হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ৯
সিনথিয়া ইসলাম সীমা
ঘরময় পায়চারি করছে হুমায়রা। চিন্তায় মাথা ফেটে যাওয়ার উপক্রম। কৃশানের ললাটে জলপট্টি দেওয়া। একটু পর পরই তাপমাত্রার প্রভাবে তা শুকিয়ে যাচ্ছে। আর সেটাকে পুনরায় শিক্ত করে কপালে দেওয়ার কাজে অব্যাহত রয়েছে সে। কিন্তু এতে করে কোনোরূপ ফল পাওয়া যাচ্ছে না। জ্বর কমার কোনো নাম নেই। উল্টো ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলছে। এখন ঔষুধ না খাইয়ে উপায় নেই। তবে ঔষুধ সেবনের আগে কিছু তো খাওয়াতে হবে মানুষটাকে। কিন্তু এই লোক তো ঘরের খাবার মুখেই নেয় না। এখন কী করবে মেয়েটা? দ্বিধদ্বন্দ্বে ভুগতে ভুগতেই রান্না ঘরের দিক এগোলো। ভাত নামক খাবারটা একেবারে চোখের বিষ কৃশানের। এই খাবারটাকে সহ্যই করতে পারে না সে। তাই একটা নুডুলস হাতে সুপ বানানোর সিদ্ধান্ত নিলো। সবাই তখন যার যার রুমে ব্যাস্ত হুমায়রা নিজের মতো সুপ বানিয়ে রুমে ফিরে এলো।
“ শুনছেন..? ”
কৃশানের শিয়রে বসে মৃদু স্বরে ডাকলো হুমায়রা। কোনো সাড়া পাওয়া গেলো না ওপাশ থেকে। ফের শুনা গেলো একই সুর,
“ শুনছেন, কষ্ট করে একটু কিছু খেয়ে ঔষধ টা নিন। ইনশাআল্লাহ জ্বর ছেড়ে দিবে। ”
কথা বলতে ইচ্ছে করছে না কৃশানের। একে তো শরীরের অবস্থা বেগতিক আবার হুমায়রার ডাকাডাকি তে মেজাজ খারাপ হলো। বিরক্তি নিয়ে উত্তর করলো,
“ তুই যাবি এখান থেকে? আরেকবার ডাকবি……”
“ তো মেরে তুন্দুরি বানিয়ে দিবেন,জানি আমি। আগে সুস্থ হন তাহলে সহজে মারতে পারবেন। ”
তার কথা সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই তাকে থামিয়ে মাঝপথে বলে উঠলো হুমায়রা। বিরক্তির মাত্রা একশো ছাড়িয়ে গেলো ছেলেটার। তবে শরীরের দুর্বলতার কারণে শান্ত রইলো। নয়তো এতক্ষণে ক ঘা লাগিয়ে দিতো নিশ্চিত। সে তুলনামূলক শান্ত অথচ কঠোর স্বরে বলল,
“ ভালো লাগছে না হুমায়রা। যা এখান থেকে। ”
মানুষটার শান্ত কণ্ঠে ভিতরটা হো হো করে উঠলো মেয়েটার। এমন শান্ত স্বর আগে কখনো শুনেনি। নিশ্চয়ই বেশি খারাপ লাগছে। সে অত্যধিক মোলায়েম কণ্ঠে অনুনয় করলো,
“ দয়া করে একটু কিছু খেয়ে ঔষধ টা নিন তাহলে ভালো লাগবে। আচ্ছা আপনাকে উঠতে হবে না। শুধু খাটের সাথে হেলান দিয়ে একটু বসুন আমি খাইয়ে দিচ্ছি। ”
নড়চড় দেখা গেলো না কঠোর মানবের। কাঁথার নিচ থেকে প্রশ্ন ছুঁড়লো,
“ কী এনেছিস? ”
“ সুপ। ”
যদিও খাবারটা তেমন একটা পছন্দ হলো না কৃশানের তবুও কাঁথার নিচ থেকে দুর্বল শরীরটা টেনে নিয়ে ঠেকালো খাটের সাথে। আপাতত ঔষধ নেওয়া আবশ্যক। বরাবরের মতো না খেয়েই ঔষধ সেবন করার নিয়ত ছিলো তার। তবে এই মেয়ের প্যানপ্যান থেকে বাঁচতে খাবার খেতে হচ্ছে। অসুস্থতার সুযোগে একটু বেশিই বাড় বেড়েছে মেয়েটা। সুস্থ হওয়ার পর মজা বুঝাবে এটাকে।
মুখের সামনে চামচ বাড়িয়ে রেখেছে হুমায়রা। অথচ সামনের ব্যাক্তির সেসবে খেয়াল নেই। সে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে হুমায়রাকে পরখ করছে। সেই দৃষ্টির আড়ালে থাকা গভীর পরিকল্পনা গুলো বুঝতে সক্ষম হলো না সরল রমনী। সে স্বামীর জ্বরাক্রান্ত মুখের দিক তাকিয়ে খাবার নিতে ইশারা করলো। সম্বিৎ ফিরলো কৃশানের। চিন্তার জগৎ থেকে বেরিয়ে এলো মুহূর্তেই। পরপরই কোনোরূপ বাধা ছাড়া খাবার মুখে পুরে নিলো। পাঁচ কী ছয় চামচ খেয়েই আর খাবেনা বলে জানিয়ে দিলো। হুমায়রার খুব করে বলতে ইচ্ছে হলো- “ পুরোটা খেয়ে শেষ করুন ”। তবে সাহসে কুলালো না। এইটুকু যে খেয়েছে এটাই অনেক। অতঃপর কৃশানের দিক পানি আর ঔষধ এগিয়ে দিলো। ঔষধ সেবন করে আবারও শুয়ে পড়লো সে। আদেশের স্বরে বলল,
” কেউ যেন না জানে জ্বরের কথা। ”
“ আচ্ছা। ”
এবেলায় একটু নিশ্চিন্ত হলো মেয়েটা। এর মাঝেই মসজিদে এশার নামাযের আহ্বান দেওয়া হলো। সুপের বাটি টা নিয়ে রান্নাঘরে রেখে দিলো হুমায়রা। তারপর চলে গেলো নামাজ আদায় করতে।
চুলার সামনে দাঁড়িয়ে রাতের খাবার গরম করছে হুমায়রা। টেবিলে বসে খাবারের অপেক্ষা করছে বাড়ির কর্তারা।
“ এখনো গরম হয়নি..? ”
“ জ্বি আম্মু, হয়ে গেছে প্রায়। ”
ইয়াসমিন বেগম পাশে এসে একটু পরখ করলেন। পরপর যেভাবে এসেছিলেন সেভাবেই চলে গেলেন। তিন রকমের খাবার গরম করে যেই না গ্যাস বন্ধ করতে নিবে হুমায়রা। তখনি খাবার টেবিল থেকে ভেসে আসলো ইয়াসমিন বেগমের স্বর,
“ আম্মু, একটু কষ্ট করে একটা ডিম ভাজি করে দাও তো তোমার আব্বুর জন্য। ”
“ এখনি দিচ্ছি আম্মু। ”
বলেই পেঁয়াজ, মরিচ কুচি করে ডিম ভাজার কাজ শুরু করলো। এর মাঝেই আবারও রান্না ঘরে এলেন ইয়াসমিন বেগম। ততক্ষণে ভাজা প্রায় হয়ে গেছে। কাজ হতেই ভদ্রমহিলা ডিম নিয়ে চলে গেলেন টেবিলে। সেই ফাঁকে সব কিছু পরিষ্কার করে গুছিয়ে রেখে দিলো হুমায়রার। অতঃপর পুরুষদের খাবার শেষ হতেই টেবিলে বসে পড়লো মহিলাগণ। ডাকা হলো হুমায়রাকে।শাশুড়িদের খাবার এগিয়ে দিয়ে নিজেও খেতে বসলো।
খাওয়া শেষে এঁটো থালাবাসন গুলো ধুতে লেগে পড়লো। এখন এইগুলো তার নিত্যদিনের কাজ হয়ে উঠেছে। সংসার জীবনে এসব সাধারণ ব্যাপার! তবে আজকে শরীরটা দুর্বল লাগছে মেয়েটার। কাজ যেন এগোচ্ছেই না। দুদিন রাতে ঠিকমতো ঘুম না হওয়া থেকেই মূলত এই দুর্বলতার সৃষ্টি। কাজের মধ্যেই ধীর পায়ে পাশে এসে দাঁড়ালো ইকরা। বলল,
“ আমি সাহায্য করি..? ”
” না লাগবে না। পারবো আমি। ”
মুচকি হেসে উত্তর করলো হুমায়রা। তবে তার কথা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে কাজে হাত লাগিয়ে দিলো সামনের রমনী।
“ বললাম তো আমি পারবো। তুই হাত লাগালি কেন? ”
“ তুই তো সবকিছুই পারিস। এখন যদি পুরো ঘরের থালাবাসন এনেও তোকে দেওয়া হয়। তাও একই শব্দই বের হবে তোর মুখ দিয়ে। তুই পারলেই হবে? আমাকেও তো শিখতে হবে। ভাবী হিসেবে ননদকে কাজ শেখানো তোর দায়িত্ব। ”
হাসলো হুমায়রা। বলার মতো কিছু খুঁজে পেলো না। শুধু কিছুপল তাকিয়ে রইলো মুগ্ধ নয়নে।
ঘরের মালিকের উপস্থিতিতে যেই ঘরটা সবসময় নিকোটিনের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে থাকতো। আজ তা একেবারে উজ্জ্বল হয়ে আছে। সময়ের সাথে সাথে পাল্লা ধরে কৃশানের জ্বর শুধু বেড়েই যাচ্ছে। শরীরের উত্তাপে উত্তপ্ত হয়ে যাচ্ছে পুরো বিছানা। অথচ ভিতরে ভিতরে শীতে কাঁপছে শরীর।
নামাজ ও খাওয়া দাওয়ার পর্ব চুকিয়ে একেবারে রুমে এলো হুমায়রা। প্রতিদিন এ সময়ে দুই বান্ধবী মিলে একটু আড্ডা দিতো তারপর ঘুমাতে আসতো। আজকেও ইকরা বলেছিলো তবে রাজি হয়নি সে। নিজের শরীর খারাপের বাহানা দিয়ে কোনোমতে রুমে চলে এসেছে। মনটা বড্ডো ছটফট করছিলো। কাজের মধ্যেও বারবার স্বামীর অসুস্থতার কথা মাথায় এসেছে। ধীর পায়ে মানুষটার নিকট এগিয়ে গেলো। তাপমাত্রা চেক করতে কপালে হাত ঠেকাতেই আঁতকে উঠলো মেয়েটা। জ্বরের মাত্রা একটুও কমেনি। কপালে থাকা জলপট্টি টা একেবারে শুকিয়ে গেছে। সাথে সাথেই ওয়াশরুম থেকে মগ ভরে পানি নিয়ে এলো। শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাওয়া জলপট্টি টা ভিজিয়ে কপালে দিয়ে দিলো। তারপর শিয়রে বসে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলো ঘুমন্ত পুরুষটিকে,
“ দুপুরের ধূসর রঙা শার্টটা এখনো গায়ে জড়ানো। শার্টের সবগুলো বোতাম খোলা হওয়ায় ভিতরের টিশার্ট দেখা যাচ্ছে। সেখানে ঝলঝল করছে একটা রূপার লম্বা চেইন। তার মাঝখানে লাগানো একটা রড লকেট। একই রকমের সিলভার ব্রেসলেট স্থান পেয়েছে হাতেও- পুরোটাই বখাটে সাজসজ্জায় ভরপুর। অথচ চেহারাটা একদম নিষ্পাপ; শ্যামলা গড়নের আকর্ষণীয় চেহারা, ঘন মোটা ভ্রু যুগলের নিচে এক জোড়া তীক্ষ্ণ চোখ। অপরিপাটি চুলগুলো কপাল ছাড়িয়ে ভ্রুতে এসে পড়েছে।”
তার গভীর ভাবে পর্যবেক্ষণের মধ্যেই পুনরায় শুকিয়ে উঠলো মাথার জলপট্টি। পরপর সেটা আবারও ভিজিয়ে দিলো মেয়েটা।একবার, দুবার, তিনবার এভাবেই জলপট্টি দিতে দিতে মধ্যরাত ঘনিয়ে আসতে লাগলো। অথচ জ্বর কমলো না মানুষটার। চোখ বারংবার ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে যেতে চাইছে। কিন্তু স্বামীর চিন্তায় চোখের পলক অব্দি পড়তে দিলো না রমনী। অতঃপর নিজের শরীরের সকল দুর্বলতা ভুলে আবারও কাটিয়ে দিলো আরেকটি নির্ঘুম রাত।
রাতের তৃতীয় পহর, সকলে তখন গভীর ঘুমে মত্ত। ঘণ্টা খানেক বাদেই ফজরের আযান পড়বে ধরণীতে। ঝিঁঝিঁ পোকা দের ডাকও তখন কানে আসছে না। তারাও বোধ হয় তখন ঘুমের দেশে পাড়ি জমিয়েছে। একেবারে নির্জীব, নিঃস্তব্ধ হয়ে আছে চারিপাশ।
সহসা শরীরের সকল শীতলতা কেটে গিয়ে ঘামতে শুরু করলো কৃশান। ভিজতে লাগলো গায়ে থাকা শার্ট। অসহ্য গরমে ঘুম হালকা হয়ে এলো ছেলেটার। ওমনিই নাকের ভেতর প্রবেশ করলো নারীসুলভ একটা পবিত্র সুঘ্রাণ। সেই ঘ্রাণের উৎস অনুসরণ করে অজান্তেই পাশ ফিরে শুলো সে। তখনি খুব কাছ থেকে শুনা গেলো কারও ভারী নিশ্বাসের শব্দ। মুখের উপর কারও তপ্ত নিঃশ্বাস উপলব্ধি করতেই পুরোপুরি ঘুম ছুটে গেলো তার। তড়াক করে চোখ মেলে তাকালো। সাথে সাথেই থমকে গেলো মস্তিষ্ক, থমকালো ছেলেটার পুরো সত্ত্বা। চোখের সামনে তার বালিশের কোণায় আবিষ্কার করলো এক ঘুমন্ত পরীকে। গাঢ় সবুজ হিজাবের মধ্যে স্থান পাওয়া মায়াবী মুখ খানা দেখে মনে হচ্ছে স্বর্গ থেকে নেমে আসা কোনো হুর। যার চেহারা থেকে ক্ষণে ক্ষণে ছড়িয়ে পড়ছে স্নিগ্ধতা। এই প্রথম এতোটা কাছ থেকে হুমায়রাকে দেখছে কৃশান। কেন যেন ব্যাপারটাতে মোটেও রাগ হলো না তার। বরং কণ্ঠনালি থেকে বেরিয়ে এলো অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু বাক্য,
“ কোনো মেয়ের চেহারায় বুঝি এতোটা মায়া হয়! সৃষ্টিকর্তা কী পুরো জগতের সকল মায়া এই মেয়ের চেহারায়ই ঢেলে দিলো? নাকি আমিই আজকাল বেশি ভাবছি এই মেয়েকে নিয়ে? ”
ভাবনার মাঝেই সে লক্ষ্য করলো মেয়েটা এক হাতে পানির মগ ধরে রেখেছে। ভ্রু কুঁচকে গেলো তার। কাঁথাটা গা থেকে সরিয়ে উঠে বসলো। তৎক্ষনাৎ কিছু একটা কোলের উপর পড়লো। তাকাতেই দেখতে পেলো আধ ভেজা জলপট্টি। মস্তিষ্ক সজাগ হলো। বুঝতে পারলো পুরো ঘটনা।
“ এই মেয়ে কী সারারাত জেগে আমার মাথায় জলপট্টি দিয়েছিলো! কিন্তু কেন? এতকিছুর পরেও কী করে এসব করে কেউ? ”
হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ৮
যতো চাইছে মেয়েটাকে নিয়ে ভাববে না ততই মস্তিষ্কের প্রতিটা নিউরনে নিউরনে ভাবার নির্দেশনা পাঠিয়ে দিচ্ছে এই মেয়ে! এ কেমন যেন আজব টাইপের মেয়ে? ”
আবারও তাকালো সামনে থাকা নারীটির পানে। দেখলো মনোযোগ দিয়ে। ঠিক কতক্ষণ তার অপলক দৃষ্টি আটকে রইলো জানা নেই। এক পর্যায়ে হুমায়রার হাত থেকে মগ নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়লো সে। ঘামে চুপচুপে হয়ে আছে শরীর। তাই শাওয়ার নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো।
