Home শেহেজাদার আদর শেহেজাদার আদর পর্ব ৪৪

শেহেজাদার আদর পর্ব ৪৪

শেহেজাদার আদর পর্ব ৪৪
সুমাইয়া ইসলাম নূর

লন্ডনের রাত তখন ধীরে ধীরে আরও গভীর হচ্ছে।
শহরের ব্যস্ততা অনেকটাই কমে এসেছে। দূরের উঁচু উঁচু বিল্ডিংগুলোর জানালায় জ্বলছে হাজারো আলো। কোথাও রাতজাগা মানুষের ব্যস্ততা, কোথাও আবার নিস্তব্ধতা।সেই আলোকিত শহরের এক অভিজাত এলাকায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে দুইতলা বিশিষ্ট বিশাল এক ম্যানশন।
চারপাশে সবুজ বাগান, মার্বেল পাথরের পথ, ঝর্ণার পানির মৃদু শব্দ আর সারি সারি গার্ডেন লাইট পুরো জায়গাটাকে স্বপ্নের মতো সুন্দর করে তুলেছে।
কিন্তু সেই সৌন্দর্যের মাঝেও আজ যেন অদৃশ্য এক ঝড় বয়ে যাচ্ছে।
ম্যানশনের বিশাল গেট পেরিয়ে দ্রুত ভেতরে প্রবেশ করল ইনায়া।তার চোখ দুটো কান্নায় লাল হয়ে আছে।মুখে কোনো কথা নেই।শুধু বুকভরা অভিমান আর কষ্ট।এদিকে পিয়াসা তখন ফোনে রেদোয়ানের সাথে কথা বলছিল।
— “জানি না তোমার বোনের হঠাৎ কি হয়েছে।”
কোথায় গেলো আমাকেও নিয়ে যায়নি। কোথায় গেছে জানি না।তোমার আসতে কত সময় লাগবে?”ওপাশ থেকে রেদোয়ানের শান্ত কণ্ঠ ভেসে এলো এই তো আর ত্রিশ মিনিট পর পৌঁছে যাবো, পিহু।”

— “তুই চিন্তা করিস না।”
— “ভাইয়া আছে তো।”
ঠিক তখনই ম্যানশনের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল ইনায়া।পিয়াসা উঠে দাঁড়িয়ে বলল—
এই বেবি! কি হয়েছে তোর?”
ইনায়া, দাঁড়া! কিন্তু ইনায়া যেন কিছুই শুনল না।
একবারও পেছনে তাকাল না।দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল।পিয়াসা এবার দুইজন বডিগার্ড মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলল—
— “কি হয়েছে?”
— “কোথায় ছিল ও?”
কিন্তু তারাও কোনো উত্তর দিল না।শুধু একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
কয়েক মিনিট পর হঠাৎ পুরো ম্যানশন কেঁপে উঠল।
উপরতলা থেকে ভাঙচুরের শব্দ ভেসে আসছে।
কাঁচ ভাঙার শব্দ।কিছু একটা ছুঁড়ে ফেলার শব্দ।
পিয়াসা ভয় পেয়ে দৌড়ে উপরে উঠল।তার পেছনে স্টাফ আর বডিগার্ডরাও ছুটে এলো।রুমের সামনে পৌঁছাতেই ভেতর থেকে ইনায়ার চিৎকার ভেসে এলো—
— “কেউ আসবে না! আমাকে একা থাকতে দাও!”
আমি একা থাকতে চাই!পিয়াসা বারবার ডাকল।
কিন্তু কোনো লাভ হলো না।শেষ পর্যন্ত এক মহিলা বডিগার্ড ইউভিকে ফোন করে সব জানিয়ে দিল।

বেশ কিছুক্ষণ পর ভাঙচুরের শব্দ থেমে গেল।
ধীরে ধীরে সবকিছু শান্ত হয়ে এলো।এক এক করে সবাই রুম থেকে বের হয়ে গেল।শুধু পিয়াসা রয়ে গেল।রুমের অবস্থা দেখে যে কারও বুক কেঁপে উঠবে।মেঝেজুড়ে ছড়িয়ে আছে ভাঙা কাঁচ।
উল্টে পড়ে আছে চেয়ার। ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বই আর কাগজপত্র।আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে ইনায়া।চুপচাপ।
নির্জীব
হঠাৎ ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল সে।
আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।তারপর নিজের লম্বা চুলে হাত বুলিয়ে দিল চোখের কোণ বেয়ে আবারও একফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল।পরের মুহূর্তেই পাশ থেকে একটা কাঁচি তুলে নিল।
পিয়াসা কিছু বুঝে ওঠার আগেই
নিজের কিছুটা চুল কেটে ফেলল ইনায়া।
ঠিক তখনই দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করল ইউভি আর রেদোয়ান।দৃশ্যটা দেখে দুজনই থমকে গেল।
বিশেষ করে ইউভি।কারণ ইনায়ার সেই লম্বা চুল তার ভীষণ পছন্দের ছিল।
আর আজ সেই চুলই নিজের হাতে কেটে ফেলেছে মেয়েটা।ইউভির দুই হাত শক্ত হয়ে গেল।
রাগে তার হাতের শিরাগুলো পর্যন্ত ফুলে উঠেছে।
মনে হচ্ছে যে কোনো মুহূর্তে ছিঁড়ে যাবে।
রেদোয়ান দ্রুত এগিয়ে গিয়ে ইনায়াকে জড়িয়ে ধরল।
বোনু!কি হয়েছে তোর?”
তুই চুল কাটছিস কেন?”
ইনায়া কোনো উত্তর দিল না তার চোখ গিয়ে থামল দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ইউভির উপর।
গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে আছে সে।ইনায়া হঠাৎ মৃদু হেসে ফেলল।তারপর বলল ভাইয়া, ভয় পেও না।
আমার কিছু হয়নি।কিছুক্ষণ থেমে আবার বলল—

— “আসলে কি বলো তো…এত বড় চুল দিয়ে কি করবো?।যদি কারও শার্টের বোতামে চুলই না আটকালো…তার থেকে বরং ছোট করে ফেলি।
তাহলে যদি কারও শার্টের বোতামে চুল আটকে।
কথাটা বলেই আবার হেসে ফেলল সে।কিন্তু সেই হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকা অভিমানটা সবাই দেখতে পেল।বিশেষ করে ইউভি।
এক মুহূর্তেই সবকিছু পরিষ্কার হয়ে গেল তার কাছে।
সে বুঝে গেল তার বেয়াদব বউটা কেন এতটা কষ্ট পেয়েছে।কিন্তু একটা প্রশ্ন এখনও তাকে ভাবিয়ে তুলছে…
ইনায়া জানল কীভাবে?
তাহলে কি তিয়া কিছু করেছে?নাকি সবকিছু নিজের চোখেই দেখেছে সে?
রুমজুড়ে আবার নেমে এলো নিস্তব্ধতা।

হঠাৎ ইনায়া ঝড়ের বেগে ইউভির দিকে এগিয়ে গেল।চোখ দুটো কান্নায় লাল, মুখভরা অভিমান।
আঙুল তুলে বলল এক নম্বরের অসভ্য লোক আপনি! ওই তিয়ার কাছেই থেকে আসেন। এখানে কেন এসেছেন?রুমের ভেতর হঠাৎ নিস্তব্ধতা নেমে এলো।ইউভি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে রইল।তারপর ঠোঁটের কোণে একফোঁটা ম্লান হাসি ফুটে উঠল।খুব শান্ত গলায় বললো
আমার সবচেয়ে বেশি খারাপ কখন লাগে জানিস?যখন তুই আমাকে অকারণে ভুল বুঝিস।”
আমার আফসোস জানিস কোথায়?”
তুই যদি ভুল বোঝার আগে একবার জিজ্ঞেস করতি কি হইছে ইউভি ভাইয়া?।একবার যদি আমার কথাটা শুনতি.।
ইউভি হালকা হেসে মাথা নেড়ে বলল—
কিন্তু না…তুই কেন জিজ্ঞেস করবি?তুই তো তোর জেদ নিয়েই ব্যস্ত।তারপর আঙুল তুলে ইনায়ার দিকে দেখিয়ে বলল বেয়াদব একটা। “ইডিয়েট!
কথাগুলো শুনে ইনায়া থমকে গেল।
হঠাৎ করেই যেন মাথার ভেতর ঝড় বয়ে গেল।
কয়েক মুহূর্ত আগেও সে রাগে অন্ধ হয়ে ছিল।
কিন্তু এখন.. এখন তার মনে পড়ছে।
সে এখানে কেন এসেছে।তার আসল উদ্দেশ্য কী।
ধীরে ধীরে নিজের মুঠো করা হাত দুটো শক্ত করে ধরল ইনায়া।চোখের কোণে জমে থাকা পানিটা মুছে ফেলল।মনের ভেতর যেন কেউ ফিসফিস করে বলে উঠল—

“না… আমি দুর্বল হতে আসিনি।”
“আমি ভেঙ্গে পরতে আসিনি। আমি হারতে আসিনি। ইনায়া ধীরে ধীরে মাথা তুলল।
তার চোখে এবার অন্যরকম এক দৃঢ়তা
সে মনে মনে বলল আমি কি করে ভুলে গেলাম?”
“আমি এখানে যে কারণে এসেছি, সেটা আমাকে ভুলে গেলে চলবে না। জীবনে মানুষ অনেক কিছু হারায়।ভালোবাসা হারায়।স্বপ্ন হারায়।
আপন মানুষ হারায়।
কিন্তু যে মানুষ নিজের আত্মবিশ্বাস হারায় না, তাকে ভাঙার ক্ষমতা পৃথিবীর কারও নেই।
— “এই ইনায়া নূর চৌধুরীকে ধ্বংস করার ক্ষমতা একমাত্র আমার আল্লাহ ছাড়া আর কারও নেই।”
আর ওই তিয়ার?ওর তো প্রশ্নই ওঠে না।
ইউভি স্থির চোখে তাকিয়ে রইল ইনায়ার দিকে।
কিন্তু মনে মনে বললো “আমি এটাই চাই, বেয়াদব..।তোর ভেতরের এই জেদটা যেন কখনো না মরে।”
কারণ আজকের পর থেকে তিয়া আরও অনেক পাগলামি করবে।।আমি চাই না সে কোনোভাবে তোর ক্ষতি করতে পারুক। সবসময় তো আর আমি তোর পাশে থাকতে পারব না।”
কিছু যুদ্ধ তোকে নিজেকেই লড়তে হবে।।তবে একটা কথা মনে রাখিস..এই শেহজাদ ইউভি চৌধুরী সবসময় তোর পাশেই আছে।”

“সবসময়…”
ইউভি গভীর একটা নিঃশ্বাস ফেলে চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ভাঙা জিনিসগুলোর দিকে তাকাল।তারপর গম্ভীর কণ্ঠে বলল—
— “কে আছো? সাথে সাথে কয়েকজন স্টাফ এগিয়ে এলো।এই গুলো পরিষ্কার করো।
কথাটা বলেই ইউভি রেদওয়ানের দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারা করল।
রেদওয়ান বুঝে গেল।
দুই ভাই একসাথে রুম থেকে বের হয়ে করিডোর পেরিয়ে ম্যানশনের ব্যালকনির দিকে চলে গেল।
বাইরে তখন গভীর রাত।দূরের শহরের আলো ঝিকমিক করছে।ঠান্ডা বাতাস এসে দুজনের মুখ ছুঁয়ে যাচ্ছে।কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর রেদওয়ান বলল—ভাইয়া, এখন কি করবে?”
— “আমি সত্যি বলছি, চাচ্চুর কাছ থেকে এইসব আশা করি নাই।মেয়েকে সাপোর্ট করবে এইভাবে…”
ইউভির চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।রেলিংয়ে হাত রেখে দূরের দিকে তাকিয়ে বলল—
আমি ওইদিনই তিয়াকে চিনে ফেলেছিলাম, রেদওয়ান।যেদিন আমি তিয়া আর আদরের মেসেজগুলো পড়েছিলাম। ও খুব হিসেব করে আঘাত করেছে বিয়াদোব টা কে
আদরের সবচেয়ে দুর্বল জায়গাগুলোতে আঘাত করেছে।”
রেদওয়ান চুপচাপ শুনছে।
ইউভি আবার বলল এই জন্যই তো আমি চেয়েছিলাম আদর নিজের পায়ে দাঁড়াবে।।নিজের পরিচয় তৈরি করবে নিজের উত্তর নিজে দিতে শিখবে।
কিছুক্ষণ থেমে মৃদু হেসে বলল—

— “কিন্তু আমার প্রতি আদর দিন দিন বেশি দুর্বল হয়ে পড়ছিল। ওর সেই আগের জেদ, একরোখা স্বভাবটা আমি আর দেখছিলাম না।দেখছিলাম শুধু আমার জন্য পাগলামি করতে। ইউভির কণ্ঠে অদ্ভুত কোমলতা নেমে এলো।আমি খুব করে চেয়েছিলাম আমাদের মাঝে একটু দূরত্ব তৈরি হোক। “না হলে ওর ভেতরের সেই জেদটা আর ফিরে আসত না।”
ঠান্ডা বাতাসে কয়েক মুহূর্ত নীরবতা নেমে এলো।
তারপর ইউভির চোখ হঠাৎ কঠিন হয়ে গেল।
তবে তোর বোন আমার দুর্বলতায় হাত দিয়েছে, রেদওয়ান। ও চুল কেটে খুব বড় ভুল করেছে।”
এই ভুলের শাস্তি ও খুব সুন্দর করেই পাবে।
রেদওয়ান হেসে ফেলল।
তুমি দিবা শাস্তি?হাসালে ভাইয়া!”
ইউভির ঠোঁটের কোণেও মৃদু হাসি ফুটে উঠল।
তারপর রেদওয়ান আবার জিজ্ঞেস করল—
যাই হোক, তিয়াকে নিয়ে কি ভাবলে?।ইউভি ধীরে ধীরে তার দিকে তাকাল।চোখ দুটো আশ্চর্য রকম শান্ত লাগছে ইউভি বললো।আমি কিছুই করব না।”
রেদওয়ান ভ্রু কুঁচকে বলল—

— “মানে?”ইউভি হালকা হেসে বলল যা করার, আমার আদর করবে।
এই যুদ্ধটা ওর। আজ থেকে আমরা শুধু ওকে সাহায্য করব।”ওর পাশে থাকব।কিন্তু লড়াইটা ও নিজেই লড়বে।আর তিয়া যাতে আমার বেয়াদবটার কোনো ক্ষতি করতে না পারে…”
— “সেই ব্যবস্থা আমি করব।”
কথাটা বলেই ইউভি আবার দূরের আলো ঝলমলে শহরের দিকে তাকাল।তার চোখে তখন অদ্ভুত এক আত্মবিশ্বাস।কারণ সে জানে—
অনেক সময় প্রিয় মানুষকে আগলে রাখার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো তাকে শক্ত হতে শেখানো।
আর তার বেয়াদব বউটা. সেও ধীরে ধীরে শক্ত হতে শিখবে।

লন্ডনের সকালটা আজও বেশ শান্ত লাগছে
রাতের হালকা বৃষ্টির কারণে চারপাশটা যেন আরও ঝকঝকে হয়ে উঠেছে। ম্যানশনের সামনের সবুজ লন জুড়ে ছোট ছোট শিশিরবিন্দু জমে আছে। দূরে সারি সারি গাছের পাতায় সকালের রোদ পড়ে চিকচিক করছে।
ম্যানশনের ডাইনিং হলে তখন সকালবেলার ব্যস্ততা।ইউভি ইতোমধ্যেই নিচে নেমে এসেছে। হাতে কফির মগ। পাশে বসে আছে রেদওয়ান।
আর কয়েকদিন পরই রেদওয়ান আবার বাংলাদেশে ফিরে যাবে। তাই এই ক’দিন দুই ভাই যতটা সম্ভব একসাথে কাজগুলো গুছিয়ে রাখার চেষ্টা করছে।
এদিকে ইনায়া আর পিয়াসা নিজেদের রুমে রেডি হচ্ছে।
গতরাতে প্রায় পুরো রাত জেগে ইনায়া সব অ্যাসাইনমেন্ট শেষ করেছে। চোখের নিচে হালকা ক্লান্তির ছাপ এখনও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে
অন্যদিকে পিয়াসা?
ম্যাডাম তো রাতের অর্ধেক সময় রেদওয়ানের সাথে ফোনে গল্প করেই কাটিয়ে দিয়েছে।
ফলাফল অ্যাসাইনমেন্ট পুরো শেষ হয়নি।
তাই আজ সকালে দুজনে আগে একটা পার্লারে গেল।ইনায়া নিজের লম্বা চুলে সুন্দর একটা নতুন কাট দিতে চেয়েছিল তাই ই করলো।

চুল কাটার পর আয়নায় নিজেকে দেখে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল সে।
আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিবর্তন লাগছে।
কিছুক্ষণ পর দুজন গাড়িতে উঠে বসল।
পিয়াসা সঙ্গে সঙ্গে ল্যাপটপ বের করে কাজ শুরু করে দিল।ইনায়া অবাক হয়ে বলল—
এই সকালে আবার কী করছিস? পিয়াসা মুখ কুঁচকে বলল—তোর দুলাভাইয়ের জন্য অ্যাসাইনমেন্ট শেষ করতে পারি নাই। “এখন গাড়িতে বসেই করতেছি।”
ইনায়া হেসে ফেলল।
গাড়িটা ধীরে ধীরে লন্ডনের ব্যস্ত রাস্তা পেরিয়ে এগিয়ে চলল।
কিছুক্ষণ পর তারা পৌঁছে গেল সেই বিখ্যাত ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম ইনস্টিটিউটে।
চারপাশে বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের আনাগোনা।
কেউ ল্যাপটপ হাতে ক্লাসে যাচ্ছে, কেউ আবার প্রেজেন্টেশন নিয়ে আলোচনা করছে।
প্রতিদিনের মতো আজও পুরো পরিবেশটা প্রাণবন্ত।
ইনায়া আর পিয়াসা নিজেদের ক্লাসরুমের দিকে এগিয়ে গেল।কিন্ত ক্লাসরুমে ঢুকেই দুজন থমকে গেল।কারণ ক্লাসরুমের ভেতরে আগে থেকেই কেউ একজন অপেক্ষা করছে।
তন্ময়।
হাতে ফোন নিয়ে দিব্যি বসে আছে। ইনায়াদের দেখেই দাঁড়িয়ে গেল সে।মুখভরা হাসি নিয়ে হাত নেড়ে বলল—

— “হেই ডল!আমি এখানে!”
ইনায়া সঙ্গে সঙ্গে ভ্রু কুঁচকে বলল—
— “ওই পাগল! কাকে ডল ডাকতেছে?
পিয়াসা হেসে কুটিকুটি হয়ে বললো তোকে।
আর ইনায়া চোখ রাঙিয়ে বলল—আর একবার ডল বললে এই ল্যাপটপ মাথায় ভাঙব সালার তন্ময় সঙ্গে সঙ্গে দুই হাত তুলে আমি এইদিকে এমোন টা বোঝালো
ওদের কাছে এসে বললো। ম্যাডাম ইনায়া নূর চৌধুরী! এতো দেরি হলো।কেন
ইনায়া কিছু বলতে যাবে
আর ঠিক তখনই ক্লাসরুমের দরজা খুলে গেল।
যার ফলে পুরো ক্লাসরুম এক মুহূর্তে শান্ত হয়ে গেল।
কারণ সবাই জানে—
আজকের প্রথম সেশন নিতে আসছেন শেহজাদ ইউভি চৌধুরী।কিছুক্ষণ পর পুরো ক্লাসরুম শান্ত হয়ে গেল।দরজাটা ধীরে ধীরে খুলে গেল।
আর পরের মুহূর্তেই ভেতরে প্রবেশ করল ইউভি।
কালো শার্ট, কালো প্যান্ট, হাতে ফাইল।
মুখে সেই স্বাভাবিক গম্ভীর ভাব।
তাকে দেখেই পুরো ক্লাসরুম যেন আরও সোজা হয়ে বসে গেল।বিশেষ করে মেয়েরা।অনেকেই আড়চোখে তাকাচ্ছে।কেউ কেউ আবার ফিসফিস বলছে অবশেষে দেখা মিললো।
ইউভি সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ না করেই সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
ডেস্কের উপর ফাইলগুলো রেখে বলল—

— “Good Morning Everyone.” (সুপ্রভাত সবাইকে।)
সাথে সাথে পুরো ক্লাস উত্তর দিল—
— “Good Morning Sir.” (সুপ্রভাত স্যার।)
ইউভি মাথা নেড়ে বলল—
— “I hope everyone completed yesterday’s assignment.” (আশা করি সবাই গতকালের অ্যাসাইনমেন্ট সম্পূর্ণ করেছে।)
তারপর ক্লাসের দিকে তাকিয়ে বলল—
বিজনেস সম্পর্কে ক্লাস নিতে শুরু করলো
কথাগুলো বলার সময় ইউভির আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠ পুরো ক্লাসরুমকে মুগ্ধ করে রাখল।
এদিকে ইনায়া চুপচাপ বসে ইউভির কথা শুনছে।
তার চোখে স্পষ্ট মুগ্ধতা।
কারণ বিজনেস সম্পর্কে যখন ইউভি কথা বলে তখন মনে হয় বইয়ের ভাষা নয়, বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা কথা বলছে।
কিছুক্ষণ ক্লাস নেওয়ার পর ইউভি বলল—

— “Now submit your assignments.” (এখন তোমাদের অ্যাসাইনমেন্ট জমা দাও।)
এক এক করে সবাই নিজেদের কাজ জমা দিতে লাগল।
সবগুলো দেখে ইউভি বলল—
— “Good.” (ভালো।)
— “Now each of you will give a five-minute presentation.” (এখন তোমাদের প্রত্যেকে পাঁচ মিনিটের একটি প্রেজেন্টেশন দেবে।)
— “Let’s see how you think.” (দেখি তোমরা কীভাবে চিন্তা করো।)
এক এক করে সবাই সামনে গিয়ে প্রেজেন্টেশন দিতে শুরু করল।
কেউ ভালো করল।কেউ মাঝামাঝি কেউ আবার নার্ভাস হয়ে ভুলে গেল কিছু অংশ।
অবশেষে ইউভি বলল—
Miss Inaya Noor Chowdhury.
(মিস ইনায়া নূর চৌধুরী।)
— “Your turn.
(এবার তোমার পালা।)
পুরো ক্লাসরুমের দৃষ্টি গিয়ে পড়ল ইনায়ার দিকে।
ইনায়া ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।ল্যাপটপ হাতে নিয়ে সামনে গিয়ে দাঁড়াল।এক মুহূর্ত চোখ বন্ধ করে নিজেকে সামলে নিল।
তারপর শুরু করল—

— “Good Morning Everyone.” (সুপ্রভাত সবাইকে।)
— “Today I will talk about how a small business can become a strong brand.” (আজ আমি বলব কীভাবে একটি ছোট ব্যবসা শক্তিশালী ব্র্যান্ডে পরিণত হতে পারে।)
প্রথম কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পুরো ক্লাস চুপ হয়ে গেল।ইনায়ার কণ্ঠে আত্মবিশ্বাস ছিল।চোখে ছিল দৃঢ়তা।সে শুধু স্লাইড পড়ে যায়নি।প্রতিটি পয়েন্ট বাস্তব উদাহরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করেছে।মাঝে মাঝে প্রশ্নও করেছে।ফলে পুরো ক্লাস তার কথার সাথে যুক্ত হয়ে গেল।পিয়াসা মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে।তন্ময়ও অবাক হয়ে মনে মনে বললো বাহহ আমার ডল টা বেস ইন্টারেস্টিং বিলিয়ান্ড।
আর ইউভি?
সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে।মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই।কিন্তু তার চোখে স্পষ্ট গর্ব ইনায়া কে নিয়ে
ইনায়া যখন শেষ স্লাইডে পৌঁছালো তখন বলল—
A successful business is not built by money.”
(একটি সফল ব্যবসা শুধু টাকা দিয়ে গড়ে ওঠে না।)
“It is built by trust.”
(এটি গড়ে ওঠে বিশ্বাসের উপর।)

— “And trust is the most valuable asset in any business.” (আর বিশ্বাস হলো যেকোনো ব্যবসার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ।)
পুরো ক্লাসরুম কয়েক সেকেন্ড নীরব রইল।
তারপর হঠাৎ করেই করতালিতে ভরে গেল চারপাশ।অনেকেই মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে।
কেউ বিশ্বাসই করতে পারছে না যে এত অল্প সময়ে এত সুন্দর প্রেজেন্টেশন দেওয়া সম্ভব।
ইনায়া ধীরে ধীরে নিজের জায়গায় ফিরে এলো।
তখন ইউভি ফাইল বন্ধ করে বলল—
— “Excellent.” (চমৎকার।)
— “Very impressive presentation.” (খুবই চমৎকার প্রেজেন্টেশন।)
This is exactly what I wanted to see
.” (আমি ঠিক এটাই দেখতে চেয়েছিলাম।)
কথাটা শুনে ইনায়ার ঠোঁটের কোণে অজান্তেই ছোট্ট একটা হাসি ফুটে উঠল।আর পিয়াসা পাশে বসে ফিসফিস করে বলল বেবি, আজ তো একদম আগুন লাগিয়ে দিয়েছিস!”

ক্লাসরুমের পরিবেশ তখনও ইনায়ার প্রেজেন্টেশনের প্রশংসায় মুখর।
ক্লাসরুমে তখন একদম পিনপতন নীরবতা।। ডিজিটাল স্ক্রিনে ইউভি নতুন একটি বিজনেস কেস স্টাডি বুঝিয়ে দিচ্ছে।তার গম্ভীর অথচ আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠ পুরো ক্লাসরুমজুড়ে ছড়িয়ে আছে।
সবাই মনোযোগ দিয়ে শুনছে।কেউ নোট নিচ্ছে।
কেউ আবার ল্যাপটপে দ্রুত টাইপ করছে।
ইউভি মাঝে মাঝে ক্লাসের একপ্রান্ত থেকে আরেকপ্রান্তে হাঁটছে।তার উপস্থিতিতেই যেন পুরো ক্লাসরুমের পরিবেশ বদলে গেছে।
ঠিক তখনই কথা বলতে বলতে হঠাৎ তার চোখ গিয়ে আটকালো তন্ময় এর দিকে।
আর পরের মুহূর্তেই ইউভির চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।
কারণ তন্ময় এর চোখ ল্যাপটপে নেই।
নোটবুকেও নেই।সে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে…
ইনায়ার দিকে।ইউভি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে তাকিয়ে রইল।তারপর ধীরে ধীরে হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ হয়ে গেল।কিন্তু মজার ব্যাপার হলো—

ইনায়াও সেটা খেয়াল করে ফেলেছে।
সে অবাক হয়ে তন্ময় এর দিকে তাকাল।
দেখল ছেলেটা তার দিকেই তাকিয়ে আছে।
আর ঠিক সেই মুহূর্তে ইনায়ার চোখ গেল ইউভির দিকে।উফফ!
মুখের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে কেউ যেন তার সামনে কোটি টাকার প্রজেক্টে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে!ইনায়ার ঠোঁটের কোণে দুষ্টু একটা হাসি ফুটে উঠল।মনে মনে বলল—
“বাহহহ! এই আইডিয়াটা আগে মাথায় আসলো না কেন?”শেহজাদ ইউভি চৌধুরী… আমি যে এখন কাঁটা দিয়েই কাঁটা তুলবো!
ইনায়াী চোখে দুষ্টুমির ঝিলিক নেচে উঠল।
পরের মুহূর্তেই সে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে তন্ময় এর দিকে তাকিয়ে হাতের হালকা ইশারায় একটা “Hi” দিল। তন্ময় ও ভদ্রভাবে হাসি দিল।
আর সেই ছোট্ট ঘটনাটাই যেন আগুনে ঘি ঢেলে দিল।সবকিছুই ইউভির চোখ এড়ালো না
তারপর—শব্দ করে ইউভি নিজের ল্যাপটপটা এত জোরে বন্ধ করল যে পুরো ক্লাসরুম কেঁপে উঠল।
সামনের সারির দুই-তিনজন শিক্ষার্থী চমকে উঠল।
কেউ কলম ফেলে দিল।কেউ আবার ভয়ে সোজা হয়ে বসে গেল।পুরো ক্লাসরুম মুহূর্তেই নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
সবাই অবাক হয়ে ইউভির দিকে তাকিয়ে আছে।
তন্ময় ও তাকাল।ইনায়া কষ্ট করে নিজের হাসি চেপে রাখল।কিন্তু তার চোখের কোণে স্পষ্ট দুষ্টুমির ছাপ।
ইউভি ধীরে ধীরে তন্ময় এর দিকে তাকাল।
সেই দৃষ্টিতে এমন কিছু ছিল যে তন্ময় অকারণেই গলা খাঁকারি দিল।
এরপর ইউভি ঠান্ডা গলায় বলল—

— “Mr. Tanmoy?”
তন্ময় সোজা হয়ে বসল।
— “Yes Sir?” (জী স্যার?)
ইউভি মুচকি হাসল।
কিন্তু সেই হাসির ভেতর বিপদের আভাস স্পষ্ট।
— “Would you like to share with the class what is more interesting than today’s lecture?” (আজকের লেকচারের চেয়েও বেশি আকর্ষণীয় কী দেখছিলেন, সেটা কি ক্লাসের সবার সাথে শেয়ার করতে চান?)
পুরো ক্লাসরুম থমকে গেল।তন্ময় প্রায় কাশতে কাশতে বলল—
— “No Sir!”
(না স্যার!)
Then focus.”
(তাহলে মনোযোগ দিন।)
— “This is a business session, not a sightseeing tour.”
(এটা বিজনেস সেশন, দর্শনীয় স্থান দেখার ট্যুর না।)
কথাটা শুনে কয়েকজন শিক্ষার্থী হাসি চেপে ফেলল।ইনায়া নিচের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট কামড়ে হাসি আটকে রাখল।
আর ইউভি?সে আবার ক্লাস নেওয়া শুরু করল।
কিন্তু তার চোখের কোণে এখনও সেই পরিচিত হিংসার ছায়া।যেটা শুধু একজন মানুষই বুঝতে পারল।ইনায়া নূর চৌধুরী।
আর মেয়েটা মনে মনে বলল—
“হুমম… রাগ হচ্ছে তাহলে?”
“এই তো শুরু, মিস্টার শেহজাদ ইউভি চৌধুরী..

ক্লাস শেষ হয়ে গেছে বেশ কিছুক্ষণ আগে।
ইনস্টিটিউটের দ্বিতীয় তলার প্রশস্ত করিডোরটা এখন অনেকটাই ফাঁকা। কাঁচের দেয়াল দিয়ে বিকেলের নরম রোদ ভেতরে ঢুকছে। দূরে শিক্ষার্থীদের ছোট ছোট দল গল্প করতে করতে বেরিয়ে যাচ্ছে।সিঁড়ির ধাপে পাশাপাশি বসে আছে ইনায়া আর তন্ময়।
তন্ময় কিছু একটা বলছে, আর ইনায়া মাঝে মাঝে হেসে উত্তর দিচ্ছে।অন্যদিকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে পিয়াসা ফোনে রেদওয়ানের সঙ্গে কথা বলছে।
ঠিক তখনই উপরের তলা থেকে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে শুরু করল ইউভি।
এক হাত পকেটে।অন্য হাতে পানির বোতল।
মুখে সেই চিরচেনা গম্ভীর ভাব।কিন্তু নিচে নামতে নামতেই তার চোখ গিয়ে আটকালো সিঁড়িতে বসে থাকা দুজন মানুষের উপর।ইনায়া আর তন্ময়।
একসাথে বসে দিব্যি গল্প করছে।মুহূর্তেই ইউভির চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।চোখ দুটো বিপজ্জনকভাবে সরু হয়ে এলো।দূর থেকে সবকিছু দেখেই পিয়াসার মুখে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল।সে নিজের ভাইকে খুব ভালো করেই চেনে।এখন তার মাথার ভেতর কী চলছে, সেটা বুঝতে একটুও কষ্ট হলো না।ইউভি ধীরে ধীরে নিচে নামতে নামতে পানির বোতলটা একটু কাত করল।

পরের মুহূর্তেই—
ছপাৎ!এক ঝাপটা পানি গিয়ে পড়ল তন্ময়ের কাঁধ আর মাথার উপর। “আরে ধুর!”
তন্ময় লাফিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলল—
— “কে রে?”পেছনে ফিরে ইউভিকে দেখে সঙ্গে সঙ্গে সোজা হয়ে গেল।স-সরি স্যার!”
ইউভি ভ্রু তুলে নিরীহ মুখে বলল—
No, it’s okay. (না, ঠিক আছে।) আমারি ভুল।”
তারপর খুব স্বাভাবিক গলায় বলল যাই হোক, ক্লাসে মনোযোগ দাও।সবাই এখানে কেন এসেছো সেটা ভুলে যেও না। তন্ময় মাথা নেড়ে সম্মতি দিল।
কিন্তু ইউভির চোখের কোণে তখনও অদ্ভুত দুষ্ট ঝিলিক বোঝা যাচ্ছে সে ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে গেল।
তারপর…একদম অসাবধানতাবশত এমনভাবে পা রাখল যে তন্ময়ের দুই পায়ের মাঝখানে গিয়ে লাগল।পরের মুহূর্তেই—

ধপাস তন্ময় মুখ থুবড়ে পড়ে গেল মেঝেতে পিয়াসোা নিজের ঠোঁট কামড়ে হাসি আটকানোর চেষ্টা করল।কিন্তু পারল না।হাসতে হাসতে প্রায় দম বন্ধ হওয়ার অবস্থা।
ইনায়ার অবস্থাও একই।সে মরিয়া হয়ে মুখ গম্ভীর রাখার চেষ্টা করছে।কিন্তু চোখের কোণে জমে থাকা হাসি কিছুতেই লুকানো যাচ্ছে না।এদিকে ইউভি এমন ভাব করল যেন পৃথিবীর সবচেয়ে দুঃখজনক ঘটনা ঘটে গেছে।
দ্রুত নিচু হয়ে তন্ময়কে টেনে তুলল।
— “আরে আরে! কি অবস্থা তোমার?এই বয়সেই এমন অবস্থা কেন? সাবধানে চলাফেরা করতে পারো না?তন্ময় হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
সে নিজেও বুঝতে পারছে না ঠিক কীভাবে পড়ল।
আর পিয়াসা?
সে এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না।
মুখ ঘুরিয়ে হেসেই চলেছে।ইউভি তখন পানির বোতল থেকে আরেক চুমুক খেল।
তারপর ধীরেসুস্থে পিয়াসার দিকে তাকাল।
চোখে স্পষ্ট বিজয়ীর হাসি।যেন বলছে—
দেখলি? শিক্ষা হয়ে গেছে! পিয়াসা আবারও হেসে ফেলল।ইউভি আর কিছু না বলে হেঁটে চলে গেল করিডোরের শেষ মাথার দিকে।
আর তার পেছনে তাকিয়ে আছে ইনায়া। ইনায়ার ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠা হাসিটা সে আর লুকাতে পারল না।
কারণ যতই রাগ দেখাক না কেন—
শেহজাদ ইউভি চৌধুরীর এই হিংসুটে স্বভাবটা আজ তার বেশ মজাই লাগছে

গোধূলি বিকালে
সূর্যের নরম আলো মেনশনের বিশাল গার্ডেন জুড়ে ছড়িয়ে আছে। চারপাশে নানা রঙের ফুল ফুটে আছে। হালকা ঠান্ডা বাতাসে ফুলের সুবাস ভেসে বেড়াচ্ছে।গার্ডেনের এক কোণে কাঠের বেঞ্চে বসে আছে রেদওয়ান।হাতে ল্যাপটপ।
কিন্তু কাজের চেয়ে ভাবনাতেই যেন বেশি ডুবে আছে সে।ঠিক তখনই ইনায়া দুই কাপ কফি হাতে নিয়ে এগিয়ে এলো।
মুখে হালকা হাসি।
রেদওয়ানের সামনে এক কাপ এগিয়ে দিয়ে বলল—
— “ভাইয়া, কফি।রেদওয়ান মুচকি হেসে কাপটা হাতে নিল।হুম বস, বোনু।।ইনায়াও তার পাশে বসে পড়ল।কিছুক্ষণ দুজন চুপচাপ কফি খেতে লাগল।
তারপর ইনায়া ধীরে ধীরে বলল—

— “ভাইয়া…”
— “হুম?”
IVA ব্র্যান্ড এখন যেহেতু আমার, আমি সব দায়িত্ব নিতে চাই।”রেদওয়ান মনোযোগ দিয়ে তার দিকে তাকাল।ইনায়া আবার বলল আজ থেকে তুমি আমাকে একটু একটু করে সব বুঝিয়ে দিবে?”
বিজনেসের সবকিছু শিখতে চাই আমি।”
রেদওয়ানের চোখে গর্বের ঝিলিক ফুটে উঠল।
ঠিক তখনই অফিস থেকে ফিরে মেনশনে প্রবেশ করল ইউভি।কালো কোট হাতে।মুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে ।

দূর থেকেই সে দেখতে পেল—তার বেয়াদব বউ আর রেদওয়ান পাশাপাশি বসে গল্প করছে।
ইউভি ধীরে ধীরে এগিয়ে আসতে লাগল।আর এগোতে এগোতেই ইনায়ার কথাগুলো তার কানে ভেসে এলো “সব দায়িত্ব নিতে চাই আমি।”
সব শিখতে চাই।”
কথাগুলো শুনে অজান্তেই ইউভির ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল।পরের মুহূর্তেই সে এসে রেদওয়ানের পাশে বসে পড়ল।কোনো অনুমতি ছাড়াই ইনায়ার হাতের কফির কাপটা নিয়ে নিল।
ইনায়া ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
— “এই!”
কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে।ইউভি খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে কাপটা ঠোঁটে তুলল।আর ইচ্ছা করেই ঠিক সেই জায়গাটাতেই ঠোঁট ছোঁয়ালো, যেখানে একটু আগেই ইনায়া কফি খেয়েছিল।
এক চুমুক দিয়ে বলল—

— “হুম… নাইস টেস্ট।”
রেদওয়ান কফির কাপ হাতে নিয়ে দুজনের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।
মনে মনে বলল দুইটাই সমান ঘাড়তেরা।”
ইউভি এবার রেদওয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল—
রেদওয়ান, তোর বোনকে বলে দে ভালো ডিসিশন নিয়েছে। যাই হোক, সবকিছু ভালো করে বুঝিয়ে দিবি। তারপর ইনায়ার দিকে একবার তাকিয়ে আবার বললো আর হ্যাঁ, পড়ালেখা আর বিজনেসে ফোকাস দিতে বল। আলতু-ফালতু ছেলেদের সাথে মিশতে মানা কর।
ইনায়া সঙ্গে সঙ্গে ভ্রু উঁচু করল।তারপর রেদওয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল ভাইয়া, তুমি বলে দাও উনাকে।”আমি কার সাথে বন্ধুত্ব করব আর কার সাথে করব না, সেটা সম্পূর্ণ আমার ডিসিশন।”

আর তন্ময় ছেলেটা কিন্তু মারাত্মক সুন্দর।
রেদওয়ান কফি খেতে খেতে প্রায় বিষম খেল।
আর ইনায়া?কথাটা বলেই উঠে দাঁড়াল।
এক মুহূর্তও না থেমে হেঁটে চলে গেল।
ইউভি স্থির হয়ে বসে রইল কয়েক সেকেন্ড।
তারপর ধীরে ধীরে রেদওয়ানের দিকে তাকাল।
রেদওয়ান তখনই বিপদ বুঝে ফেলেছে।
— “দেখ, আমি কিছু বলি নাই কথা শেষ হওয়ার আগেই ইউভি তার কলার চেপে ধরল “কি বলে গেল তোর বোন? তুই একটা থাপ্পড় দিতে পারলি না ওই ইডিয়েটটাকে?”

শেহেজাদার আদর পর্ব ৪৩

— “শেষ করে দিবো আমি!”
রেদওয়ান এবার হেসে ফেলল।
আর ইউভি দাঁতে দাঁত চেপে বলল তোর বোনকে সামলা সালা
“I’m the most jealous person in the world!”
— “যেটা আমার. সেটা শুধুই আমার!

শেহেজাদার আদর পর্ব ৪৫

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here