Home শিরোনামহীন অনুভূতি সিজন ২ শিরোনামহীন অনুভূতি সিজন ২ পর্ব ২০

শিরোনামহীন অনুভূতি সিজন ২ পর্ব ২০

শিরোনামহীন অনুভূতি সিজন ২ পর্ব ২০
রুহানিয়া ইমরোজ

অপেক্ষার প্রহর দীর্ঘ হওয়ায় আরশিয়ান অধৈর্য হয়ে উঠেছিল। তার হুঁশ ফেরে এক দীর্ঘ চুম্বনের পর। কী করে ফেলেছে বুঝতে পেরে কিঞ্চিৎ অনুশোচনা হয়। বুকের সাথে লেপ্টে থাকা প্রিমার কম্পমান দেহখানা শক্ত করে জড়িয়ে নিয়ে রুদ্ধ কন্ঠে শুধায়,
–” ব্যথা পেয়েছেন?
প্রশ্নটা শুনে প্রিমার মনে পড়ে যায় কিছুক্ষণ আগের ঘটনাটা৷ কেমন বাঘের মতো থাবা দিয়ে ধরেছিল লোকটা। তারপর.. বাকিটা ভাবতেই লজ্জায় মিইয়ে গেল বেচারি। আরশিয়ানের বুকে মুখ লুকিয়ে ধীর কন্ঠে বলল,

–” নাহ্। ক্ কিন্তু আপনি ভীষণ রাফ এন্ড রুড ছিলেন।
বউয়ের কথায় হেসে ফেলল শান। বেচারি যতটুকু ধারণা করছে তার চেয়েও ঢের গুণ বেশি রাফ এন্ড রুথলেস আরশিয়ান। তবে প্রিমাকে সেটা জানাতে চায় না।
আদরের নামে প্রিয়তমাকে ক্ষতবিক্ষত করা কোনো গৌরবের বিষয় নয়। যত্ন নিয়ে ভালোবাসতে পারাটা কঠিন সংযমের পরিচয়। বউয়ের ব্যপারে সব সময় ধৈর্যবান পুরুষ হয়েই থাকতে চায় আরশিয়ান।
খানিক সময় প্রিমাকে ওভাবেই জড়িয়ে রেখে ভীষণ নরম গলায় বলল আরশিয়ান,

–” এবারের জন্য স্যরি। আর হবে না ওমনটা৷ নিশ্চিন্তে থাকুন, আমার স্পর্শেরা আপনার মনে জায়গা পেতে চায় ; শরীরে নয়।
কথাগুলো শুনে ভীষণ চমকাল প্রিমা৷ চট করে মুখ তুলল তার বুক থেকে। চোখাচোখি হলো দুজনের। আরশিয়ানের মুখে সেই চিরাচরিত শান্তভাব তবে প্রিমা অশান্ত হয়ে পড়ল। মানুষটার কথার ধাঁচ কেমন যেনো।
প্রিমাকে ওমন ভাবে তাকাতে দেখে ভ্রু নাচাল শান। প্রিমা থতমত খেয়ে বলল,

–” ক্ কাজ তো শেষ। এখন কী করব? ”
আরশিয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
–” আপনার কালচে চোখ দু’টো দেখেই বোঝা যাচ্ছে, সারারাত ঘুমাননি আপনি। সো, এখন রেস্ট করবেন।
প্রিমা কৌতূহলী কন্ঠে শুধাল,
–” তাহলে ঢাকা ফিরব কখন ? ”
আরশিয়ান গম্ভীর গলায় বলল,
–” যখন আপনি সুস্থবোধ করবেন।
কথাটার মানে বোঝেনি প্রিমা। পুনরায় প্রশ্ন করতে চাইলে আরশিয়ান তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
–” আপাতত সময় নেই আমার হাতে। কাজে যাচ্ছি। আপনি ঘুমিয়ে নিন। সময় মতো খাবার খেয়ে নিয়েন৷
প্রিমা নিরবে সায় জানাল৷ আরশিয়ান শান্ত চোখে প্রিমার নির্জীব মুখখানা দেখে কয়েক পা এগিয়ে এল। সামান্য ঝুঁকে বউয়ের কপালে মৃদু স্পর্শ এঁকে দিয়ে বলল,

–” নিজের খেয়াল রাখবেন। এদিক-ওদিক ছুটোছুটি করতে হবে না। জায়গাটা সেইফ নয়। ”
আরশিয়ানের আদুরে স্পর্শে প্রিমা চোখ নামায়। ধীর কন্ঠে বলে,
–” আমার ঘরে থাকতেই ভালো লাগে।
জবাবে আরশিয়ানের বলতে মন চাইল,
–” আমার ঘরের ঘরণী হিসেবে কেবল আপনাকেই ভাল্লাগে৷
তবে নানাবিধ কারণে বলতে পারল না। বিদায় নিয়ে বেরিয়ে পড়ল কাজের উদ্দেশ্যে। শরীর ম্যাজম্যাজ করায় প্রিমাও ঘুমের রাজ্যে পাড়ি জমালো।

ট্যুরে আসাটা কত বড় ভুল হয়েছে সেটা ক্ষণে ক্ষণে টের পাচ্ছে মেহরিমা। ইফতি ড্রাইভ করতে ব্যস্ত, সে রোবোটের মতো বসে আছে ফ্রন্ট সিটে। বাকিরা বসে বসে ঝিমাচ্ছে। খানিক সময়ের জন্য তার মনে হলো, ঘুরতে নয় বরং শোক পালন করতে যাচ্ছে তারা৷
দীর্ঘ পাঁচ ঘন্টার জার্নি এভাবেই কেটেছে। গাড়িটা যখন রিসোর্টের ভেতর প্রবেশ করল তখন হাঁপ ছেড়ে বাঁচল মেহরিমা। লম্বা জার্নি করার অভ্যেস নেই তার৷ প্রচন্ড ব্যাক পেইন হচ্ছিল। তার উপর ভীষণ ঘুম পাচ্ছে তার। ভেবেছিল পেছনের ফাঁকা সিটে একটু গা এলিয়ে শুবে কিন্তু সবার থমথমে মুখ দেখে আর কিছু বলেনি।
মনে মনে সিধান্ত নিয়েছে, রুমে ফিরে একটু রেস্ট নিয়ে এরপর ধরবে সব ক’টাকে। ঘুরতে এসে এমন আধমরা আচরণের মানেটা কী?
যথারীতি যে যার রুমে ঢুকল। তাসফি আর মেহু এবং ইমার জন্য একটা রুম নেওয়া হয়েছে। অন্য রুমে থাকছে নিরব, আদিল আর ইফতি। রুমে ঢুকে একটু ফ্রেশ হয়েই ধপ করে বিছানায় শুয়ে পড়ল মেহরিমা। ব্যথায় কঁকিয়ে উঠে বলল,

–” ঘুমাব এখন। ভুলেও ডাকবি না আমায়..
তাসফি নিস্পৃহ গলায় শুধাল,
–” ঘুরতে বের হবো আমরা। তুই যাবি না?
মেহরিমা অস্পষ্ট গলায় বলল,
–” নোওওও।
তাসফি আর ইমা একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। খুব করে চাইল… মেয়েটা বলুক, ” আমিও যাব তোদের সাথে। ” তবে এমন কিছুই হলো না। পরিকল্পনা মোতাবেক তারা বেরিয়ে পড়ল। একলা ঘরে থেকে গেল মেহরিমা৷

ঘড়ির কাঁটায় তখন সন্ধ্যা সাতটা। অন্ধকার রুমের দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করে কেউ একজন। তার ব্যাডি পারফিউমের স্মেলটা তরতরিয়ে ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। তবে ঘুমে মগ্ন মেহরিমা টের পায় না কারও উপস্থিতি। লোকটা এক’পা দু’ পা করে শিষ বাজাতে বাজাতে এগিয়ে আসে বেডের দিকে।
এলোমেলো ভঙ্গিতে শুয়ে থাকা মেহরিমাকে উপর থেকে নিচ অব্দি স্ক্যান করে ভাবলেশহীন গলায় বলে,
–” ওহে রমণী, তোমার ঘুমের দিন শেষ। স্বামীর সেবায় করো রাত জাগার অভ্যেস।
কথাটা শেষ হওয়ার পরপরই পাশ ফিরে মেহরিমা৷ ফলস্বরূপ শরীরে থাকা টিশার্টটা খানিকটা উপরে উঠে যায়। উন্মুক্ত হয় ফর্সা ধবধবে মসৃণ উদর। বেলি বাটনের নিচে উঁকি দেওয়া দুষ্টু তিলটা দেখে গলা শুকিয়ে আসে লোকটার। কিছুক্ষণ পূর্বের ভাব কর্পূরের ন্যায় উবে যায়।
খানিকক্ষণ বেহায়া দৃষ্টিতে চেয়ে থেকে মাথা ঝাঁকায়। পকেট হাতড়ে ভেপ বের করে অস্থির চিত্তে টান দেয়৷ চোখ ফিরিয়ে নিয়ে ঘরের এপাশ-ওপাশ হাঁটতে শুরু করে তবে ওই তিলটাকে দেখার লোভ সামলাতে পারে না। হাল ছেড়ে দিয়ে এক দৃষ্টিতে ওদিকে চেয়ে থেকে কটমটিয়ে বলে,

–” গোটা বেডি জাতটাই মারাত্মক ট্যালেন্টেড। ঘুমের ঘোরেও এরা শক্তপোক্ত পুরুষ লোকের পুরুষত্ব নাড়িয়ে দেওয়ার সক্ষমতা রাখে।
মেহরিমার অতো শান্তির ঘুম সাইকো লোকটার সহ্য হচ্ছিল না। বেচারিকে জাগানোর উপায় খুঁজতে থাকল। আচমকা তার নজরে আসলো ঘরে থাকা মিনি ফ্রিজটা। সে আর অপেক্ষা না করে তড়িঘড়ি করে ছুটলো সেদিকটায়। ফ্রিজ খুলে দেখল ভেতরে দু’টো কোকের বোতল আছে। সে আর সাত পাঁচ না ভেবে একটা ক্যান খুলল।
বেডের কাছাকাছি গিয়ে মেহরিমার উম্মুক্ত উদরের উপর ঢেলে দিল কোকের ঠান্ডা তরল। আচমকা এমন হওয়ায় ঘুম আছন্ন মেহরিমা কেঁপে উঠে চোখ মেলে চাইল। কী হয়েছে বুঝতে না পেরে ঝট করে উঠে বসল। তাকে উঠে বসতে দেখে লোকটা তিরস্কারের সুরে বলল,

–” নাটক কম করো অপিও। ভয় পাওয়ার মতো কিছুই হয়নি৷ আজরাইল আসেনি তোমার ঘরে।
ভরাট পুরুষালি কন্ঠ শুনে মেহরিমা পাশ ফিরে চাইল৷ এপর্যায়ে আরেকদফা চমকাল সে। বিস্মিত স্বরে বলল,
–” অ্ আপনি? এখানে কী করছেন ? ”
লোকটা আর কেউ নয় বরং তারই জম তাজরিয়ান জাওয়াদ চৌধুরী। বদ্ধ কামরায় তাকে দেখে ভীষণ খাবড়ে গেল মেহরিমা। ওদিকে বিরক্ত তাজরিয়ান বিরস গলায় উত্তর দিল,

–” কু’নজর দিচ্ছি তোমার উপর।
মেহরিমা তখনও হতভম্ব। এতটাই অবাক হয়েছে যে তার গলা দিয়ে শব্দ বের হচ্ছে না। কোনোমতে শুধাল,
–” ক্ কেনো এসেছেন এখানে?
তাজরিয়ান ঠান্ডা গলায় জবাব দিল,
–” অপমানের প্রতিশোধ নিতে।
এবার পুরো দমে ঘাবড়ে গেল মেহরিমা। মেহরিমা আতঙ্কিত গলায় বলল,
–” ক্ কী চাইছেন আপনি?
তাজরিয়ান ভাবলেশহীন গলায় জবাব দিল,
–” দুনিয়ার চোখে তোমায় কলঙ্কিত নারী বানাতে..
মেহরিমা ভয়ার্ত হতবাক গলায় শুধাল,
–” ধর্ষণ করার উদ্দেশ্যে এসেছেন?
তাজরিয়ান বিরক্তিতে তেতে উঠে বলল,

–” ওসব কাপুরুষের কাজ। আর অল্পতে পোষায় না আমার। আই নিড মাচ মোর।
মেহরিমা বিভ্রান্ত হয়ে বলল,
–” তাহলে কী করতে এসেছেন?
তাজরিয়ান হাই তুলে বলল,
–” তোমায় বিয়ে করতে এসেছি জানেমান।
মেহরিমা হড়বড়িয়ে বলল,
–” অসম্ভব। কখনোই হবে না এমনটা..
তাজরিয়ান ভ্রু নাচিয়ে শুধাল,
–” যদি সম্ভব করে ফেলি? হয়ে যায় এমনটা?
মেহরিমা নাকচ করে দিয়ে বলল,
–” আপনার বউ হওয়ার আগে মৃত্যু হোক আমার।
তাজরিয়ান বাঁকা হাসে। ধপ করে মেহরিমার বেডে বসে ঠাস করে শুয়ে পড়ে তার উরুর উপর। এরপর চোখে চোখ রেখে বলে,

–” আমি চাই, মৃত্যুর পরও তোমার লাশকে আমার বউ হিসেবে চিনুক সবাই।
মেহরিমা বিস্ময়ে বিমূঢ়। কিছু বলতে যাবে এমন সময় আচমকা অপর পাশ থেকে জোরালো শব্দের করাঘাত শোনা যায়। মেহরিমার কলিজা কেঁপে উঠে রীতিমতো। তাজরিয়ান তার ফ্যাকাশে মুখ দেখে হু হা করে হেসে দিয়ে বলে,
–” বরযাত্রী এসেছে বেবিগার্ল। বরণ করবে না?
মেহরিমা কাঁপা গলায় বলল,
–” কীসব বলছেন?
তাজরিয়ান হামি তুলে বলল,

শিরোনামহীন অনুভূতি সিজন ২ পর্ব ১৯

–” আমায় আর কিছু বলতে হবে না মিস কিসসসস। সীই, একশন স্পিক লাউডার দ্যান ওয়ার্ডস…
বাইরের ধাক্কা জোরালো হয়েছে ততক্ষণে। শোনা যাচ্ছে অনেকের উচ্চ আওয়াজ তবে সেসব মেহুর কানে যাচ্ছে না। সে অভিভূত হয়ে শুধায়,
–” মানে?
তাজরিয়ান হেয়ালি কন্ঠে গান ধরে,
–” মে অর তুম এক কামরে ম্যেই বান্ধ হো..

শিরোনামহীন অনুভূতি সিজন ২ পর্ব ২১