নূর ই মহব্বত পর্ব ৩১
তাবাসসুম তাজ্বওয়ারী
নওমি আপন মনে রান্নাঘরে খুটখাট করে কাজ করে যাচ্ছে। বিকেলের চায়ের কাপ পিরিচ আর ডিনারের প্লেট গোছাতে গোছাতে ও ইচ্ছে করেই একটু বেশি শব্দ করছে, যাতে পাশের রুম থেকে কেউ ওর রাগটা টের পায়।
বেচারা আহিল দুইবার গিয়ে ফেরত এসেছে। ও কিছু বললেও কোনো উত্তর দিচ্ছে না। দিলেও মেপে মেপে।
আহিল ড্রয়িংরুমে ল্যাপটপ নিয়ে বসার চেষ্টা করলেও ওর পুরো মনোযোগ রান্নাঘরের দিকে। ও একটা গভীর শ্বাস ফেলে ল্যাপটপটা বন্ধ করে উঠে দাঁড়াল। ধীরপায়ে রান্নাঘরের দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়াল ও। নওমি পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে কাজ করছে। আহিল একটু গলা ঝেড়ে খুব স্বাভাবিক গলায় বলল,
– নওমি, আলমারির ওপরের তাকে আমার একটা জরুরি ফাইল রাখা ছিল। ওটা কি তুমি অন্য কোথাও সরিয়েছ? আমি খুঁজে পাচ্ছি না।
নওমি হাতের কাজ থামাল না। ও চুলার আঁচটা একটু কমিয়ে দিয়ে খুব নিরাসক্ত গলায় জবাব দিল,
– যেখানে ছিল ওখানেই আছে। ভালো করে দেখুন।
ব্যস, ওইটুকুই। ও মুখ ফিরিয়ে আহিলের দিকে একবার তাকালও না। আহিল কিছুক্ষণ ওখানেই দাঁড়িয়ে রইল। নওমির এই এড়িয়ে যাওয়া ভাবটা ওর বুকে তীরের মতো বিঁধল। ও কোনো উপায় না পেয়ে আবার নিজের রুমে ফিরে গেল। ফাইলটা হাতে নিলো। ও তো আগেই পেয়েছে ফাইলটা কিন্তু নওমির সাথে কথা বলার ছুতো খুঁজে ও গিয়েছিল ফাইলের কথা বলতে। ও ফাইলটা নিয়ে আবার রান্নাঘরের দিকে গেল। এবার ও আরো একটা ছুতো খুঁজল নওমির সাথে আরেকটু কথা বলার।
আহিল আবার রান্নাঘরে ঢুকে সেলফের ওপর ফাইলটা রেখে বলল,
– হ্যাঁ, পেয়েছি। আসলে ফাইলটা একটু আড়ালে চলে গিয়েছিল তো, তাই খেয়াল করিনি। আচ্ছা, চা কি হয়ে গেছে? মাথাটা খুব ধরেছে আজ।
নওমি কিছু না বলে চা বানিয়ে ওর দিকে এগিয়ে দিলো। আহিল ওখানেই দাঁড়িয়ে চায়ে চুমুক দিয়ে বলল,
– আমি মিষ্টি কম খাই তুমি জানো না? আজকে বেশি দিয়েছো বোধহয়!
– ঠিকই দিয়েছি। যান তো আমাকে জ্বালাবেন না। কাজ করছি আমি।
আহিল শুনল। জ্বালালো না সে। সময় নিয়ে চা শেষ করলো। তারপর কাপটা নওমির সামনে রেখে বুকে হাত গুঁজে বললো,
– এবার বলো?
নওমি ভ্রু কুঁচকে বলল,
– কি বলবো?
– কি সমস্যা? তুমি এড়িয়ে যাচ্ছো কেন হু?
– আমার কোনো সমস্যা নেই।
এবার আহিল এগিয়ে এসে বললো,
– আল্লাহ্! নওমি তুমি আমার কথা ধরে বসে আছো? আমি যে পা’গল তুমি জানো না? আদনান তোমার জন্য বসে ছিলো তুমি যাওনি ও একা একা ঘুমিয়ে পড়েছে! তুমি আমার কথা মনে রেখে ওকেও ইগনোর করেছো?
আদনান একা একা ঘুমিয়ে পড়েছে শুনে ওর বুকের ভেতরটা খুতখুত করে উঠল। ও যাবে যাবে ভেবে কাজ ফেলে যায়নি।
– আমি ওকে ইগনোর করিনি। আমি তো রান্নাঘরে কাজ করছিলাম, আপনি তো ছিলেন ওর কাছে!
আহিল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নওমির দুই কাঁধে নিজের হাত দুটো রাখল।
– আমি ছিলাম ঠিকই, কিন্তু ও তো ঘুমানোর সময় আম্মু আম্মু করে তোমার ওড়নাটা খুঁজেছিল। তুমি যাওনি দেখে বেচারা কাঁদতে কাঁদতে আমার বুকেই ঘুমিয়ে পড়েছে। এবার বলো, ডক্টর আযলান তো একটা আস্ত পা’গল, ও রাগের মাথায় কী না কী বলে ফেলেছে তার জন্য আমার এই পুচকে ছানাটার ওপর এভাবে রাগ করে থাকা কি ঠিক হয়েছে ম্যাডাম?
আহিলের মুখে নিজের জন্য এমন বিশেষণ শুনে নওমির ঠোঁটের কোণে একটা মৃদু হাসির রেখা ফুটে উঠতে গিয়েও মিলিয়ে গেল। ও মুখটা একটু শক্ত রাখার চেষ্টা করে বলল,
– আমি রাগ করিনি। আর আপনার ছেলে তো আপনারই, ও আমার ওড়না খুঁজতে যাবে কেন? আপনি তো কাল খুব বুক ফুলিয়ে বললেন “লাগবে না আমাদের বাপ-বেটার তোমাকে!” এখন আবার আমার খোঁজ করা হচ্ছে কেন?
নওমির তেজ ফিরে আসার আভাস পেয়ে আহিল মনে মনে খুশি হলো। ও মিটিমিটি হেসে নওমির কাঁধের বাঁধনটা আরও একটু মজবুত করে ওকে নিজের দিকে সামান্য টেনে আনল। ওনার চোখের ওই আড়ি-নেওয়া চাউনিটার দিকে তাকিয়ে খুব ফিসফিস করে বলল,
– ওহ! তাহলে আসল ক্ষোভটা এখানে? ওই কথাটার জন্য এই আহিল তো অলরেডি মনে মনে একশবার কান ধরে ওঠবোস করে ফেলেছে নওমি। কালকে আদনানের কান্না দেখে আমি জাস্ট নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিলাম। এই বুকে হাত দিয়ে বলো তো, তোমার এই আহিল কি তোমাকে ছাড়া এক মুহূর্ত চলতে পারবে? আমাদের বাপ-বেটার লাইফলাইনটাই তো তুমি!
আহিলের এমন সরাসরি আর ভালোবাসাময় স্বীকারোক্তিতে নওমির ভেতরের সমস্ত শক্ত অভিমানী বরফটা এক পলকে গলে গেল। তবে সে প্রকাশ করলো না। গাম্ভীর্য বজায় রেখে বললো,
– হয়েছে আর মন ভোলানো কথা বলতে হবে না। যান শুয়ে পড়ুন।
বলে সে কাজে হাত চালানো শুরু করল। আহিল মুখ ভার করে বললো,
– ডক্টর আযলানের সব প্রেসক্রিপশন এই ম্যাডামের মিষ্টি অভিমানের কাছে ফেইল মে’রে যাচ্ছে! আমি কি ডাক্তারি পড়লাম বলো তো?
আহিলের কথায় নওমি না চাইতেও ফিক করে হেসে ফেললো। নওমিকে হাসতে দেখে আহিলের মুখের মেঘ নিমেষেই কেটে গেল। ও যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেয়েছে! নিজের জয় সুনিশ্চিত বুঝতে পেরে ও নওমির আরেকটু কাছে ঘেঁষে দাঁড়াল। নওমি চট করে হাসি থামিয়ে আবার গম্ভীর হওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু ওর ঠোঁটের কোণের চঞ্চল ভাঁজ ওর ভেতরের সবটুকু নরম ভাব ফুটিয়ে তুলছিল।
নওমি ওর থেকে আলতো করে আহিলের হাতে চাপড় দিয়ে বলল,
– কী হাসছেন কেন? একদম হাসবেন না। যান এখান থেকে।
আহিল এবার নওমির কোমরে দু-হাতে আলতো করে জড়িয়ে ধরে ওকে নিজের সাথে একদম লেপ্টে নিল। ওনার এই হুট করে করা কাণ্ডে নওমি অপ্রস্তুত হয়ে দু-হাত দিয়ে আহিলের শক্ত বুকটা ঠেলে দূরে সরানোর চেষ্টা করতে করতে শাসালো,
– এই একদম দূরে যান! আমার রাগ এখনো কমেনি! আর যেকোনো সময়…
আহিল ওকে বলতে দিলো না বরং সেকথায় পাত্তাই দিল না। ও নওমির থুতনিতে নিজের আঙুল ছুঁইয়ে ওর মুখটা একটু ওপরে তুলে ধরল। ওনার চোখের গভীর, মাতাল করা চাউনিটা নওমির চোখের ওপর স্থির রেখে খুব নিচু আর ভারী গলায় বলল,
– কে আসবে শুনি? আম্মা তো বাসায় নেই। আর আমাদের ওই ক্ষুদে কাবাব মে হাড্ডি তো এখন নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে। এখন শুধু তুমি আর আমি। এবার বলো, আর কি শাস্তি দিলে রাগ কমবে হু?
আহিলের এমন মাতাল করা চাউনি নওমির সমস্ত শরীর অবশ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। ও বুকের ভেতরের ধুকপুকানি আড়াল করার আপ্রাণ চেষ্টা করে একটু শক্ত হওয়ার ভান করল। আহিলের শক্ত বুকে হালকা ধাক্কা দিয়ে মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে বিড়বিড় করে ভেঙিয়ে বলল,
– রাগ কমবে হু? কালকে ওমন করে বুক ফুলিয়ে কথা বলা হচ্ছিল, মনে নেই বুঝি!
আহিল একটু ঝুঁকে নওমির মুখ ফেরানো গালের খুব কাছে নিজের ঠোঁট দুটো নিয়ে গেল। আহিল খুব আদুরে গলায় বলল,
– সব মনে আছে রে বাবা। সেই পাপেরই তো প্রায়শ্চিত্ত করছি। এই যে ডক্টর আযলান হসপিটালের এত বড় বড় সার্জারি সামলায়, সে এখন একটা সাধারণ মেয়ের রাগ ভাঙাতে গিয়ে ঘামছে এটা কি কম শাস্তি?
নওমি এবার হেসে ফেলল আবারও। হেসেই বললো,
– হয়েছে আর নিজের গুণগান গাইতে হবে না। ছাড়ুন এবার, আবার এমন করলে কঠিন পানিশমেন্ট!
– কখনো না, পাগলি! ওমন ভুল এই আহিল জীবনে আর দ্বিতীয়বার করবে না। আমার এই ‘নূর-ই-মহব্বত’ তোমায় ছাড়া যে একদম অন্ধকার, তা কি আমি জানি না?
নওমি এবার আর নিজেকে আটকে না রেখে আলতো করে আহিলের বুকে নিজের কপালটা ঠেকিয়ে দিল। এতক্ষণের জমে থাকা সবটুকু অভিমানের মেঘ কেটে গিয়ে সেখানে কেবলই এক জোড়া হৃদয়ের ভালোবাসার ওম ছড়িয়ে রইল।
সকাল থেকে নওমি কাজ করতে করতে ক্লান্ত। বাসায় নাকি মেহমান আসবে আহিল বলেছে কিন্তু কে আসবে সেটা বলছে না। এটা নাকি সারপ্রাইজ। নওমিও কথা না বাড়িয়ে হাতের কাজ শেষ করছে। ড্রইং রুমে আহিল আর আদনান বসে ল্যাপটপে কি যেন করছে। নওমি অনেকক্ষণ রান্নাঘর থেকে সেটা খেয়াল করছে কিন্তু কি করছে বুঝতে পারছে না। একটু পর পর গুজুরগুজুর ফুসুরফুসুর করছে। নওমি কৌতূহল নিয়ে ওদের পেছনে গিয়ে উঁকি দিল। দেখল ল্যাপটপের স্ক্রিনে রংবেরঙের প্লাস্টিকের বাচ্চাদের খেলনা আর ক্রাশ-প্রুফ শোপিসের একটা বিশাল অনলাইন পেজ খোলা!
– কী হচ্ছে এখানে বাবা ছেলের? এত মনোযোগ দিয়ে কী দেখা হচ্ছে?
নওমির আওয়াজে আহিল পেছনে ফিরে ওকে উঁকি দিতে দেখলো। হেসে বললো,
– খুব দরকারি কাজ করছি ম্যাডাম। এই যে দেখো, এগুলো হলো আনব্রেকেবল সিলিকন শোপিস। আদনান এটা আ’ছাড় দিলেও ভাঙবে না, ওর হাতও কা’টবে না, আর ওর আম্মুর রাগও উঠবে না! আমি অলরেডি পুরো এক ডজন অর্ডার দিয়ে দিয়েছি।
আদনান বাবার কথা শুনে খুশিতে লাফিয়ে উঠে নওমির কাছে গিয়ে বলল,
– মা দেকো! বাবা আনতেচে ইয়েএএএ! বাবা বোলচে আমি দুমদাম আ’চা’ড় দিব, বাঙবে না।
নওমি চোখ দুটো সরু করে বলল,
– বাহ ডক্টর সাহেব! খুব তো বুদ্ধি বের করেছেন দেখছি? ছেলের বাঁদরামি থামানোর কোনো লক্ষণ নেই, উল্টো ও যাতে আরও বেশি করে আ’ছাড় মারতে পারে, সেই ব্যবস্থা করে দেওয়া হচ্ছে?
নওমির এমন ঝাড়িমিশ্রিত কথা শুনে আহিল একদম নিষ্পাপ একটা মুখভঙ্গি করল।
– আরে এটা প্রশ্রয় না! একে বলে স্মার্ট প্যারেন্টিং। আদনানেরও শখ মিটল, ও নতুন জিনিস নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করতে পারল, আর আমাদের ঘরের দামি শোপিসগুলোও প্রাণে বেঁচে গেল। ওয়ান টাইম ইনভেস্টমেন্ট, বুঝলে না?
নওমি টেবিল পরিষ্কার করতে করতে বলল,
– আপনার ডক্টর না হয়ে বিজনেসম্যান হওয়া উচিত ছিলো বুঝলেন?
নওমির এমন টিপ্পনী শুনে আহিল উচ্চস্বরে হেসে উঠল।
– ডক্টর আযলান তো অলরেডি একটা অনেক বড় লাভজনক বিজনেস করে ফেলেছে ম্যাডাম!
নওমি হাত চালানো থামিয়ে একটু কৌতূহল নিয়ে ওর দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে বলল,
– কীসের বিজনেস শুনি?
– এই যে, তোমার মতো এত দামী আর সুন্দর একটা বউকে নিজের লাইফটাইম পার্টনার বানিয়ে ঘরে এনেছি। সারাদিন চোখের সামনে থাকো এটা কি কোনো সাধারণ লাভজনক চুক্তি? পুরো লাইফের লাভ এই এক ইনভেস্টমেন্টেই উঠে গেছে!
আহিল চোখ টিপে বলতেই নওমির ফর্সা গাল দুটো আবার লজ্জায় লাল হয়ে উঠল তবুও সরু চোখে চেয়ে সে বলল,
– এই আপনি কি সারাদিন এইসব বলবেন?
নওমির কৃত্রিম ধমকের মুখে আহিল একগাল হেসে নিজের দুই কাঁধ সামান্য ওপরে তুলল, যেন সে কতই না নিরীহ!
– সারাদিন বলব না তো কখন বলব, হ্যাঁ? বউয়ের প্রশংসা করাও সওয়াব হু! তুমি আমাকে সওয়াব কামানো থেকে আটকাতে পারো না!
নওমি কিছু বললো না। নিজের কাজ শেষ করে ঘড়ির দিকে তাকাল। তারপর বলল,
– অনেক তো হলো! এবার আসল কথাটা বলুন তো ডক্টর সাহেব? সকাল থেকে তো খাটুনি গেল। এত যে আয়োজন করছি, মেহমানটা আসলে কে? কোনো হিন্টস অন্তত দিন!
আহিল রহস্যময় এক চিলতে হাসি হাসল।
– হিন্টস একটাই ম্যাডাম যিনি আসছেন, তিনি আমাদের জীবনের এই কালবৈশাখী মেঘ কেটে যাওয়ার পর প্রথম বসন্তের আলো নিয়ে আসছেন। আর হ্যাঁ, ওনার সাথে তোমার এই ডক্টর আযলানেরও একটা পুরোনো হিসাব বাকি আছে।
আহিলের কথার এই ধাঁধা নওমিকে আরও বেশি ভাবিয়ে তুলল। ও কিছু একটা আন্দাজ করার চেষ্টা করতেই হুট করে ড্রয়িংরুমের দেয়াল ঘড়িটা ঢং ঢং করে ঠিক বারোটা বাজার জানান দিল। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই পুরো বাড়ি কাঁপিয়ে বাইরের মেইন দরজার কলিংবেলটা একটানা বেজে উঠল।
আদনান এক লাফে সোফা থেকে নেমে দরজার দিকে ছুট লাগাল,
নূর ই মহব্বত পর্ব ৩০
– মেমান এসেচে! মেমান এসেচে!
আহিল চোখের ইশারা করে বললো,
– যাও দরজা খুলো।
দরজা খুলতেই নওমির চোখের সামনে ভেসে উঠল একটা পরিচিত চেহারা। অস্ফুট স্বরে উচ্চারণ করলো,
– তুমি!!!
