Home নূর ই মহব্বত নূর ই মহব্বত পর্ব ৩৪

নূর ই মহব্বত পর্ব ৩৪

নূর ই মহব্বত পর্ব ৩৪
তাবাসসুম তাজ্বওয়ারী

আহিল শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে যেন কোনো অনুভূতিই নেই তার। নওমি ওকে ঝাঁকিয়ে বললো,
– কি হয়েছে? আপনি কি খুশি হন নি?
আহিল তবুও স্তব্ধ। ওর এমন নির্বাকতা মেনে নিতে পারছে না নওমি। ওর মনে হলো তার এই সাজগোজ, এই সারপ্রাইজ দেওয়াটা হয়তো আহিলের ভালো লাগেনি। ও আহিলের কলার থেকে নিজের হাত দুটো সরিয়ে নিয়ে দুই কদম পিছিয়ে আসতে নিল। কিন্তু ওর সরে যাওয়ার উপক্রম হতেই আহিলের যেন হুঁশ ফিরে এলো। ও এক সেকেন্ডও দেরি না করে নওমির হাতটা ধরে নিজের দিকে এক টানে নিজের শক্ত বুকের মাঝে আছড়ে ফেলল। ওর দুই চওড়া বাহুর বাঁধনটা এত বেশি শক্ত ছিল যে নওমির দম আটকে যাওয়ার উপক্রম হলো। আহিল নওমির ঘাড়ের কাছে নিজের মুখটা গুঁজে দিল। নওমি হতভম্ব, কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না সে। একটু পর নওমি ঘাড়ে ভেজা অনুভব করলো।
নওমি পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে গেল। আহিল কাঁদছে? হাসপাতালের আইসিইউ-তে চব্বিশ ঘণ্টা শত শত আশঙ্কাজনক শিশুর জীবন মৃ’ ত্যুর কঠিন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েও যার হাত কখনো কাঁপেনি, আজ নিজের অনাগত সন্তানের আগমনের খবরে সেই নামকরা শিশুরোগ বিশেষজ্ঞের চোখ আনন্দের অতিশয্যে নোনা জলে ভিজে উঠেছে!
নওমি নিজের দুই হাত বাড়িয়ে আহিলের চওড়া পিঠটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। ও বড্ড নরম গলায় ডাকল,

– কী হয়েছে আপনার আহিল?
আহিল নওমিকে ছাড়লো না না বরং ওর বাহুর বাঁধনটা আরও কিছুটা জোরালো হলো। ও নওমির ঘাড়ের কাছে মুখ গুঁজে রেখেই অস্ফুট স্বরে আওড়ালো,
– খুশি হয়ে কি না তুমি বুঝতে পারছো না নওমি?
একটু চুপ থেকে ওভাবেই আবেগ জড়ানো গলায় বললো,
– আমি বুঝতে পারছি না এই খুশি কিভাবে প্রকাশ করতে হবে! আমার অদ্ভুত এক অনুভূতি হচ্ছে একদম নতুন! আমি… আমি কিভাবে এটা প্রকাশ করবো বলো না নওমি? আমি জাস্ট বিশ্বাস করতে পারছি না। আমার মনে হচ্ছে আমি কোনো স্বপ্ন দেখছি।
নওমি আহিলের মনের উথাল-পাথাল অবস্থাটা বুঝে হাসলো। অতিমাত্রায় ভালো লাগা আর পরম প্রাপ্তির এই ধাক্কাটা আহিল সামলাতে পারছিল না বলেই সে অমন নির্বাক হয়ে গিয়েছিল।
– এটা কোনো স্বপ্ন নয় আহিল! এটাই আমাদের বাস্তব। আপনি এইজন্য নির্বাক হয়ে ছিলেন? আপনি আমায় ভয় পাইয়ে দিয়েছিলেন!
আহিল নওমির কাঁধ ধরে সামনে এনে অস্থির ভঙ্গিতে পা’’গলের মতো বললো,

– আমার না… আমার ভেতরের অনুভূতিগুলো কেমন যেন জট পাকিয়ে যাচ্ছে নওমি! সেখানে যেমন আছে বাঁধভাঙা আনন্দ, তেমনই আছে এক তীব্র অবিশ্বাস! এই অবচেতন মনটা বারবার বলছে, আমি কি সত্যি এতটা সুখের যোগ্য? আমার এই ছোট্ট ছন্নছাড়া পরিবারে আবার নতুন প্রাণ আসছে? সত্যিই এত খুশি কি আমার হবে?
নওমি শুধু চেয়ে গেল এই মানুষটার অস্থিরতা! আহিলের মতো একজন শক্ত মনের মানুষকে এভাবে এতটা ব্যাকুল হতে ও কখনো দেখেনি। ও দু-হাতে আহিলের মুখের দুই পাশে চেপে ধরে নিজের বুড়ো আঙুল দিয়ে ওর গাল বেয়ে নামা সেই নোনা জলের দাগটুকু মুছে দিয়ে খুব নরম গলায় আশ্বাসের সুরে বলল,
– কেন যোগ্য নন আহিল? এইসব কেন ভাবছেন আপনি? আদনানের কাছে যে আপনি বেস্ট বাবা সেটা কি আপনি জানেন?
– এখন চেষ্টা করছি হতে কিন্তু পুরনো ক্ষ’ত তো মুছে যাবে না! আদনানের জন্মের সময়… ওই পুরোটা সময় আমি পুরো অন্ধকারের মাঝে ছিলাম। ওর পৃথিবীতে আসার খবরটা.. যেটা আমার সর্বপ্রথম জানার কথা ছিলো সেটা আমি জানতেই পারিনি! কখন ওর প্রথম হৃদস্পন্দন শুরু হয়েছিল, ওর কিচ্ছু… আমি কিচ্ছু জানতে পারিনি নূর! তোমার সেই কষ্টের দিনগুলোয় আমি পাশে থাকা তো দূর, একটা দিনও ওর অস্তিত্ব অনুভব করার সৌভাগ্য আমার হয়নি। একজন বাবা হিসেবে সেই যে প্রথমবার আমি হেরে গিয়েছিলাম, নিজের অজান্তেই প্রথম সন্তানকে অবহেলা করে ফেলেছিলাম সেই অপরাধবোধটা আমাকে প্রতিদিন তিল তিল করে মা’রে।
আহিল এক মুহূর্ত থামল। একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে চোখ মুছে নওমির কপালে নিজের কপাল ঠেকিয়ে বললো,

– আজ তুমি আমার সেই শূন্য বুকটা পরম প্রাপ্তিতে ভরিয়ে দিলে। একটা বাচ্চার বাবার জীবনের শুরুটা কেমন হয়, প্রথমবার সেই সুখের খবর পাওয়ার অনুভূতিটা কতটা তীব্র, কতটা ভালো লাগার তা আজ আমি প্রথমবার অনুভব করলাম নওমি! তুমি এই অপরাধী বাবাটাকে নিজের মনের সাথে যুদ্ধ জয় করার অধিকার ফিরিয়ে দিলে। এত সুখ আমি কোথায় রাখবো বলো তো?
নওমি আহিলের মুখ হাতের আজলায় নিয়ে আহিলের কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে বললো,
– অনেক হয়েছে আহিল! আর একটাও এমন কথা না। অতীত আমাদের হাতে ছিল না, কিন্তু এই বর্তমান আর ভবিষ্যৎ তো আমাদের চেষ্টার উপর! আদনানের সময় যা যা মিস করেছেন, এই নয়টা মাস তার সুদে-আসলে আমি আপনার কাছ থেকে উশুল করে নেব। তখন তো আবার বলবেন না যে ডিউটি করতে করতে হাঁপিয়ে গেছেন?
নওমি খুনশুটি করে আহিলকে স্বাভাবিক করতে চাইলো। সফলও হলো বোধহয়! ফিক করে হেসে ফেললো আহিল। মুহূর্তেই নিজের ফর্মে ফিরে আসলো সে। ঠোঁটে বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে বললো,

– হাঁপিয়ে যাব আমি? ডক্টর আযলানের ডিকশনারিতে এই শব্দটাই নেই ম্যাডাম। বরং এখন থেকে প্রেসক্রিপশন আরও দশ গুণ কড়া হবে। তোমার ওপর চব্বিশ ঘণ্টার কড়া ডিউটি থাকবে আমার!
নওমিকে আর কিছু বলতে না দিয়ে ওকে পাঁজাকোলে তুলে নিলো। নওমি আচমকা এই কাণ্ডে পুরোপুরি ভড়কে গেল। ও চোখ দুটো বড় বড় করে কোনোমতে আহিলের গলাটা আঁকড়ে ধরল। তার এই বাঁধভাঙা আর পাগলপরা খুশিটা নওমিকে ছুঁয়ে গেল এক নিমেষে।
– আহিল! নামান আমাকে, পড়ে যাবো তো আমি!
আহিল নওমির এই মৃদু আপত্তি পাত্তা দেওয়া তো দূর, উল্টো দুই বাহুর বাঁধন আরও শক্ত করে বুক কাঁপিয়ে হেসে উঠল।

– তুমিই তো চাইলে খুশি প্রকাশ করি তাই খুশি প্রকাশ করার ওয়ে খুঁজছি!
– খুশি এভাবে প্রকাশ করে? আমাকে ফেলে হারগোড় ভা’ঙার ধান্দা! এক্ষুনি পড়বো!
– পড়ে যাবে মানে? কার কোল থেকে পড়বে শুনি? ডক্টর আযলানের হাত থেকে আজ পর্যন্ত কোনো ক্রিটিক্যাল পেশেন্ট ফসকে যায়নি ম্যাডাম, আর তুমি তো আমার পুরো কলিজা! এত সহজে হাতছাড়া করছি না।
আহিল নওমিকে কোলে নিয়েই ঘরের মাঝখানে একটা চক্কর কাটল। নওমি অবাক হয়ে দেখল এতক্ষণের অনুশোচনায় ভারী হয়ে থাকা মানুষটা যেন কোথায় হারিয়ে গেছে! তার জায়গায় এখন শুধু একজন মাতাল করা সুখী মানুষ দাঁড়িয়ে আছে।
কিছুক্ষণ পর নওমিকে নিয়েই ডিভানে গিয়ে ধপ করে বসলো। বিছানায় আদনান ঘুমাচ্ছে। আহিল হাপাচ্ছে।
– নওমি?
– হু?
– তুমি কিন্তু ভারী হয়ে গেছো! আগে কত কোলে নিয়েছি কিন্তু আজকে…
আহিলকে আর কিছু বলতে না দিয়ে নওমি রাগে ফুঁসে উঠল। ও আহিলের কোল থেকে নেমে যাওয়ার জন্য আরেকটু ছটফট করে উঠে ওর কাঁধে একটা কিল বসিয়ে দিল। চোখ দুটো ছোট ছোট করে কুঁচকে রাগান্বিত স্বরে বলল,

– কী বললেন আমি ভারী হয়ে গেছি? আপনার তো সাহস কম না! এই বুঝি আপনার খুশির বহিঃপ্রকাশ? কোলে তুলে এখন ওজনের খোঁটা দেওয়া হচ্ছে?
আহিল নওমির এই চটে যাওয়া মুখটা দেখে শব্দ করে হাসতে গিয়েও বিছানায় ঘুমিয়ে থাকা আদনানের দিকে তাকিয়ে নিজের হাসিটা চেপে নিল।
– আরে রাগছো কেন? আমি কি বলেছি তুমি একাই ভারী হয়েছ? আমার ভেতরের এই যে এতক্ষণের জমানো সব কষ্ট, শূন্যতা আর আক্ষেপগুলো এক নিমেষে উধাও হয়ে সেখানে এক আকাশ সমান সুখ এসে জমা হলো… সেই সুখের ওজনটা বুঝি কম?

বলেই আহিল আর নিজের আবেগকে আটকে রাখল না। এতক্ষণ ধরে বুকের ভেতর জট পাকিয়ে থাকা সকল আনন্দ এবার ও উজাড় করে দিতে চাইল। ও নওমির কপালে নিজের ঠোঁট দুটো চেপে ধরল একেবারে দীর্ঘ আর গভীর এক ছোঁয়া। ওখান থেকে সরে এসে ও নওমির দুই বন্ধ চোখের পাতায়, ওর লাল হয়ে ওঠা গাল দুটোতে নিজের ভালোবাসার তীব্র আর উষ্ণ পরশ এঁকে দিতে লাগল। তার প্রতিটি চুম্বনে জড়িয়ে ছিল এতদিনের সব আক্ষেপ মুছে ফেলার এক একটা অলিখিত দলিল। আহিলের এই ব্যাকুলতায় নওমির সমস্ত শরীর শিউরে উঠল। ও আহিলের শার্টের কলারটা নিজের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরে চোখ বুজে রইল। আহিল নওমির ওষ্ঠাধরের ঠিক ইঞ্চিখানেক দূরত্বে নিজের ঠোঁট থামিয়ে নিবিড় কণ্ঠে বলল,
– তুমি জানো না নূর, আজ তুমি আমাকে কি আনন্দ দিয়েছো! ডক্টর আযলানকে আজ তুমি পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী পুরুষ বানিয়ে দিলে! আই লাভ ইউ নওমি… আই লাভ ইউ সো মাচ!
বলেই আহিল আর কোনো দূরত্ব রাখল না। নওমির ওষ্ঠাধরে নিজের ঠোঁট ডুবিয়ে দিয়ে ও ওর এতক্ষণের সব অপেক্ষার, সব ভালোবাসার আর অনাগত সেই নতুন প্রাণের শ্রেষ্ঠতম এক সেলিব্রেশন প্রকাশ করলো যেন!
বেশ কিছুক্ষণ পর নওমি হাঁপাতে হাঁপাতে বললো,

– মাথা খারাপ হয়ে গেছে আপনার? কখন এসেছেন হাসপাতাল থেকে এখনো খাবার খান নি! কি শুরু করেছেন বলুন তো? এখন মনে হচ্ছে আপনাকে বলাই উচিত হলো না!
এর মধ্যে বাচ্চার কণ্ঠ পাওয়া গেল। দুইজনই বিছানায় তাকিয়ে দেখলো আদনান উঠে বসে আছে। চোখ কচলাতে কচলাতে বললো,
– মা কুতাই যাচ্ছ?
নওমি অপ্রস্তুত হলো। ও এখনো আহিলের গলা জড়িয়ে বসে আছে। দ্রুত নামতে যাবে এমন সময় আদনান খিলখিল করে হেসে বললো,
– বাবা মাকে কুলে নিচে!
আবার মুখ কালো করে বললো,
– আমাকে কুলে নিবে না?
নওমিকে ছেড়ে দিতেই নওমি উঠে দাঁড়াল। আহিল উঠে বিছানার দিকে যেতে যেতে বললো,
– সবসময় তো তোকে কোলে নিই বাপ! আজ নাহয় তোর মাকে নিলাম। আসলে তোর মা আজ খুব ভালো একটা কাজ করেছে তো, তাই বাবা মাকে একটা থ্যাংক ইউ প্রাইজ দিচ্ছিলাম। তুই বুঝি একটুতেই হিংসে করছিস, হু? আরে বাবার এই কোলটা তো সবসময় আমার আদনানের জন্যই বুকড করা!
আহিল ওকে কোলে তুলে নিতেই আদনান ওর ছোট্ট দুটি হাত দিয়ে আহিলের গলা শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। বাবার বুকে মাথা ঘষে ও বড় বড় চোখ করে নওমির দিকে তাকাল। নওমি তখন আহিলের দিকে চোখ রাঙিয়ে তাকিয়ে আছে, যার পরিষ্কার অর্থ, “ছেলের সামনে আর একটাও উল্টোপাল্টা বানিয়ে বানিয়ে কথা বললে কিন্তু খবর আছে!”
আহিল তা দেখে ঠোঁট বাকিয়ে হাসলো।

গতকালকে ডাক্তারের কাছে চেকআপের জন্য গিয়েছিল নওমি। আহিল গাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিল কিন্তু ওর আসতে দেরি হওয়ায় বেশ কিছুক্ষণ তাকে বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে। ও আসতেই অবশ্য আর দাঁড়িয়ে থাকতে হয় নি সব সময়ের গতিতে হয়ে গেছে। কিন্তু সকাল থেকেই নওমির পা ব্যথা হয়ে গেছে। কিন্তু সেটা কাউকেই বুঝতে দেয় নি সে। কি দরকার এইটুকু ব্যথায় কাউকে উদ্বিগ্ন করার?
আহিলের ফিরতে আজকে দেরি হচ্ছে। নওমি রুমে বসে ছিলো। আদনান দাদুর কাছ থেকে আসবে না এইজন্য নওমি একা বসে ছিলো। এর মধ্যে আহিল ফিরল। আহিল ঘরে ঢুকতেই নওমি একটু নড়েচড়ে বসার চেষ্টা করল, কিন্তু পায়ের ব্যাথায় মুখটা কুঁচকে গেল। আহিল ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে ওর দিকে তাকাল। নওমি হেসে বলল,

– এসে গেছেন?
আহিলের সুতীক্ষ্ণ ডাক্তারী চোখ কিন্তু নওমির ওই সামান্যতম অস্বস্তিটুকু এড়াতে পারল না। ও নওমির কপালে হাত রেখে আলতো করে চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে নরম গলায় শুধাল,
– কী হয়েছে? মুখটা এমন শুকিয়ে আছে কেন? শরীর খারাপ লাগছে?
– আরে না, শরীর ঠিক আছে। আপনার ফিরতে আজ বড্ড দেরি হলো? হাসপাতাল থেকে তো সরাসরি আসেন নি মনে হচ্ছে, কোনো ইমার্জেন্সি কেস ছিল?
আহিল শার্ট খুলতে খুলতে আলমারির দিকে গেল।
– হ্যাঁ হঠাৎ কাজ পরে গিয়েছে। ওয়েট আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি।
নওমি মাথা নাড়ল। আহিল যেতেই নওমির একা একা বোরিং লাগায় সে একটা ম্যাগাজিন নিয়ে বসলো। বিছানার বালিশে হেলান দিয়ে আরাম করে নওমি ম্যাগাজিনের পাতা উল্টাচ্ছিল। একটু পরই ওর হাত থেকে ম্যাগাজিনটা কেড়ে নেওয়া হলো। নওমি মুখ তুলে তাকাতেই দেখল আহিল অলরেডি ওর সামনে এসে বসেছে। তার পরনে একটা ক্যাজুয়াল ট্রাউজার আর টি-শার্ট, চুলগুলো এখনো ভেজা। আহিল কিছু না বলে ওর চাদরে ঢাকা পা দুটো টেনে নিজের কোলের ওপর তুলে নিল।
নওমি একটু হকচকিয়ে গিয়ে বলল,
– কী করছেন আহিল? পায়ে হাত দিচ্ছেন কেন?
আহিল সেদিকে বিন্দুমাত্র কান দিল না। ও নওমির একটা পা নিজের হাতের তালুতে নিয়ে টিপে দিতে দিতে নির্বিকার বলল,

– তোমার যে পা ব্যথা করছে তাই টিপে দিচ্ছি।
নওমি পা সরাতে চেয়ে বললো,
– ব্যথা নেই। টিপতে হবে না রেস্ট নিন আপনি।
– বেশি কথা না বলে চুপ থাকো। আমি এখন আমার পেশেন্টের সেবা করছি। সারাদিন হসপিটালে কত পেশেন্ট দেখি, আর ঘরের আসল পেশেন্টটার দিকে একটু নজর দেওয়ার সময় পাই না। আজ কোনো অজুহাত শুনব না। আমি জানি তোমার পা ব্যথা করছে, গতকাল হসপিটালে ওই অতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার ফল এটা, তাই তো? কালকে আমার আরো কেয়ারফুল থাকা উচিত ছিলো!
বলতে বলতে নওমির পা যত্ন করে টিপে দিচ্ছে সে। আহিলের হাতের স্পর্শে ব্যথা সত্যিই কমছে। নওমি একদৃষ্টে আহিলের সেই মনোযোগ দিয়ে পা টিপে দেওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। এই পুরুষটা বাইরে কত গম্ভীর কত কড়া একজন ডক্টর অথচ ওনার এই চার দেয়ালের ভেতর ওর রূপটা কতখানি নরম আর ভালোবাসায় জড়ানো!
নওমি কোলে একটা বালিশ টেনে নিয়ে তার উপর কনুই রেখে হাতের তালুতে নিজের চিবুকটা ঠেকিয়ে বড্ড আহ্লাদী গলায় বলল,

– ডক্টর সাহেব আপনি আমায় এত ভালোবাসলে, এত যত্ন করে আমি কিন্তু বড্ড লোভী হয়ে যাব। তখন সারাজীবন শুধু আপনার এই আদরটুকুই চেয়ে বসব।
আহিল হাতের কাজ থামিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে নওমির মুখের দিকে চাইল। একটু চেয়ে থেকে বড্ড গভীর আর মাতাল করা স্বরে বলল,
– লোভী হও নওমি, আরও লোভী হও। এই আহিলের পুরো অস্তিত্বটাই তো এখন তোমার নামে লিখে দেওয়া। আর এই ভালোবাসার বিনিময়ে তুমি ডক্টর সাহেবকে নাহয় সারাটা জীবন বিশ্বাস আর ভরসা করে তার সংসারটা আগলে যেও?
নওমি আহিলের এই কথার পিঠে কী উত্তর দেবে, তা যেন ক্ষণিকের জন্য হারিয়ে ফেলল। আহিল একটু সময় নিয়ে বললো,
– কী হলো ম্যাডাম? মুখ ফুটে তো কিচ্ছু বললে না?
নওমি হেসে বললো,
– ভাবছি!
– কি?

– এই যে আপনি সারাদিন পর হাসপাতাল থেকে এসে ক্লান্ত শরীরে আমার পা টিপে দিচ্ছেন, কেউ দেখলে বলবে বউটা এসে ছেলেটাকে একেবারে আঁচলে বেঁধে ফেলেছে!
বলেই বাচ্চাদের মতো খিলখিল করে হেসে ফেলল নওমি। আহিল ও মৃদু হাসল।
– কে কী ভাবল তা দিয়ে আমার কিচ্ছু যায় আসে না। আর আঁচলে বাঁধার কথা বলছ? আমি তো নিজেই তোমার ওই আঁচলে সারাজীবনের জন্য বন্দি হতে চেয়েছিলাম। সেখানে জোর করে কেউ আমাকে বাঁধেনি, আমি নিজের ইচ্ছায় ধরা দিয়েছি।
নওমিও কম যায় না সে আবারও হেসে বললো,

– আপনি এত সুন্দর করে কথা বলতে কবে থেকে শিখলেন আহিল? আমার তো মনে হয় হাসপাতালের সব নার্স আর পেশেন্টরা আপনার এই রূপ দেখলে ভিরমি খাবে!
আহিল এবার আর নিজের হাসি চেপে রাখতে পারল না। ও ঘর কাঁপিয়ে হেসে উঠল। নওমির দিকে তাকিয়ে এক চোখ টিপে বলল,

নূর ই মহব্বত পর্ব ৩৩

– কথা অবশ্য মিথ্যে বলো নি! তবে এই রূপটা শুধু আমার নূরের জন্য সংরক্ষিত ম্যাডাম, বাকি দুনিয়ার জন্য আমি ওই কড়া ডক্টর আযলানই ভালো। এবার বলো, রাতের খাবার খাবে না? নাকি ডক্টর সাহেবের এই আদর খেয়েই পেট ভরে গেছে?

নূর ই মহব্বত পর্ব ৩৫

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here