Home শেহেজাদার আদর শেহেজাদার আদর পর্ব ৩০

শেহেজাদার আদর পর্ব ৩০

শেহেজাদার আদর পর্ব ৩০
সুমাইয়া ইসলাম নূর

রাত বাজে বারোটা দশ মিনিট…
চারপাশ একদম নিস্তব্ধ। দূরে কোথাও হালকা বাতাসে উইন্ড চাইমের টুংটাং শব্দ ভেসে আসছে। চৌধুরী বাড়ির ছাদজুড়ে লাইটের ঝিলিক, কেক, বেলুন—সবকিছু প্রস্তুত। সবাই অপেক্ষা করছে শুধু ইনায়ার জন্য।
আর এইদিকে ইনায়া বিছানার পাশে গুটিসুটি মেরে বসে আছে। চোখদুটো কান্নায় লাল হয়ে আচে ঠোঁট মুখ ফুলে আছে অভিমানে।
ঠিক তখনই ইউভি ধীরে ধীরে এসে ইনায়ার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে। আলতো করে তার হাত দুটো নিজের হাতে নিয়ে নরম গলায় বলল—
চল… সবাই অপেক্ষা করছে। আজ যে তোর জন্মদিন, ভুলে গেছিস?
ইনায়া মাথা নিচু করেই বলল—

— “আজ থেকে দশ বছর আগে আমাদের বিয়ে হয়েছিল, ইউভি ভাইয়া…”
ইউভি মুচকি হেসে ইনায়ার কপালে একটা চুমু দিয়ে বললো দশ বছর, বারো মাস, সাত দিন।
ইনায়া অবাক হয়ে ইউভির দিকে তাকিয়ে রইল।
সত্যি? কিন্তু আমি তো জানিই না কেন।
ইউভি এবার ইনায়ার ঠোঁটে ছোট্ট একটা চুমু দিয়ে ফিসফিস করে বলল সময় হলে সব বলব, আদর। এখন চল। ইনায়া সাথে সাথে মাথা নাড়িয়ে বলল—আমি যাব না। সবাই কী ভাববে?
— “কী ভাববে?”
— “যদি ভাবে… আমাদের মাঝে ওইসব হয়েছে…”
ইউভি দুষ্টু হেসে বলল—
— “কেন? যা হয়েছে তাই ভাবলে সমস্যা কোথায়?
ইনায়া লজ্জায় চোখ বড় বড় করে বলল—
— “হয়েছে নাকি?”
ইউভি আরও ঝুঁকে এসে বলল—
কেন? হয়েছে তো… নাকি ম্যাডামের এখনও কিছু বাকি আছে?
ইনায়া সাথে সাথে লজ্জায় ইউভির বুকে কিল মেরে বলল অসভ্য! ইউভি হেসে আবার বলল—

— “কি হলো বলো? বাকি আছে কিছু?”
“তুমি” ডাকটা শুনেই ইনায়ার পুরো শরীরে অদ্ভুত একটা ভালো লাগার শিহরণ বয়ে গেল।
ইউভি এবার গভীর গলায় বলল—
আরও অনেক কিছু চাই, বউ… কিন্তু তুমি তো অসুস্থ। অসুস্থ না হলে এতক্ষণে তোমার এই অসভ্য সেহজাদা চুপ করে থাকত না।
তারপর হালকা হেসে বলল পি কে এখন একটা ধন্যবাদ দিতেই হবে। সে মাঝপথে না আটকালে আজ আমি শেষ হয়ে যেতাম, আদর।
ইনায়া লজ্জায় মুখ লুকিয়ে ফেলল।
ইউভি এবার তার থুতনি তুলে খুব শান্ত গলায় বললআমার কাছে আমার চাহিদার চেয়ে তোর সুস্থতা বেশি ইম্পর্ট্যান্ট। বুঝলি?
এই বলে ইউভি দাঁড়িয়ে বলল যা, টি-শার্ট চেঞ্জ করে আয়। ইনায়া ভ্রু কুঁচকে বলল—

— “কেন? ইউভি ড্রয়ার খুলে একটা পার্পল কালারের থ্রি-পিস বের করে বলল
টি-শার্ট পরে তোকে আমি ছাদে যেতে দেব ভাবলি কী করে? এটা পরে রেডি হয়ে আয়। আমি বাইরে অপেক্ষা করছি।
এই বলে ইউভি আবার ইনায়ার কাছে এগিয়ে এলো। দুপাশে ছড়িয়ে থাকা চুলগুলো আলতো করে সরিয়ে সামনে দিয়ে বলল চুলগুলো এইভাবেই রাখবি।
— “কেন?”
ইউভি ঠোঁট কামড়ে মুচকি হেসে বলল ফ্রেশ হয়ে আয়নার সামনে দাঁড়ালেই বুঝতে পারবি।
তোকে তো আগেই বলেছি… আমি মানুষটা ভীষণ অসভ্য। ইনায়া এবার ইউভির কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল—
— “আমি মানুষটাও কিন্তু ভীষণ জাওরা সেহজাদা। আমি যদি তোমাকে জ্বালানো শুরু করি, তুমি সহ্য করতে পারবে না।
এক টানে ইউভি ইনায়াকে নিজের কাছে এনে বললবাজি ধরছিস তাহলে? ইনায়া চোখ সরু করে বলল ধরবেন?”
ইউভি হেসে বলল কেন? কতই তো ধরেছি।”
ইনায়া দ্রুত সরে গিয়ে বলল অসভ্য লোক! আমি বাজির কথা বলছি।
তারপর আঙুল তুলে বলল মাসের তেইশটা দিন আমি আপনাকে সামলাব, আর আপনি মাত্র সাতটা দিন আমাকে সামলে দেখেন কে জেতে!

ইউভি ধীরে ধীরে এক পা দুপা করে এগোতে লাগল, আর ইনায়া পেছাতে লাগল। পেছাতে পেছাতে দেয়ালের সাথে ধাক্কা খাওয়ার আগেই ইউভি হাত বাড়িয়ে তার মাথার পেছনে হাত রেখে দিল।
পরক্ষণেই আবার এক ঝটকায় ইনায়াকে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরল। ইনায়া ব্যথায় কুঁকড়ে উঠে বলল কি করছেন! ব্যথা লাগছে তো ইউভি নিচু গলায় বলল তুই তো দেখছি আমার দুর্বলতাগুলো খুব ভালো করেই বুঝে গেছিস, আদর। আমাকে ব্ল্যাকমেইল করছিস?
তারপর আরও কাছে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল—
তাহলে তুইও শুনে রাখ… আমার সাথে এমন কিছু করার আগে হাজারবার ভাববি। কারণ আমাকে বেশি খেপিয়ে দিলে আমি ভুলেই যাব কোনটা হালাল আর কোনটা হারাম।
কথাটা শুনে ইনায়ার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। তারপর ইউভি তাকে ঘুরিয়ে নিল। ইনায়ার পিঠ এসে ঠেকল ইউভির বুকে। ঘাড়ের পেছনে মুখ ডুবিয়ে ফিসফিস করে বলল—
সবসময় কালার ম্যাচিং করে পরবি। সাদার সাথে সাদা, কালোর সাথে কালো, পার্পলের সাথে পার্পল।
একটু থেমে আরও নিচু গলায় বলল—

নিজেকে সামলে রাখবি… আমার আমানতগুলো খুব যত্ন করে রাখিস, আদর। তুই যে আমার ভীষণ শখের… তোর শরীরের এক একটা অংশও আমার আমানত।
এরপর আবার কানের লতিতে কুটুস করে ছোট্ট কামড় দিয়ে বলল যে বয়সে বউ সামলানোর কথা, সেই বয়সে আমি বউয়ের ইনার সামলাচ্ছি!
কথাটা শুনেই ইনায়া চোখ বড় বড় করে বলল—
আপনি মানুষটা এত ঠোঁটকাটা কেন? লজ্জা-শরম বলতে কিছু আছে! ইউভি হেসে ইনায়াকে কোলে তুলে নিল। ভালোবাসলে নির্লজ্জের মতো ভালোবাসতে হয় বেহায়ার মতো আদর করতে হয়… আর বীরপুরুষের মতো নিজের ভালোবাসার মানুষটাকে আগলে রাখতে হয়।
এই বলে ইউভি ইনায়া কে কোলে করেই ওয়াশরুমের সামনে নামিয়ে দিয়ে বলল—
পাঁচ মিনিটের মধ্যে বের হবি। না হলে ওইদিকে লিখন চৌধুরী চিন্তায় মরে যাবে—তার কচি খুকু মেয়েটাকে আমার দামড়া ছেলে কী না কী করে ফেলেছে!
ইনায়া আর নিজেকে সামলাতে পারল না। খিলখিল করে হেসে উঠল। হাসির শব্দ শুনে ইউভি দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে বলল হাসিস না বেয়াদব! তোর চাচা যা ভাবে তাই বললাম। শালা, জীবনটাই শেষ করে দিল!
ইনায়া চেঞ্জ করে বের হতেই ইউভি একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার দিকে। পার্পল থ্রি-পিসে, খোলা চুলে, মুখভরা লাজুক আভায় ইনায়াকে আজ যেন অন্যরকম লাগছে। ইনায়া ধীরে ধীরে ইউভির কাছে এসে ভ্রু কুঁচকে বলল কি করছেন আপনি? আগের দাগই তো যায়নি, আবার নতুন করে কী করছেন? আর কখন করলেন? আমি তো টেরই পাইনি!

ইউভি ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি এনে নিচু গলায় বলল এক সমুদ্র সুখের মাঝে ছোট্ট এক ফোঁটা কষ্ট কি আর গায়ে লাগে, চাচির বেটি?
ইনায়া অবাক হয়ে বলল—
— “মানে?”
কিন্তু ইউভি কোনো উত্তর দিল না। বরং একটা ছোট্ট প্যাকেট খুলে সেখান থেকে পার্পল রঙের কাশ্মীরি চুড়ি বের করল। খুব যত্ন করে ইনায়ার হাতে পরিয়ে দিল।
তারপর আরেকটা প্যাকেট খুলে সাদা বেলিফুলের গাজরা বের করে ইনায়ার হাতে পরাতে পরাতে নরম গলায় বলল

— “শুভ জন্মদিন, আদর।”
একটু থেমে গভীর চোখে তাকিয়ে আবার বলল—
— “তোর সবগুলো জন্মদিনের মধ্যে এই জন্মদিনটা আমার কাছে সবচেয়ে স্পেশাল।”
ইনায়ার চোখ ভিজে উঠল। ধীরে ধীরে বলল—
আপনার মনে ছিল?
ইউভি সাথে সাথে মাথায় ছোট্ট একটা গাট্টা মেরে বলল মনে ছিল… কিন্তু ভুলে গেছিলাম।
ইনায়া ঠোঁট ফুলিয়ে তাকাতেই ইউভি বলল—
চল গাধা।
ইনায়া সাথে সাথে রেগে গিয়ে বলল—
আমি গাধা না গাধী!
ইউভি হেসে ফেলল।ওকে গাধী।
এই বলে হঠাৎ ইউভিনবলল কোলে করে নিয়ে যাব? ইনায়া চোখ বড় বড় করে তাকাতেই ইউভি বললো আমি তো হাঁটতে না পারার মতো কিছু করিনি!
ইনায়া ইউভির বুকে ধাক্কা মেরে বলল—
অসভ্য! চরম লেভেলের অসভ্য!
ইউভি হাসতে হাসতেই ইনায়ার পিছু পিছু হাঁটতে লাগল।
এইদিকে রাজ্জো ইউভির কে একটা মেসেজ দিল “Bro, সব ready. এখন শুধু birthday girl-এর অপেক্ষা।
ইউভি রিপ্লাই দিল তুই কই?”

— “ছাদে। তোর আর ইনায়ার জন্য অপেক্ষা করছি।”
ইউভি সাথে সাথে ছোট্ট একটা মেসেজ পাঠাল—
— “ভাবি বলবি। তোর বড় ভাইয়ার wife।”
মেসেজটা পড়ে রাজ্জো হেসে গড়িয়ে পড়ল।
এদিকে ইনায়া ছাদের সিঁড়িতে এসে হঠাৎ থেমে গেল। পেছনে তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করছে ইউভি আসছে কিনা।
যেই না ঘুরেছে, অমনি ইউভির সাথে ধাক্কা!
ইনায়া পড়ে যেতে নিতেই ইউভি দ্রুত তাকে জড়িয়ে ধরে ফেলল।
ইউভি নিচু গলায় বলল—
— “এইভাবে তুই আমার আমানত রক্ষা করবি?
ইনায়া লজ্জা পেয়ে তোতলাতে লাগল—
— “না মানে… দেখছিলাম আপনি আছেন কিনা।
ইউভি কানের লতিতে কুটুস করে একটা কামড় দিয়ে বলল সবসময় তোর পাশেই আছি। চল এখন।”
ইনায়া লজ্জায় বলল—
— “আপনি আগে চলেন… আমার লজ্জা করছে।”
ইউভি ফোনে মেসেজ করতে করতে সামনে হাঁটছে, আর ইনায়া তার পেছনে পেছনে হাঁটছে।
হঠাৎ করেই ইউভি পেছনে হাত বাড়িয়ে ইনায়ার হাত শক্ত করে ধরে ফেলল।

— “সাবধানে… এক্ষুনি তো পড়ে যাচ্ছিলি।”
ইনায়া অবাক হয়ে বলল—
— “আপনি কী করে জানলেন আমি পড়ে যেতে নিচ্ছিলাম?”
ইউভি কিছু বলল না। শুধু ঠোঁটের কোণে ছোট্ট একটা হাসি এনে আবার হাঁটতে লাগল।
ইনায়া চুপচাপ ইউভির দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল—
“ব্যাস… এইটুকুই তো চেয়েছিলাম।”
অবশেষে ইউভি যখন ছাদে উঠল, সবাই একসাথে জিজ্ঞেস করে উঠল—
— “নূর কই?”
ইউভি একটু সরে দাঁড়াতেই সবাই ইনায়াকে দেখতে পেল।
সবার মুখে তখন মুচকি হাসি।
ইনায়ার অবস্থা দেখে রেশমা চৌধুরী দ্রুত তার কাছে গিয়ে বলল—
— “এই নূর! অনেক দেরি হয়ে গেছে। কেক কাটতে হবে তো!”
মুস্তাক চৌধুরী ইনায়ার হাত ধরে বলল—
— “গিন্নি, আসো।”
দূর থেকে ইউভি সাথে সাথে বলে উঠল—

— “এই যে বুড়ো, হাত ছেড়ে কথা বলো! ওইটা আমার আমানত। তুমি তোমারটা সামলাও!
কেক কাটার সেই সুন্দর মুহূর্তটা অবশেষে চলে এলো।
চারপাশে ঝলমলে ফেয়ারি লাইটের আলো, ঠান্ডা রাতের বাতাস আর সবার মুখে খুশির হাসি পুরো ছাদজুড়ে যেন এক টুকরো স্বপ্ন নেমে এসেছে। মাঝখানে বড় কেকটা রাখা, তার উপর ছোট ছোট ক্যান্ডেল জ্বলছে। সবাই গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে শুধু ইনায়ার হাসিটা দেখার জন্য।
ইনায়া ধীরে ধীরে কেক কাটল।
“হ্যাপি বার্থডে টু ইউ…”
সবাই একসাথে গেয়ে উঠতেই ইনায়ার চোখ চিকচিক করে উঠল আনন্দে।
কেক কেটে সবার আগে ইনায়া লিখন চৌধুরীর মুখে কেক তুলে দিল। তারপর একে একে রাতিব চৌধুরী, রবুল চৌধুরী, রেশমা চৌধুরী, নুসরাত চৌধুরী সবাইকে খাইয়ে দিল।
শুধু ইউভিকে বাদ দিয়ে।
ইউভি একটু দূরে বসে মুচকি হেসে লিখন চৌধুরী আর ইনায়ার খুনসুটি দেখছিল।
হঠাৎ লিখন চৌধুরী কেকের এক টুকরো ইনায়ার হাতে দিয়ে বলল যা বেয়াদবটাকে কেক খাইয়ে আয়।
ইনায়া মুচকি হেসে ইউভির দিকে এগিয়ে গেল।
ইনায়াকে আসতে দেখে রেদোয়ান আর রাজ্জো দুজনেই পাশ থেকে সরে গেল।
ইনায়া নরম গলায় বলল—

— “ইউভি ভাইয়া… কেক…”
ইউভি ভ্রু তুলে বলল—
— “আমি যদি সবার মতো এইভাবে কেক খাই, তাহলে আমার আর সবার মধ্যে পার্থক্য কী রইল?”
ইনায়া অবাক হয়ে বলল—
তাহলে কি প্লেটে এনে দেব?”
ইউভি ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি এনে বলল—
সবে তো রাত শুরু, আদর। আমার কেক আমি পরে খেয়ে নেব… কিন্তু এইভাবে না।
ইনায়ার গাল আবার লাল হয়ে উঠল।
জন্মদিনের প্রোগ্রাম শেষ হতেই লিখন চৌধুরী গলা পরিষ্কার করে বললেন—
— “চলো সবাই। কাল নূর মায়ের জন্মদিন উপলক্ষে গ্রামে একটা মিলাদের আয়োজন করেছি। গ্রামের সবাইকে একবেলা নুন-ভাত যা হয় খাওয়াব। ভোরে উঠতে হবে।”
এই বলে সবাই ধীরে ধীরে নিচে নামতে শুরু করল।
ঠিক তখনই রিমঝিম আর রাশেদ মিরজার ফোনে একসাথে একটা মেসেজ এলো।
দুজনেই মেসেজ দেখে একে অপরের দিকে তাকিয়ে বলল—
— “ভাইয়া, আমরা আসছি। এখনই বের হতে হবে।”
তারপর তাড়াহুড়ো করে নিচে নেমে গেল।
বাড়ির সবাই বলল—

— “হয়তো নতুন কোনো কেসের ইনভেস্টিগেশনে বের হলো।
যাওয়ার আগে রাতিব চৌধুরী ইনায়ার হাত ধরে ইউভির কাছে নিয়ে গেলেন।
তারপর শান্ত গলায় বললেন—
তোমাকে আমি সবচেয়ে সুন্দর জন্মদিনের উপহারটাই দিলাম মা… সেহজাদা ইউভি চৌধুরীকে। আমার পরে যদি কেউ তোমাকে সবচেয়ে বেশি আগলে রাখতে পারে, তাহলে এই ছেলেটাই পারবে।
একটু থেমে আবার বললেন—
ছোটবেলা থেকেই ভাইয়া তোমাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে। বড় ভাবি তোমাকে নিজের মেয়ের মতো আগলে রাখে। পিয়াসা তোমাকে বোনের চেয়ে বন্ধু বেশি ভাবে… এমন একটা পরিবারের হাতে আমার রাজকন্যাকে তুলে দিতে পেরে আমার খুব ভালো লাগছে।
নুসরাত চৌধুরী নিজের হাতের বালা খুলে ইনায়ার হাতে পরিয়ে দিলেন।
— “আমার সোনা মা… এটা তোর জন্মদিনের গিফট।”
এক এক করে সবাই ইনায়াকে উপহার দিতে লাগল।
রেদোয়ান গাড়ির চাবিটা এগিয়ে দিয়ে বলল—
— “বোনু, তোর জন্য খুবই সামান্য গিফট। নে, বদমাইশি করে ঘোরার জন্য নতুন সঙ্গী এনে দিলাম।
নিচে দাঁড়িয়ে থাকা চকচকে মার্সিডিজটার দিকে তাকিয়ে ইনায়া আনন্দে রেদোয়ানকে জড়িয়ে ধরল।
আয়াত আর আতিকা নিজেদের হাতে আঁকা একটা সুন্দর আর্ট পেপার এনে বলল—

— “হ্যাপি বার্থডে আপু!”
রাজ্জো মাথা চুলকে বলল—
ইনায়া, আমি হঠাৎ করে চলে এসেছি। তাই কিছু আনতে পারিনি। আমারটা কাল দেব।
লিখন চৌধুরী আর রবুল চৌধুরী একসাথে বললেন—
আমাদেরটাও অপেক্ষায় থাকল, পরে দেব।
একসময় বড়রা সবাই নিচে নেমে গেল।
শুধু থেকে গেল ইউভি, রেদোয়ান, পিয়াসা, তুবা, তনু, ইনায়া আর রাজ্জো।
তনুর মা ডাক দিতেই তনুও চলে গেল।
যেতে যেতে মুস্তাক চৌধুরী হেসে বললেন—
আমার উপহারটাও ওয়েটিংয়ে থাকল গিন্নি!
সবাই চলে যেতেই ইউভি ইনায়ার দিকে তাকিয়ে বলল—
আদর, রুমে চল।
ইনায়া সাথে সাথে বলল—
রুমে মানে? আমি পিয়াসা আর তুবার সাথে ঘুমাব।
ইউভি আর কিছু বলতে দিল না।
এক ঝটকায় কোলে তুলে নিয়ে বলল—

অসুস্থ বউকে কাছছাড়া করব কী করে? বউটা যে আমার ভীষণ এলোমেলো।
এই বলে ইনায়াকে কোলে নিয়েই সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে লাগল।
যেতে যেতে বলল—
বোনু, রুমে যা তুবাকে নিয়ে।
ইউভি চলে যেতেই পিয়াসা আর তুবা সিঁড়ির কাছে আসতেই রেদোয়ান হঠাৎ পিয়াসার হাত টেনে আবার ছাদে নিয়ে এলো। আর রাজ্জো দ্রুত নেমে এসে দরজা আটকে দিল।
তুবা অবাক হয়ে বলল—
কি হলো? বেবি কোথায় গেল?
রাজ্জো তড়িঘড়ি করে তুবার মুখ চেপে ধরল।
চুপ! পাঁচ ফুট ওরা মান-অভিমান ঠিক করছে!
তুবা কিহ বলে চিৎকার করতে যেতেই রাজ্জো আরও শক্ত করে মুখ চেপে ধরল।
দুজনের চোখ এক মুহূর্তের জন্য আটকে গেল একে অপরের মাঝে।
রাজ্জো মনে মনে বলল—
“হাঁটুর বয়সি একটা মেয়ে আমাকে আজ কোথায় এনে ফেলছে… আমার লাইফের বেস্ট প্রবলেম তুই, পিচ্চি।”
তুবা চোখের ইশারায় বলল—

— “ছাড়ুন।”
রাজ্জো ধীরে ধীরে হাত সরাতেই তুবা বড় করে নিঃশ্বাস নিল।আপনি কি পাগল? রাজ্জো হেসে বলল—
না। আগে পাগল ছিলাম না এখন হয়ে গেছি পিচ্চি।
তুবা ভ্রু কুঁচকে বলল মানে?
বললে বুঝবা না। বলেনই তো দেখি।
রাজ্জো হেসে বলল সময় হলে বলব, পিচ্চি। এখন চলো ওদের পাহারা দিই।
ঠিক তখনই ছাদের ঘরের আলো হঠাৎ নিভে গেল।
তুবা ভয় পেয়ে রাজ্জোকে জড়িয়ে ধরল।
কি হলো!
রাজ্জো যেন হঠাৎ নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেল।
তারপর নিজেকে সামলে তুবাকে আলতো করে সরিয়ে বলল আমি আছি তো। ভয় পেও না, পিচ্চি। আমি থাকতে তোমার কিছু হবে না। এইদিকে রেদোয়ান পিয়াসাকে জোর করে জড়িয়ে ধরে বলছে ব্লক কেন করছিস?”
পিয়াসা রাগী গলায় বলল—

তোকে যে খুন করিনি এটাই তোর ভাগ্য!”
রেদোয়ান হেসে বলল জান, প্লিজ… এত রাগ করিস না।
বোনুর জন্য বাস আর কিছু বলতে দিলো না পিয়াসা
পিয়াসা রাগে বলল—
চুপ! তোর বোনের কথা ভাবার জন্য আমার ভাই আছে। তুই কেন আমাকে কথা দিয়ে কথা রাখলি না?
রেদোয়ান ওকে আরও কাছে টেনে বলল—
বেবি, তোর সাথে কথা না বলে আমি থাকতে পারি না। এখানে খুব কষ্ট হয় পিয়াসা কিছু বলতে যেতেই রেদোয়ান ওর কথা থামিয়ে দিল নিজের ঠোঁটের মাঝে আঁকড়ে ধরল পিয়াশার ঠোঁট ।
কিছুক্ষণ পর পিয়াসা নিচু গলায় বলল—
আপনি ভুলে যাচ্ছেন আমাদের এখনও বিয়ে হয়নি।
রেদোয়ান এবার একটু শান্ত হয়ে বলল—
ওকে। কিছুদিনের মধ্যেই তোকে বিয়ে করব। তারপর তোর সব রাগ, জেদ, অভিমান খেয়ে ফেলব।
পিয়াসা ঠোঁট ফুলিয়ে বলল অসভ্য শালা
রেদোয়ান হেসে বলল—
চল নিচে যাই। এখানে তুই আমার কাছে নিরাপদ না। শেয়ালের সামনে মুরগি বেশিক্ষণ থাকলে কিছু একটা হয়েই যাবে। তারপর রাজ্জোকে মেসেজ করল—
Done bro. রাজ্জো রিপ্লাই দিল—
এইটুকু সময়েই হয়ে গেল ভাই? তোকে দেখি, মেডিসিন খাওয়াতে হবে।
তুবা তখনও রাজ্জোর শার্ট ধরে দাঁড়িয়ে আছে ।
দরজা খুলতেই পিয়াসা বের হয়ে এসে তুবাকে জড়িয়ে ধরল।চল বেবি এইসব অসভ্যদের কাছে আমরা safe না।
পেছন থেকে শুধু রেদোয়ানের গলা ভেসে এলো—
পাঁচ মিনিটের মধ্যে মেসেজ দিবি। না হলে ছয় মিনিট পর আমি তোর রুমে!

এইদিকে ইউভি ইনায়াকে কোলে থেকে নামিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিল। জাস্ট পাঁচ মিনিট, আদর। আমি আসছি।
এই বলে বারান্দায় চলে গেল।
কিছুক্ষণ পর হাতে টকটকে লাল গোলাপ নিয়ে ফিরে এলো। ড্রয়ার থেকে একটা ছোট সুন্দর কেক বের করল। ছোট ছোট ক্যান্ডেল জ্বালিয়ে কেকটা বিছানার সামনে রেখে নরম গলায় বললো
শুভ জন্মদিন, আমার আদর।”
তারপর ইনায়ার কপালে চুমু দিয়ে বলল—
এই জায়গাটা আমার ভীষণ প্রিয়।”
ইনায়া লজ্জায় ঠিকমতো তাকাতেই পারছে না।
ইউভি বললো কেক কাট আদর।
এই বলে পাশে রাখা ক্যামেরা দিয়ে ইনায়ার ছবি তুলতে লাগল।
ইনায়া এক টুকরো কেক ইউভির মুখের সামনে ধরতেই ইউভি পুরো কেকটা মুখে নিয়ে নিল।
এক হাত দিয়ে ইনায়াকে নিজের কাছে টেনে এনে ওর চুলের পেছনে হাত রেখে মুখের কেকটা ইনায়ার মুখে দিয়ে দিল।
কিছুক্ষণ পর ছেড়ে দিয়ে বলল—

— “এইটাই আমি। সেহজাদা ইউভি চৌধুরী।
ইনায়া হাঁপাতে হাঁপাতে বলল—
আপনি যে খারাপ জানতাম… কিন্তু এখন তো দেখছি খারাপ pro max! ইউভি হেসে গোলাপটা ইনায়ার কানে গুঁজে দিল।
— “সকালে তোকে একটা জায়গায় নিয়ে যাব। তোর জন্য একটা উপহার আছে। ওই ডয়ারে একটদ ড্রেচ আচে ready হয়ে অপেক্ষা করিস।
ইনায়া কৌতূহলী হয়ে বলল—
কোথায়? ইউভি ধীরে ধীরে বলল—
— “যেখানে গেলে তোর আর ফিরতে মন চাইবে না… তোর সবচেয়ে সুখের জায়গায়।
ইনায়া মাথা নিচু করে মনে মনে বলল—
“আমার সবচেয়ে সুখের জায়গা তো আপনার বুকেই, ইউভি ভাইয়া…”
গভীর রাত আরও নরম হয়ে এলো।
বাইরে দূরের বাতাসে গাছের পাতা দুলছে। জানালার পর্দা হালকা নড়ছে। ঘরের ভেতর মৃদু হলুদ আলো, আর সেই আলোর মাঝখানে ইউভি আর ইনায়ার ছোট্ট পৃথিবীটা যেন শান্তিতে ঘুমিয়ে আছে।
ইউভি সব গুছিয়ে এসে বলল ঘুমিয়ে পড়ো, আদর। আমি আছি।
ইনায়া আস্তে করে বলল আপনি ঘুমাবেন না?
ইউভি ল্যাপটপ কোলে নিয়ে সোফায় বসতে বসতে বলল—

— “ঘুমাব। তার আগে একটু কাজ আছে।”
ইনায়া বিছানায় শুয়ে রইল।
অনেকটা সময় পেরিয়ে গেল, তবুও ইনায়ার ঘুম এলো না।
শেষে ইউভি নিজেই উঠে এসে বিছানায় বসল। আলতো করে ইনায়ার মাথাটা নিজের কোলের উপর নিয়ে নিল।
এক হাত দিয়ে ল্যাপটপে টাইপ করছে, আর অন্য হাত দিয়ে ইনায়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।
শান্ত গলায় বললো বেশি নড়াচড়া করিস না, আদর। চুপ করে ঘুমা। মনটা কাজে আছে তোকে বেশি দেখলে কাজে মন দিতে পারব না।
তারপর নিচু গলায় বলল—
নিজের ভালো চাইলে চুপচাপ ঘুমিয়ে পড়।
ইনায়া মনে মনে বলল—
“শালা… সবসময় mood-এ থাকে নাকি এই বালের সেহজাদা!”
কিন্তু হঠাৎই পেটব্যথাটা আবার শুরু হলো।
ইনায়া কুঁকড়ে উঠতেই ইউভি সাথে সাথে ওকে কোল থেকে নামিয়ে দিল।

শেহেজাদার আদর পর্ব ২৯

তারপর দ্রুত
দরজার দিকে যেতে যেতে বলল—
একটু কষ্ট কর, আদর। আমি আসছি পাঁচ মিনিট।”
ইনায়া অবাক হয়ে ফিসফিস করে বলল ও জানল কী করে? আমি তো বলিইনি
তারপর চোখ বন্ধ করে মুচকি হেসে মনে মনে বলল—
“বাবা… তুমি ঠিকই বলেছ। মানুষটা সত্যিই আমাকে ভীষণ খেয়াল রাখে।

শেহেজাদার আদর পর্ব ৩১