শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৭৫
নূরজাহান আক্তার আলো
রুবাব রুমে ঢুকে দেখে ঐশ্বর্য বিছানার হেডবোর্ডে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। চোখ, মুখে ক্লান্তির ছাপ। হলুদের রাত থেকে গায়ে গায়ে হালকা জ্বর মেয়েটার। তবুও কাউকে বলে নি, আচমকা এসে জড়িয়ে না ধরলে সেও জানত না। মেডিসিন নেওয়ার পর জ্বরটা এখন নেই অবশ্য। রুবাব হাতের ট্রে রেখে এগিয়ে গেল। এগিয়ে মনে হলো দরজা আঁটকানো হয় নি। পুনরায় পিছু ফিরে দরজা আঁটকে বিছানার কাছে গেল। নিঃশব্দে বসল। ঐশ্বর্যকে কোলে তুলে বালিশে ঠিকঠাকভাবে শুইয়ে দিলো। চুমু খেলো কপালের মাঝ বরাবর। ঐশ্বর্যের পরনে হালকা গোলাপী রঙের জামদানি শাড়ি। হাত, কান, গলা, কোমরে কাঁচা ফুলের গয়না। মালাটা সরে গেছে বিধায় চোখ পড়ল গলার দিকে।
ওর গলা থেকে বুক অবধি এসিডে ঝলসানো খসখসে কুঁচকানো চামড়া। ফর্সা শরীরে ঝলসানো চামড়া দেখতে অদ্ভুত লাগে। যদিও তার কাছে একটুও অদ্ভুত লাগে না, বরং গর্ব হয়। আরো ভালোবাসতে ইচ্ছে করে। পৃথিবীতে যত সুখ, শান্তি, ভালোবাসা আছে সব কুড়িয়ে ঐশ্বর্যের আঁচলে বেঁধে দিতে ইচ্ছে করে।ইচ্ছে করে তার বুকে জমা কষ্টগুলো শুষে নিতে। তার মুখ লুকানো কান্না করার কারণগুলো এত তুড়িতে সমাধান করে দিতে।কিন্তু সেটা তো তার পক্ষে সম্ভব না। সম্ভব না ঐশ্বর্যকে আগের অবস্থানে নিয়ে এতে। মেয়েটা যতই স্বাভাবিক থাকুক সে ঠিক বুঝে ঐশ্বর্য ভেতর ভেতর গুমরে মরছে,কষ্ট পাচ্ছে। অথচ তার পড়াশোনা, চলাফেরা, স্মার্টনেস, কথাবার্তার মাঝেও একটা আর্ট আছে৷ তার পারসোনালিটি নজরে লাগার মতোই। অথচ সেই মেয়ে এখন কেন জানি নিজেকে লুকিয়ে রাখতে চায়।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
যখন একা থাকে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অঝরে কাঁদে। সে যখন তার বুকে আঁকড়ে ধরে আদুরে বিড়ালছানার মতো মুখ লুকিয়ে রাখে। যেন সেও চায় রুবাবের বুকের ভেতর ঢুকে যেতো। লোকচক্ষুর আড়ালে লুকিয়ে থাকতে। কেননা লুকিয়ে থাকলে কেউ অবাক দৃষ্টিতে তাকাবে না, গলায় কি হয়েছে জানতে চাইবে না, ঘৃণায় মুখ কুঁচাবে না, ঘটনা শুনে স্বান্ত্বণার বাণী আওড়াবে না। তবে রুবাব বুকে হাত রেখে বলতে পারবে ঝলসানো চেহারায় ঘৃণার পরিবর্তে চুমু খেতে পারবে। মেয়েটা ভীষণ ভালোবাসতে পারবে। তাকে সুখে রাখার, ভালো রাখার চেষ্টায় থাকবে। বলা বাহুল্য, ঐশ্বর্যকে আগে যতটুকু ভালোবাসে এখন তার থেকেও হাজারগুন বেশি ভালোবাসে।
ভালো না বেসে উপায় আছে? এ যে তার ভাইয়ের বিপদে কেমন ঢাল হওয়ার চেষ্টা করেছিল। নিজের ক্ষতি করেও ঠিকই দেখিয়ে দিয়েছে সে আমানত রাখতে জানে। তার এই ত্যাগের কারণে চৌধুরী পরিবারের প্রতিটা সদস্যের কাছে সে প্রিয়। ভীষণ ভালোবাসার। তবে তাকে কেউ মাত্রারিক্ত কিছুই করে না যাতে ঐশ্বর্য ভাবে অন্যকিছু ভাবে। অন্যকিছু বলতে তাদের স্নেহ লোক দেখানো। এজন্য বাড়ির অন্য মেয়ে যেমন থাকে, যেমন আদর পায়, তার জন্যও সে আদরটুকু বরাদ্দ থাকে।
শারাফাত চৌধুরী বিয়ে উপলক্ষে তার কাছে এক টাকার নেন নি। দিতে গেলে থমথমে মুখে বকেছে। এত বকাটা আদরের। বাড়ির মেয়ে হিসেবে শীতল, স্বর্ণ, শখ যা পেয়ে একই জিনিস ঐশ্বর্যকেও দেওয়া হয়েছে। মা মরা, স্বজনহারা মেয়েটাকে সবাই এত ভালোবাসে যে দেখেও খুব শান্তি লাগে। যতই এটা মামার বাড়ি হোক, শুদ্ধ-সায়ন মামাতো ভাই হোক, সে দিনশেষে গর্ব করে বলতে পারে তারও পরিবার আছে। কলিজার ভাই বোনরা শক্তি হিসেবে পাশে আছে। এসব নানান কথা ভাবতে ভাবতে কেন জানি রুবাবের চোখ দিয়ে ঝরঝর করে অশ্রু গড়িয়ে গেল। পরের অশ্রুটুকু পরার আগেই ঐশ্বর্য হাতের মুঠোয় নিলো। ঘুমঘুম স্বরে বলল,
-‘কাঁদছো কেন? বউকে দেখে আফসোস হচ্ছে? ‘
রুবাব পুনরায় ঐশ্বর্যের কপালে, গালে ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল,
-‘উঠো, খাবে চলো।’
-‘খেয়েছি আমি। তুমি খেয়ে এসো।’
-‘ তা হচ্ছে না, উঠুন।’
একথা বলে রুবাব ঐশ্বর্যের হাত ধরে টেনে এনে উঠে বসাল। তারপর ঐশ্বর্যের মুখে খাবার পুরে নিজেও খেতে লাগল। ঐশ্বর্যের রুবাবের মুখ দেখে রুবাবের কাঁধে মাথা রেখে বাহু জড়িয়ে ধরে বলল,
-‘আমার মহারাজের মন খারাপ কেন? ঘুমিয়ে পড়েছিলাম তাই?’
-‘না।’
-‘কি হয়েছে?’
-‘বলতে পারি যদি কান্নাকাটি না করো।’
ঐশ্বর্য মাথা তুলে তাকাল। কিছু একটা বুঝে কিয়ৎকাল রুবাবের মলিন মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। রুবাব ঐশ্বর্যের মুখে খাবার দিলেও ঐশ্বর্য নিলো না তার অশ্রুসিদ্ধ চোখজোড়া থেকে ঝরঝরিয়ে অশ্রু ঝরে গেল।
রুবাব ছলছল চোখে বাম হাতে তার চোখ মুছে দিয়ে হাসল। বলল,
-‘ তুমি কাঁদলে যাব কিভাবে?’
এর আগে ঐশ্বর্য কখনো রুবাবের দেশ ছাড়ার মুহূর্তে ভুলেও কাঁদে নি। বরং হাসি মুখে তাকিয়ে বিদায় জানিয়ে বাসায় ফিরে পাগলের মতো কেঁদেছে। যতই কষ্ট পাক, মন খারাপ হোক, রুবাবের সামনে মন খারাপ করে কথা বলে নি। কিন্তু এবার বোধহয় নিজেকে সামলাতে পারবে না।
পারবে না হাসি মুখে বিদায় দিতে। ঐশ্বর্য আজ স্থির থাকতে পারল না রুবাবের কাঁধে মুখ লুকিয়ে শব্দ করে কেঁদে ফেলল। রুবাব একহাতে তাকে জড়িয়ে ধরে ভেজাস্বরে বলল,
-‘কাঁদে না জান। তুমি কাঁদলে আমি যেতে পারব না। আমার ধাপ উঠবে না। মাত্র..মাত্র ছয়টা মাস। দেখবে দেখতে দেখতে চোখের পলকে কেটে যাবে।’
ঐশ্বর্য কথা বলতে পারল না। ব্যাকুলস্বরে কেঁদে গেল। রুবাবের খাওয়া হলো না। গলা দিয়ে খাবার নামল না। কোনোমতে হাত ধুয়ে ঐশ্বর্যকে বুকে নিয়ে শুয়ে পড়ল। কাঁদতে কাঁদতে ঐশ্বর্যের ফুলের গয়নার বেহাল দশা। পরনের শাড়ি এলোমেলো। চুল অগোছালো। ফর্সা নাকটা লালবর্ণ ধারণ করেছে। ফুলে লাল হয়ে উঠেছে ডাগর ডাগর নেত্রজোড়া। চিকন ঠোঁটজোড়া কান্নার চোটে তিরতির করে কাঁপছে। ঐশ্বর্য হঠাৎ রুবাবের বুক থেকে মুখ তুলে ফোঁপাতে লাগল। রুবাবের মুখটা আজলা ভরে দুই হাতে নিলো। কপালে চুমু করে কপালে কপাল ঠেকাল। তারপর ঢোক গিলে বলল,
-‘যেতে দিবো যদি আমি যা চাই দেওয়া হয়।’
রুবাব ঐশ্বর্যের চোখজোড়া মুছে চোখের পাতায় চুমু খেলো। বলল,
-‘কি লাগবে বলেই দেখো।’
-‘ছোট্ট রুবাব আসার ব্যবস্থা করে যাও।’
ঐশ্বর্যের কথার মানে বুঝতে সময় লাগল না রুবাবের। হতভম্ব হয়ে এক
পর্যায়ে শব্দ করে হেসে ফেলল। ঐশ্বর্যের মাথাটা বুকের সাথে চেপে ধরে বলল,
-‘আমার বউটা তো কখনো আবেগী ছিল না। বোকা বোকা কথা বলতো না। এ কদিনে শীতলের ছোঁয়া লেগেছে বুঝি?’
-‘কথা ঘুরাবে না রুবাব। আমি যা বলছি তাই হবে নয়তো যাওয়া হচ্ছে না এই বলে দিলাম।’
-‘আরে বাবা, হাতে সময় নেই আর দশদিন পরেই আমার জয়েন্ট। বেবি নেওয়ার প্ল্যান কি এভাবে হয়? এবার এসে নাহয়..!’
-‘আল্লাহ চান তো এবারই হবে। প্লিজ,,,প্লিজ রুবাব!’
অগত্যা ঐশ্বর্যের জেদের কাছে রুবাবকে হার মানতে হলো। ঠিক করল, কিছুদিনের জন্য দূরে কোথাও ঘুরতে যাবে। কারণ বউয়ের আবদার রাখতে একান্ত সময়ের প্রয়োজন। চেষ্টা করুক,,বাকিটা আল্লাহ ভরসা।
__’শখ? ভালো আছ তো তুমি?’
হুরমুড়িয়ে রুমে ঢুকে উক্ত কথাটি আমতা আমতা করে বলল অর্ক। খুব নার্ভাস সে। আসলে বন্ধুদের ঠেলা খেয়ে এভাবে ঢুকতে হয়েছে। একদল হাড়ে বজ্জাত বন্ধু কপালে জুটেছে। ঢুকতে গিয়ে স্বজোরে বারি খেয়েছে হাতের কনুইতে। শখ অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার সামনে দাঁড়ানো সুদর্শন পুরুষের দিকে। অর্ক কি বলবে বুঝতে না পেরে শুধু মুখ কাচুমাচু করছে। তার অবস্থা দেখে শখের কেন জানি ভীষণ হাসি পেল। ভালোও লাগল, শুধু সে না অর্কও নার্ভাস। বিয়েটা এত তাড়াতাড়ি হলো তাদের মাঝে বোঝাপড়া হয় নি। সেভাবে কথা হয় নি। কারো পছন্দ অপছন্দের ব্যাপারে জানা যায় নি। এসব নাহয়ে অবশ্য ভালো হয়েছে এখন যা হবে হালাল ভাবে হবে। কামরানরা বাইরে থেকে দরজা আঁটকে দিয়েছে। সে একবার বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে ভেতর থেকেও লক করল। তারপর ধীর পায়ে এসে বসল বিছানার এককোণে। আমতা আমতা করে ধীরে ধীরে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল শখের দিকে। নরম সুরে বলল,
_’পছন্দের খাবার এনে দিয়েছি খাও নি কেন?’
_’পেট ভরা।’
_’এখনো মন খারাপ? ‘
শখ জবাব দিলো না ধীরে ধীরে মাথা নিচু করে নিলো। অর্ক বলল,
-‘কালই ওইবাড়িতে নিয়ে যাব। আগে ছিল একটা বাড়ি এখন হলো দুইটা বাড়ি। আজ থেকে দুই দুইটা বাড়ি তোমার; যখন ইচ্ছে যাবে-আসবে।’
_’হুম।’
এরপর কেউ আর কোনো কথা খুঁজে পেল না। কিছুক্ষণ পর শখ নিজে থেকে নিচু স্বরে বলল,
_’নামাজ পরব অযু করে আসুন।’
কথাটা কর্ণকুহুরে পৌঁছানো মাত্রই অর্ক ভীষণ খুশি হলো। এতক্ষণ ধরে ভাবছিল কথাটা কিভাবে বলবে। মেয়েদের নানান সমস্যা থাকে। সে যদি আগ বাড়িয়ে বলেও আর যদি সমস্যা থাকে মেয়েটা লজ্জা পাবে। তাই
বলতে পারছিল না তবে প্রস্তাব যখন শখের থেকে এসেছে সে বসল না। চট করে অযু করে এলো।সে এলে শখ অযু করে এসে অর্কের আগাপিছু নামাজে দাঁড়িয়ে গেল। দুজনের হাত তুলল রবের দরবারে। দোয়া করল নিজের দাম্পত্য জীবনের জন্য, বাকি তিন কাপলের জন্য। নামাজ পরে
শখ উঠে বসতেই অর্ক একটা প্যাকেট তার দিকে এগিয়ে দিলো। বলল,
_’ এখানে দেনমোহরের নগদ টাকা আছে। আর,আর ছোট্ট একটা গিফ্ট। খুলে দেখ পছন্দ হয় কী না! নেদারল্যান্ডস গিয়েছিলাম সেবার খুব শখ করে এনেছিলাম। মমের জোড়া মমকে দিয়েছি আজকে বউ.. না মানে তোমারটা তোমাকে দিলাম।’
শখ গিফ্টের প্যাকেট খুলে দেখে অসম্ভব সুন্দর একজোড়া স্বর্ণের চুড়ি।
সে চুড়িজোড়া দেখে তাকাল অর্কের দিকে। তারপর এগিয়ে দিতেই ধপ করে অর্কের হাসি মুছে গেল। বলল,
-‘পছন্দ হয় নি? আচ্ছা, সমস্যা নেই আবার এনে দেবো।’
একথা বলে সে শখের বাড়িয়ে দেওয়া চুড়িজোড়া ধরে রাখতে গেলে শখ অন্যদিকে তাকিয়ে হাত বাড়িয়ে দিলো। লজ্জায় নতজানু সে। তবুও তার দিকে থেকে একধাপ এগিয়ে এলো। যাতে অর্কও সহজ হতে পারে। আর দুজনের কেউ একটু একটু করে না এগোলে কেউ সহজ হতে পারবে না। অথচ সম্পর্ক টিকতে রাখতে চাইলে বোঝাপড়াটাই সবার আগে। শখের বাড়ানো হাত দেখে অর্ক দ্বিতীয় দফা খুশি হলো। ঠোঁটের কোণে হাসির রেশ। খুব যত্ন করে চুড়িজোড়া পরিয়ে দিলো। শখের লজ্জারাঙা মুখের
দিকে তাকাল। বুঝল শখের আরেকটা অস্বত্বির কারণ। তাই বলল,
_’ ভয় নেই, যতক্ষণ না তুমি পারমিশন দিবে ততক্ষণ,,,!’
একথা বলে অর্ক থামল তারপর একগ্লাস পানি পান করে গিয়ে বেডের একপাশে শুয়ে পড়ল। শখ দাঁড়িয়ে আছে দেখে তাকেও শুয়ে পড়তে বলল। রাতও অনেক হয়েছে। আজ সারাদিন অনেক ধকল গেছে বিশ্রাম দরকার। শখ ধীর পায়ে অন্যপাশে গিয়ে শুয়ে পড়ল। তখন অর্ক তাদের বন্ধুদের গল্প বলতে লাগল। সেসব শুনে হাসল শখ। অর্ক খুব সুন্দর করে গুছিয়ে স্পষ্টস্বরে কথা বলে।শখ মনযোগীশ্রোতা হয়ে গল্প শুনতে শুনতে ঘুমে তলিয়ে গেল। তার নিঃশ্বাস ভারি হতেই অর্ক কাছাকাছি এলো। খুব মন দিয়ে শখের মুখটাকে দেখল। খুব সাবধানে কপালে আদর আঁকল।
তারপর বিরবির করে বলল,
_’ বন্ধুর বোন ভেবে নজর না দিয়ে ভুল করেছি। এখন আফসোস হচ্ছে। তবে দিনশেষে তোমাকে পেয়ে নিজেকে বড্ড সৌভাগ্যবান মনে হচ্ছে। এই যে ঘুমকুমারী আমার জীবনে আসার জন্য চিরকৃতজ্ঞ আমি। কথা দিচ্ছি, আমি বেঁচে থাকাকালীন ভালোবাসার অভাব হবে না আপনার। হতেই দেবো না আমি।’
ওদিকে একচোট ভালোবাসাবাসি শেষে সায়ন-স্বর্ণ দুজনই একসাথে
শাওয়ার নিয়ে এলো। নামাজ পরল। একসাথে খেলো। তারপর সায়ন স্বর্ণকে বুকে জড়িয়ে শুয়ে পড়ল। কে বলবে এই ছেলেটাই এত উন্মাদ ছিল! ক্ষ্যাপাটে ষাঁড়ের মতো তেড়ে এসেছিল তাকে ছুঁয়ে দিতে। অথচ তার ছোঁয়াতে কোনো ক্ষীপ্রতা ছিল না। তাড়া ছিল না। যা ছিল তা হলো ভালোবাসা। এই ছেলেকে বুঝতে হলে তার মতো করে চলতে হবে। এই যে তখন ওভাবে ক্ষেপে গেল বাঁধা দিলো রেগে যেতো। সে যখন মেনে নিলো সব ঠান্ডা। এ বুনো ক্ষ্যাপাটে ছেলেটা মুখে যতই গালাগাল করুক,
বকা দিক, তার বিশেষদিক সে ভীষ যত্ন করে ভালোবাসতে পারে। বুকে আগলে রাখতে জানে। তাকে সব রকমভাবে চেনাো হয়ে গেছে স্বর্ণের। তাকে কখন কিভাবে থামাতে হবে তাও বুঝে। কখন কীভাবে তার পেট থেকে কথা বের করতে হয় তাও জানে। এখন যেমন স্বর্ণ হাত বাড়িয়ে সায়নের মাথার চুল টেনে দিতে থাকল। সায়ন শান্ত ভদ্র ছেলের মতো স্বর্ণের গলার ভাঁজে মুখ গুঁজে আছে। ঘুমঘুম ভাব। তখন স্বর্ণ জিজ্ঞাসা করল,
_’ ঘুম পাচ্ছে?’
_’হুম।’
_’ বললে নাতো তখন কোথায় গিয়েছিলে?’
_’কবরস্থানে।’
_’কেন?’
_’ ইয়াসিরের সহকারী বুরাকের জানাযায় শরীক হতে। জানিস, বুরাক
কিয়ারাকে কিডন্যাপ করেছিল। আঁটকে রেখেছিল। বিয়েও করেছিল।
কিয়ারা তাকে মানতে না পেরে সুইসাইড করেছে পরে ছেলেটা নিজের জীবনটাও শেষ করে দিলো। কিয়ারাকে চিনতে পেরেছিস? আমাদের শীতলের বেস্ট ফ্রেন্ড। এর পেছনেও ইয়াসির আছে। এখন কথা হচ্ছে,
শীতলের কানে গেলে কি যে হবে আল্লাহ জানে।’
_’ তোমরা গিয়েছিলে কেন? জানলেই বা কিভাবে?’
_’ইয়াসির খবর পাঠিয়েছিল জানাযায় শরীক হওয়ার যাওয়ার জন্য। না যেয়ে উপায় আছে? পৃথিবীর সব ক্ষমতা, অহংকার জানাযার কাতারেই শেষ। আজ যে খাঁটিয়ায় বুরাক কাল আমি ..!’
_’থামো। ঘুমাও।’
সায়ন নিঃশব্দে হেসে ফেলল। স্বর্ণকে বুকের সাথে চেপে ধরে ঘুম ঘুম স্বরে বলল,
-‘ ভুলেও আমাকে ছেড়ে যাস না রে জান। তোকে ছাড়া আমার পুরো পৃথিবী অন্ধকার। ম’রে যাব আমি। দরকার হলে নিজের হাতে খুন করে যাস তবুও একা ফেলে যাস না।’
একথা বলতে বলতে সায়ন ঘুমে তলিয়ে গেল। স্বর্ণ শুনে গেল প্রেমিক পুরুষটার কথা। চাঁদের আলোয় মন ভরে দেখল সায়নের মায়াভরা মুখ।
সে জানে, এই চঞ্চল এই পুরুষটার বুকে একটা বাক্স আছে। সেই বাক্সে একান্ত ব্যাক্তিগত কিছু কষ্ট লুকানো আছে। হসপিটালে শুদ্ধ-শীতলের
বিয়ের দিন ইয়াসির যেদিন সবার সামনে সায়নকে পরগাছা বলেছিল। অপ্রকাশিত সত্যি প্রকাশ হয়েছিল। সেদিন সায়ন বাড়িতে এসে চুপচাপ শুয়ে পড়েছিল। সেও এসেছিল। বুকের মাঝে আগলে নিতেই এভাবেই
আগলে রেখেছিল। তার এই উন্মাদ পুরুষটাই নীরবে, নিঃশব্দে অঝরে কেঁদেছিল। তার চোখের পানি তার গলা ভিজিয়েছিল। সেদিনের বাকি রাতটুকুও জেগে ছিল। ঠিক এভাবে বুকে আগলে রেখে বুঝিয়েছিল, সে আছে, ছিল, মৃত্যুর আগ মূহুর্ত পর্যন্ত সঙ্গে থাকবে।
পাক্কা বিশ মিনিট ধরে শীতলকে কান ধরিয়ে দাঁড় করিয়ে রেখেছে শুদ্ধ। তার হাতে শক্তপোক্ত মেহগনি গাছের চ্যালাকাঠ। শীতল লাল জামদানি বাঙালিয়ানা ভাবে পরেছে। গায়ে সুগন্ধিওয়ালা কাঁচা ফুলের গয়না। সরু কোমরে শুদ্ধর দেওয়া সেই কোমরবন্ধনী। লম্বা খোলা চুল। সব মিলিয়ে ভীষণ মিষ্টি লাগছে দেখতে। শুদ্ধ থমথমে মুখে ভ্রুঁ জোড়া কুঁচকে তাকে আপাদমস্তক দেখল। রাতের বেলা সেজেছে কেন বলে চ্যালাকাঠ দিয়ে মারতে গেলে শীতল ভয়ার্ত চোখে তাকাল। তার এমন ব্যবহারের কারণ খুঁজে পাচ্ছে না সে। তাকে তাকাতে দেখে শুদ্ধ এক বারি বসিয়েই দিলো।
ধমকে বলল, তার দিকে তাকালেই মেরে প্রতিবন্ধী করে দেবে। অগত্যা শীতল মাথা নিচু করে কান ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। কান্নাভেজা স্বরে বলল,
-‘কি করেছি আমি? মারছেন কেন আমায়? কিছুদিন আগে না আমরা প্রেম করে বিয়ে করেছি? কষ্ট করে পাওয়া বউকে কেউ মারে?’
-‘আমি প্রেম করি নি। বিয়েও করি নি। আমি সিঙ্গেল। সিঙ্গেলই থাকব। বের হোন আমার রুম থেকে, কারো সঙ্গে রুম শেয়ার করতে পারি না আমি।’
শুদ্ধর কথা শুনে শীতল বিষ্ফোরিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। কি বলে এই লোক? মন নিলো, দেহের দখলদারি খাটাল, এখন বলে কি না সিঙ্গেল! এই লোক কি গাছের সাথে বারি টারি খেলো নাকি? নাকি মাল মুল খেয়ে এসেছে? যদি তা না হয় তাহলে হঠাৎ মতিভ্রম হওয়ার মানে কি? তাকে যেতে না দেখে শুদ্ধ আরেক বারি মারার আগেই শীতল হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। মুখে বলতে লাগল,
-‘আর মারবেন না শুদ্ধ ভাই, চ্যালাকাঠের মার খুব লাগে। আর করব না। আপনি যা বলবেন তাই। আপনি সিঙ্গেল। আমি সিঙ্গেল। পৃথিবীতে যে যেখানে আছে আমরা সবাই সিঙ্গেল।’
কাঁদো কাঁদো সুরে একথা বলতে শুনে শুদ্ধ ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। পানি পান করতে করতে বেডে শোয়া শীতলের কথাগুলো শুনল। দেড় ঘন্টা আগে রুমে এসে দেখে শীতল বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। ক্লান্ত মুখটা দেখে মায়া লাগছিল দেখে ডাকে নি। শীতলের গায়ের ফুলের গয়না খুলেছে। চুলে বিনুনি করেছে। নামাজ পরেছে। তবুও শীতল জাগা পায় নি সে নামাজ
পরে উঠে পানির মুখে নিতেই ব্যাঙাচির ঘরের ব্যাঙাচি ঘুমের ঘরে স্বপ্ন দেখে কেঁদে উঠল। ভুলভাল বকছে এখনো। কাঁদছেও। মাঝরাতে কেউ শুনলে কি ভাববে? তবে এটা নতুন কিছু নয় দেখে শুদ্ধ অবাকও হলো না রাগলও না। গ্লাসে পানি নিয়ে শীতলের কাছে গেল। নরম সুরে বলল,
-‘কাঁদতে কাঁদতে গলা শুকিয়ে গেছে নিশ্চয়ই? পানি খা।’
একথা বলে পরপর দুবার শীতলকে ডাকতেই শীতল চোখ পিটপিট করে তাকাল। নিজের অবস্থান ধাতস্থ করে উঠে বসল। বুঝল, স্বপ্ন দেখছিল।
গ্লাসটা নিয়ে পানি পান করল। ঘুম ছুটে গেছে তার। স্বপ্ন দেখে কাঁদছিল বুঝে মনে মনে নিজেই একচোট হাসল। শুদ্ধর গ্লাসটা রাখতেই সে বলল,
-‘কখন এসেছেন? ডাকেন নি কেন আমায়? আসলে মাথা ব্যথা করছিল
চোখ বন্ধ করে থাকতে থাকতে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছি। খেয়েছেন আপনি?’
-‘হুম। মাথা ব্যথা কমেছে?’
-‘ না।’
শুদ্ধ দুজনের বালিশ ঠিকঠাক করে শুতে ইশারা করল। শীতলও কথা না বাড়িয়ে শুয়ে পড়ল। শুদ্ধ হাতের উপর ভর দিয়ে শুয়ে শীতলের কপাল টিপে দিতে লাগল। শীতল চেয়ে চেয়ে দেখল বিশুদ্ধ পুরুষটাকে। খেয়াল করল শুদ্ধ সাদা পাজামা পাঞ্জাবি পরে আছে। এই বেশে বেশ লাগে তার
ব্যাক্তিগত পুরুষটাকে। তারপর কী ভাবল কে জানে লজ্জায় গালজোড়া লাল হয়ে উঠল। ওষ্ঠজোড়া লাজুক হাসল। শুদ্ধ শীতলের তখনো দিকে তাকিয়ে থাকায় কোনোটাই নজর এড়ালো না তার। তার ঠোঁটেও ফুটল মিটিমিটি হাসি। চোখে দুষ্ট চাহনি। ওর এমন দৃষ্টিতে শীতল নতজানু হয়ে গেল। শরীর কাঁপতে লাগল মৃদুভাবে। ইচ্ছে করে যে বিশুদ্ধ পুরুষ তাকে লজ্জা দিচ্ছে বুঝতে বাকি রইল না। তবে এ মানুষটা, এ মানুষটার ছোঁয়া সর্বাঙ্গে মেখেছে তবুও এ দৃষ্টি যেন নতুন করে ঘায়েল করে দিচ্ছে তাকে।
তার লাজুকভাব দেখে শুদ্ধ ভ্রুঁ নাচাতেই শীতল দুই হাত দিয়ে তার চোখ ঢেকে দিলো। এ চোখজোড়া ভারি দুষ্টু। বড্ড জ্বালাচ্ছে। কিসব আবদার
করছে। তার এহেন কান্ডে শুদ্ধ হাত সরিয়ে তার নিজের আঙুলের ভাঁজে
শীতলের আঙুল রাখল। নিচু স্বরে বলল,
-‘কেউ কি আমাকে দেখে লজ্জা পাচ্ছে?’
-‘(….)।’
-‘পাচ্ছে না?’
-‘(…..)’
-‘ যাই, ফুটেজটা তাহলে নিয়ে আসি।’
একথা বলে উঠতে গেলে শীতল আঁটকে দিলো। শুদ্ধর বুকে মুখ লুকিয়ে
মিনমিন করে বলতে লাগল,
-‘এই,,, না প্লিজ। এই যে দেখুন আমি লজ্জা পাচ্ছি,.. খুব লজ্জা পাচ্ছি। ‘
শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৭৪
ওর কান্ডে শুদ্ধ এবার শব্দ করে হেসে ফেলল। বুকের উপর টেনে নিলো ছোট্ট শরীরটাকে। তাকে এভাবে হাসতে দেখে শীতলের মন ভরে গেল। চোখজোড়া যেন জুড়িয়ে এলো। সে নিজেও মিটিমিটি হাসতে হাসতে মনে মনে আওড়াল,
– ‘মাশাআল্লাহ! মাশাআল্লাহ! এই মুখের হাসিটুকু হাজার বছর অমলিন থাকুক। আমার ভাগের সবটুকু সুখ, সব ভালোবাসা আপনার জীবনে পুষ্পকলির ন্যায় ফুটে উঠুক।’
