নূর ই মহব্বত পর্ব ৩২
তাবাসসুম তাজ্বওয়ারী
– তুমি!!!
নওমি একবার ঘরের ভেতর তাকাল আহিলের পানে। ওর চাউনি দেখে আহিল এগিয়ে আসলো দরজার সামনে। দরজায় দাঁড়িয়ে হেসে বললো,
– আসসালামু আলাইকুম! ভেতরে আসুন!
তারপর নওমির দিকে চেয়ে বললো,
– ভেতরে যেতে দিবে না? বাইরেই দাঁড় করিয়ে রাখবে?
নওমি হতভম্বের মতো দাঁড়িয়েই রইলো। খানেক বাদে অস্ফুট স্বরে বলল,
– তুমি এখানে?
হুট করে কোথা হতে মাথা বের করে একজন বলে উঠলো,
– আমি নিয়ে এসেছি!
আড়াল থেকে বেরিয়ে আসলো তুহি তবে একা নয় সাথে রয়েছে সাইফও! নওমি চক্ষু কোটর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম! সামনে দাঁড়িয়ে তার নিজের বাবা।
তার বুকের ভেতরটা হুট করে মোচড় দিয়ে উঠল। এতদিনের চেপে রাখা কষ্ট, অপমান আর অভিমানগুলো এক জোটে ওর গলার কাছে দলা পাকিয়ে এল। ও কিছু বলতে চাইল, কিন্তু গলা দিয়ে কোনো স্বর বের হলো না। সবটা গিলে নিয়ে দরজা থেকে সরে দাঁড়াল। সাইফ হালকা স্বরে বললো,
– আপু…?
নওমি হাসার চেষ্টা করে বললো,
– ভেতরে আয়!
– টুয়ি…
বলেই আদনান দৌঁড়ে ছুটে গেল তুহির দিকে। তুহি ঝুঁকে ওকে কোলে নিয়ে আদরে আদরে আদরে ভরিয়ে দিতে দিতে বললো,
– আদনান! আমার আদু কেমন আছিস তুই? খালামণিকে তো একদম ভুলে গেছিস! কত বড় হয়ে গেছিস তুই!
আহিল হেসে বললো,
– জান্নাত ভেতরে এসো! বাইরে দাঁড়িয়েই সব গল্প শেষ করবে নাকি? আপনারও ভেতরে আসুন।
তুহি আদনানকে নিয়ে সোফায় বসলো। আদনান ওর গলা জড়িয়ে ধরে বললো,
– টুয়ি পচা হয়ে গিচে।
– কেন আমি কি করলাম?
– আতনানকে বালুবাচে না! আচে না আমার কাচে
তুহি হেসে ফেললো। ওর ফোলা গালে ঠোঁট চেপে বললো,
– তুহি নাহয় ভালোবাসে না! আদনানও বাসে না বুঝি? সেও তো আমায় দেখতে গেল না? সে তো বললো না মা আমি তুহি খালামনির সাথে কথা বলবো কল দাও! বলেছে?
আদনান কিছু চিন্তা করার ভঙ্গি করলো। আদনান কিছু চিন্তা করার ভঙ্গি করল। ও বুড়ো আঙুলটা গালের ওপর ঠেকিয়ে চোখ দুটো গোল গোল করে সিলিংয়ের দিকে তাকাল, যেন কত বড় একটা জটিল অঙ্ক মিলাচ্ছে! ওর এমন পাকা পাকা ভাব দেখে বাকিরা চোখ বড় করে তাকালো। একটু পর আদনান তুহির দিকে এক চোখ বন্ধ করে তাকাতেই তুহি আর আহিল দুজনেই হেসে ফেলল। আদনান এবার নিজের ছোট ছোট হাত দুটো দিয়ে তুহির গাল দুটো দুপাশে চেপে ধরে নিজের আধো আধো গলায় বলল,
– আমি তো ছুটো বাবু, আমার তো ফুন নাই।
আদনানের এই কথায় পুরো ড্রইং রুমে হাসির রোল পড়ে গেল। এরপর তুহি আর আদনান কথার ঝুড়ি খুলে বসেছে। নওমি এসে সোফায় বসে সাইফ আর ওর বাবার দিকে তাকাল। সাইফের মাথায় হাত বুলিয়ে হেসে বললো,
– কেমন আছিস সাইফ?
– ভালো আছি আপু! তুমি তো আমাদের ভুলে গেছো! আমাদের খোঁজখবর তো নাও না!
– কে বলেছে? তোকে আমার নাম্বার দিলাম না? কল তো দিলি না!
সাইফও জবাব দিল,
– কল কেন দিব? সরাসরি দেখা করে যাবো তাই তো চলে এলাম।
নওমি হাসলো। বাবার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো,
– কেমন আছেন? আম্মু কেমন আছে?
নওমির বাবা আলতো হেসে বললেন,
– আলহামদুলিল্লাহ আছি কোনোরকম।
নওমিও হেসে বললো,
– আলহামদুলিল্লাহ!
তুহি বলে উঠলো,
– আমি কয়দিন যাবত ভাবছিলাম আসব বুঝলি? পরে আবরার বলল সাইফ নাকি ওকে বলেছিল তোর সাথে দেখা করবে তাই ভাবলাম আঙ্কেল আর সাইফ দুজনকেই নিয়ে আসি।
নওমি হেসে বললো,
– ভালো করেছো আপু! সাইফ? আম্মুকে নিয়ে আসিসনি কেন? আনলে ভালো হতো। আনায়া? ওকেও আনিস নি!
সাইফ একটা গভীর শ্বাস ফেলে বলল,
– আম্মু আমাদের সাথে থাকে না আপু।
নওমির পুরো আকাশ থেকে পড়ার মতো অবাক হয়ে বলল,
– মানে? থাকে না মানে কী? কোথায় থাকে তাহলে?
এবার নওমির বাবা নড়েচড়ে বসলেন। উনি গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
– ওই বেটিকে ওইদিনই আমি বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছি রে মা! ওর জায়গা আমার বাড়িতে আমার সংসারে আর কোনোদিন হবে না।
বাবার মুখে এমন কঠিন আর অপ্রত্যাশিত কথা শুনে নওমি স্তব্ধ হয়ে ওনার দিকে তাকিয়ে রইল। ও যেন নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারছে না। যে সৎ মায়ের কথায় একসময় বাবা অন্ধ ছিলেন, যাঁর একটা ইশারায় নওমিকে ঘরছাড়া হতে হয়েছিল, আজ সেই মানুষকে বাবা নিজেই তাড়িয়ে দিয়েছেন? এতটাই ভাবেনি সে।
এবার সাইফ বললো,
– হ্যাঁ আপু। আম্মার ওই নোংরা মানসিকতার জন্য আমরা তোমাকে হারিয়েছিলাম। আমি তো দেখতাম তোমার সাথে কেমন করতো! বাবা যখন সত্যিটা জানতে পারল, তখন আর এক মুহূর্তও আম্মাকে সহ্য করেনি। তোমরা চলে আসার পরই বাবা আম্মাকে পাঠিয়ে দিয়েছে। আমিও যাই নি সাথে। আমার সহ্য হয় না কিন্তু…
সাইফ একটু চুপ থেকে বলল,
– কিন্তু আনায়া তো আম্মাকে ছাড়া থাকতে পারে না। ও চলে গেছে আম্মার সাথে। আম্মু কয়েকবার ফিরতে চেয়েছিলো কিন্তু বাবা মেনে নেয়নি। আমিও চাইনি আমার জীবনে অমন একটা মানুষ থাকুক।
সাইফের গলার স্বর শেষলগ্নে এসে একটু ভারী হয়ে গেল। সৎ মায়ের ওপর চরম ক্ষোভ থাকলেও নিজের ছোট বোন আনায়ার জন্য ওর মনে একটা সুপ্ত টান রয়ে গেছে, যা ওর চেহারায় স্পষ্ট। নওমি কিছু বলার আগে আহিল বললো,
– নওমি তুমি বসে আছো কেন? ওনাদের খালি মুখে বসিয়ে রাখবে? নাস্তা দিবে না?
তুহি আদনানকে কোল থেকে নামাতে নামাতে বললো,
– চল নওমি আমি তোকে সাহায্য করছি।
আহিল উঠে দাঁড়িয়ে বললো,
– তুমি বসো তোমার কিছু করতে হবে না। আমি আছি। মেহমানকে দিয়ে কাজ করাবো নাকি আমি হু?
– করলে কি হয়েছে?
– এতদিন তো ডক্টর আযলানের ধমক খেয়েছো আজ নাহয় তার হাতের নাস্তা খাও?
তুহি হেসে ফেলল।
– সেটা অবশ্য আমার জন্য ভাগ্যের ব্যাপার!
আহিল হাসল। আবার বললো,
– আবরার আসলো না যে?
– ও কাজ থেকে এখানে চলে আসবে। আমি বলে এসেছি।
– আচ্ছা বসো তাহলে। নওমি চলো আমি হেল্প করছি।
নওমি চুপচাপ উঠে রান্নাঘরে চলে গেল। পেছন পেছন গেল আহিল। নওমি চুপচাপ সব গুছিয়ে বাটিতে নিচ্ছে আর আহিল একটু আধতু সাহায্য করছে। নওমির এতটা শান্ত হয়ে থাকা আহিলকে ভাবাচ্ছে। সে আশেপাশে তাকিয়ে গলা খাঁকারী দিয়ে বললো,
– তুমি খুশি হও নি?
নওমির নির্বিকার উত্তর,
– কীসের জন্য?
আহিল থতমত খেলো তবুও নিজেকে সামলে বললো,
– এই যে তুহি, তোমার বাবা ভাই আসলো আমাদের বাসায়।
এবার হাতের কাজ থামিয়ে আহিলের দিকে ফিরলো নওমি। ঠান্ডা স্বরে বললো,
– আপনিই ওদের এনেছেন তাই না?
আহিল হাসার চেষ্টা করে বললো,
– আ.. আমি? তুহি তো বললো…
আহিলকে থামিয়ে দিয়ে নওমি বললো,
– ওইসব মিথ্যে আমি জানি। আপনিই ওদের এনেছেন।
নওমির অস্বাভাবিক আচরণে আহিল ব্যাকুল হলো। অস্থির কণ্ঠে বললো,
– তুমি খুশি হও নি? তুমি চাওনি ওরা আসুক? আমি কি কোনভাবে তোমায় কষ্ট দিয়ে ফেললাম?
নওমির চোখ দুটো ছলছল করে উঠলো। সরাসরি আহিলের চোখের দিকে তাকিয়ে বললো,
– আমি খুশি হবো না মানে? আপনি মাথায় রেখেছেন আমি কি চেয়েছিলাম?
নওমি মনে পড়লো ও একবার আহিলকে বলেছিল বাড়ির খবর নিতে। সবার খবর নিতে। ওর বেশ কিছুদিন ধরে বাড়ির সবার কথা মনে পড়ছিল। আহিলযে এত ব্যস্ততার মাঝে ওর এই বিষয়টাও সিরিয়াসলি চিন্তা করবে সে ভাবে নি!
আহিল মুচকি হেসে বললো,
– তোমার সাথে জড়ানো প্রতিটা মানুষ, প্রতিটা স্মৃতি আমার মুখস্থ নওমি। ডক্টর আযলান তার রানিকে কখনো কোনো আক্ষেপের মাঝে বাঁচতে দেবে না। তোমার চোখের কোন চাউনির পেছনে কী লুকিয়ে থাকে, তাও এই ডক্টরের একদম ঠোঁটস্থ। তোমার অতীতের প্রতিটা ক্ষ’ত শুকানোর দায়িত্ব এখন এই ডক্টর আযলানের…এই চওড়া বুকটা শুধু তোমার মাথা রাখার জন্য নয়, তোমার জীবনের সব ঝড়ঝাপটা একলাই সামলে নেওয়ার জন্য তৈরি।
আহিলের এই তীব্র ভালোবাসাময় স্বীকারোক্তি নওমির বুকের ভেতর তোলপাড় সৃষ্টি করল। নওমি আর নিজের আবেগকে আটকে রাখতে পারল না। এতক্ষণ বাবা ভাইকে দেখেও নিজেকে নরম করতে না চাওয়া মেয়েটা এই একজনের সামনে সকল কঠোরতা বিসর্জন দিয়ে দিল। চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে আহিলকে জড়িয়ে ধরলো। আহিলের বুকে মুখ লুকিয়ে ভাঙা গলায় ফিসফিস করে উঠল,
– আপনি বড্ড ভালো আহিল, বড্ড বেশি ভালো! আপনি এতটা পাগল কেন, বলুন তো? আপনি তো আমার অভ্যাস খারাপ করে দিচ্ছেন এভাবে! আমি তো শুধু খবর নিতে বলেছিলাম কিন্তু আপনি… অথচ সামনে ক্রেডিট দিচ্ছিলেন তুহির ওপর? সত্যি, ডক্টর সাহেব বড্ড চতুর!
আহিল একটা গভীর ও স্বস্তির শ্বাস ফেলল। নওমির কাঁপতে থাকা শরীরটাকে নিজের দুই চওড়া বাহুর মাঝে শক্ত করে জড়িয়ে নিল। ওনার এক হাত নওমির পিঠে আর অন্য হাত ওনার রেশমি চুলে বিলি কেটে দিতে দিতে ওর চুলের ভাঁজে চুমু খেয়ে বললো,
– তোমার কষ্টের দিনগুলো ফিরিয়ে দিতে আমি পারবো না তবে এখনের দিনগুলো যেন সর্বোচ্চ সুন্দর হয় সেই চেষ্টা আমি করতে পারব। তুমি শুধু আমার হাতটা শক্ত করে ধরে থেকো, বাকি পথটা আগলে রাখার জন্য এই আহিল একাই যথেষ্ট।
বেশ কিছুক্ষণ এভাবেই কেটে গেল। কিছুক্ষণ পর নওমি নিজেই একটু লজ্জা পেয়ে আহিলের বুক থেকে মাথা তুলল। ওর শক্ত বুকে হালকা একটা কিল মেরে চোখ মুছে বলল,
– হয়েছে, আর মন ভোলানো কথা বলতে হবে না ডক্টর সাহেব! বাইরে ওনারা কতক্ষণ ধরে বসে আছেন। এবার ছাড়ুন, চটপট নাস্তাগুলো নিয়ে চলুন।
আহিল নাস্তার প্লেট হাতে নিতে নিতে বললো,
– আবেগ শেষ হলে আহিলের সব কথায় মন ভোলানো মনে হয়। এক কষ্ট রাখার জন্য একটা এক্সট্রা প্লেট দিলে ভালো হয় নওমি ম্যাডাম?
নওমি হেসে বললো,
– চলুন তো! শুধু উল্টাপালটা কথা আপনার!
ওরা ড্রয়িংরুমে ঢুকতেই দেখা গেল তুহি আর আদনানের খুনসুটি তখনো চলছে। তুহির কাছ থেকে চকলেট আদায় করে নিয়েছে আদনান। নওমি চোখ রাঙ্গিয়ে বললো,
– তুমি আবার চকলেট খাচ্ছো আদনান? দাঁতে যে পো’কা আছে সেটা ভুলে গেলে? এখন চকলেট খেয়ে পরে কান্নাকাটি করে আমার কাছে আসবে না বলে দিলাম!
– কি বলছিস? দাঁতে পো’কা হয়েছে?
– হয়েছে মানে প্রতিদিন কান্নাকাটি করে এই ব্যথার জন্য! আর কি যে দুষ্টু হচ্ছে দিনদিন তুমি যদি জানতে!
– থাক যার বাবা ডক্টর তার চিন্তা নেই। ডক্টর আযলান আছে তো!
– আরেকটা বলছিস? সবাই শুধু প্রশ্রয়ই দিচ্ছিস! শাসন করলেই দোষ হয়ে যাচ্ছে আমার!
সাইফ সোফায় আরাম করে বসে একটা মিষ্টি মুখে পুরে দিয়ে বলল,
নূর ই মহব্বত পর্ব ৩১
– আপু! ছোটবেলায় তুমি আমাকে যেমন শাসন করতে, এখন ভাগ্নেকেও সেই একই ডায়লগ দিচ্ছো! হু?
নওমির বাবা হাসলো মেয়ের ভরা সংসার দেখে। মেয়ের জন্য যেইটুক চিন্তা করে তার কিছুটা হলেও কমলো বোধহয় নিজের চোখে দেখে! কত কষ্ট পেয়ে তারপর এমন সংসার পেয়েছে!
