Home শ্যামা সুন্দরী শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৪৮

শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৪৮

শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৪৮
সুরভী আক্তার

সন্ধ্যার পর পর বাড়ি ফিরলো শায়লার ছেলে বউমা । অংকুর আর সুরবালা । সুরবালার চোখে মুখে উপচে পড়া আনন্দ । দুপুরের আগে আগে ওকে নিয়ে বেরিয়েছিল অংকুর । সুরবালার ইচ্ছানুযায়ীই । সে ইচ্ছে প্রকাশ করেছিল শহরের রাস্তায় রিকশা করে ঘোরার । অংকুর সর্বোচ্চ চেষ্টায় ওর ইচ্ছের মূল্য দিয়েছে ।
সেই সকালের নাস্তার পর অংকুর ঘরে আসতেই সুরবালা তেড়ে গেছিলো ওর দিকে । কিছু বলার আগেই অংকুর ওকে বলেছে তৈরি হতে । বাইরে নিয়ে যাবে ঘুরতে । সুরবালা কিছুই বলতে পারে নি আর । এক নিমিষেই যা বলতে তেড়ে গেছিলো সবটা ভুলে গেছে ।

তৈরি হয়ে বাড়ি থেকে বেরোতে বেরোতে বারোটা বেজে গেছিলো ওদের । সুরবালা বোরখা পড়েছে । হিজাব নিকাবে চোখ অবধি পুরো শরীর আবৃত । এ বাড়িতে এসেছিল এক কাপড়ে , আসার পর আলমারি ভর্তি শাড়ি গহনা পেয়েছে । সবটা শায়লা নিজেই কিনে দিয়েছেন । কিনে রেখেছিলেন শায়লা । যখন জানতে পারলো , তার গোমড়া মুখো ছেলে কোনো মেয়ের পাল্লায় পড়েছে , এবং সেই মেয়েকেই বিয়ে করবে তার ছেলে । তখনই সব কাপড় চোপড় কিনে আলমারি সাজিয়ে তুলেছিলেন তিনি । বিয়েটা অকস্মাৎ হলেও তিনি সবটা আগে থেকেই গুছিয়ে রেখেছিলেন তার বউমার জন্য । এক মাত্র ছেলের একমাত্র বউ । কোনো কিছুতে যেনো কমতি না থাকে । বোরকাও কিনেছিলেন কয়েকটা । আজ একটা কালো রঙের বোরকা পড়ে অংকুরের সাথে বেরিয়েছিল সুরবালা । অংকুর সাদা মাটা । ওর পোশাক আশাকে তেমন পরিবর্তন আসে না । বাউন্ডুলের মতো ঢিলে ঢালা পোশাক পড়ে সবসময় । ঘরেও আর বাইরেও । তাও আবার বেরঙিন । রঙচটা সব কাপড় ওর । সুরবালার সাথে বেরোনোর সময় একটা প্যান্ট আর ঢিলে ঢালা ধুসর গেঞ্জি পড়েছিল । সুরবালা কটমট করে তাকিয়ে ছিল ওর দিকে ।

পুরো আলমারি ঘেঁটে একটাও পাঞ্জাবি মেলে নি অংকুরের । আজব তো একটা পুরুষ মানুষের সংগ্রহে আলমারিতে পাঞ্জাবি থাকবে না ? এ কেমন অদ্ভুত ঘটনা ? আলমারির এক কোণে সংগ্রাম জোয়ার্দারের সেই পাঞ্জাবি টার দেখা মিলেছে এক পর্যায়ে , যেটা বিয়ের দিন পড়ে এ বাড়িতে ফিরেছিল অংকুর । সুরবালা কয়েক মুহূর্ত পাঞ্জাবি টা হাতে চেপে রেখেছিল । অতঃপর সেটা আগের জায়গায় রেখে গটগটিয়ে বেরিয়ে শায়লার কাছে গেছে । অংকুরের বাবার শত শত পাঞ্জাবি পুঁজি করে অতি যত্নে সাজিয়ে রেখেছেন শায়লা । কতগুলো বছর ধরে তার কাপড় গুলো আগলে রেখেছেন তিনি । বছরে দুবার করে সবগুলো কাপড় বের করে কেচে দেওয়া হয় , আর‌ নয়তো নরম রোদে কাপড় গুলো শুকিয়ে নিয়ে আবার আলমারিতে সেগুলো গুছিয়ে রাখেন শায়লা । তাই নষ্ট হয় নি কাপড় গুলো । প্রায় নতুনের ন্যায় আছে সবগুলো । সুতো ফিকে নরম হয়ে গেছে , হয়তো একটু টান পড়লেই ছিঁড়ে যাবে । তবুও যত্নের দরুন চকচকে এখনো । সুরবালা আলমারি ঘেঁটে শায়লার অনুমতি নিয়ে একটা কালো পাঞ্জাবি খুঁজে এনেছে । অংকুর কে বলা মাত্রই এক কথায় সে সেই পাঞ্জাবি টা পড়েছেও । না করে নি । ছেলেকে পাঞ্জাবিতে দেখে অভ্যস্ত নন শায়লা । তার উপর আজ ছেলের এলোমেলো ঝাঁকড়া চুল গোছানো পরিপাটি করে । চুলগুলো সুন্দর করে গুছিয়ে দিয়ে অংকুরের মাথায় নিজ হাতে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিয়েছে সুরবালা । দিতে দিতে কতো কথা শুনিয়েছে । তার সাথে এরপর থেকে বাইরে বেরোতে হলে এভাবেই পরিপাটি হয়ে বেরোতে হবে ।

অংকুর তাজ্জব বনে দেখে গেছে সুরবালার কান্ড । মেয়েটা কে আজকাল চঞ্চল লাগে একটু । আসলেই বাউড়ি একটা । অংকুর একাধিক বার হেসেছে আনমনে ।
সেই যে ওভাবে সেজে গুজে বাইরে বেরোলো দু’জনে । পুরো শহর ঘুরেছে সন্ধ্যা অবধি । রিকশা ভাড়া করে পুরো শহর সুরবালা কে ঘুরিয়েছে অংকুর । শহরের রাস্তা ঘাট , উঁচু উঁচু দালানকোঠা , বাজার , সবকিছু দেখিয়েছে । খেয়েছেও । অংকুর সুরবালা কে নিয়ে বড় রেস্তোরাঁয় যেতে চেয়েছিল । সুরবালা যায় নি । সে খাবে রাস্তার পাশের ঝাল ঝাল ঝালমুড়ি । এ ব্যতীত আর কিচ্ছু খাবে না । বাইরের খাবার পোষায় না ওর । তবে ঝালমুড়ি পছন্দ । তাই খেয়েছে শুধু । অংকুর আরো কতো কি সাধলো , কিচ্ছু খেলোও না , কিনলো ও না । অংকুর আজ ভালো করেই উপলব্ধি করেছে , সংগ্রাম জোয়ার্দার এমনি এমনি বলে নি – সুরবালা বিলাসী নয় । সে সাধারণ । তবে অসাধারণ ।
বাড়ি ফিরতে কালে কিছু ব্যাগ জুটিয়ে এনেছে । শুধু ব্যাগ নয়‌, ব্যাগের ভেতর আরো অনেক কিছু । সদর দরজা খুলে দিলেন জাহানারা । তিনি চলে যাবেন এখন ।
সুরবালা উজ্জ্বল হেসে অংকুরের আগে ভেতরে ঢুকলো । শায়লা ছেলে বউ মার উপস্থিতি টের পেয়ে সোফায় বসে থেকেই মুচকি হেসে বললেন….

“ এসেছিস তোরা ?
সুরবালা দ্রুত পায়ে এগিয়ে আসলো । হাতের ব্যাগ গুলো সোফার উপর রেখে চটপট করে নিকাব সরালো মুখ থেকে । মুখ গোল করে দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেললো । অতঃপর বললো…
“ বাইরে খুব গরম পড়েছে মা । তোমাদের শহরে গরম একটু বেশিই । গাছপালা নেই কোথাও । মানুষের ভিড় প্রচুর । অক্সিজেনের অভাব ,‌শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল এতোক্ষণ । তার উপর মুখ বাঁধা , দম বেরিয়ে যাচ্ছিল পুরো । এখন একটু শান্তি মিললো…
আমাদের গ্রামই ভালো এর থেকে । চারদিক খোলামেলা । মানুষ নেই এতোটাও ।
শায়লা স্মিথ হাসেন । অংকুর ভেতরে এসে সর্বপ্রথম টেবিলের উপরের জগ থেকে গ্লাসে পানি ঢেলে খেয়ে নিলো পুরোটা । নির্দ্বিধায় আরো এক গ্লাস পানি ঢেলে এনে সুরবালার দিকে এগিয়ে দিলো । সুরবালা অতিরিক্ত ভাবলো না । তড়িতে অংকুরের হাত থেকে গ্লাসটা নিয়ে ঢকঢক করে পুরো পানি টুকু খেয়ে নিলো । দীর্ঘ দম নিলো অতঃপর । পিপাসা পেয়েছিলো খুব । অংকুর নিজেও পাশে বসলো । একটু দম নিয়ে উপরে উঠবে । সিঁড়ি ডেঙ্গানোর শক্তি নেই আপাতত ।
শায়লা লক্ষ্য করলেন ব্যাপারটা । সুরবালার প্রতি যত্ন টুকু দেখে বেশ আপ্লুত হলেন তিনি । ঠোঁটের কোণের হাসি টুকু দীর্ঘ হলো তার ।
সুরবালা গ্লাসটা সামনে রেখে দ্রুত পাশে রাখা ব্যাগের মধ্যে একটা ব্যাগ হাতে নিলো । সেটা হাতড়ে ভেতর থেকে কিছু একটা বের করে ঝট করে এগিয়ে দিলো শায়লার দিকে..

“ মা , এটা তোমার জন্য ‌!
শায়লা কপাল কুঁচকে তাকালেন । সুরবালা একটা মোড়ানো বলের মতো কাগজ এগিয়ে দিয়েছে । না বুঝে শুধালেন শায়লা….
“ কি ?
“ ছোলা বুট ভাজা । তোমার ছেলে বললো , তুমি নাকি খুব পছন্দ করো । তাই এনেছি । এই নাও !
শীতল হাসলেন শায়লা । সুরবালা তার হাতে ধরিয়ে দিয়েছে ছোলা বুটের ঠোঙা । ব্যাগে আরো কিছু একটা লক্ষ্য করে ফের জিজ্ঞাসা করলেন শায়লা…
“ আর‌ কি আছে ব্যাগে ?
সুরবালা মুচকি হাসে । ব্যাগ থেকে এবার বের করে একটা বেলি ফুলের গাজরা । এটা চুলের জন্য । রাস্তার ধারে একটা মেয়ে বিক্রি করছিলো । সেখান থেকে সুরবালা কে এটা কিনে দিয়েছে অংকুর । এই একটা গাজরা আর দশ টাকার ঝালমুড়ি ব্যতীত আর এক টাকাও খরচা করে নি মেয়েটা । গাজরাটাও কিনতো না , যদি না মেয়েটা ছোট হতো । ছোট্ট একটা মেয়ে বিক্রি করছিলো , মায়া লাগলো ভীষণ । তাই কিনেছে এটা । কিন্তু পড়ার উপায় নেই । তাই ব্যাগেই রেখেছে । ভীষণ মিষ্টি গন্ধ আসছে এটা থেকে । একেই বেলি ফুল পছন্দ সুরবালার । খুব খুব পছন্দ ।
শায়লার প্রশ্নের জবাবে সুরবালা গাজরা টা দেখিয়ে বললো….

“ এটাও তোমার ছেলে কিনে দিয়েছে । চুলে পড়ার । আমার খুব পছন্দ বেলি ফুল । দেখো , কি মিষ্টি গন্ধ আসছে না ? মন‌ জুড়িয়ে যায় একেবারে ।
“ আর‌ ব্যাগ গুলো ? ওগুলোতে কি আছে ?
সুরবালা এবার পাশের ব্যাগ গুলোর দিকে তাকায় । অতঃপর অংকুরের দিকে । তারপর বলে….
“ তোমার ছেলের পাঞ্জাবি আছে । জোর‌ করে কিনিয়েছি ! কিসব ছাতার মাথা পড়ে ঘুরে বেড়ায় । আজ থেকে পাঞ্জাবি পড়বে তোমার ছেলে ।
“ ও‌ পাঞ্জাবি পড়বে ? অংকুর , পাঞ্জাবি পড়বি তুই ?
শায়লার অবাক স্বর । অংকুর বিরক্তি প্রকাশ করলো । কপাল কুঁচকে উঠে দাঁড়ালো । সিঁড়ির দিকে এগোতে এগোতে বললো জবাব না দিয়ে…
“ আমি ঘরে গেলাম ।
বলেই চলে গেলো ও । শায়লা হেসে ফেললেন । বড্ড চাপে পড়েছে তার ছেলে । একেবারে যাঁতাকলে । ভারী জব্দ হচ্ছে সুরবালার কাছে । বলতেও পারছে না কিছু , আর না বলতে পারবে । সকালেও মুখ বুজে সুরবালার এক কথায় পাঞ্জাবি পড়ে বেরিয়েছে । কি পরিবর্তন টাই এসেছে ওর‌ মাঝে ।
হাসি চেপে সুরবালা কে বললেন শায়লা….

“ ঘরে যা , গিয়ে হাত মুখ ধুয়ে নে । কিছু খাস নি জানি । চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছে । হাত মুখ ধুয়ে ওটাকে নিয়ে নিচে আয় , আমি খিচুড়ি বসিয়েছি । গরম গরম খিচুড়ি খাবি । জাহানারা চলে গেলো বোধহয় !
দরজা টা লাগিয়ে দিয়ে ঘরে যা…
সুরবালা তাই করলো । সদর দরজা লাগিয়ে হিজাব খুলতে খুলতে উপরে উঠলো সব ব্যাগ হাতে করে ।
অংকুর এর‌ মধ্যেই কাপড় পরিবর্তন করেছে । হাত মুখ ধুয়ে পাঞ্জাবি খুলে নিজের সেই ঢিলে ঢালা পোশাক পড়েছে আবার । এসবই আরাম দায়ক ওর কাছে । ও এসবেই অভ্যস্ত । আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মাথার ব্যান্ডেজ টা খুলছে অংকুর । সুরবালা দেখেও কিচ্ছুটি বললো না । ব্যাগ রেখে, বোরখা খুলে হাত মুখ ধুতে চলে গেলো । খানিক বাদ বেরিয়ে আসলো আবার ।
অংকুর ব্যাগ থেকে নতুন পাঞ্জাবি গুলো বের করে আলমারিতে তুলে রেখেছে এর মধ্যেই । ফুলের গাজরা টা বের করে আয়নার সামনে রেখেছে । সুরবালা আয়নার সামনে দাঁড়াতেই ফুলের গাজরা টা দেখতে পেলো । অমনি মুচকি হাসলো সে । বাঁধা চুল গুলো খুলে দিলো । চিরুনি করলো চুলে । অংকুর টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে কিছু একটা করছে । ড্রয়ার খুলে কিছু একটা খুঁজছে হয়তো ।

সুরবালা নিজেই গাজরা টা চুলে আটকানোর চেষ্টা করলো । পারলো না । খুলে খুলে যাচ্ছে বারবার । শেষে বিরক্ত হলো মেয়েটা । মুখে চ সূচক বিরক্তিকর শব্দ উচ্চারণ করলো । আয়নার দিকে তাকাতেই প্রতিবিম্বে পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা অংকুর কে দেখতে পেলো । পিছু ফিরে নিজের কাজে মগ্ন অংকুর । সুরবালা তড়িতে পরিকল্পনা এঁটে ওর দিকে ফিরলো । ডাকলো গলা উঁচিয়ে….
“ এই যে বাবড়ি ওয়ালা , শুনছেন ? এদিকে আসুন তো !
অংকুর তাকালো না পিছু ফিরে । ড্রয়ার থেকে একটা ছোট্ট পেন্সিল মতো কিছু একটা বের করলো । সে এখন পাশের ঘরে যাবে নিজের কাজে । ছবি আঁকা হচ্ছে না কাল থেকে । দিনের একটা ভাগ সে ছবি আঁকার জন্য বরাদ্দ করে রাখে । সেটা সন্ধ্যার আগে অথবা শোবার আগে । এখন যাবে সে ছবি আঁকাতে । সুরবালার ডাকে নিরুদ্বেগ হয়ে সাঁড়া দিলো ভারী গলায়…

“ বলো ।
“ এদিকে আসুন ।
অংকুর শুধু ঘাড় ঘুরিয়ে পিছু ফেরে । স্বাভাবিক চাহনি ওর । স্বাভাবিক ভাবেই শুধায়…
“ কেনো ?
“ আসুন আগে !
বিব্রত হতে চায় অংকুর । তবে পারে না হতে । মেয়েটার শুচি শুভ্র চেহারা খানা দেখলে বিরক্তি‌ মিলিয়ে যায় আপনা আপনি । হাতের পেন্সিল টা নিয়েই সুরবালার সামনে এগোলো অংকুর । দাঁড়িয়ে রাশভারী গলায় বলল….
“ কি হয়েছে ?
“ এটা চুলে লাগিয়ে দিন !
গাজরা টা অংকুরের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে সুরবালা আদেশের সুরে কথাটা বলে সোজাসাপ্টা । খানিক আবদারি শোনায় কন্ঠস্বর । অংকুর কপাল গুটালো । শুধালো সন্দিহান হয়ে…

“ আমি ?
“ হুম ! আপনি ! নিন !
অংকুরের হাতে ধরিয়ে দিলো গাজরা টা । পিছু ফিরে আয়নার দিকে মুখ করে দাঁড়ালো । সেখানেই আয়নাতে চোখাচোখি হলো অংকুরের সাথে । আবার ইশারা করে বললো সুরবালা…
“ কি হলো , লাগিয়ে দিন !
অংকুর ভেবে পায় না । সুরবালার খোলা চুলের দিকে তাকালো দৃষ্টি সরিয়ে । অতঃপর হাতের গাজরা টার দিকে । ফের আয়নার দিকে সুরবালার চোখে চোখ রেখে শুধালো…
“ এটা আটকায় কিভাবে ?
সুরবালা একটখানা চিকন চুলের পিন এগিয়ে দিলো । বললো….
“ এটা দিয়ে যে করেই হোক আটকে দিন ।
অংকুর উল্টে পাল্টে আবার ভালোভাবে পরখ করলো গাজরা টা । অনেক কসরত করে সেটাকে পিন দিয়ে চুলে আটকাতে সক্ষম হলো অবশেষে ।

মিষ্টি একটা গন্ধ আসছে । খুব কাছ থেকে অনেকটা নাকে বিঁধছে গন্ধটা । অংকুর শ্বাস টানলো । ঝোঁকের বশে একটু ঝুঁকে নাক ডোবালো চুলের ভাঁজে । দুটো সুশ্রী সুগন্ধ । এক চুলের , অন্যটা বেলি ফুলের । দুটোর মিলমিশে নেশাক্ত মোহময় সুগন্ধি একটা । চোখ বুজে আসলো অংকুরের । আচমকা নিজের কর্মকাণ্ড ধ্যানে নেই ওর । পরপর বুক ভরে শ্বাস টানলো ও । শরীরের দূরত্ব আছে ওর আর সুরবালার মাঝে । সুরবালা দর্পণে তাকিয়ে অংকুরের কান্ডে স্মিথ হাসে । রাগ আসে না ওর ।
তবে স্মিথ হাসি টুকু মুছে যায় পরমুহূর্তেই । কড়া হয়ে আসে মুখশ্রী । ভ্রু যুগল কুঁচকে ফেলে একে অপরের সাথে । তড়িতে চট করে পিছু ফেরে । চমকায় অংকুর । নিজেকে সামলে দ্রুত ছিটকে পিছিয়ে আসে । সুরবালার ধারালো দৃষ্টিতে চোখ পড়তেই নিজের ভুল বোঝে , ভুল করে করা ভুল বোঝাতে দুদিকে মাথা নাড়ে তৎক্ষণাৎ । মুখ খোলার আগেই সুরবালা খড়খড়ে স্বরে বলল কোমরে এক হাত রেখে….

“ আপনি আমাকে মিথ্যে বলেছেন কেনো ?
ভিমড়ি খায় অংকুর । বলে ওঠে আকস্মিক অস্পষ্ট স্বরে…
“ হ্যাঁ ?
“ আপনি আমাকে মিথ্যে বলেছেন ? সকাল থেকে আপনাকে ধরতে চাচ্ছি , কিন্তু পারছি না । আপনি আমাকে বলেছিলেন পোষা প্রাণীতে মায়ের এলার্জি আছে , কিন্তু মায়ের তো এমন কিছুই নেই । আপনি তাহলে মিথ্যে বলেছিলেন কেনো আমায় ?
হাঁফ ছাড়ে অংকুর । কথার পরিপ্রেক্ষিতে বলে ধীরে…
“ ও , এটার কথা বলছিলে ?
“ হুম ! এটাই । এবার বলুন আপনি মিথ্যে বলেছেন কেনো আমায় ? আপনার জন্য মায়ের কথা ভেবে গলু কে সাথে করে নিয়ে আসি নি আমি !
বুকে হাত গুটিয়ে তীক্ষ্ণ স্বরে বলল সুরবালা । অংকুর ভাবেলাশহীন ভাবে বললো প্রত্যুত্তরে শক্ত গলায়….

“ কেউ একজন বলেছিল তার জিনিসের উপর অন্য কারোর নজর সহ্য হয় না ! সে জানে না , আমিও ঠিক তার মতোই । তবে ভিন্নতা আছে তার আর আমার । আমার ক্ষেত্রে আমার জিনিসের উপর অন্য কারোর আধিপত্য পছন্দ নয় আমার ! যদিও সে অন্যের উপর নিজের আধিপত্য বিস্তার করার স্বপ্ন দেখে এখনো । কিন্তু সেই অন্যজনের উপর আধিপত্য বিস্তার করা সম্ভব নয় । তাই সেই অন্যজন কে তার জীবনে মেনে নিয়েছি । কিন্তু একটা পোষা প্রাণী কে মানতে পারি নি । ওকে ঈর্ষা করেছি । ও তোমার কাছে থাকুক চাই নি । তাই বাহানা দিয়েছি । এখন ধরা পড়ে গেছি । ভেবো না আমি মিথ্যাবাদী ! জেনে শুনে বলা প্রথম মিথ্যেটা ছিলো এটা ।
সুরবালা থমকালো । তাজ্জব বনলো সে । অংকুর খুব সোজাসুজি ভাবেই চোখে চোখ রেখে গড়গড় করে কথা গুলো বলে ঘর থেকে বেরোনোর জন্য পিছু ফিরতেই বললো সুরবালা…
“ মিথ্যে বললে শাস্তি পেতে হয় , জানেন না ?
অংকুর একটু থেমে ঘাড় বাঁকিয়ে আড়চোখে তাকায় । বলে সুরবালা…
“ শাস্তি টা তোলা রইলো , পরে দিয়ে দেবো ! এবার বাড়িতে গেলে গলুকে নিয়ে আসবো, মনে থাকে যেনো ।
অংকুর আর থামলো না । গটগটিয়ে বেরিয়ে গেলো ঘর থেকে ।

আজ সকাল থেকেই জমিদার গ্রাম হই হট্টগোলে ভরে উঠেছে । আজ বিয়ে । বৃষ্টির দরুন স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশ । কাঁদা জমেছে এখানে ওখানে । বিয়ের অন্যসব রেওয়াজ রিতি পালন করা হয় নি । তবে বিয়েটা হবে । পুরো রাজ্যের নিমন্ত্রণ । কারোর চোখে ঘুম নেই কাল থেকেই । সকাল টা হওয়ার অপেক্ষায় ছিলো সকলে । সকাল হতে না হতেই একেক প্রান্ত থেকে ধেয়ে এসেছে সকলে । তাদের আজ ভরপেট খাওন হবে জমিদার বাড়িতে । গত সন্ধ্যা থেকেই রান্না বান্নার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে । বিয়ের উদ্দেশ্যে আনা সব গরু ছাগল জবাই হয়েছে । রান্না হচ্ছে একাধিক পদ । খাবারের আয়োজন শুরু হয়েছে সেই সকাল থেকেই । সাত গ্রাম মিলে দশ হাজারের বেশি মানুষ ।

সবার দায়িত্ব আজ জমিদার সংগ্রাম জোয়ার্দারের কাঁধে । জমিদার বাড়ির পাশের আম বাগানে সামিয়ানা ঘিরে প্যান্ডেল করা হয়েছে । সকাল থেকেই উপচে পড়া মানুষের ভিড় । পরিবেশক’রা হিমসিম খাচ্ছে সামাল দিতে ।
জমিদার বাড়ির চিত্র আলাদা । খুব সুন্দর করে সাজানো হলেও মানুষের আনাগোনা নেই জমিদার বাড়ির গন্ডিতে । অনুমতি ব্যতীত বাইরের‌ লোক জমিদার বাড়ির ভেতরে প্রবেশ নিষিদ্ধ । প্রধান ফটকের কাছে পাহারা বাড়ানো হয়েছে । যদিও সবাই গ্রামের লোক । তবুও সর্ষের মধ্যেই ভুত দেখতে চায় না সংগ্রাম । ঘরের শত্রু বিভীষণ তো‌ আছেই , বাইরের টা না হয়‌ পাহারা দার’রা সামলে নেবে । সন্ধার পর‌ পুনরায় সংগ্রাম জোয়ার্দার আর তার বেগম ডালিয়ার বিয়ে পড়ানো হবে । এবার সবার‌ সামনে সংগ্রাম জোয়ার্দারের নামে সাক্ষরিত হবে তার শ্যামা সুন্দরী । অন্দরের পরিস্থিতি স্বাভাবিক । বরং রোজকারের তুলনায় আজ একটু বেশিই শান্ত ।

সাজানো গোছানো চকচকে অন্দর মহল পুরো ফাঁকা । কাজের লোক সব বাইরে আজ । রান্না বান্না নেই অন্দরে । সালেহা সকাল থেকে এক পা বাইরে বের করেন নি । লতিফার কথা তো বাদ । তিনি নিশ্চুপে কূট বুদ্ধী আটছেন হয়তো । একেক বার করে সালেহার ঘরে হামলা দিচ্ছেন কানে বিষ ঢালতে । বাইরের উত্তাল পরিস্থিতি অনেকটা বাড়িয়ে ব্যাঙ্গ করে সালেহা কে শোনাচ্ছেন তিনি । ঐ সামান্য মেয়েটার জন্য এতো এতো আয়োজন , ভোজন বিলাস সহ্য হচ্ছে না সালেহার কাছে । বারান্দায় দাঁড়িয়ে বেশ কয়েকবার বাইরে টা দেখেছেন তিনি । ফুঁসছেন ভেতর ভেতর । সকাল থেকে কিচ্ছুটি মুখে তোলেন নি । একজন গৃহকর্মী এসে খাবার রেখে গেছে , সেটা এখনো সেই অবস্থাতেই পড়ে আছে । লতিফ জোয়ার্দার ও ব্যাস্ত বাইরে টা পরিদর্শন করতে । সালেহার খেয়াল আর রাখে কে ?
এখন দুপুর গড়াচ্ছে । শ্যামা নামাজ পড়ে নিয়েছে সংগ্রাম গোসলে ঢোকার পর । ও গোসল সেরে বেরোতে বেরোতে নামাজ হয়ে গেছে শ্যামার । খাটের উপর বিয়ের সমস্ত সাজ পোশাক বিছিয়ে রাখা । গহনা কাড়ি কাড়ি । লাল টকটকে বেনারসী । ওরনা ভারী কাজের । সব নিজে নকশা করে আলাদা করে দক্ষ কারিগর দিয়ে তৈরি করিয়ে এনেছে সংগ্রাম । শাড়ির প্রতিটি সুতার রূপরেখা তার নিজের তৈরি । শুধু বুনন হয়েছে তাঁতির হাতে । সেই বিয়ে ঠিক হওয়ার দিনই শাড়ি বানাতে দিয়েছিল সংগ্রাম ।

সেই সুদূর শহরে গিয়ে শাড়ির রুপরেখা বিন্যাস করে অনেক কর্জা দিয়ে আজ এই শাড়িটা হাতে পেয়েছে । শ্যামার গহনা আছে অনেক । জমিদারি ঐতিহ্যের পারিবারিক গহনা গুলো এখনও সালেহার কব্জায় । সেগুলোর ধার ধারে নি সংগ্রাম । নতুন করে ফের গহনা গড়ানো হয়েছে তার বেগমের জন্য ।
শ্যামা নামাজ পড়ে জায়নামাজ গুছিয়ে রাখলো । সংগ্রাম আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মাথা মুছতে মুছতে দর্পণেই পরখ করলো শ্যামা কে । কেমন বিষন্ন ঠেকলো তার বেগমের ভাবগতিক । সংগ্রামের খালি গা । শরীরে পানির বিন্দু বিন্দু কণা চিকচিক করছে । একখানা সাদা লুঙ্গি পড়নে । চুল থেকে টুপটাপ পানি ঝড়ছে এখনো । ভেজা চুল কপালে লেপ্টে । মাথা মুছতে মুছতে থমকালো সংগ্রাম । পিছু ফিরে ডাকলো…
“ ডালিয়া , এদিকে এসো ।

শ্যামা নির্দ্বিধায় এগোয় । সংগ্রাম কিছু বলার আগেই ওর হাত থেকে ভেজা গামছা টা নিয়ে নেয় । নিজের পায়ের বৃদ্ধা আঙ্গুলে ভর করে উঁচু হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে সংগ্রাম বরাবর । এটা তার নিত্যদিনের কাজ । সংগ্রামের ভেজা চুল মুছিয়ে দেওয়া , ফতুয়া / পাঞ্জাবির বোতাম লাগিয়ে দেওয়া , এসবে অভ্যস্ত শ্যামা । সংগ্রাম কে বলতে হলো না কিছুই । শ্যামা উঁচু হয়ে সংগ্রামের ভেজা চুল মুছিয়ে দিতে লাগলো । ওর মুখ ঢেকে গেছে গামছার আড়ালে ।
সেভাবে আড়ালেই ঠোঁট টিপে হাসলো সংগ্রাম । নিজেও নিজের পায়ের বৃদ্ধা আঙ্গুলে ভর করে উঁচু হয়ে দাঁড়ালো শ্যামা কে টপকে ।

সংগ্রাম উঁচু হতেই কাজে বাঁধা পড়লো শ্যামার । সংগ্রাম ওর থেকে অনেকটা লম্বা । সংগ্রামের মাথা পুরোপুরি স্পর্শ করার জন্য উঁচু হতে হয় শ্যামা কে । চোখে চোখ রেখে কথা বলার জন্য ঘাড় উঁচিয়ে তাকাতে হয় ।
এখন সংগ্রাম আরো অনেক টা উঁচিয়ে গেলো । বিভ্রান্ত হলো শ্যামা । স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়িয়ে চোখ নিচু করে সংগ্রামের পায়ের পানে তাকালো । অতঃপর ফের চোখ তুলে গামছা সরিয়ে সংগ্রামের বিদ্রুপের হাসি দেখে বললো….

“ কি করছেন ছোট জমিদার সাহেব ?
সংগ্রাম ঘাড় ঝাঁকায় । স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়ায় । বলে দায়সারা…
“ কিছুই না ! তুমি তোমার কাজ করো !
“ নিচু হোন আগে !
“ সংগ্রাম জোয়ার্দার নিচু হয়‌ না কারোর সামনে । তুমি উপরে ওঠো ! বেগম তো , উঠতেই পারো , বাঁধা দেবো না ।
“ আমি উঠবো কি করে ?
“ তোমার ব্যাপার ! এতো খাটো হয়েছো কেনো তুমি ।
“ আমার স্থান যেখানে , আমি সেই অবধিই আছি । আর উপরে ওঠার সাধ্য নেই আমার । আপনার আছে , আপনি নিচু হোন !
“ বাহ্ , কথা শিখেছেন বেশ…
“ হুম , হয়েছে ,, ভালো লাগছে না এখন এসব । আহ্লাদ করবেন না । নিচু হয়ে আসুন ।
সংগ্রাম সায় দিলো । পেছনে হাত গুটিয়ে ঝুঁকে নিচু হয়ে আসলো । শ্যামা সযত্নে মাথা মুছিয়ে দিলো ওর । এবার শুধালো সংগ্রাম…

“ মন খারাপ কেনো বেগম ?
“ জানি না , কিছুই ভালো লাগছে না !
অসার কন্ঠ শ্যামার । মুখখানা মলিন ! সংগ্রাম দুরত্ব ঘুচে শুধোয়…
“ যখন কিছুই ভালো লাগে না , তখন কিছু একটা করতে ইচ্ছে হয় । কি ইচ্ছে হচ্ছে বলো , সেটাই করবে যেটা করলে তোমার মন ভালো হবে !
“ মন‌ খারাপ থাকলে যখন কিছুই ভালো লাগে না , তখন ঘাটে যাই আমি । ঘাটে যাবো , অনেক দিন যাই না ।
“ এখন ?
উপর নিচ মাথা নাড়ে শ্যামা । সংগ্রাম বলে….

“ এখন তো বাইরে অনেক মানুষ বেগম । পরে গেলে হয় না ?
শ্যামা উত্তর করলো না । তা দেখে সংগ্রাম আবার বললো…
“ তোমার ইচ্ছে কে ত্যাগ করতে পারবো । কিন্তু তোমাকে অন্যের দৃষ্টির সম্মুখে ছাড়তে পারবো না । বাইরে অনেক মানুষ আছে , তাদের সরানো মুশকিল । এখন বাইরে বেরনো ঠিক হবে না । আর তৈরি ও তো হতে হবে তোমায় ‌। ইচ্ছে টা না হয় তোলা থাক পরের জন্য । পরে পূরন করে দেওয়ার দায়িত্ব আমার ।
শ্যামা কথা এগোয় না । মনটা কেমন খচখচ করছে সকাল থেকে । উদাস লাগছে । ও বললো পরিস্থিতি বুঝে প্রসঙ্গ পাল্টে…

“ বালা আসলো না যে ?
“ ও আসতে চায় নি , তাই আসে নি !
“ আমার আম্মা আসবে না ?
“ আসবে বিকেলে । আমি লোক পাঠিয়ে দেবো তাকে আনতে..
“ আর আব্বা ?
“ তিনি সকালে আড়ত থেকে জেলে হিসেবে এসেছিলেন একবার । তোমার বাবা হিসেবে আসবেন কি না জানা নেই ।
“ ও !
“ এখন চলো ।
“ কোথায় ?
“ আমার আম্মার কাছে !
এটাই তো তোমার বিষন্নতার কারন ?
শ্যামা ভাবে । এবার সেও তার বিষন্নতার কারন খুজে পেলো । নিজের মন উতলার কারন নিজে ঠাহর করতে পারে নি , অথচ সংগ্রাম পেরেছে ।
একটা ফতুয়া পড়ে শ্যামা কে নিয়ে ঘরে হতে বেরোলো সংগ্রাম । সালেহার ঘরের দরজা খোলাই থাকে । তবুও কড়া ঘাত করে ঘরে ঢুকলো সংগ্রাম । সালেহা ছেলের উপস্থিতি টের পেয়েছেন । জানালার কাছে দাঁড়িয়ে ছিলেন এতক্ষণ । এখন আরো মুখ ফিরিয়ে নিলেন । ঐ মেয়ে টাও নিশ্চয়ই এসেছে সংগ্রামের সাথে । এখন ওর হয়ে সাফাই গাইবে তার ছেলে ।

শ্যামার প্রতি বরাবরই তপ্ত মেজাজি সালেহা । অদ্ভুত ক্ষিপ্ততা আসে এই মেয়েটার প্রতি । তীব্র রাগ জন্মায় । এখনো জন্মালো । দাঁত চেপে চুপটি করে রইলেন তিনি ।
সকালে রেখে যাওয়া ঢেকে রাখা খাবার দেখতে পেলো শ্যামা আর সংগ্রাম । সংগ্রাম শ্যামার হাত ছাড়লো । পেছনে হাত গুটিয়ে শিরদাঁড়া সোজা করে শীতল কন্ঠে ডাকলো…

“ আম্মা !
সালেহা মুখ ঝামটান । সংগ্রাম শ্যামা কে ইশারা দেয় কিছু একটা । শ্যামা ইশারা অনুযায়ী ঘর থেকে বেরিয়ে আসে । নিচে নামে সোজা ।
সংগ্রাম এগিয়ে শুধায়…
“ সকাল থেকে খাওনি কিছু ?
সালেহার উত্তর নেই । উত্তর, প্রতিক্রিয়া না পেয়ে বিব্রত হয় সংগ্রাম । তবে নিজেকে সংবরণ করে । এগিয়ে গিয়ে সালেহা কে টেনে ফেরায় নিজের দিকে । মায়ের হাত ধরে হুতাশ মোলায়েম কন্ঠে বলে…
“ কি হয়েছে আম্মা ? আর কতদিন এসব চলবে ? অনেক তো হলো , আর কতো ? আমি এসবে ক্লান্ত আম্মা ! কি চাও তুমি ?
“ আমার চাওয়া পাওয়ার হিসেব করলে আজ এই পরিস্থিতিতে আমার সামনে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো না তোকে !
“ যথেষ্ট হয়েছে আম্মা , আর কতো বোঝাবো তোমায় ? বুঝতে চাও না কেনো তুমি ?
“ বুঝতে চাই না আমি , তো বোঝাতে আসিস কেনো ? বারবার এক কথা নিয়ে ঘ্যান ঘ্যান করিস কেনো কানের কাছে ?
“ আম্মা , আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নিও না । আমাকে চেনো তুমি ! একবার বিমুখ হয়ে পড়লে পিছু ফিরেও তাকবো না আর !

সংগ্রামের কঠিন স্বর । সালেহা বাঁকা হাসেন তাচ্ছিল্য করে । ব্যাঙ্গ করে একই তপ্ত স্বরে বলেন…
“ আর কতো বিমুখ হবি ! যথেষ্ট হয় নি তোর বিমুখতা ?
“ তোমাকে আমার বেগম কে মানতে কখনো বাধ্য করি নি । করবোও না । তবে তোমার এই অস্বাভাবিকতা মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে আম্মা । নিজের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসো । অন্তত আমার জন্য ! আমি তো তোমার ছেলে । আমার সুখ চাও , অথচ আমার সুখকে সহ্য করতে পারছো না ।
“ ঐ মেয়েটা তোর সুখ ?
শক্ত চোয়ালে তাচ্ছিল্য প্রশ্ন । সংগ্রামের স্পষ্ট জবাব…

“ ও আমার জীবন ।
“ হাহহ্ ,, জীবন !
“ হ্যাঁ , জীবন । প্রাণ ও আমার !
ওকে কোনো মূল্যেই অপদস্থ হতে দেবো না আমি । বারবার বোঝানোর পরও পরিবর্তন নেই তোমার ।
যদি এবার ও এমনটা চলতে থাকে , তাহলে তুমি এবার পুরোপুরি আমাকে হারাবে আম্মা !
সালেহা আঁতকে ওঠেন । কপালে ভাঁজ ফেলে তৎক্ষণাৎ ভড়কানো গলায় বলে ওঠেন…
“ সংগ্রাম !
“ হ্যাঁ আম্মা ।
আমি চলে যাবো তোমাদের ছেড়ে । যেখানে আমার বেগমের মূল্য নেই , সেখানে তাকে মূল্যহীন করে রাখতে চাই না আমি । ওর যথেষ্ট মূল্য আছে আমার জীবনে । ও আমার কাছেই সম্পুর্ন গুরুত্ব পাবে , তবুও গুরুত্বহীন থাকবে না অন্য কারোর কাছে । তোমার এসব অযৌক্তিক কর্মকান্ডের কোনো যথার্থতা নেই ‌। বেকার বেকার জেদ চেপে বসে আছো । আমার জেদ বাড়িও না আম্মা । সব ছেড়ে চলে যাবো আমি । আমার বেগম কে নিয়ে দূরে চলে যাবো । আর ফিরবো না , আর পাবে না আমায় ।
সালেহা ঢোক গেলেন ।

“ ভয় দেখাচ্ছিস আমায় ?
হুমকি দিচ্ছিস ?
“ যা ভাববে তাই ! তবে ফাও কথা নয় । যেখানে আমি একটা সুখের সংসার চাই সবাইকে নিয়ে , সেখানে তুমি বিপন্থী ।
“ তাহলে বোঝাতে চাস – আমার জন্য সুখ বিলম্ব হচ্ছে তোর জীবনে ?
গলা কাঁপে সালেহার । চোখ ভরে আসে । সংগ্রাম নরম হয় না একটুও ‌। মুখ ফিরিয়ে নিরেট কন্ঠে বলে…
“ হচ্ছে ।
যদি আজকের পরও এমনটাই চলে , তাহলে আমার সুখের ঠিকানা খুঁজে নেবো আমি ‌। আমার বেগম কে সহ্য করতে হবে না তোমায় । ওকে নিয়ে দূরে চলে যাবো আমি । জমিদারি চাই না আমার , আমার চাই আমার বেগম কে । ও হলেই চলবে । তুমি আর তোমার জেদ , দুটোই থেকো আমাকে ছাড়া । জেদ ধরে বসে থেকো তুমি ‌। আমি শহরে চলে যাবো , যোগাযোগ থাকবে না কারোর সাথে ।

“ সংগ্রাম , আমাকে ভয় দেখাচ্ছিস ।
কোথায় যাবি তুই ?
“ বললাম তো চলে যাবো ।
দরজার শব্দে দু’জনই চকিতে তাকায় দরজার দিকে । শ্যামা এসেছে ‌। দুই জোড়া দৃষ্টি নিজের দিকে দেখে জোর পূর্বক মুচকি হাসলো শ্যামা । হাতে খাবারের প্লেট ।
সে এগিয়ে উৎসুক হয়ে বললো…
“ খিদে পেয়েছে আম্মা ? খাবার এনেছি , খেয়ে নিন ।
সংগ্রাম স্বাভাবিক হলো । বললো…
“ খেয়ে নাও আম্মা !
সালেহা চোখ মুছলেন ঝট করে । টেবিলের উপর খাবারের প্লেট রাখলো শ্যামা । আকস্মিক দীর্ঘ শ্বাস ফেললো । বললো আপন মনে….

শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৪৭

“ জানেন আম্মা ? আমাকে না আমার আম্মার মতো কেউ কোনো দিন ভালোবাসে নি । আমার জীবনে আম্মা ব্যাতীত অন্য কারোর নিঃস্বার্থ ভালোবাসা পাই নি আগে । এ বাড়িতে এসে পেয়েছি । কিছু ভালোবাসার মানুষ পেয়েছি এখানে এসে । কিন্তু দেখুন , যে আম্মার ভালোবাসায় এতো দিন বাঁচলাম , এ বাড়িতে এসে সেই আম্মার ভালোবাসা থেকেই বঞ্চিত হলাম । হারালাম মায়ের ভালোবাসা । মায়ের ভালোবাসার তুলনা কারোর সাথেই হয় না আম্মা । এতো এতো স্নেহ পেয়েও সেই ভালোবাসা টা খুব মনে পড়ে আমার । খুব আফসোস হয় । অবশ্য,একটা পেলে একটা হারাতে হয় ‌। তাই বোধহয় মায়ের ভালোবাসা টা হারালাম আমি । তাই না আম্মা ?

শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৪৯