শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৬০
সুরভী আক্তার
বিকেল গড়িয়েছে । সংগ্রাম শ্যামা কে নিয়ে যেতে চায় নি । দুটো দিন থাকতে দেবে এবার । সকালে ঘুম থেকে উঠেই চলে গেছে সংগ্রাম । আর আসে নি । খবর ও পাওয়া যায় নি আর । এদিকে অলকাও শ্যামা কে ঘর হতেই বেরোতে দিচ্ছেন না । শ্যামা কতবার বললো সে একবার ঘাটের দিকে যাবে , কিন্তু না । অলকা যেতে দিলেন না । সামনের , পেছনের , দুই দিকের খিড়কি আটকে রাখা । সংগ্রামের কড়া নিষেধ , বাড়িতে যেনো বাইরের কেউ আসতে না পারে । শ্যামা কে যেনো চোখে চোখে রাখেন অলকা । শ্যামার প্রতি সংগ্রামের খেয়াল টুকু দেখলেন অলকা ।
শ্যামার প্রতি যথা তৎপর সংগ্রাম । জমিদার সাহেব এতো দেখভাল করে রাখে তার মেয়েটাকে ?
শ্যামা ঘরে বসে বসে হাঁপিয়ে যাচ্ছে । আগেকার সময়ে গুটিয়ে ঝিম মেরে বসে থাকাটা ওর অভ্যাস ছিলো । এখন আর এভাবে বসে থাকতে ইচ্ছে করে না । আর এখানে এসে তো আরো ঘরবন্দি হয়ে গেলো সে । জমিদার বাড়িতে না হয় দুটো কাজ করতো , কিন্তু এ বাড়িতে তার ও সুযোগ নেই । কিই বা করবে শ্যামা ? অলকা তো সবটাই একলা সামলান আগে থেকেই । শ্যামা কে আগেই কিছু করতে দিতেন না , এখন আরো দেবেন নাকি ?
আসরের নামাজের পর থেকেই সেই এক ধাড়ছে বসে আছে শ্যামা । জানালার কাছে বসে তাকিয়ে আছে ঘাটের দিকে । অলকা ঘরের দরজা বাইরে থেকে লাগিয়ে বেরিয়েছেন একটু । মনমরা হয়ে বসে আছে শ্যামা । কতো আহ্লাদ করে এখানে আসতে চাইলো , এখন আবার এখানে এসেও ভালো লাগছে না ।
খট করে দরজা খুললো । চকিতে তাকালো শ্যামা । দরজার কপাট এখনো লাগানো । তাহলে শব্দ আসলো কোথা থেকে ? কপাল গুটিয়ে ফেললো শ্যামা । নড়েচড়ে বসলো । অলকা একটু বাড়ির পেছনের দিকটায় গেছেন । রাতের রান্নার ব্যাবস্থা করতে হবে । পেছনের চালায় লাউ গাছ উঠেছে । লাউ ধরেছে বেশ কটা । লাউ পাড়তে গেছেন অলকা । যাওয়ার আগে শ্যামা কে ঘরে রেখে বাইরে থেকে দরজা লাগিয়ে দিয়ে গেছেন । কাকড়ি বুড়ি ও এই সময় নেই বাড়িতে । পাড়া ঘুরতে বেড়িয়েছেন লাঠিতে ভর করে ।
দরজার কাছে কারোর সাড়া শব্দ নেই । শ্যামা কান খাড়া করে বোঝার চেষ্টা করলো কে এসেছে ! মোখলেছ আসেন নি তো আবার ? আরো বেশি নড়েচড়ে উঠলো শ্যামা । খাট থেকে নামলো এবার । দুই কদম এগিয়ে ডাকলো…
” আম্মা ?
সাঁড়া নেই ।
শ্যামা ফের ডাকে সন্দেহ কাটাতে…
” আম্মা , তুমি আইছো ?
দু-দুবার কোনো সাঁড়া শব্দ নেই । কারোর উপস্থিতির আভাস নেই । শ্যামা এগিয়ে গেলো জোর কদমে । দরজায় হাত রাখলো । দরজা টেনে খোলার চেষ্টা করলো , না তো , খুললো না । এখনো বাইরে থেকেই দরজা লাগানো । তাহলে অমন শব্দটা আসলো কোথা থেকে ?
শ্যামা শক্তি খাটিয়ে দরজা টানলো । খুললো না । ওর কসরতের মাঝেই অদ্ভুত কিছু চাপা কন্ঠ কানে ঠেকলো । ধক্ করে উঠলো শ্যামা । বোঝার চেষ্টা করলো ধ্যান দিয়ে । বাইরে কেউ আছে নিশ্চয়ই ! কিন্তু,কে ? শ্যামা তীক্ষ্ণ হয়ে কান খাড়া করে । যা বুঝলো, তাতে কারোর মৃদু গোঙানির মতো গুমড়ে ওঠা আওয়াজ কানে আসলো । যেনো কারোর মুখ চেপে ধরে তাকে আটকে রাখা হয়েছে ।
আশঙ্কা বুঝে ছ্যাঁত করে উঠে দরজায় জোরে জোরে বাড়ি মারতে লাগলো শ্যামা । মাথায় ঝিঁঝিঁ ধরলো । শ্যামা জোরে জোরে ডাকলো…
” আম্মা , ও আম্মা । তুমি বাইরে আছো ? আম্মা , দরজা খুলে দাও । কিসের শব্দ আসছে বাইরে থেকে । তুমি এসেছো আম্মা ? দরজাটা খুলে দাও , ভয় করছে আমার ।
কোনো প্রতিক্রিয়া নেই । শ্যামা ঢোক গিলে এক মুহুর্ত থামলো । হাঁসফাঁস করে শ্বাস টানলো । নিজেকে সামলে নিলো । দরজায় কান পাতলো । আর তেমন কিছুই শুনতে পারলো না । বাইরেটা এখন নিস্তব্ধ ।
গুটিয়ে আসলো শ্যামা । শাড়ির আঁচল খামচে ধরে পিছিয়ে আসলো । ঢোক গিলে খাটের এক কোণে বসে চোখ বন্ধ করে পরপর শ্বাস ফেলতে লাগলো । সবটা নিজের মনের ভুল ভেবে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলো । এই বিকেলে কেই বা আসবে এ বাড়িতে ? আর এমনিতেও দুদিকের খিড়কি আটকে দেওয়া । অলকাও তো নেই , মোখলেছ আসলে খিড়কি খোলার জন্য গলা উঁচিয়ে ডাকতে হবে তাকে ।
স্থির হয়ে বসলো শ্যামা । মুখ গোল করে শ্বাস ফেললো ।
পেরোলো কিছুটা মুহুর্ত । অলকার দেখা নেই । এতক্ষণ লাগে লাউ নিয়ে আসতে ? শ্যামা বিচলিত । কেমন ভয় ভয় লাগছে ওর ।
আবারো দরজা খোলার শব্দ হলো । এবার খুললো দরজার কপাট । ঝট করে উঠে দাঁড়ালো শ্যামা । অলকার আসার আভাস পেয়ে দ্রুত চঞ্চলা হয়ে এগিয়ে গেলো । অলকা ঘরে ঢুকলেন । আম্মা কে দেখেই হুমড়ি খেয়ে পড়ল শ্যামা । তড়িতে আম্মাকে জড়িয়ে ধরলো ভয় কাটাতে । অলকা কিছু বুঝলেন না । শ্যামা বিড়বিড় করলো ….
” আম্মা ! তুমি আইছো….
” কি হইছে শ্যামা ? এমনে দম ফেলতাছোস ক্যান ?
শ্যামা ছাড়লো আম্মা কে । অলকার হাত টেনে দ্রুত দরজার বাইরে বেরোতে বেরোতে উদ্বিগ্ন হয়ে বললো…..
” আম্মা , আম্মা , এইহানে কেউ আছিলো আম্মা । আমি দরজা খোলার শব্দ পাইছি । গোঙানির আওয়াজ পাইছি কারোর । কেউ আছিলো এইহানে ।
কপাল গুটিয়ে ফেললেন অলকা ।
বারান্দা ছাপিয়ে আঙিনার এদিক ওদিক তাকালেন শ্যামার সাথে সাথে । শ্যামার সেই ভয় বুঝতে পারলেন তিনি । তবে কারনটা বুঝলেন না । বললেন শান্তনা দিতে….
” কেউ আছিলো না এইহানে , আমি তো দোর লাগায় গেছিলাম । এহন আবার দোর খুইলা আইলাম । কই , কাউরে তো দেখলাম না । আর কার এতো সাহস আমগোর বাড়িত আইবো ? তুই ভুল শুনছোস । মনের খেয়ালে ভুল ধারণা করছোস তুই ।
জিভে ঠোঁট ভেজায় শ্যামা । আকস্মিক যন্ত্রণায় খিচে ধরে মাথাটা । এতো কিসের ভুল ধারণা ওর ? এতো এতো ভুল ধারনা , কেনো করে ও ? নিজের প্রতি বিরক্ত হয় শ্যামা । ছিড়ে যায় মাথাটা । অলকা মেয়ের পরিস্থিতি বুঝলেন । এই মেয়েকে সামলে সামলে অভ্যস্ত তিনি । এখন আর সামলাতে হয় না, এই যা । এখন তার মেয়েকে সামলানোর জন্য এসেছেন দায়িত্ববান কেউ । অলকা মেয়ের হাত চেপে ধরলেন শক্ত করে । মাথা নিচু করে চোখ খিচে অলকা কে কিছুক্ষণ জাপটে ধরে রইলো শ্যামা । ও শান্ত না হওয়া অবধি অলকা ছাড়লেন না মেয়েকে । ঘন ঘন শ্বাস ফেলছে শ্যামা ।
আকস্মিক অলকার দৃষ্টি মাটিতে পড়লো । অমনি দৃষ্টি থমকালো তার । কপালে তীক্ষ্ণ ভাঁজ পড়লো । বারান্দার নিচে মাটিতে লাল লাল ছোপ দাগ । অনেকটা আবছা । সুক্ষ্ম ভাবে পরখ না করলে বোঝার জো নেই । অলকা প্রথমত গাঢ় দৃষ্টিতে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করলেন । বারান্দা থেকে চোখ নিচে নামালেন । ছোপ ছোপ দাগ প্রায় অনেক জায়গায় । অলকা গুরুত্ব দিলেন না আগেই । শ্যামা স্থির হতেই শ্যামা কে নিয়ে ঘরে ঢুকলেন তিনি । ঘরে শ্যামা কে বসিয়ে হারিকেন জ্বালালেন বিকেলের আলো থাকা সত্ত্বেও ।
মেয়েকে আশ্বস্ত করে বাইরে বেরোলেন তিনি । ঠিক আগের জায়গায় তীক্ষ্ণ দৃষ্টি পাত করলেন । হাঁটু মুড়ে ঝুঁকে বসলেন । হ্যাঁ তো , লাল দাগ মাটিতে । দেখে মনে হচ্ছে আলতা বা এমন কিছু ! কেউ পা দিয়ে মাড়িয়ে দাগ মোছার চেষ্টা করেছে , তা দেখেই বোঝা যাচ্ছে স্পষ্ট ।
কিন্তু আলতা কোথা থেকে আসবে এখানে ? অলকা পরখ করলেন , এই দাগটা সেভাবেই ছোপ ছোপ হয়ে পেছনের খিড়কির দিকে পৌঁছেছে । বারান্দায় দাগের ছোপ বেশি । ওদিকটায় কম । এই ছোপ দাগ টাকেও মোছার চেষ্টায় রত ছিলো কেউ । যেনো প্রমাণ লোপাটের চেষ্টা ছিলো । যাতে কোনো প্রমাণ না থাকে তাই ।
অলকা বুঝলেন না , মাথায় কিছু ঢুকলো না তার । আলতা নয় , আলতা না হয়ে এই লাল তরলের দাগ রক্ত ও তো হতে পারে । কিন্তু রক্তই বা আসবে কোথা থেকে ?
অলকার মনে পড়লো ঠিক কমাস আগের কথা । শ্যামার বিয়ের আগের কথা । যখন মানিক আর ফরিদ এবাড়িতে আসলো , তখনকার কথা । কিন্তু তখন কল পাড়ের বাইরে রক্ত দেখেছিলেন তিনি । আর রক্ত ঝড়েছে কার শরীর থেকে , আর কে ঝড়িয়েছে , তা তিনি ঠিক ধরে ফেলেছিলেন । তবে আজ পারলেন না । আজ শ্যামা ভয় পেয়েছে । কারোর উপস্থিতির আভাস পেয়েছে । অলকার তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে সবকিছু ।
মাথা থেকে আপাতত এসব ঝেড়ে ফেললেন তিনি ।
সন্ধ্যা গড়িয়েছে । তড়িঘড়ি করে রান্না শেষ করেছেন অলকা । শ্যামা কে আর একলা ছাড়েন নি । রান্না শেষে বুড়ির ঘরে আলাদা করে খাবার পৌঁছে দিয়েছেন । অতঃপর মেয়েকে নিয়ে সন্ধ্যা রাত্রি গাঢ় হাওয়ার আগেই ঘরে ঢুকেছেন তিনি । তার কেমন গাঁ ছমছম করছে সেই বিকেল থেকেই ।
সংগ্রাম আসার সময় হয়েছে । এসেও পড়লো সে । খিড়কিতে কড়া পড়তেই খিড়কি খুলে দিলেন অলকা । সংগ্রাম ধড়ফড়িয়ে ভেতরে ঢুকলো । বিচলিত হয়ে বললো….
” শ্যামা কোথায় আম্মা ?
” ঘরেই আছে , বাবা ।
সংগ্রাম আর কথা এগোলো না । দ্রুত আঙিনা পেরিয়ে ঘরে ঢুকলো । শ্যামা হারিকেনের আলোয় পিটপিট করে বসে আছে হাঁটুতে মাথার ভার ছেড়ে । সেই থেকে মাথাটা ধরেছে ওর । ভালো লাগছে না কিছুই ।
সংগ্রাম ঘরে ঢুকে হাঁসফাঁস করে শ্যামার দিকে এগোলো । শ্যামা কে ওভাবেই টেনে জড়িয়ে ধরলো ।
” বেগম , কি হয়েছে তোমার ? ঠিক আছো তুমি ? সব ঠিক আছে ? তুমি , তুমি ঠিক আছো তো ?
শ্যামা স্বাভাবিক হলো । প্রত্যুত্তরে বললো মলিন ভাবে….
” আমার কি হবে ছোট জমিদার সাহেব ? আমি তো ঠিক আছি । আপনি এমন করছেন কেনো ? শান্ত হোন । কি হওয়ার ছিলো আমার ? আমি ঠিক আছি সম্পুর্ন ।
সংগ্রাম ওকে ছাড়ে না । চোখ বুজে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে । খানিক বাদ ছেড়ে মৃদু হাসে । মুখ বরাবর বসায় শ্যামা কে । সংগ্রামের চোখে মুখে আতঙ্কিত ছাপ । ঘামে চিকচিক কপাল । পরিপাটি জমিদার সাহেবের চুল গুলো এলোমেলো । শ্যামা অবাক লোচনে তাকিয়ে শুধোয়….
” কি হয়েছে আপনার । এ কি অবস্থা করেছেন ? তাড়াহুড়ো করে এসেছেন নিশ্চয়ই ?
সংগ্রাম আলগোছে মাথা নাড়ায় । শ্বাস ফেলে পরপর । কলিজা শুকিয়ে আসছে ওর । ও শ্যামা কে ছুঁয়ে দেখলো ।হাত বাড়িয়ে দিলো শ্যামার দিকে । শ্যামার গালে হাত রাখলো । মুখখানা হাতের আজলে নিয়ে কপালে চুমু খেলো । সবটা ছেড়ে ছুড়ে বললো হুটোপাটি করে….
” চলো , বাড়ি যাবো ।
আর এক মুহূর্ত ও থাকবো না এখানে । এক মুহুর্ত ও আমি তোমাকে আমার কাছ থেকে আলাদা রাখতে পারবো না । চলো , নামো ।
” কি বলছেন ? এখন এই রাতে কেনো যাবো ? আপনিতো বলেছিলেন আমাকে কদিন রাখবেন এ বাড়িতে !
” উঁহু , রাখবো না আর । তুমি আমার কাছে সব , তোমার নিরাপত্তা টাই সব । চলো বেগম , কথা বাড়িও না । আমার ভালো লাগছে না কিছু । একটু বোঝার চেষ্টা করো…
ভীষণ অসহায় লাগছে সংগ্রামের মুখশ্রী । শ্যামা বিষ্ময়ে মূর্ত । আর কথা বাড়ানোর মতো ইচ্ছে জাগলো না । অলকা কড়া নেড়ে ঘরে ঢুকলেন । ততক্ষণে শ্যামা কে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে দাঁড়িয়ে গেছে সংগ্রাম । অলকা ঘরে ঢুকতেই বললো সে….
” আমি শ্যামা কে নিয়ে বাড়ি ফিরছি আম্মা ।
” সে কি , এখন ?
” হ্যাঁ আম্মা ।
” কিছু হইছে বাবা ? তোমারে এমন দেখাইতাছে ক্যান ?
” তেমন কিছু না আম্মা । গরম পড়েছে খুব । তাই হয়তো ।
এখন আমি শ্যামা কে নিয়ে চলে যাচ্ছি আম্মা । ভালো থাকবেন ।
অলকা কে সংগ্রাম কিছু বলার সুযোগ দেয় না । সুযোগ দিলেই কথা বাড়বে । আর এই মুহূর্তে সংগ্রাম মোটেই কথা বাড়াতে চাইছে না । সে পাশ কাটাতে চাইছে অলকা কে । অলকার পর্ববর্তী প্রশ্ন থেকে গাঁ বাঁচাতে চাইছে ।
অলকা কিছু বলার আগেই শ্যামা কে নিয়ে বাইরে বেরোলো সংগ্রাম । মা মেয়ের কথা বলার সুযোগ টুকু ও দিলো না আর ।
সুরবালা গাল ফুলিয়ে বসে আছে ।
অংকুর ওর জন্য কিছুই আনে নি । অভিমান হয়েছে মেয়ের । অভীমান না হলেও অভিমান দেখাচ্ছে ও । অংকুরের সম্পুর্ন খেয়াল নিজের দিকে টানার জন্য মুখ ভার করে রেখেছে । অথচ অংকুর ঘরে নেই । বারান্দায় সে । রাতের খাবারের পর সেই যে বই হাতে বারান্দায় বসেছে , ওঠে নি আর । সুরবালা ওকে ডাকেও নি । সে কি যেচে পড়ে ডেকে এনে নিজের অভিমান দেখাবে নাকি ?
মুখ কালো করে আর কোনো কাজ না পেয়ে কাপড় গোছাচ্ছে সুরবালা ।
রাত হয়েছে অনেকটা । হাতের উপন্যাসের বইটা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বন্ধ করলো অংকুর । চশমা ভেদে শূন্যে দৃষ্টি পাত করে আনমনে মুচকি হাসলো । অতঃপর উঠে দাঁড়ালো ।
অংকুর ঘরে ঢুকেই সুরবালা কে দেখলো কাপড় গোছাতে । মুখ কালো করে রেখেছে মেয়েটা । অংকুর ওর জন্য কিছু আনে নি , আনলেও এ পর্যন্ত দেয় নি । এই নিয়ে এর মধ্যেই হাজার বকবক শুনিয়ে দিয়েছে অংকুর কে ।
দুদিকে মাথা নাড়িয়ে শ্বাস ফেললো অংকুর ! এগিয়ে এসে হাতের বইটা টেবিলের উপর রাখলো । চোখের চশমা খুলে হাতে ধরে ডাকলো…
” সুরবালা ? এদিকে এসো তো…
এক পলক তাকিয়ে মুখ ভেংচায় সুরবালা । হাতের কাজের গতি বাড়িয়ে দেয় । ঝাড়া মেরে গোছাতে লাগে কাপড় গুলো । অংকুর আবার ডাকলো মৃদু স্নিগ্ধ স্বরে…
” এই বাউড়ি , ডাকছি তো । এসো এদিকে…
গলা ভার করে চোখ উল্টিয়ে ঘ্যাসঘ্যাসে গলায় ওকে অনুকরন করলো সুরবালা…
” এই বাউড়ি , ডাকছি তো । এসো এদিকে…
অংকুর কপাল গুটালো । চশমাটা টেবিলের উপর রেখে বুকে হাত গুটিয়ে নিলো । বললো…
” আবার কি হলো তোমার ?
সুরবালাও গলা ভেঙ্গিয়ে অনুকরন করলো একই ভাবে…
” আবার কি হলো তোমার ?
” আজব , আমাকে নকল করছো কেনো ?
” আজব , আমাকে নকল করছো কেনো ?
শ্বাস ফেলে অংকুর ।
” এমনি এমনি তোমাকে বাউড়ি বলি না আমি ?
” এমনি এমনি তোমাকে বাউড়ি বলি না আমি ?
” এইইইই বাউড়ি, কি শুরু করলে তুমি ?
” এইইইই বাউড়ি, কি শুরু করলে তুমি ?
চোখ সরু করে অংকুর । এই মেয়ে কে নিয়ে পারা যায় না । মাঝে মাঝে এমন বাচ্চামো করে ! এখন ওকে নকল করতে শুরু করে দিয়েছে ।
অংকুর দুদিকে মাথা নাড়ায়… বিড়বিড়িয়ে বলে…
” কথাই বলবো না তোমার সাথে ।
ওদিক থেকে সুরবালার একই কথা…
” কথাই বলবো না তোমার সাথে ।
অংকুর দীর্ঘক্ষণ চুপ থাকলো । মিটিমিটি হাসলো । সুরবালা কে একটু জব্দ করাই যায় এই সুযোগে । ওর জালেই না হয় ওকে ফাঁসানো যাবে ।
চেয়ারের উপরে ওর ব্যাগটা রাখা । এটাতে এখনো ওর কাপড় সহ বাকি সব আছে । বের করাই হয় নি । অংকুর ব্যাগের চেইন খুলে কিছু একটা বের করলো । সেটাকে পেছনে লুকিয়ে ফেললো । সুরবালার দিকে ফিরে মিটমিট করে বলল দুষ্টু বুদ্ধি এঁটে…
” আচ্ছা বাউড়ি , একটা কথা বলো তো ।
” আচ্ছা বাউড়ি , একটা কথা বলো তো ।
অংকুর ধীরে ধীরে এগোয় । বলে…
” আমাকে তোমার কেমন লাগে ?
” আমাকে তোমার কেমন লাগে ?
” আমি খুব সুন্দর তাই না ?
” আমি খুব সুন্দর তাই না ?
” শোনো , আমি কিন্তু তোমাকে ভালোবাসি !
সুরবালা এক মুহুর্ত চুপ থাকলো । তবুও অনুকরণ করতে ভুললো না…
” শোনো , আমি কিন্তু তোমাকে ভালোবাসি !
” সত্যিই ভালোবাসো ?
” সত্যিই ভালোবাসো ?
” কাছে এসো ।
” কাছে এসো ।
অংকুর তড়িতে কাছে এগোয় । হাতের কাপড় ছেড়ে ঝট করে পেছায় সুরবালা । অংকুর মৃদু স্বরে শুধায় ভ্রু উঁচিয়ে…
” কাছে ডাকলে কেনো ?
সুরবালা হাল ছাড়লো না ।
” কাছে ডাকলে কেনো ?
” আরো কাছে এসো !
এ পর্যায়ে গলা নুইয়ে আসলো সুরবালার । এবার বেশি বেশি হয়ে গেলো । তবুও বললো থেমে থেমে…
” আ..আরো কাছে এসো ।
দূরত্ব ঘোচে অংকুর । সুরবালা পেছাতে গিয়ে ধপ করে বসে পড়ে খাটে । ওর মুখের উপর ঝুঁকে পড়ে অংকুর । ওষ্ঠ পিষে বলে ফিসফিস করে….
” এবার যা বলবো , তাই করবে । না করলে তুলে আছাড় মারবো তোমায় ।
” এবার যা বলবো , তাই করবে । না করলে তুলে আছাড় মারবো তোমায় ।
” একটা চুমু খাও আমায় ।
চোখ বৃহৎ করে তাকায় সুরবালা । অংকুরের ঠোঁটের কোণে ফিচেল হাসি । চোখে মাদকতা । সুরবালা মুখ বাঁকালো । ভীত স্বরে থেমে থেমে তবুও অনুকরণ করলো ওকে…
” এ…একটা চুমু খাও আমায় ।
কথা শেষ হতে দেরি হলো , টুপ করে সুরবালার বাম গালে অংকুরের ঠোঁট বসাতে দেরি হলো না । বিদ্যুতের গতিতে ছোট্ট চুম্বন এঁকে দূরে সরে আসলো অংকুর ।
আকস্মিক কান্ডে বিরাট ঝটকা খেলো সুরবালা । শিহরিত হতে গিয়ে স্তব্ধ হয়ে গেলো । পাথরের ন্যায় জমে গেলো মেয়েটা । চক্ষু চড়কগাছ , চোখ জোড়া কোটর ফেটে বেরিয়ে আসার দশা । অবিশ্বাসে হতবাক বনে গেলো ও ।
অংকুর পিছু ফিরে মুখ আড়াল করে হাসি টুকু চেপে ধরলো । সুরবালা পিছন থেকে হা বনে তাকিয়ে রইল ওর দিকে । মুহুর্ত কয়েক বাদ ওর বাম হাত খানা আপনা আপনি বাম গালে উঠলো । ওষ্ঠ স্পর্শ করা স্থানে হাত চেপে খুক খুক করে কেশে উঠলো মেয়েটা । ভিমড়ি খেয়েছে বিরাট ।
অংকুর অগত্যা পিছু ফিরে এক গ্লাস পানি এগিয়ে দিলো ওর দিকে…
” পানি খাবে বাউড়ি ?
সুরবালার কাশি থেমে যায় । বিষ্মিত চোখে তাকায় ও । অংকুর কেমন অদ্ভুত মুখো ভঙ্গিমা করে রেখেছে । সুরবালা ঢোক গিললো । অংকুর পানির গ্লাস টা নামিয়ে রাখলো । ঠোঁটের কোণে ভিড় জমানো হাসি ঠেলে বললো….
” কি দেখছো ? আমি বাবা বউয়ের কাছে আছাড় খেতে চাই না । তোমাকে বিশ্বাস নেই । বলেছো যেহেতু , চুমু না খেলে আছাড় দিতেও খামতি রাখতে না । তাই আর কি….
অংকুরের দোনামোনার মাঝেই তেঁতে উঠলো সুরবালা…
” বাবড়ি ওয়ালা , আপনি খুব বাড় বেড়েছেন ।
” বাড়িনি তো । পাঁচ ফুট দশ ইঞ্চিই আছি ।
ফোঁস করে শ্বাস ফেললো সুরবালা । যদিও ওর ভীষণ লজ্জা লাগলো , ভালোও লাগার সৃষ্টি হলো উথাল পাতাল মনে , কিন্তু প্রকাশ করলো না সুরবালা ।
অংকুর নিজের হাতের প্যাকেট টা এগিয়ে দিয়ে বললো…
” এইযে , তোমার উপহার । কিছু আনিনি,আনিনি বলে মাথা খারাপ করে দিচ্ছিলে । মুখ ভার করে রেখেছিলে । অথচ এনেছি কি না তার খোঁজ নাও নি ।
সুরবালা চিকচিক করে ওঠে । নিমিষেই একটু আগের ঘটনা টুকু গিলে ফেলে । অংকুরের হাত থেকে প্যাকেটটা কেড়ে নিয়ে বলে….
” আমার জন্য সত্যিই উপহার এনেছেন আপনি ? এটা আমার জন্য ? কি এনেছেন ?
” খুলে দেখো !
শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৫৯
সুরবালা ঝটপট প্যাকেট টা খুলতে লাগলো । ভেতরের জিনিস টুকু দেখে চোখ ছানাবড়া হয়ে আসলো ওর । বিস্মিত হলো মেয়েটা । দীর্ঘ পলক হাতের জিনিসটার দিকে অবাক লোচনে তাকিয়ে থেকে দৃষ্টি তুললো অংকুরের দিকে । অমনি ভ্রু অংকুর । বুকে হাত গুটিয়ে বললো…..
” কি বাউড়ি , পছন্দ হয়েছে উপহার ?
