Home শ্যামা সুন্দরী শ্যামা সুন্দরী পর্ব ২১

শ্যামা সুন্দরী পর্ব ২১

শ্যামা সুন্দরী পর্ব ২১
সুরভী আক্তার

সকালের রান্না, খাওয়া দাওয়া সব শেষে উঠান ঝাঁট দিচ্ছিলেন অলকানন্দা । বাড়ির বাইরে জিপের আওয়াজ কানে আসতেই থামলেন তিনি । কান খাঁড়া করে সন্দেহ কাটানোর চেষ্টা করলেন । হাতের ঝাড়ু পাশে রেখে দু কদম এগোলেন খিড়কির দিকে । আম্মার ঘরের বারান্দায় হালকা রোদের আলোয় চেয়ারে বসে আছে রুপা । পা দুটো উঁচু একটা বেতের মোড়ায় রাখা । ফুলে গেছে পা দুটো । অথচ চেহারা রুগ্ন, শুকনো । ফিকে হয়ে গেছে মেয়েটার সুন্দর ভরাট চেহারা খানা । বাইরের জিপের আওয়াজ রুপার কানেও পৌঁছেছে । সেও চকিতে তাকালো আম্মার হাঁটার পথের দিকে । ময়না ও বেরিয়েছে ঘর থেকে । তাদের সবার আন্দাজ একই । কে আসতে পারে, ধারনা করতে অসুবিধা হলো না কারোরই । অলকার এগোনোর মাঝেই সংগ্রাম বাড়ির ভেতরে ঢুকলো । অলকা কে দেখে এক চিলতে হেসে সালাম প্রদান করলো । অলকাও উত্তর করলেন প্রফুল্ল হেসে । এই কদিনের মাথায় আবারো সংগ্রামের আসার কারণ বুঝতে না পেরে ভড়কালেন খানিক । অতঃপর বললেন…

” আরে বাবা , তুমি ? আও ভিতরে আও ! একা আইছো বাপ ? শ্যামা আহে নাই ?
সংগ্রাম পিছনে হাত গুটিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে জবাব দিলো…
” একা আসি নি আম্মা ! তবে শ্যামা কেও সাথে নিয়ে আসি নি আজ !
অলকা অপ্রস্তুত অবস্থায় পড়লেন । আবারো শুধালেন…
” কারে নিয়ে আইছো বাবা ? হেরে বাইরে দাঁড় করাইয়া রাখছো ক্যান ? ভিতরে নিয়া আহো !
সংগ্রাম ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকালো । অলকাও দৃষ্টি বরাবর তাকালেন সেদিকে । সবার দৃষ্টির সামনে ধীর পায়ে হাজির হলো জাভেদ । অলকা বৃহৎ নয়নে তাকিয়ে কপাল গুটালেন । সরু করলেন চাহনি । দুরে বারান্দায় বসা রুপার নজর ও বৃহৎ নয়নে পরিনত হলো । অবিশ্বাস্য নয়নে জাভেদের দিকে তাকালো মেয়েটা । এমনিতেই শরীরে শক্তি নেই , এখন আবার এক মুহুর্তে যেন পুরো শরীর কেঁপে উঠে জমাট বেঁধে গেল । অলকা একবার পিছন ফিরে মেয়ের গতি পর্যবেক্ষণ করে নিলেন । তার পর সংগ্রামের দিকে তাকালেন, অতঃপর জাভেদের দিকে । শুকনো কন্ঠে জোরপূর্বক বললেন…

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

” ভালো আছো বাবা ?
জাভেদ উত্তর করলো…
” ভালো আছি আম্মা ? আপনি কেমন আছেন ? আর রুপা ?
” রুপারে যেমন রাখছো তেমনই আছে ! দেখতে আইছো ওরে ?
অলকার কন্ঠে খানিক বিতৃষ্ণা । চোখ শক্ত করে কুঁচকে রাখা । রুপার স্থির দৃষ্টি এখনো এদিকে । জাভেদ ওর দিকে তাকালো এবার । দূর থেকেই একে অপরের দৃষ্টির মিলন ঘটলো । রুপার কাতর চাহনি । তবে জাভেদের চাহনি দুর্বোধ্য । দূর থেকে বুঝতে পারলো না রুপা । জাভেদ ওর দিকে তাকিয়েই বললো…
” আমার দায়িত্ব পালন করতে আইছি আমি…
বলেই এগোলো রুপার দিকে । অলকা সংগ্রামের দিকে তাকালে সংগ্রাম চোখের ইশারায় শান্তনা জোগালো । অতঃপর দুজনে এগোলো পিছু পিছু । জাভেদ সোজা উঠলো বারান্দায় । কিছু বলার মতো শব্দ আসছে না গলা দিয়ে । সে শুধু নিশ্চল চোখে তাকিয়ে আছে রুপার দিকে । রুপাও ঘাড় উঁচু করে তাকিয়ে আছে । আজ কতদিন পর দেখলো নিজের স্বামী কে । সংগ্রাম দু’জন কে দেখে গলা খাঁকারি দিলো । শান্ত কন্ঠে ডাকলো…

” রুপা…
তৎক্ষণাৎ চাইলো রুপা । ধ্যান ছুটলো ওর । সংগ্রাম মৃদু হেসে বলল…
” আপনি আমার বয়সে অনেকটা ছোট হবেন । আমার বেগমের দিক থেকে সম্পর্কের হিসেব না হয় বাদ দিলাম । আপনি আমার ছোট বোনের মতো,, তাই নাম ধরেই ডাকছি । বড় ভাই হিসেবে মেনে নিন এটা ।
রুপা মাথা ঝাঁকালো । বিচলিত কন্ঠে বলল…
” এ্যামনে কইয়েন না ছোট জমিদার ।
তৎক্ষণাৎ ভুল ধরলো সংগ্রাম…
” উহু… ছোট জমিদার নয় , ভাই ।
বড় ভাই হিসেবে ছোট বোনের প্রতি অনেক দায়িত্ব আমার । কয়েকটা কথা বলি…মন দিয়ে শুনুন …
রুপা কিছু বললো না । চেয়ে আছে নিগুড় চোখে । সংগ্রাম ফের বললো…

” আপনার স্বামী এসেছে আজ । জানি , অনেক ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে আপনাদের মাঝে । অনেক টানাপোড়েনের মধ্যে যেতে হয়েছে আপনাদের । তবুও শেষ অবধি কিন্তু উনি আপনার স্বামী । যত যাই হোক , আপনি ওনার দায়িত্ব । উনি ওনার দায়িত্ব পালনের জন্য এসেছেন । যা হওয়ার হয়েছে , এখন সবটা মেটানোর পালা । কে আপনাকে নিয়ে কি ভাবছে না ভাবছে,সেটা আপনার দেখার বিষয় নয় । আপনার স্বামীর কাছে আপনি কি , সে আপনাকে নিয়ে কি ভাবছে সেটাই প্রধান । আমি কি বলতে চাইছি বুঝতে পারছেন আশা করি ? নিজেদের মধ্যকার ভুল ধারণা মিটিয়ে,সবটা শুধরে নিন ।
রুপা চোখ নামালো । ছলছল করে উঠলো চোখ দুটো । সংগ্রাম এবার তাকালো জাভেদের দিকে । জাভেদ অলকার দিকে তাকিয়ে ছোট্ট করে বললো…

” আম্মা , আমি রুপার লগে আলাদা কইরা কথা কইতে চাই ।
অলকার অনুমতি দেওয়া না দেওয়াতে কোনো কিছু যায় আসে না । দ্বিমত করার ও কোনো সাধ্যি নেই তার । তিনি বারান্দার উঠে রুপার পাশে দাঁড়ালেন । রুপা একলা অচল । শরীরের দূর্বলতায় হাঁটতে পারে না । অলকা নিজের শরীরে ভর করিয়ে রুপা কে ঘর থেকে বাইরে বের করিয়েছেন । তাও আবার অনেক কষ্টে । এখন ঘরে নিতে হলে আবারও একই ভাবে ঘরে নিয়ে যেতে হবে ওকে । অলকা রুপার কাঁধে হাত রাখলেন । রুপা পিটপিট করে তাকালো আম্মার দিকে । অলকা চোখ বুজে ইশারা করলেন । রুপাকে ধরে দাঁড় করানোর আগে সংগ্রাম বলে উঠলো…

” আপনি ছেড়ে দিন আম্মা , ওর স্বামী এসেছে এখন । ওর দায়িত্ব ওকেই দিন ।
কি হলো আমার বোন জামাই ? দাঁড়িয়ে দেখছো কি ? আমার বোনের শরীরের ভার বহনের ক্ষমতা নেই তোমার ? তোমার দায়িত্বের তুলনায় ওর শরীরের ভার কমই আছে । আশা করি সমস্যা হবে না ।
বলেই ভ্রু উঁচু করলো সংগ্রাম । আফতাব চোখ নামিয়ে মৃদু হাসলো । এক মুহুর্ত অপেক্ষা না করে আকস্মিক কোলে তুলে নিলো রুপা কে । অকস্মাৎ কান্ডে ভড়কে গিয়ে নিজেকে সামলে নিয়ে জাভেদের গলা জড়িয়ে ধরলো রুপা । অলকা চোখ সরালেন থতমত খেয়ে । মুচকি হাসলেন অতঃপর । সংগ্রাম ও নরম হাসলো । দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা ময়নাও মুখ চেপে ফিক করে হাসলো । অতঃপর দরজা থেকে সরে দাঁড়ালো ।
জাভেদ রুপা কে কোলে নিতেই অনুমান করলো , আসলেই রুপা অনেক শুকিয়েছে । আগের তুলনায় অনেক হালকা লাগছে ওর শরীর টা । যার ফলে অতি আলগোছে কোলে তুলতে সমস্যা হলো না । জাভেদ ঘরে গিয়ে নামালো রুপা কে । খাটে বসালো ওকে । নিজে হাঁটু মুড়ে বসলো রুপার পায়ের কাছে । ওর পা দুটো ধরে খাটে তুলে দিতে গেলে বাঁধ সাধলো রুপা … কোমলতা খুইয়ে মুখ ফিরিয়ে তীক্ষ্ণ স্বরে বলল…

” ছুঁইবেন না আমারে…
জাভেদ তাকালো সহসা । রুপার মুখ ফিরিয়ে রাখা দেখে তপ্ত শ্বাস ফেললো । কন্ঠনালিতে শ্বাস আটকে আসছে অপরাধ বোধে । নিজের দায়িত্ব হীনতার জন্য নিজেই নিজের কাছে আজ তিরষ্কারের পাত্র সে । রুপার কাছে এমন অস্বস্তিকর ব্যবহার আশা করাটাই স্বাভাবিক । জাভেদ কন্ঠ নুইয়ে বললো…
” তিক্ত লাগতাছে আমার ছোঁয়া ?
রুপা উত্তর করলো না ‌। কথা ঘুরিয়ে বললো…
” ক্যান আইছেন এইখানে ?
” তোমারে নিতে আইছি ! দেখতে আইছি আমার বউ রে !
” বউ ? আমি ? আপনার ? তা , হঠাৎ দেখার ইচ্ছা জাগলো যে ? শেষ বার দেখতে আইছেন ?
রুপা কাঠ কাঠ কথার পরিপ্রেক্ষিতে কথা বলতে গলা কাঁপছে জাভেদের । ওর চোখে মুখে অসহায়ত্ব স্পষ্ট । ওর অসহায় মুখ পানে তাকাতেই রুপা নরম হয়ে আসলো এবার । কাঁপা গলায় বললো…

” যদি মইরা যাইতাম, তাইলে হয়তো আর দেখতে পাইতেন না আমারে । এখনো মরি নাই, দেইখা লন , চোখ ভইরা শেষ বার দেইখা চইলা যান । এরপর আপনার লগে আর দেখা না হইতেও পারে । না আমি যাইতে পারমু আর না আপনারে আইতে দিবো !
জাভেদ উঠে বসলো রুপার পাশে । সে পুরুষ বটে , তবে প্রেমিক পুরুষ নয় । প্রেমিক পুরুষরা কেমন হয় জানা নেই ওর । ওরা কি করে নিজেদের মনের ভাব প্রকাশ করে এটাও জানা নেই । ও শুধু রুপার স্বামী, এটাই জানে । রুপা কে কখনো নিজের ভালোবাসার কথা মন খুলে জানাতে পারে নি জাভেদ । তবে আর পাঁচ জন সাধারণ স্বামীর তুলনায় রুপা কে সে অনেক বেশি ভালোবাসতো । এখনো বাশে । এখন কদিনের বিরহে ভালোবাসা বেড়েছে বোই কমে নি । অপ্রকাশিত ভালোবাসা ওর । জাভেদ রুপা কে নিজের দিকে ফিরিয়ে ওর হাত দুটো শক্ত করে আকড়ে ধরলো । অতঃপর অপরাধীর ন্যায় বললো…

” আমারে ক্ষমা কইরা দেও রুপা , আমি অনেক বড় ভুল করছি । বিশ্বাস করো আমি তোমারে অনেক বেশি ভালোবাসি , সন্তান মরছে মরুক , ওদের লাগবো না আমার । আমার তো তোমারে লাগবো । তুমি হইলে সব হইবো আমার ।
” এতো দিন এই মনোভাব কোই ছিলো আপনার ? বাচ্চা মরার দায়ে আপনিও দোষি ভাবলেন আমারে ? ছাইড়া চইলা গেলেন ? আচ্ছা আমারে কি একটা বারও দেখতে ইচ্ছা করলো না আপনার ? আমি মরলাম কি বাঁচলাম, জানতে মনে চাইলো না ? অসুস্থ আমি টারে ফেলাই রাখতে কষ্ট হইলো না ? আমি মরলে আপনি খুশি হইতেন বুঝি ?
তৎক্ষণাৎ রুপার মুখ চেপে ধরলো জাভেদ । বিচলিত কন্ঠে বলল…

” একদম না , আমি কোনো দিন সন্তান মরার দায় দেই নাই তোমারে ‌। আর না তোমারে ছাড়ছি , ছাইড়া গেলে এইখানে আইতাম না ।
রুপার ফের শক্ত জবাব….
” ছোট জমিদার জোর কইরা নিয়া আইছে আপনারে ? তাই না ? না হইলে তো আপনার আওনের কথা না ! আপনার বাড়ির মানুষ আইতেও দিতো না । নিজের মনের বিরুদ্ধে গিয়া জোরপূর্বক ক্যান আইছেন এইখানে ?
” নিজের দায়িত্ব পালনের লাইগা আইছি ! এই কঠিন সময়ে তোমারে একলা ছাড়ি ক্যামনে ?
রুপার তাচ্ছিল্য কন্ঠ…
” যখন আপনার প্রয়োজন ছিল তখন কাছে পাই নাই আপনারে । পাশে পাই নাই । সঙ্গ পাই নাই আপনার । আপনার দায়িত্ব পালন করেন নাই তখন । কোই ছিলো আপনার দায়িত্ব বোধ ?

” এইটাই তো আফসোস । সৎ সাহস ছিল না আমার । এই সৎ সাহস জোগাইতে জোগাইতে অনেকটা সময় পার কইরা ফেলাইলাম দেখো । ভুল করছি আমি রুপা ।
আইজ যখন সংগ্রাম জোয়ার্দার সাহস বাড়াইলো আমার , তখন আর আমি থাকতে পারি নাই । ছুইটা আইছি বিশ্বাস করো । আমারে ক্ষমা কইরা দেও তুমি । আমি আর কোনো দিন কাপুরুষের পরিচয় দিমু না । তোমার কাছে, তোমার জন্য সুপুরুষ আমি । তোমার ঢাল হইয়া দাঁড়াইমু আইজ থাইকা । আর কেউ তোমারে কিচ্ছু কইতে পারবো না ।
রুপা নিজেকে সামলাতে পারলো না আর । চাপা আর্তনাদে গুমড়ে কেঁদে উঠলো । আঁচড়ে পড়লো স্বামীর বুকে । ক্রন্দনরত কন্ঠে কেঁপে কেঁপে বললো…

” সন্তান তো আমার মরছে , আমার বুক খালি হইছে ‌। আটটা মাস পেটে ধরছি আমি ওদের । ওদের ভার সইছি আটটা মাস , প্রসবের তীব্র যন্ত্রণাও সইছি । আবার ওদের হারানোর কষ্ট টাও সইছি । এইগুলা কি কম আছিলো ? আপনি আর আপনার পরিবার ক্যান এমনটা করলেন আমার লগে । আমার তো সুখি একটা সংসার আছিলো । সেই টাও ভাইঙ্গা দিলেন আপনারা ? আমারে গুঁড়া কাইরা দিলেন সব দিক থাইকা…
জাভেদ এক হাত রুপার পিঠে রাখলো , অন্য হাত মাথায় চুলের ভাঁজে । শক্ত করে জড়িয়ে শান্ত কন্ঠে বললো…
” ভাঙ্গে নাই তোমার সংসার । আমি আছি তোমার হইয়া । আর তোমার সংসার ও তোমারই আছে । আর কে কি কইলো না কইলো আমি কিচ্ছু শুনমু না । তুমি আমার বউ , আর আমি আমার বউরে ফিরাইয়া লইয়া যামু । সংসার করমু । এটা যদি কেউ না মানে, তাইলেও কিচ্ছু যায় আসে না আমার । কাউরে লাগবো না আমার, শুধু তুমি হইলেই চলবো ‌। খালি সুস্থ হইয়া যাও একবার , আমি ফিরাইয়া লইয়া যামু তো তোমারে । আবারো সুন্দর একটা সংসার পাতমু আমরা । এবার নতুন কইরা ।

একেবারে দুপুরের পর পর বাড়ি ফিরেছে সংগ্রাম । রুপার বিষয়টা সবসময় ওর মাথাতে ছিল । রুপা মেয়ে টা ভালো । সংগ্রাম চায়নি ওর সুন্দর সংসার টা নষ্ট হোক । তাইতো সকাল সকাল বেরিয়েছিল জাভেদের সাথে দেখা করতে । জাভেদ লোকটা সাদাসিধে । রুপার কাছে ফেরার জন্য ওর একটা সহায়কের প্রয়োজন ছিল । যে সহায়কের দায়িত্ব টা সংগ্রাম পালন করেছে যথাযথ ।
এদিকে সকাল নয়টার দিকে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল সাত শিক্ষার্থী । ওদের পুরো জমিদার গ্রাম ঘুরিয়ে দেখানোর দায়িত্ব পড়েছে আহাদের কাঁধে । আহাদ দায়িত্ব পালন করেছে নিজের । দুপুরের দিকে খাবারের জন্য ওরাও বাড়ি ফিরেছে । খাবার খেয়ে একটু বিশ্রামের জন্য মিষ্টি রোদের আলোতে সবাই বসে আছে বাগানের পাশে । সংগ্রাম অন্দরে ঢোকার আগে একবার এগোলো তাদের দিকে । সংগ্রাম কে দেখে দাঁড়িয়ে গেলো সবাই । সংগ্রাম স্বাভাবিক হেসে সবার উদ্দেশ্যে বললো…

” গ্রাম ঘুরে দেখেছো তো ঠিক মতো ? কেমন লাগলো আমাদের গ্রাম ?
আরশ জবাব দিলো …
” সবে তো এক বেলাতে অর্ধেক গ্রাম ঘুরলাম । এখনো অর্ধেক গ্রাম বাকি ‌। একটু পর বেরোবো আবার । আপনাদের গ্রাম কিন্তু অনেক বড় , আর যতদূর দেখলাম অনেক সুন্দর ও বটে । অনেক গ্রাম পরিদর্শন করেছি আগে , এতো সুন্দর লাগে নি কোনো গ্রাম । একেবারে কাব্যিক সৌন্দর্যে ভরপুর আপনাদের জমিদার গ্রাম ।
” এটা তো শুধু জমিদার গ্রামের সৌন্দর্য , আরো থাকো, দেখো পুরো জমিদার রাজ্য, আশা করি খারাপ লাগবে না ।
কথাটা শেষ করেতেই সংগ্রামের নজর পড়লো বসে থাকা একজনের দিকে । সবাই দাঁড়িয়েছে সংগ্রাম কে দেখে , এমনকি সংগ্রাম নিজেও দাঁড়িয়ে । অথচ সামনের ছেলেটা বসে ! তাও আবার পায়ে পা তুলে ‌। ওর এমন অবিনয়ী ভাব দেখে কপাল কুঁচকালো সংগ্রাম । বিরক্ত হতে চেয়েও হতে পারলো না । বরং নিরেট কন্ঠে শুধালো…

” তোমার নাম কি ?
প্রশ্ন টা যে নিজের দিকে এসেছে এটা বুঝতে পেরে উঠে দাঁড়ালো অংকুর । স্বাভাবিক ভাবে জবাব দিলো…
” অংকুর জমাদার !
সংগ্রাম ভ্রু দ্বয়ের মাঝে কয়েক স্তর ভাঁজ ফেলে আচমকা বলে বসলো…
” জমাদার আর জমিদারের মধ্যে বোধহয় পার্থক্য নেই ! কি বলো ? থাকলেও জানা নেই আমার । তোমার জানা থাকলে ভালো হতো ! পরবর্তীতে জেনে নিও পার্থক্য টা ।
সংগ্রামের কথাটার তীক্ষ্ণ খোঁচা দেওয়া অর্থ বোধগম্য হলো সবারই । অংকুরের এমন গম্ভীর আচরণ পছন্দ হয়নি ওর , এটা বুঝতে বাকি নেই কারোর । কিন্তু কি আর করার , অংকুর তো বরাবরই এমন । অন্যরা যে পথে হাঁটে সে পথ পছন্দ নয় তার ‌। সে কাউকে অনুসরণ করে না । নিজের মতো সে । তবে ও যে অবিনয়ী এটাও নয় , ও বিনয়ী তবে বিনয় প্রকাশ করে গাম্ভীর্য তার সহিত ‌।
সংগ্রাম সবাইকে দেখলো আবারো । স্বাভাবিক কন্ঠে বলল…

” খেয়েছো তোমরা ?
একই সাথে হ্যাঁ সূচক সম্মতি প্রকাশ করলো সবাই । সংগ্রাম আর কথা বাড়ালো না । পা বাড়ালো অন্দরের দিকে । দু’পা এগোতেই সেই মেয়েলি কণ্ঠ…
” আপনি খেয়েছেন ছোট জমিদার সাহেব ?
সাথে সাথে থেমে গেল সংগ্রাম । কপাল গুটিয়ে পিছন ফিরলো । অনেক সাহস জুগিয়ে উৎসুক হয়ে প্রশ্ন টা করেছে তহুরা । সংগ্রাম চোয়াল শক্ত করে নিরেট দৃষ্টিতে তাকালো । শক্ত কন্ঠে বলল…
” কি বলে ডাকলে আমায়‌ ?
তহুরা’র ফের উৎসুক জবাব…
” ঐ সকালে তো আপনি আপনার নাম ধরে ডাকতে বারন করেছিলেন । আর সবাই তো আপনাকে ছোট জমিদার বলেই ডাকে । কিন্তু আপনার ব্যক্তিত্বের সাথে ‘সাহেব’ সম্বোধন টা বেশ মানানসই । তাই আমি একটু বাড়িয়ে ‘ছোট জমিদার সাহেব’ বলে ডাকলাম ।
অধিক শক্ত হলো সংগ্রামের চোয়াল । ধমকে উঠলো ও…

” চুপ করো মেয়ে । তোমাকে না বলেছি, আমার সামনে এভাবে রসিয়ে রসিয়ে কথা বলবে না । কানে যায় নি ? আর আমাকে ‘ছোট জমিদার সাহেব’‌ বলে ডাকার সাহস কোথায় পেলে তুমি ? অন্যদের থেকে আলাদা নও তুমি । আমাকে ডাকলে ‘ছোট জমিদার’ বলেই ডাকবে । ‘সাহেব’ বলার অধিকার নেই তোমার । এই অধিকার শুধু আমার ‘সাহেবানের’ আছে ! বুঝেছো ?
চমকালো উপস্থিত সবাই । তহুরা চুপসে গেছে মুহূর্তেই । সংগ্রাম কথা শেষ করেই গটগট পা ফেলে স্থানে ত্যাগ করেছে । ওর যাওয়ার দিক থেকে চোখ সরিয়ে সবাই তাকালো তহুরা’র দিকে । তহুরা মিনমিন করে বললো…
” কি এমন বললাম আমি , এভাবে প্রতিক্রিয়া দেখানোর কি আছে ?
জবা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বললো….

” বুঝিস না , জমিদারের ছেলে , এইটুকু ভাবসাব আর আত্মগড়িমা, ভঙ্গিমা, তো থাকবেই । কেমন চেটাং চেটাং কথা দেখেছিস ?
রিক্তা বিরক্ত হলো…
” কোথায় চেটাং চেটাং কথা দেখলি ? উনি যা করেছেন বেশ করেছেন , তহুরা’র বা কি দরকার ছিল এভাবে গায়ে পড়ে কথা বলার ! সকালেও তো দেখেছি আমি ।
তহুরা রিক্তার কথায় বিভ্রান্ত হলেও সংগ্রামের এতো গায়ে লাগা রাগান্বিত স্বরের কথা ওর মধ্যে প্রভাব ফেলতে পারলো না । বরং ও উপভোগ্য চোখে তাকিয়ে রইলো সংগ্রামের যাওয়ার পানে ।

অন্দরে প্রবেশ করে ধুপধাপ পা ফেলে ঘরের দিকে উঠলো সংগ্রাম । চোখ মুখ শক্ত করে কুঁচকে রেখেছে । অত্যাধিক বিরক্ত সে , রাগ লাগছে ভীষণ । গায়ের চাদর খুলতে খুলতে ঘরে ঢুকলো সংগ্রাম । ঘরে ঢুকেই মুখোমুখি হলো শ্যামার । অমনি শিথিল হলো পুরো মুখশ্রী । কপালের বিরক্তির ভাঁজ উধাও হয়ে গেল মূহুর্তেই । ওর সামনা সামনি ঠিক দরজার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে শ্যামা । লম্বা হাঁটু সমান চুল গুলো খুলে রাখা । আলতো ভেজা সেগুলো । সংগ্রাম আলতো হাসলো । হাতের চাদরটা একপাশে রাখলো । শান্ত স্বরে বলল…
” কি হলো বেগম , আমার অপেক্ষায় ছিলে ?
শ্যামা যেন হাসার চেষ্টা করলো । কন্ঠ খাদে নামিয়ে দায়িত্ব বোধ দেখিয়ে বললো…

” কাপড় বের করে রেখেছি আপনার , আপনি গিয়ে গোসল সেরে নিন । ক্লান্ত লাগছে আপনাকে !
সংগ্রাম আর কথা বাড়ালো না । সোজা এগোলো গোসল খানার দিকে । গোসল সেরে বেরিয়ে এসেছে কয়েক মুহূর্ত পর । শ্যামা কে ঘরে পায় নি বাইরে এসে । জমিদার বাড়ির সবার দুপুরের খাবার খাওয়া শেষ । সংগ্রাম বাকি । সে ছিল না বিধায় সবাই ওকে ছাড়াই খেয়েছে । তবে শ্যামা খায় নি । সে নিচ থেকে খাবার বেড়ে নিয়ে এসেছে সংগ্রামের জন্য । ঘরে এসে দেখে সংগ্রাম আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে । পাঞ্জাবির হাতা গোছাচ্ছে কনুই পর্যন্ত । শ্যামা ধীর পায়ে দাঁড়ালো ওর পেছনে । সংগ্রাম হাতা গুটিয়ে আয়নায় তাকালো । প্রতিবিম্বে নিজের পেছনে শ্যামা কে দেখে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ । শ্যামা ও তাকিয়ে আছে নরম দৃষ্টিতে । সংগ্রাম নিঃশব্দে হাসলো । ওভাবে তাকিয়েই বললো…

” কি দেখছেন সাহেবা ?
শ্যামার নির্লিপ্ত জবাব …
” আপনাকে ! আপনি অনেক সুন্দর ছোট জমিদার সাহেব । একদম অমায়িক সুন্দর । চোখে লাগে আপনার সৌন্দর্য ।
সংগ্রাম পিছন ফিরলো , এগোতে এগোতে বললো…
” আমার বেগম ও কম সুন্দর নয় ! তার নিষ্পাপ শ্যামলতা পূর্ণ মাধুর্যময়ী সৌন্দর্য আমারো চোখে লাগে !
” আমার সৌন্দর্য শুধু আপনার চোখে লাগে , আর আপনার সৌন্দর্য পুরো নারী জাতিকে আকৃষ্ট করে । সব নারীর চোখ আকৃষ্ট করতে পারে ।
” তাতে কিছু যায় আসে না আমার । এই আমি’টা শুধু তোমার চোখকে আকৃষ্ট করতে পারলেই সন্তুষ্ট । আর কারোর বাঁকা দৃষ্টির ও প্রয়োজন নেই আমার ।
” আমার চোখকে শুধু আকৃষ্ট নয়‌, জিতে নিয়েছেন আপনি ।
শ্যামার এই অসাধারণ কথাটা মন ছুঁয়ে দিলো সংগ্রামের । শীতলতা ছড়িয়ে পড়লো হৃদয়ে । সংগ্রাম হাসলো । চোখ দুটোতে ঝিলিক বয়ে গেল মনে হলো । শ্যামার অদ্ভুত ভাবে চেয়ে থাকার মাঝেই সংগ্রাম হীমশিতল কন্ঠে বললো…
” তাহলে তো ,, এই আমি’টা ধন্য – আমার সৌন্দর্যে আমার বেগমের দৃষ্টি জিতে নেওয়ার জন্য ।
শ্যামাও লাজুক ভঙ্গিতে হাসলো । শ্যামার এই হাসিটা ভীষণ প্রিয় সংগ্রামের কাছে । এই হাসিটার গুরুত্ব ওর কাছে অতুলনীয় ।
সংগ্রাম খাওয়ার জন্য বিছানার এক পাশে বসলো । শ্যামা সামনে বসে চোখে চোখ রেখে বললো…

” আমি খাইয়ে দেই আপনাকে ?
সংগ্রাম না করলো না । মাথা ঝাঁকিয়ে ইশারা করলো । শ্যামার আচরণ কেমন অদ্ভুত লাগছে আজ । শ্যামা সচরাচর এমন করে কথা বলে না । একেবারে বলে না বললেই চলে । সংগ্রাম এক লোকমা খাওয়ার মাঝে শুধালো …
” তুমি খেয়েছো ?
শ্যামা না বোধক মাথা ঝাঁকালো শুধু । কথা বললো না । চোখ তুলেও তাকালো না । ভাতের প্লেটে হাত চালাতে লাগলো । সংগ্রাম ভালো করে লক্ষ্য করলো ওর চোখের কোণে পানি চিকচিক করছে । সংগ্রাম তৎক্ষণাৎ ওর মুখখানি উঁচু করে বিচলিত কন্ঠে বলল…
” কি হয়েছে বেগম ? কাঁদছো কেনো তুমি ?
শ্যামা মুখ ফিরিয়ে নিলো । বাম হাতের উল্টো পিঠে মুছে নিলো ভেজা চোখ দুটো । অতঃপর চোখ নামিয়ে ভেজা কন্ঠে বলল…

” কোই কাঁদছি ? কিছু হয়নি আমার….
সংগ্রাম মানলো না । শ্যামা কে ফেরালো নিজের দিকে । এবার শক্ত কন্ঠে বলল…
” তোমার চোখের পানি আমার চোখ থেকে লুকাবে ? তোমাকে বলেছি না , সংগ্রাম জোয়ার্দার তার বেগমের চোখের পানি সহ্য করতে পারে না । কি হয়েছে বলো ? কেনো কাঁদছো ? কে কি বলেছে তোমায় ?
শ্যামা তাকালো । নির্লিপ্ত স্বরে বলল…..
” কেউ কিছু বলে নি !
” তাহলে চোখে পানি কেনো ? আমি কিছু করেছি ? আমার কোনো ব্যবহারে কষ্ট পেয়েছো তুমি ?
শ্যামা মাথা নাড়ালো । বললো…

” উহুম…
আপনি আমার কষ্টের কারণ কখনো হবেন না ছোট জমিদার সাহেব । আপনি তো আমার ভয়ের কারণ…
” ভয়‌ ?
” হুম , তখন নিচে ঐ মেয়েটার সাথে কি এমন কথা বলছিলেন আপনি ? সকালেও তো কথা বলেছেন ! কে ও ? কেনো কথা বলেছেন ওর সাথে ? ও বেশি সুন্দর,, তাই না ?
সংগ্রামের ললাটে কয়েক স্তর ভাঁজ পড়লো । চেয়ে থেকেই হেসে ফেললো খানিক বাদ । হাসি থামিয়ে বলল…
” ও ,, তাহলে হিংসে হচ্ছে আমার বেগমের ? চিন্তা করো না ডালিয়া , সে সাধারণ আর তুমি অসাধারণ । সংগ্রাম জোয়ার্দারের অসাধারণের প্রতি প্রলোভন বেশি । অসাধারণ জিনিস অসাধারণ ভাবে আকৃষ্ট করে তাকে । তাই চিন্তা নেই ,, তোমার ছোট জমিদার সাহেব শুধু তোমারই থাকবে । তুমি থাকতে অন্য কারোর প্রয়োজন হবে না তার ।
” আর আমি না থাকলে ?
সংগ্রামের কথার মাঝে বলে উঠলো শ্যামা । সংগ্রাম শ্বাস টানলো । আহত স্বরে বলল…

” তুমি না থাকলে সংগ্রাম জোয়ার্দার ও থাকবে না বেগম । তুমি যতদিন আছো সংগ্রাম জোয়ার্দার ও ততদিন থাকবে ! তোমাকে আগলে রাখার জন্য হলেও থাকবে !
” যদি আপনার আগে আমার মৃত্যু হয় ! তখন ? তখন কাকে আগলে রাখবেন ?
” এটা কখনো হবেই না । তোমার আগে আমার মৃত্যু হবে । তবে জীবনের শেষ নিঃশ্বাস অবধি তোমাকে আগলে রাখবো আমি ! তারপর তোমার গর্ভে যে নতুন সংগ্রাম জোয়ার্দার জন্মাবে , আমার মৃত্যুর পর সে আগলে রাখবে তোমায়‌ ?
শ্যামা সঙ্কিত হয়ে অবস স্বরে বলল…

” আমার কি মনে হয় জানেন ? আমি বোধহয় বেশি দিন বাঁচবো না । আমার মৃত্যু হয়তো আপনার আগেই হবে , কারন আমার আয়ু মনে হয় অনেক কম । এই আয়ু ফুরিয়ে যাবে আপনার আগে…
” তাহলে আমার আয়ু তোমার হোক , আর নয়তো তুমি অবধি আমার আয়ু হোক । কারন আমার আগে তোমার বিদায় সইতে পারবো না আমি ।
শ্যামা টলমল চোখেই হাসলো । শান্ত কন্ঠে বললো…
” খেয়ে নিন !

সংগ্রাম ওর বৃদ্ধা আঙ্গুলে শ্যামার গালে গড়িয়ে পড়া পানি টুকু মুছিয়ে দিয়ে মোলায়েম কন্ঠে বলল…
” কাঁদবে না কখনো , সংগ্রাম জোয়ার্দার এটাতে কাবু । তোমার ঐ চোখে শুধু সুখের অশ্রু ঝরবে , দুঃখের নয় । তুমি আমার প্রয়োজন নও বেগম , তুমি আমার প্রিয়জন । প্রিয়তমা তুমি আমার । আমার মনের মনিকোঠায় তোমার অবস্থান , যেখানে ঠাঁই পেয়েছো তুমি , তোমার প্রতি সবচেয়ে দামী অনুভূতিরা স্থান করে নিয়েছে সেখানে ।

শ্যামা সুন্দরী পর্ব ২০

যেখানে আর কেউ নেই । আর না কারোর প্রয়োজন আছে । যেখানে গোটা একটা তুমি আছো আমার জন্য , সেখানে আমার আর কারোর প্রয়োজন হবে না বেগম । আমাকে নিয়ে, আমাকে অন্য কারোর কাছে ক্ষোয়ানোর ভয়ে কাঁদতে হবে না তোমায় । কারন আমি হারিয়ে গেলেও তুমি ব্যতীত অন্য কারোর হবো না কোনো দিন ‌। সংগ্রাম জোয়ার্দার সারাজীবন তোমার হয়েই থাকবে । থাকবে তার বেগমের হয়ে…
বরাবরই সহজ ভাবে স্বীকারোক্তি করে সংগ্রাম । এবারও করলো । কঠিন বাক্যে সহজ সরল ভাবে নির্দ্বিধায় স্বীকার করলো নিজের অনুভূতি টুকু ।

শ্যামা সুন্দরী পর্ব ২২