে দিয়েছিলো দুপুর থেকে তাই মাছ দুটো দিয়েছে।রাশিদা খাতুন ভিষন খুশি।বাড়িতে তার বাপ হারা তিন সন্তান একা একা আছে।কত দিন ধরে তারা মাছ খেতে চাই।তবে মানুষের বাড়িতে কাজ করে মাছ কেনার সাধ্য কি আর হয় রাশিদার।তাই আজ টাকা না নিয়ে মাছ চাইতেই আড়ত মালিক দিয়েছে।লোকটার মন ভিষন ভালো।রাশিদা মনে মনে সিদ্ধান্ত নেই বাড়িতে ফিরেই আগে মাছ টা ভাজি করে বাচ্চাদের খাওয়াবে।কত দিনের ইচ্ছা তার বাচ্চাদের।
ফুটপাত দিয়ে তাড়াতাড়ি হেটে বসতির ভিতর দিয়ে শেষ মাথায় খালের ধারের বাড়ির সামনে গিয়ে দাড়ালো রাশিদা।এটা রাশিদার বাপের ভিটা।এখানেই থাকে।সন্ধ্যা হয়ে গেলেও ঘরের লাইট জলছে না দেখে রাশিদার ভ্রু কুচকে যায়।বড় মেয়ে রত্না তো এমন মন ভুলা না তাহলে কি হলো কারেন্ট ও আছে তো।
রাশিদা বাড়ির ভিতরে ঢুকলো।প্রথমে এক্ষাংহর সোজাসোজি আর একটা।তারপর বারান্দা।রাশিদা ভাবলো হয়তো সভাই বারান্দা বসে পড়ছে।তবে মনের মধ্যে খুতখুতানি শুরু হলো।পুরো বাড়িটা আজ অন্ধকারে ছেয়ে আছে।রাশিদা ঘরের দরজা চাপানো দেখে রত্না বলে কয়েক বার ডাক দিলো তবে খুললো না।তাই রাশিদা খাতুন রত্না আর ছোট মেয়ে রমা কে ডাকতে ডাকতে ভিতরে ঢুকলেন তবে ঘর অন্ধকার।তিনি ঘর মাড়িয়ে অইছনের বারান্দা ঘরের দিকে এগিয়ে যেতেই কারোর গোঙানির আওয়াজে পিছু ফিরে তাকায় রাশিদা।সাথে সাথে কেও একজন সজোরে রাশিদার মাথায় বাড়ি মারে।রাশিদা পড়ে যেতে নিতেই লোকটা জোরে লাত্থি দিয়ে ফেলে দেয়।
সাথে সাথে ঘর আলোয় ভরে উঠে।ঘরের ভিতর সাত আট জন লোক দাঁড়িয়ে।রাশিদা মাটিতে পড়ে কুকড়ে উঠে।সামনে তাকাতেই দেখতে পায় তার ছোট মেয়ে রমা আর ছেলে রহিদ কে চৌকির কাঠের সাথে বেধে মুখে কাপড় গুজে দেওয়া হয়েছে।আর তার বড় মেয়ে রত্না মাটির উপরে সুয়ে কাতরাচ্ছে।শরীরে একটা বস্ত্র নেই।মাটিতে রক্তের দাগ এমনকি রতনার শরীরেও।রাশিদা এসব দেখে চিৎকার করে বলে,
-কারা আপনারা।আর আমার মেয়ে রত্না একি অবস্থা তোর।
রাশিদা খাতুন নিজের মেয়ের দিকে এগিয়ে যেতে নিতেই একজন লোক রাশিদার সামনে এগিয়ে এসে কাঠের টুল টেনে বসে। তারপর রাশিদার চুলের মুঠি টেনে ধরে এক হাত দিয়ে আর অন্য হাত গাল টিপে ধরে বলে,
-মা*গীর বাচ্চা তোর খুব সাহস।জানের মায়া নেই তোর তাইনা।একটা কথা হজম করতে পারলি না।ভাই না হয় ভুল করে একটা মেয়েকে রে*প করেছে তাই বলে তুই পুলিশ কে বলে দিবি।এতো সাহস তোর।
লোকটার কথায় রাশিদার মনে পড়ে যায় এরা কারা।আজ দুপুরে কবর স্থান রোডের পাশ দিয়ে আসার সময় এই ঘটনা দেখে ভয় পেয়ে চিল্লায় রাশিদা।পরে ওখানে ট্রাফিক কর্তব্যরত পুলিশ কে বলতেই পুলিশ এগিয়ে যায় আর রাশিদা পালায় ভয়ে।আতংকে কিছু মনে ছিলো না কারন লোক্টাকে রাশিদা চিনে এলাকার নাম করা ব্যাবসায়ী রফিক মিয়া।এই লোক ই তার রিকশা ওলা সামিকে খুন করেছিলো।কিন্তু রাশিদা আন্দাজ করতে পারেনি আজ এতো বড় বিপদ ডেকে আনবে।
রাশিদা কে চুপ থাকতে দেখে লোকটি হেসে বলে,
-বিচার চাইতে গেছিলি ধর্ষনে*র আজ তোর মেয়ে তোর চোখের সামনে দ্বিতীয় বার ধর্ষ*ন হবে তাকিয়ে দেখ।
লোকটির কথায় রাশিদা কেদে উঠে।ছেড়ে দেওয়ার আকুতি করে তার অবচেতন মন বুজে যায় তার মেয়ের সাথে কি হবে।তবে লোক গুলো শুনে না।লোকটা কাওকে ফোন দিয়ে বলে,
-চাচাজান দুই টা কচি মাল আছে।আর দুইটা ইউজ।কি করবো মাইরা দিবো নাকি আনবো??
লোকটার কথায় ফোনের ওপাশে থাকা আনাম মিয়া বলে,
-তোমার যা ভালো মনে হয় করো তবে সিয়াম কচি দুইটাকে ৩ নাম্বার গোডাউনে নিয়ে আসো।আর বাকি দুইটাকে জঙ্গলে নিয়ে গিয়ে থেরাপি দাও।
-ওকে চাচাজান।
আনাম মিয়া কল কেটে দিতেই সিয়াম ইশারা করে বাকিদের। সাথে সাথে কিছু ছেলে এসে ঝাপিয়ে পড়ে রত্নার উপর।রাশিদার মুখে কাপড় গুজে হাত পিছন থেকে বেধে দিয়েছে একজন।তার সামনেই তার আদরের বাপ মরা মেয়েটাকে ছিড়ে খাচ্ছে নরপশুরা।সিয়াম একটা সিগারেট ধরিয়ে টানে আর দেখে সেই দৃশ্য।ঠোঁটে বিশ্রি হাসি হটাত উঠে সজোরে লাথি মারে রাশিদার মুখে তার পর চৌকির পায়ার সাথে বাধা বাচ্চা দুটোর বাধন খুলএ চুল ধরে নিয়ে যায় বাইরে।হাত পা বেধে বস্তায় ভরে নেই।খালের ধারে নৌকা বাধা সেখানে তুলে দেয়।সব শেষ এ অর্ধমৃত প্রায় রাশিদা আর রত্নাকে পাজাকোলা করে চৌকির উপর পাশা পাশি রাখে লোকগুলো তারপর তাদের গায়ে কারেন্ট এর তার লাগিয়ে দিয়ে বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয়।সাথে দাউদাউ করে জলে উঠে আগুন।সিয়াম সেদিকে তাকিয়ে হেসে মাঝিকে নৌকা ছেড়ে দিতে বলে।
সন্ধ্যা হয়েছে সেই কখন।নিলাচল রেস্টুরেন্ট এ দোতলার খোলা পরিবেশ এ মুখোমুখি বসে আছে শ্রেয়সী আর মেহেরাজ। কারোর মুখে কোনো কথা নেই।বিকাল চার টাই দেখা করার কথা থাকলেও বিকালে বাড়িতে মেহমান আসার দরুন আর বের হতে পারেনি শ্রেয়সী তাই তোহা বুদ্ধি করে শ্রেয়সী কে দিয়ে কল করে বলিয়েছিলো সন্ধাই আসতে।
শ্রেয়সীর কথা মতো মাগরিবের আজান পড়তেই মেহেরাজ মসজিদ থেকে নামাজ পড়ে সোজা এসে দাঁড়ায় শ্রেয়সী দের বাড়ির সামনে।খানিক্ষন আগেই আলতাফ শেখ দোকানে চলে গেছে আর সিয়াম তো শহরের বাইরে তাই শ্রেয়সীর ভয় নেই।তোহাকে সাথে করে নিয়ে শ্রেয়সী বাইরে আসে।শ্রেয়সীর পরনে মেরুন রঙের একটা গাউন।চুল গুলো ছেড়ে দেওয়া।মুখে তেমন কিছু মাখে নি তবে কপালে ছোট্ট কালো টিপ চোখে চিকন করে কাজল দেওয়া।ঠোঁটে ডার্ক রেড লিপস্টিক।
হটাৎ শ্রেয়সীকে এই রুপে দেখে মেহেরাজের হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়।অবাক হয়ে যায় শ্রেয়সীকে দেখে।হা হয়ে তাকিয়ে থাকে সে দিকে।আশ্চর্যের বিষয় তাদের ড্রেসের রঙ এক হয়ে গেছে আজ।যা শ্রেয়সীর চোখ এড়াই।শ্রেয়সী মেহেরাজের সামনে এসে দাড়াতেই মেহেরাজে ধ্যান ভাঙে।শ্রেয়সী লজ্জায় মাথা নিচু করে সালাম দেই।মেহেরাজ সালামের উত্তর দিয়ে পাশে তাকাতেই তোহার সাথে চোখাচোখি হয়ে যায় মেহেরাজে।সাথে সাথে মেহেরাজ চিনে যায় তোহাকে।তোহার দিকে তাকিয়ে বলে,
-তুই এখানে??
মেহেরাজের কন্ঠ শুনে শ্রেয়সী মুখ উচু করে তাকায়।কাকে আবার তুই করে বললো এই লোক।তোহার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে শ্রেয়সী শান্ত কন্ঠে বলে,
-আমার ভাবি।
শ্রেয়সীর কথা শুনে মেহেরাজ আরো বেশি অবাক হয়।মেহেরাজ কিছু বলতে যাবে তার আগে শ্রেয়সী বলে,
-আপনি চিনেন ভাবিকে??
শ্রেয়সীর কথায় তোহা আঙুল দারা কানের পাশের চুল চুল্কে কিছু একটা ইশারা করে মেহেরাজের উদ্দেশ্যে। তা মেহেরাজের বোধগম্য হয় না।মেহেরাজ তোহাকে চিনে বলতে যাবে তার আগেই তোহা বলে উঠে,
-কি বলো চিনবে কি করে।আজ ই তো আমাদের প্রথম দেখা।আমার ননদাই হয়।এবার চিনে নিবো।
তোহার বাধাপ্রাপ্ত কথা শ্রেয়সীর সন্দেহ লাগে।এদিকে মেহেরাজের ও কপাল কুচকে যায়।তখন তোহা মেহেরাজের দিকে তাকিয়ে বলে,
-তো ননদাই মশাই আমার ননদিনীকে নিয়ে যাচ্ছেন যান।আবার আমার হাতে তুলে দিয়ে যাবেন মনে করে।আমার ননদিনী কিন্তু ছোট ওকে বকবেন না।
তোহার কথায় শ্রেয়সীর ভিষন লজ্জা লাগে মাথা নুইয়ে নেই।তা দেখে তোহা মেহেরাজের দিকে তাকিয়ে নিজের হাতের মোবাইল ইশারা করে ইশারায় বলে,
-সব পরে মোবাইলে বলে দিবো এখন তুই একে নিয়ে যা।
তোহার ইশারা বুজতে পেরে মেহেরাজ সস্তির একটা নিঃশ্বাস ছাড়ে। সে ভেবেছিলো এই মেয়ে তাকে সত্যি ভুলে গেলো নাকি।তোহার তাড়া দেওয়ায় মেহেরাজ শ্রেয়সীকে বাইক এর পিছনে বসিয়ে বাইক স্টার্ট দেয়।শ্রেয়সির কেমন গিলটি ফিল হচ্ছিলো তখন মেহেরাজ বলে,
-আপনার আনকম্ফর্টেবল লাগতেই পারে কিন্তু ধরে না বসলে রাস্তায় পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে ধরে বসুন।
মেহেরাজের কথায় শ্রেয়সী লজ্জায় আতষ্ট হয়ে মেয়েরাজে ঘাড়ে হাত রাখে।মেহেরাজ এই প্রথম কোনো নারিকে নিজের বাইক এর পিছনে নিয়েছে তাও আবার নিজের হালাল স্ত্রী। ফলে বুকের ভিতর তোলপাড় চলছে তার।তার পর রেস্টুরেন্টে এসে খাবার অর্ডার দিয়ে সেই থেকে চুপচাপ বসে আছে দুজন।
নিরবতা ভেঙে মেহেরাজ কাশি দেয় শ্রেয়সী মনযোগ আকর্ষন এর জন্য। কাজ ও হয়।শ্রেয়সী মেহেরাজের দিকে তাকাতেই মেহেরাজ শান্ত কন্ঠে বলে,
-এবার কাজের কথায় আসা যাক??
-জ্বী।
-আমাকে আপনার খারাপ মনে হয়।কি কি ভাবেন আমাকে মনে মনে।সেগুলো যদি একটু বলতেন তাহলে এই সম্পর্কের সকল ভুল ধারনা গুলো ভেঙে দিতে পারতাম।কারন সেদিন বুজেছিলাম আমার উপরে আপনার প্রচন্ড রাগ।কারনটা আমি জানলেও আপনি আর একবার বলেন।আশা করি সব কিছুই বলবেন।
লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ১৭
মেহেরাজের শান্ত কন্ঠে শ্রেয়সীর ভিতরে অপরাধবোধ বাসা বেধে ফেলে।লজ্জা আর অপরাধবোধ নিয়ে নিজের মাথা নিচু করে ফেলে।সেদিন আসলেই তার সম্পর্কে ভুল ধারনা নিয়েই পাব্লিক প্লেস এ ঝামেলা করলো।তাই নিয়ে নিজের মধ্যে ভিষন অপরাধী ফিল আসছে শ্রেয়সীর।কি বলবে সে এখন??
