Home শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ শেষ পর্ব

শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ শেষ পর্ব

শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ শেষ পর্ব
নূরজাহান আক্তার আলো

রাতের গাঢ় অন্ধকার তখন ফিকে হয়ে এসেছে। পূর্বাকাশে ফুটতে শুরু করেছে রুপালি আলোর রেখা। প্রকৃতি তখনো পুরোপুরি জেগে ওঠেনি।
চারদিক স্তব্ধ। ঘুমে তলিয়ে আছে শহরবাসী। তখন প্রকৃতির নিস্তব্ধতা ভেঙে ফরজের আজানের ধ্বনি শোনা গেল—‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার। আস-সালাতু খাইরুম মিনান নাউম।’ এভাবেই পুরো আজান
শেষ হলো। জানালার গ্রিলে মাথা ঠেকিয়ে বুকে শাহাদত চৌধুরীর ছবি আঁকড়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছেন সিমিন। এতক্ষণ চোখবন্ধ করে আজানের জবাব দিচ্ছিলেন। আজানের জবাব কীভাবে দিতে হয় সেটাও শাহাদত চৌধুরীর কাছ থেকে শিখেছিলেন। গল্পে গল্পে অনেক কিছুই শেখাতেন তিনি। ভিডিও কল দিয়ে কাপড় গোছাতে গোছাতে দুজন মিলে গল্পের ঝুলি খুলে বসতেন। বাড়ির ছেলে-মেয়েরা কে, কী কী দুষ্টুমি করল, কে ব্যথা পেয়েছে, কার জ্বর এসেছে, কে ঠিকঠাক মতো ঘুমাচ্ছে না, খাচ্ছে না, সব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বলতেন। মেয়েরা অকারণে জেদ করে। শীতলটা একদমই পড়াশোনা করতে চায় না এমন কতশত অভিযোগ জানাতেন। মন খারাপ হলে ভিডিও কল দিয়ে মানুষটার দিকে তাকিয়ে থাকতেন। উনাকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে শাহাদত চৌধুরী চট করে বুঝেও যেতেন সহধর্মিণীর মন খারাপ। তখন সুন্দর করে হেসে বলতেন,

_’আমার বেগমজানের মুখে মেঘ জমেছে কেন? বর্ষণ কি আজ নামবে?’
_’তোমার যাওয়ার কতদিন হলো?’
এই এক বাক্যেই সহধর্মিণীর মনের অবস্থা বুঝে যেতেন। মন খারাপের কারণটা যে উনার বুঝতে বেগ পেতে হতো না। তখন হাসাতেন। মেয়েদের সাহায্যে সারপ্রাইজ গিফট দিতেন। মাঝেমধ্যে এমন এমন কাজ করতেন সবার সামনে লজ্জায় পড়তে হতো। এ নিয়ে রাগও হতো, হাসিও পেতো।
একবার ঝগড়া করে সারাদিন ফোন বন্ধ করে রেখেছিলেন। পরে ফোনে না পেয়ে শুদ্ধকে দিয়ে একশো একটা লাল গোলাপ কিনিয়ে ‘সরি’ লেখা চিরকুট পাঠিয়েছিলেন। মধ্যরাতে শুদ্ধ গোলাপের তোড়াটা দিতে দিতে বলেছিল,

_’তোমার ছোটো মানুষটা ভুল করেছে এবারের মতো মাফ করে দাও। ফোন অন করো। নয়তো মেজর সাহেব হাত-পা ছড়িয়ে কাঁদার প্রস্তুতি নিচ্ছে।’
শুদ্ধর কথা শুনে লজ্জায় তিনদিন ছেলেটার সামনেই যেতে পারেননি।
তবে যতই ঝগড়া হোক একদিনের বেশি কথা না বলে থাকতে পারতেন না কেউ। শাহাদত আদুরে সুরে কথা বললেই এক নিমিষে মন খারাপের রেশ মুছে যেতো। তখন পেটের কথা হড়হড় করে উগলে দিতেন। এখন কথা বলার মানুষটি আর নেই। পেটের কথা উগলাতে বুকটাও ভার হয়ে আসে। চোখ ছাপিয়ে অশ্রু ঝরে কিন্তু বলতে পারেন না। কারণ কথারসঙ্গী
হারিয়ে গেছে। হারিয়ে গেছে উনার ভালোবাসার মানুষটিও। আজকাল রাতে ঘুম আসেনা। রাত জেগে বসে থাকেন নয়তো কোরআন পড়েন।
উনি আজকে অপেক্ষা করছেন নতুন এক সকালের। যে সকালে উনার কলিজার টুকরো বাড়ি ফিরবে। আম্মু! আম্মু! করে ডেকে বুকে ঝাঁপিয়ে পড়বে। আবার আগের মতো নানান বায়না ধরে অতিষ্ঠ করে তুলবে। হঠাৎ উনার খেয়াল হলো আজান থেমে গেছে। নামাজের সময়ও চলে চলে যাচ্ছে। উনি তড়িঘড়ি ওয়াশরুমে ছুটলেন। তারপর অজু করে এসে শান্ত মনে নামাজে দাঁড়িয়ে গেলেন।

ফজরের আজানের পর শুদ্ধ রেডি হয়ে পার্কিং লটে এসে দাঁড়াল। তার পরনে সাদা শার্ট আর কালো প্যান্ট। পাশাপাশি গাড়ি আর বাইক পার্ক করা। সে আজ গাড়ি না নিয়ে বাইক নিয়ে হেঁটে হেঁটে গেটের কাছে গেল। বাইকের শব্দ সায়নের কানে গেলে জেগে যেতে পারে। অন্ধকার থাকতে বের হচ্ছে দেখে নিশ্চিত চেঁচামেচিও শুরু করবে। তারপর তার সঙ্গে না পেরে নিজে বাইকে চেপে বসতে পারে। তারই তো ভাই, হাড়ে হাড়ে চিনে সে। তাই একেবারে গেটের বাইরে এসে বাইক স্টার্ট করল শুদ্ধ। তারপর মসজিদে গিয়ে নামাজ আদায় করে গেল গোরস্তানের দিকে। সেখানে শাহাদত চৌধুরীর কবর জিয়ারত করে সদ্য জন্মানো কিছু ঘাস উপড়ে ফেলল। দু’একটা শুকনো আমপাতা পড়েছিল সেটাও সরিয়ে ফেলল।

তারপর রওনা হলো কেন্দ্রের দিকে। তখন ভোরের আলো কেবল ফুটতে শুরু করেছে। সূচনা হচ্ছে নতুন এক দিনের। আজ নবর্বষ। রাস্তায় মানুষ গিজগিজ করবে। যানজট বাঁধবে। জ্যামে আটকানোর ভয়ে সে সকাল সকাল বেরিয়েছে। যদিও এটা অজুহাতমাত্র। আসলে রুমে মন টিঁকছিল না। বাড়িতে ভালো লাগছিল না। ধৈর্য্যে কুলাচ্ছে না। তাছাড়া যাবেই তো একটু আগে গেলে ক্ষতি কি? মনে মনে এসব ভেবে গতি বাড়িয়ে বাইক চালাতে লাগল। ফাঁকা রাস্তা টাইম বেশি লাগবে না। ঘড়িতে যখন ছয়টা তখন সায়নের নাম্বার থেকে কল এলো। সে বাইক থামিয়ে কল রিসিভ করে জানাল রওনা দিয়েছে। সে একা যাচ্ছে দেখে বকাবকি করে কল কাটল। জানাল সেও আসবে কিন্তু শুদ্ধ বারণ করল। কি দরকার ভাঙা পা নিয়ে ছুটে আসার? অতঃপর এক বুক আশা নিয়ে কেন্দ্রে পৌঁছাল শুদ্ধ। ঘড়িতে তখন সকাল সাড়ে সাতটা। অথচ কেন্দ্রের কার্যক্রম শুরু হয় সকাল নয় টায়। শুক্র, শনিসহ সরকারী ছুটির দিন কেন্দ্র বন্ধ থাকে। সচারাচর স্পেশাল পারসোন ছাড়া সরকারী ছুটির দিনগুলোতে কোনো বন্দিকে মুক্তি দেওয়া হয় না। তবে শীতলকে দেওয়া হচ্ছে কারণ সময় মতো তার কাগজপত্র জমা এবং সব ঠিকঠাক থাকায় তা সম্ভব হয়েছে। আর এটাকে সম্ভব করেছে ইফতেখার নাবিল। এজন্য শুদ্ধ উনার প্রতি কৃতজ্ঞ। আজ সম্ভবত ইফতেখার নাবিল উপস্থিত থাকবেন না। ছুটির দিন হলেও দু’একজন অফিসার কেন্দ্রে থাকেন। আর উনাদের সঙ্গে গত রাতেই ইফতেখার নাবিল কথা সেরে রেখেছে৷ জানিয়েছেন ফর্মালিটিজ গতরাতেই সম্পূর্ণ করা হয়েছে। বের হওয়ার সময় যেন তাদের হেনোস্তা করা না হয়। যে কাজ বাকি রয়েছে দ্রুত সেরে যেন ছেড়ে দেওয়া হয়।শুদ্ধ কেন্দ্রের বাইরে বাইকের ওপর বসে আছে। মাথা ব্যথায় চোখ তুলে তাকাতে পারছেনা, তাই কিছু খেয়ে মেডিসিন নিলো।

গায়ে জ্বর আসার পূর্বাভাস। ঘড়ির কাটা ঘুরে সাতটা, আটটা, নয়টা, দশটা বেজে দশটা মিনিটে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি পেল সে। রাগে শরীরখানা জ্বললেও নীরবে সয়ে নিলো। আর কিছুক্ষণই তো! অতঃপর শুদ্ধকে বসিয়ে রেখে শীতলকে আনার জন্য একজন মহিলা পুলিশ পাঠানো হলো। সেই যে গেল ফেরার নাম নেই। ওদিকে মুক্তির আগে জেলের দায়িত্বে থাকা এক চিকিৎসক শীতলের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করলেন। শারীরিকভাবে সুস্থ কি না বা তার শরীরের আঘাতের চিহ্ন আছে কি না, সেটা নোট করে নিলেন। যাতে বের হওয়ার পর বাড়ির লোক আঙুল তুলতে না পারে। শীতলকে যেদিন গ্রেফতার করা হয় সেদিন পরনে ছিল কলেজড্রেস। মাথায় সাদা হিজাব থাকলেও কানে, গলায়, হাতে ছিল বাড়িতে পরা সাধারণ গয়না। একটি প্রাপ্তি স্বীকার রসিদে স্বাক্ষর নিয়ে সেসবও ফেরত দেওয়া হলো। বন্দির পোশাক বদলে শুদ্ধর আনা পোশাক পরতে বলা হলো। সেসব নিয়ে শীতল নিজেকে পূর্বের সাজে সাজালো। এরপর মহিলা পুলিশের সঙ্গে ধীরে ধীরে অফিসরুমে এসে দাঁড়াল। তার উপস্থিতি বুঝে শুদ্ধ তাকাতেই দুজনের চোখাচোখি হলো। কেউ দৃষ্টি সরালো না। বরং চোখে চোখ রেখে একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল। দুজনের চোখের কোণে জল জমল। ঠোঁটে ফুটল এক চিলতে প্রাপ্তির হাসি। শীতলের পরনে তার দেওয়া গোলাপি রঙের গোল জামা সঙ্গে সাদা সালোয়ার আর ওড়না।

চুলের লম্বা বেনুনি সামনে এনে রাখা। কানে ছোট স্বর্ণের দুল, গলায় চেন আর হাতের আঙুলে তার দেওয়া রিং। পায়ে একজোড়া ঝুনঝুটি ছাড়া চিকন নুপুর। অবশ্য গোলগাল আদুরে মুখখানা শুকিয়ে গেছে। চোখের নিচে কালি। তবে শুদ্ধর কাছে খুব আদুরে লাগছে। এইতো তার ব্যাঙাচি।
এভাবেই তো সাজতো তার শীতল। এই সাজ, এই মুখ, এই চাহনি, এই হাসি সব তার চেনা। খুব আপন। এসবেই তো তার ভালো থাকা লুকিয়ে আছে। আগে এই ছোট্ট শরীরটাকে বুক জড়িয়ে নিজে শান্ত হতো। শান্তি পেতো।
এদিকের সব কাজ শেষ। চূড়ান্ত রেজিস্ট্রারে সাক্ষর করে শীতল শুদ্ধর সঙ্গে বেরিয়ে এলো। লোহার গেটের বাইরে এসে মেয়েটা প্রাণ ভরে শ্বাস নিলো। মুক্তির স্বাদ অন্যরকম। একটা অন্যরকম আনন্দ। কখনো পাখি পুষবেনা সে। বন্দি জীবন ভীষণ কষ্টের। এতটাই কষ্টে যে ভাষায় প্রকার করার মতো না। শীতল কোনো কথা না বলে চুপচাপ শুদ্ধর দিকে তাকিয়ে রইল। শুদ্ধ বাইকের ওপর বসে শীতলের দিকে তাকাল। এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে সে কিছু না বললেও শীতল বলল,

_’আপনার চোখের পাতা ফোলা কেন?’
_’কই?’
_’ কথা লুকাবেন না। কিছু হয়েছে? কেউ কিছু বলেছে?’
_’ কে কি বলবে?’
_’সেটাই তো জানতে চাচ্ছি।’
শুদ্ধ শীতলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তার ব্যাঙাচি কি চালাক হয়ে গেল নাকি? এত চালাক হলে তো সমস্যা। নিজেকে লুকিয়ে রাখা কষ্ট হয়ে যাবে। তাই খ্যাকঁ করে বলল,
_’ কিসব ভুলভাল দেখিস? এজন্যই বেশি বেশি করে মাছ খেতে বলি।’
_’আসতে দেরি হলো যে? অপেক্ষা করছিলাম। রাতেও ঘুমাতে পারিনি।’
_’কেন পারেননি?’
শীতল জবাব দিলো না। এমন ভাব করছে যেন কিচ্ছুটি জানে না। শুদ্ধ বুঝেও না বোঝার ভাণ করে এক ভ্রু উঁচু করে প্রশ্ন ছুঁড়ল,

_’আমার কাছে আসার জন্য? এত্ত তাড়া?’
_’ আমার বয়েই গেছে আপনার কাছে যেতে। বাড়ি যাব তাই।”
_’ ওহ, আমি ভেবেছিলাম কেউ আমার জন্য ব্যাকুল। কি আর করার। বাড়ি যাওয়া বলে কথা, তাই তো? উবার কল করে দিচ্ছি উবারে চলে যান।”
একথা শুনে শীতল তড়িঘড়ি বাইকের পেছনে বসল। বসাটা বোধহয় একটু জোরেই হয়ে গেছে। দুলে উঠল বাইক। ঠোঁট কামড়ে হাসল শুদ্ধ।
তারপর বাইক স্টার্ট করল সে। বউটাকে একটু জড়িয়ে ধরবে দারোয়ান এদিকেই ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে আছে। যেন গরীবের সিনেমা চলছে।
বাইকের গতি বাড়াতে পাগলাটে সমীরণ এসে ছুঁয়ে গেল তাদের শরীর।বাতাসের দাপটে উড়তে লাগল শীতলের চুল আর ওড়না। শীতল হঠাৎ আলতো করে শুদ্ধর পিঠে গাল ঠেকাল। চোখ বুজে মনভরে শ্বাস টানতে লাগল। কতদিন পর! সে চোখ বন্ধ করে শুদ্ধর পিঠে মাথা ঠেকিয়ে বসে রইল। আজ পহেলা বৈশাখ। পুরো শহর রঙে ঢঙে সেজেছে। চারদিকে মানুষের ভিড়। বেশিরভাগ মানুষের পরনে লাল-সাদা রঙের পোশাক। রাস্তার মোড়ে মোড়ে সাউন্ড বক্সে বাজছে নববর্ষের গান। কোথাও ঢাক ঢোলের শব্দ। আরেকটু এগোতেই বিশাল বড় মাঠে মেলা বসতে দেখা গেল। কত কিছু নিয়ে বসেছে সেই মেলা, কত জিনিস, কত প্রকারের সব জিনিস। খাবারের দোকানগুলোতেও প্রচুর ভিড়। এখন যা আছে; আছে তবে বিকেলে মেলা আরো জমজমাট হবে। তখন শুদ্ধ বাইকের গতিটা একটু কমিয়ে বলল,

-‘নামবি?’
_’না, বাড়ি যাব।”
_’শরীর খারাপ করছে?’
_’শান্তি লাগছে।’
থমকে গেল শুদ্ধ। মিররের দিকে একবার তাকাল। তারপর পুনরায় বলল,
_’আমি পকেট ফাঁকা করতে প্রস্তুত, বাইক থামাই?’
-‘বিকেলে আসব।’
_’আলতা, চুড়ি, আরো কিসব কিসব লাগবে না?’
_’পরে নেব।’
_’কিছু খেতে খেতে যাই?’
_’বাড়ি যাব।’

শুদ্ধ কথা বাড়াল না বাইকের গতি বাড়িয়ে দিলো। তাতে শীতলও আরও শক্ত করে শুদ্ধকে আঁকড়ে ধরল। পিঠে মাথা ঠেকিয়ে চোখ বুজে নিশ্চুপ হয়ে রইল। মানুষটাকে ছুঁয়েও যেন শান্তি। চোখের পানিতে শুদ্ধর শার্টের কিছু অংশ ভিজে গেছে। সেটা অনুভব হতেই শুদ্ধ হঠাৎ একহাত বাড়িয়ে দিলে শীতল সেটা খপ করে ধরল। দেহে প্রাণ থাকাকালীন শুদ্ধ যতবার, যতভাবে তার দিকে হাত বাড়াবে সেও ততবার, ততভাবেই সাড়া দেবে। এভাবে চলতে চলতে বাইকটা পাড়ার মোড় ক্রস করতেই সামনে পড়ল তাদের পারিবারিক কবরস্থান। যেখানে চিরনিদ্রায় ঘুমিয়ে আছেন তার বাবা। শীতল ছটফটিয়ে উঠলে শুদ্ধ বাইক থামাল। মাটিতে ধাপ রাখার আগে ঝরঝরিয়ে অশ্রু ঝরে গেল। দুজনই নামল। বাইরে দাঁড়িয়েই শুদ্ধ শাহাদত চৌধুরী কবরখানা দেখাল। এটা কেমন মুহূর্ত, সে আছে, পুরো পৃথিবীর আছে, বাবার নাম আছে, পরিচয় আছে অথচ বাবাটাই নেই।
শীতল অশ্রভেজা ঝপসা দুই চোখে তাকিয়ে করুণ সুরে বিড়বিড় করল, ‘ -বাবা! ওহ বাবা! এই দেখো..আমি এসেছি।’

ওপরপাশ থেকে সাড়া পেল না। সাড়া দেওয়ার পথ যে চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে। এখানে দাঁড়িয়ে থাকলে কাঁদতেই থাকবে তাই শুদ্ধ আবার পরে আসবে বলে বাইকে উঠে বসল। আফসোসে বুক ফেটে গেল শীতলের। বাবা জীবিত থাকলে বুকে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারত। মৃত বলে কাছে যেতে পারছে না। মেয়ে বলে সৃষ্টিকর্তা কবর জিয়ারত করার সুযোগও দেননি।
তাতে কি? জায়নামাজে বসে বাবার জন্য মনখুলে দোয়া করবে। মেয়ের দোয়া নিশ্চয়ই বাবার কাছে পৌঁছে যাবে। তারপর চোখ মুছতে মুছতেই পুনরায় বাইকে উঠে বসল। আর একটু সামনে এগোতেই চৌধুরী বাড়ির মূল ফটক দেখা গেল। আর একটু এগিয়ে হর্ণ বাজাতেই দারোয়ান চাচা গেট খুলে দিলেন। শীতল বাইক থেকে নেমে উনার সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলল। শুদ্ধ ততক্ষণে বাইক থামিয়ে বাগান বরাবর দাঁড়িয়ে আছে। সে কথা শেষ করে শুদ্ধর পাশে দাঁড়াতেই শুদ্ধ বাগানের দিকে হাঁটা ধরল। তা দেখে শীতল বলল,
_’বাগানে ঢুকছেন কেন? রোদ চড়ে গেছে ভেতরে চলুন।’
_’আয়।’

তাকে ডেকে ছোট্ট কবরখানার পাশে দাঁড়াল শুদ্ধ। শীতলও গিয়ে তার পাশে দাঁড়াল। শুদ্ধর দৃষ্টি অনুসরণ করে নিচে তাকিয়ে তড়িৎ গতিতে ঘাড় ঘুরালো শুদ্ধর দিকে। শুদ্ধ সম্মতি সূচক মাথা নাড়াতেই শীতল ধপ করে বসে পড়ল। সে তো ভেবেছিল তার অংশ ড্রেনে ঠাঁই পেয়েছে। ভ্রুণ বলে কেউ দেখেনি। হেলায় ফেলায় কোথায় না কোথায় হারিয়ে গেছে। কিন্তু শুদ্ধ এত যত্ন করে স্থান দিয়েছে দেখে হাসল সে। চোখের পানিতে ঝাপসা দেখছে। তবুও কান্নারা বাঁধ মানছে না। সে পরম মমতায় মাটির বুকে হাত বুলিয়ে দিল। যেন মাটিকে না নিজের সন্তানের মাথায় বুলিয়ে দিচ্ছে। কান্নায় কণ্ঠস্বর বুজে এসেছে। সে ঢোক গিলল। বুকটা ফেটে যাচ্ছে। দম আটকে আটকে আসছে। কী বলে ডাকবে? কোন সম্বোধনে মানাবে? নাম দেওয়ার আগেই তো হারিয়ে গেল। যদি বেঁচে থাকত বুকে জড়িয়ে নিয়ে কত আদুরে নামেই না ডাকত। কিন্তু কপাল! বাবাও নেই, সন্তান নেই, একেবারে শূন্য হাতে ফিরতে হলো। তবুও সে ফিসফিসিয়ে ডাকল, ”জানপাখি!” আর একটা শব্দ উচ্চারণ করতে পারল না শীতল। বুকের ভেতর ভেঙে আসছে। কত দামি জিনিসটা হারিয়েছে সে। আল্লাহ দিলে তারা হয়তো আবার বাবা-মা হতে পারবে। আরেকজন এসে কোল বুক ঠান্ডা করবে কিন্তু যাকে হারিয়েছে তাকে কি ভুলতে পারবে? পারবে না। প্রথম সন্তানের প্রতি সবার আবেগটা একটু অন্যরকম হয়। কাঁদতে কাঁদতে শীতলের নজর পড়ল পাশের আরেকটা কবরের দিকে। এখানে তো কারো কবর ছিল না। তার বাবার তো না। দেখে বড় মানুষের কবর মনে হচ্ছে। তারমানে তার অনুপস্থিতে আবারও কাউকে হারিয়েছে সে? এখন তাকে আরেকজন বিয়োগের কথা শুনতে হবে? তার কি হারানোর মৌসুম শেষ হয়নি? তার জীবন চৈত্রময় কেন? চৈত্রের খরায় জীবনের সুখগুলো কবেই হারিয়েছে। আর কত? আর কি হারানো বাকি তার? কি কি হারালে চৈত্রের বিদায় হবে? এতকিছু কেড়ে নেওয়ার পর কি চৈত্রের পেট ভরছে না? তার বেহাল অবস্থা দেখে মন ভরছে না? সে কান্নাভেজা লালবর্ণ চোখে তাকাতেই শুদ্ধ একদম স্বাভাবিকভাবে জবাব দিলো,

_’ইয়াসির।”
_’কিহ্!’
শীতলের চোখে-মুখে একরাশ বিষ্ময় খেলে গেল। হতবাক হয়ে বড়সড় কবরখানার দিকে তাকিয়ে রইল। নীল চোখওয়ালা মারা গেছে? কবে? ক্রসফায়ারের আদেশ জারি ছিল তার। তবে কি ক্রসফায়ারে মারা গেছে? সে থেমে থেমে জিজ্ঞাসা করল,
_”ক্রসফায়ার?”
_”সুইসাইড।”
শীতলের বিষ্ময়ের মাত্রা দ্বিগুন বাড়ল। চোখের সামনে ভাসতে লাগল অপূর্ব সুন্দর একজোড়া নীলচোখ। কানে বাজতে লাগল, ‘বাবুই’ ডাকটা।

বাকহারা হয়ে গেল শীতল। অন্যের জীবন থেকে সুখ ছিনিয়ে নেওয়া ওই মানুষটা সুইসাইড করেছে? কেন? অন্যের জীবন নিয়ে খেলতে খেলতে বোর হয়ে গেছে? মুড উঠে গেছে? এজন্য নিজের জীবনটাকেও খেলনা ভেবেছিল নাকি? কেন জানি হাসি পেল তার। হাসতে হাসতে ইয়াসিরের কবরের দিকে তাকিয়ে বলল,
-“আমার জীবনে একটু জায়গা দিইনি বলে আমার সন্তানের পাশে শুয়ে পড়লেন? এত জেদ কেন আপনার? এত লোভী কেন আপনি? প্রথমে আমার সুখটুকু কেড়ে নিলেন। আমার বান্ধবীকে কেড়ে নিলেন। আমার ভালোবাসার মানুষগুলোর ক্ষতি করলেন। তারপর যখন দেখলেন আমি সন্তান হারিয়ে পাগলপ্রায় তখন আমাকে ভালোবাসার দোহায় নিজেই মরে গেলেন? ঘুরে ফিরে সবার চোখে আমাকে অপরাধী করলেন। এটা কেমন শাস্তি দিলেন আমায়? আমাকে ভালোবেসে আপনি মরেছেন-এই অপরাধবোধ থেকে আপনাকে ঘৃণা করব কীভাবে আমি? নাকি এটা ​ভেবেছেন আমার বাচ্চার পাশে শুয়ে থাকলেই সব পাপ মুছে যাবে? সব ভুলে যাব আমি? এই সুযোগে যত্ন-আত্তি আদায়ের পায়তারা এঁটেছেন? এত কুচুটিয়া বুদ্ধি পান কোথা থেকে? আমি পারব না আপনার কবরের যত্ন নিতে। পারব না, কবরের পাশে গাছ লাগিয়ে কবর গাছের ছায়াতলে রাখতে। কেন রাখব, হুম? আমি কিন্তু কিচ্ছুটি ভুলিনি, ইয়াসির খান! কোনোদিন ভুলবও না। সবসময়, সব জায়গায় জোর খাঁটিয়ে নিজের জায়গা দখল করতেই হবে আপনাকে? করবেনই তো, আপনি বরাবরই লোভী, পাপী, বদলোক একটা! এতদিন বেঁচে থাকতে আমার সুখ সহ্য হয়নি এখন মরে গিয়েও শান্তি দিলেন না। ভিলেন! সারাজীবন ভিলেনই থেকে গেলেন।”

একথা বলে শীতল উঠে দাঁড়াল। দুই হাতে চোখ মুছে শুদ্ধর হাত আকড়ে ধরে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল। কি ভেবে আরেকবার পেছনে ফিরে মনে মনে বলল,
_’আমি আপনাকে ভালোবাসার আশ্বাস দেইনি। ভালোও বাসিনি। যখন যা করেছেন নিজের ইচ্ছায় করেছেন। তাই চাওয়া-না পাওয়ার খেলায় আমাকে টানবেন না। আমি শুরু থেকে যার থেকে ভালোবাসা শিখেছি। তাকেই মন প্রাণ উজাড় করে ভালোবেসেছি।’
একথা বলে আর দাঁড়াল না। শুদ্ধর বাহু আঁকড়ে ধরে সামনে এগোতে লাগল। শুদ্ধ এতক্ষণ চুপ করে থাকলেও হঠাৎ একটা প্রশ্নে ছুঁড়ে দিল,
_’যদি প্রশ্ন করি ‘তাকে ভালোবাসলি না কেন?’। তার তো মেয়ে পাগল করা নীল চোখ ছিল। অবৈধ টাকার পাহাড় ছিল। তোকে নাকি ভীষণ ভালোওবেসেছিল। এতোই ভালোবাসা বেসেছিল যে না পেয়ে মরেই গেল। আমি তো কখনো এত ভালোবাসতে পারব না। বিরহে মরে গিয়ে দুনিয়া কাঁপানো প্রেমের ইতিহাস রচনাও করব না। তবে?’
শীতল এবার না চাইতেও হেসে ফেলল। শুদ্ধর বাহুতে মাথা রেখে হাঁটতে হাঁটতে বলল,
_’সমুদ্রের নীল জলের দিকে তাকালে মন জুড়িয়ে যায়। বুকে শান্তি নেমে আসে। কিন্তু যে জল মনকে শান্ত করে-তা কিন্তু তৃষ্ণা মেটাতে পারে না। তার লবণাক্ত স্বাদ পান করার যোগ্য না। বরং জোর করে পান করলে নিজেরই ক্ষতি।’

একথা শুনে শুদ্ধ হাঁটা থামিয়ে দিলো। শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল পাশে দাঁড়ানো শীতলের মুখপানে। তবে মুখে আর কিছু বলল না। তবে শীতল
সিমিনকে ডাকতে ডাকতে দৌড়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকে পুনরায় একছুটে
ফিরে এলো। এভাবে আসায় শুদ্ধর বুকে সজোরে ধাক্কাও খেলো। শুদ্ধ ব্যথা পেয়েছে। সে ধমকে কিছু বলার আগে শীতল তার পেছনে লুকাল।
তখন একে একে সায়ন, রুবাব, অর্ক, হাসান, কামরান, স্যান্ডি, আজম বেরিয়ে এলো। সায়নের হাতে ফুলের মালা। সে হাসতে হাসতে মালাটি শুদ্ধর গলায় পরিয়ে দিতেই বাকিসহ একসাথে গাইতে শুরু করল,
সোয়া চন্দন ফুলের মালা
সখিগণে লইয়া আইলা
কৃঞ্চ দিলাই রাধার গলে
বাসর হইল উজালা….।
গানটি গাইতে গাইতে শুদ্ধ-শীতলের চারপাশে ঘুরছে তারা। এদের কান্ড থেকে শুদ্ধ বিরক্ত মুখে দাঁড়িয়ে রইল। রোদের মধ্যে দাঁড় করিয়ে এসব করার মানে হয়? তাই বিরক্তির সুরে বলল,

_’থামবে তোমরা? পাগল-ছাগলের মতো কিসব করছো?”
শুদ্ধর কথায় থেমে গেল তারা। ধমক খেয়ে একে অপরের দিকে তাকিয়ে
মন খারাপ করে ভেতরে চলে গেল। একটু মজা করতে চেয়েছেই নাহয় তাই বলে এভাবে ধমকাবে? তাদের কি মান সম্মান নেই? শুদ্ধ নিজেও ভ্রু কুঁচকে নিল। তার গুনধর ভাই ও বন্ধুরা এত ভদ্র হয়ে গেল? হলে তো ভালোই। সে এবার পেছনে লুকানো শীতলকে বলল,
_’বাড়ি এসেই ছোটাছুটি শুরু হয়ে গেল? হাতে চ্যালাকাঠ তুলতে হবে?’
একথা বলে শীতলকে নিয়ে ভেতরে ঢুকতে যাবে তখন আবারও সবটা হাজির। মুখ বেজার করে পথ আটকে দাঁড়িয়ে আছে। এভাবে দাঁড়ালে ঢুকবে কিভাবে? তাদের সরতে বলবে তার আগে আচমকা ঝপাৎ করে পরপর কয়েক বালতি রংগোলা জল এসে পড়লো ওদের গায়ে। এরপর একযোগে শোনা গেল, ‘শুভ নববর্ষ! রঙে রঙে রঙিন হোক তোমাদের জীবন।’

মুহূর্তেই কাকভেজা হয়ে গেছে শীতল আর শুদ্ধ। এই পুন্যের কাজখানা
করে দাঁত বের করে হাসছে,সায়ন, রুবাব, অর্ক, স্যান্ডি, হাসান, আজম, কামরান, সাম্য, সৃজন। এদের এখন কি বলা উচিত ভেবে পেল না শুদ্ধ। ভিজেপুরে একশা হয়ে কটমট করে তাকিয়ে রইল ভাই ও বন্ধুদের দিকে। বিরক্তি নিয়ে চেঁচিয়ে বলল,
_’তোমরা কি মানুষ হবে না? কি করলে এটা?’
_’না। মানুষ হয়ে আর কি হবে? একদিন তো মরেই যাব।”
একথা বলে নিজেরা নিজেরাই খ্যাঁকখ্যাঁক করে হাসতে লাগল। তখন সিরাত হন্তদন্ত হয়ে এসে আরেক বালতি রং শুদ্ধ-শীতলের গায়ে ঢেলে দিলেন। শুদ্ধ-শীতল হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল মেজো মার দিকে। কিছু বলার সুযোগ পেল না তারা। তার আগেই উনি সায়নদের দিকে তাকিয়ে বললেন,
_’হতচ্ছাড়ার দল, যেই আমি মাছ উল্টাতে গেছি ওমনি আমাকে ছাড়াই কাজ সেরে ফেলেছিস? কি ভেবেছিস নিজেরাই টাকা হাতাবি? খবরদার ভুলেও একথা ভাববি না নয়তো তোরাও আজ তোদের বউ পাবিনা।”
একথা বলে শুদ্ধর পেছনে দাঁড়ানো শীতলের দিকে তাকালেন। ভাইদের কান্ডে শীতল হাসবে নাকি কাঁদবে বুঝতে পারল না। এতদিন পর বাড়ি ফিরে শেষে কী না রঙ গোলা জল দিয়ে অভিনন্দন! যদিও ব্যাপারখানা মন্দ লাগে নি। বাড়ি ঢুকতেই তাকে বলা হয়েছে শুদ্ধর পাশে দাঁড়াতে। তাদের নিয়ে রাজকীয় অভিনন্দন জানানো হবে। এ কারণেই তো দৌড়ে এসে পেছনে লুকালো। এতদিন পর শীতলকে দেখে সিরাত এগিয়ে গিয়ে বুকে জড়িয়ে নিতেই সিমিন, সিতারা, শখ, স্বর্ণ, ঐশ্বর্যও উপস্থিত হলো।

চোখে জল নিয়ে চলল মিলনপর্ব। শারাফাত, সাফওয়ান চৌধুরী সবার পরে মেয়েটার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পেলেন। শীতল ভেবেছিল আর কাঁদবে না। কিন্তু বেহায়া চোখের জল শুনলে তো? আজ বাড়িতে বড় আব্বু, মেজো চাচ্চু আছে তার বাবা থাকলে কি খুব ক্ষতি হয়ে যেতো? শীতলের চোখে পানি দেখে শারাফাত চৌধুরী তার মাথার উপর ভরসার হাত রাখলেন। আদুরে স্বরে বললেন,
_’আমার মা আজকাল আমাকে বাতিলের খাতায় ফেলে দিয়েছে। বড় আব্বু পর হয়ে গেছি, তাই না? অথচ তোমার বাবার আগে আমার আঙুল আঁকড়ে ধরেছিলে তুমি। আমি কোলে বুকে করে তোমাকে বড় করেছি।
আমার আরেক মা তুমি। তুমি সামান্য কষ্ট পেলে এখনো আমার বুকে এসে বিঁধে। অথচ তুমি তোমার বাবার জন্য কেঁদেই যাচ্ছো। আমি কিছু না? বাবা নেই, বড় আব্বু আছি না!’
শীতল শারাফাত চৌধুরী হাতটা কপাল ঠেকিয়ে নীরবে অশ্রু ঝরালো।
সে ভুলেনি বাড়ির কাউকে ভুলেনি। কারো ভালোবাসা ভুলেনি।
আপনদের ভুলা যায়? তখন সাফওয়ান চৌধুরী গরম জিলাপি এনে শীতলের মুখের সামনে ধরে বললেন,
_’শুধু তোমাকে না ভাই, আমাকেও বাতিলের খাতায় রেখেছে।’

শীতল জিলাপিতে একটু কামড় দিয়ে সাফওয়ান চৌধুরীর হাতটা ধরল।
উনি যত্ন করে শীতলের চোখের পানি মুছে দিলেন। এত কান্নাকাটির সহ্য হলো না শখের। সে বোনকে নিজের দিকে টেনে জড়িয়ে ধরল। কাঁদতে বারণ করে যত্ন করে মুখ মুছিয়ে দিলো। এদিকে সিমিন এখনো চুপ করে এককোণে দাঁড়িয়ে আছেন। ছলছল চোখে তাকিয়ে আদরের মেয়েকে দেখছিলেন। শীতল একে একে স্বর্ণ, ঐশ্বর্য, সিতারার সঙ্গে কথা বলে এগোলো মায়ের দিকে। মা-মেয়ে কারো মুখে কথা নেই। শীতল মুখে কিছু না বলে মাকে জড়িয়ে ধরল। মায়ের বুকে মুখ লুকিয়ে ফোঁপাতে লাগল। সিমিন নিজেও নীরবে কাঁদতে কাঁদতে শাড়ির আঁচল দিয়ে তার মাথা, মুখ, যত্ন করে মুছে দিলেন। হঠাৎ চিৎকার চেঁচামেচি শুনে সবাই ঘুরে তাকালেন বাইরে দাঁড়ানো ছেলেগুলো দিকে। সায়নরা কেউ শুদ্ধকে বাড়ির ভেতর আসতে দিচ্ছে না। ঢুকতে গেলেই রঙ গোলা জল ছুঁড়ে মারছে। এটা হচ্ছে শুদ্ধ প্রতি তাদের রাগের বহিঃপ্রকাশ। কারণ তারা শীতলকে আনতে যেতে চেয়েছিল কিন্তু শুদ্ধর জন্য হয়নি। সে বের হওয়ার আগেই সবার রুম বাইরে থেকে লক করে গেছে। যাতে কেউ রুমের বাইরে আসতে না পারে।

পরে দারোয়ান এসে দরজা খুললে বের হয় তারা। ততক্ষণে শীতলকে নিয়ে শুদ্ধ বাড়ির পথে রওনা দিয়েছে। শুদ্ধ কতক্ষণ বকাবকি করে না পেরে ভেজা গায়ে দাঁড়িয়ে রইল। মাথা চুল বেয়ে রঙের পানি গড়িয়ে পড়ছে। পরনের সাদা শার্টের হাল দেখার মতো না। শুদ্ধর অবস্থা দেখে রুবাব তার পক্ষ নিতেই তারও একই অবস্থা করা হলো। এরপর নিজেরা নিজেদেরকে ইচ্ছে মতো রঙে ঢুবালো। ওদের অবস্থা দেখে মেয়েরা হাসছে। স্বর্ণ, ঐশ্বর্যকে হালকাভাবে ছেড়ে দিলেও বাকিরা আর পার পেল না। অনেক হয়েছে দেখে শারাফাত চৌধুরী থামাতে এলে উনাকেও ‘শুভ নববর্ষ, চৌধুরী সাহেব’ বলে ইচ্ছে মতো চুবানো হলো। বড় ভাইয়ের হাল দেখে সাফওয়ান চৌধুরী পেছন থেকে কেটে পড়তে গেলে শারাফাত চৌধুরী নিজেই ভাইয়ের গায়ে পানি ছুঁড়ে ভিজিয়ে দিয়ে বললেন, ‘শুভ নববর্ষ।’ এটা নিয়েও হাসাহাসি চলল কতক্ষণ। অতঃপর সিতারা চৌধুরীর ধমকানিতে সব ক’টা থামল। ভিজে চুপচুপে হয়ে গেছে সবাই। ভেতরে ঢুকলে বাড়ির হাল বেহাল করে ফেলবে। অগত্যা কেউ বাড়িতে না ঢুকে আজকে পুকুরে গোসল করার সিদ্ধান্ত নিল। ছেলেরা একে একে এগোলেও শুদ্ধ দাঁড়িয়ে ছিল। সে ভেবেছিল সুযোগ বুঝে বাড়িতে ঢুকে পড়বে। পুকুরে গোসল দিলে শরীর চুলকায়। এমনিতেই তার একটু বেশিই এলার্জির সমস্যা। কিন্তু শারাফাত চৌধুরী সহজে বুঝে নিলেন ছেলের মনের কথা। উনি নিজে ছেলের কাঁধে হাত রেখে ছেলেকে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বললেন,
_”সুন্দর মুহূর্তগুলো ধরা দিলে দুহাতে লুফে নিতে হয়। যাতে সেগুলো স্মৃতিচরণ করলে এমনি হাসি চলে আসে। আমাদের জীবনটা খুব ছোট্ট।
সুখগুলোও খুব দামি। এগুলোকে হেলাফেলা করতে নেই।”

শুদ্ধ বাবার দিকে তাকাল। মাঝের কিছুদিন বাবার সঙ্গে তার দুরত্ব সৃষ্টি হয়েছিল। যার জন্য হয়েছিল সে যখন নেই তখন মান-অভিমান রেখেও লাভ নেই। তাই বাবার কথায় সম্মতি দিয়ে পুকুর পাড়ের দিকে গেল। কি এক কথায় অর্ককে খু্ব পঁচাচ্ছে সায়ন। তা দেখে শুদ্ধ বলল,
_’রঙ নিয়ে মাতামাতি? ক্ষততে শুধু ইনফেকশন হোক না, আমিও রেডি। ফিনাইল আর সিরিজ কাগজ দিয়ে ঢলে ড্রেসিং যদি না করিয়েছি।”
একথা শুনে সায়নের হাসি মিলিয়ে গেল। ফাটা বেলুনের মতো মুখখানা চুপসে গেল। খুশির ঠেলায় সেসব মনেই নেই। এবার কি হবে? ততক্ষণে হাসান, কামরান, আজম, স্যান্ডি বুকপানিতে নেমে দাঁড়িয়ে আছে। কথা বলছে নিজেরা নিজেরা। এদিকে সিঁড়ির মাঝখানে দাঁড়িয়ে শুদ্ধ ফিচেল হেসেই যাচ্ছে। সায়নের চুপসানো মুখ দেখে পৈশাচিক আনন্দ হচ্ছে। দুই ছেলের কথা শুনে শারাফাত চৌধুরীও হাসলেন। এ নতুন কিছু না শুদ্ধর কথার প্যাঁচে সায়ন বরাবরই আটকে যায়। আজও তাই হচ্ছে দেখে উনি কোনোমতে হাসি আটকে সায়নকে বললেন,

_’এসো, আমি রঙ ধুয়ে দিচ্ছি। বাড়ি গিয়ে স্যাভলন পানিতে আরেকবার শাওয়ার নিয়ে পুরো শরীরে এ্যান্টিসেপটিক ক্রিম লাগিয়ে নিলেই হবে।’
বাবার কথাখানা সায়নের ভীষণ পছন্দ হলো। গায়ের টি-শার্ট খুলে শেষ সিঁড়িতে বসে পড়ল। শুদ্ধর দিকে একবার তাকিয়ে মেয়ে মানুষের মতো মুখ ভেংচি কাটল। তখন সাম্য আর সৃজন বেশ কয়েকটি তোয়ালে আর কয়েকটি শ্যাম্পুর বোতল নিয়ে হাজির হলো। তারাও গোসল করবে।
সাফওয়ান চৌধুরী ধমকালেও শুনলো না। তারা বাবার হাত ধরে পুকুরে নেমে পড়ল। অর্ক তখন সিঁড়িতে বসে পানি নিয়ে রঙ ধুচ্ছিল। তখন শুদ্ধ এক ধাক্কায় তাকে পুকুরে ফেলে অর্কের জায়গায় আরাম করে বসল। বলল,

_’আসসালামু ওয়ালাইকুম নতুন জামাই। দিনকাল ভালো তো?’
আচমকা ধাক্কায় নাকে মুখে পানি ঢুকে কাশতে শুরু করেছে অর্ক। তার অবস্থা দেখে হাসতে লাগল বাকিরা। শারাফাত চৌধুরী বাকিদের দিকে শ্যাম্পুর বোতল ছুঁড়ে দিলেন। তারপর আগে সায়নের গায়ের রঙ ধুয়ে শ্যাম্পু দিয়ে দিলেন। গাঢ় রঙ না শুকনো আবির গুলিয়ে রং করেছে যার কারণে তুলতে বেগ পেতে হলো না। উনি খুব যত্ন করে রঙ তুলে দিচ্ছেন দেখে সায়ন তাকাল শুদ্ধর দিকে। দুই ভাইয়ের চোখাচোখি হলো। ঠোঁটে মুচকি হাসি। বাকিরা মুখে কিছু না বললেও মুগ্ধ হয়ে দেখলে সেই দৃশ্য।
সায়নের হয়ে গেলে শারাফাত চৌধুরী এবার এলেন শুদ্ধর কাছে। যেটা একদমই আশা করেনি শুদ্ধ।
উনি শার্ট খুলতে ইশারা করলে শুদ্ধ বিনাবাক্য খুলে ফেলল। একইভাবে
তার গায়ের রঙ তুলে মাথায় শ্যাম্পু করিয়ে দিলেন। তারপর বাবা ছেলে একইসাথে পুকুরের পানিতে নেমে পড়লেন। বাকিরা পুরো পুকুর সাঁতরে বেড়ালেও শুদ্ধ আগে উঠে মাথা মুছতে শুরু করল। তার শরীর চুলকাতে শুরু করেছে। তাকে দেখে সায়নও উঠে এলো। বাকিরাও উঠে পরনের পোশাক ধুঁয়ে কোমরে তোয়ালে পেঁচিয়ে বাড়ির দিকে হাঁটা ধরল। তারা যাচ্ছে সাম্য আগেই বাড়ির ভেতর জানাতেই বাড়ির মেয়ে-বউরা সেখান থেকে সরে গেল। উনারা জানেন বুঝ হওয়ার পর ছেলেরা মা-চাচীদের সামনে একেবারে খালি গায়ে যায় না। স্বর্ণের কথা ভেবে নিচের একটা রুমে থাকছে সায়ন-স্বর্ণ। সায়ন তার রুমে গেল। রুবার গেল তার রুমে। শুদ্ধ বন্ধুদের নিয়ে ওপরে গিয়ে দেখল তার রুমে তালা ঝুলানো। আবার কতক্ষণ চেঁচামেচি করে চাবি চাইলেও সায়ন দিলো না। এরা যে আজ কি শুরু করেছে। এসব করতে করতে দুপুরের আজান পড়ে গেল। অর্ক মাঝে মাঝে এখানে আসে বিধায় তার কিছু পোশাক এখানে রয়ে গেছে।

কিন্তু বাকিদের? সেই চিন্তা অবশ্য করতে হলো না গতকাল রাতে বাড়ি ফেরার পথে গাড়িতে থাকা সবাইকে শপিং করে দিয়েছে সায়ন। বাদ যায়নি শুদ্ধর বন্ধুরাও। কারণ তার বোন বাড়ি ফিরছে।
শুদ্ধর রুম এখনো তালাবদ্ধ। তাই শীতলের আগের রুমে শুদ্ধ, হাসান, কামরান, স্যান্ডি, অর্ক আর আজম শুয়ে বসেছিল। বাকিরা রুমে গেছে পোশাক পরিবর্তন করতে। বাড়ি ফেরার পর থেকে শুদ্ধ শীতলের দেখা পায়নি। আসেওনি একবার এদিকে। কোনো এক ছুঁতোয় কি আসা যায় না? তা আসবে কেন? কেবল তো শুরু হলো তার প্রতি অবহেলা। এখন চৌদ্দ গুষ্টিকে সময় দিতে পারলেও তাকে নজরে পড়বে না। ব্যাঙাচির ঘরের ব্যাঙাচি, একবার শুধু হাতের কাছে পাক৷ একটুপরে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করতে করতে সাম্য খেতে ডাকতে এলো। অগত্যা একে একে তারা নিচে গেল। এতক্ষণে শীতলের দেখা পেল শুদ্ধ। সোনালি পাড়ের লাল টুকটকে সুতির শাড়ি পরে ডায়নিং টেবিলে খাবার সাজাচ্ছে। ভেজা চুলগুলো আধখোপা করে রাখা। শখ, ঐশ্বর্য, স্বর্ণের পরনেও শাড়ি তবে সবার কালার ভিন্ন। একবার চোখাচোখিও হলো। বরকে দূরে রেখে বউ সেজে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এটাকে শায়েস্তা করা ফরজ হয়ে গেছে। ছেলেরা আগে খেতে বসল। কতদিন পর খাবার টেবিল ভরে উঠল। নানান পদের খাবারে ম ম করছে। হইহই করতে করতে বেশ তৃপ্তি নিয়ে খেয়েও উঠল।

নানান পদে খাবার তো তিনবেলাতেই রান্না হয় কিন্তু খাওয়ার আনন্দটুকু কারো মধ্যেই দেখা যায় না। এত হইচই হয় না। অবশেষে বাড়ি স্বাভাবিক হচ্ছে। সুখ ফিরছে। আনন্দরাও ফিরছে। এবার কারো নজর না লাগুক।
ছেলেরা খেয়ে গেস্টরুমে চলে গেলে বাড়ির মেয়ে-বউরা একসাথে খেতে বসল। কত্তদিন পর! শীতল খাবারে হাতও ছোঁয়ালো না। সিমিনের হাতে পেটপুরে খেলো। আজ অনেক ভাত খেয়েছে। খেয়ে নাকি সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছে না। দাঁড়ালে নাকি মনে হচ্ছে পেট খুলে যাবে। তাই সে কোমরে হাত রেখে মিটিমিটি হাসতে হাসতে ধীরে ধীরে হাঁটছে। এবার আর কারো বুঝতে বাকি রইল না শীতল আসলে স্বর্ণকে পচাচ্ছে। স্বর্ণ হাসছে। হাসতে হাসতে কেন যেন চোখ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। শুধু কি স্বর্ণ বাকিরাও খিলখিল করে হাসছে। শারাফাত চৌধুরী যেতে যেতে শুনলেন সেই হাসির শব্দ। উনার বাগানের একটি ফুল ঝরে গেলেও বাকি ফুলরা নতুন করে বাগানে সৌরভ ছড়াচ্ছে। সুখ বিলাচ্ছে। উনার ঠোঁটেও মৃদু হাসি ফুটে উঠল। দুপুরের খাবার খেয়ে গায়ে পাঞ্জাবি জড়িয়ে বাগানের দিকে তাকাতে তাকাতে বেরিয়ে গেলেন। হাঁটতে হাঁটতে শাহাদত চৌধুরী কবরের পাশে চুপ করে বসে রইলেন। মুখে কোনো কথা নেই। কোনো অভিযোগ নেই। কোনো অভিমান নেই। রোজ আসেন আর এভাবে বসে থাকেন।

ওদিকে ছেলেদের খাওয়াও নাকি বেশি হয়ে গেছে। তাই হাত-পা ছড়িয়ে বসে আছে। শুদ্ধ পুনরায় রুমের চাবি চাইল কিন্তু সায়ন গুরুত্বই দিলো না। রুমের চাবি দিচ্ছে না আবার ব্যাঙাচিকেও কাছে পাচ্ছে না। এবার তার মেজাজ চড়ে গেল। রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে ফোন স্কল করতে লাগল।
তখন রুবাব বলল, বিকেলে বাড়ির সবাইকে নিয়ে মেলায় যাবে। অর্ক জানাল, তার শালিকা বাড়ি ফেরার আনন্দে সে বাইরে ডিনার করাবে। স্যান্ডি কামরানের দিকে একবার তাকিয়ে শুদ্ধর দিকে একটা সাদা খাম এগিয়ে দিলো। ইশারায় সেটা দেখতে বললে শুদ্ধ নিয়ে খুলল। নরওয়ের হানিমুন প্যাকেজ? তাও পনেরো দিনের। সে কিছু বলার আগেই হাসান শুদ্ধর কাঁধ চাপড়ে বলল,
_”ঘুরে আয়। ঘুরাঘুরি করলে মাইন্ড ফ্রেশ হয়। এবার নিজেদেরও একটু সময় দে। ভালোবেসে দিয়েছি এই নিয়ে বাড়তি টু শব্দও করবি না।”
_”হঠাৎ, হানিমুন প্যাকেজ কেন?’
একথা শুনে কামরান শুদ্ধকে ধাক্কা দিয়ে বিছানায় ফেলল। তারপর তার ঠোঁটে আঙুল বুলিয়ে আবেনময়ী সুরে বলার চেষ্টা করল,

_’উমম,,বিকজ উই লাভ ইউ,,, জান।’
তার কান্ডে বাকিরা একযোগে উচ্চশব্দে হেসে উঠল। পুরুষালি হাসির ঝংকারে রুমের দেওয়াল প্রতিধ্বনি হতে লাগল। শুদ্ধ কামরানকে লাথি মেরে সরিয়ে উঠে বসল। এরকম হারামি বন্ধু থাকলে শত্রুর দরকার হবে না। তারপর সে বলল,
_’ কিছুদিন বাড়িতে থাকুক। তারপর কোথাও যেতে চাচ্ছিলাম।”
_’বুঝি তো বন্ধু। এজন্যই তো এক সপ্তাহ পরের টিকিট বুক করেছি।’
_’ বাহ্, তোর এত বুদ্ধি হলো কিভাবে? বউয়ের মার রেগুলার খাচ্ছিস নাকি?”
_’ওই আর কি।”
হাসান দীর্ঘশ্বাস ফেলতেই বাকিরা পুনরায় হাসতে লাগল। এত গল্পকথার
মাঝে সায়ন বেরিয়ে এলো। তারপর প্রায়ই বিশ মিনিট পর ফিরে এসে শুদ্ধকে বলল,
_’এ্যাই ভাই, শীতল কোথায়? সারা বাড়ি খুঁজেও পেলাম না তো?”
_’ছোটো আম্মুর রুমে দেখেছো?”
_’রুম, ছাদ, বাগান কোথাও নেই সে। কোথায় গেল মেয়েটা? উঠ, চল দেখতো একটু। আমি পা নিয়ে জোরে হাঁটতেও পারছি না।”
_’ভাইয়া, মজা কোরো না৷ এসব নিয়ে মজা ভালো লাগে না।’
_’মজা না। সত্যি বলছি ভাই।’

সায়নের মুখ দেখে মনেও হচ্ছে না মজা করছে। তাই শুদ্ধসহ বাকিরাও উঠে দাঁড়িয়েছে। শুদ্ধ দ্রুতপায়ে বেরিয়ে গেলে বাকিরাও যেতে চাইল। কিন্তু সায়ন যেতে দিলো না বরং রুমের দরজা আঁটকে আরাম করে বিছানায় শুলো। তাকে শুতে দেখে আজম অবাক হয়ে বলল,
_’ভাই, আপনে শুঁইলেন ক্যান? শীতল আপারে খুঁজতে যাইবেন না?”
_’না। যার বউ সে খুঁজুক গা। বউ যার প্যারা তার।”
একথা শুনে বাকিরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করে হেসে ফেলল। সায়ন কুল মানে নিশ্চয়ই কাহিনি আছে। ওদিকে শুদ্ধ ছাদ, বাগান, বাড়ির প্রতিটা আনাচে-কানাচে খুঁজে না-পেয়ে বড় গেটের কাছে গেল। দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করে জানল বাড়ির কেউ বের হয়নি। তাহলে গেল কোথায়?
বাড়ি আসতে না আসতে টেনশন দেওয়া শুরু। চ্যালাকাঠের মার পড়ে নি বহুদিন। গাছে উঠে বসে নাই তো? সে এবার গেল পেয়ারা গাছ তলায়। ভালো করে খুঁজল কিন্তু সেখানেও নেই। তবে গেল কোথায়?
তার পছন্দের জায়গা বলতে বাগান, ছাদ নয়তো তার রুম। তার রুম?
রুমের কথা মনে পড়তেই সে আর না দাঁড়িয়ে নিজের রুমের দিকে হাঁটা ধরল। দ্রুত সিঁড়ি পেরিয়ে রুমের সামনে গিয়ে দেখে লক খোলা। রুমের মধ্যে ঢুকেও কাউকে পেল না। তবে কিছু ফুল, ফেইরি লাইট আর সুগন্ধি ক্যান্ডেল দিয়ে অসম্ভব সুন্দর করে সাজানো রুম। সে রুমে দৃষ্টি বুলাতেই হঠাৎ দরজার পেছন থেকে কেউ বলে উঠল,

_”শুভ জন্মদিন, আমার শেহজাদা।”
​হঠাৎ চেনা কণ্ঠস্বর শুনে তড়িৎ পেছনে তাকাল শুদ্ধ। তার সামনে শীতল দাঁড়িয়ে আছে। পরনে লাল রঙের শাড়ি। কোমর সমান লম্বা খোলা চুল।
চোখে কাজলের টান আর ঠোঁটে ভুবন ভোলানো মিষ্টি হাসি । হাত, কান গলায় লেটেস্ট মডেলের সাধারণ কিছু গয়না। তবে নজর আটকাল তার দেওয়া কোমরবন্ধনীতে। হাতে লাভ শেপের রেড ভেলভেট কেক। রুমের হালকা হলদেটে আলোয় ভীষণই আদুরে দেখাচ্ছে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর এমন মোহিনী রূপে দেখছে তাকে! ​শুদ্ধ অনড় হয়ে তাকিয়ে রইল। দৃষ্টি গাঢ় হলো। কথারা পথ হারাল। বুকের ধুকপুকানি বেড়ে গেল। আচ্ছা, কী সম্বোধনে ডাকল তাকে? শেহজাদা? আমার শেহজাদা! বাহ্, একেবারে রাজকীয় সম্বোধন! এসব কোথায় থেকে শিখে এসেছে? হ্যাঁ, আজ ১৪ই এপ্রিল, তার শুভ জন্মদিন। বছরের শুরুতেই পৃথিবীতে এসেছিলো সে।
আর এ দিনটির কথা প্রতিবারই ইচ্ছে করে ভুলে যায়। যাতে প্রিয় জনরা তাকে মনে করে দেয়। কিন্তু এবার সত্যিই ভুলে গিয়েছিল। তাছাড়া কেউ মনে করিয়ে দেয়নি! বিশেষ কাউকে দিয়ে বিশেষভাবে শুভেচ্ছা শুনাবে বলেই কী এত আয়োজন? তা এসব কার পরিকল্পনা? নিশ্চয়ই সায়নের।

শুদ্ধ আর ভাবতে পারল না দৃষ্টিও সরালো না। মাদক চাহনিতে
তাকিয়ে রইল। মনে পড়ে গেল সমুদ্র নিয়ে বাগানে বলা সেই কথাগুলো। তখন একটা কথা দিয়ে অনেক কিছু বুঝিয়েছে শীতল। কি আশ্চর্য তাই না? যে মেয়েটা একদিন ভালোবাসা শেখানোর আবদার করেছিল,মিথ্যা ভালোবাসার দাবি নিয়ে তার সামনে দাঁড়িয়েছিল, আজ সে সত্যিকারের ভালোবাসা বুঝতে শিখেছে, চিনতে শিখেছে। ভালো ও মন্দের তারতম্য ধরতে পেরেছে। তার বিশুদ্ধ পুরুষের খুব গোপনে লুকানো ভালোবাসার নাগাল পেয়েছে। আর আফসোস নেই। এইটুকুই যথেষ্ট! তবে বুকটা ভার হয়ে আছে। তীব্র ছটফটানিতে ভীষণ অস্থির লাগছে। অবুজ মন বারবার মন করিয়ে দিচ্ছে—”কখন বুকের জ্বালা কমাবি? তাকে একটু বুকে টেনে নিবি না? অনেক তো হয়েছে এবার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে ফেল। সীমাবদ্ধতা ভুলে যা। মাত্রাকে যাত্রা করে তার মাঝে হারিয়ে যা।” কিন্তু ধৈর্যের বাঁধ ভাঙতে চাইলে সকালে বাইক থামিয়ে জড়িয়ে ধরতে পারত। কিন্তু তাতে তার মন ভরতো না। বুকের জ্বালা জুড়াতো না। বরং তৃষ্ণা আরও বাড়ত।কিন্তু এখন দগ্ধ বুকে শান্তি নামানো বড্ড প্রয়োজন। শীতলকে এই বেশে, এই রূপে দেখে ধৈর্যের বাঁধটুকু নিমিষেই গুঁড়িয়ে গেল। তাই নিজেকেও সামলানোর চেষ্টা করল না। শুধু শীতলের দিকে তাকিয়ে তার এক হাত বুকের বাঁ পাশে রেখে বলল,
_​”এখানে ভীষণ ব্যথা।”

​কথাখানা শুধু বলতেই দেরি তবে কেক রেখে ছুটে আসতে দেরি হলো না শীতলের। তীরে আছড়ে পড়া উত্তাল ঢেউয়ের মতো সে ঝাঁপিয়ে পড়ল শুদ্ধর প্রশস্ত বুকে। আচমকা এমন ধাক্কায় শুদ্ধ এক কদম পিছিয়ে গেল। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে দুই হাতের শক্ত বাঁধনে বুকের সঙ্গে মিশিয়ে নিল। এতদিন পর, এত বিনিদ্র রজনী পর! এত অপেক্ষার পর। শীতল প্রিয় পুরুষের বুকে ঠাঁই পেয়ে হাসল না বরং তার গলা জড়িয়ে ধরে শব্দ করে কেঁদে উঠল। ভীষণ করুণ শোনাল কান্না। সে শুদ্ধর বুকের ভেতর ঢুকে যেতে চাইল। কিন্তু পারল না। তাই আরো শক্ত বাঁধনে শুদ্ধর গলা জড়িয়ে ধরল। তারপর কাঁদতে কাঁদতেই বলল,
_​”খুব পুড়িয়েছি না? আর দূরে যাব না। আর কষ্ট দেব না। আমি সরি … খুব সরি।”
​শুদ্ধ জবাব দিল না। জবাব দেওয়ার অবস্থায় কি আছে সে? সে শুধু শীতলকে নিজের বুকের সঙ্গে আরও জোরে চেপে ধরল যেন এই দুই দেহের মাঝে একচুল দূরত্বও না থাকে। তবে শুদ্ধ কিছু বলছে না দেখে
শীতল পুনরায় ব্যাকুল স্বরে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
-​”আমার বুকেও ভীষণ ব্যথা। আমারও খুব কষ্ট হয়। আমি আরেকটি বার মা হতে চাই। আমার শূন্য কোল পুন্য করতে চাই।”

​কথাটা শেষ হতেই শীতল টের পেল ওর কাঁধটা ভিজে যাচ্ছে। ওর কান্না আচমকায় থেমে গেল। শুদ্ধর চওড়া পিঠ মৃদুভাবে কেঁপে উঠছে। বুঝতে
বাকি রইল না শুদ্ধর তপ্ত অশ্রুতে কাঁধ ভিজে যাচ্ছে। যে মানুষটা এত ঝড়-ঝাপ্টার পরও শক্ত ছিল, সে অবোধ শিশুর মতো ফুঁপিয়ে কাঁদছে! তার মানে, এই বুকেও সন্তান হারানোর ক্ষত জমে ছিল? সন্তানের জন্য কষ্ট পাচ্ছিল? শীতল এবার নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে গেলে শুদ্ধর বাঁধন আঁটসাঁট হলো। এতদিন ধরে বুকে জমা কষ্টগুলো কান্না হয়ে ঝরে পড়তে লাগল। ​খানিক বাদে নিজেকে একটু সামলেও নিল। তারপর শীতলকে বুক থেকে একটু সরিয়ে দুহাতে ওর মুখটা তুলে ধরল। শীতল তখনো ফোঁপাচ্ছে। বোচা নাকটা লাল হয়ে গেছে৷ সে যত্ন করে তার চোখ মুছে দিতে দিতে বলল,
_​”হবে, সব হবে। কিন্তু তার আগে তোকে সুস্থ হতে হবে।”
“আমি সুস্থই আছি।”
_”উহুম, এভাবে না। প্রেগনেন্সি জার্নিটা খুব কঠিন। পুরোপুরি সুস্থ হতে হবে। বেশি বেশি করে খেয়ে দূর্বলতা কাটাতে হবে। শরীরে পর্যাপ্ত রক্ত
তৈরি করতে হবে। তাছাড়া একবার এক্টোপিক প্রেগনেন্সি হলে বারবার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ডাক্তার দেখিয়ে পরামর্শ নিয়ে তারপর আমরা বেবি নেওয়ার প্ল্যান করব। যাতে সেই হারানোর ব্যথায় পুনরায় পুড়তে নাহয়।”
_”তাহলে কালই ডাক্তারের কাছে যাই?”

শুদ্ধ একটু হাসল। শীতলের কপালের মাঝখানে আদর এঁকে বলল,
_”আগে ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া কর। শরীরের যে হাল ডাক্তার দেখে দুজনকেই ধরে পেটাবে। বাল্যবিবাহের দায়ে একবার জরিমানা খেয়েছি এবার ডাক্তার না কেস খাওয়ায়।’
জরিমানার কথা শুনে শীতল হেসে ফেলল। কেন জানি জরিমানার কথা মনে পড়লেই দুনিয়া কাঁপিয়ে হাসতে ইচ্ছে করে তার। ভাগ্যিস জরিমানা হয়েছিল, নাহলে বৃদ্ধ বয়সে এই নিয়ে ঝগড়ার একটা টপিক কম হয়ে যেত। তাকে হাসতে দেখে শুদ্ধ সুন্দর করে বুঝিয়ে আবারও বলল,
_”বাড়িতে দুটো বেবি আসছে। ওরা আসুক। রুবাবটাও চলে যাবে, ঐশ্বর্য একা হাতে সব সামলাতে পারবে না। আমরা ছাড়া ওর আর কেউ আছে, বল? ওই পুঁচকে দুটো আসতে আসতে তুইও নিজেকে প্রস্তুত করে ফেল। কি, বোঝাতে পারলাম?”
​শীতল শুদ্ধর বুকে কপাল ঠেকাল। সবই তো বোঝে, কিন্তু মন তো মানে না। বিশেষ করে ছোট্ট কবরখানা দেখার পর বুকটা আরো শূন্য লাগছে।
তাই নিচু স্বরে বলল,
_”সন্তান যে বাবা-মায়ের কাছে এতটা দামি তা আগে বুঝিনি। এখন সদ্য সন্তান হারিয়েছি তো, তাই স্বার্থপর হয়ে শুধু নিজের কথা ভাবতে ইচ্ছে করছে।”
​কথাটা শুনে শুদ্ধর বুকটা মুচড়ে উঠল। সে আর কিছু না বলে শীতলকে বুকে টেনে নিল। ওভাবে কতক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল হিসাব নেই। সময়জ্ঞান আজ স্তব্ধ হয়ে যাক। ​অনেকক্ষণ পর শীতল নিজেকে মুক্ত করে কেকটা শুদ্ধর সামনে নিয়ে এলো। শুদ্ধ শীতলকে টেনে নিজের কোলেই বসিয়ে নিল। দুজনে মিলে একসাথে কেক কাটল, একে অপরকে খাইয়ে দিল। খাওয়া শেষে শুদ্ধ শীতলের কাঁধে থুতনি রেখে চোখ বুজল। ফিসফিস করে বলল,

_” সেই ঘটনার দুপুরে মনভরে ঘুমিয়েছিলাম। তারপর ঘুম ছুটি নিয়েছে। কতদিন তোকে বুকে জড়িয়ে ঘুমাই না! এখন একটু ঘুমাই?”
একথা শুনে ​শীতল বিছানার হেডবোর্ডে হেলান দিয়ে বসল। শুদ্ধও আর কালবিলম্ব না করে তার কোমর জড়িয়ে কোলে মাথা রাখল। অদ্ভুত এক প্রশান্তিতে চোখের পাতা আপনাআপনি বুজে এলো। শীতল শুদ্ধর চুলে আঙুল ডুবিয়ে বিলি কাটতে লাগল। চুল কেটেছে, যেভাবে ধরাও যাচ্ছে না। তবে চুল কাটলে দেখতে ভীষণ ভালো লাগে। বারবার তাকাতে ইচ্ছে করছে। নিজের মনের ভাবনায় নিজেরই হাসি পেল। সে একবার মাথায়
চুল টানতে লাগল, কিছুক্ষণ কপাল মালিশ করল, কখনো বা তার কাঁধ
টিপে দিল। শুদ্ধ ঘুমিয়ে গেছে। বিগত কয়েকটা মাস নির্ঘুম রাত কেটেছে তার। একটুখানি চোখ বুজলেই আতঙ্কে বুক কেঁপে উঠত। সব মিলিয়ে এই ঘুমটুকু বড্ড প্রয়োজন ছিল। অনেক দৌড়েছে, অনেক কষ্ট করেছে, অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছে। এবার থামা দরকার। তাছাড়া গত রাতেও ঘুমায়নি এজন্য বোধহয় শান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছে। ​শীতল অপলক ঘুমন্ত শুদ্ধর দিকে তাকিয়ে রইল। ওর এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না বাড়িতে ফিরে এসেছে; বিশ্বাস হচ্ছে না বারবার শুদ্ধকে ছুঁতে পারছে। এই ছোঁয়াটুকুর জন্য কত কেঁদেছে! ছটফট করেছে। শুদ্ধর নিঃশ্বাস পেটে বারি খাচ্ছে।

একটু সুড়সুড়ি লাগছে যদিও। কিন্তু নড়লেই যদি ঘুম ভেঙে যায়? তাই সেভাবেই বসে থাকতে থাকতে নিজেও ঘুমিয়ে গেল। বাইরে তখন বেলা ডুবে গেছে। মাগবিরের আজানের পর শুদ্ধর ঘুমটা ভাঙল। চোখ খুলে দেখে রুমটা অন্ধকার হয়ে আছে। উঠে লাইট জ্বালিয়ে শীতলকে সুন্দর করে শুইয়ে দিল। সময় দেখে তড়িঘড়ি ওজু করে এসে নামাজে দাঁড়িয়ে গেল। মসজিদে যাওয়ার মতো সময় নেই। সালাম ফিরিয়ে দেখে শীতল তার দিকেই আছে৷ চোখে মুগ্ধতার চাহনি। সে কিছু বলল না একেবারে
মোনাজাত সেরে বলল,
_’নামাজ না পড়লে বউ পেটানো জায়েজ।’
_’কাল থেকে পড়ব।’
_’এবার থেকে মুখে আর বলব না।’
_’তবে কি মারবেন? কি দিয়ে?’
_’যেটাতে আপনি ঠান্ডা, মেহগনির চ্যালাকাঠ।’
_’খু্ব লাগে।’
_’লাগার জন্যই মারি।’

একথা বলে জায়নামাজ গুছাতেই সাম্য এসে দৌড়ে রুমে প্রবেশ করল। হড়বড় করে বলল,
_’শুদ্ধ ভাই, সায়ন ভাই পড়ে গিয়ে পা মচকে গেছে। জলদি….।’
সাম্য কথা শেষ করার আগেই শুদ্ধ রুম থেকে বেরিয়ে গেছে। তার পিছু শীতল আর সাম্য দৌড়াল। সায়ন সত্যি সত্যি পড়ে গিয়ে ব্যথা পেয়েছে।
আজ অনেক ছোটাছুটি করে এমনিতেই পা ব্যথা করছিল। কিন্তু একথা যদি স্বর্ণ বা শুদ্ধ জানে তাকে শূলে চড়াবে। তাই লুকিয়ে পেইন কিলার খাওয়ার জন্য ড্রয়িংরুমে এসেছিল। কিন্তু পায়ের নিচে পানি একদমই খেয়াল করেনি। সৃজন পানি ঢালতে গিয়ে ফেলে দিয়েছে মা বকবে বলে পালিয়েছে। সেই পানিতে পা দিতেই সায়ন চিটপটাং। খুব ব্যথা পেয়েছে ছেলেটা। চোখ-মুখ কুঁচকে নিয়েছে। না চাইতেও ঝরঝর করে অশ্রু ঝরে গেছে। শুদ্ধ এসে টেনে তুলে সোফায় বসাল। পা সোজা করতে পারছেনা সায়ন৷ স্বর্ণ দ্রুত বরফ এনে ঢলতে গেলে শুদ্ধ বলল,
_’আমাকে দে।’

শীতল আরেক টুকরো বরফ নিয়ে ডলতে লাগল। শুদ্ধ ব্যথা স্থানে বরফ ডলতে গিয়ে খেয়াল করল ক্ষতস্থানের সেলাই লাল হয়ে আছে। গায়ে প্রচুর জ্বর। জ্বর কখন এলো? কত করে বলল দৌড়ঝাপ না করতে কিন্তু শুনলে তো? সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জ্বরটা বাড়াল। অগত্যা ডাক্তারের কাছে যেতেই হল। ডাক্তার সেলাইগুলো টিপে দেখতেই সায়ন চেঁচিয়ে উঠল। কোনোমতে গালি আটকাল। কিন্তু ডাক্তারের কান বরাবর ঘুষি বসিয়ে বলতে ইচ্ছে করল, ‘হারামজাদা এটা তোর বউয়ের শরীর না, পেশেন্টের পা। আস্তে টিপ!’এদিকে তার ক্ষত থেকে গলগল করে পুঁজ বের হচ্ছে। অর্থাৎ ইনফেকশন হয়েছে। কিন্তু শুকনো ক্ষততে ইনফেকশন কীভাবে?
আজ নাহয় পুকুরে গোসল করেছে কিন্তু একদিনে তো হওয়ার কথা না।
সায়ন এবার নিজে স্বীকার করল মনের ভুলে মিষ্টি খেয়েছিল সে। আর কদিন ধরে ভীষণ চুলকাচ্ছিল। ডাক্তার ড্রেসিং করতে লাগলেন। সায়ন সমানে চেঁচাচ্ছে। শুদ্ধকে বলছে ডাক্তারকে থামাতে। কিন্তু শুদ্ধ তা না করে ভাইকে জড়িয়ে ধরে রাখল। ডাক্তার সময় নিয়ে ড্রেসিং করলেন।
দুই পায়ের ব্যথায় ধাপ ফেলা দায়। অতঃপর নতুন মেডিসিন কিনে বাড়ি ফিরল তারা। ঘড়িতে তখন দশটা। সিতারা ছেলেকে খাইয়ে একে একে ওষুধ খাইয়ে দিলেন। সায়ন ধীরে ধীরে শুলো। তাকে রেস্ট করতে দিয়ে সবাই চলে গেল। শুদ্ধও যাওয়ার পা বাড়াবে সায়ন বলল,

_’আমি তোকে বড্ড জ্বালাই, তাই না ভাই? দিন দিন বোঝা হয়ে যাচ্ছি।’
শুদ্ধ শান্ত দৃষ্টিতে ভাইয়ের দিকে তাকাল। বলল,
_’ঘটে বুদ্ধি থাকলে অন্তত এইটুকু বুঝতে ভাই কখনো ভাইয়ের বোঝা হয় না। যতদিন বেঁচে আছি আমার আপনজনরা আমার বোঝা হবে না। ফোন হাতের কাছেই আছে প্রয়োজন হলে কল দিও।’
একথা বলে শুদ্ধ চলে গেল। সায়ন জানালার দিকে তাকিয়ে চাঁদটাকে দেখে হাসল। চাঁদ একা। চাঁদের কেউ নেই। তার আছে? নিজের প্রশ্নে নিজেই থমকে গেল সে। তারপর চাঁদকে মধ্যমা আঙুল দেখিয়ে বলল, ‘সায়ন তোর মতো একা না রে , সায়নের একটা সুপারহিরো ভাই আছে।’
রাত তখন এগারোটা। খাওয়ার পর্ব সেরে রুমে এলো শুদ্ধ। শীতল তার সাজগোছের জিনিস ঘাটাঘাটি করছে। রুমজুড়ে শুদ্ধর পারফিউমের সুগন্ধ ম ম করছে। সে যে সেগুলোতেও হাত দিয়েছে বুঝতে বাকি রইল না। শুদ্ধ ফ্রেশ হয়ে এসে ফোনে কিছুক্ষণ কথা বলল। লেপটপে কিসব কাজ করল। তারপর শীতলকে কাছে ডেকে স্কাই ড্রাইডিং এর ভিডিও দেখাল। বলল,

_’আগামী সপ্তাহে দেশের বাইরে যাব। শপিং যা করার করে নিস।’
_’আমিও যাব?’
_’হুম।’
_’কোন দেশ?’
_’নরওয়ে।’
_’কিহ্!’
_’নরওয়ে থেকে সোজা সুইজারল্যান্ড।’
-‘সুইজারল্যান্ড কেন?’
_’ওখানে স্কাই ড্রাইভিং বেশি মজা।’
_’স্কাই ড্রাইভিং? না, না, আমি ওসব করব না। এত তাড়াতাড়ি মরতে চাই না। আমাকে দিয়ে হবেও না। এমনিতেই আমার প্রেসার লো।’
তার কথা শুনে শুদ্ধ হাসল। তাকে টেনে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল। তারপর তার মসৃণ কাঁধে থুতনি ঠেঁকিয়ে বলল,
_’ বেল্ট দিয়ে আমার বুকের সঙ্গে বেঁধে রাখব। আমার বুকে থাকতেও ভয়?’
শীতল জবাব দিলো না। বরং পিঠটা হেলিয়ে মাথা রাখল শুদ্ধর বুকে। শুদ্ধ জবাব পেয়ে গেল। তখন শীতল বলল,

_’কিন্তু আপনাকে জাপটে ধরে স্কাই ড্রাইভিং করতে পারব না।’
_’কেন?’
_’কারণ, আমি সিঙ্গেল।’
শুদ্ধ মাথা বাঁকিয়ে তার মুখের দিকে তাকাল। তারপর শীতলের কাঁধে দাঁত বসিয়ে বলল,
_’আমিও সিঙ্গেল।’
একথা বলে দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল। তাদের হাসিতে সুখরাও যেন তালে তালে নৃত্য করতে লাগল। চাঁদটাও মিটিমিটি হাসল।

শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৯৭

ভালোবাসা জিনিসটাই কি অদ্ভুত সুন্দর তাই না? এত কষ্ট, এত দহনের পরও মানুষ ভালবাসতে চায়। ভালোবাসা খোঁজে। আসলে মানুষ মূলত সুখের কাঙাল। যেখানেই সুখ সেখানেই ছুটে যেতে চায়। অথচ এইটুকু অনেকের ভাগ্যে জোটে না৷ জীবন সেই সুযোগই দেয় না। চৈত্রের খরার মতো পুড়তে পুড়তে যায় তাদের জীবন। যদিও চৈত্রের আরেক রুপের সঙ্গে জীবনের অনেক মিল। যেমন চৈত্রের রুপ বদলায়। রঙ বদলায়। খরায় নামে মনের সুখে পোড়ায়। মূলত চৈত্র আসেই পুড়িয়ে ছারখার করে শেষ মূহুর্তে সৃষ্টির আশ্বাস দিতে। যদিও ঝড় ঝাপ্টার পর তাদের জীবনের চৈত্রটা বিদায় নিয়েছে। তবে কেড়েও নিয়েছে অনেককিছু। যা গেছে তা হয়তো ফিরেও পাবে না কিন্তু নতুন করে সূচনা করতে বাঁধা নেই। তারা নাহয় এক পৃথিবী সমান ভালোবাসা নিয়ে আবার স্বপ্ন বুনবে৷ একসাথে বাঁচবে। হাসবে। একে অপরের শক্তি হয়ে শেষ চৈত্রের ঘ্রাণের মতো মিষ্টি সুবাস ছড়াবে।

সমাপ্ত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here