হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ১২
সিনথিয়া ইসলাম সীমা
ক্যালেন্ডার এর পাতা উল্টিয়ে চোখের পলকে কেটে গেলো দুটি দিন। এ দুদিনে কৃশানের থেকে তেমন কোনো আঘাত প্রাপ্ত হয়নি হুমায়রা। ধমকা- ধমকি তো তার রোজকার রুটিংয়ের আবশ্যক কর্ম। এটা থেকে ছাড় পায়নি! তবে এতে তেমন একটা প্রভাব পড়ে না মেয়েটার উপর। এ কদিনে স্বামীর এমন ধমকে একেবারে অভ্যস্ত হয়ে গেছে সে।
আজকে মির্জা পরিবারের প্রতিটা সদস্যদের মধ্যে তাড়াহুড়া চলছে। কিছুক্ষণ পরেই তারা রওনা হবে কৃশানদের মামা বাড়ির উদ্দেশ্যে। একদিন সেখানে থেকে পরদিনই আবার রওনা হতে হবে আলভির মামা- বাড়ির উদ্দেশ্যে। এই সপ্তাহের মাথায় আবারও দেশ ছাড়বেন ইকরার বাবা- চাচারা।
সেই সুবাদে দুভাইয়ের শ্বশুর বাড়ি থেকেই দাওয়াত পড়েছে। এইদিকে সবার মাঝে যতটা তাড়া দেখা যাচ্ছে ঠিক ততটাই গা ছাড়া ভাব হ নিয়ে আছে কৃশান। প্যান্টের পকেটে হাত দিয়ে বেশ ফুরফুরে মেজাজে ভার্সিটির জন্য রেডি হয়ে নিচে নামতে দেখা গেলো তাকে। ছেলের এমন লাপাত্তা ভাবে বরাবরের মতোই বিরক্ত হলেন ইয়াসমিন বেগম। তিনি সকাল সকাল গিয়ে বলে এসেছেন রেডি হয়ে থাকতে অথচ এসবে কোনো খেয়ালই নেই ছেলেটার। ভদ্রমহিলা ছেলের পথ আটকে দাঁড়ালেন। বললেন,
“ তোকে বলেছিলাম না আজকে তোর মামার বাড়িতে যাবো। কোথায় যাচ্ছিস তুই? ”
“ তো যেতে নিষেধ করেছে কে? তোমার বাপের বাড়ি তুমি যাও! ”
“ তুই যাবি না? ”
এক কথা বারবার বলতে গিয়ে বিরক্ত হলো ছেলেটা। সকালেও একবার বলেছে, সে কোথাও যাচ্ছে না। তারপরেও বারবার একই প্রশ্ন করার মানে হয়? বিরক্তি নিয়ে উত্তর করলো,
“ গেলেই তোমার বাপের বাড়ির মানুষ শুধু জ্ঞান দেওয়া শুরু করে। আমার আবার অত জ্ঞানী মানুষ সহ্য হয় না। তোমাদের যাওয়া তোমরা যাও তো! ”
“ জ্ঞানের কী দেখিস তুই? যা বলে ঠিকই তো বলে! এ বাড়িতে আরেকটাও তো ছেলে আছে নাকি! তোর মতো এমন অমানুষ হয়েছে সে? নিজের বড়ো ভাইয়ের মতো হতে পারবি না আবার আমার বাপের বাড়ির মানুষ সেটা বললেই দোষ? ”
“ ওঁর মতো হতেও চাই না আমি। ”
“ তুই কখনো আলভির মতো হতেও পারবি না। ওমন….”
“ এই এক কথা কানের কাছে বারবার বলো না তো! ছোটোবেলা থেকেই শুনে আসছি তোমাদের এই বয়ান। ওঁর মতো হওয়ার দরকার নেই আমার। আমি আমার মতো হয়েছি! ”
“ হয়েছিস তো এক নম্বরের বখাটে আবার গলা উচিয়ে সেই কথা বলিস। আর আলভি…..”
“ ওঁর নাম আরেকবার আমার সামনে নিবে না বলে দিলাম! আগে থেকেই তো ওঁ ভালো ছিলো আর আমি খারাপ ছিলাম। তাই এখন সেই খারাপের উচ্চ মাত্রায় গিয়ে পৌঁছেছি। সুতরাং ওঁর সাথে আমাকে টানবে না। আমি আমার মতো! ”
চিৎকার করে বলল কৃশান। রাগে চোখ, মুখ লাল হয়ে গেছে ছেলেটার। পরিস্থিতি খারাপের দিক যেতে দেখে রান্নাঘর থেকে এগিয়ে আসলেন নাজমিন বেগম। ছোটো জাকে হালকা ধমকের সুরে বললেন,
“ আহ, সকাল সকাল এসব কী শুরু করলে! ওঁ যেতে না চাইলে জোর করার কী আছে? ওঁ তো কখনোই কোথাও যায় না। ”
থেমে গেলেন ইয়াসমিন বেগম। ক্ষুব্ধ চোখে তাকিয়ে রইলেন ছেলের পানে। সেদিকে লক্ষ্য করলো না কৃশান। গটগট পায়ে রুমে চলে গেলো সে। ভার্সিটিতে যাওয়া হলো না আর।
পুরো ঘটনা রান্নাঘর থেকে চুপচাপ লক্ষ্য করলো হুমায়রা। স্বামীর কথার পিছনে লুকিয়ে থাকা অভিযোগ গুলো বুঝতে বেগ পোহাতে হলো না তার।
মিঠুর জন্য খাবার নিয়ে ধীর পায়ে রুমে প্রবেশ করলো হুমায়রা। আশেপাশে চোখ বুলিয়ে খুঁজলো মন গহীনের কাঙ্ক্ষিত ব্যাক্তিটাকে। রুমের মধ্যে দেখা মিললো না তার। বারান্দায় গিয়ে দেখতে পেলো মানুষটার চওড়া কাঁধের পিছনটা।
মিঠুকে নিয়ে বারান্দায় বসে সিগারেট ফুঁকছে কৃশান। হুমায়রার উপস্থিতি টের পেতেই ধমকে বলল,
“ এখানে কী চাই? ”
“ মিঠুর জন্য খাবার নিয়ে এসেছি। ”
“ দেহ। ”
হাত বাড়িয়ে বাটিটা নিয়ে নিলো সে। কিছু বললো না হুমায়রা। তাকিয়ে রইলো সেদিকে। মিঠুর সামনে বাটিটা ধরতেই মুখ ফিরিয়ে নিলো প্রাণীটি। যেন কৃশানের হাতে খেতে নারাজ সে। কপাল কুঁচকে গেলো ছেলেটার। বলল,
“ কী হলো! খাচ্ছিস না কেন? ”
“ মিঠু তুমি না ভালো খেয়ে নাও! ”
বাটিটা আরেকটু এগিয়ে দিয়ে আদুরে গলায় বলে উঠলো হুমায়রা। সাথে সাথেই ভদ্র প্রাণীর মতো একটা গাজরের কুচি মুখে পুরে নিলো মিঠু। মুচকি হাসলো মেয়েটা। তবে ব্যাপারটা সহ্য হলো না সামনে বসা পুরুষটির। সে কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো,
“ এটাকে বশ করেছিস নাকি তুই? ”
“ বশ করার হলে খরগোশ কে না করে আগে তার মাহাজনকেই করতাম! ”
মনে মনে বিড়বিড় করলো মেয়েটা। মুখে বলল,
“ উঁহু, একটু ভালোবাসা দিয়েছি এই যা! ”
“ আচ্ছা বলুন তো এই দুটো গাজরের থেকে কোন গাজরটা বেশি ভালো? ”
দুটো গাজরের টুকরো কৃশানের সামনে ধরে ফ্লোরে বসতে বসতে প্রশ্ন ছুঁড়লো হুমায়রা। তার কান্ড দেখে ভ্রু বেঁকে গেলো কৃশানের। রাগ নিয়ে বলল,
” তোর কী আমার হাতে মার খাওয়ার ইচ্ছা জেগেছে? ”
“ তো আপনার সাথে থেকে আর কিই বা পাওয়ার ইচ্ছা জাগতে পারে। ভালোবাসা তো দিবেনই না! ”
“ ফালতু কথা বলে মার খাস না বলে দিলাম এমনেই মেজাজ খারাপ! ধরলে একদম দুনিয়া দেখার অবস্থায় রাখবো না। ”
“ আমাকে মেরে যদি আপনার মেজাজটা একটু ভালো হয় তাহলে নাহয় খেলামই কটা মার! ”
“ আজকাল বেশিই কথা ফুটছে তোর মুখ দিয়ে। তোকে তো….”
বলেই হুমায়রাকে মারার জন্য তেড়ে এলো। জায়গা থেকে নড়লো না মেয়েটা। শুধু চোখ, মুখ খিচে রাখলো। যেন স্বামীর মার সাদরে গ্রহন করতে প্রস্তুত সে। তার এমন মাসুম চেহারার পানে তাকিয়ে কেন যেন হাত উঠাতে সক্ষম হলো না কঠোর মানব। মেয়েটার বন্ধ চোখের দিক এক পল তাকিয়ে হাত সরিয়ে আনলো কৃশান। বলল,
“ তুই সামনে থেকে যা আমার। আরেকবার বিরক্ত করলে…..”
“ কোন গাজরটা ভালো এটা বললেই তো হয়। আমি আপনাকে আর কিছু জিজ্ঞেস করবো না। দয়া করে একটু বলুন। ”
মেয়েটার এমন অনুনয়ে নিজের সিদ্ধান্ত থেকে নড়তে বাধ্য হলো কৃশান। দীর্ঘশ্বাস ফেলে গাজর দুটোকে পর্যবেক্ষণ করে বললো,
“ এটার থেকে ঐটা ভালো। ”
প্রত্যাশিত জবাব পেয়ে মুচকি হাসলো হুমায়রা। পরপর বলে উঠলো,
“ হুঁ, আপনার উত্তর একেবারে সঠিক। কিন্তু আপনি কী একটা বিষয় খেয়াল করেছেন যে, পাশাপাশি দুটো জিনিস হওয়ায় একটার প্রশংসা বা দুর্নাম করতে গিয়ে অপরটাকে অজান্তেই টেনে এনেছেন আপনি! ঠিক এমনটাই প্রত্যেকের ক্ষেত্রে হয়। আশেপাশে থাকা দুটো মানুষের মধ্যে কারও প্রশংসা বা দুর্নাম করতে গেলে আমরা অজান্তেই পাশের জনকে টেনে আনি। এর মানে এই নয় যে, যার সাহায্যে অন্যকে সুনাম করা হলো সে খারাপ! বরং তারা দুজনেই দুজনের দিক থেকে পারফেক্ট। হ্যাঁ সে হয়তো ঐ ব্যক্তির মতো অতটা ভালো নয়। তবে সে নিজের জায়গা থেকে ঠিক। সুতরাং এসব ভেবে নিজেকে খারাপ করা পুরোপুরি ভাবে ভুল। ”
কৃশান পূর্ণদৃষ্টি নিক্ষেপ করে দেখলো হুমায়রার মনোযোগী সত্ত্বাটাকে। পরপর ভ্রু উঁচিয়ে প্রশ্ন করলো,
“ তুই কী জ্ঞান দিচ্ছিস আমাকে? ”
“ আসতাগফিরুল্লাহ, মোটেও না। আমার নিজেরই তো জ্ঞান নেই আপনাকে দেবো কীভাবে? ”
একেবারে ইনোসেন্ট ফেস নিয়ে উত্তর করলো মেয়েটা।
“ তাহলে এতক্ষণ এই কথগুলো দিয়ে কী বুঝিয়েছিস? ”
“ উমম, সারমর্ম টা হলো; আপনি অতটাও মন্দ নন। শুধু একটু খানি বখাটে! ”
বসা থেকে উঠে স্থান ত্যাগ করার প্রস্তুতি নিয়ে বললো হুমায়রা।
” এই তুই কোথায় যাচ্ছিস? দাঁড়া বলছি! আমার সাথে ফাজলামি করিস? ”
হুমায়রাকে আর পায় কে। ত্রস্ত পায়ে রুম ছাড়লো সে। দরজার কাছে গিয়ে আবারও বলল,
“ ফাজলামি না আমি সত্যি বলছি আপনি অতটাও মন্দ নন। ”
“ অতটা না তোর ভাবনার চেয়েও বেশি মন্দ আমি। ”
কথাটা শুনে মুখের মুচকি হাসিটা উবে গেলো হুমায়রার। যেতে যেতেই মিহি স্বরে বলল,
“ বখাটে স্বামী! ”
কৃশানের সজাক কানে কথাটা পৌঁছাতেই কেন যেন হাসি পেলো ছেলেটার। মুহূর্তের মধ্যেই মন থেকে মুছে গেলো সকল অভিযোগ, হিংসা, রাগ। স্থান পেলো একটু টুকরো শান্তির হাসি।
মনটা আগের তুলনায় শান্ত হতেই ভার্সিটি যাওয়ার সিদ্ধান্তে আবার ফিরে আসলো কৃশান। চুলগুলো হাত দিয়ে একটু ঠিকঠাক করে হাঁটা ধরলো। ড্রয়িং রুমের শেষ মাথায় আসতেই পা জোড়া থেমে গেলো তার। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসলো অপ্রত্যাশিত কিছু কথোপকথন,
“ তুমি কী কোনোভাবে এখন ঐ বখাটে ছেলের সাইড নিচ্ছো? ”
শাশুড়ির কণ্ঠের পরিপ্রেক্ষিতে দমলো না হুমায়রা। পূর্বের মতো মাথা নিচু করেই বলে উঠলো,
“ নাহ আম্মু, আমি উনার সাইড নিচ্ছি না। উনি ভুল করলে আপনি বকাবকি করুন বা যাই করুন। শুধু কারও সাথে তুলনা না করার অনুরোধ রইলো। কারও তুলনা করে কিছু বললে মানুষের মনে একটা নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এর থেকে সে নিজেকে আরও খারাপের দিকে ঠেলে দেয়। আর তুলনা করার মধ্য দিয়েই একটা মানুষের মনে হিংসা তৈরি হয়। আমার যেটা মনে হলো- বললাম। এতে আপনি কষ্ট পেয়ে থাকলে আমায় ক্ষমা করবেন। ”
বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে আছে কৃশান। মানে! তার যেই দিকটা তার পরিবারের কেউ আজ অব্দি বুঝলো না। আজকের কিছু কথা শুনেই সেই দিকটা বুঝে নিলো ঐ মেয়ে! এটাও সম্ভব? আবার কিনা তার মাকেই নিষেধাজ্ঞা জানাচ্ছে সেই বিষয়ে? এমন আজব কেন মেয়েটা? একেবারে অন্যরকম! কেমন যেন পুরোটাই স্নিগ্ধতায় ভরপুর।
হুমায়রার কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনলেন ইয়াসমিন বেগম। তার পাশেই নাজমিন বেগম স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। কথাগুলো একটু ভেবে দেখলেন ইয়াসমিন বেগম। পরপর বললেন,
“ আচ্ছা তোমার কথাই মানলাম। দেখি এতে কোনো পরিবর্তন আসে কিনা ঐ ছেলের মধ্যে! ”
মুচকি হাসলো হুমায়রা। পরপর কাজে হাত লাগিয়ে দিলো। বলল,
হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ১১
“ আপনরা রেডি হতে চলে যান। আমি সব সামলে নিবো। ”
“ তুমি যাবে না? ”
“ না, আম্মু আপনারা যান। ”
কথা বাড়ালেন না দুই জা। এমনিতেও কৃশান যেহেতু যাচ্ছেই না সেহেতু হুমায়রা বাড়িতে থাকাই ভালো। এই ছেলেকে একা বাড়িতে রেখে গেলে চিন্তার শেষ নেই। মেয়েটা থাকলে একটু নিশ্চিন্ত থাকতে পারবেন।
