Home শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৯৩

শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৯৩

শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৯৩
নূরজাহান আক্তার আলো

–’ভা,,,ভাইয়া! ভাইয়া এসেছো? এই যে এইদিকে আমি,,দেখতে পাচ্ছো আমাকে?’
কথাগুলো বলতে বলতে শীতলের কণ্ঠস্বর যেন কান্নায় বুজে এল। বন্দি পাখির মতো ছটফট করতে লাগল।হাত বাড়িয়ে ভাইকে ছোঁয়ার আপ্রাণ চেষ্টা চালাল। কিন্তু লোহার জালের ছোট ছোট ফাঁক গলিয়ে ভাইকে সে ছুঁতে পারল না বরং শক্তি প্রয়োগ করায় ঘষা লেগে হাতে খুব ব্যথা পেল। আফসোসে বুকখানা ভার হয়ে এলো। ওদের ভাই-বোনের মাঝে জালটা না থাকলে এতক্ষণে ভাইয়ের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ত। চিৎকার করে কেঁদে বুকের হাহাকারগুলো কমাতে পারত। খোলসে আবৃত আবরণটুকু ছুঁড়ে আগের শীতল হয়ে যেতো। যে শীতল কিছু হলে গড়গড় করে সব কথা উগলে দিতে পারত। সামান্য ব্যথা পেলে চিৎকার করে কেঁদেকেটে বাড়ি মাথায় তুলে রাখত। কেউ বকলে তোতাপাখির ন্যায় অভিযোগের ঝুড়ি খুলে বসত। কিন্তু এসব যে কিছুই হলো না, শতচেষ্টা করে ভাইকে ছুঁতেও পারল না। এই না পারাটুকুতে অসহায় সুরে ডুকরে কাঁদতে লাগল। আহ, কী করুণ সেই কান্না! এদিকে বোনকে কাঁদতে দেখে সায়নের পাগলপ্রায় অবস্থা। তার চোখজোড়াও লালবর্ণ ধারণ করেছে। না চাইলেও টপটপ করে অশ্রু ঝরে যাচ্ছে। কন্ঠস্বর যেন বাকশক্তি হারিয়েছে। হাত-পা ধীরে ধীরে কাঁপছে। দেহের ভারসাম্য ধরে রাখা কষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তবুও কান্না ভেজাকন্ঠে বহুকষ্টে উচ্চারণ করল,

_’জ..জানবাচ্চা!’
এতদিন পর ভাইয়ের মুখে ভীষণ প্রিয় ডাক শুনে থমকে গেল শীতল। ওর কলিজাখানা যেন জুড়িয়ে গেল। সে ছটফটিয়ে জবাব দিলো,
_’ এই যে আমি!’
_’কাঁদে না পাখি। ভাইয়া এসে গেছি এবার সব ঠিক হয়ে যাবে।’
_’আসতে এত দেরি করলে কেন ভাইয়া? আমি যে তোমার অপেক্ষাতেই ছিলাম? তা ঠিক আছো তো তুমি? ব্যথা সেরেছে তোমার? ডাক্তার কি বলেছে?’
বন্দিদশাতেও তার জন্য ব্যাকুল হতে দেখে সায়ন জালে মাথা ঠেকিয়েই কাঁদতে লাগল। কে বলে সে এতিম? কে বলে, চৌধুরীরা তার কেউ না?
ঠিক এই কারণে চৌধুরীদের রক্তের না হয়ে পড়ে আছে চৌধুরী নিবাসে।
কে কী ভাবল তার হিসাব না কষে বরং উপলব্ধি করেছে বাড়ির মানুষরা তাকে কিভাবে দেখছে, কীভাবে গ্রহন করছে, যখন দেখল বাড়ির সবাই তাকে শাসনের আড়ালে ভালোবাসে তখন নিজেকে কখনো পর ভাবার অবকাশ পায় নি সে। এজন্য নিজেকে কখনো এতিম বলেও মনে হয় নি।

তাছাড়া শাহরিয়ার চৌধুরীর সবচেয়ে শক্তি হলো তার ভাই-বোনরা। যার এমন ভাই-বোন আছে সে এতিম হতে পারে? পারে না, কখনো না। যারা তাকে এতদিন স্নেহের চাদরে মুড়িয়ে রেখেছে, সম্মান দিয়েছে, অসহায় হয়েও ‘ভাই’ হওয়ার অধিকার দিয়েছে। মুখভর্তি করে ভাইয়া ডেকে বুক
ভরিয়ে দিয়েছে। শান্তির জীবন দিয়েছে। তারাই যে তার মূল শক্তি। তার এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা, শুধু তারা পাশে থাকলে শাহরিয়ার চৌধুরী কোনোদিন গরিব হবে না। সে এটাও ভাবে তার জীবনের বিনিময়ে যদি
কখনো তার ভাইবোনের মুখে হাসি ফোটে তাহলে হাসতে হাসতে জীবন বিসর্জন দেবে। কিন্তু সেই সুযোগ হলো কই? হলো না, পারলও না, বরং তাকে বাঁচাতে গিয়ে ভাই-বোনদের জীবন থেকে সুখ হারিয়ে গেল। হাসি মুছে গেল। এ আফসোস মুছবে কিভাবে সে? কিভাবে এ ক্ষত সারাবে? সায়নকে এভাবে কাঁদতে দেখে শীতল বারণ করেই যাচ্ছে। আদুরে সুরে ডাকছে। কিন্তু সায়ন যেন আজ আর নিজেকে সামলাতেই পারছে না।
অগত্যা শীতল জালের ফাক গলিয়ে এক আঙুল ঢুকিয়ে ভাইয়ের চোখ ছুঁলো। আঙ্গুলের ডগার সাহায্যে ভাইয়ের চোখ মুছে দিয়ে ব্যাকুল হয়ে বলল,

_’ তোমাকে কাঁদতে দেখলে আমার খুব কষ্ট হচ্ছে, থামো ভাইয়া, প্লিজ থামো।’
শীতলের বাড়িয়ে দেওয়া আঙুল কপালে ঠেকিয়ে অঝরে কাঁদতে লাগল সায়ন। তার কলিজাখানা কেউ যেন যত্ন করে থেতলে দিচ্ছে। তার কষ্ট আরো দ্বিগুন হয়েছে কারণ তার আদরের বোনটা তার জন্যই হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছে। গায়ে খুনী তকমা লাগিয়েছে। বাড়ির বাইরে একরাত না থাকা মেয়েটা এখানে পড়ে আছে। যাদের সম্পর্কের সূচনা তার হাত ধরে হয়েছিল, আজ তারই কারণে দুই চড়ুই আলাদা। তাদের ছটফটানি মানা যায়? সহ্য করা যায়? কি করে বোঝাবে শুদ্ধ-শীতলের এই দূরত্ব মানতে পারছে না সে। ওদের বুকচাপা কষ্ট দেখলে শ্বাসটা যেন আটকে আসছে।
ভাই-বোনদের কিচিরমিচিরে আগে বাড়িটা সব সময়ই পূর্ন থাকত। সুখ যেন উতলে উঠত বাড়ির আনাচে কানাচে। অথচ এখন বাড়ি থেকে যেন সুখ হারিয়ে গেছে। শান্তি পালিয়ে গেছে । এসব হয়েছে তার কারণে। সে যদি শারাফাত চৌধুরীর কথা শুনে রাজনীতিতে না জড়াত তাহলে এমন হতো না। শুধু তার কর্মফল ভোগ করছে তার ভাই-বোনদেরা, বাড়ির সব সদস্যরা। যারা এতদিন তাকে আগলে রেখেছিল, তবে কী এটাই তাদের প্রাপ্য? এই তার প্রতিদান? সায়ন আর ভাবতে পারল না শুধু ছটফটিয়ে আফসোসের অনলে পুড়তে লাগল। সেই আফসোস কান্না হয়ে অঝরে ঝরতে লাগল।
এদিকে ওদেরকে এভাবে কাঁদতে দেখে বাকিরা কথা ভুলে হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। কেউ কেউ কেঁদেও ফেললেন তাদের আহাজারি দেখে।
সায়নকে শীতল কত করে বারণ করছে। শরীর খারাপ করবে তা মনে করিয়ে দিচ্ছে কিন্তু সায়নের যেন নিজেকে সামলানো দায় হয়ে পড়েছে।
তার ইচ্ছে করছে জাল ভেঙে বোনকে বাড়ি নিয়ে যেতে। আর আইনকে মধ্যমা আঙুল দেখিয়ে চিৎকার করে বলতে,

_’তোদের আইনকে আমি চুু*দি! চু*দি তোদের লোক দেখানো নিয়মকে। আমার বোন অন্যায় করেনি শুধু আমার ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে সে। আর এটাকে তোরা অপরাধ বলিস? কিসের অপরাধ? এটা যদি অপরাধ হয় তাহলে ভাইয়ের সামনে বোনের সম্মানহানি করাও তোদের কাছে পুণ্যের কাজ? যদি তাই হয়, তবে প্রার্থনা করি এমন ‘পুণ্য’ যেন তোদের সঙ্গেও হয়! কথায় বলে আইন অন্ধ! আসলেই অন্ধ। ধিক্কার জানাচ্ছি তোদের অন্ধ আইনকে, ধিক্কার তোদের অন্ধ বিচারব্যবস্থাকে!’
আজম এতক্ষণ দরজার কাছেই দাঁড়িয়ে ছিল। ওদের দেখে মুখ লুকিয়ে কাঁদছিল। কিন্তু হঠাৎ খেয়াল করল সায়নের শরীরটা কাঁপছে তখন দ্রুত এসে আগলে ধরল। শান্ত হতে বলল। কিন্তু সায়ন তার কথা গুরুত্ব দিলো না বরং তাকে জড়িয়ে ধরেই বলতে লাগল,

_’আজম ওদের বল না আমার বোনটাকে ছেড়ে দিতে। বোন ছাড়া বাড়ি ফিরব কোন মুখে? ও বাচ্চা একটা মেয়ে, ওসব জেল টেল ওর জন্য না। জেল খাটতে হয় আমি খাটব, শাস্তি দিতে হয় আমাকে দিক, তাও অন্তত বোনটাকে এবার ফিরিয়ে দিক!’
শীতলের কান্না থেমে গেছে। জালে মাথা ঠেকিয়ে ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। গর্ব হচ্ছে, ভীষণ গর্ব হচ্ছে যে এমন একজন ভাইয়ের
বোন সে। তখন সেখানে শুদ্ধও উপস্থিত হলো। এদিক ওদিক তাকিয়ে সায়নের পাশে দাঁড়াল। ঘেমে নেয়ে একাকার অবস্থা। শীতলের সঙ্গেও চোখাচোখি হলো। বুঝল পুরোদমে কান্নার পর্ব চলছে তাই সায়নকে ধরে শীতলকে বলল,
_’ওই রুমে যা, আমরা আসছি।’

শুদ্ধর বলতে দেরি হলেও শীতলের ছুটতে দেরি হলো না। সে চোখ মুছে
এগোতে লাগল ভিজিটিং রুমের দিকে। আজকে ভিজিটিং রুমে দেখার করার অনুমতি পায় নি বিদায় এখানে আসতে হয়েছিল। তারপর টাকা খসাতে কিছুক্ষণের মধ্যেই অনুমতি পেয়ে গেল। শীতল দৌড়ে ওই রুমে ঢুকতেই থমকে দাঁড়িয়ে গেল। ঝাপসা দুই চোখে দেখল রুবাব, শখ, স্বর্ণ, সাম্য-সৃজন দাঁড়িয়ে আছে। তাদের দেখে হাউমাউ করে কেঁদে উঠতেই ভাই-বোনরা তাকে আগলে নিলো। একসাথে কেঁদে উঠল। সায়ন প্রবেশ করলে সেও যুক্ত হলো। সায়ন শীতলের হাত কপালে ঠেকিয়ে অঝরে কাঁদল। কত কিছু বলল। কত কিছু বোঝাল। এক সময় শীতল কাঁদতে কাঁদতে তাকে সবচেয়ে বেশি আঘাত দেওয়া মানুষটার নামে অভিযোগ দিলো,

_’ভাইয়া! বা..বাবা, বাবা আমাকে ফাঁকি দিয়েছে। আসব বলে আসে নি। মিথ্যা বলেছে আমাকে। কত কাঁদি, কত ডাকি তাও আসে না। আচ্ছা, কবরে কি মেয়ের ডাক পৌঁছায় না?’
সায়ন জবাব দিতে পারল না। রুবাব, শখ, স্বর্ণ ডুকরে কেঁদে উঠল। বুকে জমা হাহাকার গুলো একে একে উগলে দিতে লাগল শীতল। শুদ্ধ নীরবে দাঁড়িয়ে দেখল ভাই-বোনদের মেলবন্ধন। আজমও শুদ্ধর পাশে দাঁড়িয়ে হাসতে হাসতে চোখ মুছছে। কি আশ্চর্য, চোখ মুছতে না মুছতেই আবার ভিজে যাচ্ছে। এদিকে টাইম দেখে শুদ্ধ স্মরণ করিয়ে দিলো হাতে আছে আর মাত্র দশ মিনিট। দশ মিনিট শুনে বহুকষ্টে তারা নিজেদের সামলে নিলো। স্বাভাবিক হওয়ার আপ্রাণ চেষ্টাও চালাল। সায়ন তখন শীতলের চোখ মুছে দিয়ে ঠোঁটে ফুটিয়ে বলল,
_’কি রে পাজি, তোর জন্য নাকি আমার ভাইকে জরিমানা দিতে হয়েছে?
এটা কি ঠিক হয়েছে? বেচারা ভাই আমার।’
শীতল প্রথমে ওর কথার মানে বুঝতে পারে নি। পরে বুঝে শুদ্ধর দিকে তাকিয়ে ছলছল চোখে ফিক করে হেসে ফেলল। তার দেখে বাকিরাও হাসল। তখন রুবাব শীতলের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,

_’আর কাঁদে না বোন। এবার সব ঠিক হয়ে যাবে, ইন শা আল্লাহ!’
_’হবে। তবে এক বছর পর।’
_’আরে না।’
_’কিন্তু রায়..! ‘
এবার শীতলের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে সায়ন জবাব দিলো,
_’ওসব রায়ের গুষ্টি কিলাই।’
শীতল হাসল। চোখ মুছে সাম্য, সৃজনকে কাছে টেনে নিলো। হাসতে হাসতে ওদের ছোট্ট বুকে মাথা রেখে বলল,
_’লাল পেয়ারা গাছে পেয়ারা ধরে নি? ডাসা ডাসা হয়েছে কি? খবরদার ওদিকে ভুলেও তাকাবি না। খুব মারব কিন্তু!’
তার কথা শুনে পাজি দুটো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলল,
_’মিস ইউ আপু। তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরো। তোমাকে ছাড়া আমরা কেউ ভালো নেই। একটুও ভালো নেই।’
ছোটো ভাইদের কথায় শীতল তাদের হাতের উল্টো পিঠে চুমু খেলো। তারপর শুদ্ধকে দেখিয়ে হঠাৎ বলল,
_’বল তো ওইটা কে?’
ওর কথা শুনে সাম্য-সৃজন ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে রইল। শুদ্ধ ভাইকে শীতল আপু চিনতে পারছে না? কাঁদতে কাঁদতে সব ভুলে গেল নাকি? তারা উত্তর দিচ্ছে না দেখে শীতল তাড়া দিয়ে পুনরায় বলল,

_’কি রে বল?’
_’শুদ্ধ ভাইয়া।’
_’না, ওইটা আমার বর আর তোদের দুলাভাই। এবার বল কি ভাই?’
_’দুলাভাই।’
_’ঠিক। এই মুহূর্ত থেকে উনাকে গালভর্তি করে দুলাভাই ডাকবি। ভাইয়া না, দু..লা..ভা..ই” যখন যেটা ইচ্ছে করবে আবদার করবি, যতক্ষণ না দিবে ততক্ষণ মাটিতে শুয়ে গড়াগড়ি করবি, দরকার হলে তোদের দাবি না মানা পর্যন্ত পা ছাড়বি না, মনে থাকবে?’
শীতলের কথা শুনে বাকিরা মুখ টিপে হাসলেও সাম্য-সৃজন ভয়ে ভয়ে শুদ্ধর দিকে তাকাল। সায়ন, রুবাব ভাই হলেও একটা কথা ছিল। কিন্তু শুদ্ধ ভাইকে একটু ভয়ই লাগে। এদিকে শুদ্ধ নিশ্চুপ হয়ে দেখছে তার ব্যঙাচির দুষ্টুমি। কতদিন পর ওই ঠোঁটে দুষ্টু হাসি ফুটল। চোখে ভাসল তাকে জ্বালানোর প্রবণতা। এদিকে তাদের সময় শেষ। সুন্দর মুহূর্তগুলো কেন যে তাড়াতাড়ি চলে যায়? মনে হলো, দুটো কথা বলতে না বলতেই সময় ফুরিয়ে গেল। আরো কত কথা জমা থেকে গেল। অগত্যা বুকচাপা কষ্ট নিয়ে সবাইকে ছলছল চোখে বিদায় নিতে হলো। ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল তারা। শীতল শুদ্ধর দিকে একবার তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসল। কি চমৎকার সেই হাসি। হাসতে হাসতে তার গাল ভিজে গেল। এবারও শুদ্ধ নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইল, শীতল গেলে সেও চলে যাবে। শীতল দুই পা বাড়িয়ে দ্রুত ফিরে এলো। দরজার কাছে পাহারা দেওয়া পুলিশ, সিসি ক্যামেরা তোয়াক্কা করে শুদ্ধর বুকে ঝাপিয়ে পড়ল। পাহারাদার এতক্ষণ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে রুমের ভেতরে নজর রাখছিলেন। মূলত উনার কাজই এটা।
এতক্ষণ ধরে ভাই-বোনদের কান্না কিংবা এই মুহূর্তের ঘটনা কোনোটাই
উনার দৃষ্টিগোচর হলো না। খুব ভালো করে জানেন এদের ব্যাপারে তাই দৃষ্টি সরিয়ে নিলেন। কতদিন পর শীতল শুদ্ধর গলায় মুখ ডুবিয়ে জোরে জোরে শ্বাস টানল। বিরবির করে বলেই ফেলল,

_’ খুব মিস করি।’
শুদ্ধ তাকে আরো শক্ত করে বুকের ভেতর আগলে নিলো। মাথায় আদর আঁকল। তারপর শীতলের কথার ধার না ঘেঁষে বলল,
_’শুকনো খাবার আর ফলমূল এনেছি, একটাও যেন নষ্ট না হয়। আগেও বলেছি সুস্থ থাকতে হবে। নিজের যত্ন নিতে হবে। আমি কি বলছি কানে ঢুকছে? আরেকটা কথা, পেট ব্যথা করে? বা অন্য কোনো সমস্যা? ‘
শীতল না বোধক মাথা নাড়াল অর্থাৎ করে না। তারপর কয়েক সেকেন্ড
চুপ থেকে শীতল বলল,
_’আমার না ওই স্মেলটা খুব ভালো লাগে।’
_’কোন স্মেল?’
_’বেবিদের গায়ের স্মেল।’
শুদ্ধ নিশ্চুপ! বুঝতে বাকি রইল না তার কথার মানে। সে আরেকটু শক্ত করে বুকে জড়িয়ে নিয়ে বলল,
_’এবার যে যেতে হবে।’
_’সাবধানে যাবেন।’
_’হুম।’
_’আবার কবে আসবেন?’
_’রোজ আসা তো সম্ভব না। আগের মতোই শুক্রবার অবশ্যই আসবে।’
_’আচ্ছা।’

দুজনের কারোই পা উঠছিল না। ছেড়ে যেতে মন টানছিল না। খুব ইচ্ছে
করছিল সময় এখানেই থমকে যাক। কিন্তু সেটা তো আর সম্ভব না তাই দুজনকে দুই পথে পা বাড়াতে হলো। শুদ্ধ বাইরে এসে দেখে বাকিরা তার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে। শুদ্ধ আরেক জায়গায় যাবে তাই তাদের চলে যেতে বলল। সায়ন শুদ্ধকে একা ছাড়বে না অসুস্থ শরীরেই শুদ্ধর সঙ্গে যাওয়ার জন্য গাড়িতে চেপে বসল। অগত্যা রুবাব বাকিদের নিয়ে রওনা হলো আর শুদ্ধ অন্যপথ ধরল। কেন জানি সায়ন একেবারে নিশ্চুপ হয়ে গেছে। চোখের উপর একহাত রেখে চুপ করে বসে আছে৷ বিদায় মুহূর্তে শীতল কেমন মায়া মায়া চোখে তাকিয়ে ছিল। ছলছল চোখ দুটো যেন তাকে চিৎকার করে বলছিল, ‘আমাকেও নিয়ে যাও না ভাইয়া। আমিও বাড়ি যাব। আমার আম্মুর কাছে যাব। এখানে আমার ভালো লাগে না। তোমাদের ছাড়া সময় কাটে না। কষ্ট হয় আমার। খুব কান্না পায়।’ তখন চট করেই বুঝে গিয়েছিল বোনের চোখের ভাষা। চোখে ভাসছে আদুরে মুখখানা। শখ বরাবরই ঘরকুনো, লাজুক, না ডাকলে কাছও ঘেঁষে না।

তারমানে এই না সে ভাইদেরকে কম ভালোবাসে কিংবা ভাইয়েরও তাকে কম ভালোবাসে। আসলে শীতল তার মতো বাচাল তাই দুজনের জমতো বেশ। শীতলের মুখে ডাক হাক বেশি যার কারণে ওর প্রতি মায়াও একটু বেশি। এসব ভাবতে ভাবতে পুনরায় তার চোখজোড়া ভিজে উঠল। অশ্রু ঝরে গেল নিজের অজান্তেই। তখন শুদ্ধ গাড়ির হুইল ঘুরাতে ঘুরাতে মলিন হেসে বলল,
-‘একদিনে কাহিল হলে চলবে? আমার দিনগুলো তো এভাবেই কাটছে। এভাবেই তাকে দেখে আসি, বুকে পাথর চেপে একা রেখে আসি।’
একথা শুনে ​সায়ন আর নিজেকে সামলাতে পারল না। শুদ্ধকে জাপটে ধরে শব্দ করে কেঁদেই ফেলল। অতর্কিতে শুদ্ধ দ্রুত গাড়ির ব্রেক কষল। সায়নের তপ্ত চোখের জলে মুহূর্তে ভিজে উঠল শুদ্ধর কাঁধ। কেন জানি সায়নকে কাঁদতে দিলো শুদ্ধ। নিজে কাঁদতে না পারলেও ভাইকে কাঁদার সুযোগ দিলো। কিছুক্ষণ পর বলল,

_’ পার্টি অফিসে যাবে? ছেলেপুলেরা তোমার অপেক্ষায় আছে।’
_’না।’
_’ ঠিক আছে যেও না তবে মেয়েদের মতো ফ্যাচ ফ্যাচ করে কেঁদো না। শার্টটার কি অবস্থা করলে? বাচ্চার বাপ হতে যাচ্ছে তাও জড়াজড়ির স্বভাব যাচ্ছে না।’
ভাইয়ের কথা শুনে সায়ন মুখ তুলে কটমট করে তাকিয়ে রইল। তারপর কিছুক্ষণ চুপ থেকে নাকের সর্দি শুদ্ধর গায়ে মুছতে গেলে শুদ্ধ একদম সিটের সঙ্গে সিটিয়ে গেল। হুমকিও দিলো এ কাজ করলে খবর আছে।
তা দেখে সায়ন টিস্যুতে হাত-নাক মুছে বাইরে তাকিয়ে রইল। শুদ্ধ গাড়ি স্টার্ট দিলে কিছু একটা মনে হতেই সায়ন খেঁকিয়ে উঠে বলল,
—’কোন চুতিয়া আমার বোনকে এক বছরের রায় দিয়েছে? কোন যুক্তিতে দিয়েছে? নাম কি ওর? বালের আইন মারায় সে! ওর আইনকে কারেন্ট করে ওর পেছনেই লাগিয়ে দেব। কিসের এক বছরের জেল? কে থাকবে এক বছর? আমার বোন? কখনো না! এই কোর্টের রায় মানি না, হাইকোর্টে আপিল করব আমি।’

_’ আচ্ছা কোরো। আপাতত শান্ত হও।’
_’ আমার বোনটা কাঁদছে আর তুই শান্ত হতে বলছিস? বোন বাড়ি নাই, ওই বাড়িতে থাকব কি করে আমি? আমার নিঃশ্বাস যে আটকে আসছে ভাই।’
এবার শুদ্ধও বেশ শান্ত স্বরে জবাব দিলো,
_’আমারও দম আঁটকে আসে। তবুও তো বেঁচে আছি।’
_’হয় কিছু কর নয়তো আমি মাঠে নামলে সব তামা তামা করে ফেলব।’
একথা শুনে ভাইয়ের দিকে একপলক তাকাল শুদ্ধ। তারপর কিছুক্ষণ চুপ থেকে ধীরে কন্ঠে বলল,
_’ চিৎকার করে ক্ষমতার বড়াই আর বুদ্ধি খাটিয়ে জেতা এক জিনিস নয়, ভাইয়া। ইয়াসিরও ঠিক এ ভুলটাই করেছিল। ও ভেবেছিল ক্ষমতার দাপট দেখালে জজ ভয়ে কাঁপবে। ওর কথা মেনে শীতলের জামিন হবে। কিন্তু এগুলো কি এতই সোজা? হয়তো সোজা ভেবে ইয়াসির এরপরের ভুলটা করেছিল, জজকে সরাসরি খুনের হুমকি দিয়েছিল,উনার বোনের স্ক্যান্ডাল ভাইরালের ভয় দেখিয়েছিল। এমনকি ক্ষমতার দাপটে জজের প্রতিবন্ধী বাচ্চাটাকে আঁটকে রেখেছিল। সেদিন জজ হয়তো পরিবারের সম্মান আর বাচ্চার প্রাণের মায়ায় কেসটা অন্যকে হ্যান্ডওভার করেছিল । তারপর রায় ঘোষণার পর জানলাম বর্তমানের জজ আর আগের জন সম্পর্কে তারা কলিগের পাশাপাশি আপন ভায়রা ভাইও। ক্যালকুলেশন বুঝলে এবার? তোমার কি মনে হয় আদালতের কেস জজের টেবিলেই সীমাবদ্ধ থাকে? খাবার টেবিলে সেই প্রসঙ্গ উঠে না? অবশ্যই উঠে। এবং তারা নিরপেক্ষতার মুখোশে ঠিকই সুযোগে সৎ ব্যবহার করে। এখন ​সেই হিসেবে ইয়াসিরের ভুলের মাসুল শীতলকে দিতে হচ্ছে। এখন তুমি যদি চাও তাহলে তোমার ক্ষমতাও দেখাতে পারে। তাতে আমার বিন্দুমাত্রও আপত্তি নেই। দিনশেষে আমি তো আছিই এসব সামাল দেওয়ার জন্য।’

সায়ন জবাব দিলো না বরং একদৃষ্টিতে ভাইয়ের দিকেই তাকিয়ে রইল।
শুদ্ধর শেষের কথাখানায় অভিমান খুঁজে পেল। পরক্ষণেই তার দৃষ্টি নত হয়ে এলো। আর ভাবতে পারল না এসির ঠান্ডা বাতাসেও দরদর করে ঘামতে লাগল। তখন শুদ্ধ পুনরায় বলল,
_’ আমি থেমে নেই। হালও ছাড়ি নি। একটু ধৈর্য ধরো। এখন আবেগের বশে ভুল করা যাবে না। তোমার, আমার একটা ভুলে তীরে এসে তরী ডোবার মতো হবে। আর এর খেসারত দিতে হবে তোমার বোনকে।’
সায়ন একদম শান্ত হয়ে গেল। শুদ্ধ ভাইয়ের মনের অবস্থা বুঝে মুচকি হেসে জিজ্ঞাসা করল,
_’মন কি খুব বেশি খারাপ? তা আইসক্রিম কিনে দেব নাকি ফুল?’
_’চুমু।’
_’ছিঃ!’

শুদ্ধকে মুখ কুঁচকাতে দেখে সায়ন হেসে ফেলল। তারপর উকিলের সঙ্গে কথা বলে কিছু কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে দুই ভাই বাড়িতে ফিরল।
বাড়ি ফেরামাত্রই সাম্য-সৃজন শুদ্ধকে পানি এগিয়ে গেল। সঙ্গে শীতলের শিখিয়ে দেওয়া কথামতো প্রতিটা কথায় ‘দুলাভাই’ ডাকটা যুক্ত করল। শুদ্ধ ভ্রুজোড়া কুচকালে পাঁজি দুটো দূরে দাঁড়িয়ে খিলখিল করে হাসতে লাগল। কাছে ডাকলেও এলো না। সারাদিনে যতবারই শুদ্ধর সঙ্গে দেখা হলো ততবারই দুলাভাই ডেকে কান ঝালাপালা করতে লাগল। এই নিয়ে বড়রা না চাইতেও হেসে ফেললেন। অনেকদিন পর, কিছু মুহূর্তের জন্য চ বাড়ির ড্রয়িংরুমে তাদের কিচিরমিচির শোনা গেল। শুদ্ধ আর দাঁড়াল না
রুমে গিয়ে ফ্রেশ না হয়ে শুয়ে পড়ল। তারপর বুকের বাঁ পাশে হাত রেখে একা একাই বিরবির করে
_’আমারও ভালো লাগে.. ভীষণ ভালো লাগে..বেবিদের গায়ের স্মেল।’

পরেরদিন সকালবেলা,
সকালের নাস্তা সেরে আজমের সঙ্গে পার্টি অফিস এসেছে সায়ন। ভীষণ কষ্ট হয়েছে হাঁটতে তবুও এসেছে। তাকে দেখে দলের ছেলেরা যেন হাতে চাঁদ পেয়েছে। কত গল্প হলো। হাসাহাসি হলো। পূর্বের ফূর্তিবাজ ভাইকে পেয়ে তারাও ভীষণ খুশি হলো। জোর গলায় বলল মেয়র পদ শাহরিয়ার
ভাইয়ের জন্য বরাদ্দ। এই শহরের রাজা হয়ে দাপিয়ে বেড়াবে শাহরিয়ার ভাই। ভাইকে মেয়রের আসনে দেখা তাদের কত দিনের স্বপ্ন। অবশেষে তাদের স্বপ্ন সত্যি হতে যাচ্ছে। এবং আবদার জুটে বসল নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরপরই বিদেশী ব্যান্ডের কিছু টেস্ট করাতে হবে। সায়ন গালি দিলে তারা বেহায়ার মতো হেসে উঠল। কথায় কথায় আরো শুনল তার অনুপস্থিতিতে শুদ্ধর কথামতো নাকি প্রচার চালিয়ে গেছে। জনগনকে তাদের দলে টানতে অনেককিছুই করেছে। সব মিলিয়ে জনগন তাদের সাপোর্টে। তার জয় নিশ্চিত। আবু সিদ্দিকও ভয়ে গা ঢাকা দিয়েছে। তার হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। রবিও একটু কাবু হয়েছে আগের মতো দাপটে চলে না। সব শুনে সায়ন হাসল। তারপর আরো কিছুক্ষণ সেখানে থেকে আজমকে নিয়ে কোথায় যেন গেল। কোথায় গিয়েছিল কাউকে বলে নি। তবে শুদ্ধর কাছে ঠিকই খবর চলে এলো যে, সায়ন নিজে গিয়ে নির্বাচন বাতিল করার আবেদনপত্র জমা দিয়ে এসেছে। সে রাজনীতি করবে না আর না করবে নির্বাচন। শেষ মুহূর্তে এসেও আবেদনপত্র যেন মঞ্জুর হয় তাই হসপিটালের রিপোর্ট জমা দিয়েছে। হঠাৎ একাজ কেন করল? কি ভেবে করল? মেয়র হওয়া ভাইয়ের স্বপ্ন ভেবে নিজে এতদিন খেটেছিল। এত ঝড় ঝাপ্টার মাঝেও তাকে কেউ দমিয়ে রাখতে পারে নি।

শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৯২

বিপক্ষ কারো হুমকিতে পিছিয়ে যায় নি। ভয় পায় নি। তবে জেদ ধরে রেখেছিল যে আসনের জন্য ভাইয়ের রক্ত ঝরেছে সেই আসনই দখল করবে। সেই ভাইকে বসিয়ে তারপর দম ছাড়বে।
অথচ ভাই এসেই কী না এমন একটা সিদ্ধান্ত নিলো। একবার জানানোর প্রয়োজনও মনে করল না। এতদিনের করা সব কষ্ট বিফলে গেল। তাই শুদ্ধও সিদ্ধান্ত নিলো সায়ন না বললে সেও আগ বাড়িয়ে কিছু বলবে না।

শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৯৪

23 COMMENTS

  1. সুন্দর পাঠ☺️☺️
    পরের টা তাড়াতাড়ি দিও আপু প্লিজ 🙏🙏🙏

  2. Apu asole golpota ektu taratari dile valo hoito, tomar deoar speed dekhe to mone hoitase na ei jibone golpota poira ses koira morte parbo.

  3. Didi khub sundor hoyeche💗 kintu tumi plz ektu taratari uploaded koro golpo er part gulo ami onek din diye tomar lekha golpo pori ar amr khub valo lage.Love from India🇮🇳

  4. আপনার লেখা পড়তে খুব ভালো লাগছে 🫶🏻.. Thank you তাড়াতাড়ি part গুলো দেওয়ার জন্য.. 🥰love you আলো আপু.. Ur reader from india.. 🫶🏻

  5. আপু পরের পর্ব দেন 😞🫩 দেরি করেন কেন আর কয়টা পর্ব বাকি 🫩🤔❤️🥰 সুন্দর হয়েছে পর্ব টা আর কতদিন এই উপন্যাস টা শেষ হতে 🤔😐😑🫩🙂

  6. আপনি কি গল্প টা শেষ করতে চাইছেন না?? এত পাঠিকা এই গল্পের আসায় বসে থাকে অপেক্ষা করে.. আপনি লেখক তো কোনো প্রবলেম থাকলে এত পাঠিকা দের জন্য রিপ্লাই করুন কিন্তু সবাই কে avoid কেনো করেন?? আর আপনি এই উপন্যাস অনেক দিন থেকেই শুরু করেছেন.. ডেইলি আপডেট দিলে গল্পের আগ্রহ বেড়ে যায়.. কিন্তু এত লেট করলে তো সবাই চরিত্র গুলোই ভুলতে শুরু করবে… এই উপন্যাস আমার অনেক প্রিয়.. 1 মাস ও হয়নি এটা পড়েছি কিন্তু অল্প সময়েই এত তা চলে এসেছি… শেষে একটা কথাই বলব গল্প টা একটু তাড়াতাড়ি দেবেন আর আপনার কোনো প্রবলেম হলেও সেটা একটু কমেন্ট করবেন..
    সরি দিদি ভাই আপনার যদি খারাপ লেগে থাকে তার জন্য extremely sorry কিছু মনে করবেন না আমার যা মনে হল সেটাই বলেছি.. কারোর যদি খারাপ লেগে থাকে তার জন্য দুঃখিত 🙏🙂

  7. Apu ato deri kore part dile golpo porar interest p kome jay
    Sei 19 tarikh er por theke wait kortesi apu

Comments are closed.