Home হৃদয় রাঙানো প্রেম হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ১০

হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ১০

হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ১০
সিনথিয়া ইসলাম সীমা

ফোনের বাজখাই শব্দে ঘুম ছুটে গেলো কৃশানের। সবটুকু বিরক্তি হাতের মধ্যে ঢেলে দিয়ে খপ করে ধরলো মোবাইলটা। স্ক্রিনে ঝলঝল করছে রবির নাম্বার। বিরক্তি সংযত করে কল রিসিভ করলো। ওপাশ থেকে ভেসে আসলো তিনটি সম্মিলিত স্বর,
“ কিরে আলালের ঘরের কুলাঙ্গা দোলাল! কাল থেকে এতগুলো কল দিলাম কোন গর্তে ঢুইকা ছিলি তুই? ”
“ সকাল সকাল মুখ খারাপ করবি সামনে পাইলে তোদের ডিগবাজি খাওয়ামু দেখিস। ”
দমে গেলো ওপাশের ব্যাক্তিরা। বলল,
“ ভার্সিটি আসবি কখন? ”
“ আসছি। ”
ফোন কেটে ওয়াসরুমে ঢুকে ফ্রেশ হতে চলে গেলো কৃশান। হাত, মুখ ধুয়ে এসে ভার্সিটির জন্য রেডি হতে শুরু করলো। এখন শরীরটা আগের তুলনায় অনেকটাই ভালো লাগছে। সুতরাং ঘরে বসে বোরিং সময় কাটানোর প্রয়োজন নেই।

তার তৈরি হওয়ার মাঝেই নিঃশব্দে রুমে প্রবেশ করলো হুমায়রা। তখন কৃশানের শাওয়ার নেওয়ার মধ্যেই আযান পড়ে যাওয়ায় ঘুম থেকে উঠে রুম ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছিলো সে। এর মাঝে একবার এসে ঘুমন্ত স্বামীর জ্বর চেক করে গিয়েছিলো। তাপমাত্রা স্বাভাবিক থাকায় এরপর আর আসা হয়নি।
নিজেকে পরিপাটি করে মিররের সামনে থেকে সরে আসলো কৃশান। পিছন ঘুরে হুমায়রাকে সঙ এর মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো,
“ কী চাই..? ”
“ ঔষধ টা খেয়ে যেতেন, নয়তো আবার জ্বর আসতে পারে। ”
পিছন থেকে হাত গুলো এনে খাবারের বাটিটা সামনে ধরে বলল হুমায়রা। চোখ মুখ একেবারে স্বাভাবিক, ভয়ের লেশ টুকু নেই তার মুখে। ব্যাপারটা বোধ হয় সহ্য হলো না সামনের ব্যাক্তির। সে শার্টের হাতা গুটাতে গুটাতে দাঁত খিচে বলতে নিলো,
“ খুব বাড় বেড়েছিস তুই না? তবে তো এবার তোকে শি…..”
কথা সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই একটা আস্ত স্যান্ডুইচ তার মুখে পুরে দিলো হুমায়রা। জবান থেমে গেলো ছেলেটার।
“ আপনি আমাকে মারুন, কাটুন যাই করুন! এটা খেয়ে ঔষধ খেয়ে যান। নয়তো পুনরায় জ্বর ফিরে আসার সম্ভাবনা আছে। ”

চোখ মুখ খিচে রেখে গরগর করে বলে উঠলো হুমায়রা। চেহারার মধ্যে ভয়ের ছাপ স্পষ্ট। এই বুঝি এক ঘা লাগিয়ে দিবে মানুষটা। অথচ তেমন কিছুই হলো না। সহসা হাতে কারও ঠান্ডা স্পর্শ পেয়ে তড়াক চোখ মেলে সামনে তাকালো সে। দেখলো তার বাড়িয়ে রাখা হাতটা ধরে খাবার চিবোচ্ছে কৃশান। বিস্ময়াভিভূত, হকচকানো দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো মেয়েটা। চোখ বড়ো বড়ো করে বারংবার পল্লব ঝাপটে বুঝতে চাইলো ঘটনা সত্য কিনা। নাহ, ঘটনা পুরো সত্য। সামনে থাকা স্বামী নামক ব্যাক্তিটা আসলেই তার হাত থেকে খাবার খাচ্ছে। তাহলে কী এবার সত্যিই দুঃখের দিন গুচতে চলেছে হুমায়রার?

হুমায়রার এমন হতবিহ্বল বদন দেখে বাঁকা হাসলো কৃশান। ভদ্র ছেলের মতো পুরোটা স্যান্ডুইচ খেয়ে শেষ করলো। শেষ কামড় টা দেওয়ার সময় মেয়েটার নরম আঙুলে নিজের শক্ত দাঁত বসিয়ে দিলো। সমস্ত রাগ বুঝিয়ে দিলো এক কামড়ে। ঘটনার আস্মিকতায় বাটিটা হাত থেকে পড়ে গেলো হুমায়রার। মেয়েটা আন্দাজও করতে পারেনি এমন কিছু হতে যাচ্ছে। ব্যাথায় দাঁত দিয়ে ঠোঁট চেপে ধরলো। চোখ জোড়া ভিজে উঠলো জলে। লালিত হয়ে উঠলো পুরো মুখশ্রী। তবুও শব্দ বের করলো না মুখ দিয়ে।
ভেজা পাপড়ি যুগলের উপর দৃষ্টি পড়তেই থেমে গেলো কৃশান। দন্তপাটির নিচে চেপে ধরা আঙুল ছেড়ে দিলো ওমনিই। হুমায়রার হাত থেকে ঔষধ টা নিয়ে যেতে যেতে শাসনের স্বরে বলল,
“ বলেছিলাম আমার থেকে তিন মাইল দূরে থাকবি! কথা কানে যায় না।। নেক্সট টাইম কথার অবাধ্য হলে আঙুলটা আর আস্ত রাখবো না।
প্যারা যত্তসব! ”
শেষ কথাটা রুম থেকে বেরিয়ে বললো। অতসব কানে পৌঁছালো না হুমায়রার। গাল বেয়ে পড়তে চাওয়া অশ্রুকণা গুলো তড়িঘড়ি করে মুছে নিলো সে। পরপর ফ্লোর থেকে বাটিটা নিয়ে স্বাভাবিক ভাবেই রুম ছেড়ে বেরিয়ে পড়লো।

“ কিরে কালকে কোথায় ছিলি তুই? ”
ভার্সিটির ভিতরে ঢুকতে না ঢুকতেই প্রশ্ন ছুঁড়লো রবি। উত্তরে হাতে থাকা সিগারেটে টান মেরে কৃশান বলল,
“ জ্বরের সাথে কুস্তি খেলতে গেছিলাম। ”
“ তা খেলা তো মনে হয় ভালোই জমেছে! নয়তো এক রাতেই চাঙ্গা হয়ে ফিরে আসলি যে? ”
“ জ্বরের সাথে তেমন একটা জমছিল না। তাই তোর সাথে কন্টিনিউ করবো বলে ফিরে আসলাম। ”
মুখটা চুপসে গেলো রবির। এর সাথে কথা বলা মানেই নিজের বিপদ ডেকে আনা। তবুও একই ভুল বারবার করে সে। তাদের কথার মাঝেই সাইফুল ফিসফিস করে বলল,
“ এই মামা ঐদিকে তাকা! দেখ প্রেম ভালোবাসার ঘন্টি বাজতেছে! ”
তার কথায় কৃশান ভ্রু কুঁচকে জানতে চাইলো,
“ কোথায়? ”

“ আরে ওইযে চিপায় দেখ! ”
আঙুল অনুসরণ করে সকলে এক জায়গায় দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো। দেখলো প্রাপ্ত বয়স্ক দুটো ছেলে মেয়ে একটা গাছের আড়ালে লুকিয়ে প্রেমে মজেছে। দুটোই জুনিয়র।
“ চল মামা, কাজে লেগে পড়ি? ”
অভির কথায় কৃশান ঘাসের উপর আরাম করে বসে বলল,
“ তোরা যা, ঘাড়ত্যাড়ামি করলে আমায় ডাকিস। ”
সাথে সাথেই তিন বন্ধু উঠে হাঁটা দিলো। ছেলে মেয়ে গুলোর কাছে গিয়ে বলল,
“ হেই জুনিয়র গণ, কেয়া বাত হে! কী হচ্ছে এখানে? ”
পিছন থেকে সিনিয়রদের কণ্ঠ শুনে ঘাবড়ে গেলো ছেলেমেয়ে গুলো। মেয়েটা হাতে থাকা গুলাপ টা লুকিয়ে ফেললো। ছেলেটা মুচকি হেসে বলল,

“ আসসালামু আলাইকুম ভাইয়া! আপনারা এখানে? ”
“ হুঁ, একটু ভার্সিটির পরিবেশ চেক করতে আসলাম আর কী! ”
“ ওহ, আচ্ছা। ”
“ তা কবে থেকে চলছে এসব? ”
“ কিসের কথা বলছেন ভাইয়া? ”
“ নাটক বন্ধ করো জুনিয়র, এখন বলো গণধোলাই খাওয়ার ব্যবস্থা করবো। নাকি কাজের কথায় আসবো? ”
“এসব কী বলছেন ভাইয়া! ”
“ যা শুনছো তাই বলছি। বেশি কথা বাড়ালে অপশন ছাড়াই মারা খাবা। ”
“ আচ্ছা এসব বাদ দিন। কাজের কথাটা বলুন। ”
ছেলেটাকে কথা বলার সুযোগ না দিয়েই মেয়েটা বলে উঠলো। এতে হাসলো তিন বন্ধু। বলল,
“ গুড গার্ল! কাজের কথা হলো গণধোলাই না খেতে চাইলে পাঁচ হাজার টাকা বের করো। ”
“ এইগুলো কী বলছেন ভাই! ”
“ এই জুনিয়র মনে হয় মার খেতে চাচ্ছে।”
” আরে না না ভাইয়া। দাঁড়ান ওঁ এক্ষুনি টাকা দিচ্ছে। এই এতো কথা বলছো কেন তুমি? ভাইয়াদের টাকা দিয়ে দাও! ”

বলতে বলতেই ছেলেটাকে তাড়া দিতে লাগলো মেয়েটা। উপায় না পেয়ে পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করলো ছেলেটা। না চাইতেও সেখান থেকে গুনে গুনে পাঁচটা হাজার টাকার নোট দিতে হলো। কাজ সম্পন্ন হতেই বিশ্বজয়ের হাসি ফুটলো তিন বন্ধুর মুখে। বলল,
“ গো এহেড ডেয়ার জুনিয়র। তবে কালকে থেকে যেন ভার্সিটিতে এসব না দেখি। যা করার ভার্সিটির বাইরে। নয়তো মারা খাবে। ”
যেভাবে এসেছিলো সেভাবেই চলে গেলো তারা। এসব কান্ড আজকে প্রথম নয় এর আগেও করেছে। ভার্সিটি তে এসে যাকেই প্রেম করতে দেখেছে তাকেই মারা খাইয়ে ছেড়েছে। না নিজেরা ভার্সিটিতে প্রেম করবে না কাউকে করতে দিবে।
“ মামা পাক্কা পাঁচ হাজার, চল আজকে ছোটো খাটো একটা পার্টি দেই। ”
“ চল। ”
কৃশান উঠতেই চার জন মিলে হাঁটা ধরলো। ভার্সিটি থেকে বেরোতে বেরোতে কৃশান সন্দিহান কণ্ঠে বলল,
“ আমরা বিরি খাইতে টাকা পাইনা আর এইগুলা মাইয়া মানুষ নিয়া ঘুরতে এতো টাকা পায় কোথায়! ”
“ আল্লাহ জানে রে মামা! ”

“ কিরে তোর হাতে কী হইছে? ”
প্রতিদিনের মতোই মিঠুকে নিয়ে আসরের নামাজ শেষ করে বাগানে এসেছিলো দুই বান্ধবী। কথার মাঝেই সহসা হুমায়ারার আঙুলের দিক চোখ পড়লো ইকরার। লাল হয়ে ফুলে উঠা আঙুলের ডগা দেখিয়ে তৎক্ষনাৎ প্রশ্ন করলো সে। প্রশ্ন শুনে চমকে উঠল হুমায়রা। নিজেকে স্বাভাবিক রেখে উত্তর দিলো,
“ ঐ কিসে যেন কামড় দিয়েছিলো! ”
“ কখন কিসে কামড় দিলো আবার? এতক্ষন দেখলাম না যে! কখন হলো? ”
“ সকালেই হয়েছিলো তুই হয়তো খেয়াল করিসনি। বাদ দে তো! ”
“ বাদ দেবো মানে? কী অবস্থা হয়েছে আঙুলটার! ”
“ হায় আল্লাহ, থামবি তুই! এটা কিছুই না পরে মলম লাগিয়ে নিবোনি এখন থাম। ”
“ আমি জানি তুই যে পরে লাগাবি। সকালে এমন হয়েছে এখনো কয়বার লাগিয়েছিস শুনি? চল আমরা সাথে। ”
এক প্রকার টানতে টানতেই মেয়েটাকে নিয়ে বাড়িতে ঢুকে পড়লো। তাদেরকে যেতে দেখে মিঠুও পিছন পিছন ছুটলো। হুমায়রা একবার সেদিকে তাকিয়ে চুপচাপ ইকরার পায়ের সাথে পা মিলিয়ে হাঁটতে লাগলো।

রাত তখন এগারোটা কী বারোটা। তখন ভার্সিটি থেকে বন্ধুদের সাথে বেরিয়ে আর বাসায় ফেরেনি কৃশান। জমিয়ে মাস্তি করে একেবারে রাতেই ফিরেছে। আজ তেমন একটা নেশা করে নি। খেলেও একেবারে কম খেয়েছে। যার দরুণ শরীর পুরো ফিট। কোনো হেলদুল নেই। ফুরফুরে মেজাজে রুমে প্রবেশ করলো সে। বিছানার একেবারে মাঝখানে হুমায়রাকে শুয়ে থাকতে দেখে ফুরফুরে মেজাজটা ওমনিই চড়ে গেলো তার। কাধ থেকে ব্যাগ রেখে, ফ্রেশ হয়ে এসে চড়া গলায় ডেকে উঠলো,
“ এই মেয়ে ওদিকে চেপে ঘুমা। ”
কোনো উত্তর এলো না হুমায়রার তরফ থেকে। রাগ সংবরণ করতে হাত দিয়ে ঘাড় ডললো। ফের ডাকলো একই স্বরে,
“ এই মেয়ে, কথা কানে যায়না? ”
“ ……..”

হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ৯

পরপর দুবার ডাকার পরও যখন কোনো সাড়া শব্দ পাওয়া গেলো না। তখন এগিয়ে এসে গালে বেশ জোরেই একটা চাপড় মারলো। কিছু বলতে নিবে এর আগেই মেয়েটার শরীরের উত্তপ্ততায় হালকা ঝটকা খেলো। নরম গালে কৃশানের চড় খেয়ে ঘুমের মাঝেই সামান্য নড়ে উঠলো হুমায়রা। সেদিকে তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে রইলো কঠোর মানব। অনিচ্ছা সত্বেও হাত ছুঁয়ালো মেয়েটার কপালে। জ্বরে গা পোড়ে যাচ্ছে একদম। এবেলায় কপালে ভাঁজ পড়লো ছেলেটার। কী করবে ভাবতে ভাবতেই মাথায় একটা বুদ্ধি এলো। সাথে সাথেই রুম থেকে বেরিয়ে গেলো সে।

হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ১১