Home হৃদয় রাঙানো প্রেম হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ১১

হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ১১

হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ১১
সিনথিয়া ইসলাম সীমা

ঘুমের দেশে তলিয়ে আছে ইকরা। চারপাশে কী হচ্ছে কোনো খবর নেই তার। সহসা কারও মুখে নিজের নাম কর্ণপাত হলো বোধ হয়। তবে তেমন একটা গ্রাহ্য করলো না। আবারও ভেসে আসলো একটা ক্ষীণ স্বর,
“ ইকরা? ”
মা- চাচিরা যেন জেগে না যায় সেজন্য বেশ আস্তে করেই ডাকলো কৃশান। এবেলায় ওপাশ থেকে ঘুম ঘুম কণ্ঠে প্রশ্ন এলো,
“ কে? ”
“ তোর মায়ের পেটের বড়ো ভাই! ”
বিরক্তি নিয়ে উত্তর করলো কৃশান। ভাইয়ার কণ্ঠ বুঝতে পেরে এক লাফে ঘুম থেকে উঠে পড়লো মেয়েটা। তড়িঘড়ি করে নিজেকে সামলে নিয়ে এসে রুমের দরজা খুললো।

“ কিছু হয়েছে ভাইয়া? হুমায়রার কিছু লাগবে? ”
“ তোর বান্ধবীর জ্বর এসেছে। কী করবি কর গিয়ে! ”
কথাটা শুনতেই ত্রস্ত পায়ে কৃশানের রুমে চলে এলো ইকরা। বিছানায় কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকা হুমায়রার কপালে হাত রাখতেই আঁতকে উঠলো। বলল,
“ হায় আল্লাহ, জ্বর তো অনেক বেশি। ”
কৃশান নীরব দর্শকের মতো শুধু তাকিয়ে রইলো। বললো না কিছুই। এর মাঝেই ইকরা রুম থেকে বেরোতে বেরোতে বলল,
“ আমি এক্ষুনি আসছি দাঁড়াও। ”
হুমায়রার মুখোমুখি হয়ে খাটের অপর পাশে বসলো কৃশান। তাকালো স্ত্রীর জ্বরাক্রান্ত মুখপানে। চেহারায় কেমন মলিন ভাব ফুটে উঠেছে। ঠোঁট দুটো শুকিয়ে একেবারে কাঠ। মেয়েটার ক্লান্ত মুখশ্রীর দিক তাকিয়েই ভিতরের এক অদৃশ্য সত্ত্বা বলে উঠলো,
“ তোর সেবা করতে করতেই মেয়েটা নিজে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। আর পরিবর্তে তুই কিনা মেয়েটাকে পুনরায় আঘাত করলি! ”
সেই সত্ত্বার কাবুতে এলো না কঠোর মানব। উল্টো প্রখর বিরোধিতা করে বললো,
“ আমি তো বলিনি সেবা করার জন্য। এই মেয়ে নিজেই নিজের দুঃখ টেনে এনেছে। আমি বলেছিলাম আমার থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে। কথা না শুনলে তো আঘাত পাবেই। ”

“ একজন মানুষ অসুস্থ হলে বুঝি চুপচাপ বসে থাকা যায়? তাহলে তুই কেন পারলি না মেয়েটাকে অসুস্থ দেখার পর ঘুমিয়ে পড়তে? নিজের এ ব্যাপারে অভিজ্ঞতা নেই বলে তো ঠিকই বোনকে ঘুম থেকে উঠিয়ে আনলি! ”
তার মন- মস্তিষ্কের এমন অদৃশ্য যুদ্ধের মধ্যেই ফিরে এলো ইকরা। বাটিতে করে একটা রুমাল ভিজিয়ে এনেছে সে। হুমায়রার শিয়রে বসে জলপট্টি দেয়ার জন্য আগে মেয়েটার হিজাবটা আলগা করে কপাল থেকে সরালো। উত্তপ্ত কপালে ঠান্ডা কিছুর স্পর্শ পেতেই কেঁপে উঠলো হুমায়রা। সেদিকে তাকিয়ে কৃশান প্রশ্ন ছুঁড়লো,
“ রাতের খাবার খেয়েছিলো তোর বান্ধবী? ”
“ হুঁ, আমাকে বলেছিলো শরীরটা কেমন যেন করছে আর মাথা ব্যাথা করছে। তাই আমি নাপা খাইয়ে দিয়েছিলাম। ”
“ ওহ, ”
“ আজকে নাহয় আমি এ রুমে থেকে যাই। তুমি….”
“ দরকার নেই। আপাতত কাপড়টা শুকালে ভিজিয়ে দিলেই তো হবে নাকি? ”
কথা সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই তাকে থামিয়ে বলে উঠলো কৃশান। ভাইয়ার কথায় ইকরা ছোট্ট করে উত্তর করলো,

“ হুঁম। ”
“ তাহলে তুই এখন যা, আমি অন্য রুমে যেতে পারবো না। ”
কথা বাড়ালো না ইকরা। এক পল হুমায়রার দিক তাকিয়ে অনিচ্ছা সত্বেও রুম ত্যাগ করলো। দরজা লক করে আবারও এসে আগের স্থানেই বসলো কৃশান। কিছুক্ষণের মধ্যেই আবারও জলপট্টি শুকিয়ে গেলো হুমায়রার। শিয়রে এসে বসলো মানুষটা। পুনরায় তা শিক্ত করে দিয়ে দিলো ঘুমন্ত রমনীর ললাটে। এ ঘটনা যদি কোনোমতে তার বন্ধুরা দেখতে পেতো তাহলে আশ্চর্যের সপ্তম আকাশে উঠে বলতো,
“ যে হাতে সিগারেট আর মদের বোতল ছাড়া অন্য কিছুর ঠাই মিলেনা আজ সেই হাতেই কাউকে জলপট্টি দিচ্ছে স্বয়ং কৃশান মির্জা। তাও কিনা একটা মেয়েকে! ”
কাজ শেষ করে এক কোণায় শুয়ে পড়লো কৃশান। এতদিন হুমায়রা যেভাবে এক কোণায় গুটিশুটি মেরে ঘুমাতো ঠিক সেইভাবে। যেন হুমায়রার শরীরে শরীর না লাগতে পারে। একেবারে কোণায় শুয়ার পরেও হুমায়রা মাঝ বরাবর থাকায় খুব বেশি দূরত্ব নেই তাদের মধ্যে। পকেট থেকে মোবাইল বের করে উল্টো ঘুরে তা স্ক্রোল করতে লাগলো কৃশান। ফাঁকে ফাঁকে সতর্ক চোখ দুটো দেখলো পাশে থাকা রমণীকে।

ভিতরের শীতলতায় ঘুমের মধ্যেই ক্ষণে ক্ষণে কেঁপে উঠছে হুমায়রা। সময়ের সাথে সেই কাঁপুনি আরও প্রগাঢ় হলো। ঠাণ্ডায় হাত পা একেবারে গুটিয়ে নিয়েছে। এতেও উষ্ণতা পাচ্ছে না মেয়েটা। সহসা পাশে উপলব্ধি করলো একটা উষ্ণ কিছুর। কোনোকিছু না ভেবেই হাত বাড়িয়ে আঁকড়ে ধরলো তা।
ফোন স্ক্রোলের মাঝেই পেটের মধ্যে একটা উত্তপ্ত নরম হাতের স্পর্শ পেয়ে থমকে গেলো কৃশানের পুরুষ সত্ত্বা। হুমায়রার কম্পমান শরীরটা তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে ধরতেই হাত থেকে ফসকে পড়ে গেলো মোবাইলটা। নির্জন রাতে পুরো ফ্লোরে ঝনঝন শব্দের উত্তোলন হলো। সেই সাথে কিছু একটা আছড়ে পড়লো কৃশানের হৃদ কোটরে। এক অজানা অনুভূতির জোয়ারে শিহরিত হলো প্রতিটা শিরা উপশিরা। এই প্রথম কোনো নারীর এতটা কাছাকাছি তে বড্ডো অশান্ত হলো মস্তিষ্ক। গলা শুকিয়ে কাঠ, একটা শুষ্ক ঢোক গিললো ছেলেটা। বহু কষ্টে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো স্ত্রী নামক নারীটির পানে। ঠান্ডায় তিরতির করে কাঁপছে হুমায়রার টিউলিপের পাঁপড়ির ন্যায় গোলাপি অধর যুগল। সেদিকে তাকিয়ে প্রকান্ড ঝড় উঠলো ছেলেটার মনে। মস্তিষ্ক অচল হলো অগণিত নিষিদ্ধ বার্তায়। সামনে থাকা মায়াবী রমণীটিকে এবেলায় কোনো প্রাণঘাতিকার চেয়ে কম মনে হলো না তার কাছে। সাথে সাথেই হুমায়রাকে নিজের থেকে ছাড়িয়ে উঠে পড়লো সে।

আলমারি থেকে কমফোর্ট বের করে জড়িয়ে দিলো মেয়েটার শরীরে। কাঁপুনি কমতে লাগলো ওমনিই। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো কৃশান। পরপর ঘেমে উঠা শরীর নিয়ে বারান্দার দিক হাঁটা দিলো। ঠোঁটের ভাঁজে সিগারেট ধরিয়ে লাইটার জ্বালিয়ে দিলো সিগারেটের মাথায়। অতঃপর সকল নামহীন অনুভূতি উড়ে গেলো নিকোটিনের ধোঁয়ায়। সেদিকে তাকিয়ে কৃশান বিড়বিড় করে বলল,
“ নারীর স্পর্শ বড্ডো ভয়ানক!
এই মেয়েকে দুরে রাখাতে চাইছি অথচ এঁ কিনা আমার অস্তিত্বকে নিয়ন্ত্রণ হীন করে ছাড়ছে। ”
এর মাঝেই ভিতর থেকে সিগারেটের গন্ধে কেশে উঠলো হুমায়রা। দীর্ঘশ্বাস ফেললো ছেলেটা। আধ খাওয়া সিগারেট টা গ্রিলের ফাঁক দিয়ে ফেলে দিলো। বলল,
“ শুধুই কী আর বলি নারী জাতি মানেই প্যারা! ”

সকালে ঘুম থেকে উঠে কৃশানকে বিছানায় পেলো না হুমায়রা। চোখ জোড়া পুরো ঘর খুঁজলো মানুষটাকে। নাহ, কোথাও তার অস্তিত্ব নেই। রাতে বুঝি বাসায় ফিরেন নি তিনি? সারারাত কী বাইরেই কাটিয়েছে!
সকাল সকাল চেহারায় অন্ধকার নেমে এলো মেয়েটার। বিছানায় ভর দিয়ে শুয়া থেকে উঠে বসলো সে। ফ্লোরে পা ফেলতে যাবে এর আগেই করিডোর থেকে ভেসে আসলো কাঙ্ক্ষিত ব্যাক্তির অনাকাঙ্ক্ষিত স্বর,
“ কোথায় যাচ্ছিস? ”
ভরকে গেলো হুমায়রা। অবাক দৃষ্টিতে চাইলো করিডোরে দাঁড়িয়ে আকাশের দিক তাকিয়ে থাকা মানবের পানে। বলল,
“ আপনি ওখানে কেন? ”
“ যেভাবে পুরো বিছানা জুড়ে ঘুমিয়েছিস আরেকজন ঘরে থাকার কোনো অপশন ছিলো কী? ”
“ ডাকলেই হতো! ”
“ শুধু ডাকিনি থাপ্পড়ও মেরেছিলাম কাজ হয়নি। ”
চোখ বড় বড় হয়ে গেলো মেয়েটার। তার ঘুম তো এতটাও গাঢ় নয়! গতকাল শরীরটা অতিরিক্ত খারাপ লাগছিলো যার দরুণ এতকিছু তার মাথায় ছিলো না। মাঝখানেই শুয়ে পড়েছে। কিন্তু তাই বলে থাপ্পড় খেয়েও সজাগ পাবে না!
“ এখন কোথায় যাবি তাড়াতাড়ি যা আমি ঘুমাবো। ”
কৃশানের কণ্ঠে সম্বিৎ ফিরলো হুমায়রার। হন্তদন্ত হয়ে বলল,
“ জ্বি আপনি ঘুমান। আমি নামাজ পড়তে যাচ্ছি। ”
বিছানা ছেড়ে ওয়াসরুমে ঢুকে পড়লো সে। সাথে সাথেই বিছানায় গা এলিয়ে দিলো কৃশান। চোখে এসে ভিড় করলো রাজ্যের ঘুম।

শীতের রিক্ততা কাটিয়ে ধরণীতে আগমন ঘটেছে বসন্তের। নিজের অমায়িক সৌন্দর্য দিয়ে প্রকৃতিকে নতুন সাজে সাজিয়ে তুলেছে ঋতু রাজ। গাছে গাছে গজে উঠেছে নতুন পত্তর। ক্ষণে ক্ষণে সকালের স্নিগ্ধ হাওয়ায় দুল খেয়ে নিজেদের অস্তিত্বের জানান দিচ্ছে তারা।
ছাদে দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য মুগ্ধ দৃষ্টিতে দেখছে হুমায়রা ও ইকরা। হুমায়রার শরীরের তাপমাত্রা এখন প্রায় পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে। ইকরা এতক্ষন গত কাল রাতের সব ঘটনা খুলে বলেছে তাকে। সব শুনে হুমায়রা টাস্কি খেয়ে আছে। কই সেতো কিছুই টের পায়নি। শুধু একটু একটু ঠান্ডা অনুভব করেছিলো রাতে- এটুকুই মনে আছে। আর সকালে উঠেও চোখের সামনে পানি, জলপট্টি কিছুই দেখলো না। দেখবে কীভাবে? এর আগেই তো সব সরিয়ে ফেলেছে কৃশান। যার দরুণ কিছুই বুঝতে পারে নি সে।
সবশেষে ইকরা বললো যে, “ তার নাকি মনে হচ্ছে কৃশান হুমায়রার প্রতি দূর্বল হচ্ছে। ” কথাটায় কেবল একটা মুচকি হাসি উপহার দিয়েছে হুমায়রা। এরপর দুজনেই চুপচাপ সামনের গাছ পালার দিক তাকিয়ে আছে।
“ আমার মনে হয় এখন থেকেই ভাইয়াকে সব খারাপ কাজে বাধা দেওয়া উচিত তোর। এভাবে প্রতিবাদ করলেই ধীরে ধীরে দ্বীনের পথে এসে যাবে ভাইয়া। ”

নীরবতা ভেঙে বলে উঠলো ইকরা। উত্তরে খানিক চুপ রইলো হুমায়রা। পরপর শান্ত প্রকৃতিতে ধ্বনিত হলো কিছু মনোরম বাক্য,
“ যে রাজ্যের রাজার মনে তার রানীর রাজত্ব নেই সেই রাজ্যে রানীর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে গেলে রাজ্যের ধ্বংস নিশ্চিত। আমরা দীর্ঘকাল সংসার করার স্বপ্ন দেখি। অথচ সংসার টিকানোর মূল ভিত্তিটাই ভুলে যাই। নির্দিষ্ট ব্যাক্তির মন গহীনে জায়গা না করতে পারলে শত চেষ্টার পরেও সংসার টিকে না।যেদিন আমার হালাল পুরুষের মনে আমার রাজত্ব এসে যাবে সেদিন তার রাজ্য তিনি আপনমনেই আমার হাতে তুলে দিবেন। আমি সেদিনেরই অপেক্ষায় আছি। আর আমি জানি আমার রব আমায় নিরাশ করবেন না। আমার চোখের পানির পরিবর্তে তিনি দেরী করে হলেও উত্তম কিছুই উপহার দিবেন। ”
“ তা ঠিক তবে আমার মনে হচ্ছে ভাইয়ার মনে এখন তোর জন্য একটা সফট কর্নার তৈরি হয়েছে। তাই এখন থেকে প্রতিবাদ করলেও পারিস। ”

হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ১০

“ যদিও আমি জানিনা উনার মনে সত্যিই আমার জন্য কিছু আছে কিনা। তবে এখন যদি আমি উনার জীবন নিয়ে কথা বলি আমার মনে হয় উনি আরও বিগড়ে যাবেন। কেননা উনি যেখানে মেয়েদের সহ্যই করতে পারেন না। আমাকে সারাক্ষন বলেন দুরে থাকতে সেখানে যদি এখন উনাকে আমি বলি এটা করা যাবে না ওটা করা যাবে না তখন উনি রেগে গিয়ে উল্টো সেই কাজটাই আরও বেশি করবেন। কারও দখলদারি উনার মোটেও পছন্দ নয়। এক্ষেত্রে আমার প্রতিবাদী নয় বরং আরও বেশি ধৈর্য্য ধারণ করা উচিৎ। আর দোয়া কর, আমি যেন শেষ অব্দি ধৈর্য্য ধরতে পারি। ”
“ অবশ্যই আমার প্রিয় সখি, আমি জানি ইনশাআল্লাহ তুই একদিন তোর হৃদয়ের পবিত্র ভালোবাসা দিয়ে আমার ভাইয়ার মন জয় করবি। ”

হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ১২