শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৫৫
সুরভী আক্তার
দুপুরের রোদ ঝিমিয়ে গেছে । পড়েছে বিকেলের লগ্ন ।
মিঠে হাওয়া বইছে ধরনীতে । গাছে গাছে নতুন পাতা গজিয়েছে । কদিন আগেও খড়খড়ে ছিলো প্রকৃতি । এখন আবার সবুজে সবুজে আবৃত হয়েছে গাছ পালা । পশ্চিম দিগন্তে লাল আভা মিইয়ে যাচ্ছে । অস্ত যাচ্ছে সূর্য ।
শ্যামা নামাজ শেষে বারান্দায় গিয়ে বসে ছিলো বেতের সোফাটায় । বাতাসের মিষ্টতায় সেখানেই কখন ঘুমিয়ে পড়েছে টেরই পায় নি । ওর ঘুম ভাঙলো শবনমের ডাকে । শবনম বেশ কবার গলা ঝেড়ে ডেকেছে । সাঁড়া পায় নি । অতঃপর গা ঝাঁকিয়ে ডাকতেই হকচকিয়ে উঠলো শ্যামা । সহসা ঘুম ছুটিয়ে ধড়ফড়িয়ে উঠলো । গোলমেলে হয়ে গেলো সবটা । নিজেকে সামলে হাঁফ ছেড়ে বললো শ্যামা…
” ও ভাবি , আপনি ?
” হুম । কখন থেকে ডাকছি , শুনছিলে না । এখানে ঘুমাচ্ছো কেনো ?
” বসে থাকতে থাকতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি খেয়ালই করিনি । বেলা গড়িয়েছে,, না ?
” সন্ধ্যা হতে চললো ।
ওঠো এখন । নিচে মামা ডাকছে তোমায় !
” আমাকে ?
” হুম ।
কপাল গুটায় শ্যামা । হঠাৎ ওকে কেনো ডাকছে লতিফ জোয়ার্দার ? যদিও লতিফ জোয়ার্দারের সাথে শ্যামার সখ্যতা আছে বেশ । কিন্তু এমন হুট করে ওকে আলাদা করে ডাকছে কেনো ?
শ্যামা উঠলো । শবনম বেরিয়ে গেছে । চোখে মুখে পানি ছিটিয়ে নিচে নামলো শ্যামা । অন্দরের বড় সিংহাসন স্বরূপ চেয়ারটায় বসে আছেন লতিফ জোয়ার্দার । পাশে আতিয়া বেগম । মা ছেলে নিজেদের মাঝে কথা বলেছে । শ্যামা মৃদু স্বরে বলল….
” আব্বা ? আমাকে ডেকেছেন ?
” আরে আম্মা ? কোথায় ছিলে ? দেখিনি তোমায় ।
বসো ,বসো । গল্প করি একটু ।
আতিয়া বেগমের পাশে বসলো শ্যামা । লতিফ জোয়ার্দার বললেন সোজাসুজি…..
” শুনলাম কাল নাকি সংগ্রামের সাথে সুখের নীড়ে গেছিলে ?
” জ্বি আব্বা !
” কেনো গেছিলে ?
” এমনি , যাওয়ার ইচ্ছে ছিলো । তাই ছোট জমিদার সাহেব নিয়ে গেছিলেন ।
লতিফা পান চিবুতে চিবুতে নিচে নামলেন । কথা গুলো কানে পড়লো তার । পিক গিলে বসলেন তিনি । লতিফ জোয়ার্দারের আগে কূচুটি মুখ খুললেন….
” সুখের নীড়ে সংগ্রাম নিয়ে গেছিলো তোকে ? বাব্বাহ , বউকে নিয়ে আদিখ্যেতার শেষ নেই দেখছি । ভিমরতী ধরেছে বউয়ের কবলে পড়ে ।
শ্যামা চুপ থাকলো না । সহসা বললো….
” এখানে আদিখ্যেতার কি দেখলেন ফুফু আম্মা ?
তৎক্ষণাৎ শ্যামার জবানের তৎপরতা দেখে রুষ্ট চোখ তাক করেন লতিফা । এই মেয়ের সাহস বেড়েছে আজকাল । দিনকে দিন মুখে মুখে কথা বলে । কই , আগে তো এমন ছিলো না । এখন জমিদারের হাল পেতে না পেতেই গিন্নি পনা শুরু করেছে ।
খবরদারি দেখায় এই মেয়ে ? লতিফা মুখ ঝামটালেন…
” দেখেছো আম্মা , কেমন চোপা দেখেছো মুখের ? সংগ্রাম এখন জমিদার হতে না হতেই এই মেয়ের পরিবর্তন দেখেছো ? সাহস বেড়েছে কতো !
আতিয়া বেগম উল্টে লতিফাকেই কটাক্ষ করলেন..
” জমিদারের বউয়ের চোপা হইবো না তো কার হইবো ? হেয় জমিদারের বউ , এইটা ভুইলা যাইস ক্যান । হের সাহসের দেখছোস টা কি ?
লতিফা সুযোগ পেলেন ….
” দেখছি তো সাহস । পাগলের সাহস কতটুকু সেটা জানাতে এসো না আমায় । পাগলামো থেমেছে একটু , তাই বলে পাগল ভালো হয়ে যায় নি । দেখবো কত সাহস ? সাহস না দেমাগ তা বুঝতে বাকি নেই আমার ।
” সাত গ্রামের জমিদার সংগ্রাম জোয়ার্দারের একমাত্র বেগম সে , একটু দেমাগ তো থাকবেই ফুফু আম্মা….
পিছন থেকে সংগ্রামের গলা ভেসে আসলো আচানক । চকিতে চাইলো শ্যামা সহ বাকিরা । সংগ্রাম কে দেখে মুখ বাঁকালো লতিফা ।
গায়ের শালটা খুলে হাতে জড়ানো সংগ্রামের । শ্যামা উঠে দাঁড়ালো । লতিফ জোয়ার্দারের দিকে তাকালো প্রশ্নাত্মক নয়নে । লতিফ জোয়ার্দারের ইশারা দিলেন । তার আর কিছু বলার নেই । থাকলেও এই মুহূর্তে সংগ্রাম এসেছে । আর বলবেন না তিনি । সংগ্রাম সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে শ্যামা কে ডাকলো…
” ঘরে এসো বেগম ।
পিছু পিছু উঠে গেলো শ্যামা ।
শ্যামা ঘরে ঢোকার আগেই সংগ্রাম গোসল খানায় ঢুকে পড়েছে । শ্যামা তড়িঘড়ি করে কাপড় বের করলো ওর জন্য । দুপুরে আজ বাড়ি ফেরে নি সংগ্রাম । কোথায় ছিলো কে জানে ! বাইরেই বা কি করে সারাদিন ? গ্রামে কি কাজ সংগ্রামের ? কোথাও কোনো তৎপরতা পড়লে তবেই সংগ্রামের উপস্থিতির প্রয়োজন হয় । নতুবা সংগ্রামের কাজ করে দেওয়ার জন্য লোকের অভাব নেই । তাহলে সারাদিন বাইরে কি করে সংগ্রাম ?
এই মুহূর্তে ছোট জমিদার সাহেবের খিদে পেয়েছে নিশ্চয়ই ? সারাদিন খেয়েছে কি খায় নি খোঁজ নেই ? বেশ অবসন্ন দেখালো চেহারা । শ্যামা কাপড় বের করেই নিচে নেমেছে । রাতের খাবার রান্না ইতিমধ্যে মোটামুটি শেষ । এখন খেলে আর রাতে খাবে না সংগ্রাম । পরে খিদে পাবে নয়তো । তাই আর খাবার বাড়লো না শ্যামা । এক কাপ চা করে নিলো । উপরে উঠতে গেলে সিঁড়ির শেষ মাথায় সালেহার সাথে দেখা । শ্যামা কে দেখেই মুখ কুঁচকে ফেলেন সালেহা । অনিচ্ছা সত্ত্বেও কড়া জবানে রুষ্ট স্বরে বুলি ফুটান….
” সংগ্রাম এসেছে ?
” হ্যাঁ আম্মা ।
” দে আমায় । আমি নিয়ে যাচ্ছি ওর জন্য । আমার ছেলের সাথে কথা আছে আমার । তুই খবরদার পা ফেলবি না আশেপাশে । আমি ঘর থেকে বেরোবো , তারপর ঘরে আসবি । এর আগে যেনো ঘরের ত্রিসীমানাতেও না দেখি তোকে ।
বলেই শ্যামার হাত থেকে চায়ের কাপটা ছিনিয়ে নিলেন এক প্রকার । গজগজ করে ঘরের দিকে এগোলেন । খানিক প্রশন্য হলো শ্যামা । অনেক দিন পর সালেহা নিজে থেকেই সংগ্রামের খোঁজ করেছেন । ছেলের প্রতি খেয়াল ফিরেছে তার । নিচে নামলো শ্যামা । সৈকত কে মেঝেতে খেলতে দেখে ঝট করে ওকে কোলে তুললো । লতিফ জোয়ার্দার ঘরে উঠে গেছেন । শবনম আর আতিয়া বেগম বসে আছে । শ্যামা যোগ দিলো ওদের সাথে ।
সালেহা ঘরে ঢুকলো কড়াঘাত করে । আয়নার সামনে ভিজে শরীরে দাঁড়িয়ে সংগ্রাম । শ্যামার জন্য অপেক্ষায় সে । সালেহা কে দেখে ইতস্তত হলো । ভেজা শরীরে ফতুয়া জড়ালো । মাথা মুছলো আজ নিজেই । মোলায়েম কন্ঠে বলল….
” আম্মা , তুমি ? আজ এখানে , আমার ঘরে ?
” আসতে পারি না নাকি তোর ঘরে ?
” অবশ্যই আসতে পারো । কিন্তু আসো না তো আজকাল , তাই জিজ্ঞেস করলাম আরকি ।
সালেহা চায়ের কাপটা রাখলেন ।
ছেলের হাতের দিকে আচমকা চোখ পড়তেই আঁতকে উঠলেন কিছু বলার আগেই । ডান হাতের কব্জির উপরে তাজা ক্ষতচিহ্ন । কাঁটা চিহ্ন । টকটকে হয়ে আছে । সালেহা বিচলিত হয়ে এগোলেন….
” সংগ্রাম , হাতে কি হয়েছে তোর ?
নিজের হাতের দিকে তাকায় সংগ্রাম । জবাব দেয়…
” কেটে গেছে একটু ।
” একটু কোথায় , এতো অনেকটা কেটে গেছে ! কি করে হলো এমনটা ? দেখি দেখি । দেখ কতটা কেটেছে । জখম হয়ে আছে পুরো । ঔষধ লাগাস নি ? শ্যামা কোথায় , দাঁড়া আমি ওকে ডাকছি…
” এটুকুর নির্ভরতাও শ্যামার উপর বর্তাচ্ছো আম্মা ? অথচ শ্যামা কে মানো না , সহ্য করো না । এটুকু তুমিও সামলে নিতে পারবে । ওকে ডাকার প্রয়োজন হবে না ।
থামলেন সালেহা । উদ্বিগ্নতা কমালেন । নিজেকে স্বাভাবিক করলেন । চায়ের কাপ হাতে তুলে সোফায় বসেছে সংগ্রাম । সালেহা আলমারি থেকে ঔষধের বাক্স বের করে ছেলের পাশে বসলেন । কাঁটা হাতটা টেনে নিজের কোলে রাখলেন । কি করে এমনটা হলো জিজ্ঞেস করলেন না আর । হয়তো উত্তরটা জানা আছে আন্দাজে ।
কাঁটা স্থানে ঔষধ লাগিয়ে বেঁধে দিতে দিতে অন্য প্রসঙ্গে মুখ খুললেন তিনি…
” যা করছিস , ভেবে চিন্তে করছিস তো ?
” কি করলাম ?
” শুনলাম শ্যামা কে নিয়ে ও বাড়িতে গেছিলি !
” তো কি হয়েছে ?
” কিচ্ছু হয়নি সেটা দেখেই বুঝতে পেরেছি ! কিছু হলে কি হতো ?
” কি হওয়ার ছিলো বলতো ?
” বুঝেও না বোঝার ভান করবি না সংগ্রাম ।
আমি স্পষ্ট করেই বোঝাচ্ছি তোকে !
” শ্যামার চিন্তা করে এ কথা বলছো, নাকি ? এই নিয়ে তো তোমার ভাবার কথা নয় ।
” গায়ে লাগা কথা বলবি না একদম !
আমি কার চিন্তা করছি না করছি সেটা তোকে ভাবতে হবে না । বউকে নিয়ে সারাদিন ভাবিস , বড় বড় কথা বলিস , ভালোবাসার বয়ান দিস , অথচ না ভেবে কাঁচা কাজ করিস কেনো ?
” কাঁচা কাজ করলাম কোথায় ?
আর ভালোবাসার বয়ান দেই না মোটেও , আমি ভালোবাসি ওকে ! ওকে নিয়ে সর্বাধিক অভিপ্রায় আছে আমার ।
” তাহলে ওকে নিয়ে ওখানে গেলি কেনো ? জানিস না ওর পাগলামো সম্পর্কে ? যদি ভুলভাল কিছু দেখে ফেলতো ? কম অঘটন তো ঘটাস না ও বাড়িতে । তার উপর একটা উটকো ঝামেলা ঝুলিয়ে রেখেছিস এখনো । সেটাকে বিদায় করতেও পারিস না । যদি শ্যামা ওকে দেখে তোকে ভুল বোঝে….
সংগ্রাম মায়ের দিকে তাকালো । মুচকি হাসি আসলো ঠোঁটের কোণে । বললো স্বাভাবিক ভাবে…..
” আমার সংসার নিয়ে ভাবছো আম্মা ? কথা শুনে তো তাই মনে হচ্ছে ।
চিন্তা করো না , আমার ঘর আর ঘরনী,দুটোই সামলানোর ক্ষমতা আছে আমার । শ্যামা শুধু যেতে চেয়েছিল কারোর প্ররোচনায় , আমি নিয়ে গেছিলাম । যেটুকু ভুল বুঝেছিলো , সেটুকু ভেঙে গেছে । ওখানে গিয়ে আলাদা করে আর ভুল বোঝাবুঝি জন্মায় নি । এই প্রথম আর এই শেষ বারের মতো সুখের নীড়ে পা পড়েছে আমার বেগমের । আর পড়বে না কোনো দিন । সুখের নীড়ের পেছনের অসুখ কোনো দিন জানবে না আমার বেগম । সুখের নীড়ের সন্ধানের অগোচরে আমি ওকে নিয়ে সুখে থাকতে চাই আমি ।
” তাহলে এসব ছেড়ে দে ।
ভেঙে ফেল ঐ সুখের নীড় ।
সালেহার মৃদু কন্ঠ । কন্ঠে অচলতা । সংগ্রাম আম্মার চোখে চোখ রাখে….
” আমি তো সব ছেড়েছি আম্মা । কিচ্ছু করছি না এখন ! যখন সময় আসছে তখন শুধু নিজ কর্তব্য টুকু পালন করছি । এ ব্যাতীত বদলে গেছি আমি । আজ অনেক দিন পর দেখো , আমার হাতে ক্ষত হয়েছে । কেনো হয়েছে জানো তো ! মাঝে মাঝে এমন ক্ষত হবে আমার হাতে , রক্তাক্ত হবে আমার হাত ।
” সংগ্রাম ।
এসবে তোর লাভ টা কোথায় ? দেশে আইন আছে….
” অচল আইন । আর অচলতা দিয়ে সচ্ছলতা ছড়ানো যায় না আম্মা । আমি যতদূর পারি , সচ্ছলতা ছড়ানোর চেষ্টা করি । নোংরা কীট পছন্দ নয় আমার । তুমি সেটা জানো আম্মা ।
সালেহা তপ্ত শ্বাস ফেলেন ।
উঠে দাঁড়ান । এই নিয়ে সংগ্রামের সাথে আর কথা বাড়াতে চান না তিনি । নিঃশব্দে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন সালেহা । আজ বিষন্ন তিনি । সোজা নিচে নামলেন , সিঁড়ির নিচে দাঁড়িয়ে থেকে শ্যামাকে শবনম আর আতিয়া বেগমের সাথে হাস্যোজ্জ্বল মুখে গল্পতে মেতে থাকতে দেখে বেশ কিছুটা মুহুর্ত নীরব দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন শ্যামার দিকে । অতঃপর শান্ত কন্ঠে বললেন অবিষন্ন হয়ে…..
” এই মেয়ে , সংগ্রামের খাবার নিয়ে ঘরে যা । খিদে পেয়েছে ওর ।
শ্যামা তৎক্ষণাৎ অক্ষরে অক্ষরে আদেশ তামিল করলো । গরম খাবারই বাড়লো । খাবার সাজিয়ে উপরে উঠলো । ঘরে ঢুকে দেখলো সংগ্রাম কে । সোফায় বসে হাতের ব্যান্ডেজটা নাড়াচাড়া করছে সংগ্রাম । পানি পড়ে থকথকে হয়ে গেছে কাঁটা স্থান, তার উপর বেঁধে দেওয়ার দরুন চাপ পড়ে জ্বলছে ভীষণ । শ্যামা সংগ্রামের হাতে সাদা ব্যান্ডেজ দেখে আঁতকে ওঠে । দ্রুত কদমে ছুটে যায় । প্লেট রেখে উত্তেজিত হয়ে পড়ে….
” ছোট জমিদার সাহেব , আপনার হাতে কি হয়েছে ? ব্যান্ডেজ ? এভাবে বেঁধে রাখা কেনো হাত !
সংগ্রাম ধীরে চায় । মোলায়েম চোখে তাকিয়ে বলে…
” তেমন কিছু না , একটু কেটে গেছে বেগম ।
আম্মা ব্যান্ডেজ করে দিয়ে গেলো । ভেবো না , বেশি কিছু হয় নি ।
শ্যামা সংগ্রামের হাতটা টেনে নিলো । উল্টে পাল্টে দেখলো । রক্তের ছোপ দেখা যাচ্ছে ব্যান্ডেজ ভেদে । মলিন চোখে তাকিয়ে ব্যান্ডেজের উপর ঠোঁট ছোঁয়ায় শ্যামা । সংগ্রাম কেবলই এক চিলতে হাসে তা দেখে । সকাল থেকে শ্যামার সংস্পর্শে আসা হয় নি । এই মেয়েটার সামান্য দূরত্ব ও বড্ড পীড়া দেয় হৃদযন্ত্রে । ধড়ফড় লাগে কেমন । শরীর আনচান করে । চোখ জ্বলে এই শ্যামলা মুখশ্রীর মায়া না দেখতে পারলে । কি আছে এই মেয়েটার মাঝে ?
সংগ্রাম হুট করে শ্যামার কাঁধে মাথা রাখলো । চোখ বুজে শ্বাস টেনে বললো আবদারের সুরে….
” আমাকে একবার ভালোবাসি বলবে বেগম ?
তোমার মুখে এই একটা শব্দ শোনার বড্ড তৃষ্ণা আমার । একদিন ও বলোনি এ পর্যন্ত ! চার অক্ষরের একটা শব্দ , অথচ লুকিয়ে আছে কতশত অনুভুতি । একবার প্রকাশ করবে অনুভুতি টুকু ? বলবে ভালবাসি …?
শ্যামা মাঝে মাঝে অবাক হয় । এই লোকটা কেমন ঝিমিয়ে যায় মাঝে মাঝে । কি হয় কে জানে !
শ্যামা বললো….
” শুধু ভালোবাসি বললেই কি ভালোবাসার অনুভূতি প্রকাশ হয় ছোট জমিদার সাহেব ? ভালোবাসার অনুভূতি আদৌ প্রকাশ্যে বুঝিয়ে পরিমাপ করা যায় কি ? আমি আপনাকে ভালোবাসি বললে আপনি বুঝতে পারবেন আমি আপনাকে কতটা ভালোবাসি ?
” বুঝতে তো পারি । অপ্রকাশ্যেই বুঝতে পারি । প্রকাশ্যে না জানি কতটা ভালোবাসো আমায় !
শ্যামা মৃদু হাসলো । ও কখনো অপ্রকাশ্যেও ভালোবাসা বুঝিয়েছে কি ? কই , ওর তো মনে পড়ছে না ।
উঠে দাঁড়ালো শ্যামা । খাবারের প্লেট নিয়ে আবার বসলো । হাত ধুয়ে , ভাত মেখে মুখের সামনে তুলে ধরলো ভাতের লোকমা । ডান হাত কাঁটা সংগ্রাম । যদিও কব্জি পেরিয়েছে , খেতে পারবে নিজেও । তবুও শ্যামা খবরদারি করলো ।
সকাল থেকে ঝিম ধরে আছে সুরবালা । মাথাটা এখনো ভার । কেমন অস্বস্তি লাগছে । বমি করেছে দুবার । অংকুর বেজায় চটে আছে রিক্তার উপর । ওরা দুপুরে এসেছিল খোঁজ নিতে । তখনই নিশ্চিত হয়েছে অংকুর । খাবার পর রিক্তা সুরবালা কে একটা শরবত খাইয়েছিলো কাল । বলেছে এটা নাকি বেলের শরবত । নতুন বেলের শরবত । আসার সময় কিনে এনেছে ওরা । সেই শরবতে ভুল ভাল কিছু মিশিয়ে খাইয়েছে ওকে ।
রিক্তা কে এই নিয়ে কথা শুনিয়েছে অংকুর । যদি সুরবালার শরীরের অতিরিক্ত অবনতি হতো , তখন এর দায় নিতো কে ? রিক্তা কোথায় ওদের কথা ভেবে , নেশায় মত্ত করে ওদের কাছাকাছি আনার ফন্দি এঁটে এসব করলো , আর অংকুর উল্টে ওকেই কথা শোনালো ।
শায়লার পর যদি অংকুর কে কেউ ভালোভাবে বুঝতে পারে , সে হলো রিক্তা । আরশের থেকেও রিক্তা বেশি চেনে অংকুর কে । ছোটবেলা থেকেই একসাথে পড়াশুনা করেছে ওরা । যেখানে অংকুরের সাথে ওর গুমোট স্বভাবের জন্য কারোরই তেমন খাতির ছিলো না , সেখানে রিক্তা ছিলো অংকুরের সঙ্গী । সব থেকে ভালো বন্ধু । বাকিরা তো আসলো অনেক পর ।
রিক্তা কে কথা শোনালেও অংকুরের কথায় দাপট ছিলো না । দায় সারা ভাবে উপর উপর রাগ দেখিয়েছে শুধু । কেননা সে নিজেও প্রশন্য মনে মনে । কাল সে সুরবালা কে কাছে পেয়েছিল । জড়িয়ে ঘুমিয়েছে সারারাত । এই প্রথম কাছে পেয়েছে সুরবালা কে । সেটা রিক্তার জন্যই । ওর দুষ্টু বুদ্ধির জন্য ।
রিক্তারা তখনই চলে গেছে ।
এখন সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত । সুরবালা সেই একই ঝিম ধরে বসে আছে । অংকুর সন্ধ্যার পর বাইরে বেরিয়েছিল । ফিরলো এখন । হাতে একটা প্যাকেট । ঘরে ঢুকে সুরবালা কে পেলো না । বারান্দায় এগোলো । বেতের সোফায় পা তুলে শরীর এলিয়ে বসে আছে সুরবালা । অংকুর পেছন থেকে দেখলো । সামনে এগোতেই কপাল কুঁচকালো । সুরবালার হাতে অংকুরের বই ।
উপন্যাসের বই । এমন শত শত বই টেবিলে গোছানো আছে অংকুরের । অবসর সময়ে বই পড়া আর আঁকাআঁকি করা অংকুরের নেশা । বই পড়ায় প্রচুর আগ্রহ ওর । প্রচুর বই কেনে সে । টেবিল ভরে গেছে বইয়ে বইয়ে । সুরবালা পড়ছে । গভীর মনযোগ বইয়ের পাতায় । আজ বেশি বিষন্ন লাগছিলো । তাই একটা বই নিয়ে বসেছে । অংকুর কে পড়তে দেখে রোজ । ওর ও আগ্রহ জাগলো একটু পড়ার । কি পড়ে অংকুর , একটু দেখার আগ্রহ জাগলো ।
অংকুর চোখ সরু করে দেখলো । সুরবালার হাতে #দেবদাস বই । বেছে বেছে এটাই নিয়ে বসেছে সে ।
মৃদু হাসলো অংকুর । পরমুহূর্তে হাসি চাপলো । আজকাল একটু বেশি হাসছে না ও ? এতো হাসাহাসি কিসের ? তার উপর ক্ষণে ক্ষণে মুচকি হাসি নাকি প্রেমের লক্ষন । সে তো প্রেমে পড়েছেই , এই বাউড়ি টার প্রেমে হুবড়ি খেয়ে পড়েছে একদম । এ আর বলতে !
অংকুর গলা ঝেড়ে ডাকলো…
” সুরবালা ?
চমকে চাইলো সুরবালা ।
ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো । বই বন্ধ করলো তৎক্ষণাৎ ।
” আপনি কখন আসলেন ?
” কেবলই ! পড়ছিলে তুমি ?
” আ… ভালো লাগছিলো না । সময় ও কাটছিলো না । তাই বইটা হাতে নিলাম একটু ।
একটু থেমে তীক্ষ্ণ স্বরে বলল….
” আপনি এসব পড়েন ?
” হুমমম ।
” ভালো লাগে ?
কল্পনা সুন্দর , তাই না ?
অংকুর উত্তর করে না । পাল্টা বলে..
” ঐ বইটা রাখো । সুচনা সুন্দর হলেও সমাপ্তি বিদারক । খারাপ লাগবে পরে । কষ্ট পাবে না চাইতেও ।
সুরবালা খানিক হাসলো । উঠে দাঁড়ালো । বললো কেমন করে….
” তাহলে পড়বো না । বিদারক সমাপ্তি মানতে কষ্ট হয় বড্ড । আমার শিক্ষা আছে এই নিয়ে । কল্পনা তো কম করিনি । কল্পানাতেই সুখে ছিলাম । কিন্তু সুখ সইলো না । সূচনা না হতেই বিদারক সমাপ্তি ঘটলো ।
বলতে বলতে ঘরের দিকে পা বাড়ালো । অংকুর কে পাশ কাটিয়ে যেতেই অংকুর সহসা বললো….
” সমাপ্তি ঘটেছে কি এখনো ?
থমকে দাঁড়ায় সুরবালা । পিছু ফিরে চায় । অংকুর বলে…
” আমাদের জীবনের তো এখনো সূচনাই হয় নি । সমাপ্তি তো অনেক দূরে এখনো ।
সুরবালা ক্ষিয় কাল চেয়ে রয় । নির্বিকার দৃষ্টি সরিয়ে বইটা রাখে টেবিলের উপর ।
কাটলো কটা দিন ।
নতুন দিনের সাথে সাথে আবর্তিত হলো নতুন বছর । বাংলা সন ১৪০০ ।
বাংলা সনের প্রথম দিন আজ । পয়লা বৈশাখ । বৈশাখের এক তারিখ । বাঙালি আনায় আমেজে মেতে উঠেছে সবাই । ময়না সুস্থ একটু । এই কদিনে দূর্বলতা কেটেছে অনেকটা ।
সকাল সকাল আফতাবের বাবা পান্তা নিয়ে বসেছেন । বৈশাখে নাকি পান্তা খেতে হয় । সাথে ইলিশ । তবে ইলিশ খাওয়ার সামর্থ্য নেই তাদের । কাল রাতে হাট থেকে বড় একটা রুই মাছ এনেছেন তিনি । সকাল সকাল মাছ ভাজি করেছেন খালেদা । এখন পান্তার সাথে মাছ নিয়ে খেতে বসেছেন তিনি । ময়না কে সাথে নিয়ে বসেছেন । কাল গঞ্জ থেকে ময়নার জন্য শাড়ি কিনে এনেছেন নিজে । লাল পেড়ে সাদা শাড়ি । ময়না বয়সে ছোট এখনো । অন্যদের মতো ওর ও ছটফটে পনা বর্তমান ।
বৈশাখে নাকি মেয়েরা এমন শাড়ি পড়ে । খালেদা বলেছেন তাকে । শুনেই এক মুহুর্ত অপেক্ষা করেন নি । কিনে এনেছেন নিজ হাতে । সকাল সকাল সেই শাড়ি ময়না কে পড়িয়েও দিয়েছেন খালেদা । এখন ওকে নিয়ে খেতে বসেছে । আফতাবের বাবা নিজে মরিচ ঢলে পান্তা মেখে দিলেন ময়না কে । রুই মাছের বড় টুকরো টা পাতে তুলে দিয়ে বললেন…
” খাও বউমা ।
ময়না আপ্লুত হয়ে চেয়ে রইলো কিছুটা সময় ।
আফতাব বাড়িতে নেই । আজ সকাল সকাল উঠে বেরিয়েছে । হাঁটের দোকানে হালখাতা আছে । আফতাবের কাছে বাকি আছে কিছু টাকা । সে টাকা মিটিয়ে বাড়ি ফিরলো । হাতে মিষ্টির প্যাকেট , আর একটা মোড়ানো ক্যালেন্ডার । নতুন বছরের পাঁজি । দেউড়ি থেকে নতুন শাড়িতে ময়না কে দেখলো । সকাল সকাল গোসল সেরে শাড়ি পড়েছে , ভেজা চুল খোলা । উড়ছে মৃদু বাতাসে । শশুর বউমা মিলে পান্তা ভাত খাচ্ছে মজিয়ে । আফতাবের বাবা কিছু একটা বলতেই খাওয়ার মাঝে ফিক করে হাসলো ময়না ।
আফতাব দাঁড়িয়ে দেখলো হাসি টুকু । চোখ সংযত করে বাড়িতে ঢুকলো । বারান্দার দিকে এগিয়ে যেতেই ওর দিকে দৃষ্টিপাত করলো সকলে । খালেদা বললেন চটপটিয়ে….
” আইছোস আব্বা । তোর লাইগা অপেক্ষা করতে করতে খাইতে বইলো হেরা । খাইবি না , বস এখন….
আফতাব হাতের মিষ্টির প্যাকেট টা বারান্দায় রেখে বললো…
” এখন খাবো না ।
বলেই ঘরে উঠলো আফতাব ।
হাতের ক্যালেন্ডার টা দরজা বরাবর সোজাসুজি টাটির বেড়ায় আটকে দিলো । ময়নার বইয়ের ভাজ থেকে কলম বের করলো একটা । আজ এক তারিখ , এক সংখ্যাটায় কাঁটা বসালো আফতাব । এখন দিন যত পেরোবে , তত কাঁটা পড়বে ক্যালেন্ডারেও । সময় গুনবে আফতাব । উপযুক্ত লগ্নের , শুভ সময়ের প্রতীক্ষা করবে । প্রনয়নের অপেক্ষায় রইবে সে । কবে কাঁটা পড়বে নবতী সংখ্যা । কবে পেরোবে এতো গুলো দিন ? পাঁজির দিকে তাকিয়ে শ্বাস ফেললো আফতাব ।
ময়নার খাওয়া শেষ ইতিমধ্যে । ঘরে আসলো ও । শাড়িটা পাতলা । অস্বস্তি হচ্ছে ওর । তার উপর ঘেমে নেয়ে এককার । পান্তায় মরিচ খেয়েছে জেদ ধরে । ঝালের চোটে জিভ ঝলছে এখন । চোখ লাল হয়ে গেছে । পাতলা অধর নাকের ডগা লালচে ।
ঘরে ঢুকতেই আফতাব তাকালো ওর দিকে । ঝালে কাতরাতে দেখে চোখ সরু করলো । হাতের কলমটা রেখে আগের স্বরুপে ফিরে আসলো । কড়া গলায় বলল…
” হয়েছে টা কি ?
” ঝাল !
ঝাড়ি মারলো আফতাব…
” একটা থাপ্পর মারবো , ঝাল তো এখানে এসেছো কেনো ? এতো ঝাল কে খেতে বলেছে ? কতবার বলি , যা পারো না তা করবে না । আমার কথা শোনো তুমি ? যাও এখান থেকে । মিষ্টি এনেছি , খাও গিয়ে ।
ময়না চুপসে যায় ।
কোথায় ভাবলো নতুন শাড়ি পড়েছে , আফতাব কে দেখাবে এসে । আর আফতাব ওকে ধমকালো । কাঁচুমাচু মুখে ঘর হতে বেরোলো ময়না । ও বেরোতেই খানিক হাসলো আফতাব ।
জমিদার গ্রামে ঢাক ঢোল বাজছে । বৈশাখি মেলার আয়োজন হয়েছে স্কুলের মাঠে । আয়োজক সংগঠনের প্রধান সংগ্রাম জোয়ার্দার । পুরো জমিদার রাজ্যে রোল পড়েছে বৈশাখ উদযাপনে । জমিদার বাড়িতেও সকাল থেকে ধুমধাম শুরু হয়ে গেছে ।
দুপুর গড়িয়েছে ।
ফুলি ঘরে বসে একা একা । ওদের বাড়ির পাশেই স্কুল । সেখানেই মেলা । সবাই ছুটছে মেলার উদ্দেশ্যে । জানালার পাশে বসে বসে আনমনে দেখছে ফুলি । রহিম করিম সকালে বেরিয়েছে একসাথে ।
ওরা ফিরলো । করিমের হাতে একখানা ব্যাগ । নাচতে নাচতে বাড়িতে ঢুকলো দুই ভাই । রহিম মুখ পেঁচার মতো করে রেখেছে । করিমের বউ আছে দেখে জমিদার সংগ্রাম জোয়ার্দার ওর বউয়ের জন্য উপহার পাঠিয়েছে বৈশাখে । শাড়ি , চুড়ি , আলতা , আরো কত কি দেখে নি । আর ওর নিজের একটা বউ নেই দেখে কিচ্ছুটি পায় নি ও । সংগ্রাম জোয়ার্দার বৈষম্য করলেন না এটা ? একেই করিমের আগে বিয়ে দিয়ে বৈষম্য করেছেন , তার উপর এখন এই উপহার । দ্বিগুণ বৈষম্য হলো এবার ।
করিম বেজায় ফুরফুরে । হাতের ব্যাগটা গোটা রাস্তায় কম করে হলেও হাজার বার নাচিয়ে নাচিয়ে দেখিয়েছে রহিম কে । এখন বাড়িতে এসে থামলো । এই পাঠা ফুঁসছে ভেতর ভেতর । কখন যে বোমের মতো ফেটে যায় ভরসা নেই । আম্মার কানে ফুসমন্তর ঢাললে আরো রক্ষে থাকবে না । স্বাভাবিক হলো করিম । ঘরের দিকে যাওয়ার আগে শেষবারের মতো ব্যাগটা দেখিয়ে খোঁচালো রহিম কে । সহসা চেঁচিয়ে উঠলো রহিম…..
” আম্মা ।
ভড়কালো করিম । ঢোক গিলে কিড়মিড় করে তাকালো । চাপা স্বরে বললো…..
” চেঁচাস ক্যান খাসি ? মারছি তোরে আমি ?
বলদার বাচ্চা ।
” ও আম্মা , তোমার বড় পোলা তোমারে বলদ কইছে ।
বেশি জোরে চেঁচালো রহিম ।
” ওরে পাঠা , আইজ বৈশাখ । আইজ তো ভালো হ । পাঠা পাঠা গন্ধ আইতাছে শরীর থাইকা , আগে গিয়া গা ধুইয়া ল । আমি আমার বউরে গিয়া উপহার খান দিয়া আহি ।
” সব সময় বউ বউ করবি না কিন্তু ।
একখান বউ পাইছোস দেইখা মাথা কিন্না লইছোস ?
” হ , কিন্না লইছি । দেখোস না !
আইজ বউরে লইয়া প্রত্থম বৈশাখ । তার উপর জমিদার সাহেবের দেওয়া উপহার । উফফফ , যাই আমি , গিয়া নিজ হাতে বউরে শাড়িখান পড়াইয়া দেই । তুই থাক । বাচ্চা মানুষ । বউ নাই কপালে । বউ থাকলে পয়লা বৈশাখ , আর বউ না থাকলে একলা বইসা থাক । আমি জাইগা আমার বউয়ের কাছে ।
স্কুলের মাঠের মেলায় জমিদার বাড়ির সবাই পৌঁছেছে বিকেলের আগে । শ্যামা কেও নিয়ে যাওয়া হয়েছে । সংগ্রাম দুপুরে বাড়িতে গেছিলো । সবাইকে সাজিয়ে গুছিয়ে এক সাথে মেলাতে নিয়ে এসেছে ও । ওরা সবাই বিশেষ অতিথির সম্মানীয় অভ্যর্থনা পেলো ।
শ্যামার পড়নে বোরখা । শ্যামা কে নিয়ে আসতে চায় নি সংগ্রাম । এসেছে তো বোরখা পড়িয়ে চোখ মুখ বেঁধে নিয়ে এসেছে । তার বেগমের উপর সবার দৃষ্টি নিক্ষেপিত হবে , সেটা তার জানা । মাঠের একপাশে বসার জায়গা । সেখানে বসেছে জমিদার বাড়ির সকলে । খেলার আয়োজন হয়েছে নানা ধরনের । নিকাবেব আড়ালে শ্যামার চোখ । সংগ্রাম অন্যপাশে বসে ।
মাইকে একজন পুরো মাঠের বক্তৃতা শোনা যাচ্ছে । গিজগিজ করছে পুরো মাঠ । ছেলে পেলেদের ভিড় জমেছে । একেই গরম, তার উপর মানুষের সমাগম । বোরকার আড়ালে ঘেমে নেয়ে এককার শ্যামা । সংগ্রামের মাথার উপর একজন বাতাস করছিলেন বড় পাখা দিয়ে । সংগ্রাম তাকে ইশারা করতেই তিনি সেদিক থেকে সরে শ্যামার দিকে এগোলেন । জমিদার বাড়ির মহিলারা সবাই একসাথে বসে । শবনমের পড়নে জামদানি শাড়ি । আঁচল মাথায় টেনে রাখা ।
শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৫৪
এতো সমাগমের মাঝে কয়েক জোড়া লোলুপ দৃষ্টি চেয়ে আছে এদিকে । সোজাসুজি শবনমের পানে । শবনম সুন্দর , অমায়িক সুন্দর । দৃষ্টি আটকানোরই কথা । তবে সব দৃষ্টি সমান নয় ।
বখাটে ছেলে কয়েকটা । জমিদার রাজ্যের নয় । বাইরের কোনো গ্রামের । হয়তো মেলা দেখতে এসেছে । অনেকক্ষণ ধরেই নিজেদের মাঝের খারাপ প্রবৃত্তির প্রকাশ করছিলো দৃষ্টিভঙ্গির দ্বারা । বলাবলি করছিলো এটা ওটা । শ্যামা কে নিয়েও কুৎসিত কথা বার্তা বলেছে । তবে শ্যামাকে যেহেতু দেখা যাচ্ছে না , তাই ওদের লোলুপ দৃষ্টি পড়েছে শবনমের দিকে । বয়স কম , রক্ত গরম শরীরের । কিছু না ভেবেই যা নয় তাই বলেছে আশপাশ না দেখেই । ওরা যা যা বলেছে , সেসব কথা শুনেছে একজন । তার মাধ্যমেই এক সময় সেসব কথা পাই টু পাই কানে পৌঁছেছে সংগ্রামের । সংগ্রাম দাঁত খিচলো । বসা অবস্থায় শান্ত চোখ বুলিয়ে পরখ করলো ছেলে গুলোকে ।
