Home শুকনো পাতার নূপুর পায়ে শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ৩৩

শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ৩৩

শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ৩৩
আয়েশা শেখ

বেলা তখন দুপুর দুটো। নিজের ডুকাটি প্যানিগালে ভি-৪ বাইকটার এক্সিলারেটর একদম শেষ সীমা পর্যন্ত ঘুরিয়ে গমগম শব্দে বাসার দিকে ছুটিয়ে নিয়ে যাচ্ছে যুবক। ইঞ্জিনের গর্জনে রাস্তার পিচও যেন কেঁপে উঠছে। দুপাশের পথচারীরা চোখ কপালে তুলে হা করে তাকিয়ে দেখছে তাকে। অবাক হওয়ারই কথা! বাইক নয়, তাকে দেখে মনে হচ্ছে যেন গোটা এক সংসার পিঠে চেপে তীব্র বেগে ধেয়ে চলেছে। চওড়া বাইকটার চারপাশে শপিং ব্যাগ বাঁধা। দুটি কনুইয়ের সাথে ঝোলানো কাস্ট-আয়রন স্কিলেট আর নন-স্টিক ফ্রাইপ্যান। মাথার কালো হেলমেটের ওপরে টুপির মতো করে বসানো একটা স্টেইনলেস স্টিলের প্রেসার কুকার! আর পিঠের ব্যাগ থেকে ওপরের দিকে উঁচিয়ে আছে হাতা, খুন্তি, সিলিকন স্প্যাচুলা আর হুইস্কের মাথাগুলো—যেন কোনো যুদ্ধক্ষেত্রের যোদ্ধা তার পিঠে বিশাল তলোয়ারের খাপ ঝুলিয়ে বেরিয়েছে। সকলের অবাক চোখ উপেক্ষা করে বেপরোয়া যুবক এতসব হাঁড়িপাতিল আর ভারী সরাঞ্জাম নিয়ে নির্বিঘ্নে এঁকেবেঁকে বাইক চালিয়ে যাচ্ছে। দ্রুতগতিতে বাইক চালানোর দরুন বাতাসে তার পরনের কুচকুচে কালো শার্টটা গা থেকে উড়ে যেতে চাইছে।

আকাশটা মেঘলা, বৃষ্টির বেগ কিছুটা কমে এলেও যেকোনো মুহূর্তে আবার মুষলধারে নেমে আসতে পারে। সেজন্যই যুবকের এত তাড়াহুড়ো। কাল থেকেই গাড়িটা ডিস্টার্ব দেওয়ায় বাধ্য হয়ে আজ বাইক নিয়ে বের হতে হয়েছে তাকে। শেহরিয়ার ভিলার দারোয়ানকে দিয়ে বাইকটা আনিয়ে নিয়েছিল। সকাল এগারোটার দিকে দুজনে শাওয়ার নিয়ে ঝিলমিল ঘুমিয়ে পড়ে। আর বারিশ চটজলদি বেরিয়ে পড়ে মার্কেটের উদ্দেশ্যে।
পোর্চে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িটার পাশেই বাইকটা পার্ক করল বারিশ। কেনাকাটার সব জিনিসপত্র হাতে নিয়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকে সোজা গেল কিচেনে। একে একে রান্নার সরঞ্জাম আর দ্রব্যাদি টেবিলে গুছিয়ে রেখে পরনের শার্টটা খুলে ফেলে গলিয়ে নিল একটা স্লিভলেস টি-শার্ট। এরপর এক ঘণ্টার ভেতর তৈরি করে ফেলল চিকেন সসেজ, বাটার টোস্ট, গ্রিলড মাশরুম, সাথে তাজা স্ট্রবেরি, ব্লুবেরি আর গ্র্যানোলা। সব খাবার থালায় সাজিয়ে পরিপাটি করে এনে রাখল ডাইনিং টেবিলে।
ঠকঠক শব্দে ঘুম ভাঙল ঝিলমিলের। কপালে বিরক্তির ভাঁজ ফেলে এক পাশে তাকাতেই দেখল বারিশ দরজায় হেলান দিয়ে দাড়িয়ে আছে। ঝিলমিল এবার নিজেকে চাদরের নিচে মুড়িয়ে নিয়ে মাথা ঢেকে ফেলল। এর মুখোমুখি হতে ইতস্তত করছে যেন।

— বিকাল চারটা বাজে, আর কত ঘুমাবে?
হালকা স্বরে বলল বারিশ। ঝিলমিল চাদরের ভেতর থেকেই উত্তর করল,
— ঘুমিয়েছিই তো সকাল এগারোটায়!
— কেন? সকাল এগারোটা কি ঘুমানোর সময়? সারা রাত কী করেছ শুনি?
বারিশ একদম স্বাভাবিক কণ্ঠে প্রশ্নটা ছুড়ে দিল। ঝিলমিল হুড়মুড় করে বিছানা ছেড়ে উঠে বসতে চাইল, কিন্তু কোমর, তলপেট এবং উরুর পেশিতে টান অনুভব করায় উঠতে পারল না। ব্য”থার তীব্রতায় প্রতিটা অঙ্গ যেন বি”ষিয়ে উঠেছে। ডান হাত দিয়ে বাম বাহু আর বাম হাত দিয়ে ডান বাহু শক্ত করে চেপে ধরে রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে বারিশের দিকে তাকিয়ে বলল,
— নাটক করবেন না! সাধু সাজা হচ্ছে, তাই না?
— ‘আমি নাটক করছি?’
বারিশ ভ্রূ কুঁচকাল।
— আপনিই তো আমাকে ঘুমাতে দেননি! সারা রাত অমন অ”ত্যাচার চালিয়ে এখন ধোয়া তুলসী পাতা সাজছেন!
— ‘সারা রাত?’
বারিশ ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে ধীরকণ্ঠে বলল,

— উহু, ভুল বলছ। তোমাকে তো আমি পেয়েছিলামই একদম রাতের শেষ প্রহরে!
ঝিলমিল চারপাশে চোখ বুলিয়ে নিল। সে এখন একটা সুবিশাল বেডরুমে রয়েছে। শেহরিয়ার ভিলায় বারিশের যে বেডরুম ছিল, তার চেয়েও এটি অনেক বেশি প্রশস্ত আর আধুনিক। তবে এত বড় রুমে কেবল একটা ড্রয়ার আর বেড ছাড়া আর কিছুই নেই। গায়ের চাদরটা গায়ে ভালোভাবে জড়িয়ে ভেঙে আসা শরীর নিয়ে কোনোমতে উঠে দাড়াল মেয়েটা। বারিশের দিকে না তাকিয়েই বলল,
— আমার তো কোনো কাপড়ই নেই এখানে! এখন আমি কী পরব?
— কিচ্ছু পরতে হবে না।
— মানে?
— কিছু পরার কোনো প্রয়োজন নেই। খিদে পেয়েছে, চলো আগে খেয়ে নেবে।
— আমি কি তবে সারা দিন এই চাদর জড়িয়েই বসে থাকব?
— উহু, তাও না।
— তাহলে?

ঝিলমিলকে আর কোনো উত্তর না দিয়ে নিমেষে তার গায়ের চাদরটা সরিয়ে সটান কোলে তুলে নিল। কিশোরীর শরীরে তখন কেবল বারিশের গত রাতে ফেলে রাখা আলগা একটা শার্ট। সেই অবস্থাতেই তাকে পাঁজাকোলা করে নিচে নামিয়ে আনল সে। ডাইনিং চেয়ারে বসাতেই টেবিলে সাজানো খাবারগুলোর দিকে নজর পড়ল ঝিলমিলের; পলকেই পেটটা মোচড় দিয়ে খিদের জানান দিল।
— খেয়ে নাও। রাতের খাবারটা বাইর থেকে আনিয়ে নেব। তবে কাল থেকে কিন্তু রান্না তোমাকেই করতে হবে।
বারিশ প্লেটে খাবার বাড়তে বাড়তে বলল।
— আবার?
ঝিলমিল একটু চমকে উঠে প্রশ্ন করল।
— কেন, করবে না?
— করব…

বারিশের দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে এক প্রকার স্বীকার করে নিল ঝিলমিল। তারপর দৃষ্টি খাবারে রেখে চুপচাপ খেয়ে যাচ্ছে সে। বারিশের দিকে নজর তুলে তাকানোও যেন তার জন্য মহা অপরাধ! একদিকে লজ্জা, অন্যদিকে ভেতরে উপচে পড়া অভিমান আর চাপা জেদ। গত রাত থেকে আজ সকাল অবধি মেয়েটার একটা হাহাকার, একটুখানি রেহাই পাওয়ার করুণ আর্জি—কোনো কিছুই এই লোকটার পাথুরে কানে পৌঁছায়নি! উল্টো ঝিলমিলের ছটফটানি আর বাধা দেওয়ার চেষ্টা ভেস্তে দিতে তার দুটো হাত এক করে বেল্ট দিয়ে বাঁধতেও দ্বিধা করেনি বারিশ। রাতের সেই উদ্দাম আর বেপরোয়া মুহূর্তগুলোর কথা মনে পড়তেই ঝিলমিলের সম্পূর্ণ শরীর আবার শিউরে উঠে।
ঝিলমিলের নীরবতা বারিশ উপভোগ করছে। মেয়েটার এই কাতর শরীর দেখে বারিশের মনে মায়া জাগলেও অনুশোচনা জাগল না। কেনই বা জাগবে? এই মেয়েটির ওপর তার সম্পূর্ণ দখল। এই টান আর আসক্তি কেবলই তার একার। যে রূপ আর যে উন্মাদনা কেবলই তার একার, তাকে এভাবে নিজের করে পাওয়ার মধ্যে অপরাধের কিছু দেখে না সে। বেপরোয়া চুম্বনের ফলে ঝিলমিলের ঠোঁটসহ সারা শরীরে যে লালচে ক্ষতগুলো ফুটে উঠেছে, সেগুলোর দিকে তাকিয়ে বারিশের চোখ দুটো আরও বেশি মাতাল আর তৃষ্ণার্ত হয়ে উঠছে। এসবই যেন চিৎকার করে জানান দিচ্ছে এই নারী এখন পুরোপুরি, কেবলই বারিশের একার অস্তিত্ব।

বারিশের দৃষ্টির নিচে বসে থাকতে অস্বস্তিতে ঝিলমিলের দম আটকে আসছে। এভাবে বসে থাকা সম্ভব নয়। সে চটজলদি খাওয়া শেষ করে প্লেট হাতে তুলে নিয়ে রান্নাঘরের সিঙ্কের দিকে পা বাড়াল। পানির কলটা ছেড়ে দিয়ে প্লেট ধোয়ায় মন দেওয়ার চেষ্টা করতেই হঠাৎ পেছন থেকে দুটো শক্তপোক্ত হাত এসে দৃঢ়ভাবে জড়িয়ে ধরল তার পেট। পিঠের সাথে বারিশের তপ্ত বুকের স্পর্শ পেতেই ঝিলমিল জমে কাঠ হয়ে গেল। বারিশ তার ঘাড়ের কাছে মুখ গুজে দিয়ে গভীর, উষ্ণ শ্বাস টানল; তপ্ত ঠোঁট দুটো ঘাড়ের নরম ত্বকে ডুবিয়ে দিয়ে ছোট ছোট চুমু বসাতে লাগল। ভেজা চুমু আর ঘনশ্বাসের অস্ফুট অনুভূতির শব্দে যেন বিজলি খেলে গেল কিশোরীর সারা শরীরে। ঘাড়ে ঠোঁট চেপে রেখেই গম্ভীর স্বরে বারিশ ফিসফিস করে বলল,
— মেডিসিন লাগবে? বেশি খারাপ লাগছে?
ঝিলমিল কিঞ্চিৎ শরীর মোচড় দিয়ে নিজেকে ছাড়ানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে অভিমানী স্বরে বলল,
— সেই চিন্তা কি আছে আপনার?
বারিশ ঠোঁট দুটো ঝিলমিলের ঘাড়ে আরও একটু চেপে ধরে তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলল।
— চিন্তা না থাকলে এতক্ষণে রান্নাঘরের মার্বেল কাউন্টারেই তোমাকে আবার নিজের করে নিতাম, সোনা। ছোট মেয়ে বলে দয়া করছি। আমার এই ঢিলেঢালা শার্টটায় তোমাকে একটু বেশিই আকর্ষণীয় লাগছে।
ঝিলমিল ঘুরে দাড়াল। চোখের কোণে জমা জল নোনা ধারা হয়ে গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে। তা দেখে বারিশ পকেট থেকে ঔষধ বের করে পানি দিয়ে বলল,

— এটা খাও ব্যথা কমে যাবে।
— লাগবে না! আপনি ধারণাও করতে পারবেন না আমার এখন কতটা যন্ত্রণা হচ্ছে! সামান্য একটু নড়াচড়া করলেও য”ন্ত্রণায় গা চিড়বিড় করে উঠছে। মন বলে কিছু নেই আপনার ভেতরে? এতটুকু দয়ামায়া নেই মনে? কাল রাতে কথা দিয়েছিলেন না খুব সহানুভূতির সাথে থাকবেন? এই কি আপনার সেই প্রতিশ্রুতি রাখার নমুনা?
​বারিশ মুখাবয়বে গম্ভীরতা বজায় রেখে চুপচাপ শুনে গেল মেয়েটার আর্তনাদ। পরক্ষণে আলতো টেনে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে নিল ঝিলমিলকে। চুলে হাত বোলাতে বোলাতে সোজাসাপ্টা বলল,
​— আমার দেওয়া য”ন্ত্রণা, আমার ভালোবাসা, অধিকার, বেপরোয়া আদর—সবকিছুই তোমাকে সয়ে নিতে হবে। আমিই তোমাকে য”ন্ত্রণায় বি”ষিয়ে দেব, আবার আমিই ভালোবেসে পরিপূর্ণ করে রাখব। আমার দেওয়া ক্ষতে আমিই মলম লাগাব। বারিশের নামের পাশে একবার যখন তোমার নাম জুড়ে গেছে, তখন তার এই উগ্র সত্তাকে আজীবন মেনে নেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।

— এটা হুমকি নাকি আশ্বাস?
​ঝিলমিলের গালে আটকে থাকা পানির ফোটা আলতো আঙুলে মুছে দিয়ে বারিশ নির্বিকার স্বরে বলল,
​— মেনে নিতে পারলে আশ্বাস, আর না নিতে পারলে হুমকি… ডিপেন্ডস অন ইউ।
ঝিলমিল নিঃশব্দে ঠোঁট কামড়ে কান্নার বেগ সামলানোর চেষ্টা করল। বারিশ তাকে পাঁজা কোল করে তুলে বসিয়ে দিল রান্নাঘরের মার্বেল কাউন্টারটার ওপরে। তারপর ঔষধটা খাইয়ে দিল। কাউন্টারের মার্বেল থেকে আসা হালকা হিম এক বিষম শিহরণ জাগাল ঝিলমিলের উন্মুক্ত ত্বকে। পরিধানে থাকা বারিশের অতিরিক্ত ঢিলেঢালা শার্টটার ওপরের দুটো বোতাম খোলা ছিল, যা সড়ে গিয়ে উন্মোচিত করে দিয়েছিল তার তুষারশুভ্র, সুগঠিত গ্রীবা আর অনাবৃত স্কন্ধের কোমল বাঁক।

​যুবকের চোখ জোড়া অনায়াসেই থমকে গেল সেই অনাবৃত শুভ্রতায়। শার্টের ফাঁক গলে বেরিয়ে আসা তুষারবর্ণ ত্বক আর তারই উগ্র ভালোবাসার গাঢ় লাল, নীলচে হয়ে আসা ক্ষত। নিজের দেওয়া সেই সতেজ ভালোবাসার চিহ্নের ওপর দৃষ্টি স্থির হতেই ভেতরে জেগে উঠল আদিম, উগ্র তাড়না! চোয়াল শক্ত হয়ে এল এক লমহায়। চোখের পাতায় ঘনাল নিষিদ্ধ ক্ষুধা। ঝিলমিলের অসহায়, আধো-উন্মুক্ত রূপ তার রক্তের ভেতর দাবানল জ্বালিয়ে দিল পূণরায়। যাকে বলে নিজের নিয়ন্ত্রণে পিষে মারার আদিম ও বেপরোয়া কামনা।
বারিশ ঝিলমিলের ঝুলন্ত ফর্সা দু’পায়ের মাঝখানের ফাঁকা জায়গায় এসে একদম ঘেঁষে দাঁড়াল। দু’হাত কাউন্টারে রেখে তাকে নিজের দেহের ছায়ায় পুরোপুরি বন্দি করে নিল। ঝিলমিল নিজের হ্যাজেল রঙের কাঁচস্বচ্ছ চোখে বিভ্রান্তি নিয়ে সরাসরি বারিশের গম্ভীর, তীক্ষ্ণ চোখের দিকে তাকাল। কম্পিত ঠোঁট দুটো সামান্য ফাঁক করে শুধাল,
— আপনি কি সত্যিই ভালোবাসেন আমায়?
ঝিলমিলের উন্মুক্ত উরুর ওপর হাত রাখল বারিশ। রুক্ষ আঙুলগুলো ফর্সা ত্বকে স্লাইড করে ওপরে ওঠার সাথে সাথে সে শীতল গলায় পালটা প্রশ্ন করল,

— কী মনে হয়?
— ভালোবাসলে কবে থেকে বাসেন? একদিনও তো আমার সাথে স্বাভাবিক আচরণ করেননি। ছোটবেলায় তো আমাকে সহ্যই করতে পারতেন না।
বারিশের হাতের গতি থমকে গেল। উরুর নরম মাংসে আঙুলের চাপ আরেকটু বাড়িয়ে গভীর আর নিরাসক্ত স্বরে বলল,
— আমি তোমাকে ভালোবাসি না।
ঝিলমিল স্তব্ধ হয়ে রইল। চোখদুটো হয়ে গেল অপলক।
— ভালোবাসেন না? তবে এই পাগলামি, এই জোর জবরদস্তি আর অধিকারের নাটক কিসের জন্য? আমি চলে আসার পর কেন এমন করছিলেন?
যুবকটি ঝিলমিলের মুখাবয়বের একদম কাছাকাছি ঝুঁকে এল, তার তপ্ত নিঃশ্বাস ঝিলমিলের ঠোঁটে ভিজিয়ে দিয়ে সোজাসাপ্টা স্বরে বলল,

— ভালোবাসা হলো সস্তা আবেগ।
— মোটেও না। আমি আপনাকে ভালোবাসি।
— তুই তো জারিফকেও ভালোবাসতি।
হঠাৎই গলার স্বর বদলে গেল লোকটার। ঝিলমিল বলল,
​— না! ওর জন্য কখনো এমন অনুভূতি হয়নি যা আপনার জন্য হয়! আপনি পাশে না থাকলে আমার রাতে ঘুম আসে না, মনে হয় কী যেন নেই আমার পাশে। চারপাশের সবকিছু অশান্তি লাগে, এমনকি প্রিয় খাবারগুলোও তখন অসহ্য লাগে! জারিফের জন্য আমার কখনো এমন লাগত না; উল্টো ওর সাথে কখনো ঝগড়া হলে আমি আরও বেশি বেশি খেতাম। আব্বু যখন আমাকে আপনার কাছ থেকে নিয়ে এলো, তখন আমার কেবলই মনে হচ্ছিল আপনি কোথায় আছেন, খেয়েছেন কি না, ঠিকমতো ঘুমিয়েছেন কি না… কারণ আপনি তো আমার হাত ছাড়া খেতেন না! এসব মনে হলেই আমার বুক ফেটে কান্না আসত…

অন্য সময় হলে হয়তো ঝিলমিলের এই কথা গুলো বারিশ উপভোগ করত। কারণ এই কথা গুলো শোনার জন্য ঝিলমিলকে দিয়ে নিজের সব কাজকর্ম করাত। যেন মেয়েটা বারিশের উপর অভ্যস্ত হয়ে যায়। হয়েছেও তাই, কিন্তু এই প্রভাব তার নিজের উপরও পড়েছে। তবে এই মুহূর্তে মেয়েটার বোকার মতো একের পর এক জারিফ আর বারিশের তুলনা করা মোটেই সহ্য হচ্ছে না। অবুঝের মতো তুলনা করেই যাচ্ছে! অথচ বুঝতেই পারছে না অন্য পুরুষের নাম উচ্চারিত হওয়া মাত্রই বারিশের ভেতরের হিংসুটে পশুটো কীভাবে ফুঁসে উঠছে। নিজের ধৈর্যের ওপর বারিশের আর একবিন্দু বিশ্বাস নেই। ঝিলমিল তা না বুঝে ব্যাকুল হয়ে বারিশের গলা জড়িয়ে ধরে বলল,
​— কালকে তো ভেবেই নিয়েছিলাম আপনাকে আর কোনোদিন পাব না… আমি হয়তো মরেই যেতাম! জারিফ…
​বাক্যটা শেষ হওয়ার আগেই বারিশ ঝটকায় ঝিলমিলের ঠোঁট দুটো নিজের দাঁতের ফাঁকে শক্ত করে কা”মড়ে ধরে তাকে স্তব্ধ করে দিল। ​আচমকা এই হিংস্র আর তপ্ত আক্রমণে ব্যথায় কঁকিয়ে উঠে ঝিলমিলের গলা দিয়ে এক আর্তনাদময় বিষাদ গুমরে উঠল,

​— উঁহু… ম্হ্…
অল্পতেই ছেড়ে দিল বারিশ। বলল,
— প্রকাশিত ভালোবাসা আমার অপছন্দ। তুমি আমাকে কতটা ভালোবাসো বা না ভালোবাসো সেটা তোমার নিজের ভেতরেই আটকে রাখো। এসব সস্তা আবেগ বিরক্ত লাগে আমার!
ঝিলমিল কয়েক সেকেন্ড নিথর হয়ে বারিশের নির্দয় চেহারার দিকে তাকিয়ে রইল। বুকের ভেতর জমে থাকা কান্নাটাকে জোর করে চেপে ধরে সে কাঁপা গলায় শুধাল,
— এসব আপনার কাছে সস্তা আবেগ লাগছে?
— হ্যাঁ।
অভিমানে তার গা গুলিয়ে উঠল মেয়েটার। আর এক মুহূর্তও এই মানুষটার এত কাছাকাছি থাকার সহ্যশক্তি তার নেই। ঝিলমিল বারিশের বুক ঠেলে, দু’পা কাউন্টার থেকে নামিয়ে সেখান থেকে সরে যাওয়ার জন্য ছটফট করে উঠল।
কিন্তু সরে যাওয়ার আগেই বারিশের শক্ত দু’টি হাত ঝিলমিলের কোমর পেঁচিয়ে ধরে তাকে আগের চেয়েও রূঢ়ভাবে কাউন্টারের সঙ্গে চেপে ধরল। ঝিলমিলের মুখের ওপর নিজের মুখ এনে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

— আমাকে ইগনোর করার পরিণতি ভালো হবে না!
ঝিলমিল আর কোনো কথা বলল না। মুখ ফিরিয়ে কিচেনের এক পাশের কাচের দেয়ালের দিকে তাকিয়ে রইল। কাচের ফাঁক দিয়ে বাইরে ধীরগতিতে বয়ে চলা নদীর পানির দিকে চেয়ে রইল সে। বারিশ একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস টানল। ঝিলমিলের অভিমানী মুখটা নিজের দিকে ফিরিয়ে এনে মেয়েটার কপালে শান্ত একটা চুমু খেল। তারপর ধীর পায়ে আরও ঘনিষ্ট হয়ে ঝিলমিলের পরনে থাকা শার্টের বোতামের ওপর হাত রাখতেই ঝিলমিল ঝটকা মেরে তার হাত সরিয়ে দিল। বারিশের ইঙ্গিত বুঝতে পেরে মুহূর্তেই তেতে উঠল কিশোরী। দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠল,
— একা একটা বাড়িতে এনে যখন-তখন নিজের নোংরা শখ মেটাচ্ছেন? থাকব না আমি এখানে! আগে যেখানে ছিলাম, সেখানেই থাকব।
বারিশ ঠোঁট টিপে হাসল। ঝিলমিলের উন্মুক্ত গলা থেকে শুরু করে অনাবৃত উরু ও হাঁটু পর্যন্ত চোখ বুলিয়ে নিয়ে শান্ত, ধারালো কণ্ঠে বলল,

— এই শরীর নিয়ে তুমি সবার সঙ্গে এক বাড়িতে থাকতে চাচ্ছো? তোমার অঙ্গপ্রত্যঙ্গের প্রতি ইঞ্চিতে আমার সিলমোহর মারা… ডু ইউ রিয়েলি ওয়ান্ট এভরিওয়ান টু সি দিস?
— এসব উঠে গেলেই যাব তবে।
পাঁজা কোল করে তুলে নিল ঝিলমিলকে। সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে উঠতে নিচু, ভারী কণ্ঠে বলল যুবক,
— উঠে যেতে যেতে নতুন সিলমোহর বসানো হয়ে যাবে।
রুমে পৌঁছে নিজের পায়ের ধাক্কায় শব্দ করে ভেতর থেকে দরজাটা লাগিয়ে দিল সে।
—— ফেজবুক পেজ: Ayesha Rin— রিন
রাতে ঝিলমিল আর বারিশ হাসপাতালে গেল। বারিশ অবশ্য আসতে চায়নি; ঝিলমিল চঞ্চল সাহেব আর মেহরাজের অসুস্থতার কথা বলে জোরজবরদস্তি করেই তাকে রাজি করিয়ে নিয়ে এসেছে। দুজনই এখন বিপদমুক্ত ও সুস্থ আছেন। কেবিনের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই বারিশকে দেখে একরাশ বিরক্তি আর ক্ষোভ নিয়ে মেহরাজ কটা গালি ছুড়ে দিল,

— তোর এখন আসার সময় হলো?
— বউ না বললে আসতামই না।
— তোর মতো বন্ধুর জন্য আমার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে, এটা ভেবে আমার আবারও হার্ট অ্যাটাক করতে ইচ্ছে করছে!
— করে নে। এমনিতেও বেঁচে থেকে তুই কোনো কাজে আসছিস না।
বারিশের নির্বিকার উত্তর। মেহরাজ এবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে কিছুটা শান্ত হয়ে বলল,
— দেখ, আমি সত্যিই খুব ভয় পেয়েছিলাম। তুই তো জানিস, কাছের মানুষের কিছু হলে আমি ওসব নিতে পারি না। কোথায় ছিলি তুই তখন?
— একজনকে ব্লাড ডোনেট করতে গিয়েছিলাম। ইমার্জেন্সি ছিল, তাই ফ্লাইট মিস করেই গিয়েছিলাম।
বারিশের কথা শুনে তাহসিন বাঁকা হেসে তার দিকে তাকিয়ে বলল,
— বাহ! আপনি তো খুব মানবদরদী লোক।
বারিশ তাহসিনের চোখের দিকে সোজাসুজি তাকাল।
— তুমি একদম ঠিক বলেছ। হয়তো এই দরদের জন্যই বেঁচে গেছি।
মেহরাজের মন কিছুতেই কথাটি বিশ্বাস করতে পারল না। আর যাই হোক, বারিশ নিজে গিয়ে কাউকে র”ক্ত দেবে? ওর চোখের সামনে কেউ র”ক্তের অভাবে মরে গেলেও র”ক্ত দেওয়ানো বারিশকে দিয়ে সম্ভব না। তবে মেহরাজ আর কথা না বাড়িয়ে ঝিলমিলের দিকে নজর দিল। মেয়েটা একদম চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। এই প্যাচপ্যাচে গরমের মধ্যেও গায়ে শাল জড়ানো দেখে বেশ অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করল,

— কীরে ঝিলমিল, এই গরমে তুই এভাবে গায়ে চাদর জড়িয়ে রেখেছিস কেন?
ঝিলমিল আমতা আমতা করে কিছু একটা বলার আগেই বারিশ চট করে উত্তর দিল,
— বিয়েশাদী হলে একটু ঢেকেঢুকেই চলতে হয়। তুই ব্যাচেলর মানুষ, ওসব বুঝবি না।
কথাটা শোনামাত্র লজ্জায় ঝিলমিলের দুই কান আর গাল গরম হয়ে উঠল। এখানে মেহরাজ তার আপন চাচা, আর তাহসিন প্রবীণ অভিভাবকতুল্য আঙ্কেল। তাঁদের সামনে লোকটা এভাবে নির্লজ্জের মতো ইঙ্গিতপূর্ণ কথা কীভাবে বলতে পারল, তা ভেবেই ঝিলমিলের মাটির সঙ্গে মিশে যেতে ইচ্ছে করল।
ঝিলমিল একটু হেসে বলল,

— চাচ্চু বাহিরে বৃষ্টি হচ্ছে তাই একটু শীত লাগছে। তোমার জন্য খাবার এনেছি, খেয়ে নাও ধরো।
হাতের খাবার গুলো এগিয়ে দিল ঝিলমিল। তাহসিন গলার আওয়াজ নামিয়ে বারিশকে উদ্দেশ্য করে বলল,
— মেয়েটার উপর একটু দয়া করুন।
— আমি অন্তত তোমার চেয়ে ভালো। কারও সুযোগ তো নেই না।
কেবিনে হঠাৎ বারিশ আর মেহরাজের বন্ধু নীল সাথে আরও দুজন ঢুকল। বাকি দুজন চট্টগ্রাম থেকে এসেছে। নীল ভেতরে পা দিয়েই হেসে উঠে বলল,
— কীরে মেহরাজ, তুই নাকি বারিশের এক্সিডেন্টের ফেক নিউজ শুনে জ্ঞান হারিয়েছিস? তুই তো জানতিস আমরা পাহাড়ে বারবিকিউ পার্টি করছিলাম, তাও কীভাবে বিশ্বাস করলি?
কথাটা শোনামাত্র মেহরাজ আর ঝিলমিল দুজনই স্তব্ধ হয়ে গেল। মেহরাজ চোখ জোড়া কপালে তুলে শুধাল,
— পার্টি মানে? কিসের পার্টি?
সঙ্গে থাকা বন্ধুদের একজন অবাক হয়ে বলল,

— কেন, বারিশ তোকে বলেনি? তুই নাকি বলেছিলি তোর পাতলা পা”য়খানা হয়েছে, তাই তুই যাবি না! কীরে বারিশ, তুই-ই তো বললি!
মেহরাজ যেন মুহূর্তের জন্য অন্য কোনো দুনিয়ায় চলে গেল। অবাক চোখে একবার তাকাল বারিশ আর বন্ধুদের দিকে। তার কবে পাতলা পা”য়খানা হলো? আর কবেই বা সে বারিশকে এসব কথা বলল? আর এই ছেলেই বা কবে তাকে বলল ওরা একসঙ্গে পার্টি করছে?
এত কিছুর পরও বারিশ একদম নির্বিকার। তাহসিন একটু খোঁচা মেরে বলল,
— বাহ! আপনি আসলেই তো অনেক বড় মানবদরদী লোক!
ঝিলমিল স্তব্ধ হয়ে নিচু কণ্ঠে শোধাল,
— উনি আপনাদের সঙ্গে পাহাড়ে পার্টি করছিলেন?
নীল চোখ বন্ধ করে একনাগাড়ে বলে যেতে লাগল,

— হ্যাঁ! পাহাড়িদের মুরগি চুরি করে বারবিকিউ বানাচ্ছিলাম, তখনই তো খবর এল তুমি আর মেহরাজ নাকি ভুয়া নিউজ শুনে অসুস্থ হয়ে পড়েছ। খবর পাওয়া মাত্রই ও পার্টি ভেস্তে দিয়ে দৌড়ে চলে আসে। ওখানে আমাদের পুরো ফ্রেন্ড সার্কেলই ছিল। আর সত্যি বলতে, ফ্লাইট মিস করে এই পার্টির পুরো প্ল্যান বারিশই বানিয়েছিল! ভাগ্যিস বানিয়েছিল, নইলে সেদিন সেই অভিশপ্ত প্লেনে ও-ও থাকত…
নীল তো মনের সুখে বলেই যাচ্ছে, কিন্তু ততক্ষণে বারিশ চোখ দিয়ে ওকে জ্যা”ন্ত পুড়িয়ে মারার মতো দৃষ্টি নিক্ষেপ করছে। ঝিলমিলের মাথা চড়া দিয়ে উঠল। সে আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়াল না, থমথমে মুখে হনহন করে কেবিনের বাইরে বেরিয়ে গেল।
ঝিলমিল বের হয়ে যেতেই বারিশ এক লহমায় চেপে ধরল নীলের শার্টের কলার। ঘু”সি বসিয়ে দিল ওর চোয়াল বরাবর, ধাক্কা দিয়ে সোফায় ফেলে দিয়ে গর্জে উঠল,
— আর কিছু বলার বাকি ছিল? ওগুলোও বলে দিতি! আমরা যে মদ খেয়েছিলাম, ওটা কেন বললি না?
নীল গাল চেপে ধরে কঁকিয়ে উঠে বলল,

শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ৩২

— আরে! ওটা বললে তো ও তোর ওপর রেগে যেত!
— হ্যাঁ, এখন তো রাগেনি! এখন ও সোজা এসে আমাকে চুমু খাবে, তাই না? নির্বোধ কথাকার! আমার বন্ধু হয়েও মিথ্যে শিখিসনি?
দাঁতে দাঁত চেপে গসগস করে উঠল বারিশ। সময় নষ্ট না করে বারিশ দ্রুত কেবিনের বাইরে গিয়ে ঝিলমিলের পিছু নিল।

শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ৩৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here