Home লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৫৬

লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৫৬

লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৫৬
নুসাইবা আরা নুরি

সোফাই বসে থাকা সকলের মাঝে এক অদ্ভুত নিরবতা বিরাজমান।মাথা নিচু করে বসে আছে সকলে।সবারই যেনো চোখ মুখ হতাশায় ডুবে আছে।একটু আগে মেহেরাজের অফিস থেকে ফোন দিয়েছিলো।একটা গুরুত্বপূর্ণ মিশনের জন্য ইমিডিয়েটলি নিজের কর্মস্থানে মেহেরাজ কে যেতে বলা হয়েছে আজ রাতেই।ফোন লাউড স্পিকারে থাকায় সকলেই শুনেছে ক্যাপ্টেনের কথা।আর তখন থেকেই সকলেই নিরব।এক রাশ মন খারাপ এসে ভিড় করেছে সবার মাঝে।
সবার নত হয়ে যাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে মেহেরাজ।তারপর নিরবতা ভেঙে গলা পরিষ্কার করে খুক খুক করে কাশি দিয়ে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।সবাই মেহেরাজের দিকে তাকানোর পর মেহেরাজ স্বাভাবিক ভাবে গম্ভীর গলায় বলে উঠে,

-জানিনা কোন মিশনে যেতে হবে আবার ওই নীল সমুদ্রের বুকে।তোরা দেখলি তো ক্যাপ্টেন কথা টা বলেই কল কেটে দিলো।যার মানে আমার যাওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ।তবে সমস্যা নেই আমি যাবো না।আমি ক্যাপ্টেন কে ফোন দিচ্ছি।দিয়ে যেকোনো একটা মিথ্যা অযুহাত দিয়ে দিচ্ছি।আমি চাচ্ছি না আমার জন্য তোদের এই মিশনে অংশ নেওয়ার আগেই মন খারাপ হয়ে যাক।তাই আমি এখানেই থাকবো তোদের সাথে।
যেভাবেই হোক ক্যাপ্টেন কে রাজি করাচ্ছি
তোরা শুধু শান্ত থাক।মিশনে অংশ নেওয়ার সম্পুর্ন প্রস্তুতি নে।কখন কি বলে এই অনুভব চ্যাটার্জী সেটা কাটায় কাটায় পালন কর।আশা করি এই মিশন টা কম্পিলিট হবে দ্রুত।
মেহেরাজের বলা কথাগুলো সবাই মনযোগ দিয়ে শ্রবন করব।মেহেরাজ থামার পর তোহা পাশ থেকে মেহেরাজের বাহুতে মৃদু চড় দিয়ে শান্ত গলায় বলে উঠে,

-উহু তোর কোনো মিথ্যা বলা লাগবে না দোস্ত।আমি যানি তুই মিথ্যা কথা বলিস না।তাই আমাদের জন্য তোর মিথ্যা বলা লাগবে না।তুই নিজের মিশনে যা দোস্ত। শুধু দোয়া করিস যাতে আমরা সফল হতে পারি।আর আমিও দোয়া করি তুই ও সফল হো। তবে তুই থাকলে মনে আর একটু জোর পেতাম তবে আমি চাইনা তুই আমাদের সাথে থাকার জন্য ক্যাপ্টেনের সাথে মিথ্যা কথা বল।তাই তুই যা আমার কথা শোন।
তোহার কথায় সকলেই একমত হয়।তবুও মেহেরাজের মন মানতে চাইনা।তুহিন,মিলি,ইভান সবাই এক এক করে বোজায় মেহেরাজকে।অনেক বোজানোর পর মেহেরাজ রাজি হয়। তারপর শান্ত গলায় বলে,
-যেহেতু আমি থাকবো না এখানে।আবার কোয়ার্টারেও থাকবো না।তাই শ্রেয়সী কে নিয়ে যেতেও পারবো না আবার দেখেও রাখতে পারবো না আমি আপাতত।তোরাও তো সব সময় বাড়িতে থাকবি বলে মনে হয় না।শ্রেয়সী কি একা থাকবে??
মেহেরাজ থামে তারপর সবার মুখের দিকে এক নজর তাকিয়ে আবার বলে,

-এই মিশন শেষ হবার আগে কাওকে কোনো ভাবেই তোহা বা তুহিনের আসল পরিচয় জানতে দেওয়া যাবে না।সেটা শ্রেয়সী হোক কিংবা অন্য কেও।এই মিশন শেষ হওয়ার সবাই এমনিতেই হান্তে পারবে তখন ই জানুক এর আগে না।আপাতত চিন্তা।শ্রেয়সী একা বাড়িতে কিভাবে থাকবে??
মেহেরাজের কথায় সকলে আবার চিন্তায় পড়ে যায়।একে অপরের মুখ চাওয়া চাওয়ি করতে শুরু করে।তখন মেহেরাজ বলে উঠে,
-আমি ফাহিম আর নিশাদ কে আসতে বলি এখানে।যদিও ফাহিম কোনো হেল্প করতে পারবে না সকাল বেলা সিড়িতে পড়ে গিয়ে ওর হাতে ব্যাথা পেয়েছে।ডাক্তার হাত নাড়াতে নিষেধ করেছে।তবে নিশাদ পারবে।কারন এই মিশনের ও নিজেও একটা অংশ।আর শ্রেয়সী কে দেখার জন্য ফাহিম আর ইরু এখানে থাকলে আর কোনো সমস্যা হবে না আমার মনে হয়।

-কিন্তু কেও তো জানে না তোহা আর শ্রেয়সী এখানে।যদি ফাহিম বা ইরু অন্য কাওকে বলে দেয়??
মিলির কথায় মেহেরাজ মিলির দিকে তাকিয়ে বলে,
-আগে আমি ফাহিম কে সব বুজিয়ে বলবো।আর ফাহিম এমনিতেও কাওকে বলবে না।আর ফাহিম ইরুকেও বলে দিবে।আর নিশাদ কে তুই কল দিয়ে আসতে বল।ওর সম্ভবত ডিউটি শুরু হয়ে গেছে চট্রগ্রামেই আছে।সবাই আসার পর ওদের এখানে রেখে গিয়ে আমি অফিসে গিয়েও শান্তি পাব।
মেহেরাজের কথায় সবার মাঝে এক
রাশ শান্তির বন্যা বয়ে গেলো।যাক একটা না একটা উপাই তো হয়েছে।মেহেরাজ টি টেবিলের উপরে থাকা ফোন টা হাতে নিয়ে উঠে দাড়ালো।তারপর মোবাইলে টাইম দেখে তোহার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলে,
-দোস্ত এলাচি দিয়ে একটু চা বানা সবার জন্য প্লিজ।আর কাজি আসার সময় হয়ে গেছে।নাস্তা গুলো রেডি কর দ্রুত।আমি তার ভিতরে কথা শেষ করে নেই ফাহিমের সাথে।আর শ্রেয়সীর কি অবস্থা একটু দেখে আসি।
-আচ্ছা যা।
মেহেরাজ আর না দাড়িয়ে ঘরে দিকে চলে গেলো।মেহেরাজ যাওয়ার পরপরই তোহা ও উঠে রান্না ঘরে চলে যায়।এদিকে সোফায় বসা তিনজন নিজেদের মুখ চাওয়া চাওয়ি শুরু করে।কাজি আসবে কেন হটাৎ।কিছুই বোধগম্য হলো না ওদের।

ঢাকার একটা ফাইভ স্টার হোটেলের রুমে রকিং চেয়ারে বসে দুলছে আর সিগারেট টানছে আনাম মিয়া।তার ঠিক পাশেই বিছানায় অর্ধ*নগ্ন হয়ে বসে আছে এক নারী।মুখে ভারী মেকাপ।ঠোঁটে গাড়ো লাল লিপস্টিক।চুল গুলো খুলে রাখা।
আনাম মিয়ার মন আজ বেশ ফুরফুরে।তাইতো পতিতা*পল্লি থেকে সব থেকে কড়া মেয়েটাকেই আজ বিছানায় এনেছে।মনে জন্মানো সুখের খায়েশ মেটাবে বলে।আজ বেশ মোটা অংকের টাকা ঢুকেছে একাউন্টে।প্রায় পঞ্চাশ টা মেয়েকে সফল ভাবে রাশিয়ার মাফিয়াদের হাতে তুলে দিতে পেরেছে।তার সাথে ঢাকা থেকে কাজের লোভ দেখিয়ে প্রায় দশটা অল্প বয়সী মেয়েকে নিজের ডেরায় পাঠাতে পেরেছে সফল ভাবে।
আর কি লাগে আনন্দ করতে।তবে আনন্দের মাঝেও আনাম মিয়ার রাগ হয় ভীষন।সিয়ামের বোনটাকে হাতের নাগালে পেলোনা।সেদিন তারা যখন গিয়েছিলো ততক্ষনে অন্য কেও এসে তোহা আর শ্রেয়সীকে তুলে নিয়ে গিয়েছিলো।সেদিন প্রচন্ড রাগে ফেটে পড়েছিলো আনাম মিয়া।পরএ বুজতে পেরেছিলো যে অনুভব চ্যাটার্জীর লোকের কাজ।তবে কেনো তা জানা নেই আনাম মিয়ার।

নিজের রাগ কমাতে তার আন্ডারগ্রাউন্ড ডেরায় গিয়ে এক বারো বছরের বা*চ্চা মেয়ের উপর পশুর মতো হামলে পড়ে।আশ পাশে সকল নারীরা ভয়ে শিউরে উঠেছিলো সেদিন।বাচ্চাটার ভয়ংকর মৃত্যু দেখে।তবে আনাম মিয়ার একটুও খারাপ লাগে নি।বাচ্চা মেয়েটাকে সবার সামনে ধ*র্ষন করে মেরেই তবে শরীরে পুর্ন তৃপ্তি পেয়েছিলো।
সেদিন রাতেই সংসদের কাজে ঢাকা চলে আসে আনাম মিয়া।পরে জানতে পারে সিয়াম তাকে খুজতে গিয়েছিলো তার বাড়িতে।তবে কেনো গেছে তা জানেনা আনাম মিয়া।তবে আন্দাজ করতে পেরেছে।সিয়ামের চতুর মন নিশ্চয় বুজতে পেরেছে আনাম মিয়া কিডন্যাপ করিয়েছে।তবে বাস্তবতা তো ভিন্ন আনাম মিয়া নাগালেই পাইনি মেয়ে দুটোকে।

তবে পরেরদিন আলতাম শেখ এর স্ট্রোক এর কথা শুনে খুব খারাপ লেগেছিলো আনাম মিয়ার।তবে মনের মাঝে কোথাও একটা প্রশান্তি ও কাজ করছিলো।কেন তাও যানা নেই আনাম মিয়ার।
আনাম মিয়া সিগারেট টা মেঝেতে ছুড়ে ফেলে দিয়ে উঠে দাঁড়ায়।ইদানিং ভুড়ি বেড়ে গিয়েছে তার।শরীরের প্রতি খেয়াল রাখা হয় না।এবার চট্রগ্রামে ফিরে নিজের শরীরের যত্ন নিতে হবে।তার আগে সিয়াম বেশি চালাকি করলে ওকে উপরে পাঠিয়ে দিবে।তারপর অন্য কাজ।চলার পথে কাটা আসলে তা টুকুস করে উঠিয়ে আবার টুকুস করে সরিয়ে ফেলতে হয় সামনে থেকে।যেনো পরবর্তীতে পায়ে না আটকে যায়।
আনাম মিয়া হাসে।সংসদে আর দুইদিন কাজ আছে তারপর চট্রগ্রামে ফিরে যাবে।তারপর যা করার করবে।এখন আপাতত নিজের খায়েশ মেটানোতে আগ্রহী সে।আনাম।মিয়া ধীর পায়ে মহিলাটার দিকে এগিয়ে যেতেই মহিলাটা ঠোঁট কামড়ে হেসে আনাম মিয়ার গলা জড়িয়ে ধরে কাছে টেনে নেয় আনাম মিয়াকে।

ইরুর আজ ভীষন মন খারাপ।চোখ দিয়ে অঝোরে পানি পড়ছে।বিছানার এক কোনে বালিশ জড়িয়ে ধরে একাধারে ফুফিয়ে কেদে যাচ্ছে মেয়েটা।ইরুর থেকে কিছুটা দূরে বসে করুন চোখে ইরুর মুখের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ফাহিম।ইরুর আজকের মন খারাপের শান্তনা দেওয়ার কোনো ভাষা তার জানা নেই।
আজ সকালে যখন বাড়িতে ফেরার পথে সিড়িতে পড়ে হাতে ব্যাথা পেয়েছিলো ফাহিম।তখন ইরুকে সাথে নিয়ে ডাক্তারের কাছে গেছিলো ।আর সেখানে একটা বাচ্চা ছেলেকে তার বড় বোনের সাথে খুনশুটি করতে দেখার পর থেকেই ইরুর মন খারাপ।

বাড়িতে ফেরার পর আরো বেড়ে যায় তা বহুগুনে।সাহিদা খাতুন জিজ্ঞাসা করলেও কিছু বলেনি ইরু।দুপুরে খাইনি।পরে ফাহিম ইরুকে মন খারাপের কথা জিজ্ঞাসা করতেই ইরু তার ভাইয়ের কথা জিজ্ঞাসা করে বসে।সাথে এটাও বলে যে সে তো কথা দিয়েছিলো বিয়ের পর তার ভাইকে তার কাছে এনে দিবে।তাহলে কথা রাখেনি কেন।
ইরুর কথায় ফাহিম প্রতিউত্তর না করলে ইরু আরো রেগে যায়।কাদতে শুরু করে অভিমানে।শেষ অব্দি ফাহিম আর ধরে রাখতে পারে না নিজেকে।সব বলে দেয় ইরুকে।সেদিন তারা ইরুর ভাইয়ের সন্ধান পেলেও সেখানে গিয়ে তার ভাইকে আর জীবিত পায়নি।তবে তা বললে হয়তো ইরু ফাহিমকে বিয়ে করতো না।আর করলেও অনেক জোর করা লাগতো।তাই মিথ্যা টা বলেছিলো।

লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৫৫

ফাহিমরা সেদিন ইরুর ভাইয়ের সদ্য পচতে শুরু করা লাশ পেয়েছিলো।যার চোখ,, কিডনি,,হৃদপিন্ড কিছুই ছিলো না।পেট এ অনেক বড় কাটা।সেখানে আরো চারটে বাচ্চার লাশ পেয়েছিলো ওরা।এটাই এতদিন লুকিয়ে গেছে ইরুর থেকে।যে ওর ভাই আর নেই।ফাহিমের মুখ থেকে কথাটা শোনার পর ইরু প্রথমে বিশ্বাস না করলে। ফাহিম মোবাইল এর গ্যালারি ঘেটে ছবি দেখানোর পর থেকেই শব্দ করে কাদতে শুরু করেছে মেয়েটা।ফাহিম চাইলেও শান্তনা দিতে পারছে না ইরুকে।

লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৫৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here