Home শিরোনামহীন অনুভূতি সিজন ২ শিরোনামহীন অনুভূতি সিজন ২ পর্ব ২৬

শিরোনামহীন অনুভূতি সিজন ২ পর্ব ২৬

শিরোনামহীন অনুভূতি সিজন ২ পর্ব ২৬
রুহানিয়া ইমরোজ

গোধুলির শেষ বেলা। সন্ধ্যা নামবে এমন সময় ঘুম ভাঙে মেহরিমার। ঘুম পরিপূর্ণ হওয়ায় বেশ চনমনে লাগে শরীরটা। লম্বা একটা হামি তুলে উঠে বসে সাথে সাথে চোখ যায় সোফার দিকে। উদোম গায়ে স্রেফ একটা শর্টস পরে বসে আছে তাজ।
চোখদুটো নিবদ্ধ ল্যাপটপের স্ক্রিনে। খুব মনোযোগের সাথে ধীর গতিতে স্ক্রল করছে। তবে তার কর্মকান্ড দেখে মেজাজ বিগড়ে যায় মেহরিমার। এ কেমন বেলেল্লাপনা? ঘরে একটা মেয়ে মানুষ আছে সেটা কী চোখে পড়ে না ওই বেয়াদব লোকের?

মনে মনে শ’খানেক গালি দেয় তাজকে। ঝামেলা বাড়াতে না চাওয়ায় দাঁতে দাঁত চেপে হজম করে যায় দৃশ্যটুকু। বেড থেকে নেমে ধুপধাপ পা ফেলে এগিয়ে যায় ওয়াশরুমের দিকে। ফ্রেশ হওয়া জরুরি এখন৷
প্রায় আধাঘন্টা সময় নিয়ে ফ্রেশ হয় মেহু। ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে দেখে, একই ভঙ্গিতে বসে আছে তাজ। এবার মেজাজটা লাগামছাড়া হয় মেহরিমার। তাকে উঠতে দেখেও এমন অর্ধনগ্ন থাকার মানে কী? প্রচন্ড রাগ হলেও সেটা দমিয়ে রেখে বিছানা গোছাতে শুরু করে মেহরিমা। বেড কে তাজ মনে করে ইচ্ছে সুখে ঝাড়তে থাকে।
কাজের মধ্যে ডুবেছিল তাজ। বিছানা ঝাড়ার বিকট শব্দ কানে যেতেই ভ্রু কুঁচকে তাকায় সে। পরক্ষণে মেহুর মুখশ্রী অবলোকন করে কিঞ্চিৎ অবাক হয় তাজরিয়ান। রাগে ফুঁসছে তার বউ। ফর্সা গোলগাল মুখটা রাগে লাল হয়ে আছে। কিন্তু কেনো?
চিন্তায় কপালে ভাঁজ পড়ে তাজের। কী আশ্চর্য! সে তো কোনো পাপ করেনি। একসাথে শুইলেও দুষ্টুমি করেনি। তাহলে তার বউ ক্ষেপলো কেনো? ভাবতে ভাবতেই উত্তর পেয়ে গেল তাজ। একবার নিজের অর্ধনগ্ন শরীরের পানে চেয়ে আরেকবার নিজের নাগিনী বউ কে দেখল। সাথে সাথেই দুষ্টুমি খেলে গেল মস্তিষ্কে। মনে মনে বলল,

–” এবার খাঁচায় ধরা না দিয়ে পাখি যাইবো কই?
সেন্টার টেবিলের উপর ল্যাপটপ রেখে এটিটিউড নিয়ে উঠে দাঁড়াল তাজ। আয়নার সামনে গিয়ে গলা খাঁকারি দিয়ে বউয়ের মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করল। বারংবার তাজের কাশি শুনে মেহরিমা বিরক্ত দৃষ্টিতে তাকালে, নানান ধরনের ভঙ্গিমা করে প্রশস্ত বডি প্রদর্শন করতে শুরু করে তাজরিয়ান। বড্ড ভাব নিয়ে মেহুকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলে,
–” কী সৌভাগ্য তাহার!
করিবে যে এই যৌবন আহার।
লাইন দু’টো যথেষ্ট ছিল মেহরিমার ধৈর্যের বাঁধ ভাঙার জন্য। তবুও দাঁতে দাঁত চেপে কোনোমতে নিজেকে সামলায় মেহু কিন্তু তাজকে উচিত শিক্ষা দেওয়ার ইচ্ছেটা আর দমাতে পারে না। ওদিকে বেচারা তাজ বুঝতে অব্দি পারে না, সিডিউস করতে গিয়ে বউকে সাংঘাতিক ক্ষেপিয়ে দিয়েছে।

মেহরিমাকে চোখ সরিয়ে ফেলতে দেখে তাজরিয়ান চোখমুখ কুঁচকে সরে আসে। মেজাজ খারাপ করে ল্যাপটপ নিয়ে বসে। অদ্ভুত মেয়ে বিয়ে করেছে সে। যেখানে হাজারো সুন্দরী রমণীর চোখের মণি তাজ সেখানে কি-না ঘরের মহিলা তাকে দূর ছাই করছে। এত বড় অপমান আদৌ মেনে নেওয়া যায়?
ওসব ভাবতে ভাবতেই মেজাজ বিগড়ায় তাজের। হাত নিশপিশ করতে শুরু করে। ভেতরকার অস্থির ভাবটা দমাতে একটা সিগারেট জ্বালায় তাজ। লম্বা একটা টান দিয়ে ধোঁয়া উড়াতেই কিছুটা রিল্যাক্স ফিল হয় কিন্তু দু চারবার ধোঁয়া ছাড়তেই সেটার বিকট গন্ধ কেশে উঠে মেহরিমা।

তাজরিয়ান মাথা ঘামায় না।উল্টো প্রথমটা শেষ করে ইচ্ছে করে আরেকটা ধরায়। মেহরিমাকে ঘর ঝাড়ু দিতে দেখে ইচ্ছে করে সিগারেটের ফিল্টার ফেলে মেঝেতে। বিষয়টা দেখেও নরমাল থাকে মেহু।
দুষ্টুমি করার পরও মেহরিমার জিরো রিয়েকশন দেখে খানিকটা হতাশ হয় তাজ। তবে বেশি একটা না ভেবে নিজ কাজে মনোযোগ দেয়। পুরোদমে কাজে ফিরছে আজ৷ স্ক্যাজিউলে চোখ বুলিয়ে নেওয়া দরকার। সেটা চেক করতে গিয়ে আরেকটা এলার্ট আসে নোটিফিকেশনে। কেউ একজন হামলা করেছে তার গোপন আস্তানায়। ব্যপারটা খতিয়ে দেখতে যাবে এমন সময় হুট করে লাউডস্পিকারে উচ্চ শব্দে বেজে উঠে গানের কিছু লাইন,
বেনসনের প্যাকেটে আবুল রাখে আকিজ বিড়ি,
খাম্বার সাথে ধাক্কা খাইয়া ইংলিশে কয় sorry!
বরিশালে বাড়ি, কিন্তু কয় ঢাকাইয়া ভাষা,
আমার পিছে ঘুইরা বেড়ায়, মনে বহুত আশা!

আকস্মিক বিকট শব্দে গান বেজে ওঠায় সোফা ছেড়ে দাঁড়িয়ে যায় তাজরিয়ান। কিঞ্চিত চমকেছে সে। গানের উৎস খুঁজতে গিয়ে বুঝে মেহরিমার কাজ এটা। লিরিক্স গুলো শুনে চোখমুখ কুঁচকে যায় তার।একই সাথে হতভম্বও হয়। তার ব্র্যান্ডের সিগারেটকে আকিজ বিড়ির সাথে তুলনা করা হচ্ছে? ইয়াক্
মেজাজ খারাপ করে কিছু বলতে যাবে তার আগেই দ্বিগুণ স্পিডে ঝাড়ু দিতে দিতে এগিয়ে আসে মেহু। সোফা ঝাড়ার বাহানায় তাজরিয়ানের পশ্চাৎদেশে হাত সাফ ( মারতে) করতে করতে চিবিয়ে চিবিয়ে বলে,
–” টিট ফর ট্যাট টু ইয়্যু ঠু মিস্টার বিড়িখোর৷
তাজরিয়ান বিস্ময়ে হতভম্ব হয়ে কথা বলতেই ভুলে যায়। প্রতিশোধ নিতে বিয়ে করে নিজেই অত্যাচারিত হচ্ছে। দেশের কুখ্যাত মাফিয়ার ডান হাত হয়ে বউয়ের হাতে ঝাড়ুপেটা খাচ্ছে। এই দৃশ্য সহ্য করা যায়?

সন্ধ্যার পর ঘুম ভাঙে প্রিমার। ঘুমঘুম চোখ দুটো মেলে তাকাতেই নজরে আসে রাজকীয় সাদা সিলিং। বড় একটা হামি তুলে অলস ভঙ্গিতে উঠে বসতে নিলে আচমকা আর্তনাদ করে ওঠে বেচারি। কোমরে হাত চেপে ধরে চোখমুখ কুঁচকে ফেলে রীতিমতো।
একমুহূর্তের জন্য ব্যথায় দম আঁটকে আসে প্রিমার।
তার নেতা সাহেবর অতি আদরের সুফল সব। ভোর থেকেই এই যাতনা সহ্য করতে হচ্ছে। পেইন কিলার খেয়েও চিনচিনে ব্যথাটা কমেনি। যন্ত্রণায় কাতর হয়ে প্রিমা বিড়বিড়িয়ে বলে,
–” জালেম পুরুষ। আদরের নামে অত্যাচার করেছে আমার উপর। আর কক্ষণো ধরা দিব না তার মিষ্টি কথার ফাঁদে। এবারের মতো সুস্থ করে দাও খোদা..
মোটামুটি মিনিট দশেক সময় লাগে তার স্বাভাবিক হতে। ব্যথা কমতেই ক্লান্ত ভঙ্গিতে হেডবোর্ডে গা এলিয়ে দেয় প্রিমা। অনুসন্ধানী নজর ঘুরিয়ে খুঁজতে থাকে কালপ্রিটকে। বিছানা থেকে নামার মতো অবস্থা তার নেই অথচ ফ্রেশ হওয়াটা জরুরি।
বিধিবাম, শানকে কোত্থাও খুঁজে পায় না। উল্টো নিজেকে আবিষ্কার করে ভিন্ন একটা রুমে। এতে অবশ্য হতবাক হয় না কারণ রুমের সুসজ্জা আর আভিজাত্য সাক্ষী দিচ্ছে, এটা তার ভদ্রলোকের কামরা।
নিজ ভাবনায় ডুবে থাকা প্রিমার হুঁশ ফেরে দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে। প্রিমা একটু চমকায়। তাড়াতাড়ি করে কম্ফোর্টারটা টেনে আপাদমস্তক ঢেকে ফেলে নিজেকে৷ অপ্রস্তুত কন্ঠে বলে,

–” আসুন..
সাথে সাথে চিন্তিত ভঙ্গিতে ঘরে প্রবেশ করেন আফিয়া চৌধুরী। প্রিমার পানে চেয়ে বলেন,
–” এখন কেমন আছ মা?
প্রিমা কোনোমতে বলে,
–” জ্ জ্বি ভালো।
প্রিমার জবাব শুনে আফিয়া চৌধুরী শুকনো হাসেন। ভেতরকার অস্থিরতা দমাতে না পেরে বলেন,
–” মা একটা প্রশ্ন করি?
আফিয়া চৌধুরীর উদ্ভ্রান্ত মুখশ্রী দেখে প্রিমা একটু অবাক হয়। ভদ্রতা দেখিয়ে বলে,
–” জ্বি..
আফিয়া চৌধুরী তৎক্ষনাৎ জিজ্ঞেস করেন,
–” শান কিছু বলে গেছে তোমায়? অফিসের বিষয়টা সম্পর্কে জানো কিছু?
প্রিমা হতভম্ব স্বরে জবাব দেয়,
–” না, উনি কিছু বলে যাননি আমায়। অফিসে কী হয়েছে?
আফিয়া চৌধুরী না পারতে বলে বসেন,

–” খুব ক্লোজ কেউ শানের আপকামিং মেগা প্রজেক্টের তথ্য পাচার করেছে বিপরীত টিমের কাছে। এটা শুনেই আমার অসুস্থ ছেলেটা সব ফেলে ছুটেছে অফিসে। না, জানি কোন দুশমনে এত বড় ক্ষতি করল।
প্রিমা চমকে উঠল প্রথম দফায় পরক্ষণে হিসেব মেলাতেই বুক ধড়ফড়িয়ে উঠল তার। খামচে ধরল বিছানার চাদর। মেগা প্রজেক্টের ফাইল শুধুমাত্র শান আর তার কাছেই আছে। আর তার ফোনের সমস্ত মালিকানা আছে ওয়াসীত্বদের কাছে। যারা কি-না বর্তমানে চৌধুরী গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রির সবচেয়ে বড় রাইভাল।
একে একে ক্লু মিলে যেতেই থরথর করে কেঁপে উঠে প্রিমা। কিচ্ছু করেনি সে ; ইভেন এতকিছু জানতোও না। কীভাবে কী হয়ে গেল কে জানে? সে তো পেছন থেকে আঘাত করতে চায়নি। শান কী ভুল বুঝবে তাকে? প্রশ্নের ঝাঁকে মাথা নষ্ট হয়ে এল প্রিমার।

ঘড়ির কাঁটা রাত নয়টার ঘরে। হসপিটালের বেডে উদাস ভঙ্গিতে বসে আছে ফারজানা। শরীরের সাথে সাথে মনটাও তার বেজায় খারাপ। নিজেকে বড্ড আনওয়ান্টেড ফিল হচ্ছে । এমনটা মনে হওয়ার কারণও আছে বটে।
অসুস্থ হওয়ার পর থেকেই কেমন যেনো বোঝা হয়ে গেছে সবার উপর। সেই শুরু থেকে প্রিমা আর মেহুর গা ছাড়া ভাব দেখে আসছে। এখন তো দেখাই নেই। ক’দিন আগে তাকে বাসায় নেওয়ার কথা ছিল অথচ সেটাও নাকি ক্যানসেল করে দিয়েছে প্রিমা। নিশ্চয়ই ফারজানার টেক কেয়ার করার ঝামেলা এড়াতে তাকে হসপিটালের বেডে ফেলে রেখেছে?
উল্টোপাল্টা ভাবনা গুলো মাথায় আসতেই অঝোর ধারায় অশ্রুকণা গড়িয়ে পড়ল ফারজানার চোখ বেয়ে। নাক টেনে ফুঁপিয়ে উঠল নিদারুণ যন্ত্রণায়। তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নার্স চিন্তিত স্বরে বলল,

–” আপনার প্রেশার বেড়ে যাচ্ছে ম্যাডাম। প্লিজ এবার কান্না থামান..
ফারজানা শুনল না। নাক টেনে বাচ্চাদের মতো বলল,
–” আমি মরে গেলেই ভালো হবে। সবার ঘাড় থেকে বোঝা নামবে। কাউকে পেরেশান হতে হবে না..
বলতে বলতেই আবারও ফুঁপিয়ে উঠল সে। ঠিক তখুনি ভারী কাঁচের দরজাটা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করল ইশতিরাজ। ওদিকে এক পলক চেয়ে মুখটা শুকিয়ে গেল ফারজানার। নার্সের হাত ধরে ভয়ার্ত গলায় বলল,
–” উনি এখ্ খানে কেন?
নার্স সুমিষ্ট স্বরে জবাব দিল,
–” উনি একজন হার্ট স্পেশালিষ্ট ম্যাডাম। আপনার চেকআপ করতে এসেছেন। ভয় পাচ্ছেন কেন?
নার্স কথাগুলো বললেও ফারজানার মাথায় খেলে গেল ভিন্ন স্মৃতি। স্টেথোস্কোপ দিয়ে হার্টবিট মাপার বাহানায় ইচ্ছেকৃত ভাবে বুক স্পর্শ করা, পরীক্ষা করার বাহানায় নোংরা ভাবে ছুঁয়ে দেওয়া.. সবটা মনে পড়তেই ফারজানা বলল,

–” চলে যেতে বলুন উনাকে। ছেড়ে দিতে বলুন আমার পিছু..
বেডের দিকে এগিয়ে আসতে আসতে সবটা শুনল ইশতিরাজ কিন্তু গায়ে মাখল না। নার্সের দিকে চেয়ে বলল,
–” প্লিজ লিভ।
নির্দেশ পেয়ে নার্সটি চলে যেতে নিলে ফারজানা আঁটকে দেয় তাকে। শক্ত করে তার হাত টেনে ধরে কাঁদো কাঁদো গলায় বলে,
–” আমায় বাঁচান প্লিজ। উনি নোংরা ভাবে ছুঁয়ে দিবে আমায়। কলঙ্কিত হয়ে যাব আমি..
ফারজানা উত্তেজিত হয়ে যাচ্ছে। নার্সও পড়ে গেছে দোটানায়। একবার রাজের মুখের দিকে তাকাচ্ছে আবার জানার হাতের দিকে। ইশতিরাজ তাকিয়ে ছিল মনিটরের দিকে। ওটা বিপদ সংকেত দিতেই ইশতিরাজ বাজখাঁই গলায় ধমকে উঠল তাদের।
ধমকটা এত জোরে ছিল যে দুজনই চমকে উঠে। ফারজানা হাত ছেড়ে দেয় নার্সের। সেই বেচারি ছাড়া পেয়ে দৌড় লাগায় দরজার দিকে। ইশতিরাজ কোনোকিছুর তোয়াক্কা না করে সোজা ফারজানার পালস চেক করার জন্য তার হাতের কব্জি ধরে।
ফারজানা কেঁপে উঠে বলে,

–” আ..আমায় ছুঁবেন না প্লিজ..
ইশতিরাজ তার হার্টবিট চেক করে বলল,
–” আমি আপনার কোনো ক্ষতি করব না মিস জানা৷
ফারজানা আতঙ্কিত স্বরে বলে,
–” মিথ্যা কথা। বিশ্বাস করি না আমি..
ইশতিরাজ প্রশ্নাত্মক কন্ঠে বলে,
–” কেনো করেন না?
ফারজানা হড়বড়িয়ে বলে,
–” পুরুষ লোক হায়েনার জাত। সুযোগ পেলে যাচ্ছে তাই করে…
ইশতিরাজ সাবলীল গলায় উত্তর দেয়,
–” আপনার হাতের পাঁচ আঙ্গুল যেমন সমান নয় ঠিক তেমনই সব পুরুষই হায়েনার জাত নয়। কেউ কেউ এক মায়াবতীর প্রেমে পড়ে জগতের সমস্ত লাস্যময়ীকে উপেক্ষা করে।
ফারজানা অবিশ্বাস্য গলায় বলে,

–” ভুয়া কথা..
ইশতিরাজ বুদ্ধিমানের মতো বলে,
–” প্রমাণ করে দেখান।
ফারজানা তৎক্ষনাৎ বলল,
–” আমি নিজেই ভুক্তভুগী। এরচেয়ে বড় প্রমাণ আর কী হতে পারে?
ইশতিরাজ শান্ত গলায় জবাব দেয়,
–” এখানে আমার তো দায় নেই। আমি যে খারাপ সেটার কোনো প্রমাণ আছে?
ফারজানা উত্তেজিত হয়ে বলল,
–” ওটা কীভাবে প্রমাণ করব আমি?
ইশতিরাজ সাথে সাথেই জবাব দিল,
–” আগামী এক মাস… প্রতিদিন এক ঘন্টা করে কথা বলব আমরা। ওই সময় যদি আপনি একটুও ইনসিকিউর ফিল করেন তাহলে মেনে নিব আমি সহ গোটা পুরুষ জাতি খারাপ।
রাগে জেদে হুঁশ হারায় ফারজানা। কথার ফাঁদে পড়ে বলে,
–” রাজি আমি..
ইশতিরাজ হেসে বলে,
–” ডিল ডান..
বলেই আর একমুহূর্ত অপেক্ষা না করে রুম থেকে বেরিয়ে যায় ইশতিরাজ। ফারজানা কাঁপতে কাঁপতে বিছানায় গা এলিয়ে দেয়। মস্তিষ্ক শূন্য লাগছে। চোখ মুখ আঁধার হয়ে আসছে। ঠিক ভুলের পার্থক্য করতে পারছে না। কে জানে কোন অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিল নিজেকে।

সময়কাল তখন ঠিক রাত বারোটা। ফাঁকা অফিসের কেবিনে নিথর ভঙ্গিমায় রকিং চেয়ারে গা এলিয়ে বসে আছে আরশিয়ান। গম্ভীর তার হাবভাব । শান্ত থাকলেও ভেতরে কী চলছে তা বোঝা মুশকিল।
সুনশান নিস্তব্ধতা ভাবল দরজা খোলার শব্দ। শান চোখ মেলল না। নির্জীব গলায় বলল,
–” কেন এসেছিস?
প্রশ্নের জবাব দেওয়ার প্রয়োজনবোধ করল না রাজ। গাড়ির চাবিটা সেন্টার টেবিলের উপর রেখে শানের মুখোমুখি হয়ে সোফায় বসল অতঃপর অশান্ত গলায় শুধাল,
–” কে করেছে এত বড় দুশমনি?
প্রশ্নটা শুনে দীর্ঘশ্বাস ফেলল আরশিয়ান। তাচ্ছিল্য হেসে বলল,
–” আমারই ঘরণী..
ইশতিরাজ বোবা হয়ে রইল খানিক সময়ের জন্য। আরশিয়ানের জ্বরতপ্ত কঠিন মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
–” এবার কী করবি?
আরশিয়ান লম্বা শ্বাস টেনে বলল,

–” চৌধুরী গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রির পুরো দায়ভার মিসেস আরশিয়ানের কাঁধে দিয়ে রাজনীতির মাঠে নামব।
ইশতিরাজ চমকে উঠে বলল,
–” তাহলে তো বাবা জেনে যাবে প্রিমার বিষয়টা..
আরশিয়ান হতাশার শ্বাস ফেলে বলে,
–” উনি সবাই জানেন।
ইশতিরাজের মাথা গুলিয়ে যায়। সে হতভম্ব হয়ে বলে,
–” ভেঙেচুরে বল সবটা..
আরশিয়ান নির্বিকার গলায় বলতে শুরু বলে,
–” মিস প্রিমার বাবার মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে এবং উনার গুম হয়ে যাওয়া মা’কে ফিরে পাওয়ার লোভে ওয়াসীত্বদের সাথে হাত মিলিয়েছেন উনি। ওরাই বাইপাস করে মিস প্রিমাকে আমাদের কোম্পানিতে ঢুকিয়েছে। আমি সেসব জেনেছিলাম বহু পূর্বে কিন্তু সঠিক সময়ের অপেক্ষা করেছিলাম। এরমধ্যে হুট করে মিস ফারজানার ইন্সিডেন্ট ঘটে।
কথাটুকু বলে সামান্য থামে আরশিয়ান। এরপর বলে,

–” বেসামাল হয়ে আমিও বিয়ে করি ফেলি তাকে। এরপর সময় দিই সামলে উঠতে। তার মনে নিজের জন্য জায়গা তৈরি করার চেষ্টা করি। যথাযথ সম্মান, ভালোবাসা এবং সম্মান পাওয়ার পরেও উনি বুঝেনি সেসব। আমার প্রেমবোধকে ছাপিয়ে যায় তার প্রতিশোধ স্পৃহা। উনি যে মুহূর্তে ওয়াসীত্বদের কাছে তথ্য পাচার করেন ওই মুহূর্তেই বাবার কাছে সেটার ইনফো চলে যায়। কারণ এই কোম্পানিতে কর্মরত প্রত্যেকটা মানুষের জীবনের অতি সুক্ষ্ম বিষয়ও বাবার নখদর্পনে।
আরশিয়ানের কথায় ইশতিরাজ হাঁ হয়ে যায়। হুট করে তার মাথায় খেলে যায় ভিন্ন কথা,
–” এই কোম্পানির ৬০% শেয়ার হোল্ডার স্বয়ং আরিয়ান ইয়াসার চৌধুরী। হি ইজ ড্যাম সিরিয়াস এবাউট ইট কারণ এই কোম্পানিটা আফিয়া চৌধুরীর ড্রিম ছিল৷
ইশতিরাজ হতবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,

শিরোনামহীন অনুভূতি সিজন ২ পর্ব ২৫

–” এতকিছু জেনেও বাবা নিশ্চুপ?
আরশিয়ান মলিন হেসে বলে,
–” মিশনে আছেন। ওটা শেষ হলেই বাংলাদেশে ফিরবেন।
কথাটা শুনে ইশতিরাজ প্রবল চিন্তায় ঠোঁট কামড়ে বলে,
–” এরপর কী হবে?
আরশিয়ান আঁধারের পানে চেয়ে বলে,
–” ধ্বংসযজ্ঞ..

শিরোনামহীন অনুভূতি সিজন ২ পর্ব ২৭