Home শ্যামা সুন্দরী শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৪৯

শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৪৯

শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৪৯
সুরভী আক্তার

সালেহা থমকান । ঢোক গেলেন শুল্ক ।
সংগ্রামের কথার চোটে চোখের কোটরে পানি জমেছিল । শ্যামার কথায় চোখ ছাপিয়ে গাল গড়িয়ে পড়ে সেই পানি । সালেহার নিষ্প্রভ চাহনি দেখে শ্যামা মুচকি হাসলো । খাবারের প্লেট হাতে তুললো আবার । সালেহার সম্মুখে অগ্রসর হলো সংগ্রাম কে পাশ কাটিয়ে । সম্মুখ বরাবর দাঁড়িয়ে চোখে চোখ রেখে শীতল কন্ঠে বলল…
“ খাবারের উপর রাগ করতে নেই আম্মা । এতে খাদ্য দানা অভিশাপ দেয় ‌। না খেলে নিজের ক্ষতি । জেনে শুনে নিজের ক্ষতি করবেন না নিশ্চয়ই ? খেয়ে নিন ।

“ খেয়ে নাও আম্মা । সংগ্রাম জোয়ার্দারের বিয়ের ভোজ পুরো রাজ্য উপভোগ করছে । আশির্বাদ দিচ্ছে সকলে সংগ্রাম জোয়ার্দার আর তার বেগম কে । তুমি তো মা , না খেলেও তোমার দোয়া কাজে আসবে । সবসময় তোমার দোয়া সাথে আছে জানি । এভাবেই দোয়া করো সারাজীবন , যেন তোমার বউ মাকে নিয়ে সুখে থাকতে পারি । ভুলেও অভিশাপ দিও না , মায়ের অভিশাপ কিন্তু ফলে যায় । এটা ভুলে যেও না । আমাকে হারিও না আম্মা ।
কথা শেষ করেই গটগটিয়ে কয়েক পা এগোলো সংগ্রাম । একটু থেমে ঘাড় বাঁকিয়ে শ্যামা কে ডাকলো…
“ ঘরে এসো বেগম !
আর‌ এক মুহুর্ত অপেক্ষা করলো না । দ্রুত বেরিয়ে গেলো ঘর থেকে । সালেহা চোখ মুছলেন ও বেরোতেই । রগরগে দৃষ্টিপাত করলেন শ্যামার দিকে । শ্যামার শীতল চাহনি দেখেও মায়া জাগলো না । হয়তোবা জাগলো , কিন্তু প্রকাশ করলো না । খড়খড়ে স্বরে ঝাঁজিয়ে উঠলো শ্যামার উপর…

“ এভাবে সংয়ের মতো দাঁড়িয়ে আছিস কেনো আমার সামনে ? চলে যা আমার ঘর থেকে , বের হ । তোকে দেখলে গা জ্বলে আমার । যা এখান থেকে…
শ্যামা হেসে ফেলে তপ্ত ঝাড়িতে । হীম কন্ঠে বলে…
“ তাচ্ছিল্য পাওয়ায় অভ্যস্ত আমি । অভ্যাস আছে কটাক্ষ পেয়ে পেয়ে । যদি আমার সাধ্য থাকতো তাহলে আর কক্ষনো আপনাকে জ্বালাতাম না । চোখের সামনে আসতাম না আপনার । কিন্তু আমি না খুব লোভি আম্মা , ঐযে প্রথম দিন আমাকে লোভি বলেছিলেন মনে আছে ? আসলেই আমি লোভি । এখানে একটু ভালোবাসা পেয়েছি কি পাইনি ‌। গেড়ে গেছি এখানে ! কাঙালি আমি , আমাকে মাফ করবেন আম্মা ।
কম্পিত স্বরে কথা শেষ করলো শ্যামা । খাবারের প্লেট টা সালেহার সম্মুখের চেয়ারটায় রাখলো । অতঃপর বেরিয়ে আসার উদ্দেশ্য পা বাড়াতেই সালেহা তপ্ত স্বরে ডাকলেন…

“ এই মেয়ে …
চমকে থামলো শ্যামা । ঝট করে চাইলো । বললো অস্ফুটে…
“ হ্যাঁ আম্মা !
সালেহা কিছু বললেন না । দপাদপ হেঁটে আলমারির দিকে এগোলেন । ঠাস করে আলমারির দরজা খুলে দুই হাত ঢুকিয়ে কিছু একটা বের করলেন আলমারি থেকে । গহনার বাক্স । পুরনো কালের একটা বাক্স । সালেহা যেভাবে দপাদপ হেঁটে গেছিলেন , সেভাবেই শ্যামার সামনে ফিরে আসলেন দপাদপ । মাত্রাতিরিক্ত রুক্ষ স্বরে বললেন….

“ এই নে । গেড়ে যখন গেছিস , তখন নাটক করছিস কেনো ? নিয়ে যা এগুলো । এগুলোই তো চাই তোর ? নিয়ে যা । আমার ছেলেটাকে তো ফাঁসিয়েছিস । খারাপ বানিয়েছিস আমাকে ওর কাছে । এগুলো নিয়ে যা , গিয়ে দেখা ওকে । আমি খারাপ নই । জমিদারি ঐতিহ্যের গয়না নিয়ে চলে আমার সম্মুখ থেকে । তোর মুখ দেখতে চাই না আমি ।
শ্যামা কিছু বলতে পারলো না । গহনার বাক্স টা শ্যামার হাতে ধরিয়ে দিলেন সালেহা । বেশ ভারি । আচমকা বাক্সের ভার ধরতে না পেরে খানিক হেলে পড়লো শ্যামা । সালেহা ছাড়লেন না । শ্যামার হাত ধরে টেনে হিড়হিড় করে দরজার বাইরে এক প্রকার ছুড়ে মারলেন শ্যামা কে ।
খটাস করে দরজা লাগিয়ে দিলেন মুখের উপর । শ্যামা মূক বনলো বধিরের ন্যায় । খানিক দাঁড়িয়ে থেকে বাক্স টার দিকে তাকালো । অতঃপর ধীরে পা বাড়ালো নিজের ঘরের দিকে । মাঝপথে শবনমের দেখা । আতিয়া বেগম আর শবনম হন্নে হয়ে খুঁজছে শ্যামা কে । ঘরে গিয়ে পায় নি ওকে । সংগ্রাম বললো সে মায়ের ঘরে । তাই এদিকটায় এগিয়েছিল । ফুলিও চুপচাপ গুটিয়ে আছে ওদের সাথে । নিজেকে কেমন হীন লাগছে এভাবে অন্যের বাড়িতে থাকতে ।

শ্যামা কে দেখে শবনম চঞ্চল হয়ে উঠল….
“ আরে শ্যামা , কখন থেকে খুঁজছি তোমায় ‌। তৈরি হবে না । চলো !
আতিয়া বেগমের নজর সবার আগে পড়েছে গয়নার বাক্সের দিকে । তিনি সচকিতে অবিশ্বাস্য কন্ঠে প্রশ্ন করলেন…
“ নাত বৌ , গয়নার বাক্স কেডায় দিলো তোরে ?
“ আম্মা ।
শ্যামার বিমূর্ত জবাব । আতিয়া বেগম উজ্জ্বল চোখে তাকান ।
“ বউমায় দিছে ? পোলার বউরে জমিদারি গয়না দিলো হেয় ? বাহ্ বাহ্, বউমার সুবুদ্ধি হইলো তাইলে ? চল নাত বৌ , তোরে সাজাই এহন । সব গয়না পড়ামু আইজ তোরে । একবারে রাজ রাণীর নাকান সাজামু । আমার পাগলা দাদু ভাই তোরে দেইখা আরো বেশি পাগল হইয়া যাইবো আইজ দেখিস । চল চল…
শ্যামা কে ঘরে নিয়ে আসা হলো । সংগ্রাম ঘরেই ছিলো । আতিয়া বেগম ওকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে ঠেলে ঠুলে ঘর থেকে বের করে দিয়েছেন । সংগ্রাম বাইরে গেছে । আগামী সন্ধ্যা অবধি শ্যামার মুখ আর দেখতে পারবে না সংগ্রাম । বিয়ে পড়ানো হবে , তার পর চেহারা দেখবে একে অপরের । এর আগে আর নয় । শ্যামা কে সাজানোর পর ও দেখতে পারবে না আর ।

শবনম অতি যত্নে শ্যামা কে শাড়ি পড়ালো । নতুন সব গয়না তুলে রাখা হলো । সেই পুরনো ঐতিহ্যের গয়না গুলোই গা ভর্তি করে পড়ানো হলো শ্যামা কে । শ্যামা বিরক্ত হলো গহনার ভারে । গা ম্যাজ ম্যাজ করছে ওর । আতিয়া বেগম এই নিয়ে ধমকেছেন বেশ কবার । ধমক খেয়ে আর কিচ্ছুটি বলার সাহস পায় নি শ্যামা । চুপচাপ বসে আছে ।
সন্ধ্যার পর পুনরায় বিয়ে পড়ানো হবে । এখনো হাতে ঢের সময় আছে । শ্যামা কে সাজাতে সাজাতে আসর গড়িয়েছে । নিজ হাতে শ্যামা কে সাজিয়েছে শবনম । ফুলি আর আতিয়া বেগম বসে বসে দেখছেন । সাজানো শেষ হলে শ্যামা কে নিজের দিকে ফেরালেন আতিয়া বেগম । চোখ বড় করে তাকালেন তিনি ।

লাল টকটকে বেনারসী শাড়ি , কপাল অবধি ভারী কাজের ঘোমটা । ডাগর চোখে মোটা কাজল টানা , ঠোটে রক্তিম ঠোঁট রঞ্জন । গা ভর্তি গহনা , শ্যামার শরীরের ভারের চেয়ে গহনার ভার যেনো একটু বেশি । সব মিলিয়ে এই সাজগোজ । এতেই এতক্ষণ । আতিয়া বেগম বিমূঢ় হয়ে গেলেন শ্যামা কে দেখে । মেয়েটা কে অত্যাধিক সুন্দর লাগছে । একটা কালো বনাম শ্যামলা চেহারার মেয়ে যে এতোটা আকৃষ্টময়ী হতে পারে , তা শ্যামা কে না দেখে বোঝা দায় ! কালো মানেই কুৎসিত, বিদঘুটে । সকলের পরিত্যার্য । এটা শোনা অবধি সবাই নাক সিঁটকায়,মুখ কুঁচকায় । কিন্তু শ্যামার মতো কালো কে দেখলে নাক সিঁটকাবে কার সাধ্যি ? শ্যামার এই কালোর মাঝেই রয়েছে এক উজ্জ্বল দিপ্তী । যা দেখা মাত্রই সবার নজর কাড়তে সক্ষম । যারা না দেখে তাচ্ছিল্য করলো , পরবর্তীতে এক ঝলক দেখেই আফসোস করলো সকলে । হুতাশ হলো নিজের মাঝে ।
সংগ্রাম কি এমনি এমনি শ্যামার মাঝে তলিয়ে গেছে নাকি ? আতিয়া বেগম শ্যামা কে প্রথম দিন দেখেই থমকে গেছিলেন । আজ থমকালেন আবার । মতিভ্রম হলো তার । তিনি দ্রুত পলক ঝাপটে শ্যামার হাত টেনে কনিষ্ঠা আঙুলে কামর বসালেন । থুতু ফেললেন অতঃপর । নিজের নজর নিজেই কাটালেন তিনি । মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে স্নিগ্ধ কন্ঠে বললেন….

“ তোরে মেলা সুন্দর লাগতাছে নাত বৌ । ভারী সুন্দর একেবারে । এমনি এমনি কইলাম না দাদু পাগল হইবো । মশগুল হইয়া যাইবো আইজ হেয় তোর‌ রুপ দেইখা । নিজেরে সামলাইয়া রাখিস…
শ্যামা লাজুক হাসে । চোখ নামিয়ে নেয় ।
পড়ন্ত বিকেল । বাহিরে মানুষের আনাগোনা কমার বদল বেড়েই চলেছে যেনো । সংগ্রাম বাগানের পাশে নিজের জিপে ডিকির উপর আধশোয়া হয়ে আছে । পাশে রহিম করিম ।
একে একে গ্রামের মানুষ জন আসছে আর অভিবাদন দেখিয়ে সালাম দিচ্ছে সংগ্রাম কে । অনেকে শ্যামা কে দেখার বাসনা প্রকাশ করলো সাহস করে । সংগ্রামের শক্ত চোয়াল দেখে বাসনা চুপসে বিদায় নিতে সময় লাগে নি তাদের । মহিলা রাও আজ এক নিয়মের কাতারে পড়েছে । আজ আর কেউ দর্শন করতে পারবে না সংগ্রাম জোয়ার্দারের বেগম কে ।
রহিম করিম বেশ ভাবসাব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সংগ্রামের পাশে । নতুন পোশাক পড়েছে ওরা । সংগ্রামের ভাবসাবে পরিবর্তন না দেখে গলা ঝেড়ে বললো রহিম…

“ জমিদার সাহেব , আপনে তৈরি হইবেন না ? সবাই আইতাছে আর খালি চৌখে জামাইরে দেইখা যাইতাছে । আপনের রাজ পোশাকের সাথে দেখবো না কেউ আপনেরে ?
সংগ্রামের স্বাভাবিক স্বর…
“ না , দেখবে না ।
“ ক্যান ?
“ ঐ পাঠা , তোর তো সাহস কম না । আমাগো জমিদারের কাছে কৈফিয়ত চাইস তুই ? চুপ কর ….
হেয় সাজবো কি সাজবো না হেইডা তার ব্যাপার । তোরে মাতব্বরি কইরা জিগাইতে কইছে কেউ ? তুই সাইজা গুইজা আইছোস তুই থাক , নাক গলাইতাছিস ক্যান হের ব্যাপারে ?
বরাবরের ন্যায় করিমের ধমকে কটমটিয়ে তাকালো রহিম ।

“ দেখ , সবসময় এমনে ধমকাইবি না আমারে । আমি কিন্তু আম্মারে কইয়া দিমু সব ।
“ কি কইবি তুই ? আমিও কমু । হের পোলার নজর ভালা না । চরিত্র খারাপ হইয়া যাইতাছে দিনে দিনে । ছোডু মানুষ ছোডু থাক । কইয়া দিমু আমি আম্মারে , তুই যে আক্কাস কাকার মাইয়া জরিনারে দেখার লাইগা এইহানে ছুকভুক কইরা খাঁড়ায় আছোস আর চাইয়া চাইয়া দেখতাছোস , এইটাও কইয়া দিমু । কমু ?
রহিম নুইয়ে যায় । মুখ গোল করে তাকায় । অসহায় হয়ে আসে চাহনি । করিম ওর থেকে এক বছরের বড় । পিঠাপিঠি ওরা । ওদের মাঝে পার্থক্য নেই বেশি । বড় ছোট হওয়ার তফাৎ নেই । একে অপরকে ধমকায় ওরা । তবে করিম শক্ত । ও একটু বেশি নিরেট । রহিম ওর তুলনায় ভোলাভালা ।
ওদের বাড়ি ছেড়ে পাশের চারটে বাড়ি বাদ আক্কাসের বাড়ি । আক্কাসের ছোট মেয়েটা ওকে দেখলে হাসে মিটিমিটি । রহিম অনেক বার লক্ষ্য করেছে এটা । এখন ঐ জরিনার সাথে তাল মিলিয়ে রহিম ও ভ্যাট ভ্যাট করে হাসে ওকে দেখলেই । ওকে দেখলে টানটান হয়ে যায় রহিম । হাঁটুর বয়সী একটা মেয়ে জরিনা । তবুও হাসি দেখলে বুক ছলকে ওঠে রহিমের ।

করিম এসব লক্ষ্য করেছে । দাওয়াত খেতে আক্কাসের পুরো পরিবার এসেছে । ভেতরে খেতে বসেছে ওরা । রহিম অধীর অপেক্ষায় আছে ওদের বেরোনোর জন্য । বারবার উঁকি ঝুঁকি দিচ্ছে সেদিকে । এটাও লক্ষ্য করেছে করিম ।
রহিম থমমত স্বরে আমতা আমতা করলো…
“ মিথ্যা অপবাদ দিবি না আমারে ।
আমি ভালা পোলা । কাউরে দেখি নাই আমি…
“ হ দেখোস নাই । খালি ভ্যাটকাইয়া চাইয়া আছিলি । শালা হারামি ।
মাইয়া দেখলে চাইয়া দেখোনের লোভ মানে না তো তোর ।
জানোস না রে খাসি ,,, লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু । মৃত্যুর পর কবর আর তারপর হাশর , আর হাশর থাইকা সোজা জাহান্নাম । আর তুই মরার পর জাহান্নামি হইবি ,জাহান্নামি, জাহান্নামি জাহান্নামি….

কারন তুই মাইয়া দেখার লোভ করছোস , আর লোভ কইরাই তোর পাপ হইছে । পাপ হইছে দেইখা মরছোস , আর মরছোস দেইখা তোরে কবর দেওয়া হইছে , কবর দেওয়া হাইছে দেইখা হাশরের ময়দানে গেইছোস । আর ঐ খানে তোর লোভের লাইগা তোরে জাহান্নামে দিছে…
জাহান্নামে দিছে কারন তুই লোভ করছোস , লোভের লাইগা পাপ কুড়াইছোস..
“ উফফফ , কি শুরু করলে তোমরা ?
থামবে ?
করিম কথার মাঝে ধমক খেয়ে চমকে থামলো । চকিতে তাকালো সংগ্রামের দিকে । সংগ্রাম বিরক্ত । সে নেমে পড়লো ডিকি থেকে ।
এদের দুটোর বেকার প্যাচাল বেশিক্ষণ শুনলে কান মাথা ভোঁ ভোঁ করবে । এখানে থাকা যাবে না আর ।
সংগ্রাম ওদের ছেড়ে বাড়ির দিকে রওনা দিলো । সংগ্রাম যেতেই করিম কে ভেংচি কাটলো রহিম ।

রাত থেকেই গা কাঁপিয়ে পোড়া জ্বর আফতাবের ।
সারারাত ভেজা কাপড়ে জ্বর ছেকা হয়েছে , লাভ হয় নি একটুও । অঝোর ধারার উত্তাল বৃষ্টিতে ভেজার পর গা উষ্ণ গরম ছিলো । রাত হতেই চড়চড় করে জ্বর বেড়েছিল । মাঝরাতে অত্যাধিক মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে । ঠান্ডায় ব্যামো আছে আফতাবের । একটুও ঠাণ্ডা সহ্য হয় না ওর ।
বাড়িতে ঔষধ এনে রাখা ছিলো , সেগুলো খেয়েও কোনো লাভ হয় নি । রাতে এসেছিল আবার তুমুল বৃষ্টি । ঘর ছেড়ে বাইরে বেরোনো দায় । আফতাবেব বাবাও বেরোতে পারেননি বাইরে । আলাদা করে ঔষধ আনা বা আফতাব কে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া, কোনোটাই হয় নি । সারারাত গুঙ্গিয়েছে আফতাব । বিড়বিড় করেছে নিজের মাঝে । জ্বরের ঘোরে কেঁপে কেঁপে বেহুঁশ রাত কেটেছে ওর ।

সকালে ভ্যান ডেকে আফতাব কে নিয়ে বাজারে গেছিলেন ওর বাবা । হাঁটের ভালো ডাক্তার দেখিয়ে ঔষধ নিয়ে এসেছেন । সকাল থেকে বিছানায় পড়ে আছে আফতাব । ঘুমিয়েছে সারাটা দিন । চোখ মুখ ফুলে গেছে জ্বরের সাথে সাথে ঘুমের তোপে । বিকেলের শেষ ভাগে ঘুম থেকে উঠলো আফতাব । গা গরম এখনো । ওর জ্বর আসলে সহজে সারে না । দুই থেকে তিন দিন জ্বরে ভুগতে হবে এখন ওকে । ঔষধে জ্বর কমলেও সারবে না সহজে ।
শরীর কাঁপছে আফতাবের । বিছানা ছেড়ে উঠে কম্বল খানা টেনে ভাঁজ করে গায়ে জড়িয়ে নিল আফতাব । বাইরে বেরোলো অতঃপর । মাথা , শরীর উভয়ই টলছে । খালেদা চাল ভেজেছেন । জ্বরের মাঝে কাঁচা মরিচ আর পেঁয়াজ কুচি দিয়ে ঝাল ঝাল করে চাল ভাজা মাখিয়ে খেতে বেশ পছন্দ করে আফতাব ।
চাল ভেঁজে দিয়ে আসরের নামাজে ঢুকেছেন তিনি । দেরি হয়ে গেছে আজ । ময়না কে বলে গেছেন পেঁয়াজ মরিচ কেটে দিয়ে চাল‌ ভাঁজা গুলো মাখিয়ে নিতে । আফতাব উঠলে খাবে ।

ময়না চুলার পাড়ে তাই করছে । কুলোয় গরম চাল ভাঁজা । বেশি করে মরিচ আর সরষের তেল দিয়ে মাখিয়েছে প্রথমে । পেঁয়াজ কাটছে এখন । ঝাঁঝ খুব পেঁয়াজে । আফতাব ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে পিছু ফিরে বসে থাকা ময়না কে দেখলো । পিঁড়িতে বসে কিছু একটা করছে ময়না । পিছন থেকে বুঝলো না আফতাব । সে এক পলকেই চোখ সরিয়ে নিলো নির্বিকার ভঙ্গিতে ।
একটু এগিয়ে আসলো । আঙিনায় দাঁড়ালো এসে । এদিক ওদিক তাকিয়ে খালেদা কে খুঁজে না পেয়ে আন্দাজ করলো খালেদা হয়তো নামাজে ।

ময়নার নাক টানার শব্দ কানে আসতেই আফতাব চমকে তাকালো ময়নার দিকে । ময়না চোখ মুছলো বোধহয় । পেছন থেকে এটুকু বুঝলো আফতাব । বেশ কবার নাক টানার সাথে সাথে কাশির শব্দ ভেসে আসলো । এবার আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না আফতাব । দপাদপ পা ফেলে ছুটলো । ময়নার পাশে দাঁড়িয়ে গমগমে স্বরে বললো…
“ এই মেয়ে , কাঁদছো কেনো ?
ছলকে তাকায় ময়না । ভেজা চোখ ওর । পেঁয়াজের ঝাঁজে চোখ খুলতে পারছে না সে । কোনো রকমে টেনে টুনে চোখ খোলার চেষ্টা করলো ময়না । সবে অর্ধেক পেঁয়াজ কুচি করেছে , তাতেই এই অবস্থা । ময়না ভেজা চোখ ডান হাতের উল্টো পিঠে মুছলো । বেশি ঝাঁজালো উত্তাপ চোখে লাগতেই আরো কুঁচকে ফেললো চোখ মুখ । নাক দিয়ে পানি পড়ছে চোখের সাথে সাথে ।
আফতাব সবটা অবলোকন করে বুঝতে পেরে চরম বিরক্ত হলো । চোখ মুখ পাকিয়ে হেঁচকা টানে দাঁড় করালো ময়না কে । চাপা স্বরে ধমক দিলো দাঁত পিষে….
“ একটা থাপ্পর মারবো ,, বলেছি না যেটা পারো না সেটা করবে না । আমার কথা কানে যায় না তোমার ?
ময়না চোখ খুলতে পারছে না ।
ফের পেঁয়াজ কাঁটা হাত দিয়ে চোখ মুছতে গেলে তার আগেই ওর হাত টা চেপে ধরলো আফতাব । এবার ধমকালো চড়া গলায়…

“ আবার এই হাত চোখে লাগাচ্ছো ? একেই চোখ জ্বলছে , মাথায় বুদ্ধি সুদ্ধি নেই তোমার ?
“ চোখ জ্বলতাছে তো । খুলতে পারতাছি না ।
বাচ্চামো স্বর ময়নার । আফতাব সব ভুলেছে মুহুর্তেই । ময়না ও তাই ।
আফতাব কন্ঠে দৃঢ়তা রেখেই বলে উঠলো….
“ হাত ধুয়ে তারপর চোখ স্পর্শ করবে ।
বলতে বলতে দ্বিধা হীন নিজ হাতে ময়নার চোখ দুটো মুছিয়ে দিলো আফতাব । একটুও জড়তা আসলো না এতে । আফতাব ময়নার পুরো মুখশ্রী নিজ হাতের তালুতে মুছিয়ে দিলো ‌। চোখ জোড়া মুছিয়ে দিলো ফের ‌। আফতাবের উষ্ণ গরম হাতের স্পর্শে ময়না পাথরের ন্যায় জমে গেলো এক মুহুর্তেই । ধ্যান ফিরলো এতক্ষণে । আফতাবের স্বাভাবিক আচরন দেখে ছ্যাঁত করে উঠলো । চোখ খুললো ঝট করে । চোখের পাপড়ি যুগল ভেজা এখনো । ঝট করে চোখ মেলার দরুন কেঁপে উঠলো পাপড়ি গুলো । ময়নার দৃষ্টি বুঝেই এবার টনক নড়লো আফতাবের । দ্রুত হাত সরিয়ে নিলো ও । পিছিয়ে আসলো ছিটকে । হুশে ফিরতেই চোয়াল শক্ত হয়ে আসলো আগের ন্যায় । ময়নার তাজ্জব চাহনি দেখে মুখ ফিরিয়ে ঢোক গিললো । ঠোঁট ভিজিয়ে দ্রুত প্রসঙ্গ পাল্টালো ময়নার মন ঘোরানোর জন্য…

“ যাও , চোখে মুখে পানি দিয়ে এসো ।
অত্যন্ত স্বাভাবিক স্বর । ময়না কিংকর্তব্য বিমুঢ় । অবাক লোচনে চেয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে ও । আফতাব বাঁকা চোখে ওকে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কপালে ভাঁজ ফেললো । রুক্ষ স্বরে বলল সম্পূর্ণ দৃষ্টি পাত করে…
“ কি হলো যাও !
ময়না দ্রুত কদমে পা চালালো ঢোক গিলে । চোখ নামিয়ে ছটফটিয়ে এগোলো কলপাড়ের দিকে ‌। ও চলে যেতেই তপ্ত শ্বাস ফেললো আফতাব ।
নিচে তাকাতেই এতক্ষণে চাল ভাজা নজরে আসলো । খালেদা বেরোচ্ছেন না এখনো । আফতাব পিঁড়িতে বসলো । অর্ধেক করে রাখা পেঁয়াজের টুকরো টা কাটলো নিজেই । অতঃপর চাল ভাজা মাখাতে মাখাতে উঠলো পিঁড়ি থেকে । ঘরের দিকে এগোতে এগোতেই খালেদা বেরিয়ে আসলেন । তিনি খান না এসব । চিবুতে গেলে চোয়াল ব্যাথা হয়ে যায় তার । আফতাবের বাবাও বাড়িতে নেই । তার জন্য আলাদা করে আগেই শুকনো অবস্থায় তুলে রেখেছেন একটু ।

আফতাব সোজা ঘরে ঢুকলো । খাটে আধশোয়া হয়ে খাওয়া শুরু করলো । কম্বল এখনো গায়ে জড়ানো ।
ময়না চোখে মুখে পানি ছিটকে দিয়েছে । লাল হয়ে গেছে চোখের আদ্র কিনারা । ভেজা মুখ নিয়ে ঘরে ঢুকলো ও । আফতাবের দিকে না তাকিয়ে গামছা টেনে মুখ মুছলো ।
গামছা সরিয়ে বরাবর দৃষ্টি পাত করলো আফতাবের দিকে ‌। আফতাব নিজের ধ্যানে খেতে নিমগ্ন । ময়না চোখ নামিয়ে নেয় । গুটিয়ে যায় জড়তায় । আফতাবের এড়িয়ে চলা আন্দাজ করে ঘর থেকে বেরোতে গেলে এবার ডাকলো আফতাব…
“ ময়না ?
ময়না দ্রুত পিছু ফিরে । ছলকানো দৃষ্টিতে চোখাচোখি হতেই আফতাব শুধালো নরম কন্ঠে…
“ খাবে ?
তৎক্ষণাৎ দুদিকে মাথা নাড়ায় ময়না । ঢোক গেলে ভয়ার্ত চিত্তে । আফতাব নিষ্ক্রিয় চোখে তাকিয়ে ডাকলো নিজের কাছে…

“ এসো !
বাধ্যের ন্যায় কলের পুতুলের মতো এগোয় ময়না । আফতাব বসতে ইশারা করতেই বসে পায়ের কাছে । আফতাব নিজের পা গুটিয়ে নেয় । অত্যন্ত স্বাভাবিক আচরণ তার । ময়না অবাক হলো চরম । কালকেও সে নিজের প্রতি আফতাবের ক্ষুব্ধ আচরণ দেখেছে । আর আজ স্বাভাবিক ?
আফতাব ময়নার অবস্থা বুঝে বলে…
“ খাও ।
“ খা..খামু না আমি ।
ময়নার কন্ঠ কাঁপে । কাঁপে রক্তিম অক্ষি যুগল‌‌‌ ।
আফতাব চোখ সরায় । কন্ঠে শাসন টেনে বলে…
“ খেতে বলেছি খাও । আমার অবাধ্য হওয়া পছন্দ করি না বলেছিলাম ! খাও…

সন্ধ্যা হতেই সাজানো জমিদার বাড়ির সব আলো জ্বলে উঠেছে । আলোকসজ্জার সজ্জিত উজ্জ্বল আলো ফুটেছে পুরো বাড়িতে । ছাদ থেকে শুরু করে পুরো বাড়িতে যে রঙিন রঙিন ফেইরি লাইট টাঙানো হয়েছিল , তা সব জ্বালানো হয়েছে । সব আলো ধেয়ে ছড়িয়ে গেছে অদূর থেকে অদূর পর্যন্ত । বাড়ির বাইরেটা রঙ বেরঙের আলোর সজ্জায় সজ্জিত । আর ভেতরটা ফুলে । কাঁচা ফুলে সজ্জিত । অন্দরের বসার ঘরে মৌলভী সাহেব আর কাজি অপেক্ষা করছেন । তাদের ভেতরে ঢোকার অনুমতি দেওয়া হয়েছে আজ । লতিফা, সালেহা তারা নিচে নেমেছেন এখন । সন্ধ্যার আগে আগে অলকা কে নিয়ে আসা হয়েছে । এই প্রথম তার আগমন জমিদার বাড়িতে । জমিদার বাড়ির রূপ – বিলাসবহুলতার বর্ননা শুনেছেন এতদিন । আজ দেখলেন স্বচোক্ষে । তার মেয়ের বর্তমান আর ভবিতব্য এটা । কে ভেবেছিল তার অবহেলিত, তাচ্ছিল্যে বেড়ে ওঠা মেয়েটার ভাগ্য এতোটা প্রশন্য হবে ?
অলকার চোখ ভিজেছে সুখে । তার মেয়ের সুখ দেখে । তিনি সাধারণ , এসবের কল্পনাও কখনো ছিলো না আপাদ মস্তকে । আর এসবেই ঘটে গেলো ।

বিয়ে পড়ানো হবে এখন । সংগ্রাম সহ সবাই উপস্থিত অন্দরে । অন্দরের মাঝ বরাবর দুভাগ করা হয়েছে । সিঁড়ির দিকে এক ভাগ , অন্য ভাগ রান্না ঘরের দিকে । মাঝে দেয়াল টানা হয়েছে ফুলের তৈরি একাধিক মালার আবরন দ্বারা । গাঁদা ফুলের তৈরি মোটা মোটা ঝুল টেনে দুভাগ করা হয়েছে বসার ঘরকে । একদিকে সেই কখন থেকে অপেক্ষমান উতলা সংগ্রাম জোয়ার্দার ।
অন্যদিক এখনো ফাঁকা । সংগ্রাম জোয়ার্দারের বেগম কে নিচে নামানো হয় নি এখনো । লতিফ জোয়ার্দার তাড়া দিলেন এবার ।

এবার শ্যামা কে নিচে নামানোর হিড়িক পড়লো । শবনম,ফুলি দুজনে মিলে ঘর থেকে বের করলো শ্যামা কে । সাথে অলকা আছেন । বিয়ে পড়ানো হলেই চলে যাবেন তিনি । এই কয়েক মুহূর্তেই এ বাড়ির সকলের ব্যবহার অনুমান করে ফেলেছেন তিনি । বাড়ির সবাই ভালো । সালেহাও অত্যন্ত নরম ভাবে কুশল বিনিময় করেছেন অলকার সাথে । এই প্রথম বড় জমিদার গিন্নি কেও দেখলেন অলকা ।
সংগ্রামের উদগ্রীবতা বাড়ছে । অপর পাশ থেকে কিছুই দেখতে পারছে না সে । সেই দুপুরের পর থেকে আর দেখা হয় নি শ্যামা কে । কেমন লাগছে তার বেগমকে, কে জানে ?
পরপর ঢোক গিলছে সংগ্রাম । শ্যামা কে সিঁড়ি বেয়ে নামিয়ে সংগ্রামের মুখোমুখি ফুলের তৈরি আবরনের অপর পার্শ্বে বসানো হলো । গলা অবধি ঘোমটা টানা ।
বিয়ে পড়ানোর কার্যক্রম শুরু হলো অপেক্ষা না করে । পুনরায় বিয়ে পড়ানো হলো সংগ্রাম জোয়ার্দার আর তার বেগম ডালিয়ার । তিন কবুল পাঠ করলো দুই নর নারী । তিন কবুলের বন্ধনে দ্বিতীয় বার আবদ্ধ হলো তারা । শ্যামা আজ থমকায় নি কবুল বলতে ।
বিয়ে পড়ানো শেষে উঠে দাঁড়ায় সংগ্রাম । পড়নে সফেদ রঙ্গা ধবধবে শেরোয়ানি । মাথায় মিল করে পাগড়ি । এসব তার সাজসজ্জা ।

সংগ্রাম উঠে দাঁড়িয়ে মুচকি হাসে । মৌলভি আর কাজি কে নিয়ে অন্দর ছেড়েছেন লতিফ জোয়ার্দার । তারা ব্যতীত সবাই উপস্থিত অন্দরে ।
সংগ্রাম কারোর পরোয়া করে না । দ্বিধা হীন এগোয় । ফুলের তৈরি মধ্যবর্তী দেয়াল সরিয়ে ঘোমটার আড়ালে থাকা শ্যামার পানে তাকায় । ঠোঁটের প্রগাঢ়তা বৃদ্ধি করে মোলায়েম স্বরে ডাকে…
“ বিবি সাহেবান !!
শ্যামা লাজুক হাসে লুকানো মুখে ।
শ্যামার পাশে অলকা দাঁড়িয়ে ছিলেন । সংগ্রাম কে দেখে ইতস্ততায় সরে গেলেন তিনি । অপর পাশে এসে দাঁড়ালেন । সালেহা শক্ত মুখে সোফায় বসে ছিলেন । অলকা কে দেখে স্বাভাবিক হলেন তিনি । শান্ত কন্ঠে বললেন…
“ বসুন ।
সংগ্রাম শ্যামার সম্মুখে অগ্রসর হতেই গলা খাঁকারি দিলো শবনম । ফুলি মুচকি হাসলো । আতিয়া বেগম এপাশ ছেড়ে উঠে শ্যামার পাশে বসলেন গা ঘেঁষে । সংগ্রাম কপাল গুটায় । বুড়ি ভেবেছে সে লজ্জা পাবে । বয়েই গেছে তার লজ্জা পেতে । সংগ্রাম ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসে । হেলে ঘোমটার উপরেই শ্যামার কপালে গাঢ় চুমু আঁকে । আতিয়া বেগম বড়সড় চোখে তাকাতেই সংগ্রাম ব্যাঙ্গ করে বললো…
“ তোমাকেও চুমু খাবো বুড়ি ? কি দেখছো এভাবে ? আর এখানে আমার বেগমের পাশে বসেছো কেনো ? আমার বউকে ফের হটানোর ধান্দা করছো ? সরো এখান থেকে ।
আতিয়া বেগম মুখ বাঁকালেন ঝামকা মেরে ।‌ শ্যামার ঘোমটা তুলতে গেলে বাঁধা দিলো শবনম ..

“ ভাই , দাঁড়াও !
“ কি হলো ?
“ শ্যামার পাশে বসো । আমি আসছি এক্ষুনি…
সংগ্রাম পাশে বসলো । শ্যামার দিকে ঝুঁকে কানের কাছে চমৎকার কন্ঠে ফিসফিসিয়ে বললো…
“ সালাম বিবি সাহেবান !
শ্যামা মিষ্টি হাসে । ঘাড় ঝাঁকায় উত্তরে ।
সংগ্রাম ঠোঁট পিষে হাসলো । শবনম একটা বড়সড় গোল আয়না নিয়ে আসলো উপর থেকে । আয়নাটার গন্ডি সাজানো ফুল দিয়ে সুন্দর করে । আগে থেকে পরিকল্পনা ছিলো কিছু একটার ।
সৈকত গুড়ি গুড়ি পায়ে এসে দাঁড়ালো শ্যামার সামনে । মাথা এলিয়ে ও দেখার চেষ্টা করলো শ্যামার মুখশ্রী । শবনম আয়না টা শ্যামার হাতে ধরিয়ে দেয় । নিজে আলতো করে ঘোমটা সরাতে সরাতে বলে…
“ ভাই , তুমি আয়নার দিকে তাকাও ।
সংগ্রাম চকিতে তাকালো শ্যামার হাতে থাকা আয়নার দিকে । দর্পণে শ্যামার সজ্জিত লাজুক প্রতিবিম্ব ভাস্যমান । চোখ আটকালো সংগ্রামের । শ্যামা তাকায় নি , চোখ নামিয়ে রেখেছে ও !
সংগ্রাম খেই হারিয়েছে । দৃষ্টি গেঁড়ে গেছে ওর । চোখের দিপ্তী অস্বাভাবিক আবেশিত । প্রকম্পিত হচ্ছে হৃদয় । পলক ঝাপাটাতেও নাকচ করছে মস্তিষ্ক । যদি পলক ফেললেই শ্যামা কে দেখায় বিঘ্ন আসে ? তাই নিষ্পলক চেয়ে আছে সংগ্রাম ?

তার বেগমের শ্যামলতা পূর্ণ সৌন্দর্যের এতোটা জোর কেনো ? এতোটা আকৃষ্টময়ী হতে হবে কেনো তার বেগম কে ? সংগ্রাম ভেবেই শুষ্ক ঢোক গেলে । পলক পড়ে অনেকক্ষণ বাদ । ঘোমটার দরুন শ্যামার শ্যামালা মুখশ্রীতে আঁধার নেমেছে । তবুও সেই শ্যামলা চেহারায় জৌলুসের খামতি নেই ? অন্তত সংগ্রামের চোখে নেই । কারন তার দেখার দৃষ্টি নিষ্পাপ । চেয়ে থেকেই নরম হাসলো সংগ্রাম ।
শবনম মুচকি হেসে বললো….
“ আয়নাতে কাকে দেখা যায় ভাই ?
প্রশ্নের উত্তরে এক মুহুর্ত বিলম্ব হলো না । তড়িতে উত্তরে ঝাঁপিয়ে পড়লো সংগ্রামের জবান….
“ আমার শ্যামা সুন্দরী কে ।
আমার হৃদয়ে অবাধ্য বিচরণ কারিনি কে । হৃদযন্ত্রের তোলপাড় চালানো এক অপার্থিব রমনীকে । আমার বাম পাজরের হাড়ে তৈরি স্বয়ংসম্পূর্ণাকে । যে আমার বাম পাজরের হাড় চুরি করে তীব্র ব্যাথার সৃষ্টি করেছে আমার বাম পাজরে অবস্থিত উত্তাল হৃদয়ে ।
সে , আমার বেগম । আমার অনাগত সুফিয়ানার জননী । লাল টুকটুকে বউ রূপে তারই লাজুক প্রতিবিম্ব দেখতে পারছি আমি ‌।

হেসে উঠলো সকলে । হাসির ঝংকার উঠলো শবনম আর আতিয়া বেগমের । শ্যামা নুইয়ে যায় আরো । গায়ে কাঁটা দেয় ওর । লজ্জায় শিউরে ওঠে সর্বাঙ্গ । লতিফা মুখ ঝামটালেন । সালেহা মুখ ফিরিয়ে নিলেন স্বাভাবিক ভাবেই । অলকা হাসেন স্মিথ ।
সৈকত ড্যাপ ড্যাপ করে চেয়ে আছে । ও বারবার তাকাচ্ছে আয়নার দিকে ।
শবনম মুচকি হেসে ঠাট্টা স্বরে বলল গলা ঝেড়ে….
“ বাহ্ ভাই ,, সুফিয়ানা ? নাম ও ঠিক করে রেখেছো দেখছি ! তাহলে অপেক্ষার তীব্রতা টা নিশ্চয়ই অনেক বেশি ?
আমরাও তাহলে অপেক্ষায় রইলাম , তোমাদের অনাগত সুফিয়ানার অপেক্ষায় ।
শ্যামা , এবার তুমি তাকাও । বলো তো কাকে দেখতে পারছো আয়নায় …
শ্যামা তাকাতে হয়রান । ইতস্ততা কাটিয়ে ধীরে চোখ তুললো আয়নার দিকে । সংগ্রামের চোখ সরানোর ইয়ত্তা নেই ।‌ সে এখনো এক আবেশে এক ধ্যানে চেয়ে ।
শ্যামার‌ চোখে চোখ পড়লো এক মুহুর্তেই । অমনি ভ্রু নাচালো সংগ্রাম । শ্যামা বললো ওষ্ঠপূটে হাসি ফুটিয়ে ঠোঁট নাড়িয়ে…

শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৪৮

“ আমার ছোট জমিদার সাহেব কে । সর্বাধিক সৌন্দর্য সম্পন্ন এক জমিদার সাহেব কে ‌। আমার দেখা সবচেয়ে সুদর্শন পুরুষ কে ‌। আমাকে ভালোবেসে আগলে রাখা প্রথম পুরুষ কে । আমার জীবনের অধিকারক কে । আমার বিশ্বাস আর ভরসা কে । আমার ভালোবাসা কে দেখছি আমি…

শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৫০