Home নূর ই মহব্বত নূর ই মহব্বত পর্ব ৩৩

নূর ই মহব্বত পর্ব ৩৩

নূর ই মহব্বত পর্ব ৩৩
তাবাসসুম তাজ্বওয়ারী

সেদিনটা বেশ ভালোই কেটে গেল সকলের। নওমির মনে হয়েছে সে যেন সব ফিরে পেয়েছে। নয়না বেগম সকলকে থাকতে বলেছেন কিন্তু কিন্তু তারা আজই ফিরে যাওয়ার কথা বলছে। বিকেলে নাস্তা দিয়ে সকলে কথা বলছিল। তখন নওমির বাবা বলে উঠলো,
– তোর সংসার দেখে আমার মন ভরে গেছে রে মা! অনেক সুখী হো তুই! কিন্তু… তুই কি আর কোনোদিন ওই পুরোনো বাড়িতে ফিরবি না? সব তো এখন শেষ। যে তোকে তাড়িয়েছিল, সে আর ওই বাড়িতে নেই। বাড়িটা বড্ড খালি খালি লাগে মা। তুই কি আসবি না কখনো?
ড্রইংরুমের চঞ্চল পরিবেশটা হুট করে যেন কিছুটা নিঝুম হয়ে পড়ল। আহিল এক কোণে দাঁড়িয়ে শান্ত চোখে নওমির দিকে চাইল। ও নওমিকে চেনে, ও জানে এই মুহূর্তে নওমির মনের ভেতর ঠিক কী চলছে। নওমি আলতো করে একটা শ্বাস ফেলল। ও শান্ত কণ্ঠে বললো,

– তুমি আমার বাবা। এত বছর পর তোমার এই অনুশোচনা, তোমার এই মেয়েকে ফিরে পাওয়ার আকুলতা আমার সব অভিমান ধুয়ে দিয়েছে বাবা। তুমি তোমার মেয়ের সংসারে যখন খুশি আসবে, যত দিন খুশি থাকবে, আমার কোনো আপত্তি নেই। তোমার জামাই তো তোমায় মাথায় করে রাখবে। কিন্তু…
নওমি একটু থামল।
– কিন্তু আমায় আর ওই বাড়িতে ফিরে যেতে বোলো না বাবা। আমি ওখানে আর যেতে পারব না, যেতে চাইও না। যে চার দেয়াল আমাকে প্রতিটা সেকেন্ড শুধু অপমান আর লাঞ্ছনা দিয়েছে, যেখানে আমার প্রতিটা রাত কেটেছে একলা এক বুক কান্না আর আতঙ্কে সেই স্মৃতির খাঁচায় আমি আর নিজেকে বন্দি করতে পারব না বাবা। অতীতকে আমি ক্ষমা করেছি ঠিকই, কিন্তু সেই অতীতে ফিরে যাওয়ার ক্ষমতা আমার নেই। এই আমার যে বর্তমান… এটাই এখন আমার আসল ঠিকানা।
নওমির বাবা এর বিপরীতে আর কিছু বলার জন্য খুলে পেলেন না। ভুল তো বলেনি মেয়েটা। মেনে নিলো নওমির কথা। নওমিকে কোনো রূপ জোরাজোরি করলো না। মেয়ে এখানে সুখে থাকলে ভালো থাকলেই হলো! নয়না বেগম কথা ঘুরতে বলল,

– আমার মেয়ে এই বাড়ি থেকে গেলে আমার বাড়ি ফাঁকা হয়ে যাবে না? তখন আমরা একা কিভাবে থাকবো?
নওমি হাসলো এমন কথায়। সন্ধ্যায় সবাই চলে যাওয়ার পর পুরো বাড়িটা হুট করে বেশ শান্ত হয়ে গেল। অতীতকে বিদায় জানানো সহজ ছিল না, কিন্তু আজ ও মুক্ত। রাতে নওমি একা বেলকনিতে দাঁড়িয়ে ছিলো। আদনান দাদির রুমেই ঘুমিয়ে পড়েছে। আহিল নিজেদের রুমে এসে দেখলো নওমি আনমনা চেয়ে আছে বাইরে। আহিল কোনো শব্দ না করে একদম পেছন থেকে নওমিকে নিজের দুই চওড়া বাহুর মাঝে জড়িয়ে ধরল। ওর কাঁধের উপর ওপর নিজের চিবুকটা ঠেকিয়ে খুব আলতো, নরম গলায় ডাকল,
– নওমি…?
নওমি প্রথমে চমকে উঠলেও পরক্ষণেই আহিলের উপস্থিতি বুঝতে পেরে শান্ত হয়ে রইলো। আহিলের হাতের উপর নিজের হাত রেখে চুপ করে রইলো। আহিল আদুরে গলায় বলল,

– কী হয়েছে আমার নূরের? আজ তো তোমার হাসার দিন! মন খারাপ কেন হু?
নওমি একটু সময় নিল। তারপর ঘাড় ঘুরিয়ে আহিলের দিকে দেখার চেষ্টা করে বললো,
– মন খারাপ না আহিল… কেমন যেন একটা অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে। আজ বাবা যখন ওই বাড়িতে ফিরে যাওয়ার কথা বলছিল, আমার তখন পুরোনো সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল।
ও একটু চুপ থেকে বাইরে তাকাল। বাইরের অমানিশার দিকে তাকিয়ে বললো,
– আজ আপনি আমাকে যে সারপ্রাইজটা দিলেন আমি যে কতটা খুশি হয়েছি তা আপনাকে বলে বোঝাতে পারব না ডক্টর সাহেব। আপনি আমার জীবনের প্রতিটা শূন্যতা, প্রতিটা ক্ষ’ত যেভাবে পূর্ণ করে দিচ্ছেন, আমার মাঝে মাঝে বড্ড ভয় হয় জানেন? মনে হয় এটা কোনো স্বপ্ন নয় তো? আমি সত্যি এতটা সুখের যোগ্য তো আহিল?
আহিল ওকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বললো,
– এটা কোনো স্বপ্ন নয় নওমি, এটাই তোমার বাস্তব। আর এই বাস্তবের প্রতিটা সেকেন্ডে এই আহিল তোমার পাশে থাকবে। আমি তোমায় আগেই বলেছি না? তোমার অতীতের সমস্ত ক্ষত শুকানোর দায়িত্ব এখন আমার।
নওমি দুই হাত বাড়িয়ে আহিলকে জড়িয়ে ধরলো।

– থ্যাংক ইউ আহিল! এতটা ভালোবাসা যে আমার হতে পারে আমি ভাবতে পারি না!
আহিল মুচকি হেসে ওকে জড়িয়ে দিল নিজের সাথে। ওর চুলে ঠোঁট ছুইয়ে বললো,
– তুমি এর চেয়েও বেশি ভালোবাসা ডিসার্ভ করো নূর!
কতক্ষণ জানা নেই তবে বেশ অনেকটা সময় এভাবে কেটে গেল। কিছুক্ষণ পর আহিল নওমিকে নিজের বুক থেকে সামান্য সরিয়ে ওনার চিবুকটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরল। আহিলের চোখের চাউনি এবার বড্ড গভীর আর তৃষ্ণার্ত হয়ে উঠল। ও ওনার কানের কাছে মুখ নামিয়ে বড্ড নিচু স্বরে বললো,
– আজ অনেক রাত অব্দি ডক্টর সাহেবকে ইমোশনাল ডায়লগ শুনিয়েছেন নওমি ম্যাডাম। এবার এই অধমের একটু ফি দেবে না? ডক্টররা কিন্তু ফ্রি ফ্রি সময় দেয় না! আজ কিন্তু আদনানও রুমে নেই, পুরো সময়টাই শুধু আমার।
নওমির গাল দুটো অনুরাগের রঙে পুরোপুরি রাঙা হলো। আহিল আর এক সেকেন্ডও দেরি করল না। নওমিকে নিজের দুই বাহুর মাঝে কোলে তুলে নিল। নওমি চমকে উঠে ওর গলা জড়িয়ে ধরে মৃদুস্বরে আপত্তি জানাতে চাইল, কিন্তু আহিলের চোখের গভীর আর তীব্র ভালোবাসার চাউনি দেখে ওর সব কথা যেন মাঝপথেই হারিয়ে গেল। নওমি লজ্জায় নিজের চোখের পাতা দুটো বুজে ফেলল। আহিল ওর কপালে, দুই গালে আর বন্ধ চোখের পাতায় নিজের ঠোঁটের উষ্ণ ছোঁয়া এঁকে দিল। রাতের আঁধারে দুটো ব্যাকুল হৃদয়ের স্পন্দনের মাঝে এতদিনের সমস্ত নিভৃত দহন, একাকীত্ব আর কষ্টের মেঘগুলো যেন আজ রাতের এই তীব্র, গভীর আর মোহময় ভালোবাসার চাদরে ঢাকা পড়ে গেল।

আরো দেড় মাস কেটে গেছে। সকাল থেকে নওমি কেমন উশখুশ করছে! ওর মধ্যে বিরাজ করছে একরাশ অস্থিরতা… কিচেনে গিয়ে চায়ের পানি বসিয়ে দিয়ে ও কাউন্টারে হাত রেখে কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। ওনার এই ছটফটানি ভাব আর অস্থিরতা কিন্তু এক জোড়া তীক্ষ্ণ চোখের আড়াল হলো না।
আহিল মাত্রই রেডি হয়েছে হাসপাতালে যাওয়ার জন্য। সে তার শার্টের হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত গোটাতে গোটাতে কিচেনে এসে ঢুকেছিল। হসপিটালে যাওয়ার আগে এক কাপ কড়া লিকারের চা ওর চাই-ই চাই। কিন্তু ভেতরে ঢুকেই নওমির এই উশখুশ ভাব দেখে ওর ভ্রু জোড়া কুঁচকে গেল। নওমি খেয়ালও করেনি আহিল কখন ওনার ঠিক পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে।
– নওমি?
কোনো জবাব এলো না। আহিল ওর পাশে গিয়ে দাঁড়াল। চুলার দিকে তাকিয়ে দেখলো চায়ের পানি সেদ্ধ হয়ে শুকিয়ে যাচ্ছে। ও চুলার আঁচ কমিয়ে দিয়ে নওমির হাত ঝাঁকিয়ে ডাকলো,
– নওমি!
নওমি হকচকিয়ে তাকালো।

– হ্যাঁ…? হ্যাঁ কি হয়েছে?
– তোমার কি হয়েছে? এমন আনমনা হয়ে আছো কেন?
– কি হবে কিছুই হয় নি।
আহিল খানেক সময় নিয়ে তাকিয়ে থাকলো। নওমি এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে নিজের অস্বস্তির জানান দিল। আহিল নওমিকে টেনে ঘুরিয়ে দাঁড় করিয়ে ওর কপালে নিজের হাতের উল্টো পিঠটা ঠেকাল। ওর চোখ দুটো তখন ব্যাকুলতায় ভরা। ও অত্যন্ত যত্নশীল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
– কী হয়েছে নওমি? বলছো না কেন? সকাল থেকে দেখছি কেমন উশখুশ করছ! শরীর খারাপ লাগছে?
নওমি চোখ এড়ানোর চেষ্টা করে আলতো হেসে বলল,
– না তো, ঠিকই আছি আমি। আপনি টেবিলে বসুন। চা প্রায় হয়ে এসেছে।
আহিল মানতে নারাজ। সে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
– একদম লুকোছাপার চেষ্টা করবে না। আমি তোমাকে দেখেই বুঝতে পারছি কিছু একটা হয়েছে। কোনো সমস্যা? কি সমস্যা?
নওমি এবার মনে মনে চরম বিষম খেল! ও কীভাবে আহিলকে বোঝাবে যে ওনার শরীর একদম ঠিক আছে… আহিল বাড়িতে থাকা অব্দি একটু স্বাভাবিক আচরণ করলে কি হতো? কথাগুলো নওমি নিজের ভেতর চেপে রেখে নওমি জোর করে একটা স্বাভাবিক হাসি ফুটিয়ে তুলল তারপর বললো,

– আরে না, সত্যি কিছু হয়নি। আসলে… সকাল থেকে ঘরের কাজগুলো একটু এলোমেলো হয়ে গেছে তো, তাই কেমন যেন খাপছাড়া লাগছিল। আপনি অহেতুক চিন্তা করছেন!
– তবুও তোমায় কেমন অস্থির লাগছে। যাইহোক তুমি আজকে রেস্ট নাও। আমি খাবার বাইরে থেকে অর্ডার দিয়ে দেবো দিয়ে যাবে। যাওয়ার আগে আমি তোমায় একটা কড়া প্রেসক্রিপশন দিয়ে যাচ্ছি আজ কোনো কাজ করতে হবে না তোমাদের আদনানকে নিয়ে একদম কম্বল মুড়ি দিয়ে রেস্ট নাও। আম্মুকেও রেস্ট নিতে বলে এলাম।
নওমি ওকে ঠেলে রান্নাঘর থেকে বের করে দিতে দিতে বলল,
– হয়েছে। এবার আপনি যান। চা নিয়ে আসছি।
– যাচ্ছি।
আহিল গিয়ে টেবিলে বসলো। নওমি চা নিয়ে আসলে দ্রুত চা শেষ করে রুমে গেল ঘুমে কাদা হয়ে থাকা আদনানের কপালে একটা আদর দিয়ে হসপিটালের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেল। যাওয়ার আগে দরজায় দাঁড়িয়ে নওমিকে বললো,

– মনে থাকে যেন কড়া প্রেসক্রিপশন!
নওমি হেসে মনে মনে বললো, “হসপিটাল থেকে ফিরে আসেন ডক্টর সাহেব, তারপর দেখবেন, কার প্রেসক্রিপশন বেশি কড়া!”
আহিল বেরিয়ে যেতেই নওমি টেবিল গুছিয়ে চলে গেল শাশুড়ির রুমে। নওমি রুমে ঢুকতেই দেখল তার শাশুড়ি মা একটা বই পড়ছেন। নওমিকে দেখে এক গাল হেসে বললো,
– নওমি ভেতরে আয়!
নওমি ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে শাশুড়ির পাশে বসল। দৃষ্টি মেঝেতে রেখেই বললো,
– আম্মু একটা কথা বলার ছিলো…
নয়না বেগম সিরিয়াস মুখে তাকিয়ে বললো,
– হ্যাঁ বল? কিছু হয়েছে? আহিল কিছু বলেছে? সকাল থেকে দেখছি কেমন মুখ কিরে ঘুরছিস।
নওমি হেসে বলল,

– না আম্মু! আপনার ছেলে কি বলবে? উনি কিছুই বলে নি।
নয়না বেগম চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে বইটা বন্ধ করলেন।
– আমার ওই কাঠখোট্টা ছেলে তোকে আবার কিছু না বললেই ভালো! হসপিটালের রোগী দেখতে দেখতে নিজের বউয়ের মুখের দিকে তাকানোর সময় পায় নাকি ও? সকাল থেকে তোকে দেখে আমার কেমন সন্দেহ হচ্ছিল। আমি তো ভাবলাম আমার ওই বাউন্ডুলে ছেলেটা আবার হসপিটালের রাগ তোর ওপর ঝাড়ল কি না! সারাদিন তো শুধু গম্ভীর মুখে গম্ভীর গম্ভীর কথা বলতে পারে। ওর মুখের ডক্টরি ভাব দেখলে আমার নিজেরই মাঝে মাঝে গা জ্ব’লে যায়!
শাশুড়ি মায়ের মুখে আহিলের এমন রসাত্মক আর নিখাদ বদনাম শুনে নওমি নিজের হাসি আর চেপে রাখতে পারল না। ও ফিক করে হেসে ফেলল। নয়না বেগমের হাত চেপে বলল,
– কী যে বলেন না আম্মু! উনি মোটেও তেমন নন। সকালে তো উল্টো আমার জন্য চিন্তায় অস্থির হয়ে যাচ্ছিলেন। যাওয়ার সময় একদম কড়া প্রেসক্রিপশন দিয়ে গেছেন আজ নাকি আমার কোনো কাজ করা নিষেধ!
নয়না বেগম রসাত্মক ভঙ্গিতে বললো,

– হুম, তা তো দেবেই। মুখটা চুন করে রাখলে তো আমার ছেলের কলিজা শুকিয়ে যাবেই!
ওনার এমন মজায় নওমি লজ্জা পেলো। নয়না বেগম হেসে বললো,
– থাক আম্মা তোমার লজ্জা পেতে হবে না আর। তা আসল ব্যাপারটা কী, এবার আমায় বলবি? নাকি আমিই বলে দেবো?
নওমি চমকে বললো,
– কি বলে দেবেন?
নয়না বেগম রহস্যময় হাসি হাসলো।
– এমনি এমনি বুড়ো হয়েছি নাকি আমি? মায়ের চোখ ফাঁকি দেওয়া কি এতই সহজ? তা আহিলকে জানিয়েছিস?
নওমি মাথা নুইয়ে ফেলল। তারপর মাথা নেড়ে না বোঝাল। নয়না বেগম হেসে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বললো,
– আল্লাহ্ তোকে সবসময় এমন হাসিখুশি রাখুক রে মা। তুই আমার এই উথাল-পাথাল সংসারটায় শান্তি এনে দিয়েছিস। আমার আহিলটার জীবনটা তুই আবার সুন্দর করে দিলি।

রাত প্রায় ৮ টা বেজেছে। আহিল হাসপাতাল থেকে ফিরেছে আধ ঘণ্টা। আহিল এখন গোসলে। কিছুক্ষণ পর আহিল মাথা মুছতে মুছতে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এলো। সামনে তাকাতেই থমকে গেলো সে।
নওমি ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তার ঘরের মাঝে যেন দাঁড়িয়ে এক মায়াবী নারী। নওমির গায়ে জড়ানো রানি-গোলাপি রঙের একটা জমদানি শাড়ি। সে পিঠের ওপর ছেড়ে দেওয়া রেশমি চুলগুলো একপাশে সরিয়ে কানে একটা সোনার ঝুমকো পরার চেষ্টা করতেই ওর কাঁচের চুড়িগুলোর রিনঝিন শব্দ পুরো নিস্তব্ধ ঘরে প্রতিধ্বনি সৃষ্টি করলো।
নওমিকে আচমকা এমন সাজে দেখে তোয়ালেটা হাত থেকে খসে পড়ার উপক্রম হলো! জানলা গলে আসা রাতের স্নিগ্ধ আলো আর ঘরের সাদা আলোর মাঝে দাঁড়িয়ে আছে তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর ধ্রুবতারা।
নওমি এখনো আহিলকে খেয়াল করেনি, সে আয়নার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে। সেই হাসি দেখে আহিলের কপালে কৌতূহলের রেখা ফুটে উঠল, ভ্রু জোড়া কুঁচকে গেল। সে হাতের তোয়ালেটা বিছানায় ছুঁড়ে ফেলে ওর সেই চেনা হাসিটা ঠোঁটে ফুটিয়ে ধীরপায়ে এগিয়ে গেল। খুব নিঃশব্দে নওমির ঠিক পেছনে এসে দাঁড়াল ও। আয়নায় আহিলের প্রতিচ্ছবি দেখে চমকালেও মুহূর্তেই নিজেকে সামলে নওমি। আয়নার ভেতর দিয়ে দু-জোড়া চোখ যখন এক হলো, নওমি লজ্জায় চোখ দুটো নামিয়ে নিল। ওনার ফর্সা গাল দুটো এমনিতেই লালচে আভা ধারণ করল।
আহিল পেছন থেকেই আয়নায় ওর চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,

– কি ব্যাপার ম্যাডাম? আজকে এই সময়ে সেজেগুজে হঠাৎ?
নওমি রহস্যময়ী হাসলো। সেই হাসি দেখে আহিলের ভ্রু কুঁচকে এলো। ও নওমিকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে ফের প্রশ্ন করলো,
– হু? ডক্টর সাহেবকে মাঝরাতে খু-ন করার কোনো নতুন চক্রান্ত চলছে?
নওমি সাহসী হয়ে এক কদম এগোলো। এগিয়ে সোজা আহিলের কলার চেপে ধরল। ওর এহেন কাণ্ডে হতবাক হলো আহিল। চোখ বড় বড় করে তাকাল নওমির পানে।
– তুমি ঠিক আছো নওমি?
নওমির চোখ হাসলো। মুখে বললো,
– হু আমি একদম ঠিক!
– তাহলে তোমার আচরণ অস্বাভাবিক লাগছে কেন? সকালে তো সব ঠিক ছিলো তবে…
নওমি ওকে থামিয়ে দিয়ে বললো,
– ডক্টর সাহেব তো চব্বিশ ঘণ্টা শুধু ওটি আর পেশেন্ট নিয়েই মেতে থাকেন। ঘরে যে ওনার একটা বউ আছে, তার দিকে নজর দেওয়ার সময় হয় না তাই ভাবলাম আজ নিজেই একটু নজর কেড়ে নিই।
নওমির ভাব বুঝতে পারলো না তবুও সে ঠোঁট চেপে হেসে নওমির কোমড় জড়িয়ে ধরলো।

– বউ তো নজর কাড়েনি সে তো এই ডক্টরের পুরো মনটাই চুরি করে নিয়েছে!
নওমি লাজুক হাসলো। আহিল ভ্রু নাচিয়ে বললো,
– এবার বলো তো মতলব কি? হু? হঠাৎ ডক্টর স্বামীর জন্য এত সাজগোজ? এত চমক? আজকে কি বিশেষ কোনো দিন, যা আমি ভুলে গেছি?
নওমি কোনো কথা না বলে নিজেকে ছাড়িয়ে নিলো তারপর ড্রেসিং টেবিল থেকে একটা খাম এনে আহিলের দিকে বাড়িয়ে দিলো। আহিল কৌতুহলী হয়ে বললো,
– কি এটা?
– উফ এত প্রশ্ন না করে খুলে দেখুন!
আহিল কৌতূহল সামলাতে না পেরে খামটা খুললো। বেরিয়ে এলো একটা কাগজ। ভ্রু কুঁচকে কাগজটা পড়তেই আহিলের চোখ দুটো স্থবির হয়ে এলো।
নওমি ওর এই পাথরের মতো হয়ে যাওয়া রূপ দেখে ফিক করে হেসে দিল। ও আবারও আহিলের কলারটা আলতো টেনে ধরে ওনার গাল ছুঁয়ে ফিসফিস করে বলল,

নূর ই মহব্বত পর্ব ৩২

– কী হলো ডক্টর সাহেব? প্রেসক্রিপশনের ভাষা বুঝতে কি খুব কষ্ট হচ্ছে?
আহিল কাঁপা গলায় বললো,
– ক… কি এটা?
নওমি হেসে বললো,
– আপনার আর আমার লাইফে আমাদের ভালোবাসার একটা নতুন অংশ!

নূর ই মহব্বত পর্ব ৩৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here