লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৫৭
নুসাইবা আরা নুরি
ঘড়ির কাটায় রাত এগারোটা পেরিয়েছে বহু আগে।মেহেরাজের ভাড়া নেওয়া ফ্লাটের ডাইনিং টেবিলে বসে রাতের খাবার খাচ্ছে সকলে।সন্ধা বেলা কাজি এসেছিলো।মেহেরাজ আর তোহা আগেই প্লানিং করে কাজি এনেছিলো কাজিকে।গত রাতের তুহিনের কথা শোনার পর পরই তোহা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছিলো তুহিনের সাথে পুনরায় মিলিকে বিয়ে দিয়ে ভাই ভাবিকে এক সাথে রাখবে।তার জন্য কেন মিলি কষ্ট পাবে।তাদের সংসার টা কেন থেমে থাকবে।
সেসব মেহেরাজ কে খুলে বলার পর মেহেরাজ আর কথা বাড়াইনি কাজি ডেকেছিলো।সন্ধাবেলা ঘরোয়া ভাবেই বিয়ে হয়ে যায় তুহিন আর মিলির।প্রথমে বিশ্বাস করে উঠতে পারছিলো না মিলি।তারপর তোহাকে জড়িয়ে ধরে অসম্ভব কান্না।মিলির কান্নাতেও তোহা নিজের মনের প্রশান্তি খুজে পেয়েছিলো এক দন্ড।
মেহেরাজ কল দেওয়ার পর পরই নিশাদ আর ফাহিম চলে এসেছে।ওদের আসতে আসতে রাত নয়টা বেজে গিয়েছিলো।তারপর গল্প করতে করতে এখন খেতে বসেছে।ফাহিম আগেই ইরুকে নিষেধ করেছে যে শ্রেয়সীর বাবা যে স্ট্রোক করেছে সেটা শ্রেয়সী কিংবা কাওকে না জানাতে মেহেরাজ নিষেধ করেছে বলতে।ইরু ও কোনো প্রশ্ন ছাড়াই মেনে নিয়েছে ফাহিমের কথা।
ভাই হারানোর বেদনায় বুক ভার হয়ে আছে তার।এসে এক দফা শ্রেয়সী কে জড়িয়ে কেদে নিয়েছে।ভাই হারানোর শোক কিছুটা হলেও কাটিয়ে উঠতে পেরেছে নিজের প্রানের বান্ধুবীকে ফিরে পেয়ে।তখন আসার আগে ফাহিম যখন শ্রেয়সীর কথা বলেছিলো তখন ইরু এক লাফে সব কষ্ট ভুলে গিয়েছিলো ক্ষনিকের জন্য।শ্রেয়সী ও ইরুকে দেখতে পেয়ে আবেগে আপ্লুত হয়ে ইরুকে জড়িয়ে ধরে অশ্রু ঝরিয়েছিলো।
শ্রেয়সীকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে সোফায় বসে আছে মেহেরাজ।মেহেরাজের ভিষন খারাপ লাগছে শ্রেয়সী কে রেখে যেতে।তবে করার কিছু নেই।সময় রাত একটা।মেহেরাজের অফিসের গাড়ি বিল্ডিংয়ের এর নিচে এসে সবে মাত্র থেমেছে।শ্রেয়সী মেহেরাজ কে জড়িয়ে ধরে কেদে চলেছে একা ধারে। যখন থেকে শুনেছে মেহেরাজ চলে যাবে তখন থেকে মন খারাপ করে কেদে চলেছে।মন খারাপের জন্য রাতে খেতে চাইনি শ্রেয়সী তবে মেহেরাজ জোর করে গালে তুলে খাইয়ে দিয়ে ওষুধ খাইয়ে দিয়েছে।
বেশ কিছুক্ষন যাওয়ার পর মেহেরাজ আলতো করে শ্রেয়সীর মাথার চুলে হাত বোলাতে বোলাতে বলে,
-তুমি তো জানো তোমার স্বামির প্রফেশন কী।এমন কাদলে হয় বলো।আমার ও তো খারাপ লাগছে তোমার চোখের পানি দেখে।তুমি কাদলে আমি ওখানে গিয়ে কাজে ফোকাস করবো কিভাবে পাখি।
শ্রেয়সী চুপ কোনো কথা নেই মুখে।শুধু ক্ষনে ক্ষনে ফুফিয়ে উঠছে।সোফায় সকলে তাদের দিকে চেয়ে বসে আছে।সবার ই মন খারাপ কিছুটা।মেহেরাজ এর চলে জাওয়া নিয়ে।আজ কত মজা হলো। কত সুন্দর একটা সময় কাটলো দ্য শ্যাডো সেক্টর সেভেন গ্রুপের সাত বন্ধু একত্রে বসে কত আড্ডা দিলো।আর আল্লাহ চাইলে হয়তো এই মিশন শেষ করার পর সবাই একত্রে হবে।
মেহেরাজ এমটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আবারো শ্রেয়সীর মাথার চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,
-গাড়ি এসে দাঁড়িয়ে আছে পাখি। আমি যদি কোয়ার্টারে থাকতাম সত্যিই তোমাকে নিয়ে যেতাম।কিন্তু আমি থাকবো গভীর সমুদ্রে কখন কোথায় ডিউটি নিজেও জানিনা।তোমাকে ছাড়া কি আমি থাকতে পারবো তুমি এমন কাদলে।বোকা মেয়ে।আমি খুব দ্রুত আবার ফিরে আসবো জান-পাখি।আর সময় পেলে তো কথা হবেই।
মেহেরাজ ঘরে বসে অনেক্ষন ধরে বুজিয়েছে শ্রেয়সী কে আবার এখন এখানেও বোজাচ্ছে।তবে শ্রেয়সীর কান্না যেনো থামছে না খারাপ লাগছে ভীষন মেহেরাজের।ইচ্ছা করছে বুকে জড়িয়ে রেখে দিতে এভাবেই।তবে তা তো আর এখন সম্ভব না।
মেহেরাজ শ্রেয়সী কে নিজের থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে শ্রেয়সীর কপালের মাঝ বরাবর সবার সামনে একটা চুমু খেলো।তারপর শ্রেয়সী কান্নামাখা মুখটা নিজের দুহাতের আজলায় নিয়ে এসে শান্ত গলায় বলল,
-যদি অনুমতি দাও তাহলে এবার আসি জান-পাখি।হাতে টাইম নেই আর।
মেহেরাজের কথায় চোখ ভিজে উঠে শ্রেয়সীর।তবুও বুকে পাথর চেপে হ্যা বোধক মাথা নাড়ায়।মেহেরাজ তা দেখে চাপা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তোহার দিকে চোখ দিয়ে কিছু একটা ইশারা করে। সঙ্গে সঙ্গে মেহেরাজের ইশারা বুজতে পেরে তোহা এগিয়ে এসে শ্রেয়সীর পাশে বসে।তোহার দেখাদেখি ইরু আর মিলিও এগিয়ে আসে শ্রেয়সীর কাছে।
মেহেরাজ ছোট্ট একটা ল্যাগেজ হাতে উচু করে নিয়ে সবার দিকে তাকিয়ে পুনরায় চাপা একটা শ্বাস ছেড়ে বলে,
-নিজেদের কাজে সম্পুর্ন ফোকাস করবি।কষ্ট হলেও অন্তরে চেপে রাখবি।কষ্ট টা যেনো মুখে প্রকাশ না পায়।সব সময় সকলে শক্ত থাকবি।আর আমি আমার হৃদপিন্ডের অর্ধেক তোদের কাছে আমানত রেখে গেলাম।দেখে রাখিস।আর আমি সময় পেলেই কল দিবো ম্যাসেজ এ কথা হবে সবার সাথে।দোয়া করি সব ভালোই ভালোই হোক।
মেহেরাজ আর কথা না বাড়িয়ে শ্রেয়সী নত হয়ে যাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে সদর দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেলো।তুহিন, ইভান নিচ পর্যন্ত এগিয়ে দিতে চাইলে মেহেরাজ মানা করে ফাও নিচে গিয়ে কি করবে।মেহেরাজ নিচে এসে গাড়িতে উঠে বসে। মেহেরাজ গাড়িতে ওঠার কিছুক্ষন বাদেই গাড়ি ছেড়ে দেয়।ঘরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে শ্রেয়সী আর তোহা তা দেখে।মেহেরাজের গাড়ি অদুরে চলে যাওয়ার পর শ্রেয়সী কে নিয়ে তোহা ঘরের ভিতরে চলে আসে।
তোহা শ্রেয়সীকে আর ইরু কে মেহেরাজের ঘরে থাকতে বলে আর আজ সেও সেখানে থাকবে।প্রথমত মেহেরাজ বলে গিয়েছে শ্রেয়সীর কাছে থাকতে আর দ্বিতীয়ত ফ্লাটে ঘর তিনটা।তোহা, মিলি আর তুহিন কে আজ এক ঘরে দেয় আলাদা প্রাইভেট স্পেস দেওয়ার জন্য। যেহেতু বিয়ের দুই বছর পার হলেও ওরা একে অপর কে কাছে পাইনি এক মুহুর্তের জন্য ও একান্ত ভাবে তাই তোহা ওদের একত্রে থাকতে দিয়েছে।আর বাকি ছেলেদের এক ঘরে দিয়েছে।যেহেতু তিনটে ঘর তাই মিলেমিশেই থাকতে হবে।তবে কেও কোনো অভিযোগ করেনি।সবাই সবার মত ঘুমিয়ে পড়েছে।
শ্রেয়সী মেহেরাজ এর জন্য কাদতে কাদতে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেছে।তার পাশে সোয়া ইরুও গভীর ঘুমে।শুধু ঘুমাইনি দুই নিশাচর রাতজাগা পাখি।
মাটির প্রায় দশ ফুট গভীরে বিশাল ট্যানেল।উপরে জনমানব পুর্ন ব্যাস্ত সড়ক।গভীর রাত ট্যানেলের ভিতর দিয়ে কানে ব্লুতুথ লাগিয়ে এক মানব বেশ শান্তিপূর্ণ ভাবে নিজের পোষা কুকুর কাইজার কে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে নিজ গন্তব্যে।কাইজার হলো লুপো ইতালিয়ানো প্রজাতির এক হিংস্র কুচকুচে কালো রঙের কুকুর।তবে মানব টির বেশ বিশ্বস্ত সে।মানব টির একটা ইশারায় কুকুর টি সামনে থাকা মানুষ কে মুহুর্তেই আহত করে দিতে সক্ষম।
কুকুরটির সম্পুর্ন শরীর কালো কুচকুচে।অন্ধকারে সবুজ চোখ জোড়া জ্বলে উঠে বারংবার।কুকুর টির পিছু পিছু মানব টি বেশ কিছুদুর হাটার পর কাঙ্খিত একটা যায়গায় এসে থামে মানব টি।চোখের নাইট ভিষন সানগ্লাস টা ঠিক করে একটা স্যাতস্যাতে ভেজা দেওয়ালের পাশে পানির পাইপ এর দিক বন্ধ করতেই দেয়ালে ছোট্ট একটা পোর্টাল খুলে যায়।মানবটি সেটা দেখে ফিচলে হেসে হাতের হ্যান্ডগ্লাভস টা খুলে ফিংগারপ্রিন্ট স্ক্রীনে হাত রাখে।
মানব টির হাত স্কান হতেই অপর পাশের একটা দরজা শব্দ করে খুলে যায়।মানব টি হাত বের করে নিয়ে আবারো পানির পাইপ এর দিক পরিবর্তন করে দেয় সাথে সাথে ফিংগারপ্রিন্ট স্ক্রীন আবারো দেয়ালের মাঝে ঢুকে যায়।মানবটি আর এক মুহুর্ত দেরি না করে কাইজার কে নিয়ে প্রবেশ করে সেই দরজার ভিতরে।
দরজার ভিতরেও দরজা দুইটা দরজা পার হওয়ার পর। কাইজার কে রেখে লাস্ট দরজায় সিক্রেট একটা কোড দিতেই ফোশ ফোশ শব্দে দরজা টা খুলে যায়।মানব টি ভিতরে প্রবেশ করতেই ভিতরে উপস্থিত দাঁড়িয়ে সালাম দেয় মানব টিকে।মানব টি সবার দিকে এক পলক তাকিয়ে সালামের প্রতি উত্তর করে সোজা হেটে মনিটরিং রুমের দিকে চলে যায়।
মনিটরিং রুমের দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করে মানবটি।চোখ যায় এক পাশের দেয়ালে ঘেষা অসংখ্য টিভির স্ক্রীনে।সব কয়টায় আলাদা আলাদা ফুটেজ চলছে।আর কয়েকজন বসে বসে সেগুলো মনিটরিং করছে মনযোগ দিয়ে।
মানব টি ভেতরে প্রবেশ করার পর মানব টির দিকে ফুয়াদ এগিয়ে এসে সালাম দিয়ে বলে,
-এতো দেরি হলো যে স্যার??
ফুয়াদের কথার প্রতি উত্তরে মানব টি গম্ভীর স্বরে বলল,
-চরবাজারের মোড়ে দুটো মেয়ের লা*শ পাওয়া গেছে।সম্পুর্ন উলঙ্গ।চোখ নেই মেয়ে দুটোর।সেজন্যই রাস্তায় জ্যাম ছিলো।তোমরা খোজ লাগাও মেয়ে দুটোর সম্পুর্ন ডিটেইলস আমার চাই
কথাটা বলে মানব টি নিজের মুখে পরা কালো মাস্ক টা খুলে পাশে থাকা ডাস্টবিন এ ফেলে।সাথে হ্যান্ডস গ্লাভস গুলো খুলে ফেলে।নিজের মাথায় দেওয়া ক্যাপ টা খুলে চুল গুলো ঝাড়া দেয়।
লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৫৬
ফুয়াদ চলে গেছে বাকি টিম মেম্বার দের বলতে ইতিমধ্যে।মানবটি হলো এই অন্ধকার রাজ্যর রাজা।আর ফুয়াদ হলো তার সেনাপতি।
মানব টি নিজের নাইট ভিষন সানগ্লাস টা খুলে মনিটরিং রুমের পাশে নিজের পারসোনাল রুমে প্রবেশ করতেই একটা এ আই এর রোবোটিকস বিড়াল বলে উঠে,
-হ্যালো,দ্যা আন্ডারওয়ার্ল্ড কিং।হাও আর ইউ??
