শেহেজাদার আদর পর্ব ৩৩
সুমাইয়া ইসলাম নূর
রাত তখন প্রায় একটা বাজে।
চারপাশ একদম নিস্তব্ধ হয়ে গেছে। চৌধুরী বাড়ির সব রুমের আলো নিভে গেছে অনেক আগেই। দূরে কোথাও রাতজাগা ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ভেসে আসছে। হালকা ঠান্ডা বাতাসে ছাদের একপাশে টাঙানো ছোট্ট fairy light গুলো আস্তে আস্তে দুলছে।
পুরো ছাদে এখন শুধু তিনজন মানুষ বসে আছে—
ইনায়া, তুবা আর পিয়াসা।
তিনজনই পাটি পেতে গোল হয়ে বসে আছে। মাঝখানে রাখা চিপস, কোল্ড ড্রিংকস আর আধাখাওয়া চানাচুরের প্যাকেট। বাকি সদস্যরা ঘুমোতে চলে গেছে।
তুবা হাই তুলতে তুলতে বলল বেবি, কাল কিন্তু আমরা তিনজন পুরো গ্রাম ঘুরবো। আমি ওই রহস্যের পুকুর দেখতে যাবো।
পিয়াসা সাথে সাথে বললহ্যাঁ! আর তুই আগে বল, ভাইয়া তোকে কোথায় নিয়ে গেছিল?”
ইনায়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে আজকের পুরো দিনের ঘটনা খুলে বলতে শুরু করল। আশ্রমে যাওয়া বাচ্চাদের সাথে কাটানো সময় IVA brand-এর papers দিয়া লাল শাপলার পুকুর আর ইউভির সাথে কাটানো প্রতিটা মুহূর্ত। তুবা আর পিয়াসা দুজনেই একদম চুপচাপ মন দিয়ে শুনছে।
তখন পিয়াসার চোখ পানিতে টলমল করে উঠল।
পিয়াসা খুব আস্তে বলল“ইনায়া।
পিয়াসার মুখে নিজের নামটা শুনে ইনায়া অবাক হয়ে তাকাল। কারণ পিয়াসা সবসময় তাকে “বেবি” বলেই ডাকে। আজ হঠাৎ নাম ধরে ডাকায় কেমন যেন লাগল ইনায়ার।
পিয়াসা ধীরে ধীরে ইনায়ার হাতটা নিজের মুঠোর ভেতর নিল। তারপর নিচু গলায় বলল জানিস… আমার ভাইয়া তোকে অনেক ভালোবাসে। সেই ছোটবেলা থেকেই। শুধুমাত্র তোর জন্য ভাইয়া বাড়ি ছেড়ে চলে গেছিল। ইনায়ার বুকটা কেমন করে উঠল।
আমার জন্য… মানে?” পিয়াসা গভীর শ্বাস ফেলল।
তারপর একে একে সব বলতে শুরু করল।
তাদের ছোটবেলার বিয়ের ঘটনা বাড়িতে লিখন চৌধুরীর করা অপমান ইউভির বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়া কীভাবে আতিক চৌধুরীর সাহায্যে আজ ইউভির এতদূর আসা সব।
তুবাও চুপচাপ শুনছে।
পিয়াসা ভেজা গলায় বলল জানিস, তোর চুল ভাইয়ার কতটা প্রিয়? ইনায়া চমকে তাকাল।
পিয়াসা হালকা হেসে বলল সবসময় আম্মু আর মেজো মাকে বলত, তোর চুলের যত্ন নিতে। একটুও কাটতে দিত না। ইনায়ার চোখ ধীরে ধীরে পানিতে ভিজে উঠছে। পিয়াসা আবার বলল দূরে থেকেও ভাইয়া তোর সবকিছুর খেয়াল রাখত। তোর কোন জিনিস ভালো লাগে, কোনটা তোর স্বপ্ন সব জানত।
তোর সব ইচ্ছা পূরণ করত ভাইয়া পিয়াসা আবার বলল আর আমরা ভাবতাম হয়তো রেদোয়ান ভাইয়া বা বাড়ির অন্য কেউ দিছে। অথচ ওই সব gift, dress, books… সব ভাইয়াই পাঠাইত। ইনায়া কথাগুলো শুনে একদম নিশ্চুপ হয়ে গেল। বুকের ভেতরটা কেমন ভারী হয়ে উঠছে।
ইনায়া কাঁপা গলায় বলল এত ভালোবাসে কেন আমাকে…?”
পিয়াসা মুচকি হেসে চোখের পানি মুছে দিল।
কারণ তুই শুধু আমাদের বেবি না, বেবি… তুই আমার ভাইয়ার পুরো পৃথিবী।
রাত আরও গভীর হয়ে এসেছে।
চারপাশে ঠান্ডা বাতাস বইছে। ছাদের fairy light গুলো হালকা হালকা দুলছে বাতাসে। দূরে কোথাও কুকুরের ডাক ভেসে আসছে। ইনায়া তখনও চুপচাপ বসে আছে। চোখদুটো একটু লাল হয়ে আছে কান্নার জন্য। হঠাৎ সে ঠোঁট ফুলিয়ে বলল বেবি… তোর ভাইয়া আমার উপর রাগ করছে।
পিয়াসা সাথে সাথে সোজা হয়ে বসল। কীইই! আমার ভাইয়া রাগ করছে? ক্যান?”
ইনায়া সাথে সাথে মাথা নেড়ে বললো না না… ওইটা বলা যাবে না! তুবা তখন থেকেই সন্দেহের চোখে তাকিয়ে ছিল। সে ধীরে ধীরে চোখ ছোট করে বলল বুঝছি।
পিয়াসা অবাক হয়ে বলল কি বুঝছিস?”
তুবা দুষ্টুমির হাসি দিয়ে বলল মনে হয় ভাইয়া মিষ্টি খাইতে চাইছিল কিন্তু ইনায়া খাইতে দেয় নাই।
ইনায়া না বুঝেই মুখ ফসকে বলে ফেলল।তোর ভাইয়ার মিষ্টি খাওয়ার দরকার হলে জোর করেই খেয়ে নেয়! দিয়া লাগে না কথাটা বলেই থেমে গেল ইনূয়া তুবা আর পিয়াসা কয়েক সেকেন্ড একদম চুপ করে রইলো।।
তারপর—
ওওওওওওওওওও!!!”
পিয়াসা আর তুবা একসাথে চিৎকার করে উঠল।
তুবা তো হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাওয়ার অবস্থা। এই জন্যই ভাইয়া রাগ করছে নাকি বেবি?
ইনায়া লজ্জায় একদম টমেটোর মতো লাল হয়ে গেল। — “ধুর! তোরা অনেক সয়তান হয়ে গেছিস
পিয়াসা বুক চাপড়ে বলল “ইয়া আল্লাহ! আমার নিষ্পাপ ভাইয়ার নামে এসব কী শুনলাম!
ইনায়া সাথে সাথে বালিশ ছুঁড়ে মারল। নিষ্পাপ না ছাই!
পিয়াসা এবার একটু শান্ত হয়ে ইনায়ার হাত ধরল।
শোন বেবি… আমি জানি না তুই কী করছিস। কিন্তু তুই এখনই আমার ভাইয়ার অভিমান ভাঙাবি।”
ইনায়া ঠোঁট ফুলিয়ে বলল কীভাবে?”
পিয়াসা চোখ টিপে বলল তুই তো ভালো গান জানিস… না হলে সুন্দর করে sorry বল।
তারপর একটু থেমে নিচু গলায় বলল যাই হোক… আমার ভাইয়াকে কষ্ট দিস না। ইনায়ার বুকটা হালকা কেঁপে উঠল।
এদিকে ঠিক তখনই চৌধুরী বাড়ির সামনে এসে একটা কালো গাড়ি থামল।
গাড়ি থেকে প্রথমে নামল রাজ্জো আর রেদোয়ান। তারপর ধীরে ধীরে নামল ইউভি।
কালো শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গোটনো হাত পকেটে দিয়ে ।গাড়ির সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ইউভি। রেদোয়ান আর রাজ্জো সামনে দাঁড়িয়ে কোনো important কথা বলছিল।
হঠাৎ—
টুন করে ইউভির ফোনে message আসার sound হলো। ইউভি ফোন বের করে স্ক্রিনের দিকে তাকাল।
স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে— 💙 “আমার আদর”
ইউভির ঠোঁটের কোণে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল।
মেসেজটা খুলতেই লেখা দেখলো।
“তুমি কি আমায় তোমার বউ বানাবে
সারাটাজীবন তোমার করে রাখবে
হাজারো লোকের ভিড়ে হাত টি ধরে
বুকের মাঝে জড়িয়ে আমায় রাখবে…”
মেসেজটা পড়তেই ইউভির চোখদুটো কেমন নরম হয়ে গেল। তারপর মাথা নিচু করে মুচকি মুচকি হাসতে লাগল। রেদোয়ান আর রাজ্জো দুজনেই একদম থ হয়ে তাকিয়ে আছে।
কারণ— এই মানুষটার হাসি তারা খুব কমই দেখে।
রাজ্জো ধীরে ধীরে রেদোয়ানের কানে ফিসফিস করে বলল ভাই… ভাবির একটা মেসেজেই lion থেকে kitten বানাইয়া ফেলছে!
রেদোয়ান ঠোঁট কামড়ে হাসি আটকাতে আটকাতে বললো তোর ভাবি বাট আমার বোন
ইউভি চোখ তুলে দুজনের দিকে তাকাতেই দুজন সাথে সাথে গম্ভীর হয়ে গেল।
— “কী?”
রাজ্জো একদম innocent মুখ করে বলল না ভাই আমরা ভাবতেছিলাম দেশের economy নিয়ে। ইউভি বললো ভাবা হলে যা এখান থেকে আমি আসছি।
ইউভি আবার ফোনের দিকে তাকাল।
তারপর খুব আস্তে স্ক্রিনে আঙুল বুলিয়ে মনে মনে বলল—
“পাগলি একটা…”
ইনায়া বারবার ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকাচ্ছে। কিন্তু এখনও কোনো রিপলে আসে নাই।
স্ক্রিনটা নিভে যেতেই আবার অন করছে সে। আবার ইনবক্স খুলছে। আবার হতাশ হয়ে মুখ ফুলিয়ে বসে থাকছে।
মনে মনে বলল— “উফফ বালের শেহজাদা এত রাগ করছে নাকি কী এমন বলেছিলাম আমি ? একটা reply তো দিতে পারতো এতো ইগো।
তুবা ইনায়ার অবস্থা বুঝতে পেরে হটাৎ বললো।“বেবি চল তো!
ইনায়া মন খারাপ গলায় বলল।কোথায়?
তুবা রহস্যময় মুখ করে ফিসফিস করল ছাদের উপরে একটা লাল জামরুল গাছ আছে।
পিয়াসা চানাচুর খাচ্ছিল তুবার কথা টা শোনার সাথে সাথে লাফ দিয়ে উঠে বসল। কিহহহ! লাল জামরুল? তুবা মাথা নেড়ে বলল হ্যাঁ ম্যাডাম। একদম টকটকে লাল!
পিয়াসা আর এক সেকেন্ডও দেরি করল না। চানাচুরের প্যাকেট ছুঁড়ে ফেলে বলল “চল চল চল! আগে জামরুল খাবো পরে চানাচুর। তুবা পিয়াসা কে চিমটি কেটে বললো এতো খাশ তোবু ও ভুটকি হস না কেন বল তো। পিয়াসা দুষ্টমি সুরে বললো প্রেমে পড়ো তাহলে বুঝবা কোই যাই।
ইনায়াও একটু হেসে ফেলল। তিনজন চুপিচুপি ছাদের একপাশে চলে গেল।
সত্যিই বিশাল একটা জামরুল গাছ। ছাদের উপর এতো বড়ো জামরুল গাছ কেমনে সম্ভব । হালকা বাতাসে লাল লাল জামরুলগুলো দুলছে।
পিয়াসা নিচ থেকে লাফাতে লাফাতে বলল বেবি! ওই উপরেরটা চাই আমার!
তুবা সাথে সাথে বলো আমার ওই বড়টা লাগবে!
ইনায়া দুই হাত কোমড়ে দিয়ে বলল তোরা দুইটা কি আমাকে অডার করছিস ! এত রাতে জামরুল খাওয়ার শখ উঠছে কেন?
পিয়াসা নিষ্পাপ মুখ করে বলল মন খারাপের best medicine হচ্ছে টক জামরুল। ইনায়া বললো বাল তুই মনে হয় আফ্রিকার জামরুল খেয়ে এসেছিস এতো দিন না হলে জামরুল আবার টক পাইলি কোই।
পিয়াসা মাথা চুলকে বললো সব দোষ তোর ভাইয়ার সালা আমার টেস্ট পুরো চেঞ্জ করে দিছে।
ইনায়া হেসে মাথা নেড়ে বলল আচ্ছা সর, আমি উঠতেছি।
ইনায়া সাবধানে গাছের মোটা ডাল ধরে উঠতে লাগল। ড্রেস সামলাতে সামলাতে একসময় বেশ উপরে উঠে গেল।
তুবা নিচ থেকে বলল বেবি careful!”
ইনায়া একটা ডাল ধরে জামরুল ছিঁড়তে ছিঁড়তে বলল “উফফ এত easy!
পিয়াসা নিচে দাঁড়িয়ে মুখ হাঁ করে বলল ওই ডান পাশেরটা! ওইটা! ওইটাআআ! ইনায়া একটু বেশি সামনে ঝুঁকল।তারপর মড়মড় শব্দ হলো।
ইনায়া থমকে গেল। এই শব্দটা ভালো লাগতেছে না
তুবা চোখ বড় বড় করে বলল বেবি… নড়িস না।
পিয়াসা তো already পিছাইতে শুরু করছে। — “আমি কিছু করি নাই আগে বলতেছি!”
পরের মুহূর্তেই
— “ইইইইইইয়া আল্লাহহহহ! ধপাসসসস!
ইনায়া ডালসহ নিচে পড়ে গেল। সৌভাগ্যবশত নিচে মাদুর থাকায় বেশি কিছু হলো না, কিন্তু পায়ে প্রচণ্ড ব্যথা পেল। পিয়াসা আর তুবা দুই সেকেন্ড চুপ করে তাকিয়ে রইল। তারপর
দুজন একসাথে হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খেতে লাগল। ইনায়া মাটিতে বসে রাগে বলল “আমি মইরা যাইতেছি আর তোরা হাসতেছিস?
পিয়াসা তো হাসতে হাসতে তুবাকে কিছু চর ঘুসি মারছে “ইয়া আল্লাহ! ভাইয়া যদি দেখতো—”
ইনায়া রাগে একটা জামরুল ছুঁড়ে মারল। চুপ!
ঠিক তখনই নিচ থেকে গম্ভীর একটা পুরুষ কণ্ঠ ভেসে এলো—
— “উপরে কী হচ্ছে?”
তিনজন একসাথে freeze হয়ে গেল।
পিয়াসা ফিসফিস করে বলল শেষ। ভাইয়া আসছে। ইনায়া ব্যথা ভুলে আতঙ্কে বলল “ইয়া আল্লাহ…”
সিঁড়ি বেয়ে দ্রুত উপরে উঠে এলো ইউভি।
ছাদে উঠেই তার চোখ গিয়ে আটকে গেল এক জায়গায়।
মাটিতে পড়ে আছে ইনায়া। ভাঙা ডাল একপাশে। চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে লাল জামরুল। আর ইনায়া লজ্জায় নিজের থ্রি-পিসের ওড়না দিয়ে পুরো মুখ ঢেকে বসে আছে।মনে হচ্ছে— মাটির নিচে ঢুকে যেতে পারলেই বাঁচে।
ইউভির বুকটা হঠাৎ কেমন ধক করে উঠল। ইউভি দ্রুত এগিয়ে এলো। কিন্তু আশ্চর্যভাবে ইনায়ার সাথে একটাও কথা বলল না।।শুধু ঠান্ডা গলায় পিয়াসার দিকে তাকিয়ে বলল বোনু… এত রাতে ছাদে কী করতে আসেছিস ?
পিয়াসা সাথে সাথে ঠোঁট কামড়ে বললো Sorry ভাইয়া। আমরা একটু গল্প করছিলাম
তারপর তুবার হাত ধরে ফিসফিস করে বলল “চল আমরা যাই।
তুবা যাওয়ার আগে একবার ইনায়ার দিকে তাকিয়ে দুজন দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেল।
আর পুরো ছাদে রয়ে গেল শুধু ইউভি আর ইনায়া।
হালকা বাতাসে fairy light গুলো দুলছে। দূরে ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ এখনো শোনা যাচ্ছে
ইনায়া এখনও মুখ ঢেকে বসে আছে। না পারছে উঠে যেতে… না পারছে ইউভির দিকে তাকাতে।
কয়েক সেকেন্ড চুপ থাকার পর আমতা আমতা করে বলল আমি… ইচ্ছে করে।
কিন্তু বাকিটা বলতে দিল না ইউভি।
ধীরে ধীরে নিচু হয়ে ইনায়ার কপালে ছোট্ট একটা চুমু দিল। তারপর কপাল ঠেকিয়ে খুব আস্তে বলল।যদি বেশি কিছু হয়ে যেত, আদর?
ইনায়ার বুকটা কেঁপে উঠল।
ইউভির গলা তখন ভারী হয়ে উঠলো তুই কি আমাকে একটুও শান্তি দিবি না? তোর জন্য আমি পুরো শেষ হয়ে যাচ্ছি বিয়াদোপ ইনায়ার চোখ ভিজে উঠল। ইনায়া আস্তে করে ওড়নাটা মুখ থেকে সরাল।
ইউভি তখন হাঁটু গেরে ইনায়ার সামনে বসে আছে। চোখে স্পষ্ট ভয় আর ভালোবাসা।
ইউভি খুব সাবধানে ইনায়ার পায়ের কাছে হাত রাখল।
— “ব্যথা অনেক?”
ইনায়া এবার একটু ন্যাকামো করে বল “হুম… অনেক। ইউভি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর একদম আলতো করে পায়ের উপর ফুঁ দিল।
ইনায়া সাথে সাথে কেঁপে উঠল।
ইউভি মাথা তুলে তাকাল চল। নিচে যাবি
ইনায়া ধীরে ধীরে উঠতে গেল। কিন্তু পায়ে ভর দিতেই ব্যথায় মুখ কুঁচকে গেল।
পরের মুহূর্তেই ইউভি কোনো কথা না বলে তাকে কোলে তুলে নিল।
— “ইউভি ভাইয়া!”
ইনায়া সাথে সাথে দুই হাত দিয়ে ইউভির গলা জড়িয়ে ধরল। ইউভি খুব যত্ন করে ইনায়া কে বুকের সাথে আগলে রাখল। মনে হচ্ছেপৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান কিছু ধরে আছে। হালকা বাতাসে ইনায়ার চুল উড়ে এসে বারবার ইউভির মুখে লাগছে।
ইউভি নিচু হয়ে খুব আস্তে তার গালে একটা চুমু দিয়ে বলল আরেকবার যদি এমন করিস
ইনায়া কাঁপা গলায় বলল কি করবেন?”
ইউভি ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে বলল এমনোন অবস্থা করবো তোকে “সারাজীবন হাটতে পারবি না
কি বলছেন ইউভি ভাইয়া আপনি আমাকে আঘাত দিতে পারবেন।
ইউভি মুচকি হেসে বলে আঘাত দিবো বাট কষ্টের না সুখের। ইনায়া কিছু না বুঝেই আবার বলা শুরু করলো আঘাত আবার সুখের হয় ইউভি হটাৎ থেমে গিয়ে ইনায়ার কানের লতি তে কুটুস করে একটা কামোর দিয়ে বলে সুখ কয় প্রাকার কী কী তুই এখনো জানিস না আদর পরে তোকে প্যাকটিকাল এ বুঝিয়ে দিব। মানে সুখের আঘাত কাকে বলে বুঝিয়ে দিব।
ইনায়া লজ্জায় আবার মুখ লুকিয়ে ফেলল ইউভির বুকের মাঝে।
আর ইউভি ধীরে ধীরে তাকে কোলে নিয়েই সিঁড়ির দিকে হাঁটতে লাগল। ।ইউভি খুব সাবধানে ইনায়াকে কোলে নিয়েই নিজের রুমে নিয়ে এলো।
রুমের ভেতর হালকা নীল আলো জ্বলছে। বেলিফুলের মিষ্টি গন্ধে পুরো ঘরটা ভরে আছে। বাইরে হালকা বাতাসে জানালার পর্দাগুলো আস্তে আস্তে দুলছে।ইউভি বিছানার উপর খুব যত্ন করে ইনায়াকে বসিয়ে দিল। তারপর নিচু হয়ে পায়ের দিকে তাকিয়ে বললো Change করবি তুই?
ইনায়া মাথা নিচু করে আস্তে বলল হুম…”
ইউভি মাথা নেড়ে বলল ঠিক আছে। আমি বোনুকে বলি dress নিয়ে আসতে।
কিন্তু পরের মুহূর্তেই ইনায়া খুব ছোট্ট গলায় বলল—আমি তো রাতে আপনার t-shirt পরেই ঘুমাই
কথাটা শুনে ইউভির ঠোঁটের কোণে মুচকি। হাসি ফুটে উঠল।
ইউভি কয়েক সেকেন্ড শুধু ইনায়ার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর মুচকি হেসে বলল
Okay, sweetheart.”
এই বলে ইউভি ওয়াশরুমে ঢুকে গেল।
প্রায় পনেরো মিনিট পর বের হয়ে এলো সে। হালকা আকাশি রঙের একটা t-shirt পরে আছে। চুলগুলো একটু ভেজা। হাতে আরেকটা same color t-shirt।।ইউভি এসে shirt টা ইনায়ার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল।এখন থেকে তাহলে সব double কিনতে হবে, বউ।
ইনায়া লজ্জা পেয়ে t- shirt টা নিয়ে ফেলল।
ইউভি বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে বললআমি help করবো? ইনায়া সাথে সাথে মাথা নেড়ে বলল “না! আমি পারবো। ব্যথা পাইছি পায়ে হাতে না।
ইউভি ধীরে ধীরে আরও কাছে এগিয়ে এলো।
এতটাই কাছে ইনায়ার নিঃশ্বাস আটকে যাচ্ছে।
ইউভি নিচু গলায় বলল ঠিক আছে… আজ help করবো না।
একটু থেমে ইনায়ার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল তবে খুব দ্রুত নিজের হাতে তোর dress খুলবো আবার নিজের হাতেই পরাবো। ইনায়া সাথে সাথে বড় বড় চোখ করে তাকাল। — “কেন?”
ইউভি একদম শান্ত গলায় বলল কারণ… তখন তুই dress পরার অবস্থায় থাকবি না।
— “ইউভি ভাইয়া!!!”
ইনায়া চিৎকার করে উঠতেই ইউভি হেসে ফেলল।
ইনায়া রাগে বালিশ ছুঁড়ে মারল অসভ্য! আপনার আমার সাথে কথা বলা লাগবে না! সারাজীবন রাগ করে থাকবেন আগের মতো ইগো নিয়ে থাকবেন লজ্জা নাই একদম!
ইউভি এবার ধীরে ধীরে ইনায়াকে নিজের আরও কাছে টেনে আনল।
তারপর চোখে চোখ রেখে খুব শান্ত গলায় বলল—Ego তাই না, আদর
পুরুষ মানুষের ego থাকতে নাই। “পুরুষ মানুষের যদি ego থাকে… তাহলে নারীকে বেহায়ার মতো ভালোবাসবে কে?
ইনায়ার বুকটা কেমন করে উঠল।
ইউভি আবার বলল আর কী বললি? লজ্জা?
ইউভি খুব আস্তে ইনায়ার গাল ছুঁয়ে দিল।
পুরুষ মানুষের লজ্জাও থাকতে নাই, আদর। পুরুষ মানুষের যদি লজ্জা থাকে… তাহলে নারীকে নির্লজ্জের মতো আদর করবে কে?
ইনায়া একদম থম মেরে তাকিয়ে রইল।
গাল লাল হয়ে গেছে পুরো।
ইউভি আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। দরজার দিকে হাঁটতে হাঁটতে শুধু বলল— — “Just Teen minutes এর মধ্যে change করতে পারলে ভালো কথা দরজার কাছে গিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে দুষ্টু চোখে তাকাল। না হলে কিন্তু আমি সত্যিই help করবো বলে দিলাম। এখন choice তোর।
এই বলে ইউভি নিচে বরফ আনতে চলে গেল।
আর ইনায়া বিছানার উপর বসে লজ্জায় বালিশ দিয়ে মুখ চেপে বলল ইয়া আল্লাহ… এই মানুষটারে এখন সামলাই কেমন আমি
নিচে রাজ্য পানি খাচ্ছে আর ফোন দেখছে ইউভি কে দেখে বললো কি Broo পানি খাবি নাকি।
ইউভি সান্ত ভাবে উত্তর দিলো বরফ লাগবে
কি তুই লাল পানি খাবি দারা রেদোয়ান কে ডাকি।
সালা তুই না ডক্টর তুই বরং আমাদের মানা করবি এই সব খাওয়ার জন্য তুই নিজে কিনা খেতে বলছিস। অটোপাশ ডক্টর হলে যা হয় আর কি।
শুনে রাখ মামাতো Bro আমি লাল পানি খাই তখন যখন অন্য নেশা মাথা থেকে সরাতে পারি না।
এখন প্রয়জন নাই বুঝলি।
তাহলে কি করবি বরফ।
বউ এর লাগবে।
কিহহহ ভাই তুই কি মানুষ ও ছোট মানুষ কি করেছিস ওর সাথে তুই। তুই দুই দিন পড়ে তোর পিচ্চির সাথে যা করবি তাই করেছি আর শুনে রাখ এই শেহেজাদার ইউভি চৌধুরী নিজের প্রার্পাটি দ্রুত বড় করে নিতে পারে।
এই বলে আর এক মূহুর্তে দারালো না সেখানে
এই দিকে রাজ্য পানি খাচ্ছে আর নিজেই মনে মনে বিরবির করছে জীবন যুদ্ধে এক ধাপ পিছিয়ে গেলাম।
দরজা ঠেলে রুমে ঢুকতেই ইউভির চোখ গিয়ে আটকে গেল বিছানার দিকে।
ইনায়া already change করে বসে আছে। হালকা আকাশি রঙের oversized t-shirt পরে। চুলগুলো খোপা করা কিছু ছোট চুল।খোপার বাহিরে ইনায়াকে খুব বিরক্ত করছে । পা দুটো সামনে ছড়িয়ে বসে আছে একদম শান্ত হয়ে।
ইউভির ঠোঁটের কোণে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল।
— “Good…”
ইনায়া মুখ ঘুরিয়ে ছোট্ট করে বলল হুম।”
ইউভি কিছু না বলে এসে বিছানার নিচে হাটু গেরে বসে পড়ল। তারপর খুব যত্ন করে বরফ হাতে নিয়ে ইনায়ার পায়ে লাগাতে শুরু করল। দুজনেই তখন চুপচাপ।।শুধু বরফের টুংটাং শব্দ শোনা যাচ্ছে আর দুজনের নিঃশ্বাসের শব্দ।
ইউভি মুখে কিছু বলছে না। কিন্তু তার হাতের ছোঁয়াতেই বোঝা যাচ্ছে সে কতটা careful কাজ করছে ইনায়া কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে রইল ইউভির দিকে।
তারপর খুব মিষ্টি গলায় ডাকল আমার শেহজাদা।
ডাকটা শুনেই ইউভির হাত থেমে গেল।
মাথা নিচু করেই মনে মনে হালকা হেসে বলল বেয়াদবটার বিয়াদোপি শুরু হয়ে গেছে
তারপর মাথা তুলে তাকাল।
— “হুম, বল।”
ইনায়া ঠোঁট কামড়ে ছোট্ট গলায় বলল।আমার চার টা আবদার ছিল।রাখবেন।
হুম বল।
ইনায়ার চিৎকার করে বললো ও ইউভি ভাইয়া শুনছেন। ইউভি বরফ লাগাতে লাগাতে বলল “হুম, শুনছি তো বল।
ইনায়া ধীরে ধীরে তার হাতের আঙুলগুলো ইউভির চুলে চালিয়ে দিচ্ছে তারপর আস্তে আস্তে বলল।
ইনায়া:বৃষ্টি ভেজা রাতে তোমার হাতে হাত রেখে বৃষ্টিবিলাস করতে চাই।
ইউভি : হুম
ইনায়া: রাতের শহরে তোমার সাথে পুরো শহরটা ঘুরতে চাই।
ইউভি:হুম
ইনায়া:এক শীতের সকালে তোমার সাথে হাঁটতে চাই।
আর তোমার মুখ থেকে ‘ভালোবাসি’ কথাটা শুনতে চাই কথাগুলো বলেই ইনায়া নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল—“রাখবে তো?”
ইউভি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।
তারপর একদম শান্ত গলায় বলল—
— “না।”
ইনায়া সাথে সাথে মুখ ফুলিয়ে ফেলল। কেন?
ইউভি এবার ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
তারপর বিছানার উপর উঠে ইনায়ার একদম কাছে এসে বসল।
এতটাই কাছে ইনায়ার বুকের ধুকপুকানি পর্যন্ত শোনা যাচ্ছে।
ইউভি খুব আস্তে তার কপালে চুমু দিয়ে ফিসফিস করে বলল কারণ এগুলা শুধু রাখতে না, আদর
এর থেকেও বেশি কিছু করতে চাই তোর জন্য।
ইনায়া ধীরে ধীরে ইউভির দিকে তাকাল।
ইউভি তখন আবারো মন দিয়ে ইনায়ার পায়ে বরফ লাগাচ্ছে। ইনায়া আস্তে করে বলল এত ভালোবাসেন কেন?”
শেহেজাদার আদর পর্ব ৩২
ইউভির হাত এক সেকেন্ডের জন্য থেমে গেল।
তারপর খুব আস্তে মাথা তুলে তাকাল।
কয়েক সেকেন্ড শুধু তাকিয়েই রইল ইনায়ার দিকে।
তারপর ঠোঁটের কোণে ছোট্ট হাসি এনে বলল এই প্রশ্নটার উত্তর আমি নিজেও জানি না, আদর।
