হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ১৩
সিনথিয়া ইসলাম সীমা
নির্জন দুপুর, বাড়ির গেট পেড়িয়ে অলস ভঙ্গিতে ভিতরে ঢুকলো কৃশান। জনমানব শূন্য ড্রয়িং রুম দেখেই বুঝা যাচ্ছে বাড়িতে এখন কারও উপস্থিতি নেই। ভালোই হয়েছে তার জন্যে। এমনিতেই মাথাটা কেমন ধরে আছে ভার্সিটি যাওয়ার পর থেকে। এখন একটু শান্তিতে থাকা যাবে। চিল মুডে নিজের রুমের দিক হাঁটা ধরলো সে। দরজার সামনে আসতেই পা যুগল থেমে গেলো তার। সামনের দৃশ্যে অচল হলো মস্তিষ্কের নিউরন বার্তা। চোখের সামনে আবিষ্কার করলো এক খোলা চুলের কেশবতিকে। মিররের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ভেজা চুল ঝাড়ছে হুমায়রা। কিছু জল বিন্দুর ফোঁটা চিকচিক করছে তার গালে। এই প্রথম হুমায়রাকে চুল খোলা অবস্থায় দেখতে পেলো কৃশান। ছেলেটা ভেবেছিলো বাসায় হয়তো কেউ নেই। আর রুমে এসে যে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত দৃশ্য দেখবে- তা মোটেও আশা করে নি। দর্পণে স্বামীর প্রতিবিম্ব ভেসে উঠতেই সেদিক ফিরে তাকালো হুমায়রা। মুচকি হেসে বলল,
” আসসালামু-আলাইকুম। ”
সম্বিৎ ফিরলো কৃশানের। চটজলদি নিজেকে স্বাভাবিক করে মনে মনে সালামের উত্তর নিলো। মুখে বলল,
“ তুই বাড়িতে কেন? ”
“ আপনি বাড়িতে তাই! ”
“ মানে! আবার ফাজলামো শুরু করেছিস তুই? ”
“ আরে, ফাজলামো কেন করতে যাবো? এমনেই আমি কোথাও যাই না। ”
“ ভাবছিলাম একা একা একটু এনজয় করবো দিলি তো সব মাটি করে! ”
মুখটা চুপসে গেলো মেয়েটার। মিনমিন করে বলল,
“ আমি কী আপনাকে এনজয় করা থেকে আটকে রাখবো নাকি! ”
“ আটকে রাখা লাগবে নাকি! আশেপাশে থাকলেই তো আমি কেমন যেন আটকে আটকে যাই। ”
মনে মনে বলল কৃশান। মুখে বলল,
” আচ্ছা যাই হোক, এখন কথা হচ্ছে তুই এভাবে চুল খুলে রেখেছিস কেন? ”
“ চুলগুলো ভেজা তাই। ”
“ তাই বলে একটা ছেলের সামনে এভাবে চুল ছেড়ে রাখবি? ”
চোখ ছোটো ছোটো করে তাকালো মেয়েটা। বলল,
“ আপনি কী কোনো পরপুরুষ নাকি! আপনি আমার স্বামী। ”
তিরের ফলার মতো গিয়ে বুকে বিধলো কথাখানা। সৃষ্টি হলো এক বেনামী অনুভূতির প্রকান্ড ঝড়! মেয়েটা কী পাগল নাকি? এতো কিছুর পরেও আমার মতো ছেলেকে কী অকপটে স্বামী বলে স্বীকার করে! নাহ, এভাবেই মাথা ব্যাথা করছে আবার এই মেয়েকে নিয়ে ভাবতে বসলে ব্যাথা আরও বেড়ে যাবে। সে কাঁধের ব্যাগটা সোফায় রেখে ওয়াশরুমের উদ্দেশ্যে হাঁটা দিলো। হুমায়রাকে সম্পূর্ন উপেক্ষা করলো বললেই চলে। কিছু বললো না মেয়েটা চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো নিজের জায়গায়। মনটা বিষন্ন হতে চাইলেও তাকে নতুন আশায় জাগ্রত করলো।
কিছুক্ষনের মধ্যেই ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এলো কৃশান। দরজা খোলার শব্দে সেদিকে লক্ষ্য করলো হুমায়রা। দেখলো, মানুষটার চোখ জোড়া আগের তুলনায় কেমন লাল হয়ে গেছে। চুলগুলো খামছে ধরে এগিয়ে আসছে সে। মেয়েটা মুখ খুলে কিছু জিজ্ঞেস করতে নিবে মাঝপথেই তাকে থামিয়ে দিলো কৃশান। শাসিয়ে বলল,
“ খবরদার আর একটা কথা বলে আমায় বিরক্ত করবি তো ভালো হবে না বলে দিলাম! ”
মানুষটার এমন শাসানো সুরে পাত্তাই দিলো না হুমায়রা। চোখ বড়ো বড়ো করে বলল,
“ হায় আল্লাহ, আপনার চুলে কী? ”
সাথে সাথেই চুল ঝাড়তে লাগলো কৃশান। উদ্বেগ নিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“ চুলের মধ্যে আবার কী পড়লো? গেছে…? ”
কোনোকিছু তোয়াক্কা না করে কৃশানের কাছে চলে এলো হুমায়রা। সামনের পুরুষটি তার থেকে বেশ লম্বা হাওয়ায় সহজে চুলের নাগাল পেতে সোফায় উঠে দাঁড়ালো। পরপর দুবার আলতো হাতে স্বামীর চুল টেনে দিয়ে বলল,
“ হুঁ, এবার চলে গেছে। ”
সেদিকে খেয়ালই নেই চুলের মালিকের। হুমায়রার চুল টেনে দেওয়ার মাঝে হারিয়ে গেছে সে। এতটা শান্তি লেগেছে যে, মুখ দিয়ে শব্দ বের করতে ইচ্ছে হচ্ছে না। প্রত্যাশিত ফলাফল পেতেই মুচকি হাসি ফুটলো হুমায়রার মুখে। মোলায়েম কণ্ঠে জানতে চাইলো,
“ একটু চুলগুলো টেনে দেই…? ভালো লাগবে। ”
তৎক্ষনাৎ বন্ধ চোখ জোড়া খুলে ফেললো ঘাড়ত্যাড়া মানব। প্রবল নিষেধাজ্ঞা জানিয়ে বলল,
“ না দরকার নেই! ”
মানে, ভাঙ্গবে তবুও মচকাবে না। নিজের সিদ্ধান্তে অনড় হয়ে থাকবে সর্বদা। হুমায়রা কী দমে যাওয়ার পাত্রী নাকি? পিছু হাটলো না সে। কৃশানের চুল ধরে রেখেই বলল,
“ একটু দেই দেখবেন অনেক শান্তি লাগবে। ”
একে তো মাথার অসহ্য যন্ত্রণা আবার হুমায়রার এমন পকরপকরে না পেরে মেনে নিলো কৃশান। আসলেই আপাতত এই শান্তিটা প্রয়োজন তার। কথা না বাড়িয়ে সোফায় হেলান দিয়ে ফ্লোরে বসে পড়লো। সম্মতি পেয়ে বিশ্বজয়ের হাসি হাসলো রমনী। সাথে সাথেই লেগে পড়লো স্বামীর খেদমতের কাজে। মাথার মধ্যে নরম তুলতুলে হাতের বিচরণে অজান্তেই সকল ক্লান্তি, বেদনা দুর হতে লাগলো কৃশানের। চোখ জোড়া বুঁজে আসছে ঘুমে। শরীরের পুরো ভার হুমায়রার কোলে ছেড়ে দিলো।
অনেকক্ষন যাবৎ কৃশানের নড়চড় না দেখে থামলো হুমায়রা। মুখটা একটু এগিয়ে এনে বুঝতে চাইলো মানুষটা ঘুমিয়ে পড়লো কিনা। মাথা ঝুঁকতেই ঘন চুলগুলো দুদিক দিয়ে সামনে এসে ভিড় করলো। তাদের রাজত্বে নিমিষেই আড়াল হলো দুটো মুখশ্রী। মুখের উপর কারও তপ্ত নিঃশ্বাস উপলব্ধি করতেই তড়াক করে চোখ খুললো কৃশান। তার কালো মণির সাথে চোখ মিলতেই বুক কেঁপে উঠলো মেয়েটার। মুহূর্তেই নিজেকে সরিয়ে আনলো সে। ঘটনার আকস্মিকতায় বড্ডো ভয় পেয়েছে। হাতগুলোও কেমন অনড় হয়ে পড়েছে যেন। অথচ অত্যধিক শান্ত দেখা গেলো অপর মানুষটিকে। একটু ও হেলদোল নেই তার মাঝে। সহসা নীরবতা ভেঙে ধ্বনিত হলো তার নিরেট স্বর,
“ তখন তুই ইচ্ছে করে বলেছিলি আমার চুলে কী যেন? ”
” ……….. ”
চুপ রইলো মেয়েটা। তখন কৃশানের মুখ দেখেই আন্দাজ করতে পেরেছিলো মানুষটার মাথা হয়তো ব্যাথা করছে। ভালো করে বললে তো আর কখনোই মালিশ করতে দিতো না। তাই ওমন টেকনিক খাটিয়েছে। এখন সেটা মুখ ফুটে কীভাবে বলবে?
“ শুন, আমার সাথে নিজেকে জড়াতে আসিস না। পরে আমার মতোই কুল কিনারা হীন হয়ে পড়বি! ”
বসা থেকে উঠে পড়লো কৃশান। কোনোদিক না তাকিয়ে বিছানায় গিয়ে উবর হয়ে শুয়ে পড়লো। সেদিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে রইলো হুমায়রা।
দিনের প্রায় শেষ ভাগে এসে ঘুম ভাঙলো কৃশানের। ঘরের মাঝে তখন হুমায়রার অস্তিত্ব নেই। ঘুম ঘুম চোখে ওয়াসরুমে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে আসলো সে। গায়ে শার্ট জড়িয়ে রওনা হলো বাইরের উদ্দ্যেশ্যে।
বাড়ির মূল ফটক অতিক্রম করতেই বাগানে দেখা মিললো হুমায়রার। মনোযোগ দিয়ে গাছে পানি দিচ্ছে সে। এবেলায় আর চুল দেখা যাচ্ছে না তার। সুদীর্ঘ কেশ গুচ্ছ স্থান পেয়েছে হিজাবের আড়ালে। সেদিকে এক পল তাকিয়ে নিজের রাস্তায় হাঁটতে নিলো কৃশান। সহসা চোখ পড়লো মেয়েটার কাঁধের কাছটায় হিজাবের উপর দিয়ে হাঁটা বিষাক্ত ভোমরের দিকে। তুরন্ত হস্তে ছুটলো মানুষটার পা জোড়া।
কারও পায়ের আওয়াজে পিছু ফিরে তাকালো হুমায়রাকে। কৃশানকে এমন দৌড়ে আসতে দেখে ভয়ে আপনা আপনিই কদম পিছাতে লাগলো। তবে যেতে পারলো না বেশিদূর। এর আগেই খপ করে এসে তার হাতটা ধরে ফেললো কৃশান। কোনোকিছু না ভেবেই ভোমর টাকে হাত দিয়ে ছুঁড়ে ফেললো। ওমনিই পতঙ্গটির বিষাক্ত শুঙ্গ বসে গেলো ছেলেটার হাতে। দাঁতে দাঁত পিষে ব্যাথা হজমের চেষ্টা চালালো। সেই সাথে বেখেয়ালি হুমায়রার ধরে রাখা হাতটা আরও জোরে চেপে ধরলো। এতটাই জোরে ধরেছে যে মেয়েটার হাতের রক্ত চলাচল বন্ধ হওয়ার উপক্রম। সহসা কৃশানের এমন আচরনের আগামাথা খুঁজে পাচ্ছে না হুমায়রা। ব্যাথায় কঁকিয়ে আসা কণ্ঠে প্রশ্ন ছুঁড়লো,
“ এমন কেন করছেন! কী হয়েছে আপনার? ”
মস্তিষ্ক সচল হলো কৃশানের। তৎক্ষনাৎ হুমায়রার হাত ছেড়ে দিলো সে। ধমকে বলল,
” কাজ করার সময় মনোযোগ কই থাকে তোর? ”
তার লালিত চেহারায় পানে তাকিয়ে আছে মেয়েটা। সে কী এমন করলো যে লোকটা এতো রেগে গেছে? এইদিকে সে জানেই না, রাগে নয় বরং তাকে বাঁচাতে গিয়ে নিজে আঘাত পেয়ে এই অবস্থা হয়েছে মানুষটার। সে ঘাড় নামিয়ে মিনমিন করে জানতে চাইলো,
“ কী করলাম? ”
“ কিছু করিসনি মর তুই! ”
উল্টো ঘুরে ধুপধাপ পায়ে স্থান ত্যাগ করলো ছেলেটা। ব্যাথায় হাত টনটন করছে তার।
মানুষটার যাওয়ার পানে অপলক চেয়ে রইলো হুমায়রা। এতক্ষন কী হলো, কেন হলো কিছুই বুঝলো না।
গোধূলি বেলা, বাইরের সব কাজ সেরে ঘরের ভিতরে ঘামটি মেরে বসে আছে হুমায়রা। সবকিছু কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। সেই তখন থেকে ইকরাকে মনে পড়ছে। এমন সময় প্রতিদিন ইকরার সাথেই সময় কাটে তার। মেয়েটা যেতে চায়নি। বলেছিলো হুমায়রা না গেলে সেও যাবেনা। তবে ইয়াসমিন বেগম ও হুমায়রার জোরে বাধ্য হয়েই যেতে হয়েছে তাকে।
মিঠুকে কোলে নিয়ে মন মরা হয়ে বসে রইলো হুমায়রা। তখনি কলিং বেল বেজে উঠলো। ভ্রু বেঁকে এলো মেয়েটার। এমন সময় আবার কে এলো? কৃশান তো কখনোই আসবে না। তাহলে কে?
বসা থেকে উঠে দরজার সামনে আসলো। দোর খুলতেই ভেসে উঠলো ইকরার হাস্যজ্জ্বল মুখ,
“ সারপ্রাইজ! ”
চোখ বড়ো বড়ো করে তাকিয়ে আছে মেয়েটা। নিজের চোখকেই বিশ্বাস হচ্ছে তার। বিস্ময় ভরা কণ্ঠে বলল,
“ তুই! ”
“ হুঁ, আব্বু এসে দিয়ে গেলো। ”
“ ওমা কেন? আজকেই তো গেলি! ”
“ ওখানে ভাল্লাগে না আমার। আর আলভি ভাইয়ারা মামা বাড়িতে গিয়ে আমি কী করবো? আজব! ”
“ তাই বলে আজকেই চলে এলি? আম্মু কিছু বলেনি? ”
“ বলেছে, তবে আমি বাবাকে মানিয়ে এসে পড়েছি। ওখানে কেউ নেই, শুধু আমার ছোটো একটা কোলের মামাতো বোন আছে। আর বাকিসব বড়ো বড়ো মহিলা, পুরুষ। তারা নিজের মতো বকবক করতে থাকে আমি ওখানে কী করবো! আর এখানে তুই একা থাকবি- সবদিক বিবেচনা করে চলে এলাম। ”
হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ১২
“ আমি একা কই! উনি আছেন না? ”
“ আমার ভাইয়া থাকলে যা না থাকলেও তা। ওঁর তো বাসায় ফেরার কোনো ঠিক ঠিকানাই নেই। ”
এতক্ষনের মলিন মুখটায় মুহূর্তেই হাসি ফুটে উঠলো হুমায়রার। বলল,
“ শুকরিয়া আমার প্রিয় সখি। আমায় নিয়ে এতোটা ভাবার জন্যে। ”
