শিরোনামহীন অনুভূতি সিজন ২ পর্ব ১৯
রুহানিয়া ইমরোজ
কুয়াশাজড়ানো শীতের সকাল। আঁধার বিলীন হয়ে সূর্যের আগমন ঘটেছে ধরণীতে। প্রিমার বুকের সাথে লেপ্টে শুয়ে আছে মেহরিমা।ছোটো বোনকে আঁকড়ে ধরে নিশ্চুপে সিলিংয়ের দিকে চেয়ে আছে প্রিমা।
মস্তিষ্কে ঘুরপাক খাচ্ছে হাজারটা চিন্তা। ফারজানাকে বাসায় আনতে হবে আজ। এরপর কীভাবে সবকিছু সামাল দিবে সেটাই বুঝছে না৷ আরশিয়ান একরোখা পুরুষ। দিন হোক কিংআা রাত, প্রিমাকে তার চাই। বুদ্ধিমান ফারজানাকে ফাঁকি দিয়ে বের হওয়া কী এতটা সহজ হবে?
এখন না-হয় ম্যানেজ করে নিবে কিন্তু প্রেগন্যান্সি কীভাবে লুকাবে ? চিন্তায় অস্থির শ্বাস ফেলে প্রিমা। টেনশনে সারারাত ঘুমাতে পারেনি বিধায় শরীরটাও খারাপ লাগছে। এরমধ্যে হুট করে এলার্ম বেজে উঠে৷
তীব্র শব্দে নড়েচড়ে উঠে মেহরিমা। প্রিমারও ধ্যান ভাঙ্গে। মেহরিমার বাহুতে হাত রেখে বলে,
–” বাবুইপাখি? উঠো সোনা। নাস্তা সেরে জলদিই বেরোতে হবে।
মেহরিমা নিভু নিভু চোখে চেয়ে হুঁ হাঁ করে ওপাশ ফিরল। প্রিমা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে বসে জোর গলায় বলল,
–” বাস তোরে ফেলে চলে যাবে কিন্তু..
মেহরিমা ঘুম ঘুম গলায় জবাব দিল,
–” আমিও বাস ওয়ালার বউ নিয়ে চলে যাব ..
প্রিমা হতাশ চোখে চাইল। এই দুষ্টু মেয়েটার কী যে করবে। একটা মানুষ কত ঘুমকাতুরে হতে পারে সেটা মেহুকে না দেখলে কেউ বুঝবে না৷
প্রিমা কম্বল টেনে ধরে বলল,
–” শরীর ভালো না আমার। জলদিই উঠ। রান্নায় হেল্প লাগবে..
বোনের কথা শুনে অতি কষ্টে চোখ মেলে তাকাল মেহরিমা। তা দেখে প্রিমা কিচেনে গেলো। খানিক্ষন বসে থেকে মেহরিমাও ফ্রেশ হয়ে বেরুলো। রান্নাঘরে গিয়ে দেখল প্রিমা ব্রেড টোস্ট করছে।
মুহূর্তের মাঝে ভ্রু কুঁচকে গেল তার। ভেবেছিল, তাকে জাগানোর জন্য প্রিমা মজা করছে কিন্তু এখন মনে হচ্ছে সে আসলেই অসুস্থ। মেহরিমা তড়িঘড়ি করে এগিয়ে এসে বলল,
–” আপা? শরীর খারাপ লাগছে?
প্রিমা ক্লান্ত গলায় বলল,
–” এমনিতেই একটু খারাপ লাগছে।
মেহরিমা চিন্তিত গলায় বলল,
–” আমি নিষেধ করে দিই ওদের? চলো ডক্টরের কাছে থেকে ঘুরে আসি। তোমার চোখমুখের অবস্থা ভালো লাগছে না।
সবাই মিলে শ্রীমঙ্গল যাওয়ার প্ল্যান করেছে। গত কাল সব কনফার্ম হয়েছে। প্রিমাও সব জেনে-বুঝে এরপর সম্মতি দিয়েছে। সকালে ইফতিরা আসবে মেহুকে নিতে। শেষ মুহূর্তে এসে বোনের আনন্দটা মাটি করতে চাইল না প্রিমা তাই মৃদু ধমক দিয়ে বলল,
–” ছোট্ট মাথায় এত প্রেসার নিতে বলেছে কেউ? ঘুম হয়নি তাই ওমন লাগছে। স্ট্রং কফি খেলে এমনিতেই ঠিক হয়ে যাবে।
বোনের ধমকে চুপসে যায় মেহরিমা। মুখ ফুলিয়ে বলে,
–” থাকব না তোমার বাসায়। খালি বকা দাও তুমি।
বোনের বাচ্চামিতে ভীষণ মজা পেল প্রিমা। ঠোঁট এলিয়ে হেসে বলল,
–” কই যাবি তাহলে?
মেহরিমা গরম তেলে ডিম ভেঙে দিতে দিতে বলল,
–” জামাইয়ের কাছে।
প্রিমা ফিক করে হেসে ফেলল। আলগোছে মেহুকে কাছে টেনে নিয়ে বলল,
–” দোয়া রাখি স্বামী সোহাগি হও। সুখেরা এসে ভীড় জমাক তোমাদের জীবনের আঙিনায়।
প্রিমার কথায় সরু চোখে তাকাল প্রিমা এরপর অভিমানী স্বরে বলল,
–” আমায় তাড়িয়ে দেওয়ার এত তাড়া? বিরক্ত হয়ে গেছো বুঝি?
প্রিমা মৃদু হেসে বলল,
–” তুই আমার কাছে সন্তানের মতো। যাকে আদরে যতনে পেলেপুষে এত বড় করলাম তার প্রতি বিরক্ত হওয়া সম্ভব? সমস্যা হলো, মেয়েদের জন্য জাগতিক নিয়মাবলি খুব কঠিন। একটা সময় তাদের পাত্রস্থ করতেই হয়। তোর বিয়ে নিয়ে আমার অনেক সপ্ন আছে জানিস?
মেহরিমা অভিভূত হয়ে শুনছিল বোনের কথা। তার প্রশ্ন শুনে বলল,
–” কী কী সপ্ন?
প্রিমা উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল,
–” দুনিয়ার সবথেকে চমৎকার ব্যক্তিত্বের মানুষকে খুঁজে আনব তোর জন্য। এরপর ওর হাতে তোর হাতটা রেখে বলব, ” আমার কলিজা সঁপে দিচ্ছি। যত্নে রেখো তাকে। ভাত কাপড় দিতে না পারলেও অন্তত আদর আর সম্মানটুকু দিয়ো৷ তাও না পারলে আমায় ডেকো। আমার বাবুইপাখির জন্য আমি আছি তো৷ ”
মেহরিমার চোখ ভরে উঠল। আত্মিক টান বুঝি এত শক্তিশালী হয়? উত্তর জানা নেই মেহরিমার। জানার আগ্রহও নেই তার। সে শুধু অনুভব করে যেতে চায়। নিজেকে সামলাতে না পেরে বাচ্চাদের মতো জড়িয়ে ধরে প্রিমাকে। আহ্লাদীকে জড়িয়ে নিয়ে প্রিমা আদুরে কন্ঠে বলে,
–” আপা তোকে ভীষণ ভালোবাসে মেহু। সেই সাথে অগাধ বিশ্বাসও করে। কখনো নড়বড়ে করে দিস না সেই জায়গাটা।
মেহরিমা আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল,
–” করব না আপা।
কথা দেওয়া সহজ কিন্তু সময়সাপেক্ষে আদৌ কী তা রক্ষা করা সম্ভব হয়? সময় গড়ালো আরও কিছুটা। দু বোন নাস্তা করে রেডি হয়ে নিল। এর মাঝে আবার ইফিতিরা হাজির হলো। মেহরিমাকে ওদের গাড়িতে তুলে দিয়ে ইফতিকে উদ্দেশ্য করে বলল প্রিমা,
–” তোমার রিকুয়েষ্টেই রাজি হয়েছি আমি। আমার আমানত সহিসালামত ফিরিয়ে দিয়ো। তোমাদের ফেরার অপেক্ষায় থাকব৷
ইফতি কোনোমতে ঠোঁট এলিয়ে হাসলো শুধু। জিভের আগালে কোনো কথা আসছিলো না। পেছন থেকে তাসফি বলে উঠল,
–” জ্ জ্বী আপু সমস্যা নেই৷ দেখে রাখব আমরা ওকে।
প্রিমা আরও কিছু কথাবার্তা বলে ওদের যেতে দিল। ততক্ষণে তারও অফিসের গাড়ি এসে গিয়েছিল। তাই দেরি না করে প্রিমার বেরিয়ে পড়ে অফিসের জন্য।
চৌধুরী গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রির পার্কিং লটে এসে গাড়ি থামতেই আবির্ভাব ছুটে আসে। প্রিমা ডোর খুলে বের হয়ে কিছু বলতে নিবে তার আগেই হড়বড়িয়ে বলে,
–” হুট করে একটা জরুরি মিটিং পড়ে গেছে। তার জন্য গাজীপুরে যেতে হবে।
প্রিমা হকচকিয়ে উঠে বলল,
–” কোন প্রজেক্ট? কী রিলেটেড? প্রেজেন্টেশন..
আবির্ভাব তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
–” সব রেডি আছে ম্যাম। শুধুমাত্র আপনার জন্য অপেক্ষা করছিলাম আমরা।
প্রিমা হতভম্ব হয়ে বলল,
–” কেনো? আমাকে কল করলেই তো পারতেন।
আবির্ভাব মিনমিনিয়ে বলল,
–” আপনাকে ডিস্টার্ব করতে নিষেধ করেছেন স্যার৷
প্রিমা হতাশার শ্বাস ফেলল। কপাল গুণে পেয়েছে এক মহা পুরুষকে। সেটা ভুলতে বসেছিল। কোনো কথা না বলে সোজা ওয়াক ওয়েতে দাঁড়িয়ে থাকা সাদা গাড়িটার দিকে গেলো।
প্রিমা কাছাকাছি আসতেই ভেতর থেকে দরজাটা খুলে গেলো। খুব একটা চমকালো না প্রিমা৷ এসব প্রিন্সেস ট্রিটমেন্টে এখন অভ্যস্ত হয়ে গেছে। গাড়িতে উঠে বসতেই আকর্ষণীয় পুরুষালী সুঘ্রাণ তার নাসারন্ধ্রে এসে পৌঁছুল।
মেয়েটা থমকাল কিয়ৎকালের জন্য এরপর নজর ঘুরিয়ে চাইল ডান পাশে। বরাবরের মতোই সুদর্শন লুকে বসে আছে তার স্বামী মহাশয়। আজ কেনো যেনো একটু বেশিই সুন্দর লাগছে লোকটাকে।
কারণ খুঁজতে গিয়ে বুঝল, দাঁড়ি ট্রিম করেছে শান। পরনের পরিচ্ছদ সম্পূর্ণ ভিন্ন। আজ শুভ্র পাঞ্জাবি গায়ে জড়িয়েছে লোকটা। হাতটা দু’টো কনুই অব্দি গুটিয়ে রাখা। বাঁ হাতের কব্জিতে একটা রোলেক্সের ঘড়ি।
সব ছেড়ে ছুঁড়ে প্রিমার নজর আটকাল আরশিয়ানের উন্মুক্ত বক্ষে। পাঞ্জাবির উপরের দু’টো বোতাম খোলা থাকায় সৌম্য বুকের বেশ খানিকটা দৃশ্যমান। প্রিমা কে ওভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে আরশিয়ান গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
–” গুড মর্নিং মিসেস চৌধুরী।
ভারিক্কি শব্দের ঝংকারে হুঁশ ফেরে প্রিমার৷ ঝট করে অন্য পাশে চেয়ে আমতা আমতা করে বলে,
–” ম্ মর্নিং স্যার।
আরশিয়ান দুষ্টু হাসে। প্রিমা লজ্জায় সিঁটিয়ে যায় সিটের সাথে। গাড়িতে ড্রাইভার উপস্থিত বিধায় মুহূর্তটা স্থায়ী করতে চাইল না আরশিয়ান। গম্ভীর গলায় ড্রাইভারকে গাড়ি স্টার্ট দিতে বলল।
আরশিয়ানের কথামতো তাই হলো। তাদের পিছু ছুটে চলল আরও কয়েকটা গাড়ি। হাজার হোক মন্ত্রী সে। নিরাপত্তার একটা ব্যপার আছে৷
প্রায় ঘন্টা দুয়েক সময় লাগলো ওদের পৌঁছাতে। আর এই পুরোটা সময় অতি সভ্য মন্ত্রী সাহেব অত্যন্ত বেহায়া নজরে স্ক্যান করছিল তার ব্যক্তিগত নারীকে। প্রিমার চোখে চোখ পড়লে সরিয়ে নেওয়ার বদলে দ্বিগুণ উৎসাহে ভ্রু নাচিয়ে টিজ্ করছিল।
বেচারি প্রিমা পড়েছিল ফ্যাসাদে। না পারছিল বলতে আর না পারছিল সইতে কিন্তু কী আর করার। সে এক অসহায় হরিণ সাবক। বাঘের সামনে মতামত জাহির করার দুঃসাহস তার নেই।
কাঙ্ক্ষিত রিসোর্টে পৌঁছে আরশিয়ান ভীষণ ব্যস্ত পড়ল মিটিং নিয়ে। প্রিমাও পুরোটা সময় তার সাথে ছিলো। আড়াই ঘন্টার মিটিংয়ে প্রিমাকে একটুও ডিস্টার্ব করেনি আরশিয়ান তবে ওখান থেকে বের হতেই তার মাথায় দুষ্টুমি চেপে বসে।
মিটিং রুম থেকে বেরিয়ে রিসোর্টের বরাদ্দকৃত কামরার উদ্দেশ্যে হাঁটছিল দু’জন। প্রিমা আনমনে তাল মেলাচ্ছিল আচমকা কোমরে কারও শীতল হাতের স্পর্শ পেয়ে একদম লাফিয়ে উঠে বেচারি। অবাক কন্ঠে বলে,
–” ক্ কী করছেন?
আরশিয়ান নির্বিকার গলায় জবাব দেয়,
–” অনুভব করছি আপনাকে।
প্রিমা মিইয়ে যায়। আরশিয়ান লাই পেয়ে দ্বিগুণ উৎসাহে ছুঁয়ে দেয় প্রিমার উন্মুক্ত কোমর। প্রিমা আশেপাশে চেয়ে বাহানা দিতে চাইলে আরশিয়ান ভরাট গলায় বলে,
–” দেয়ার ইজ নো ওয়ান ওয়াইফি। এক্সেপ্ট ইয়্যু অ্যান্ড মি।
প্রিমা লজ্জায় পড়ে যায়। আরশিয়ান আজ অবাধ্য। বুঝেও বুঝতে চাইল না অনেককিছু। রুমে ঢুকে শব্দ করে দোর আটকালো। প্রিমা কাঁপল সামান্য। আজ বোধহয় রক্ষে নেই তার।
প্রিমার ভয়কে সত্যি করে দিয়ে আরশিয়ান এগিয়ে এলো তার দিকে। জড়িয়ে নিলো বুকের মাঝে। তার চিবুকে হাত রেখে থুঁতনি উঁচু করে বলল,
শিরোনামহীন অনুভূতি সিজন ২ পর্ব ১৮
–” একটুখানি কাঁদায় আপনাকে?
প্রিমা কাঁপা গলায় বলল,
–” ক্ কেনো?
আরশিয়ান থামল কিয়ৎক্ষন। মোহনীয় দৃষ্টিতে চাইল প্রিমার কাজল মাখানো ডাগরআঁখি জোড়ার দিকে৷ এরপর ঘোর লাগা কন্ঠে বলল,
–” ওই কাজল চোখের অসহনীয় সৌন্দর্য মেটাতে। যা আমাকে ক্ষণে ক্ষণে বেহায়া করে দিচ্ছে।
প্রেম ধারায় মত্ত দুই সত্তা অথচ তারা জানলো না, কী অনাচার ঘটতে চলেছে তাদের অগোচরে।
