শেহেজাদার আদর পর্ব ৭১
সুমাইয়া ইসলাম নূর
দুপুরের রোদটা আজ কেমন যেন ম্লান।
জানালার কাঁচ ভেদ করে সূর্যের আলো ক্লাসরুমের মেঝেতে এসে পড়েছে ঠিকই, কিন্তু সেই আলোয়ও যেন কোনো উজ্জ্বলতা নেই। বাইরে দুপুরের ব্যস্ততা—করিডোরজুড়ে শিক্ষার্থীদের আনাগোনা, দূরে কোথাও হাসির শব্দ, কারও চিৎকার, কারও ছুটে চলা। অথচ ক্লাসরুমের এক কোণে বসে থাকা তুবার কাছে পুরো পৃথিবীটাই কেমন যেন নিরানন্দ।
মুখটা মলিন করে বেঞ্চে বসে আছে সে।আজ নাকি নতুন একজন স্যার আসবেন।এই খবরটা নিয়ে পুরো ক্লাসে যেন উৎসবের আমেজ। সবাই বন্ধুদের সঙ্গে গল্পে ব্যস্ত, নতুন স্যার কেমন হবেন তা নিয়ে জল্পনা-কল্পনা করছে। কেউ আবার আয়নায় নিজের মুখ দেখছে, চুল ঠিক করছে, পোশাকের ভাঁজ ঠিকঠাক করছে।কিন্তু তুবার সেদিকে কোনো মনোযোগ নেই।আসলে এই ক্লাসে তার তেমন কোনো বন্ধু হয়নি। সবাই যার যার মতো নিজেদের বন্ধুমহলে ব্যস্ত। তুবারও অবশ্য তাতে খুব একটা আক্ষেপ নেই। কারণ তার প্রিয় দুই টা বেবি আছে তারা তিনজনে আলাদা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হলেও ভাগ্য যেন তিনজনের প্রতি একটু সদয় হয়েছে। তিনজনের বিশ্ববিদ্যালয় আলাদা, কিন্তু পাশাপাশি।
আগামীকাল থেকেই তারা একসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবে। এই একটা বিষয়ই মন ভালো করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। তুবা আর ইনায়া সেই তখন থেকে এই বিষয় নিয়েই আলোচনা করছে মেসেজ আদান প্রদানের মাধ্যমে। তবে তুবার কেন যেন মনে হলো ইনায়ার মনটা খারাপ । বিষয়টা বুঝতে পেরে ইনায়া কে হাসানোর জন্য তুবা ব্যস্ত হয়ে পড়ল
তুবার আঙুলগুলো ব্যস্ত হয়ে উঠল মুঠোফোনের পর্দায়। একের পর এক মজার ছবি, অদ্ভুত সব ইমোজি আর হাস্যকর স্টিকার পাঠিয়ে চলেছে সে ইনায়াকে।এই দেখ, তোর মতো দেখতে একটা পেঙ্গুইন পেলাম।’সঙ্গে সঙ্গে একটি হাসির ইমোজি পাঠাল তুবা।
ইনায়ার কাছ থেকে কোনো উত্তর এলো না।
তুবা ঠোঁট বাঁকিয়ে আবারও একটি মজার ছবি তুলে পাঠাতে ব্যস্ত হয়ে গেল। মুখে এমন এক অদ্ভুত ভঙ্গি করল যে নিজেই নিজের ছবি দেখে হেসে ফেলল।
ঠিক সেই মুহূর্তেই—
ক্লাসরুমের দরজায় কারো ছায়া পড়ল।প্রথমে কেউ সেভাবে খেয়াল করল না।তারপর ধীরে ধীরে কথাবার্তার শব্দ কমে গেল। একে একে সবার দৃষ্টি গিয়ে আটকে গেল দরজার দিকে।
আর তারপর পুরো ক্লাসরুম সবাই যেন হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে গেল।দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন একজন সুদর্শন পুরুষ।উচ্চদেহী, সুঠাম গড়ন। পরনে নিখুঁতভাবে পরা ফরমাল পোশাক। ব্যক্তিত্বে এমন এক ধরনের দৃঢ়তা, যা কোনো কথা না বলেও মানুষকে থমকে তাকিয়ে থাকতে বাধ্য করে। মুখের ধারালো গড়ন, গভীর চোখজোড়া এবং শান্ত অথচ কঠিন অভিব্যক্তি—সব মিলিয়ে মানুষটিকে প্রথম দেখাতেই আলাদা করে চোখে পড়ার মতো।
ক্লাসের প্রায় সব মেয়ের চোখ একসঙ্গে বড় হয়ে গেল।কেউ দ্রুত নিজের চুল ঠিক করে নিল।
একটা মেয়ে পাশের বান্ধবীকে কনুই দিয়ে ধাক্কা দিয়ে ফিসফিস করে বললো
‘উনি কি সত্যিই আমাদের নতুন স্যার?’আরেকজন নিজের চুলের গোছা কানের পেছনে গুঁজে দিয়ে ফিসফিস করে বলল ইশ! এত সুন্দর স্যার হয় বুঝি ?’সামনের সারিতে বসা কয়েকজন মেয়ে ইতোমধ্যে নিজেদের এমনভাবে গুছিয়ে নিয়েছে, যেন এই মুহূর্তে তাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজই হলো নতুন স্যারের দৃষ্টি আকর্ষণ করা।
তবে যুবকটির দৃষ্টি শুধু এসে থামল একজনের ওপর।ক্লাসের একেবারে মাঝামাঝি বসে থাকা তুবার উপর।অবশ্য তুবার সেদিকে কোনো খেয়ালই নেই।সে এখনো মুঠোফোন হাতে নিয়ে ইনায়াকে একের পর এক মজার ইমোজি পাঠিয়ে চলেছে।
তুবার সমস্ত মনোযোগ মুঠোফোনের পর্দায়।চারপাশে কী হচ্ছে, কে ক্লাসে ঢুকেছে, সবাই কেন এত চুপ হয়ে গেছে—এসবের কোনো কিছুই যেন তার মাথায় নেই।নতুন স্যার কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন মেয়েটির দিকে।
অন্য সব মেয়ের দৃষ্টি যেখানে তার ওপর আটকে আছে, সেখানে এই মেয়েটি তার দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে নানবরং নিজের মুঠোফোন নিয়ে এমন ব্যস্ত, যেন পৃথিবীতে এই মুহূর্তে তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কোনো বিষয় নেই।
যুবকটির ভ্রু সামান্য কুঁচকে গেল যেন পুরো ক্লাসরুমের দৃষ্টি যেখানে সামনের সুদর্শন পুরুষটির দিকে আটকে আছে সেখানে তুবার চোখ মুঠোফোনের পর্দায়।
যুবকটি কয়েক সেকেন্ড নীরবে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর শান্ত অথচ ভারী কণ্ঠে বললেন—
‘এই যে মিস?’
‘মিস?’
তুবা এবারও সাড়া দিল না।যুবকটির ঠোঁটের কোণে এবার ক্ষীণ এক হাসি ফুটে উঠল।হাসিটা দেখে বোঝার উপায় নেই—এটা মজা, নাকি বিপদের পূর্বাভাস।তিনি টেবিলের ওপর আঙুল ঠুকলেন।
টক।শব্দটা ক্লাসরুমের নীরবতা ভেঙে দিল।
তুবা চমকে মাথা তুলল।তার চোখ গিয়ে আটকে গেল সামনের যুবকটির মুখে।আর তারপর সমস্ত পৃথিবী যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল।তুবার চোখ বড়ো বড়ো হয়ে গেল। মুহূর্তে মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।মুঠোফোন ধরা হাতটা মাঝপথে স্থির হয়ে রইল।সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে দেখে তুবার ঠোঁট সামান্য কেঁপে উঠল।চোখের পলক পড়ছে না মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হচ্ছে না।
কারণ—এই মানুষটিকে সে চেনে।ভীষণ ভালোভাবে চেনে।এই চোখ।এই মুখ।এই কঠিন দৃষ্টি।এই মানুষটি—রাজ্য।তার রাজ্য।তুবা কয়েক মুহূর্ত একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।তারপর খুব ধীরে ঠোঁট নাড়িয়ে শব্দহীনভাবে বলল—
‘রাজ্য?’কিন্তু শব্দটি মুখের বাইরে এলো না।রাজ্যও বিষয়টা দেখছে কিন্তু তার চোখে কোনো বিস্ময় নেই।কোনো পরিচয়ের ছাপ নেই।যেন এই সামনের মেয়েটিকে তিনি জীবনে প্রথম দেখছেন।তুবার বুকের ভেতরটা কেমন ধক করে উঠল।এটা কী হচ্ছে?রাজ্য এখানে কী করছে? মনে মনে বললো এটা রাজ্যের জমজ ভাই না তো না না এ কি বলছি ওরা যমচ হতে যাব কেন কি বাল বকছি।
রাজ্য ঠান্ডা কণ্ঠে বললেন মিস, আপনি কি এই পৃথিবীতে আছেন?’তুবা কোনো উত্তর দিল না। কি উত্তর দিবে সে তার চোখ যে এখনো রাজ্যের মুখে আটকে আছে।রাজ্যের ভ্রু সামান্য কুঁচকে গেল।
‘নাকি অন্য কোনো গ্রহে অবস্থান করছেন?’
‘যদি অন্য কোনো গ্রহে থাকেন, তাহলে ভিসা-পাসপোর্ট সঙ্গে থাকলে দয়া করে ক্লাসরুমে ফিরে আসুন। আমরা আপনার জন্য অপেক্ষা করছি।’কথাটা শোনা মাত্রই পুরো ক্লাসরুমে চাপা হাসি ছড়িয়ে পড়ল।তুবার হুঁশ ফিরল।
সে দ্রুত বললো‘সরি স্যার—শব্দটা মুখ থেকে বের হতেই সে থেমে গেল।চোখ আবার আটকে গেল রাজ্যের মুখে।রাজ্য?সত্যিই রাজ্য?নাকি সে স্বপ্ন দেখছে?তুবার ঠোঁট শুকিয়ে গেল।মুখ দিয়ে আর কোনো শব্দ বের হলো না।রাজ্য তার দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা কণ্ঠে বললেন—
‘কী হলো?’কথা বলার সময় শব্দ হারিয়ে ফেলেন?’তুবার চোখ আরও বড়ো হয়ে গেল
এই মানুষটা তার সঙ্গে এমন আচরণ করছে কেন?রাজ্য আবার বলল‘দাঁড়িয়ে থাকুন।’
তুবা হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।রাজ্য পুরো ক্লাসের সবার দিকে তাকালেন।বাকি সবাইও দাঁড়িয়ে যান।’কেউ এক মুহূর্ত দেরি করল না।পুরো ক্লাসরুমের প্রত্যেকটা স্টুডেন্ট দাঁড়িয়ে গেল।
রাজ্য ধীরে ধীরে সামনে হাঁটতে লাগলো
তার কণ্ঠ শান্ত।কিন্তু সেই শান্ত কণ্ঠের ভেতরের কঠোরতা এতটাই স্পষ্ট যে কেউ নড়াচড়া করার সাহস পেল না।প্রথম দিন। তাই পরিচয়টা আগে দিয়ে দিই।’আমি ডক্টর রাজ্য।’আপনাদের নতুন শিক্ষক।’
আমার ক্লাসে নিয়ম খুব সহজ।’আমি যা বলব, সেটাই হবে।’ক্লাসে অপ্রয়োজনীয় কথা বলা যাবে না।’মুঠোফোন ব্যবহার করা যাবে না।’অমনোযোগী হয়ে বসে থাকা যাবে না।’‘আর আমি কথা বলার সময় কেউ কথা বলবেন না।’
এখন সবাই বসুন।’সবাই একসঙ্গে বসে পড়ল।
শুধু তুবা কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে রইল।রাজ্যের দৃষ্টি তার দিকে গেলো আপনিও বসতে পারেন।’
তুবা ধীরে ধীরে বসে পড়ল।চোখের কোণে জমে থাকা পানি এবার আর আটকে রাখা গেল না।
একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল গাল বেয়ে।
রাজ্য আরও কিছুক্ষণ ক্লাস নিলেন।
প্রথম ক্লাসেই তার কঠোরতা সম্পর্কে ধারণা হয়ে গেছে সবার।কেউ অপ্রয়োজনীয় কথা বলার সাহস করেনি।কেউ মুঠোফোন বের করেনি।এমনকি রাজ্যের অনুমতি ছাড়া কেউ নড়াচড়াও করেনি।
তুবা পুরোটা সময় চুপচাপ বসে ছিল।তার চোখ বারবার চলে যাচ্ছিল সামনের মানুষটির দিকে।
তার রাজ্য।অথচ রাজ্য যেন তাকে চেনেনই না।
একবারও এমন কোনো দৃষ্টি দেয়নি, যাতে বোঝা যায় তাদের মধ্যে কোনো সম্পর্ক আছে।
শেষ পর্যন্ত রাজ্য পুরো ক্লাসের সবার দিকে ফিরে দাঁড়ালেন।আজকের মতো ক্লাস এখানেই শেষ।’
ক্লাসের সবাই যেন একসঙ্গে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
রাজ্যের ঠোঁটের কোণে সামান্য হাসি ফুটল।
‘পরের ক্লাসে দেখা হবে।’সবাই একসঙ্গে বলল—‘জি, স্যার।’রাজ্য মাথা নেড়ে বোর্ডের দিকে ফিরলেন।তারপর হঠাৎ যেন কিছু মনে পড়েছে—এমন ভঙ্গিতে থেমে গেলেন।ধীরে ধীরে তার দৃষ্টি গিয়ে থামল তুবার ওপর।তুবার বুকের ভেতরটা আবার ধক করে উঠল।রাজ্য কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।তারপর ভ্রু সামান্য কুঁচকে বললেন মিস…’তুবা অনিচ্ছা সত্ত্বেও মাথা তুলল।
রাজ্য এমন ভান করলেন, যেন গভীরভাবে কিছু মনে করার চেষ্টা করছেন।‘কী যেন আপনার নাম?’
তুবার চোখ বড়ো হয়ে গেল।
ক্লাসের কয়েকজনও কৌতূহলী হয়ে তাকাল।
রাজ্য ঠান্ডা গলায় বললেন ‘তুবা… তাই তো?’
তুবার বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল।নিজের নামটা সে এমনভাবে বলছে—
যেন এই নামটা তার কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত।
যেন কত কষ্ট করে মনে করতে হয়েছে।
তুবা কোনো উত্তর দিল না।
রাজ্য তার দিকেই তাকিয়ে রইলেন।
তারপর খুব শান্তভাবে বললেন—
‘পরেরবার একটু সাবধানে থাকবেন।’
তুবার ভ্রু কুঁচকে গেল।
‘জি?’রাজ্যের ঠোঁটের কোণে এবার ক্ষীণ হাসি ফুটল।‘ক্লাসে বসে অন্য জগতে চলে যাবেন না।’
কথাটা বলেই তিনি চোখের ইশারায় মুঠোফোনের দিকে তাকালেন। এরপর আর এক মুহূর্ত দেরি না করে ক্লাস রুম থেকে বেরিয়ে গেল রাজ্য ।
সন্ধ্যা নেমেছে চৌধুরী ভিলায়।
দিনের ব্যস্ততা ধীরে ধীরে গুটিয়ে নিচ্ছে নিজেকে। পশ্চিম আকাশে সূর্যের শেষ আলোটুকু মিশে গেছে মেঘের গায়ে। চারপাশে নরম অন্ধকারের চাদর বিছিয়ে পড়ছে ক্রমশ। দূরের গাছপালার পাতায় সন্ধ্যার বাতাস দোলা দিচ্ছে। ভিলার চারপাশের আলোগুলো একে একে জ্বলে উঠেছে, অথচ বারান্দার এক কোণে বসে থাকা ইনায়ার কাছে যেন কোনো আলোই পৌঁছাচ্ছে না।ইউভি নিজের ঘরে ঢুকেই বুঝেছিলেন, ইনায়া সেখানে নেই । ঘর ফাঁকা পেয়ে ভ্রু কুঁচকে গেল। এরপর ধীর পায়ে বারান্দার দিকে এগিয়ে যেতেই চোখে পড়ল তাকে।নরম সোফাটায় গুটিসুটি হয়ে বসে আছে ইনায়া।
চোখ তার দূরের আকাশে নিবদ্ধ। মুখটা ভীষণ গোমড়াো করে রাখছে । মনে হচ্ছে, পৃথিবীর সমস্ত অভিমান একা নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে বসে আছে সে।ইউভি ও সবে মাএ চৌধুরী ভিলাই প্রবেশ করল নুসরাত চৌধুরী ইউভি কে ডেকে কিছু কথা বললো। ইউভি আশ্বাস দিল আমি দেখছি মেঝো মা। এর পর চলে গেল নিজের রুমের উদ্দেশ্যে। গিয়ে দেখল ইনায়া রুমে কোথাও নাই। বেলকনিতে গিয়ে দেখলো ইনায়া মন মরা হয়ে বসে আছে বেলকনিতে। ইউভির ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটল।সে ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে ইনায়ার পাশে বসে পড়লেন। ইনায়া তার উপস্থিতি টের পেয়ে ফিরে তাকাল না সে দিকে ।ইউভি কিছুক্ষণ স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর নরম অথচ মজার সুরে বললো
মিসেস চৌধুরী?’ইনায়া কোন উত্তর দিলো না ইউভি এবার সামান্য ঝুঁকে তার মুখ দেখার চেষ্টা করলেন।সারাদিনে পেটে কিছু পড়েনি শুনলাম।’ইনায়ার মুখ আরও গম্ভীর হয়ে গেল।
ইউভি মৃদু হেসে বললেন সামান্য একটু অবহেলা সহ্য করতে পারেন না,
ইনায়া এবারও কোনো উত্তর দিল না।
ইউভি দীর্ঘশ্বাস ফেলে পকেট থেকে একটি চাবির রিং বের করলো চাবিগুলো আঙুলের ফাঁকে ঘুরিয়ে বলল ‘মিসেস চৌধুরী।’ইনায়া এবার অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাকাল।ইউভি চাবির রিংটা তার চোখের সামনে সামান্য নাড়ালেন।
‘বাইক রাইডে যাবেন?’ইনায়ার চোখ দুটো মুহূর্তে বড়ো হয়ে গেল।মুচকি হেসে বললো ‘সত্যি?’
ইউভি ওমুচকি হেসে বললো ‘আজ আপনার ওড়ার শেষ দিন, মিসেস চৌধুরী।’ইনায়ার হাসি ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।ইউভি গম্ভীর ভঙ্গিতে বললো
‘কাল থেকে ক্লাস আর ব্যবসা—দুটোই সামলাতে হবে। আর একটুও ফাঁকি দিলে আমি কিন্তু মেনে নেব না।ইনায়া মুখ বাঁকিয়ে বলল ‘সত্যি বাইক রাইড এ যাবেন?’কিন্তু আমার বাইক তো। ইউভি এবার আর হাসি আটকে রাখতে পারলেন না।
‘গার্ডেনে অপেক্ষা করছে আপনার কিউট বাইক। চলুন।’ইনায়া সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল।কিন্তু এক পা এগোতেই ইউভি তার হাত ধরে টেনে নিজের বুকের সঙ্গে মিশিয়ে নিলেন।এক মুহূর্তে ইনায়ার কোমর ঘিরে শক্ত হয়ে গেল তার বাহু।ইনায়া চমকে তাকাল।ইউভি নিচু হয়ে তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ধীর কণ্ঠে বললো।
চাইলেই তোমার ডানা কেটে তোমাকে বন্দি করে রাখতে পারতাম, মিসেস চৌধুরী।’কিন্তু আমার ভালোবাসা খাচা নয়।’ মুক্ত আকাশ তাই তোমাকে ডানা দিয়েছি উড়ার জন্য তবে মনে রেখ সেই ডানা পৃথিবীর এদিক ওদিক উড়ে বেড়ানোর জন্য নয় আমার আকাশ টাকে আরো সুন্দর করে তোলার জন্য তারপর পকেট থেকে বাইকের চাবিটা বের করে ইনায়ার হাতে তুলে দিলেন।এই নাও। আমিও দেখতে চাই, আমার পৃথিবীটা কতটা সুন্দর করে উড়তে পারে।’
ইনায়ার চোখের দৃষ্টি মুহূর্তেই বদলে গেল।
সে ধীরে ধীরে ইউভির আরও কাছে এগিয়ে এলো।
তারপর আলতো করে স্বামীর চুলে হাত বুলিয়ে দিল।ইউভি চোখ বন্ধ করে ফেললেন এক মুহূর্তের জন্য।ইনায়া মৃদু স্বরে বলল—
‘আকাশটা যখন আপনার, তখন উড়বও শুধু আপনার সঙ্গেই, মিস্টার চৌধুরী।’
ইউভির চোখ খুলে তাকাল ইনায়ার দিকে তাকিয়ে তার মুখে এমন এক হাসি ফুটল, যা এই হাসি টা কেবল এই নারীর জন্যই জমা থাকে।ইনায়া কে আরও শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরলো
‘চলুন।’
ইনায়া বেরিয়ে যেতে চাইলে ইউভি তাকে ছাড়লো না।বরং আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে নিচু স্বরে বললোএকটু দাঁড়িয়ে যাও না, বউ।’ইনায়া থেমে গেল।ইউভির কণ্ঠে ক্লান্তি স্পষ্ট প্রকাশ পেলো
সারাদিনের ব্যস্ততার ক্লান্তি কিন্তু তার থেকেও বেশি ছিল স্ত্রীর কাছে কিছুক্ষণ থাকার আকাঙ্ক্ষা।
‘বড্ড ক্লান্ত লাগছে।’ইনায়ার মুখের সমস্ত অভিমান মুহূর্তে গলে গেল।সে আর কোনো বাধা দিল না।
নিঃশব্দে স্বামীর বুকে নিজেকে আরও একটু গুটিয়ে নিল। ইউভির এই একটি মাত্র কথাতেই এনায়া ও বেশ এলোমেলো হয়ে যাই এই টা কি তার শেহেজাদা জানে জানে না বোধ হয়।
ইউভি তার পিঠে ধীরে ধীরে হাত বুলিয়ে দিলো।
ফিসফিস করে বললো বড্ড ঘার তেরা মেয়ে তুই আদর সারাজীবন তোর এই ত্যারামি সহ্য করতে হবে আমাকে।
সন্ধ্যার নরম বাতাস তাদের দুজনকেই ছুঁয়ে যাচ্ছে।
দূরে ভিলার আলো জ্বলছে।আর সেই আলোর ভেতর, পৃথিবীর সমস্ত ব্যস্ততা থেকে দূরে—
একজন ক্লান্ত পুরুষ তার স্ত্রীকে বুকে জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে।আর একজন নারী নিশ্চুপ হয়ে আশ্রয় নিয়েছে তার সবচেয়ে নিরাপদ জায়গাটিতে।
তার স্বামীর বুকে।।।
( ইশশশ কি মিষ্টি একটা মূহুর্ত)
।কিছুক্ষণ পর দুজনেই বাইক রাইডের জন্য প্রস্তুত হয়ে নিচে নেমে এল।ইউভির পরনে কালো জিন্সের সঙ্গে কালো টি-শার্ট। তার ওপর গাঢ় কালো লেদার জ্যাকেট। চুলগুলো এলোমেলো অথচ স্বাভাবিকভাবেই আকর্ষণীয় লাগছে । দীর্ঘদেহী মানুষটির মধ্যে আজ সেই গম্ভীরতা নেই। বরং বাইক রাইডের জন্য প্রস্তুত হওয়া পুরুষটির চোখেমুখে এক ধরনের অদ্ভুত উচ্ছ্বাস প্রকাশ পাচ্ছে
অন্যদিকে ইনায়া পরেছে কালো জিন্সের সঙ্গে হালকা গোলাপি রঙের ফিটেড ওপর কালো লেদার জ্যাকেট। খোলা চুলগুলো বাতাসে উড়ছে পায়ে সাদা স্নিকার্স।
ইনায়া গার্ডেনে পা রাখতেই থমকে দাঁড়াল।
তার চোখ সরাসরি গিয়ে আটকে গেল সামনের বাইকটির ওপর।কালো রঙের বিশাল বাইকটি গার্ডেনের আলোয় চকচক করছে চকচকে কালো বডি, শক্তিশালী গঠন, ভারী চাকা আর এমন এক আক্রমণাত্মক সৌন্দর্য—যে কেউ দেখলেই বুঝবে, এটি সাধারণ কোনো বাইক নয়।এটি ছিল ইউভির Ducati Panigale V4 SP2।
‘পাশে আর একটা বাইক দেখে ইনায়া অবাক হয়ে বললো। এটা…’? ইউভি তার পাশে এসে দাঁড়ালো
তোমার জন্য গাঢ় কালো আর উজ্জ্বল গোলাপি রঙের অসাধারণ সমন্বয়। বাইকটির গঠন যেন একইসঙ্গে কোমল ও শক্তিশালী। কালো বডির ওপর গোলাপি রঙের সূক্ষ্ম নকশা, ঝকঝকে ধাতব অংশ আর দুর্দান্ত স্পোর্টস ইনায়া ধীরে ধীরে বাইকটির কাছে এগিয়ে গেল চোখে বিস্ময় বড় হয়ে গেল ঠোঁটে অবিশ্বাস্য হাসি ফুটে উঠলো
‘এটা আমার?’ইউভি মৃদু হাসলেন।
হ্যাঁ।’ইনায়া বাইকটির চারপাশে একবার ঘুরে দেখল এত সুন্দর!’ইউভি পকেটে হাত ঢুকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো ‘সুন্দর?’
ইনায়া মাথা ঘুরিয়ে তাকাল।
‘হুম।’
‘শুধুই কী সুন্দর?’ভীষণ সুন্দর।’ আমার শেহেজাদা
ইউভি সন্তুষ্টির ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন।এটা আপনার জন্য বিশেষভাবে কাস্টমাইজ করা হয়েছে।’
ইনায়া চোখ বড়ো করে বললো
‘কী?’
ইউভি ধীরে ধীরে বললেন—এটা হলো Ducati Superleggera V4-এর বিশেষ কাস্টম সংস্করণ।
‘কী?’
ইনায়া কে আর কিছু বলতে দিল না ইউভি কিছু বলার আগেই ইউভি তার হাতে একটি হেলমেট তুলে দিলো গোলাপি আর কালোর অসাধারণ সমন্বয়।ইনায়া হেলমেটটির দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে গেল।
ইউভি যত্ন করে তার মাথায় হেলমেট পরিয়ে দিলো। তারপর দুপাশের চুল সরিয়ে স্ট্র্যাপটা ঠিক করে দিয়ে একবার সামনে থেকে, একবার পাশ থেকে দেখে নিশ্চিত হয়ে দেখে নিলো সব ঠিকঠাক আছে কি না।ইনায়া মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইল তার স্বামীর দিকে।
ইউভি হেলমেটের নিচে বেরিয়ে থাকা চুলের গোছাটা আঙুল দিয়ে সরিয়ে দিয়ে বললো এখন ঠিক আছে।’ইনায়া মৃদু হাসল।আপনি আমার জন্য এত কিছু করেন কেন?’
ইউভি তার দিকে তাকিয়ে বললো ।কারণ তুমি আমার।’ আমার আদর।। ইনায়ার মুখের ভঙ্গি মুহূর্তেই নরম হয়ে গেল।
ইউভি নিজের হেলমেট পরলো
তারপর নিজের বাইকের দিকে এগিয়ে গিয়ে
ইঞ্জিন স্টার্ট দিতেই গার্ডেনের নীরবতা কেঁপে উঠল।
গভীর গর্জনে চারপাশের বাতাস যেন থমকে গেল।
ইনায়ার চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।ওহ!’
ইউভি তার দিকে তাকিয়ে হাসলেন।
ভয় লাগছে তোমাকে ?’ইনায়া নিজের বাইকে উঠে বসল আমাকে?’ইউভি মুচকি হাসলেন।
ইনায়া তার দিকে তাকিয়ে চোখ রাঙাল।
চলুন, মিস্টার চৌধুরী।’বাইক দুইটি পাশাপাশি গার্ডেন থেকে বেরিয়ে এলো।প্রথমে ধীর গতি চলতে লাগলো তারপর ইউভি গতি বাড়াললো ইনায়াও পিছিয়ে রইল না।
সে ও ইউভির সঙ্গে বাইকের গতি বাড়াতে লাগলো রাতের রাস্তায় পাশাপাশি ছুটে চলল বাইক দুইটি শহরের ল্যাম্পপোস্ট এর আলো একে একে পেছনে পড়ে রইল ঠান্ডা বাতাস দুজনের মুখে এসে আছড়ে পড়ছে ইউভি সামনে এগিয়ে গিয়ে আবার গতি কমিয়ে ইনায়ার পাশে চলে এলেন।
তারপর বাইক চালাতে চালাতেই এক হাত বাড়িয়ে দিল ইনায়া চমকে তাকাল।ইউভির হাত তার দিকে বাড়ানো।ইনায়া কয়েক সেকেন্ড দ্বিধা করল।তারপর নিজের এক হাত হ্যান্ডেল থেকে সামান্য সরিয়ে ইউভির হাতের ওপর রাখল।ইউভি তার হাত শক্ত করে ধরে ফেললএক হাতে বাইক চালাচ্ছেন।
অন্য হাতে ধরে রেখেছেন তার আদর কে।
কিছু সময় পর ইউভি বাইকটা সামান্য এগিয়ে নিয়ে গেল ইনায়া সঙ্গে সঙ্গে গতি বাড়াল।
ইউভি রিয়ার ভিউ মিররে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন।
ইনায়া যেন সেই হাসি দেখেই বুঝে গেলে ইউভি তাকে চ্যালেঞ্জ করছে। ইউভি চিৎকার করে বলল জিতে দেখাও মিসেস চৌধুরী। ইনায়া ও পালটা উত্তর দিলো। ওকে চ্যালেঞ্জ মিস্টার
চ্যালেঞ্জ।পরক্ষণেই দুটো বাইক আবার পাশাপাশি ছুটতে শুরু করল।
ইউভির চোখে খুশির ঝিলিক দেখা দিলো সাথে ঠোঁটের কোণে দেখা মিলল এক তৃপ্তির হাসি প্রিয় মানুষটার আনন্দ দেখার তৃপ্তি।
ইউভি মুগ্ধ হয়ে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে আছে সেই সামান্য সুযোগটুকুই কাজে লাগাল ইনায়া।
পরক্ষণেই ইনায়া গতি বাড়িয়ে ইউভিকে পাশ কাটিয়ে সামনে এগিয়ে গেল।
ইউভি কয়েক সেকেন্ডের জন্য কিছুই বুঝতে পারলেন না। তারপর রিয়ার ভিউ মিররে ইনায়ার বাইককে নিজের বাইককে পেছনে ফেলে এগিয়ে যেতে দেখে তার ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।ইনায়া তাকে পাশ কাটিয়ে চলে গেছে!
ইউভি এবার গলা উঁচু করে চিৎকার করে বললেন—
‘যাও, জিতে নাও বউ। বাড়ি ফিরলে কিন্তু কোনো দয়া-মায়া কাজ করবে না… তখন শুধু এই শেহেজাদ ইউভি চৌধুরীর কথাই চলবে।’
পরক্ষণেই যেন হঠাৎ আকাশের রং বদলে গেল।
কিছুক্ষণ আগেও যে আকাশটা ছিল পরিষ্কার, মুহূর্তের মধ্যেই সেখানে কালো মেঘের দল এসে জড়ো হলো। শহরের উজ্জ্বল আলোগুলো ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে গেল মেঘের ছায়ায়। ঠান্ডা বাতাস হঠাৎ আরও জোরে বইতে শুরু করল।
ইনায়া আকাশের দিকে তাকাতেই—
টুপ… টুপ…করে বৃষ্টির প্রথম কয়েক ফোঁটা এসে পড়ল তার হেলমেটের ওপর।
এরপর যেন আকাশের সমস্ত অভিমান একসঙ্গে ঝরে পড়ল। মুহূর্তের মধ্যেই ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল।
ইউভি দ্রুত বাইকের গতি কমিয়ে ইনায়ার পাশে চলে এল। তারপর গলা উঁচু করে চিৎকার করে বললেন—
—‘আদর! সামনে টংয়ের দোকান আছে, ওখানে যাও! বৃষ্টিতে ভিজলে কিন্তু জ্বর আসবে!’
ইনায়া কিছু বলল না। শুধু বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নেড়ে সামনে এগিয়ে গেল।বৃষ্টির ঝাপটায় রাস্তা মুহূর্তেই ঝাপসা হয়ে উঠেছে। চারপাশে গাড়ির হেডলাইটের আলো বৃষ্টির পর্দা ভেদ করে ছড়িয়ে পড়ছে। শহরের কোলাহলও যেন বৃষ্টির শব্দে কোথাও হারিয়ে গেছে।কিছুক্ষণের মধ্যেই দুজনেই রাস্তার পাশে ছোট্ট একটি টংয়ের দোকানের সামনে এসে থামল।
ইউভি দ্রুত বাইকটা একপাশে পার্ক করে ইনায়ার কাছে ছুটে এলো তার চোখে স্পষ্ট উদ্বেগ।
‘বেশি ভিজেছ?’ইনায়া হেলমেট খুলতে খুলতে মুচকি হেসে বলল ‘না, ভিজিনি।’
ইউভি একবার তার মাথা থেকে পা পর্যন্ত ভালো করে দেখে নিলেন। তারপর যেন নিশ্চিত হওয়ার পরই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন।
ইউভি আর কিছু না বলে দোকানদারের দিকে ফিরে বলল মামা , দুই কাপ চা দিন।’দোকানদার মাথা নেড়ে চা বানাতে ব্যস্ত হয়ে গেল।দুজন গিয়ে দোকানের সামনে রাখা কাঠের বেঞ্চটায় পাশাপাশি বসে পড়ল।চারপাশে তখন শুধু বৃষ্টির শব্দ।
টিনের চালের ওপর ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ছে। পাশের রাস্তার ওপর জমে থাকা পানিতে আলো পড়ে ছোট ছোট ঢেউ তৈরি করছে। বাতাসে ভেজা মাটির গন্ধ। দূরে কোথাও গাড়ির হর্ন শোনা যাচ্ছে, আবার পরক্ষণেই সবকিছু ঢেকে যাচ্ছে বৃষ্টির অবিরাম শব্দে।ইনায়া ধীরে ধীরে ইউভির দিকে তাকাল।
আর ঠিক তখনই থেমে গেল ইউভি তার দিকেই তাকিয়ে আছেন।কখন থেকে তাকিয়ে আছেন, কে জানে!ইনায়ার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে লাজুক এক হাসি ফুটে উঠল। সে চোখ নামিয়ে নিল।
ইউভি একটু ঝুঁকে তার আরও কাছে এসে নিচু কণ্ঠে বলল ‘আদর… বাইরে বৃষ্টি, তুমি, আমি আর এক কাপ চা—এর চেয়ে সুন্দর সন্ধ্যা আর কী হতে পারে, বলো তো?’
ইনায়া ঠোঁট কামড়ে লজ্জায় মুখ ঘুরিয়ে নিল।
ঠিক তখনই দোকানদার চায়ের কাপ দুটো এগিয়ে দিল।ইউভি কাপটা হাতে নিয়ে ইনায়ার দিকে বাড়িয়ে বললেন ‘খেয়ে নাও। ঠান্ডা লেগে যাবে।’
ইনায়া চায়ের কাপটা হাতে নিল। ধীরে ধীরে এক চুমুক দিল।তারপর কাপটা নামিয়ে রাখতেই ইউভি কোনো কথা না বলে কাপটা তুলে নিল
ইনায়া অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।ইউভি এক মুহূর্তও দেরি না করে কাপের ঠিক সেই জায়গায় ঠোঁট ছোঁয়ালেন—যেখানে কিছুক্ষণ আগেই ইনায়ার ঠোঁট ছুঁয়েছিল।তারপর অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে চায়ে চুমুক দিলো ইনায়ার চোখ দুটো বড়ো হয়ে গেল।
কয়েক সেকেন্ড সে নির্বাক হয়ে ইউভির দিকে তাকিয়ে রইল।তারপর ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি ফুটিয়ে বলল ‘বড্ড অসভ্য লোক আপনি! দিন দিন হৃদয়ের ভেতর বাজে ভাবে গেঁথে যাচ্ছেন।’
ইউভি চায়ের কাপে আরেকবার চুমুক দিয়ে ভীষণ নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল
—‘হৃদয়ে আছি বুঝি?’‘এত সৌভাগ্য আমার কবে থেকে হলো?’
ইনায়া এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না। হেসে ফেলল।‘আপনি না… একদম অসহ্য!’
‘জানি।’
—‘তারপরও এত গর্ব?’
—‘আপনি যখন সহ্য করছেন, তখন গর্ব না করে উপায় কী?’
ইনায়া চোখ রাঙাল।কিন্তু সেই চোখের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ভালোবাসাটা ইউভির চোখ এড়াল না।হঠাৎ ইনায়া বেঞ্চ থেকে উঠে দাঁড়াল।ইউভি অবাক হয়ে তাকাল‘কোথায় যাচ্ছ?’
ইনায়া কোনো উত্তর দিল না।শুধু ধীরে ধীরে দোকানের সামনের ছাউনির বাইরে এগিয়ে গেল।
বৃষ্টির পানিতে তার হাত ভিজে গেল। ঠান্ডা ফোঁটাগুলো তার আঙুল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে। ইনায়া চোখ বন্ধ করে এক মুহূর্ত বৃষ্টির স্পর্শ অনুভব করল।তারপর হঠাৎই গুনগুন করে৷ গেয়ে উঠলো
শেহেজাদার আদর পর্ব ৭০
‘হৃদয় চিরে দেখো, তোমারই ছবি,
কত ভালোবাসি, তবু লাজে মরি।
আমার জীবন শুধু তোমায়…
তুমি হীনা সবই আঁধার…’
